KRISHNACIVIL

প্রেমবিবর্ত্ত-নামরহস্যপটল-নামরহস্যপটল

শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত Prema Vivarta of Jagadananda Pandit (INDEX PAGE)

১৯। নামরহস্যপটল

একদা গৌরাঙ্গচাঁদ চন্দ্রালোক পাঞা ।

সমুদ্রের তীরে আইল ভক্তবৃন্দ লঞা ॥১॥

হরিদাস-সমাজের উপকণ্ঠে বসি’ ।

সর্ব্ব বৈষ্ণবের প্রতি বলে গৌরশশী ॥২॥

শ্রীনামই একমাত্র ও শ্রেষ্ঠ সাধন

“শুন হে ভকতবৃন্দ, কলিকালের ধর্ম্ম ।

শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন বিনা আর নাহি কর্ম্ম ॥৩॥

কর্ম্ম-জ্ঞান-যোগ-ধ্যান দুর্ব্বল সাধন ।
অপ্রাকৃত সম্পত্তি লাভের নহে ক্রম ॥৪॥

ধর্ম্ম, ব্রত, ত্যাগ, হোম, সকলই প্রাকৃত ।

অপ্রাকৃত তত্ত্ব লাভে নাহি করে হিত ॥৫॥

কৃষ্ণনাম উচ্চারণে, স্মরণে, শ্রবণে ।

অপ্রাকৃতসিদ্ধি হয়, বলে শ্রুতিগণে ॥৬॥

শ্রীনামরহস্য সর্ব্বশাস্ত্রেতে দেখিবা ।

নাম-উচ্চারণমাত্র চিৎসুখ লভিবা ॥৭॥

পদ্মপুরাণ স্বর্গখণ্ড ৪৮ অধ্যায়, নামরহস্যপটলং, যথা—

‘শ্রীশৌনক উবাচ—


নামোচ্চারণমাহাত্ম্যং শ্রূয়তে মহদদ্ভুতম্ ।

যদুচ্চারণমাত্রেণ নরো যায়াৎ পরং পদম্ ।

তদ্বদস্বাধুনা সূত বিধানং নামকীর্ত্তনে ॥৮॥

শ্রীসূত উবাচ—


শৃণু শৌনক বক্ষ্যামি সংবাদং মোক্ষসাধনম্ ।

নারদঃ পৃষ্টবান্ পূর্ব্বং কুমারঃ তদ্বদামি তে ॥৯॥

একদা যমুনাতীরে নিবিষ্টং শান্তমানসম্ ।

সনৎকুমারং পপ্রচ্ছ নারদো রচিতাঞ্জলিঃ ।

শ্রুত্বা নানাবিধান্ ধর্ম্মান্ ধর্ম্মব্যতিকরাংস্তথা ॥১০॥

শ্রীনারদ উবাচ—


যোঽসৌ ভগবতা প্রোক্তা ধর্ম্মব্যতিকরো নৃণাম্ ।

কথং তস্য বিনাশঃ স্যাদুচ্যতাং ভগবৎপ্রিয়’ ॥১১॥

এই পটলের অর্থ কিছু বিশেষ করিয়া ।

বলি স্বরূপ রামানন্দ শুন মন দিয়া ॥১২॥

শ্রীনামকীর্ত্তন কি ? ‘উচ্চারণ’

‘উচ্চারণ’ শব্দে বুঝ শ্রীনামকীর্ত্তন ।
‘করে’ বা ‘মালায়’ সঙ্খ্যা করে ভক্তগণ ॥১৩॥

সঙ্খ্যা ছাড়ি’ অসঙ্খ্য নাম কভু কভু হয় ।

‘উচ্চারণ’ শব্দে এসব জানহ নিশ্চয় ॥১৪॥

জপ ও কীর্ত্তন

লঘূচ্চারে ‘জপ’ হয়, উচ্চারে ‘কীর্ত্তন’ ।

স্মরণ-কীর্ত্তনে সব হয় ত’ গণন ॥১৫॥


কি প্রকারে নাম কৈলে সুকীর্ত্তন হয় ।

শ্রীনামকীর্ত্তনে তাহা বিধান নিশ্চয় ॥১৬॥

কীর্ত্তন সর্ব্বথা ও সর্ব্বদা কর্ত্তব্য

শ্রীনামকীর্ত্তন হয় জীবের নিত্যধর্ম্ম ।

জগতে বৈকুণ্ঠে জীবের এই মুখ্য কর্ম্ম ॥১৭॥

মায়াবদ্ধ জীবের এই মোক্ষ সাধন হয় ।

মুক্তজীবের পক্ষে তাহা সাধ্যাবধি রয় ॥১৮॥

ভক্তিহীন শুভকার্য ত্যাজ্য

ধর্ম্মশাস্ত্র-উক্ত ভক্তিহীন ধর্ম্ম যত ।

ভক্ত্যুদ্দেশ বিনা আর যত প্রকার ব্রত ॥১৯॥


ভক্ত্যুত্থিত বিরাগ ব্যতীত যত ত্যাগ ।

ভক্তি-প্রতিকূল যজ্ঞ প্রাকৃত বিভাগ ॥২০॥


এই সব শুভকর্ম্ম সম্বন্ধ বিচারে ।

ভক্তি-অনুকূল বলি’ শাস্ত্রেতে প্রচারে ॥২১॥


কলিকালে সেই সব জড়ধর্ম্ম হইল ।

ভক্তি-আনুকূল্য ত্যজি’ ধর্ম্ম নষ্ট ভেল ॥২২॥

অতএব কলিকালে নামসঙ্কীর্ত্তন ।

বিনা আর ধর্ম্ম নাই শুন ভক্তগণ ॥২৩॥

সে ধর্ম্মের ব্যতিকর যাহাই দেখিবে ।

তাহাই বর্জ্জিবে যত্নে ভক্তির প্রভাবে ॥২৪॥

‘শ্রীসনৎকুমার উবাচ—


শৃণু নারদ গোবিন্দপ্রিয় গোবিন্দধর্ম্মবিৎ ।

যৎ পৃষ্টং লোকনির্ম্মুক্তিকারণং তমসঃ পরম্’ ॥২৫॥

তুমি ত’ নারদ শ্রীগোবিন্দধর্ম্মবেত্তা ।

গোবিন্দের প্রিয়, মায়াবন্ধনের ছেত্তা ॥২৬॥

লোকনির্ম্মুক্তির হেতু জিজ্ঞাসা তোমার ।

তব প্রশ্নোত্তরে জীব হবে তমঃ পার ॥২৭॥

কলিতে সকল ধর্ম্মাধর্ম্ম তমোময় ।

নামধর্ম্ম বিনা জীবের সংসার নহে ক্ষয় ॥২৮॥

অতএব

‘সর্ব্বাচারবিবর্জ্জিতাঃ শঠধিয়ো ব্রাত্যা জগদ্বঞ্চকাঃ
দম্ভাহঙ্কৃতিপানপৈশুন্যপরাঃ পাপাশ্চ যে নিষ্ঠুরাঃ ।

যে চান্যে ধনদারপুত্রনিরতাঃ সর্ব্বেঽধমাস্তেঽপি হি
শ্রীগোবিন্দপদারবিন্দশরণাঃ শুদ্ধা ভবন্তি দ্বিজ’ ॥২৯॥

নামে সর্ব্বপাপক্ষয়

শ্রীগোবিন্দপদারবিন্দে শরণ যে লয় ।

তার সর্ব্বপাপ নামে নিশ্চয় হয় ক্ষয় ॥৩০॥

কৃষ্ণনাম লয়ে কাঁদে, নিজ দোষ বলে ।

অতি শীঘ্র তার পাপ যায় ভক্তিবলে ॥৩১॥

কর্ম্ম প্রায়শ্চিত্তে বাসনা নষ্ট হয় না

কর্ম্মজ্ঞান-প্রায়শ্চিত্তে তার কিবা ফল ।

সে ফল দুর্ব্বল অতি, তার নাহি বল ॥৩২॥

এক কৃষ্ণনামে পাপীর যত পাপক্ষয় ।

বহু জন্মে সেই পাপী করিতে নারয় ॥৩৩॥

হেন পাপ স্মার্ত্তশাস্ত্রে না আছে বর্ণন ।

এক কৃষ্ণনামে যাহা না হয় খণ্ডন ॥৩৪॥

তবে কেন স্মার্ত্তলোক প্রায়শ্চিত্ত করে ? ।

সুকৃতি-অভাবে তার কর্ম্মে মতি হরে ॥৩৫॥

কর্ম্ম-প্রায়শ্চিত্তে কভু বাসনা না যায় ।

জ্ঞান-প্রায়শ্চিত্তে শোধে বাসনা হিয়ায় ॥৩৬॥

বাসনার মূল অবিদ্যা ভক্তিতে বিনষ্ট হয়

পুনঃ কিছুদিনে সে বাসনা হয় স্থূল ।

ভক্তিতে অবিদ্যা যায় বাসনার মূল ॥৩৭॥

যে জন গোবিন্দপদে লইয়া শরণ ।

নাম লয় কাকুভরে করয় রোদন ॥৩৮॥


তার পক্ষে শ্রীমুখের বাক্য সুমধুর ।

জীবের মঙ্গল, গীতায় দেখহ প্রচুর ॥৩৯॥

শ্রীগীতা—

‘সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।

অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥৪০॥

অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্ ।

সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ ॥৪১॥

ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্ম্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি ।

কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি’ ॥৪২॥

অতএব কর্ম্মাঙ্গ প্রায়শ্চিত্তাদি পরিহরি’ ।

বুদ্ধিমান্ জন ভজে প্রাণেশ্বর হরি ॥৪৩॥

অতএব

নামের ফল

‘তমপি দেবকরং করুণাকরং
স্থাবর-জঙ্গম-মুক্তিকরং পরম্ ।

অতিচরন্ত্যপরাধপরা জনা 
য ইহ তান্বপতি ধ্রুবনাম হি’ ॥৪৪॥

কৃষ্ণনাম দয়াময় কৃষ্ণতেজোময় ।

স্থাবর-জঙ্গম-মুক্তিদাতা সুনিশ্চয় ॥৪৫॥

নাম-অপরাধী তাহে করে অপরাধ ।

অতিচার আসি’ নাম-ধর্ম্মে করে বাধ ॥৪৬॥

সেই মহা-অপরাধীর দোষ, নামে হয় ক্ষয় ।

নাম বিনা জীববন্ধু জগতে না হয় ॥৪৭॥

‘শ্রীনারদ উবাচ—


কে তেঽপরাধা বিপ্রেন্দ্র নাম্নো ভগবতঃ কৃতা ।

বিনিঘ্নন্তি নৃণাং কৃত্যং প্রাকৃতং হ্যানয়ন্তি চ’ ॥৪৮॥

নামাপরাধ

ওহে গুরু সনৎকুমার কৃপা করি বল ।

নামে অপরাধ যত প্রকার সকল ॥৪৯॥


নামরূপ মহাকৃত্য জীবের নিশ্চয় ।

সেই কৃত্য যাহে সাধকের নষ্ট হয় ॥৫০॥

নামকে প্রাকৃত করি’ সাধন করাঞা ।

সামান্য প্রাকৃত ফলে দেয় ফেলাইয়া ॥৫১॥

‘শ্রীসনৎকুমার উবাচ—


সতাং নিন্দা নাম্নঃ পরমপরাধং বিতনুতে
যতঃ খ্যাতিং যাতং কথমুসহতে তদ্বিগর্হাম্ ।

শিবস্য শ্রীবিষ্ণোর্য ইহ গুণনামাদিসকলং
ধিয়াভিন্নং পশ্যেৎ স খলু হরিনামাহিতকরঃ’ ॥৫২॥

নামাপরাধ হইতে মুক্তি

দশটী নামাপরাধ ভিন্ন ভিন্ন করি’ ।

বুঝিয়া লইলে নাম-অপরাধে তরি ॥৫৩॥

এই শ্লোকে দুই অপরাধের বিচার ।

করিয়া করহ শুদ্ধ নামের আচার ॥৫৪॥

একান্ত নামেতে আশ্রয় আছে যাঁর ।

সাধুপদবাচ্য তেঁহ তারেন সংসার ॥৫৫॥

জড়কর্ম্মজ্ঞানচেষ্টা ছাড়ি’ সেই জন ।

শুদ্ধভক্তিভাবে নাম করেন উচ্চারণ ॥৫৬॥

নামের প্রচার একা তাঁহা হৈতে হয় ।

তাঁর নিন্দা কৃষ্ণনাম কভু না সহয় ॥৫৭॥

সাধুনিন্দা

সে সাধুর নিন্দা, তাঁতে লঘু-বুদ্ধি যার ।

বড় অপরাধ নামে নিশ্চয় তাহার ॥৫৮॥

যত্নে এই অপরাধ করিয়া বর্জ্জন ।

সেই সাধু-সঙ্গ-বলে করহ ভজন ॥৫৯॥

শ্রীনাম-নামী একতত্ত্ব

মঙ্গলস্বরূপ বিষ্ণু পরতত্ত্ব হরি ।

অপ্রাকৃত স্বরূপেতে শ্রীব্রজবিহারী ॥৬০॥

তাঁর নাম-রূপ-গুণ-লীলা অপ্রাকৃত ।

তাঁহার স্বরূপ হৈতে ভিন্ন নহে তত্ত্ব ॥৬১॥

নাম নামী এক তত্ত্ব অপ্রাকৃত ধর্ম্ম ।

এ জড় জগতে তার নাহি আছে মর্ম্ম ॥৬২॥

এই শুদ্ধজ্ঞানলাভ ভক্তিবলে হয় ।

তর্কে বহু দূর ইহা জানিহ নিশ্চয় ॥৬৩॥

নিজ শুদ্ধসাধন, আর সাধুগুরুবল ।

দুইয়ের সংয়োগে লভি’ এ তত্ত্বমঙ্গল ॥৬৪॥

এই তত্ত্বসিদ্ধি যত দিন নাহি হয় ।

ততদিন প্রাকৃতবুদ্ধি কভু না ছাড়য় ॥৬৫॥


ততদিন নাম করি’ না পাই স্বরূপ ।

নামাভাসমাত্র হয় ভজনবিরূপ ॥৬৬॥

বহু যত্নে লাভ ভাই স্বরূপের সিদ্ধি ।

শুদ্ধনামোচ্চারে পাবে পরংপদ-বুদ্ধি ॥৬৭॥


যত্নসহ নিরন্তর নামাভাসে হরি ।

নামেতে স্বরূপসিদ্ধি দিবে কৃপা করি’ ॥৬৮॥

কৃষ্ণ সর্ব্বেশ্বর, শিবাদি তাঁহার অংশ

সর্ব্বেশ্বর কৃষ্ণ, তাহে জানিবে নিশ্চয় ।

শিবাদি দেবতা তাঁর অংশরূপ হয় ॥৬৯॥

সেই সেই দেবের নামাদি গুণরূপ ।

কৃষ্ণশক্তিদত্ত সিদ্ধ জানহ স্বরূপ ॥৭০॥

এরূপ জানিলে শিববিষ্ণুতে অভেদে ।

জন্মিবে স্বরূপবুদ্ধি, গায় সর্ব্ববেদে ॥৭১॥

ভেদবুদ্ধি অপরাধ যত্নেতে ত্যজিবে ।

গুরুকৃপাবলে তবে শ্রীনাম ভজিবে ॥৭২॥

‘গুরোরবজ্ঞা শ্রুতিশাস্ত্রনিন্দনং
তথার্থবাদো হরিনাম্নি কল্পনম্ ।

নাম্নো বলাদ্​যস্য হি পাপবুদ্ধির্-
ন বিদ্যতে তস্য যমৈর্হি শুদ্ধিঃ’ ॥৭৩॥

গুরু-কর্ণধারের অনাদর

কৃপা করি’ যেই জন হরি দেখাইল ।

হরিনাম-পরিচয় করাইয়া দিল ॥৭৪॥


সেই মোর কর্ণধার গুরু মহাশয় ।

তাঁহারে অবজ্ঞা কৈলে নামাপরাধ হয় ॥৭৫॥

‘হীনজাতি পাণ্ডিত্য-রহিত মন্ত্রহীন’ ।

নামের গুরুতে হেন বুদ্ধি অর্ব্বাচীন ॥৭৬॥

শ্রুতিশাস্ত্রে অনাদর

যেই শ্রুতিশাস্ত্র নামের ব্রহ্মত্ব দেখায় ।

অপার মাহাত্ম্য নামের জগতে জানায় ॥৭৭॥


তারে অনাদর করি’ কর্ম্মাদি প্রশংসে ।

শ্রুতিনিন্দা বলি’ তারে সর্ব্বশাস্ত্রে ভাষে ॥৭৮॥

নামে কল্পনাবুদ্ধি

নাম নিত্যধন সদা চিন্ময় অগাধ ।

তাহাতে কল্পনাবুদ্ধি গুরু অপরাধ ॥৭৯॥

নামবলে পাপবুদ্ধি

নামবলে পাপবুদ্ধি হৃদয়ে যাহার ।

সতত উদয় হয়, সেই ত’ অসার ॥৮০॥

নামে অর্থবাদ

রোচনার্থা ফলশ্রুতি কর্ম্মমার্গে সত্য ।

ভক্তিমার্গে নামফল সর্ব্বকালে নিত্য ॥৮১॥

অপ্রাকৃত নামের মাহাত্ম্য সীমাহীন ।

তাতে যার ‘অর্থবাদ’ সেই অর্ব্বাচীন ॥৮২॥

এই সব অপরাধ বর্জ্জনে নামের কৃপা

এই পঞ্চ অপরাধ বর্জ্জিবে যতনে ।

তবে ত’ নামের কৃপা লভিবে সাধনে ॥৮৩॥

‘ধর্ম্মব্রতত্যাগহুতাদিসর্ব্বশুভক্রিয়াসাম্যমপি প্রমাদঃ ।

অশ্রদ্দধানে বিমুখেঽপ্যশৃণ্বতি যশ্চোপদেশঃ শিবনামাপরাধঃ’ ॥৮৪॥

সর্ব্ব শুভকর্ম্ম প্রাকৃত

বর্ণাশ্রমময়-ধর্ম্ম ধর্ম্মশাস্ত্রে যত ।

দর্শপৌর্ণমাসী-আদি তমোময়-ব্রত ॥৮৫॥


দণ্ডী মুণ্ডী সন্ন্যাসাদি ত্যাগের প্রকার ।

নিত্য নৈমিত্তিক হোম-আদির ব্যাপার ॥৮৬॥


অষ্টাঙ্গ-ষড়ঙ্গ-যোগ-আদি শুভ-কর্ম্ম ।

সকলই প্রাকৃত-তত্ত্ব, এই সত্য মর্ম্ম ॥৮৭॥

উপায় রূপেতে তারা উপেয় সাধয় ।

না সাধিলে জড় বই কিছু আর নয় ॥৮৮॥

শ্রীনাম উপায়, উপেয়

নাম কিন্তু অপ্রাকৃত চিন্ময় ব্যাপার ।

সাধনে উপায়তত্ত্ব সাধ্যে উপেয়-সার ॥৮৯॥

অতএব নামতত্ত্ব বিশুদ্ধ চিন্ময় ।

জড়োপায় কর্ম্ম সহ সাম্য কভু নয় ॥৯০॥

কর্ম্মজ্ঞান সহ নাম তুল্য নহে

কর্ম্মজ্ঞান সহ নামে সাম্যবুদ্ধি যথা ।

নাম-অপরাধ গুরুতর ঘটে তথা ॥৯১॥

অবিশ্বাসী জনে নাম উপদেশ

নামে যার বিশ্বাস না জন্মিল ভাগ্যাভাবে ।

তাকে নাম উপদেশি’ অপরাধ পাবে ॥৯২॥

এই দুই অপরাধ সদ্গুরুকৃপায় ।

বহু যত্নে ছাড়ি’ ভাই নামধন পায় ॥৯৩॥

‘শ্রুত্বাপি নামমাহাত্ম্যং যঃ প্রীতিরহিতোঽধমঃ ।

অহং‑মমাদি-পরমো নাম্নি সোঽপ্যপরাধকৃৎ’ ॥৯৪॥
নামের মাহাত্ম্য সব শুনি’ শাস্ত্র হৈতে ।

