KRISHNACIVIL

প্রেমবিবর্ত্ত-নবদ্বীপ দীপক-বৈষ্ণব মহিমা-গৌরদর্শনের ব্যাকুলতা-বিপরীত বিবর্ত্ত

শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত Prema Vivarta of Jagadananda Pandit (INDEX PAGE)

১১। নবদ্বীপ-দীপক

শ্রীনবদ্বীপ বৃন্দাবন অভিন্ন

ব্রহ্মাণ্ডে ধরণী ধন্য, ধরায় গৌড়-ক্ষৌণী ধন্য ।
গৌড়ে নবদ্বীপ ধন্য দ্ব্যষ্টক্রোশ জগৎ মান্য ॥১॥

মধ্যে স্রোতস্বতী ধন্য ভাগীরথী বেগবতী ।
তাহাতে মিলেছে আসি’ শ্রীযমুনা সরস্বতী ॥২॥

তার পূর্ব্বতীরে সাক্ষাৎ গোলোক মায়াপুর ।
তথায় শ্রীশচীগৃহে শোভে গৌরাঙ্গঠাকুর ॥৩॥

যে ঠাকুর দ্বাপরের শেষ বৃন্দাবনে বনে ।

মহারাসক্রীড়া কৈল রাধিকাদি গোপী সনে ॥৪॥

পরকীয় মহারাস গোলোকের নিত্যধন ।

আনিল ব্রজের সহ নন্দযশোদানন্দন ॥৫॥

সেই ঠাকুর আবার নিজের যোগ-মায়াপুর ।
প্রপঞ্চে আনিল গৌড়ে রসাস্বাদ সুচতুর ॥৬॥

গৌরাবতারের হেতু

শ্রীকৃষ্ণলীলায় বাঞ্ছাত্রয় না হৈল পূরণ ।

শ্রীগৌরলীলায় পূর্ণ কৈল সে সুখ সাধন ॥৭॥

“মোরে প্রণয় করি’ রাধা পায় কিবা সুখ ।

মোর মাধুর্য-আস্বাদনে রাধার কত যে কৌতুক ॥৮॥

আমার অনুভবে রাধায় সৌখ্য কি প্রকার ।

নায়ক হঞা নাহি বুঝি এ সুখের সার ॥৯॥

অতএব রাধার ভাবকান্তি লঞা গৌর হব ।
কৃষ্ণমাধুর্যাদি ভক্তভাবে আস্বাদ পাইব” ॥১০॥

এত ভাবি’ কৃষ্ণ নিজধাম লঞা গৌড়-দেশে ।

নবদ্বীপে প্রকটিল স্বয়ং আনন্দ-আবেশে ॥১১॥

গৌরের ভজন-প্রণালীতে কৃষ্ণভজন

ওরে ভাই সব ছাড়ি’ বৈস নবদ্বীপপুরে ।

গৌরাঙ্গের অষ্টকাল ভজ, দুঃখ যাবে দূরে ॥১২॥

অষ্টকালে অষ্টপরকার কৃষ্ণলীলা-সার ।

গৌরোদিত ভাবে ভজ, পাবে প্রেম চমৎকার ॥১৩॥

কৃষ্ণ ভজিবারে যার একান্ত আছে মন ।

গৌড়ের অষ্টকালে ভজ কৃষ্ণরসধন ॥১৪॥

গৌরভাব নাহি জানে যে কৃষ্ণ ভজিতে চায় ।

অপ্রাকৃত কৃষ্ণতত্ত্ব তার কভু নাহি ভায় ॥১৫॥

আচার্য বর্ণাশ্রমে আবদ্ধ নহেন

কিবা বর্ণী, কিবাশ্রমী, কিবা বর্ণাশ্রমহীন ।

কৃষ্ণতত্ত্ব-বেত্তা যেই, সেই আচার্য প্রবীণ ॥১৬॥

অসদ্গুরুগ্রহণে সর্ব্বনাশ

আসল কথা ছেড়ে ভাই বর্ণে যে করে আদর ।
অসদ্​গুরু করি’ তার বিনষ্ট পূর্ব্বাপর ॥১৭॥

১২। বৈষ্ণব-মহিমা

কৃষ্ণভক্তি ও তীর্থ

জলময় তীর্থ মৃৎশিলাময় মূর্ত্তি ।

বহুকালে দেয় জীবহৃদে ধর্ম্মস্ফূর্ত্তির্ ॥১॥

