আদিশূর -Adisur

Adisur of Bengal [1060 CE]

এই প্রশস্তি যে কেবল বর্ম্ম-রাজবংশের এবং দ্বাদশ শতাব্দীর রাঢ়-বঙ্গের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশের ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে আলোক দান করে এমন নহে, ইহা বাঙ্গালার ইতিহাসের আরও একটি গুরুতর প্রশ্নের মীমাংসার সহায়তা করে। এই গুরুতর প্রশ্ন,—আদিশূর ঐতিহাসিক ব্যক্তি কি না? আদিশূর নামক যে প্রকৃত একজন রাজা ছিলেন, এ বিষয়ে কেহ কখনও সন্দেহ করেন নাই। আদিশূর কখন কোন্ স্থানে রাজত্ব করিয়া গিয়াছেন, এই কথা লইয়াই বহু দিন বাদানুবাদ চলিতেছে। কিন্তু ভট্ট-ভবদেবের ভুবনেশ্বরের প্রশস্তি পাঠ করিলে, আদিশূরের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই সন্দেহ উপস্থিত হয়। “গৌড়রাজমালায়” আদিশূর স্থান পাইতে পারেন কি না, এ স্থলে এ কথার মীমাংসার যত্ন করা কর্ত্তব্য। সুতরাং, প্রক্রমভঙ্গ হইলেও, এখানে সেই প্রশ্নের বিচারের পর, বর্ম্ম-বংশের ইতিহাস আলোচিত হইবে।

কুলপঞ্জিকা বা ঐ শ্রেণীর গ্রন্থ ভিন্ন, আর কোথায়ও আদিশূরের পরিচয় পাওয়া যায় না। এখন সকল কুলপঞ্জিকা দেখা যায়, তাহা আদিশূরের আনুমানিক আবির্ভাব-কালের অনেক পরে রচিত। পরবর্ত্তী কালের রচনা হইতে ইতিহাসের উপাদান সংগ্ৰহ করিতে হইলে, বিশেষ সাবধানতা আবশ্যক। যে পরবর্ত্তী কালের গ্রন্থে তুল্যকালীন গ্রন্থোক্ত প্রমাণ উদ্ধৃত থাকে, তাহাই কেবল ইতিহাসের উপাদানের ভাণ্ডাররূপে গৃহীত হইতে পারে। কুলগ্রন্থনিচয়ে উল্লিখিত আদিশূর রাজার বিবরণ যে সেরূপ প্রমাণ অবলম্বনে সঙ্কলিত, তাহা এযাবৎ কেহই প্রতিপাদন করিতে পারেন নাই। কারণ, আদিশূরের সময়ের কোন চিহ্নই এখনও পাওয়া যায় নাই। অনেকে বলিতে পারেন, কুলপঞ্জিকার আদিশূর রাজার বিবরণ প্রত্যক্ষ প্রমাণমূলক না হইলেও, জনশ্রুতিমূলক; এবং জনশ্রুতির যদি ইতিহাসে স্থানলাভ করিবার অধিকার থাকে, তবে আদিশূর রাজার বিবরণ ইতিহাসে স্থান পাইবে না কেন? জনশ্রুতিমাত্রই যে প্রামাণ্য এবং ঐতিহাসিকের নিকট আদরণীয়, এমন নহে। যে জনশ্রুতি প্রবল এবং প্রত্যক্ষপ্রমাণের অবিরোধী, তাহাই ঐতিহাসিকের বিবেচ্য; এবং যে প্রবল জনশ্রুতি প্রত্যক্ষ প্রমাণের অনুকূল, তাহাই ইতিহাসে স্থান লাভের যোগ্য।

এখন আদিশূর সম্বন্ধীয় জনশ্রুতির পরীক্ষা করিয়া দেখা যাউক্, উহার ঐতিহাসিকতা কত দূর। রাঢ়ীয় কুলজ্ঞগণের মধ্যে প্রচলিত আদিশূর সম্বন্ধীয় জনশ্রুতি নিম্নোক্ত শ্লোকটিতে বিনিবদ্ধ আছে—

“आसीत् पुरा महाराज आदिशूर प्रतापवान्।
आनीतवान् द्विजान् पञ्च पञ्चगोत्र-समुद्भवान्॥”[১]

এখানে পাওয়া গেল,—আদিশূর ছিলেন (আসীৎ)। বারেন্দ্র কুলজ্ঞগণের গ্রন্থে আরও কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁহারা আদিশূরের এবং বল্লালসেনের সম্বন্ধ নিরূপণ করিয়াছেন। যথা—

“जातो वल्लालसेनो गुणि-गणित स्तस्य दौहित्र-वंशे।”