তবু তাহে রতি যার নৈল কোনমতে ॥৯৫॥

অহংতা-মমতা-বুদ্ধি দেহেতে করিয়া ।

লাভ-পূজা-প্রতিষ্ঠাতে রহিল মজিয়া ॥৯৬॥


পাপে রত হঞা পাপ ছাড়িতে না পারে ।

নামে যত্ন করি’ চেষ্টা করিবারে নারে ॥৯৭॥


সাধুসঙ্গে মতি নহে অসাধু বিষয়ে ।

সুখ পায় বিবেক বৈরাগ্য ছাড়াইয়ে ॥৯৮॥


এই ত’ নামাপরাধ ঘটনা তাহার ।

নামে রুচি নাহি পায় কৃষ্ণের সংসার ॥৯৯॥

এই দশ অপরাধ নামাপরাধ হয় ।

নামধর্ম্মে বাধা দেয় সুমঙ্গলক্ষয় ॥১০০॥

‘সর্ব্বাপরাধকৃদপি মুচ্যতে হরিসংশ্রয়ঃ ।

হরেরপ্যপরাধান্ যঃ কুর্য্যাদ্দ্বিপদপাংসনঃ ॥১০১॥


নামাশ্রয়ঃ কদাচিৎ স্যাত্তরত্যেষ[ব?] স নামতঃ ।

নাম্নোহি সর্ব্বসুহৃদোহ্যপরাধাৎ পতত্যধঃ’ ॥১০২॥

পাপ তাপ অপরাধ জীবের যত হয় ।

শ্রীহরিসংশ্রয়ে সব সদ্য হয় ক্ষয় ॥১০৩॥

কলির সংসার ছাড়িয়া কৃষ্ণের সংসার কর

কলির সংসার ছাড়ি’ কৃষ্ণের সংসার ।

অকৈতবে করে যেই অপরাধ নাহি তার ॥১০৪॥

দীক্ষাকালে অকৈতবে আত্মনিবেদনে সর্ব্বপাপক্ষয়

পূর্ব্ব যত পাপাদি বহু জন্মে করে ।

হরিদীক্ষামাত্রে সেই সব পাপে তরে ॥১০৫॥

অকৈতবে করে যবে আত্মনিবেদন ।

কৃষ্ণ তার পূর্ব্ব পাপ করেন খণ্ডন ॥১০৬॥

প্রায়শ্চিত্ত করিবারে তার নাহি হয় ।

দীক্ষামাত্র পাপক্ষয় সর্ব্বশাস্ত্রে কয় ॥১০৭॥

নিষ্কপটে হর্য্যাশ্রয় করে যেই জন ।

সর্ব্ব অপরাধ তার বিনষ্ট তখন ॥১০৮॥


আর পাপতাপে কভু রুচি নাহি হয় ।

পুণ্য পাপ দূরে যায়, মায়া করে জয় ॥১০৯॥

সেবা-অপরাধ

তবে তার কভু হয় সেবা-অপরাধ ।

সেই অপরাধে হয় ভক্তিক্রিয়াবাধ ॥১১০॥


সাধুসঙ্গে করে কৃষ্ণনামের আশ্রয় ।

নামাশ্রয়ে সেবা-অপরাধ নষ্ট হয় ॥১১১॥

নামকৃপা হৈলে জীব সর্ব্বশুদ্ধি পায় ।

কৃষ্ণের নিকট গিয়া করে শুদ্ধসেবার আশ্রয় ॥১১২॥

সর্ব্বদা নামাপরাধ বর্জ্জনীয়

কিন্তু যদি নাম-অপরাধ তার হয় ।

তবে পুনঃ অধঃপাত হইবে নিশ্চয় ॥১১৩॥

সর্ব্বজীব-বন্ধু নাম, তাঁর অপরাধ ।

কোনক্রমে ক্ষয় নহে প্রাপ্ত্যে হয় বাধ ॥১১৪॥

নাম অপরাধ ত্যাগ বহু যত্নে করি’ ।

লভে জীব সর্ব্বসিদ্ধি প্রাপ্ত হয় হরি ॥১১৫॥

‘এবং নারদঃ শঙ্করেণ কৃপয়া মহ্যং মুনীনাং পরং

প্রোক্তং নাম সুখাবহং ভগবতো বর্জ্জ্যং সদা যত্নতঃ ।

যে জ্ঞাত্বাপি ন বর্জ্জয়ন্তি সহসা নামাপরাধান্দশ

ক্রুদ্ধা মাতরমপ্যভোজনপরাঃ খিদ্যন্তি তে বালবৎ’ ॥১১৬॥
আমি পূর্ব্বে শিবলোকে শঙ্করসন্নিধানে ।

নাম-অপরাধ-কথা জিজ্ঞাসিলাম মুনে ॥১১৭॥
বহুমুনিগণ মধ্যে শম্ভু কৃপা করি’ ।

আমায় উপদেশ করে কৈলাস উপরি ॥১১৮॥

ভগবানের নাম সর্ব্বজীবসুখাবহ ।

তাতে অপরাধ সর্ব্ব-অমঙ্গল-বহ ॥১১৯॥

মঙ্গল লভিতে যার ইচ্ছা আছে মনে ।

সদা নাম-অপরাধ বর্জ্জিবে যতনে ॥১২০॥

সাধুগুরুসন্নিধানে বহু দৈন্য ধরি’ ।

দশ অপরাধ-তত্ত্ব লবে শিক্ষা করি’ ॥১২১॥

অপরাধগুলি যত্নে জানিয়া ত্যজিবে ।

সত্বরে শ্রীহরিনামে প্রেম উপজিবে ॥১২২॥

নাম পেয়ে অপরাধ বর্জ্জন না করে ।

সহসা তাহারে দশ অপরাধ ধরে ॥১২৩॥

অপরাধ বর্জ্জন না করিয়া নাম করা মূঢ়তা

অপরাধ বুঝিয়া যে বর্জ্জনে উদাসীন ।

তার দুঃখ নিরন্তর সেই অর্ব্বাচীন ॥১২৪॥

মায়ে ক্রোধ করি’ বালক না করে ভোজন ।

সুপথ্য অভাবে সদা ক্লেশের ভাজন ॥১২৫॥

সেইরূপ অপরাধ বর্জ্জন না করি’ ।

নাম করে মূঢ় নিজ শিব পরিহরি’ ॥১২৬॥

‘অপরাধবিমুক্তো হি নাম্নি জপ্তং সদাচর ।

নাম্নৈব তব দেবর্ষে সর্ব্বাং সেৎস্যতি নান্যথা’ ॥১২৭॥

সনৎকুমার বলে, ‘ওহে দেবর্ষিপ্রবর ।

নিরপরাধে নাম জপ সদাই আচর ॥১২৮॥

নাম বিনা অন্য পন্থা নাহি প্রয়োজন ।

নামেতে সকল সিদ্ধি পাবে তপোধন’ ॥১২৯॥

‘শ্রীনারদ উবাচ—


সনৎকুমার প্রিয় সাহসানাং
বিবেক-বৈরাগ্যবিবর্জ্জিতানাম্ ।

দেহপ্রিয়ার্থাত্ম্য-পরায়ণানাম্
উক্তাপরাধাঃ প্রভবন্তি নো কথম্’ ॥১৩০॥
ওহে সনৎকুমার তুমি সিদ্ধ হরিদাস ।

অনায়াসে করিলে নামরহস্যপ্রকাশ ॥১৩১॥
সাধকের নামাপরাধ বর্জ্জনোপায়

সাধক আমরা আমাদের বড় ভয় ।

অপরাধ-ত্যাগে যত্ন কিরূপেতে হয় ॥১৩২॥

বিষয় মোদের বন্ধু তাহার সাহসে ।

করিবে সকল কর্ম্ম বদ্ধ মায়াপাশে ॥১৩৩॥

বিবেকবৈরাগ্যশূন্য দেহ প্রিয়জন ।

অর্থস্বরূপে মোরা সদা পরায়ণ ॥১৩৪॥

কিরূপে সাধক-মনে অপরাধ দশ ।

নাহি উপজিবে তাহা করহ প্রকাশ ॥১৩৫॥

‘শ্রীসনৎকুমার উবাচ—


জাতে নামাপরাধে তু প্রমাদে বৈ কথঞ্চন ।

সদা সঙ্কীর্ত্তয়েন্নাম তদেকশরণো ভবেৎ ॥১৩৬॥


নামাপরাধযুক্তানাং নামান্যেব হরন্ত্যঘম্ ।

অবিশ্রান্ত-প্রযুক্তানি তান্যেবার্থকরাণি হি’ ॥১৩৭॥

নামেতে শরণাপত্তি যেই ক্ষণে হয় ।

তখনই নামাপরাধের সদ্য হয় ক্ষয় ॥১৩৮॥

তথাপি প্রমাদে যদি উঠে অপরাধ ।

তাহাতেও ভক্তিতে হইয়া পড়ে বাধ ॥১৩৯॥

অপরাধ প্রমাদেতে হইবে যখন ।

নামসঙ্কীর্ত্তন তবে করিবে অনুক্ষণ ॥১৪০॥


নামেতে শরণাগতি সুদৃঢ় করিবে ।

অনুক্ষণ নামবলে অপরাধ যাবে ॥১৪১॥

নামই উপায়

নামেই নামাপরাধ হইবেক ক্ষয় ।

অপরাধ নাশিতে আর কারও শক্তি নয় ॥১৪২॥

এ বিষয়ে মূলতত্ত্ব বলি হে তোমায় ।

বুঝহ নারদ তুমি বেদে যাহা গায় ॥১৪৩॥

‘নামৈকং যস্য বাচি স্মরণপথগতং শ্রোত্রমূলং গতং বা
শুদ্ধং বাশুদ্ধবর্ণং ব্যবহিতরহিতং তারয়ত্যেব সত্যম্ ।
তচ্চেদ্দেহ‑দ্রবিণ‑জনতা‑লোভ‑পাষণ্ড‑মধ্যে
নিক্ষিপ্তং স্যান্নফলজনকং শীঘ্রমেবাত্র বিপ্র’ ॥১৪৪॥
যার মুখে উচ্চারিত এক কৃষ্ণনাম ।
যাহার স্মরণপথে এক নাম গুণধাম ॥১৪৫॥
যার শ্রোত্রমূলে তাহা প্রবেশ করিবে ।
ব্যবহিত-রহিত হৈলে তখনই তারিবে ॥১৪৬॥

