Bengali Page

হিন্দু আইনের উৎপত্তি ও উপকরণ-Source and materials of Hindu Law

Bengali Text

হিন্দু আইনের উৎপত্তি ও উপকরণ

হিন্দু আইনের মূল ভিত্তি সম্বন্ধে যতই মতভেদ থাকুক না কেন, উহার উপকরণ সম্বন্ধে কোন মতভেদ নাই। নিম্নলিখিত বিষয়গুলি হইতে হিন্দু আইনের উপকরণ গৃহীত হইয়াছে – (১) শ্রুতি ; অর্থাৎ চারি বেদ, ছয় বেদাঙ্গ এবং অষ্টাদশ উপনিষদ। যদিও শ্রীতি হিন্দু আইনের একটা উপকরণ বলিয়া কথিত আছে, তথাপি আমরা আইন বলিতে যাহা বুঝি, তাহা শ্রীতিতে নাই বলিলেই হয়, এবং আইনঘটিত কোনও বিষয়ের মীমাংসায় কখনও বেদ-বেদাঙ্গ প্রভৃতির আলোচনা করিবার প্রয়োজন হইয়াছে বলিয়া বোধ হয় না । (২) স্মৃতি ; অর্থাৎ, মহ, যাজ্ঞবল্ক্য, নারদ, বৃহস্পতি, দেবল, কাত্যায়ণ, ব্যাস প্রভৃতি ঋষিগণ প্রণীত স্মৃতিশাস্ত্রসমুহ ; এবং গৌতম, বৌধায়ণ, বশিষ্ঠ, পরাশর প্রভৃতি ঋষি প্রণীত ধৰ্ম্মস্থত্রসমূহ। এইগুলি হিন্দু আইনের প্রধান উপকরণ বটে। স্মৃতি সম্বন্ধে জৈমিনী লিখিয়াছেন—যদি স্মৃতির কোন বিধানের সহিত শ্রুতির বিরোধ দৃষ্ট হয়, তবে সে স্থলে স্মৃতির বিধান অগ্রাহ্য হইবে। আরও, যদি এরূপ বুঝিতে পারা যায় ষে পুরোহিতগণ র্তাহাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোন বিধান প্রণয়ন করিয়া গিয়াছেন, তবে সে স্থলেও স্মৃতির সেই বিধান গ্রাহ করা হইবে না । ( পূৰ্ব্বমীমাংসা, ১৩৩৪) (৩) পুরাণ- এইগুলিতে দেবদেবীগণের উপাখ্যান, স্বষ্টিতত্ত্ব, দেবামুরের যুদ্ধ, দশাবতারের বিবরণ প্রভৃতি লিপিবদ্ধ হইয়াছে। আইনের উপকরণ হিসাবে পুরাণের মূল্য অতি সামান্ত ।

(৪) নিবন্ধ বা উপরোক্ত স্মৃতিশাস্ত্র ও, ধৰ্ম্মস্থত্র সমুহের টীকা । যদিও এইগুলি স্মৃতিশাস্ত্রসমূহের টীকা বা ব্যাখ্যারূপে লিখিত হইয়াছে।

স্মৃতিসমূহ যে সময়ে লিখিত হইয়াছিল, তাহার বহু শতাব্দী পরে নিবন্ধকারগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, এই সময়ের মধ্যে প্রাচীন রীতিনীতির অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছিল। বোধ হয়, সেই কারণে নিবন্ধকারগণ তাহাদের সমসাময়িক সামাজিক রীতিনীতির প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া উক্ত সমাজের মতানুযায়ী করিবার নিমিত্তই প্রাচীন শাস্ত্রসমূহের ঐরূপ পরিবর্তন এবং স্থানে স্থানে নূতন বিষয় সংযোজনা করিয়াছেন । এই নিবন্ধগুলিই হিন্দু আইনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপকরণ এবং আইন হিসাবে স্মৃতিসমূহ অপেক্ষাও ঐগুলি অধিক মূল্যবান। যদি কোনও বিষয়ে স্মৃতি এবং নিবন্ধের মধ্যে মতভেদ লক্ষিত হয়, তাহা হইলে নিবন্ধের মতই গৃহীত হইবে ।