“আদিশূর রাজা পঞ্চগোত্রে পঞ্চব্রাহ্মণ আনয়ণ করিলেন [পঞ্চব্রাহ্মণের পরিচয়] এহি পঞ্চগোত্রে পঞ্চব্রাহ্মণ সংস্থাপন করিয়া আদিশূর রাজার সর্গারোহণ॥ তদন্তে কিছুকালানন্তর তত দহিত্র কুলেত উদ্ভব হইলেন বল্লালসেন [বল্লালসেন কর্ত্তৃক কুলমর্য্যাদা স্থাপন এবং রাঢ়ী ও বারেন্দ্র-বিভাগ] ইত্যবকাশে অন্যান্য দেশীয় রাজাসকল ব্রাহ্মণহীন দেশ বিবেচনা করিয়া বল্লালসেনের নিকট ব্রাহ্মণ যাচিঞা করিয়া কহিলেন সুনহে বল্লালসেন তোমার মাতামহ কুলোদ্ভব আদিসূর পঞ্চগোত্রে পঞ্চব্রাহ্মণ আনয়ন করিয়া গৌড়মণ্ডল পবিত্র করিয়াছেন। আমরা যবনাক্রান্ত দেশে বাস করি আমারদিগের দেশে কিঞ্চিৎ ব্রাহ্মণ প্রেরণ করিয়া আমারদিগের দেশ পবিত্র করি।”[২]

আদিশূর সম্বন্ধে যে সকল জনশ্রুতি প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে এইটিই সর্ব্বাপেক্ষা প্রবল। কুলজ্ঞগণের মুখ্য উদেশ্য ইতিহাস-সঙ্কলন নহে, বংশাবলী-রক্ষা। বংশাবলী অনুসারে হিসাব করিলে, আদিশূরের যে সময় নির্দ্ধারিত হয়, তাহার সহিত এই জনশ্রুতির সামঞ্জস্য করা যাইতে পারে। “গৌড়ে ব্রাহ্মণ”-কার বারেন্দ্র-ব্ৰাহ্মণগণ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন,[৩]

—“শাণ্ডিল্য-গোত্রীয় বর্ত্তমান ব্যক্তির পুরুষ সংখ্যা ভট্টনারায়ণ হইতে ৩৬৷৩৭ এবং ৩৮ পুরুষ, কাশ্যপগোত্রে ৩১৷৩২৷৩৩৷৩৪ পুরুষ, ভরদ্বাজগোত্রে ৩৫ হইতে ৩৯ পুরুষ, কিন্তু বাৎস্যগোত্রে ২৫ হইতে ২৮ পুরুষ দৃষ্ট হয়।”

রাঢ়ীয় সমাজে ৩৫ হইতে ঊর্দ্ধতন পর্য্যায়ের লোক বিরল। বাৎস্যগোত্র ছাড়িয়া দিলে, বর্ত্তমান কালকে আদিশূর-আনীত ব্রাহ্মণগণের কাল হইতে গড়পড়তায় ৩৪৷৩৫ পুরুষের কাল বলা যাইতে পারে। প্রতি পুরুষে ২৫ বৎসর ধরিয়া লইলে, আদিশূর ৮৫০ বৎসর পূর্ব্বে [১০৬০ খৃষ্টাব্দে] বর্ত্তমান ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। এই অনুমান, “বেদবাণাঙ্ক-শাকেতু গৌড়ে বিপ্রাঃ সমাগতাঃ” [৯৫৪ শাকে বা ১০৩২ খৃষ্টাব্দে গৌড়ে ব্রাহ্মণগণ আগমন করিয়াছিলেন] এই কিম্বদন্তীর বিরোধী নহে, এবং তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে কর্ণাট-রাজকুমার বিক্রমাদিত্যের সহিত বল্লালসেনের পূর্ব্বপুরুষের গৌড়ে আগমনকালের সহিত ঠিকঠাক মিলিয়া যায়। প্রথম রাজেন্দ্রচোলের তিরুমলয়-লিপিতে দক্ষিণরাঢ়ের অধিপতি রণশূরের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। আদিশূরকে রণশূরের পুত্র বা পৌত্র ধরিয়া লইলে, কোন গোলই থাকে না।

রাজসাহীর রাণী হেমন্তকুমারী-সংস্কৃতকলেজের স্মৃতিশাস্ত্রের অধ্যাপক বিক্রমপুর-নিবাসী পণ্ডিতবর শ্ৰীযুত বামনদাস বিদ্যারত্ন মহাশয় লেখককে যে পাতড়া দিয়াছেন, তাহার আরম্ভে এই শ্লোকটি আছে। তৎপরে আর ১৩টি শ্লোকে পঞ্চব্রাহ্মণের আগমনবৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে, এবং উপসংহারে আছে—“ইতি আদিশূর-ব্যাখ্যানং সমাপ্তং।” বিদ্যারত্ন মহাশয় বলেন, এই শ্লোক কয়টি “কুলরমার” সূচনায় দৃষ্ট হয়। আমার পরীক্ষিত রাঢ়ীয় কুলগ্রন্থ মধ্যে ধ্রুবানন্দমিশ্রের “মহাবংশাবলী”-গ্রন্থে কান্যকুব্জ হইতে পঞ্চব্রাহ্মণ আগমনের কোন উল্লেখ নাই। ধ্রুবানন্দ “নত্বা তাং কুলদেবতাং” ইত্যাদি শ্লোকে মঙ্গলাচরণ করিয়া আরম্ভ করিয়াছেন—