‘ব্যবহিত’ এই শব্দে দুই অর্থ হয় ।

অক্ষরের ব্যবধানে নাম আচ্ছাদয় ॥১৪৭॥


অবিদ্যার আচ্ছাদনে প্রাকৃত প্রকাশ ।

নাম নামী একভাবে অবিদ্যা-বিনাশ ॥১৪৮॥

ব্যবহিত-রহিত হৈলে শুদ্ধনামোদয় ।

বর্ণশুদ্ধাশুদ্ধিক্রমে দোষ নাহি হয় ॥১৪৯॥

অপ্রাকৃত নামে কৃষ্ণ সর্ব্বশক্তি দিল ।

কালাকাল শৌচাশৌচ নামে না রহিল ॥১৫০॥

সর্ব্বকাল সর্ব্বাবস্থায় শুদ্ধ নাম কর ।

সর্ব্ব শুভোদয় হবে সর্ব্বাশুভ হর ॥১৫১॥

অসৎসঙ্গ ত্যাগপূর্ব্বক নামগ্রহণ

এমত অপূর্ব্ব-নাম সঙ্গযুক্ত যথা ।

শীঘ্র শুভফলদাতা না হয় সর্ব্বথা ॥১৫২॥

দেহ, ধন, জন, লোভ, পাষণ্ডসঙ্গ ক্রমে ।

ব্যবহিত জন্মে, জীব পড়ে মহাভ্রমে ॥১৫৩॥

অতএব সকলের অগ্রে সঙ্গ ত্যজি’ ।

অনন্যশরণ লঞা নামমাত্র ভজি ॥১৫৪॥

নামকৃপাবলে হবে প্রমাদ রহিত ।

অপরাধ দূরে যাবে, হইবেক হিত ॥১৫৫॥

অপরাধমুক্ত হঞা লয় কৃষ্ণনাম ।

প্রেম আসি’ নামসহ করিবে বিশ্রাম ॥১৫৬॥

অপরাধীর নামলক্ষণ কৈতব নিশ্চয় ।

সে সঙ্গ যতনে ছাড়ি’ কর নামাশ্রয় ॥১৫৭॥

‘ইদং রহস্যং পরমং পুরা নারদ শঙ্করাৎ ।

শ্রুতং সর্ব্বাশুভহরমপরাধনিবারকম্ ॥১৫৮॥


বিদুর্বিষ্ণ্বাভিধানং যে হ্যপরাধপরা নরাঃ ।

তেষামপি ভবেন্মুক্তিঃ পঠনাদেব নারদ’ ॥১৫৯॥

সনৎকুমার বলে, ‘ওহে দেবর্ষিপ্রবর ।

পূর্ব্বে শ্রীশঙ্কর মোরে হঞা দয়াপর ॥১৬০॥


শ্রীনামরহস্য সর্ব্ব-অশুভ নাশন ।

অপরাধ-নিবারক কৈল বিজ্ঞাপন ॥১৬১॥

অপরাধপর জন বিষ্ণুনাম জানি’ ।

পাঠ করিলেই মুক্তি লভে ইহা মানি’ ॥১৬২॥

নামরহস্যপটল প্রচার

ওহে স্বরূপ রামরায় এ নামরহস্য- ।
পটল যতনে প্রচার করিবে অবশ্য ॥১৬৩॥

কলিতে জীবের নাহি অন্য প্রতিকার ।

নামরহস্যেতে পার হইবে সংসার ॥১৬৪॥

পূর্ব্বে মুঞি ‘শিক্ষাষ্টকে’ যে তত্ত্ব কহিল ।

এবে ব্যাসবাক্যে তাহা পুনঃ দেখাইল ॥১৬৫॥

যতনে রহস্যপটল প্রচারিবে সবে ।

সর্ব্বক্ষণ আলোচিয়া নাম লবে তবে ॥১৬৬॥

নামাচার্য্য ঠাকুর হরিদাসের আনুগত্যে শ্রীনামভজন

পৃথিবীর শিরোমণি ছিল হরিদাস ।

এই নামরহস্য সব করিল প্রকাশ ॥১৬৭॥

প্রচারিল আচরিল এই নামধর্ম্ম ।

নামের আচার্য্য হরিদাস, জান মর্ম্ম ॥১৬৮॥

হরিদাসের অনুগত হইয়া শ্রীনাম ।
ভজিবে যে জন সেই নিত্যসিদ্ধকাম” ॥১৬৯॥

২০। নাম-মহিমা

একদিন কৃষ্ণদাস কাশীমিশ্রের ঘরে ।

আপন গৌছারি কিছু কহিল প্রভুরে ॥১॥

“আজ্ঞা হয় শুনি কৃষ্ণনামের মহিমা ।

যে মহিমার ব্রহ্মা শিব নাহি জানে সীমা” ॥২॥

প্রভু বলে, “কৃষ্ণনামের মহিমা অপার ।

কৃষ্ণ নিজে নাহি জানে, কি জানিব জীব ছার ॥৩॥

শাস্ত্রে যাহা শুনিয়াছি কহিব তোমারে ।

বিশ্বাস করিয়া শুন যাবে ভবপারে ॥৪॥

সর্ব্বপাপপ্রশমক সর্ব্বব্যাধিনাশ ।

সর্ব্বদুঃখবিনাশন কলিবাধাহ্রাস ॥৫॥


নারকি-উদ্ধার আর প্রারব্ধখণ্ডন ।

সর্ব্ব-অপরাধ-ক্ষয় নামে সর্ব্বক্ষণ ॥৬॥

সর্ব্ব-সৎ-কর্ম্মের পূর্ত্তি নামের বিলাস ।

সর্ব্ববেদাধিক নামসূর্যে্যর প্রকাশ ॥৭॥

সর্ব্বতীর্থের অধিক নাম সর্ব্বশাস্ত্রে কয় ।

সকল সৎকর্ম্মাধিক্য নামেতে উদয় ॥৮॥

সর্ব্বার্থপ্রদাতা নাম, সর্ব্বশক্তিময় ।

জগৎ-আনন্দকারী নামের ধর্ম্ম হয় ॥৯॥

নাম লঞা জগদ্বন্দ্য হয় সর্ব্বজন ।

অগতির গতি নাম পতিতপাবন ॥১০॥

সর্ব্বত্র সর্ব্বদা সেব্য সর্ব্বমুক্তিদাতা ।

বৈকুণ্ঠপ্রাপক নাম হরিপ্রীতিদাতা ॥১১॥

নাম স্বয়ং পুরুষার্থ ভক্ত্যঙ্গপ্রধান ।

শ্রুতি-স্মৃতি-শাস্ত্রে আছে বহুত প্রমাণ ॥১২॥

নাম সর্ব্বপাপবিনাশক

সর্ব্বপাপ নাশ করা নামের একধর্ম্ম ।

প্রথমে তাহাই সপ্রমাণ শুন মর্ম্ম ॥১৩॥
পাপী অজামিল দেখ বিবশ হইয়া ।

হরিনাম উচ্চারিল ‘নারায়ণ’ বলিয়া ॥১৪॥


কোটি কোটি জন্মে পাপ করিয়াছে যত ।

সে সকল হইতে মুক্ত হইল সাম্প্রত ॥১৫॥

অয়ং হি কৃতনির্ব্বেশো জন্মকোট্যংহসামপি ।

যদ্ব্যাজহার বিবশো নাম স্বস্ত্যয়নং হরেঃ ॥১৬॥

স্ত্রী-রাজ-গো-ব্রাহ্মণ-ঘাতী মদ্যরত ।

গুরুপত্নীগামী মিত্রদ্রোহী চৌর্য্যব্রত ॥১৭॥


এ সবের পাপ আর অন্য পাপচয় ।

হরিনাম উচ্চারণে সব পরিষ্কৃত হয় ॥১৮॥

পাপ সুনিষ্কৃত হৈলে কৃষ্ণে হয় মতি ।

এইরূপে নামে জীবের হয় ত’ সদ্গতি ॥১৯॥

স্তেনঃ সুরাপো মিত্রধ্রুগ্ ব্রহ্মহা গুরুতল্পগঃ ।

স্ত্রীরাজপিতৃ গোহন্তা যে চ পাতকিনোঽপরে ॥২০॥

সর্ব্বেষামপ্যঘবতামিদমেব সুনিষ্কৃতমং ।

নামব্যাহরণং বিষ্ণোর্যতস্তদ্বিষয়া মতিঃ ॥২১॥

ব্রতাদি নামের নিকট তুচ্ছ

চান্দ্রায়ণব্রত-আদি শাস্ত্রোক্ত প্রকারে ।

পাপ হইতে পাপীকে নাহি সেরূপ নিস্তারে ॥২২॥

কৃষ্ণনাম একবার উচ্চারিত যবে ।

সর্ব্বপাপ হইতে পাপী মুক্ত হয় তবে ॥২৩॥

ন নিষ্কৃতৈরুদিতৈর্ব্রহ্মবাদিভিস্

তথা বিশুদ্ধ্যত্যঘবান্ ব্রতাদিভিঃ ।

যথা হরের্নামপদৈরুদাহৃতৈস্

তদুত্তমঃশ্লোকগুণোপলম্ভকম্ ॥২৪॥

সঙ্কেতে বা হেলায় নামগ্রহণ

সঙ্কেত বা পরিহাস স্তোভ হেলা করি’ ।

নামাভাসে কভু যদি বলে ‘কৃষ্ণ’ ‘হরি’ ॥২৫॥

অশেষপাতক তার দূরে যায় তবে ।

শ্রীবৈকুণ্ঠে নীত হয় যমদূতের পরাভবে ॥২৬॥

সাঙ্কেত্যং পারিহাস্যং বা স্তোভং হেলনমেব বা ।

বৈকুণ্ঠনাম-গ্রহণমশেষাঘহরং পরম্ ॥২৭॥

পড়ি’ খসি’ ভগ্ন দষ্ট দগ্ধ বা আহত ।

হইয়া বিবশে বলে, ‘আমি হৈনু হত’ ॥২৮॥


‘কৃষ্ণ’ ‘হরি’ ‘নারায়ণ’ নাম মুখে ডাকে ।

যাতনা কখন আশ্রয় না করে তাহাকে ॥২৯॥

পতিতঃ স্খলিতো ভগ্নঃ সংদষ্টস্তপ্ত আহতঃ ।

হরিরিত্যবশেনাহ পুমান্নার্হতি যাতনাঃ ॥৩০॥

জ্ঞানে বা অজ্ঞানে নাম

অজ্ঞানে বা জ্ঞানে কৃষ্ণনাম-সঙ্কীর্ত্তনে ।

সর্ব্বপাপ ভস্ম হয়, যথা কাষ্ঠ অগ্ন্যর্পণে ॥৩১॥
অজ্ঞানাদথবা জ্ঞানাদুত্তমঃশ্লোকনাম যৎ ।