কৃষ্ণভক্ত দেখি’ দূরে যায় সর্ব্বানর্থ ।

কৃষ্ণভক্তি সমুদিত হয় পরমার্থ ॥২॥

সাধুসঙ্গের ফল

সংসার ভ্রমিতে ভব ক্ষয়োন্মুখ যবে ।

সাধুসঙ্গ-সংঘটন ভাগ্যক্রমে হবে ॥৩॥

সাধুসঙ্গফলে কৃষ্ণে সর্ব্বেশ্বরেশ্বরে ।

ভাবোদয় হয় ভাই জীবের অন্তরে ॥৪॥

প্রাকৃত বা কনিষ্ঠ ভক্ত

সেই ত’ প্রাকৃত ভক্ত দীক্ষিত হইয়া ।

কৃষ্ণার্চ্চন করে বিধিমার্গেতে বসিয়া ॥৫॥

উত্তম মধ্যম ভক্ত না করে বিচার ।

শুদ্ধভক্তে সমাদর না হয় তাহার ॥৬॥

মধ্যম ভক্ত

কৃষ্ণে প্রেম, ভক্তে মৈত্রী, মূঢ়ে কৃপা আর ।

শুদ্ধভক্তদ্বেষী জনে উপেক্ষা যাঁহার ॥৭॥


তিহোঁ ত’ প্রকৃত ভক্তিসাধক মধ্যম ।

অতি শীঘ্র কৃষ্ণ-বলে হইবে উত্তম ॥৮॥

উত্তম ভক্ত

সর্ব্বভূতে শ্রীকৃষ্ণের ভাব সন্দর্শন ।

ভগবানে সর্ব্বভূতে করেন দর্শন ॥৯॥


শত্রু-মিত্র-বিষয়েতে নাহি রাগদ্বেষ ।

তিহোঁ ভাগবতোত্তম এই গৌর-উপদেশ ॥১০॥

উত্তম ভক্তের বিষয়-স্বীকার

বিষয় ইন্দ্রিয়দ্বারে করিয়া স্বীকার ।

রাগদ্বেষহীন ভক্তি জীবনে যাঁহার ॥১১॥


সমস্ত জগৎ দেখি’ বিষ্ণুমায়াময় ।

ভাগবতগণোত্তম সেই মহাশয় ॥১২॥

তাঁহার ইন্দ্রিয় বৃত্তি পরিচালন

দেহেন্দ্রিয়-প্রাণ-মন-বুদ্ধি-যুক্ত-সবে ।

জন্ম নাশ ক্ষুধা তৃষ্ণা ভয় উপদ্রবে ॥১৩॥


অনিত্য সংসার-ধর্ম্মে হঞা মোহহীন ।

কৃষ্ণ স্মরি’ কাল কাটে ভক্ত সমীচীন ॥১৪॥

তাঁহার কর্ম্ম দেহযাত্রার্থে মাত্র—কামের জন্য নহে

যাঁর চিত্তে নিরন্তর যশোদানন্দন ।

দেহযাত্রামাত্র কামকর্ম্মের গ্রহণ ॥১৫॥

কামকর্ম্মবীজরূপ বাসনা তাঁহার ।

চিত্তে নাহি জন্মে এই ভক্তিতত্ত্বসার ॥১৬॥

হরিজন দেহাত্মবুদ্ধিহীন

জ্ঞান-কর্ম্ম-বর্ণাশ্রম দেহের স্বভাব ।

তাহে সঙ্গদ্বারা হয় ‘অহং-মম’-ভাব ॥১৭॥

দেহসত্ত্বে ‘অহং-মম’-ভাব নাহি যাঁর ।

হরিপ্রিয়জন তিহোঁ, করহ বিচার ॥১৮॥

সর্ব্বভূতে সমবুদ্ধিসম্পন্ন

বিত্তসত্ত্বে তাহে ছাড়ি’ স্ব-পরভাবনা ।

‘তুমি’ ‘আমি’-সত্ত্বভেদে মিত্রারি-কল্পনা ॥১৯॥

সর্ব্বভূতে সমবুদ্ধি শান্ত যেই জন ।

ভাগবতোত্তম বলি’ তাঁহার গণন ॥২০॥

কৃষ্ণপাদপদ্মে সেই সুরমৃগ্য ধন ।
ভুবনবৈভব লাগি’ না ছাড়ে যে জন ॥২১॥

কৃষ্ণপদস্মৃতি নিমেষার্দ্ধ নাহি ত্যজে ।

বৈষ্ণব-অগ্রণী তিহোঁ পরানন্দে মজে ॥২২॥

ভক্ত ত্রিতাপমুক্ত