“आयितो बहुरूपाख्यः शिरो गोवर्द्धनः सुधीः।
गां शिशो मकरन्दश्च जाल्वनाख्यः समा इमे॥”

মহেশের “নির্দ্দোষ কুলপঞ্জিকায়”—

“क्षितीशो तिथिमेधा[च] वीतरागः सुधानिधिः।
सौभरिः पञ्चधर्म्मात्मा आगता गौड़-मण्डले॥”

এই পর্য্যন্ত উল্লিখিত হইয়াছে, আদিশূরের নাম নাই।

বারেন্দ্র-কুলপঞ্জিকার ঐতিহাসিক অংশ “আদিশূর রাজার ব্যাখ্যা” নামে পরিচিত। লালোর-নিবাসী শ্রীযুত মনোমোহন মুকুটমণির, মাঝগ্রামের শ্রীযুত জানকীনাথ সার্ব্বভৌমের, এবং রামপুর-বোয়ালিয়ার শ্রীযুত নৃত্যগোপাল রায় মহাশয়-সংগৃহীত পুঠিয়া নিবাসী ৺ মহেশচন্দ্র শিরোমণির ঘরের পুস্তক মধ্যে পাঁচ প্রকার “আদিশূর রাজার ব্যাখ্যার” পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। তন্মধ্যে দুই খানিতে বল্লালসেন আদিশূরের দৌহিত্র-বংশোদ্ভব বলিয়া কথিত। উপরে তাহা উদ্ধৃত হইল। “গৌড়েব্রাহ্মণ”-গ্রন্থে (দ্বিতীয় সংস্করণ, ৯৬ পৃ) উদ্ধৃত একটি শ্লোকে কথিত হইয়াছে—রাজা শ্রীধর্ম্মপাল ভট্টনারায়ণের পুত্র আদিগাঞিকে যজ্ঞান্তে দক্ষিণা-দানার্থ ধামসার গ্রাম দান করিয়াছিলেন। শ্রীযুত নগেন্দ্রনাথ বসুর মতানুসারে, এই ধর্ম্মপালকে যদি পালবংশীয় ধর্ম্মপাল মনে করা যায়, তবে আদিশূরকে ধর্ম্মপালের পিতা গোপালের তুল্যকালীন বিবেচনা করিতে হয়। এইরূপ সিদ্ধান্ত “গৌড়ে ব্রাহ্মণে” ধৃত (৮৩ পৃঃ) “ভাদুড়ি-কুলের বংশাবলীর” নিম্নোক্ত বচনের বিরোধী—

“तत्रादिशूरः शूरवंशसिंहो विजित्य वौद्धं नृपपालवंशं।
शशास गौड़ं इत्यादि।

“গৌড়েব্রাহ্মণ”-ধৃত এই শেষোক্ত বচন আবার শ্রীযুত নগেন্দ্রনাথ বসু কর্ত্তৃক “বারেন্দ্র-কুলপঞ্জিকা”-ধৃত, “শাকে বেদকলম্বষট্‌ক-বিমিতে রাজাদিশূরঃ স চ” (“বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, প্রথম ভাগ, ৮৩ পৃঃ) এই বচনের, অর্থাৎ আদিশূর ৬৫৪ শকাব্দে বর্ত্তমান ছিলেন এই মতের, বিরোধী। যে যে কুলজ্ঞগণের সহিত আলাপ করিয়াছি, তাঁহারা এই সকল বচনের কোনটির বিষয়ই অবগত নহেন। সুতরাং এই সকল বচন প্রবল জনশ্রুতিমূলক বলিয়া স্বীকার করা যায় না। আদিশূর সম্বন্ধে যদি কোনও জনশ্রুতি নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হয়, তবে তাহা উপরে উদ্ধৃত আদিশূর ও বল্লালসেনের সম্বন্ধবিষয়ক জনশ্রুতি। “গৌড়ব্রাহ্মণ”-ধৃত “ভাদুড়ী-কুলের বংশাবলীর” বচন প্রকারান্তরে ইহারই পোষকতা করে; এবং “লঘুভারতকার”ও আদিশূর কর্ত্তৃক গৌড়ের পালবংশ উচ্ছেদের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন (“গৌড়েব্রাহ্মণ”, ৩২ পৃঃ ৪নং টীকা)।


Source : গৌড়রাজমালা by  রমাপ্রসাদ চন্দ [১৩১৯] CE 1912