সঙ্কীর্ত্তিতমঘং পুংসো দহেদেধো যথানলঃ ॥৩২॥

প্রারব্ধ অপ্রারব্ধ সমস্ত পাপনাশ

বর্ত্তমান পাপ আর পূর্ব্ব-জন্মার্জ্জিত ।

ভবিষ্যতে হবে যাহা সে সকল হত ॥৩৩॥

অনায়াসে হবে কৃষ্ণনাম-সঙ্কীর্ত্তনে ।

নাম বিনা বন্ধু নাহি জীবের জীবনে ॥৩৪॥

বর্ত্তমানস্তু যৎ পাপং যদ্ভূতং যদ্ভবিষ্যতি ।

তৎসর্ব্বং নির্দ্দহত্যাশু গোবিন্দ-কীর্ত্তনানলঃ ॥৩৫॥

দ্রোহকারীর মুক্তি

মহীতলে সজ্জনের প্রতি পাপাচারে ।

নামকীর্ত্তনেতে মুক্তি লভে সর্ব্ব নরে ॥৩৬॥
সদা দ্রোহপরো যস্তু সজ্জনানাং মহীতলে ।

জায়তে পাবনো ধন্যো হরের্নামানুকীর্ত্তনাৎ ॥৩৭॥

কোটি প্রায়শ্চিত্ত নামতুল্য নহে

শাস্ত্রে কোটি কোটি প্রায়শ্চিত্ত আছে কহে ।

কিন্তু কৃষ্ণকীর্ত্তনের তুল্য কেহ নহে ॥৩৮॥
বসন্তি যানি কোটিস্তু পাবনানি মহীতলে ।

ন তানি তত্তুল্যং যান্তি কৃষ্ণনামানুকীর্ত্তনে ॥৩৯॥

নামগ্রহণকারীর পাপ থাকে না

হরিনাম যত পাপ নির্হরণ করে ।

তত পাপ পাপী কভু করিতে না পারে ॥৪০॥
নাম্নোঽস্য যাবতী শক্তিঃ পাপ-নির্হরণে হরেঃ ।

তাবৎ কর্ত্তুং ন শক্নোতি পাতকং পাতকী জনঃ ॥৪১॥

মনোবাক্​কায়জ পাপ তত নাহি হয় ।

কলিতে গোবিন্দ-নামে নাহি হয় ক্ষয় ॥৪২॥

তন্নাস্তি কর্ম্মজং লোকে বাগ্​জং মানসমেব বা ।

যন্ন ক্ষপয়তে পাপং কলৌ গোবিন্দকীর্ত্তনম্ ॥৪৩॥

নামে সর্ব্বরোগনাশ

নামে সর্ব্বব্যাধিধ্বংস সর্ব্বশাস্ত্রে গায় ।

ওগো স্থানেশ্বরী ভক্ত বলিহে তোমায় ॥৪৪॥
সত্য সত্য বলি, ‘লহ বিশ্বাস করিয়া ।

‘অচ্যুতানন্দ’ ‘গোবিন্দ’ এই নাম উচ্চারিয়া ॥৪৫॥


কাঁদিয়া কাঁদিয়া ডাক শ্রীমধুসূদনে ।

সর্ব্বরোগ নাশ করে শ্রীনামকীর্ত্তনে ॥৪৬॥

অচ্যুতানন্দ-গোবিন্দ-নামোচ্চারণভীষিতাঃ ।

নশ্যন্তি সকলা রোগাঃ সত্যং সত্যং বদাম্যহম্ ॥৪৭॥

নামে মহাপাতকী পংক্তিপাবন হয়

মহাপাতকীও অহর্নিশ হরিগানে ।

শুদ্ধ হঞা গণ্য হয় সুপংক্তিপাবনে ॥৪৮॥
মহাপাতকযুক্তোঽপি কীর্ত্তয়ন্ননিশং হরিম্ ।

শুদ্ধান্তঃকরণো ভূত্বা জায়তে পংক্তিপাবনঃ ॥৪৯॥

ভয় ও দণ্ড নিবারণ

মহাব্যাধি-ভয়ও বা রাজদণ্ড-ভয় ।

নারায়ণ-সঙ্কীর্ত্তনে নিরাতঙ্ক হয় ॥৫০॥
মহাব্যাধি-সমাচ্ছন্নো রাজবাধোপপীড়িতঃ ।

নারায়ণেতি সঙ্কীর্ত্ত্য নিরাতঙ্কো ভবেন্নরঃ ॥৫১॥

সর্ব্বরোগ-সর্ব্বক্লেশ-উপদ্রব-সনে ।

অরিষ্টাদি-বিনাশ হয় হরি-উচ্চারণে ॥৫২॥

সর্ব্বরোগোপশমনং সর্ব্বোপদ্রবনাশনম্ ।

শান্তিদং সর্ব্বারিষ্টানাং হরের্নামানুকীর্ত্তনম্ ॥৫৩॥

যথা অতিবায়ুবলে মেঘ দূরে যায় ।

সূর্য্যোদয়ে তমো নাশ অবশ্যই পায় ॥৫৪॥


তথা সঙ্কীর্ত্তিত নাম জীবের ব্যসন ।

দূর করে স্বপ্রভাবে, এ ব্যাসবচন ॥৫৫॥

সঙ্কীর্ত্ত্যমানো ভগবাননন্তঃ
শ্রুতানুভাবো ব্যসনং হি পুংসাম্ ।

প্রবিশ্য চিত্তং বিধুনোত্যশেষং
যথা তমোঽর্কোঽভ্রমিবাতিবাতম্ ॥৫৬॥
আর্ত্ত বা বিষণ্ণ শিথিলমনা ভীত ।

ঘোরব্যাধিক্লেশে আর নাহি দেখে হিত ॥৫৭॥

‘নারায়ণ’ ‘হরি’ বলি’ করে সঙ্কীর্ত্তন ।

নিশ্চয় বিমুক্তদুঃখ সুখী সেই জন ॥৫৮॥

আর্ত্তা বিষণ্ণাঃ শিথিলাশ্চ ভীতা
ঘোরেষু চ ব্যাধিষু বর্ত্তমানাঃ ।

সঙ্কীর্ত্ত্য নারায়ণ-শব্দমেকং
বিমুক্তদুঃখাঃ সুখিনো ভবন্তি ॥৫৯॥
অসীম শক্তিমান্ বিষ্ণু, তাঁহার কীর্ত্তনে ।

