KRISHNACIVIL

শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত-প্রথম প্রণাম-গৌরস্য গুরুতা-বিবর্ত্তবিলাসসেবা-জীব-গতি

৩। প্রথম প্রণাম

যাঁর অংশে সত্যভামা দ্বারকায় ধাম ।

সে রাধা-চরণে মোর অসংখ্য প্রণাম ॥১॥

শ্রীনন্দনন্দন এবে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ।
গদাধরে সঙ্গে আনি’ নদীয়া কৈল ধন্য ॥২॥

গদাধরে লঞা শ্রীপুরুষোত্তম আইল ।

গদাই-গৌরাঙ্গ-রূপে গূঢ়-লীলা কৈল ।

টোটা-গোপীনাথ-সেবা গদাধরে দিল ॥৩॥

মোরে দিল গিরিধারী-সেবা সিন্ধুতটে ।

গৌড়ীয়-ভকত সব আমার নিকটে ॥৪॥

দামোদর স্বরূপ আমার প্রাণের সমান ।

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য যার দেহ-মন-প্রাণ ॥৫॥

নমি প্রাণ-গৌর-পদে সাষ্টাঙ্গে পড়িয়া ।
এ ‘প্রেমবিবর্ত্ত’ লিখি ভক্ত-আজ্ঞা পায়া ॥৬॥