কৃষ্ণপদশাখানখমণিচন্দ্রিকায় ।

নিরস্ত সকল তাপ যাঁহার হিয়ায় ॥২৩॥

সে কেন বিষয়সূর্য্যতাপ অন্বেষিবে ।

হৃদয় শীতল তার সর্ব্বদা রহিবে ॥২৪॥

উত্তম ভক্তের অন্যান্য লক্ষণ

যে বেঁধেছে প্রেমছাঁদে কৃষ্ণাঙ্ঘ্রিকমল ।

নাহি ছাড়ে হরি তার হৃদয় সরল ॥২৫॥

অবশেও যদি মুখে স্ফুরে কৃষ্ণনাম ।

ভাগবতোত্তম সেই, পূর্ণ সর্ব্ব কাম ॥২৬॥

স্বধর্ম্মের গুণদোষ বুঝিয়া যে জন ।
সর্ব্ব ধর্ম্ম ছাড়ি’ ভজে কৃষ্ণের চরণ ॥২৭॥


সেই ত’ উত্তম ভক্ত কেহ তার সম ।

না আছে জগতে আর ভাগবতোত্তম ॥২৮॥

কৃষ্ণের স্বরূপ আর নামের স্বরূপ ।
ভক্তের স্বরূপ আর ভক্তির স্বরূপ ॥২৯॥


জানিয়া ভজন করে যেই মহাজন ।

তার তুল্য নাহি কেহ বৈষ্ণব সুজন ॥৩০॥

স্বরূপ না জানে তবু অনন্যভাবেতে ।
শ্রীকৃষ্ণে সাক্ষাৎ ভজে নামস্বরূপেতে ॥৩১॥

তিহোঁ ভক্তোত্তম বলি’ জানিবেরে ভাই ।
এই আজ্ঞা দিয়াছেন চৈতন্য গোসাঞি ॥৩২॥

১৩। শ্রীগৌরদর্শনের ব্যাকুলতা

গৌরাঙ্গ তোমার চরণ ছাড়িয়া

চলিনু শ্রীবৃন্দাবনে ।

পূর্ব্ব-লীলা তব দেখিব বলিয়া

হইল আমার মনে ॥১॥

কেন সেই ভাব হইল আমার

এখন কাঁদিয়া মরি ।

তোমারে না দেখি’ প্রাণ ছাড়ি’ যায় 

না জানি এবে কি করি ॥২॥

ও রাঙ্গা চরণ মম প্রাণ ধন

সমুদ্রবালিতে রাখি’ ।

কি দেখিতে আইনু নিজ মাথা খাইনু 

উড়ু উড়ু প্রাণপাখী ॥৩॥

যত চলি’ যাই মন নাহি চলে

তবু যাই জেদ করি’ ।

প্রেমের বিবর্ত্ত আমারে নাচায়

না বুঝিয়া আমি মরি ॥৪॥

গৌরাঙ্গের রঙ্গ বুঝিতে নারিনু

পড়িনু দুঃখ-সাগরে ।

আমি চাই যাহা নাহি পাই তাহা

মন যে কেমন করে ॥৫॥

গৌরাঙ্গের তরে প্রাণ দিতে যাই

না হয় মরণ তবু ।

মরিব বলিয়া পড়িয়া সমুদ্রে

খাই মাত্র হাবুডুবু ॥৬॥

সে চন্দ্রবদন দেখিবার লোভে

শীঘ্র উঠি সিন্ধুতটে ।

পুনঃ নাহি দেখি’ প্রাণ উড়ি’ যায়

চলি পুনঃ টোটাবাটে ॥৭॥

গোপীনাথাঙ্গনে দেখি’ গোরামুখ

পড়ি অচেতন হঞা ।

পণ্ডিত গোঁসাঞি মোরে লঞা রাখে

দেখি পুনঃ সংজ্ঞা পাঞা ॥৮॥

গৌর গদাধর বসিয়া দুজনে

বলেন আমার কথা ।

অমনি কাঁদিয়া যাই গড়াগড়ি

না বিচারি যথা তথা ॥৯॥

ক্ষণেক বিরহ সহিতে না পারি

গৌর মোর হৃদে নাচে ।

মরিতে না দেয় বাঁচিলে কোন্দল

কিসে মোর প্রাণ বাঁচে ॥১০॥

হেন অবস্থায় গৌরপদ ছাড়ি’