যক্ষ-রক্ষ-বেতালাদি ভূতপ্রেতগণে ॥৬০॥

বিনায়ক-ডাকিন্যাদি হিংস্রক সমস্ত ।

পলায়ন করে সবে দুঃখ হয় অস্ত ॥৬১॥

সর্ব্বানর্থনাশী হরিনাম-সঙ্কীর্ত্তন ।

ক্ষুধা তৃষ্ণা স্খলিতাদি বিপদনাশন ॥৬২॥

ইহাতে সংশয় যথা, নিশ্চয় তথায় ।

নামের বিক্রম কভু না হয় উদয় ॥৬৩॥

বিশ্বাসে নামের কৃপা, অবিশ্বাসে নয় ।

এ এক রহস্য, ভক্ত জানহ নিশ্চয় ॥৬৪॥

কীর্ত্তনাদ্দেবদেবস্য বিষ্ণোর্মিততেজসঃ ।

যক্ষরাক্ষসবেতালভূতপ্রেতবিনায়কাঃ ॥৬৫॥

ডাকিন্যো বিদ্রবন্তি স্ম যে তথান্যে চ হিংসকাঃ ।

সর্ব্বানর্থহরং তস্য নামসঙ্কীর্ত্তনং স্মৃতম্ ॥৬৬॥

নামসঙ্কীর্ত্তনং কৃত্বা ক্ষুত্তৃট্ প্রস্খলিতাদিষু ।

বিয়োগং শীঘ্রমাপ্নোতি সর্ব্বানর্থৈর্ন সংশয়ঃ ॥৬৭॥

কলিকালকুসর্পের তীক্ষ্ণ দংষ্ট্রা হেরি’ ।

ভয় না করিও ভক্ত, শুন শ্রদ্ধা করি’ ॥৬৮॥

কৃষ্ণনাম-দাবানল প্রজ্জ্বলিত হঞা ।

সে সর্পের দংষ্ট্রা দগ্ধ করিবে ফেলিয়া ॥৬৯॥

কলিকালকুসর্পস্য তীক্ষ্ণদংষ্ট্রস্য মা ভয়ং ।

গোবিন্দনামদাবেন দগ্ধো যাস্যতি ভস্মতাং ॥৭০॥

এই ঘোর কলিযুগে হরিনামাশ্রয়ে ।

কৃতকৃত্য ভক্তগণ ত্যক্ত-অন্যাশ্রয়ে ॥৭১॥

হরে কেশব গোবিন্দ বাসুদেব জগন্ময় ।

এই নাম সঙ্কীর্ত্তনে বড় সুখোদয় ॥৭২॥

সদা যেই গায় নাম বিশ্বাস করিয়া ।

কলিবাধা নাহি তার সদা শুদ্ধ হিয়া ॥৭৩॥

হরিনামপরা যে চ ঘোরে কলিযুগে নরাঃ ।

তে এব কৃতকৃত্যাশ্চ ন কলির্ব্বাধতে হি তান্ ॥৭৪॥

হরে কেশব গোবিন্দ বাসুদেব জগন্ময় ।

ইতীরয়ন্তি যে নিত্যং ন হি তান্ বাধতে কলিঃ ॥৭৫॥

নারকী কীর্ত্তন করে ‘হরি’ ‘কৃষ্ণ’ বলি’ ।

হরিভক্ত হঞা যায় দিব্যধামে চলি’ ॥৭৬॥

যথা যথা হরের্নাম কীর্ত্তয়ন্তি স্ম নারকাঃ ।

তথা তথা হরৌ ভক্তিমুদ্বহন্তৌ দিবং যয়ুঃ ॥৭৭॥

প্রারব্ধখণ্ডন কেবল হরিনামে হয় ।

জ্ঞানকর্ম্মে সেই ফল কভু না মিলয় ॥৭৮॥

বিনা হরিকীর্ত্তন কভু কর্ম্মবন্ধ ।

খণ্ডন না হয়, মুমুক্ষুতা নহে লব্ধ ॥৭৯॥


যে মুক্তি লভিলে আর না হয় কর্ম্মসঙ্গ ।

রজস্তমোদোষহীন শূন্য মায়াসঙ্গ ॥৮০॥

নাতঃ পরং কর্ম্মনিবন্ধকৃন্তনং

মুমুক্ষতাং তীর্থপদানুকীর্ত্তনাৎ ।

ন যৎ পুনঃ কর্ম্মসু সজ্জতে মনো-

রজস্তমোভ্যাং কলিলং ততোঽন্যথা ॥৮১॥

ম্রিয়মাণ ক্লিষ্ট জন পড়িতে খসিতে ।

বিবশ হইয়া কৃষ্ণ বলে কোনমতে ॥৮২॥


কর্ম্মার্গলমুক্ত হঞা লভে পরা গতি ।

কলিকালে যাহা নাহি লভে অন্য মতি ॥৮৩॥

যন্নামধেয়ং ম্রিয়মাণ আতুরঃ

পতন্ স্খলন্ বা বিবশো গৃণন্ পুমান্ ।

বিমুক্তকর্ম্মার্গল উত্তমাং গতিং

প্রাপ্নোতি যক্ষ্যন্তি ন তং কলৌ জনাঃ ॥৮৪॥

শ্রদ্ধা করি’ নাম লইলে অপরাধকোটী ।

ক্ষমা করে কৃষ্ণ যদি না থাকে কুটিনাটী ॥৮৫॥
ইহাতে বিশ্বাস যার না হয় সে জন ।

বড়ই দুর্ভাগা তার নাহিক মোচন ॥৮৬॥

মম নামানি লোকেঽস্মিন্ শ্রদ্ধয়া যস্তু কীর্ত্তয়েৎ ।

তস্যাপরাধকোটিস্তু ক্ষমাম্যেবং ন সংশয়ঃ ॥৮৭॥

মন্ত্র-তন্ত্র-ছিদ্র দেশ-কাল-বস্তু-দোষ ।

নামসঙ্কীর্ত্তনে যায়, পায় পরম সন্তোষ ॥৮৮॥

সৎকর্ম্ম প্রধান নাম, তাহার আশ্রয়ে ।

অন্য সৎকর্ম্মের সিদ্ধি হইবে নিশ্চয়ে ॥৮৯॥

মন্ত্রতস্তন্ত্রতশ্ছিদ্রং দেশকালার্হবস্তুতঃ ।

সর্ব্বং করোতি নিশ্ছিদ্রং নামসঙ্কীর্ত্তনং তব ॥৯০॥

সর্ব্ববেদাধিক নাম, ইহাতে সংশয় ।

যে করে তাহার কভু মঙ্গল না হয় ॥৯১॥

প্রণব কৃষ্ণের নাম যাহা হৈতে বেদ ।

জন্মিল ব্রহ্মার মুখে বুঝ তত্ত্বভেদ ॥৯২॥


ঋক্-যজু-সামাথর্ব্ব সে কৈল পঠন ।

‘হরি’ ‘হরি’ যার মুখে শুনি’ অনুক্ষণ ॥৯৩॥

ঋগ্বেদো হি যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোপ্যঽথর্ব্বণঃ ।

অধীতাস্তেন যেনোক্তং হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্ ॥৯৪॥

ঋক্-যজু-সামাথর্ব্ব পঠ কি কারণ ? ।

‘গোবিন্দ’ ‘গোবিন্দ’ নাম করহ কীর্ত্তন ॥৯৫॥

মা ঋচো মা যজুস্তাত মা সাম পঠ কিঞ্চন ।

গোবিন্দেতি হরের্নাম গেয়ং গায়স্ব নিত্যশঃ ॥৯৬॥

বিষ্ণুর প্রত্যেক নাম সর্ব্ববেদাধিক ।

‘রাম’-নাম জান সহস্র নামের অধিক ॥৯৭॥

বিষ্ণোরেকৈকনামাপি সর্ব্ববেদাধিকং মতম্ ।

তাদৃক্ নামসহস্রেণ ‘রাম’-নামসমং স্মৃতম্ ॥৯৮॥

সহস্র নাম তিনবার আবৃত্তি করিলে ।

যেই ফল হয় তাহা এক কৃষ্ণ-নামে মিলে ॥৯৯॥

‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হে’ ।

এই নাম সর্ব্বক্ষণ ভক্ত সব কর হে ॥১০০॥

‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ ॥১০১॥


এই ষোল নামে সর্ব্বদিক্ বজায় রহিল হে ।

সর্ব্বফলসিদ্ধি লাভ এই ষোল নামে হইবে হে ॥১০২॥

সহস্রনাম্নাং পুণ্যানাং ত্রিরাবৃত্ত্যা তু যৎ ফলম্ ।

একাবৃত্ত্যা তু কৃষ্ণস্য নামৈকং তৎ প্রযচ্ছতি ॥১০৩॥

তীর্থযাত্রাপরিশ্রমে কিবা ফল হবে ।

‘হরে কৃষ্ণ’ নিত্য গানে সব ফল পাবে ॥১০৪॥

কিবা কুরুক্ষেত্র, কাশী, পুষ্কর-ভ্রমণে ।

জিহ্বাগ্রেতে হরিনাম যাঁর ক্ষণে ক্ষণে ॥১০৫॥

কুরুক্ষেত্রেণ কিং তস্য কিং কাশ্যা পুষ্করেণ বা ।

জিহ্বাগ্রে বসতি যস্য হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্ ॥১০৬॥

কোটি শত কোটি সহস্র তীর্থে যাহা নয় ।

হরিনাম-কীর্ত্তনেতে সেই ফল হয় ॥১০৭॥

তীর্থকোটিসহস্রাণি তীর্থকোটিশতানি চ ।

তানি সর্ব্বাণ্যবাপ্নোতি বিষ্ণোর্নামানুকীর্ত্তনাৎ ॥১০৮॥

কুরুক্ষেত্রে বসি’ বিশ্বামিত্র ঋষি বলে ।

‘শুনিয়াছি বহু তীর্থনাম ধরাতলে ॥১০৯॥


হরিনাম-কীর্ত্তনের কোটি-অংশতুল্য ।

কোন তীর্থ নাহি’—এই বাক্য বহু মূল্য ॥১১০॥

বিশ্রুতানি বহুন্যেব তীর্থানি বহুধানি চ ।

কোট্যংশেনাপি তুল্যানি নামকীর্ত্তনতো হরেঃ ॥১১১॥

বেদাগম বহু শাস্ত্রে কিবা প্রয়োজন ।

কেন করে লোক বহুতীর্থাদি ভ্রমণ ॥১১২॥

আত্মমুক্তিবাঞ্ছা যার, সেই সর্ব্বক্ষণ ।

‘গোবিন্দ’ ‘গোবিন্দ’ বলি’ করুক কীর্ত্তন ॥১১৩॥

কিন্তাত বেদাগমশাস্ত্রবিস্তরৈস্
তীর্থৈরনেকৈরপি কিং প্রয়োজনম্ ।

যদ্যাত্মনো বাঞ্ছসি মুক্তিকারণং
গোবিন্দ গোবিন্দ ইতি স্ফুটং রট ॥১১৪॥
সর্ব্বসৎকর্ম্মাধিক নাম জানহ নিশ্চয় ।

এই কথা বিশ্বাসিলে সর্ব্বধর্ম্ম হয় ॥১১৫॥
সূর্য্য উপরাগে কোটি কোটি গরুদান ।

প্রয়াগেতে কল্পবাস মাঘেতে বিধান ॥১১৬॥


অযুত যজ্ঞাদি কর্ম্ম স্বর্গমেরুদান ।

শতাংশেতে হরিনামের না হয় সমান ॥১১৭॥

গোকোটিদানং গ্রহণে খগস্য
প্রয়াগগঙ্গোদকে-কল্পবাসঃ ।

যজ্ঞাযুতং মেরুসুবর্ণদানং
গোবিন্দকীর্ত্তের্ন সমং শতাংশৈঃ ॥১১৮॥
ইষ্টাপূর্ত্ত কর্ম্ম বহু বহু কৃত হৈলে ।

তথাপি সে সব ভবহেতু শাস্ত্রে বলে ॥১১৯॥
হরিনাম অনায়াসে ভবমুক্তিধর ।

কর্ম্মফল নামের কাছে অকিঞ্চিৎকর ॥১২০॥

ইষ্টাপূর্ত্তানি কর্ম্মাণি সুবহূনি কৃতান্যপি ।

ভবহেতূস্তান্যেব হরের্নামস্তু মুক্তিদম্ ॥১২১॥

সাঙ্খ্য-অষ্টাঙ্গাদি যোগে কিবা আশা ধর ।

মুক্তি চাও—গোবিন্দ-কীর্ত্তন সদা কর ॥১২২॥

মুক্তিও সামান্য ফল নামের নিকটে ।

হেলায় করিলে নাম জীবের মুক্তি ঘটে ॥১২৩॥

কিং করিষ্যতি সাঙ্খ্যেন কিং যোগৈর্নরনায়ক ।

মুক্তিমিচ্ছসি রাজেন্দ্র কুরু গোবিন্দকীর্ত্তনম্ ॥১২৪॥

শ্বপচ হইলেও দ্বিজশ্রেষ্ঠ বলি তারে ।

যাহার জিহ্বাগ্রে কৃষ্ণনাম নৃত্য করে ॥১২৫॥

সর্ব্বতপ কৈল সর্ব্বতীর্থে কৈল স্নান ।

সর্ব্ববেদ অধ্যয়নে আর্য্য মতিমান্ ॥১২৬॥


এই সব সাধনের বলে ভাগ্যবান্ ।

রসনায় সদা করে হরিনাম গান ॥১২৭॥

অহো বত শ্বপচোঽতো গরীয়ান্
যজ্জিহ্বাগ্রে বর্ত্ততে নাম তুভ্যম্ ।

তেপুস্তপস্তে জুহুবুঃ সস্নূরার্য্যা
ব্রহ্মান্নূচুর্নাম গৃণন্তি যে তে ॥১২৮॥
সর্ব্ব-অর্থ-দাতা হরিনাম মহামন্ত্র ।