৪। গৌরস্য গুরুতা

গৌরের নৃত্য, নিত্য

ভাইরে ভজ মোর প্রাণের গৌরাঙ্গ ।

গৌর বিনা বৃথা সব জীবনের রঙ্গ ॥১॥

নবদ্বীপ-মায়াপুরে শচীর অঙ্গনে ।

গৌর নাচে নিত্য নিতাই-অদ্বৈতের সনে ॥২॥

শ্রীবাস-অঙ্গনে নাচে গায় রসভরে ।

যে দেখিল একবার আর না পাশরে ॥৩॥

আমার হৃদয়ে নাট অঙ্কিত হইয়া ।

নিরন্তর আছে মোর প্রাণ কাঁদাইয়া ॥৪॥

জগন্নাথ-মন্দিরেতে নৃত্য দেখি যবে ।

অনন্ত ভাবের ঢেউ মনে উঠে তবে ॥৫॥

আর কি দেখিব প্রভুর জাহ্নবীপুলিনে ।

সুনৃত্য-কীর্ত্তনলীলা এ ছার জীবনে ॥৬॥

সর্ব্বদেবদেবী শ্রীগৌরাঙ্গের দাস

নিষ্ঠা করি’ ভজ ভাই গৌরাঙ্গচরণ ।

অন্য দেব-দেবী কভু না কর ভজন ॥৭॥

গৌরাঙ্গের দাস বলি’ সর্ব্বদেবে জান ।

কৃষ্ণ হৈতে গৌরকে কভু না জানিবে আন ॥৮॥

নিজ গুরুদেবে জান গৌরকৃপাপাত্র ।

গৌরাঙ্গ-পার্ষদে জান গৌরদেহগাত্র ॥৯॥

গৌর-বৈরী রসপোষ্টা এই মাত্র জান ।

সকলে গৌরাঙ্গ-দাস এ কথাটী মান ॥১০॥

গৌরভজননিষ্ঠা

পরনিন্দা পরচর্চ্চা না কর কখন ।

দৃঢ়ভাবে একান্তে ভজ শ্রীগৌরচরণ ॥১১॥

গৌর যে শিখাল নাম সেই নাম গাও ।

অন্য সব নামমাহাত্ম্য সেই নামে পাও ॥১২॥

গৌর বিনা গুরু নাই এ ভব-সংসারে ।

সরল গৌরাঙ্গভক্তি শিখাও সবারে ॥১৩॥

কুটীনাটী ছাড়, মন করহ সরল ।

গৌর-ভজা লোকরক্ষা একত্রে নিষ্ফল ॥১৪॥

হয় গোরা ভজ, নয় লোক ভজ ভাই ।

একপাত্রে দুই কভু না রহে এক ঠাঞি ॥১৫॥

জগাই বলে, “যদি একনিষ্ঠ না হইবে ।
দুই নায়ে নদী-পারের দুর্দ্দশা লভিবে” ॥১৬॥

৫। বিবর্ত্তবিলাসসেবা

প্রেমের বৈচিত্ত্যগত প্রেমের বিবর্ত্ত যত

মোর মনে নাচে নিরন্তর ।

কলহ গৌরের সনে করি আমি দিনে দিনে

“কুন্দলে জগাই” নাম মোর ॥১॥

গেলাম ব্রজ দেখিবারে রহি সনাতনের ঘরে

কলহ করিনু তার সনে ।

রক্তবস্ত্র সন্ন্যাসীর শিরে বাঁধি’ আইলা ধীর

ভাতের হাঁড়ি মারিতে কৈনু মনে ॥২॥

সনাতনের বিনয় দেখে ছাড়ি’ তারে এক পাকে

লজ্জায় বসিনু এক ধারে ।

গৌর মোর যত জানে আমায় পাঠায় বৃন্দাবনে

মজা দেখে থাকি’ নিজে দূরে ॥৩॥

ভাল তার হউক সুখ মোর হউক চির দুঃখ

তার সুখে হবে মোর সুখ ।

আমি কাঁদি রাত্রদিনে গৌর বিচ্ছেদ ভাবি’ মনে

গৌর হাসে দেখি কাঁদা মুখ ॥৪॥

সেই ত’ কপটন্যাসী তার লীলা ভালবাসি

মধুমাখা কথাগুলি তার ।

যে ভাব ব্রজেতে ভেবে পুনঃ সেই ভাব এবে

বুঝেও না বুঝি আর বার ॥৫॥

চন্দনাদি তৈল আনি’ বাঁকা বাঁকা কথা শুনি’

তৈল-ভাণ্ড ভাঙ্গিলাম বলে ।

মান করি’ নিজাসনে শুঞা রৈনু অনশনে

সে মান ভাঙ্গিল নানা ছলে ॥৬॥

আমারে করায় পাক অন্নব্যঞ্জন আবোনা শাক

বলে, “ক্রোধের পাক বড় মিষ্ট” ।

বাড়ায় আমার রোষ তাতে তার সন্তোষ

তার প্রসন্নতা মোর ইষ্ট ॥৭॥

জিজ্ঞাসিল সনাতন যাইতে কৈনু বৃন্দাবন

তাতে মোরে রাখে বোকা করি’ ।

বাল্য বুদ্ধি দেখি’ তার চিত্তে হয় চমৎকার

আমি তার পাদপদ্ম ধরি’ ॥৮॥

বৃন্দাবন যাইতে চাই তাতে আজ্ঞা নাহি পাই

নানা ছল করে মোর সনে ।

যখন কোন্দল হয় নবদ্বীপে যেতে কয়

সেই তার কৃপা জানি মনে ॥৯॥

মাতৃ-আজ্ঞা ছল করি’ আছেন বৈকুণ্ঠপুরী

নিজ ধাম ছাড়িয়া এখন ।

তাতে পাঠায় নিজপুরে যাহাকে সে কৃপা করে

যেন গোপের গোলোক-দর্শন ॥১০॥

এই ভাবে গৌর-সেবা করি আমি রাত্রদিবা
গৌরগণের এই ত’ স্বভাব ।
গৌর-গদাধর-পদ আমার ত’ সম্পদ
দামোদর জানে এই ভাব ॥১১॥

৬। জীব-গতি

জীব ও কৃষ্ণ

চিৎকণ জীব, কৃষ্ণ চিন্ময় ভাস্কর ।

নিত্যকৃষ্ণ দেখি’ কৃষ্ণে করেন আদর ॥১॥

মায়াগ্রস্ত জীব

কৃষ্ণ-বহির্ম্মুখ হঞা ভোগ বাঞ্ছা করে ।

নিকটস্থ মায়া তারে জাপটিয়া ধরে ॥২॥

পিশাচী পাইলে যেন মতিচ্ছন্ন হয় ।

মায়াগ্রস্ত জীবের হয় সে ভাব উদয় ॥৩॥

“আমি সিদ্ধ কৃষ্ণদাস” এই কথা ভুলে ।
মায়ার নফর হঞা চিরদিন বুলে ॥৪॥

কভু রাজা কভু প্রজা কভু বিপ্র শূদ্র ।

কভু দুঃখী কভু সুখী কভু কীট ক্ষুদ্র ॥৫॥

কভু স্বর্গে, কভু মর্ত্ত্যে, নরকে বা কভু ।

কভু দেব, কভু দৈত্য, কভু দাস প্রভু ॥৬॥

সাধুসঙ্গে নিস্তার

এইরূপে সংসার ভ্রমিতে কোন জন ।

সাধুসঙ্গে নিজতত্ত্ব অবগত হন ॥৭॥

নিজতত্ত্ব জানি’ আর সংসার না চায় ।

“কেন বা ভজিনু মায়া” করে হায় হায় ॥৮॥

কেঁদে বলে, “ওহে কৃষ্ণ আমি তব দাস ।

তোমার চরণ ছাড়ি’ হৈল সর্ব্ব নাশ” ॥৯॥

কৃপা করি’ কৃষ্ণ তারে ছাড়ান সংসার ।

কাকুতি করিয়া কৃষ্ণে যদি ডাকে একবার ॥১০॥

মায়াকে পিছনে রাখি’ কৃষ্ণপানে চায় ।

ভজিতে ভজিতে কৃষ্ণপাদপদ্ম পায় ॥১১॥

কৃষ্ণ তারে দেন নিজ চিচ্ছক্তির বল ।

মায়া আকর্ষণ ছাড়ে হইয়া দুর্ব্বল ॥১২॥

সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম—এই মাত্র চাই ।

সংসার জিনিতে আর কোন বস্তু নাই ॥১৩॥

সকল ভরসা ছাড়ি’ গোরাপদে আশ ।
করিয়া বসিয়া আছে জগাই গোরার দাস ॥১৪॥


Categories: CIVIL