নিবন্ধ বহুসংখ্যক আছে, তন্মধ্যে কতকগুলির নাম উল্লেখযোগ্য, যথা—জীমূতবাহন প্রণীত “দায়ভাগ” ; বিজ্ঞানেশ্বর প্রণীত “মিতাক্ষর”; রঘুনন্দন প্রণীত “দায়তত্ব” ; শ্ৰীকৃষ্ণ প্রণীত “দায়ক্রম-সংগ্রহ” ; বাচস্পতি মিশ্র প্রণীত “বিবাদ-চিন্তামণি” ; দেবানন্দ ভট্ট প্রণীত “স্মৃতি-চন্দ্রিকা” ; চণ্ডেশ্বর প্রণীত “বিবাদ-রত্নাকর” ; মিত্ৰমিশ্র প্রণীত “বীরমিত্রোদয়” প্রভৃতি। এই সমস্ত গ্রন্থগুলি সকল দেশ সমানভাবে প্রচলিত নহে ; কোনটী বঙ্গদেশে প্রচলিত, কোনটী বা মিথিলায় প্রচলিত, এইরূপ । বঙ্গদেশে দায়ভাগ, দায়তত্ত্ব, দায়ক্রমসংগ্রহ এবং বীরমিত্রোদয় এই চারিট গ্রন্থ প্রচলিত ; তন্মধ্যে দায়ভাগই সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ । যদি কোনও বিষয়ে এই চারিট গ্রন্থের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়, তাহা হইলে দায়ভাগের মতই গৃহীত হইবে। – একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমে, অর্থাৎ আট শত বৎসর পূৰ্ব্বে জীমূতবাহন কর্তৃক দায়ভাগ রচিত হইয়াছিল। ইহা প্রধানত: মনুসংহিতার টীকা ।

রঘুনন্দন তাহার “দায়তত্ব” গ্রন্থে স্থানে স্থানে দায়ভাগের ব্যাখ্যা এবং অনুসরণ করিয়াছেন । শ্ৰীকৃষ্ণ প্রণীত “দায়ক্রমসংগ্রহ” গ্রন্থখানি দায়ভাগেরই একটী ব্যাখ্য’ । মিতাক্ষর গ্রন্থ দায়ভাগের বহু পূৰ্ব্বে পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর  কর্তৃক রচিত হইয়াছিল। ইহা যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির টীকা বিশেষ। মিতাক্ষর গ্রন্থখানিতে হিন্দু আইনের সকল বিষয়গুলিই (উত্তরাধিকার, দত্তকগ্রহণ, বিবাহ, ভরণপোষণ ) লিপিবদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু দায়ভাগ গ্রন্থখানি বঙ্গদেশে উত্তরাধিকার সম্বন্ধে বিশেষ বিধি প্রচলিত করিবার জন্য রচিত হইয়াছে । সুতরাং বঙ্গদেশে উত্তরাধিকার ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে মিতাক্ষরার বিধি গ্রাহ হইবে । র্যাহারা দায়ভাগশাসিত, তাহাদের প্রতি উত্তরাধিকার সম্বন্ধে মিতাক্ষরা অপেক্ষা দায়ভাগই প্রবল হইবে । বঙ্গদেশের কোন কোন স্থানে অনেক বাঙ্গালী বাস করেন, তাহারা মিতাক্ষর কর্তৃক অনুশাসিত, তাহারা সম্পত্তি বিভাগ ও উত্তরাধিকার বিষয়ে দায়ভাগ অপেক্ষা মিতাক্ষরার বিধিই মানিয়া চলিবেন ।

(৫) রাজকীয় আইল সনমূহ। পূৰ্ব্বোক্ত স্মৃতি ও নিবন্ধগুলি হইতে আমরা যে আইনব্যবস্থা প্রাপ্ত হই, তাহা স্থানে স্থানে রাজকীয় আইনসমূহ কর্তৃক পরিবৰ্ত্তিত হইয়াছে। যথা, কোনও ব্যক্তি ধৰ্ম্মাস্তুর গ্রহণ করিলে সে তাহার পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হইতে পারিতনা ; ইহাই স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত প্রাচীন হিন্দু আইন ছিল ; কিন্তু ১৮৫০ সালের ২১ আইনের বিধানমতে এখন আর কেহ ধৰ্ম্মান্তর গ্রহণ করিলে উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত হয় না।