মোর বৃন্দাবনে আসা ।

এ বুদ্ধি হইল কেন নাহি জানি

ইহ-পরলোক-নাশা ॥১১॥

আজ্ঞা লইনু যাইতে আজ্ঞা না পালিলে

তাতে হয় অপরাধ ।

গোরাচাঁদমুখ না দেখিয়া মরি 

সব দিকে মোর বাধ ॥১২॥

গোরাপ্রেম যার সঙ্কট তাহার
প্রাণ লঞা টানাটানি ।
গদাধরগণে এই ত’ দুর্দ্দশা
সবে করে কাণাকাণি ॥১৩॥

১৪। বিপরীত বিবর্ত্ত

নবদ্বীপ-দর্শনে বৃন্দাবন-দর্শন

ভাইরে বৃন্দাবনে যাওয়া আর হলো না ! ।
গোরামুখ না দেখিয়া গোরারূপ ধেয়াইয়া

পথ ভুলি’ যাই অন্য দেশ ॥১॥

সেখান হইতে ফিরি’ পুনঃ যাই ধীরি ধীরি

পুনঃ আসি’ দেখি সে প্রদেশ ॥২॥

এইরূপে কত দিনে যাব আমি বৃন্দাবনে

না জানি কি হবে দশা মোর ।

বৃক্ষতলে বসি’ বসি’ কাটি আমি অহর্নিশি

কভু মোর নিদ্রা আসে ঘোর ॥৩॥

স্বপ্নে বহু দূর গিয়া সিন্ধুতটে প্রবেশিয়া

দেখি গোরার অপূর্ব্ব নর্ত্তন ।

গদাধর নাচে সঙ্গে ভক্তবৃন্দ নাচে রঙ্গে

গায় গীত অমৃত-বর্ষণ ॥৪॥

নৃত্যগীত-অবসানে গোরা মোর হাত টানে

বলে, “তুমি ক্রোধে ছাড়ি’ গেলে ।

আমার কি দোষ বল তব চিত্ত সুচঞ্চল

ব্রজে গেলে আমা হেথা ফেলে ॥৫॥

আইস আলিঙ্গন করি তব বক্ষে বক্ষ ধরি’

ছাঁড়ো মুঞি চিত্তের বিকার ।

মধ্যাহ্নে করিয়া পাক দেহ মোরে অন্ন শাক

ক্ষুন্নিবৃত্তি হউক্ আমার ॥৬॥

ছাড়িয়া জগদানন্দে মোর মন নিরানন্দে

ভোজনাদি লইল কত দিন ।

কি বুঝিয়া গেলে তুমি দুঃখেতে পড়িনু আমি

জগা মোরে সদা দয়াহীন ॥৭॥

শীঘ্র ব্রজ নিরখিয়া আইস তুমি সুখী হঞা

মোরে দেহ শাকান্ন ব্যঞ্জন ।

তবে ত’ বাঁচিব আমি তাতে সুখী হবে তুমি

ক্রোধে মোরে না ছাড় কখন” ॥৮॥

নিদ্রা ভাঙ্গি’ দেখি আমি বহুদূর ব্রজভূমি

নিকটেতে জাহ্নবীপুলিন ।

আহা ! নবদ্বীপধাম নিত্যগৌরলীলাগ্রাম

ব্রজসার অতি সমীচীন ॥৯॥

আনন্দেতে মায়াপুরে প্রবেশিনু অন্তঃপুরে

নমি আমি আইমাতা-পদ ।

গৌরাঙ্গের কথা বলি’ শীঘ্র আইলাম চলি’

দেখি নবদ্বীপ-সুসম্পদ ॥১০॥

ভাবিলাম বৃন্দাবন করিলাম দরশন
আর কেন যাব দূর দেশ ।
গৌর দরশন করি’ সব দুঃখ পরিহরি’
ছাড়ি’ দিব বিরহজ-ক্লেশ ॥১১॥


শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত Prema Vivarta of Jagadananda Pandit (INDEX PAGE)

Categories: CIVIL