ফুকারিয়া বলে যত বেদাগমতন্ত্র ॥১২৯॥
হরিনামবলে সর্ব্বষড়্​বর্গ-দমন ।

রিপুনিগ্রহণ আর অধ্যাত্ম-সাধন ॥১৩০॥

এতৎ ষড়্​বর্গহরণং রিপুনিগ্রহণং পরম্ ।

অধ্যাত্মমূলমেতদ্ধি বিষ্ণোর্নামানুকীর্ত্তনম্ ॥১৩১॥

গুণজ্ঞ সারভুক্ আর্য্য কলিকে সম্মানে ।

সর্ব্বস্বার্থ লভি’ কলৌ নাম-সঙ্কীর্ত্তনে ॥১৩২॥

কলিং সভাজয়ন্ত্যার্য্যা গুণজ্ঞাঃ সারভাগিনঃ ।

যত্র সঙ্কীর্ত্তনেনৈব সর্ব্বং স্বার্থোঽভিলভ্যতে ॥১৩৩॥

সর্ব্বশক্তিমান্ নাম কৃষ্ণের সমান ।

কৃষ্ণের সকল শক্তি নামে বর্ত্তমান ॥১৩৪॥

দানব্রতস্তপস্তীর্থে ছিল যত শক্তি ।

দেবগণে কর্ম্মকাণ্ডে হইয়া বিভক্তি ॥১৩৫॥


রাজসূয়ে অশ্বমেধে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ।

সব আকর্ষিয়া কৃষ্ণ নিল আপন নামে ॥১৩৬॥

দানব্রততপস্তীর্থক্ষেত্রাদীনাঞ্চ যাঃ স্থিতাঃ ।

শক্তয়ো দেবমহতাং সর্ব্বপাপহরাঃ শুভাঃ ॥১৩৭॥

রাজসূয়াশ্বমেধানাং জ্ঞানমধ্যাত্মবস্তুনঃ ।

আকৃষ্য হরিণা সর্ব্বাঃ স্থাপিতাঃ স্বেষু নামসু ॥১৩৮॥

দেবদেব শ্রীকৃষ্ণের সর্ব্ব অর্থ শক্তি ।

যুক্ত সব নাম, তঁহি মধ্যে যাতে আনুরক্তি ॥১৩৯॥


সেই নাম সর্ব্ব অর্থে যোজনা করিবে ।

সর্ব্ব অর্থ শক্তি হৈতে সকলই মিলিবে ॥১৪০॥

সর্ব্বার্থশক্তিযুক্তস্য দেবদেবস্য চক্রিণঃ ।

যচ্চাভিরুচিতং নাম তৎ সর্ব্বার্থেষু যোজয়েৎ ॥১৪১॥

হৃষীকেশ-সঙ্কীর্ত্তনে জগদানন্দিত ।

অনুরাগে হৃষ্টচিত্ত সর্ব্বদা সম্প্রীত ॥১৪২॥


দৈত্য রক্ষ ভীত হঞা পলাইয়া যায় ।

সিদ্ধসঙ্ঘ সদা প্রণমিত তাঁর পায় ॥১৪৩॥

যেই কৃষ্ণ সেই নাম, নামের প্রভাব ।

উপযুক্ত বটে তাতে না থাকে অভাব ॥১৪৪॥

স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্ত্যা

জগৎ প্রহৃষ্যত্যনুরজ্যতে চ ।

রক্ষাংসি ভীতানি দিশো
দ্রবন্তি
সর্ব্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ ॥১৪৫॥

বর্ণাদি বিচার নাহি শ্রীনামসঙ্কীর্ত্তনে ।

দীক্ষাপুরশ্চর্য্যা বিধি বাধা নাই গণে ॥১৪৬॥
নারায়ণ জগন্নাথ বাসুদেব জনার্দ্দন ।

যার মুখে সদা শুনি, পূজ্য গুরু সেই জন ॥১৪৭॥

শয়নে স্বপনে আর চলিতে বসিতে ।

কৃষ্ণনাম করে যেই, পূজ্য সর্ব্ব মতে ॥১৪৮॥

নারায়ণ জগন্নাথ বাসুদেব জনার্দ্দন ।

ইতীরয়ন্তি যে নিত্যং তে বৈ সর্ব্বত্র বন্দিতাঃ ॥১৪৯॥


স্বপন্ ভুঞ্জন্ ব্রজংস্তিষ্ঠনুত্তিষ্ঠংশ্চ বদংস্তথা ।

যে বদন্তি হরের্নাম তেভ্যো নিত্যং নমো নমঃ ॥১৫০॥

স্ত্রী-শূদ্র-পুক্কশ-যবনাদি কেন নয় ।

কৃষ্ণনাম গায়, সেও গুরু পূজ্য হয় ॥১৫১॥

স্ত্রী শূদ্রঃ পুক্কশো বাপি যে চান্যে পাপযোনয়ঃ ।

কীর্ত্তয়ন্তি হরিং ভক্ত্যা তেভ্যোঽপীহ নমো নমঃ ॥১৫২॥

অন্যগতিশূন্য ভোগী পর-উপতাপী ।

ব্রহ্মচর্য্য-জ্ঞানবৈরাগ্যহীন পাপী ॥১৫৩॥


সর্ব্বধর্ম্মশূন্য নামজপী যদি হয় ।

তাহার যে সুগতি তাহা সর্ব্ব ধার্ম্মিকের নয় ॥১৫৪॥

অনন্যগতয়ো মর্ত্ত্যা ভোগিনোঽপি পরন্তপাঃ ।

জ্ঞানবৈরাগ্যরহিতা ব্রহ্মচর্য্যাদিবর্জ্জিতাঃ ॥১৫৫॥

সর্ব্বধর্ম্মোজ্​ঝিতা বিষ্ণোর্নামমাত্রৈকজল্পকাঃ ।

সুখেন যাং গতিং যান্তি ন তাং সর্ব্বেঽপি ধার্ম্মিকাঃ ॥১৫৬॥

হরিনামগ্রহণে দেশকালের নিয়ম নাই ।

উচ্ছিষ্ট অশৌচে বিধি নিষেধ না পাই ॥১৫৭॥

ন দেশনিয়মস্তস্মিন্ ন কালনিয়মস্তথা ।

নোচ্ছিষ্টাদৌ নিষেধোঽস্তি শ্রীহরের্নাম্নি লুব্ধকঃ ॥১৫৮॥

কৃষ্ণনাম সদা সর্ব্বত্র করহ কীর্ত্তন ।

অশৌচাদি নাহি মান, নাম স্বতন্ত্র পাবন ॥১৫৯॥

চক্রায়ুধস্য নামানি সদা সর্ব্বত্র কীর্ত্তয়েৎ ।

নাশৌচং কীর্ত্তনে তস্য স পবিত্রকরো যতঃ ॥১৬০॥

যজ্ঞে দানে স্নানে জপে আছে কালের নিয়ম ।

কৃষ্ণকীর্ত্তনে কালাকালচিন্তা মহাভ্রম ॥১৬১॥

দেশ-কাল-নিয়মাদি নামে কভু নাই ।

কৃষ্ণকীর্ত্তন সদা করহ সবাই ॥১৬২॥

ন দেশনিয়মো রাজন্ ন কালনিয়মস্তথা ।

বিদ্যতে নাত্র সন্দেহো বিষ্ণোর্নামানুকীর্ত্তনে ॥১৬৩॥

কালোঽস্তি দানে যজ্ঞে চ স্নানে কালোঽস্তি সজ্জপে ।

বিষ্ণুসঙ্কীর্ত্তনে কালো নাস্ত্যত্র পৃথিবীতলে ॥১৬৪॥

সংসারে নির্ব্বিণ্ণচিত্ত অভয়পদ চায় ।

হেন যোগীর জন্য নাম একমাত্র উপায় ॥১৬৫॥

এতন্নির্ব্বিদ্যমানানামিচ্ছতামকুতোভয়ম্ ।

যোগীনাং নৃপ নির্ণীতং হরের্নামানুকীর্ত্তনম্ ॥১৬৬॥

হরিনাম বিনা আর সহজ মুক্তিদাতা ।

কেহ নাহি ত্রিজগতে, নামই জীবের ত্রাতা ॥১৬৭॥

একবার মুখে বলে ‘হরি’ দু’অক্ষর ।

সেইজন মোক্ষপ্রতি বদ্ধপরিকর ॥১৬৮॥

সকৃদুচ্চারিতং যেন হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্ ।

বদ্ধ পরিকরস্ তেন মোক্ষায় গমনং প্রতি ॥১৬৯॥

জিতনিদ্র হঞা একবার ‘নারায়ণ’ বলে ।

শুদ্ধ-চিত্ত হঞা সেই নির্ব্বাণপথে চলে ॥১৭০॥

সকৃদুচ্চারয়েদ্​যস্তু নারায়ণমতন্ব্রিতঃ ।

শুদ্ধান্তঃকরণো ভূত্বা নির্ব্বাণমধিগচ্ছতি ॥১৭১॥

এ ঘোর সংসারে বলে বিবশে ‘হরে হরে’ ।

সদ্যোমুক্ত হয়, ভয় তারে ভয় করে ॥১৭২॥

আপন্নঃ সংসৃতিং ঘোরাং যন্নাম বিবশো গৃণন্ ।

ততঃ সদ্যো বিমুচ্যেত যদ্বিভেতি স্বয়ং ভয়ম্ ॥১৭৩॥

মৃত্যুকালে বিবশে যে করে উচ্চারণ ।

তাঁর অবতার নাম লীলা বিড়ম্বন ॥১৭৪॥


বহুজন্মদুরিত সাহস ত্যাগ করি’ ।

যায় সে পরমপদে ভজে সেই হরি ॥১৭৫॥

যস্যাবতারগুণকর্ম্মবিড়ম্বনানি

নামানি যেঽসুবিগমে বিবশা গৃণন্তি ।

তেঽনেকজন্মশমলং সহসৈব হিত্বা

সংযান্ত্যপাবৃতামৃতং তমজং প্রপদ্যে ॥১৭৬॥

চলিতে বসিতে স্বপ্নে ভোজনে শয়নে ।

কলিদমন কৃষ্ণোচ্চারে বাক্যের পূরণে ॥১৭৭॥


হেলাতেও করি’ নাম নিজ স্বরূপ পাঞা ।

পরমপদ বৈকুণ্ঠে যায় নির্ভয় হইয়া ॥১৭৮॥

ব্রজংস্তিষ্ঠন্ স্বপন্নশ্নন্ শ্বসন্ বাক্যপ্রপূরণে ।

নামসঙ্কীর্ত্তনং বিষ্ণোর্হেলয়া কলিবর্ধনম্ ।

কৃত্বা স্বরূপতাং যাতি ভক্তিযুক্তঃ পরং ব্রজেৎ ॥১৭৯॥

যেন তেন প্রকারেতে লয় কৃষ্ণনাম ।

তাকে প্রীতি করে কৃষ্ণ করুণা-নিদান ॥১৮০॥

মদ্যপানে ভূতাবিষ্ট বায়ু-পীড়া-স্থলে ।

হরিনামোচ্চারে মুক্তি তাঁর করতলে ॥১৮১॥

বাসুদেবস্য সঙ্কীর্ত্ত্যা সুরাপো ব্যাধিতোঽপি বা ।

মুক্তো জায়েত নিয়তং মহাবিষ্ণুঃ প্রসীদতি ॥১৮২॥

হরিনাম স্বতঃ পরমপুরুষার্থ হয় ।

উপেয়-মাঙ্গল্য-তত্ত্ব পরংধনময় ॥১৮৩॥


জীবনের ফল বস্তু কাশীখণ্ডে বলে ।

পদ্মপুরাণেও তাহা কহে বহু স্থলে ॥১৮৪॥

ইদমেব হি মাঙ্গল্যং এতদেব ধনার্জ্জনম্ ।

জীবিতস্য ফলঞ্চৈতদ্ যদ্দামোদরকীর্ত্তনম্ ॥১৮৫॥

সর্ব্ব মঙ্গলের হয় পরম মঙ্গল ।

চিত্তত্ত্ব-স্বরূপ সর্ব্ববেদবল্লীফল ॥১৮৬॥

কৃষ্ণনাম লয় যেই শ্রদ্ধা বা হেলায় ।

নর-মাত্র ত্রাণ পায় সর্ব্ববেদে গায় ॥১৮৭॥

মধুরমধুরমেতন্মঙ্গলং মঙ্গলানাং

সকলনিগমবল্লী সৎফলং চিৎস্বরূপম্ ।

সকৃদপি পরিগীতং শ্রদ্ধয়া হেলয়া বা

ভৃগুবর নরমাত্রং তারয়েৎ কৃষ্ণনাম ॥১৮৮॥

ভক্তির প্রকার যত শাস্ত্রে দেখা যায় ।

তঁহি মধ্যে নামাশ্রয় শ্রেষ্ঠ বলি’ গায় ॥১৮৯॥

কষ্টেতে অষ্টাঙ্গ যোগে বিষ্ণুস্মৃতি সাধে ।

ওষ্ঠস্পন্দনেই শ্রেষ্ঠ কীর্ত্তন বিরাজে ॥১৯০॥

অঘচ্ছিৎ স্মরণং বিষ্ণোর্বহ্বায়াসেন সাধ্যতে ।

ওষ্ঠস্পন্দনমাত্রেণ কীর্ত্তনন্তু ততো বরম্ ॥১৯১॥

দীক্ষাপূর্ব্বক অর্চ্চন যদি শত জন্ম করে ।

তাহার জিহ্বায় নিত্য হরিনাম স্ফুরে ॥১৯২॥

যেন জন্মশতৈঃ পূর্ব্বং বাসুদেবঃ সমর্চ্চিতঃ ।

তন্মুখে হরিনামানি সদা তিষ্ঠন্তি ভারত ॥১৯৩॥

সত্যযুগে বহুকালে যাহা তপোধ্যানে ।

যজ্ঞাদি যজিয়া ত্রেতায় যেবা ফল টানে ॥১৯৪॥


দ্বাপরে অর্চ্চনাঙ্গেতে পায় যেবা ফল ।

কলিতে হরিনামে পায় সে সকল ॥১৯৫॥

ধ্যায়ন্ কৃতে যজন্ যজ্ঞৈস্ত্রেতায়াং দ্বাপরেঽর্চ্চয়ন্ ।

যদাপ্নোতি তদাপ্নোতি কলৌ সঙ্কীর্ত্ত্য কেশবম্ ॥১৯৬॥

কলিকালে মহাভাগবত বলি তারে ।

কীর্ত্তনে যে হরিভজে এভব সংসারে ॥১৯৭॥

মহাভাগবতা নিত্যং কলৌ কুর্ব্বন্তি কীর্ত্তনং ॥১৯৮॥

চিদাত্মক হরিনাম বারেক উচ্চারে ।

শিব-ব্রহ্মা-অনন্ত তার ফল কহিতে নারে ॥১৯৯॥

নামোচ্চারণ মাহাত্ম্য অদ্ভুত বলি’ গায় ।

উচ্চারণ মাত্রে নর পরমপদ পায় ॥২০০॥

সকৃদুচ্চারয়ন্ত্যেব হরের্নাম চিদাত্মকং ।

ফলং নাস্য ক্ষমো বক্তুং সহস্রবদনো বিধিঃ ॥২০১॥

নামোচ্চারণ মাহাত্ম্যং শ্রূয়তে মহদদ্ভুতং ।

যদুচ্চারণমাত্রেণ নরো যায়াৎ পরং পদম্ ॥২০২॥

কৃষ্ণ বলে, ‘শুন অর্জ্জুন ! বলিব তোমায় ।

শ্রদ্ধায় হেলায় জীব মম নাম গায় ॥২০৩॥


সেই নাম মম হৃদি সদা বর্ত্তমান ।

নামসম ব্রত নাই, নামসম জ্ঞান ॥২০৪॥


নামসম ধ্যান নাই, নামসম ফল ।

নামসম ত্যাগ নাই, নামসম বল ॥২০৫॥


নামসম পুণ্য নাই, নামসম গতি ।

নামের শক্তিগানে বেদের নাহিক শকতি ॥২০৬॥

নামই পরমা মুক্তি, নামই পরমা গতি ।

নামই পরমা শান্তি, নামই পরমা স্থিতি ॥২০৭॥


নামই পরমা ভক্তি, নামই পরমা মতি ।

নামই পরমা প্রীতি, নামই পরমা স্মৃতি ॥২০৮॥


জীবের কারণ নাম, নামই জীবের প্রভু ।

পরম আরাধ্য নাম, নামই গুরু প্রভু’ ॥২০৯॥

শ্রদ্ধয়া হেলয়া নাম রটন্তি মম জন্তবঃ ।

তেষাং নাম সদা পার্থ বর্ত্ততে হৃদয়ে মম ॥২১০॥

ন নামসদৃশং জ্ঞানং, ন নামসদৃশং ব্রতম্ ।

ন নামসদৃশং ধ্যানং, ন নামসদৃশং ফলম্ ॥২১১॥

ন নামসদৃশস্ত্যাগো, ন নামসদৃশঃ শমঃ ।

ন নামসদৃশং পুণ্যং, ন নামসদৃশী গতিঃ ॥২১২॥
নামৈব পরমা মুক্তির্নামৈব পরমা গতিঃ ।

নামৈব পরমা শান্তির্নামৈব পরমা স্থিতিঃ ॥২১৩॥

নামৈব পরমা ভক্তির্নামৈব পরমা মতিঃ ।

নামৈব পরমা প্রীতির্নামৈব পরমা স্মৃতিঃ ॥২১৪॥

নামৈব কারণং জন্তোর্নামৈব প্রভুরেব চ ।

নামৈব পরমারাধ্যং নামৈব পরমো গুরুঃ ॥২১৫॥

হরিনাম-মাহাত্ম্যের কভু নাহি পার ।

যে নাম শ্রবণে সদ্য পুক্কশ উদ্ধার ॥২১৬॥

যন্নাম সকৃচ্ছ্র বণাৎ পুক্কশোঽপি বিমুচ্যতে সাক্ষাৎ ॥২১৭॥

স্বপনে জাগ্রতে যেবা জল্পে কৃষ্ণনাম ।

কলিতে সে কৃষ্ণরূপী, কৃষ্ণের বিধান ॥২১৮॥

কৃষ্ণ কৃষ্ণেতি কৃষ্ণেতি স্বপন্ জাগ্রদ্ ব্রজংস্তথা ।

যো জল্পতি কলৌ নিত্যং কৃষ্ণরূপী ভবেদ্ধি সঃ ॥২১৯॥

কৃষ্ণ বলি’ নিত্য স্মরে সংসার-সাগরে ।

জলোত্থিত পদ্ম যেন নরকে উদ্ধরে ॥২২০॥

কৃষ্ণ কৃষ্ণেতি কৃষ্ণেতি যো মাং স্মরতি নিত্যশঃ ।

জলং হিত্বং যথা পদ্মং নরকাদুদ্ধরাম্যহম্ ॥২২১॥

কৃষ্ণনাম সর্ব্বমুখ্য জীবের আশ্রয় ।

অশেষ পাপ হরে, সদ্য পাপমুক্তিকর ॥২২২॥

নাম্নাং মুখ্যতরং নাম কৃষ্ণাখ্যং মে পরন্তপ ।

প্রায়শ্চিত্তমশেষাণাং পাপানাং মোচকং পরম্ ॥২২৩॥

নাম চিন্তামণি, কৃষ্ণ, চৈতন্য-স্বরূপ ।

পূর্ণ, শুদ্ধ, নিত্যমুক্ত, নামনামী একরূপ ॥২২৪॥

নাম চিন্তামণিঃ কৃষ্ণশ্চৈতন্যরসবিগ্রহঃ ।

পূর্ণঃ শুদ্ধো নিত্যমুক্তোঽভিন্নত্বান্নামনামিনোঃ ॥২২৫॥

বিষ্ণুনাম বিষ্ণুশক্তি যেই জন জানে ।

সুমতি প্রার্থনা করে অপ্রাকৃত জ্ঞানে ॥২২৬॥

ওঁ আস্য জানন্ত নাম চিদ্বিবক্তন ।

মহস্তে বিষ্ণো সুমতিং ভজামহে” ॥২২৭॥

স্থানেশ্বরী কৃষ্ণদাস যোড় করি’ কর ।

বলে, “প্রভু, এক বস্তু প্রার্থনা হামার ॥২২৮॥

এরূপ মাহাত্ম্য নামের শুনিনু শ্রবণে ।

সর্ব্বত্র সমান ফল নাহি হোয় কেনে” ॥২২৯॥

প্রভু বলে, “শ্রদ্ধা-বিশ্বাস সকলের মূল ।

বিশ্বাস-অভাবে কেহ নাহি লভে ফল” ॥২৩০॥

প্রভু বলে, “অন্তর্য্যমী নাম ভগবান্ ।

বিশ্বাসানুসারে ফল করেন প্রদান ॥২৩১॥

নামের মহিমা পূর্ণ বিশ্বাস না করে ।

নামের ফল নাহি পায়, নাম-অপরাধে মরে ॥২৩২॥

অর্থবাদ করে ফলে বিশ্বাস ত্যজিয়া ।

ফল নাহি পায়, থাকে নরকে পড়িয়া” ॥২৩৩॥

অর্থবাদং হরের্নাম্নি সম্ভাবয়তি যো নরঃ ।

স পাপিষ্ঠো মনুষ্যাণাং নিরয়ে পতিত স্ফুটম্ ॥২৩৪॥

যন্নামকীর্ত্তনফলং বিবিধং নিশম্য
ন
শ্রদ্দধাতি মনুতে যদুতার্থবাদম্ ।

যো মানুষস্তমিহ দুঃখচয়ে ক্ষিপামি

সংসার-ঘোর-বিবিধার্ত্তিনিপীড়িতাঙ্গম্ ॥২৩৫॥

শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত সমাপ্ত

Categories: CIVIL