(৬) নজীর। নজীরগুলি দ্বারাও প্রাচীন হিন্দু আইনের অনেক অংশ পরিবর্তিত হইয়াছে। যথা, যে বালক তাহার পিতামাতার একমাত্র পুত্র, তাহাকে দত্তকরূপে গ্রহণ করা শাস্ত্রোক্ত হিন্দু আইনে নিষিদ্ধ ; .কিন্তু প্রিভিকেন্সিল কর্তৃক ঐরুপ দত্তকগ্রহণ সিদ্ধ বলিয়া প্রতিপন্ন হইল ( ২২ মাদ্রাজ ৩৯৮ ; ২১ এলাহাবাদ ৪৬০ ; ২৪ বোম্বাই ৩৬৭ ) ।

(৭) প্রথা। প্রাচীন হিন্দু আইনকর্তৃগণ হইতে আরম্ভ করিয়া বর্তমান কালে আদালতের বিচাবিপতিগণ পৰ্য্যস্ত সকলেই সামাজিক প্রথার খুব উচ্চ স্থান দিয়াছেন। প্রিভি কৌন্সিল একটি মোকদ্দমায় স্পষ্টই বলিয়াছেন যে যদি কোনও লিখিত আইন এবং সামাজিক প্রথা পরম্পরবিরোধী হয়, তাহা হইলে লিখিত আইন অপেক্ষা প্রথই বলবত্তর বলিয়া গণ্য হইবে ( মাদুরাব কালেক্টর ব: মুথু রামলিঙ্গ, ১২ মুরস্ ইণ্ডিয়ান আপীল ৩৯৭ সকলেই জানেন যে রাজ-এষ্টেটগুলি (যথা বৰ্দ্ধমান রাজ এষ্টেট, দ্বাণবঙ্গ রাজ এষ্টেট ) বিভাগ করা যায় না, এবং উহা কেবলমাত্র জ্যেষ্ঠ পুত্ৰই পাইয়া থাকেন ; ইহাই প্রথার একটা প্রক্লষ্ট উদাহরণ ; সাধারণ হিন্দু আইনের বিভাগ ও উত্তরাধিকার বিষয়ক কোনও বিধান এস্থলে প্রযোজ্য হইবে না, প্রথাই প্রবল থাকিবে । তবে সকল প্রথাই যে এইরূপ প্রবল বলিয়া গণ্য হইবে তাহা নহে । যে প্রথা বহুদিন ধরিয়া ( অন্ততঃ একশত বৎসর ধরিয়া ) চলিয়া আসিতেছে, যাহার কোনও পরিবর্তন হয় নাই এবং যাহা সামাজিক নীতিবিরুদ্ধ নহে, এইরূপ প্রথাই আদালত কর্তৃক গৃহীত হইবে ( রামলক্ষ্মী ব: শিবানন্দ, ১৪ মুরস ইণ্ডিয়ান আপীলস ৫৮৫ ) । যাহা অল্পদিন মাত্র হইয়াছে.(৩ মাদ্রাজ ল জাৰ্ণাল ১১ , ১৩ বেঙ্গল ল রিপোর্ট ১৬], যাহা পরিবর্তনশীল, এবং যাহা, ধৰ্ম্মনীতি-বিরুদ্ধ (২১ মাদ্রাজ ২২৯ ) এরূপ প্রথা কোনও মত্ত্বেই প্রবল বলিয়া বিবেচিত হইবে না। এই সাতুটা উপকরণের সংমিশ্রণে বৰ্ত্তমান হিন্দু আইন গঠিত হইয়াছে। ইহা হইতেই স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়, যে শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ ও নিবন্ধগুলি হইতে আমরা যে প্রাচীন বিশুদ্ধ হিন্দু আইন প্রাপ্ত হই, তাহা পরে রাজকীয় আইন ও নজীর দ্বারা বহু পরিবর্তিত হইয়া বর্তমান সময়ে এক মিশ্রিত আকার ধারণ করিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, হিন্দু আইনের কতকগুলি বিষয় ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট কর্তৃক একেবারেই পরিত্যক্ত হইয়াছে।

দণ্ডবিধি, চুক্তি, সম্পত্তি হস্তান্তর, আদালতের কার্য্যবিধি প্রভৃতি সম্বন্ধে প্রাচীন হিন্দু আইনে যে সমস্ত বিধান ছিল, তাহা ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট এদেশে হিন্দু আইন প্রচলিত করিবার সময়ে গ্রহণ করেন নাই । কেবলমাত্র বিবাহ, দত্তকগ্রহণ, উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ, এজমালী পরিবার, বিভাগ প্রভৃতি বিষয়ে হিন্দু আইনের বিধানগুলি গবৰ্ণমেণ্ট কর্তৃক এদেশের জন্য গৃহীত ও প্রচলিত হইয়াছে, এবং হিন্দু আইন বলিতে গেলে এখন আমরা ঐ বিষয়গুলিই বুঝিয়া থাকি। ঐ বিষয়গুলিই আমরা একে একে এই পুস্তকে লিপিবদ্ধ করিব। এইস্থলে আরও একটী কথা জানিয়া রাখা আবশ্বকে—কোন কোন ব্যক্তির প্রতি হিন্দু আইন প্রযোজ্য ? প্রথমতঃ, যাহারা হিন্দু ধৰ্ম্মাবলম্বী র্তাহাদের প্রতি ইহা প্রয়োজ্য ; যদিও তাহার। হিন্দু আচার ব্যবহার পরিত্যাগ করিয়া থাকেন, তাহা হইলেও র্তাহার। হিন্দু আইন কর্তৃক শাসিত হইবেন । যথা, যদি কেহ বিলাতে গিয়া সাহেবী আচার-ব্যবহার অবলম্বন করেন, তাহা হইলেও যতদিন তিনি হিন্দু ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ না করিবেন ততদিন তিনি হিন্দু আইনের অধীনে থাকিবেন। দ্বিতীয়তঃ, শিখ ও জৈনগণের প্রতি হিন্দু আইন প্রযোজ্য হইবে ; তবে হিন্দু আইনের যে যে বিধানের সহিত হিন্দু-ধর্মের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, সেই সেই বিধানগুলি শিশু ও জৈনগণের প্রতি প্রয়োজ্য হইবে না ; যথা, হিন্দু আইন অনুসারে পিতৃপুরুষের পিগুলোপ নিবারণ করিবার জন্য দত্তকগ্রহণের ব্যবস্থা আছে, অর্থাৎ দত্তকগ্রহণের সহিত হিন্দুধর্শ্বের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রহিয়াছে, স্বতরাং १ দত্তকগ্রহণ সম্বন্ধে হিন্দু আইনের বিধানগুলি শিখ ও জৈনগণের প্রতি প্রয়োজ্য হইবে না ! তৃতীয়তঃ, কতিপয় শ্রেণীর লোক হিন্দু না হইলে ৪ তাহদের প্রতি হিন্দু আইনের উত্তরাধিকারের নিয়মগুলি প্রয়োজ্য হয় ; যথা, বোম্বাই দেশের খোজা এবং মেমনগণ ; গুজরাটের মুন্নি বোরাগণ ; রাজপুতানার গিরাসিয়াগণ। উত্তরাধিকার ব্যতীত হিন্দু আইনের আর কোনও বিধান ইহাদের প্রতি প্রয়োজ্য হয় না। আসামের কোচগণের প্রতিও হিন্দু আইন প্রয়োজ্য হইবে ( দীননাথ ব; চণ্ড কোচ, ১৬ কলিকাত ল জার্ণাল, ১৪ ; আইতি কোচুনি বঃ আইদেও কোচনি, ২৪ কলিকাতা  ४१५ ) । চতুর্থত, কোন হিন্দু ব্যক্তি মুসলমান ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিবার পরেও যদি হিন্দু আচার ব্যবহার পরিত্যাগ না করেন, তাহা হইলে তিনি হিন্দু আইন কর্তৃক শাসিত হইতে থাকিবেন। পঞ্চমত:, কোন হিন্দু ব্যক্তি যদি খৃষ্টানধৰ্ম্ম গ্রহণ করেন, তাহ। হইলে যে যে বিষয়ের সহিত খৃষ্টান ধৰ্ম্মের কোনও সংশ্ৰব নাই,সেই সেক্ট বিষয়ে হিন্দু আইন তাহার প্রতি প্রয়োজ্য হইবে। ষষ্ঠভঃ, ব্রাহ্মগণ হিন্দু বলিয়া গণ্য এবং তঁহার। হিন্দু আইন দ্বার শাসিত হইবেন ।


Source: হিন্দু আইন -বিভূতিভূষণ মিত্র 1335 Bengali

Categories: Bengali Page

Tagged as: