হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান – Howrah Municipal Corporation by Alak Bhattacharya

শহর কে পরিষ্কার রাখার জন্য সরকার একটি আইন করলেন ১৮৫৭ সালে, হাওড়া অফেন্স এক্ট। এই আইনে বিধি ভেঙ্গে সহরকে নোংরা করলে মেজিস্ট্রেট শাস্তি দিতে পারতেন। মিউনিসিপালিটি গঠনের সলতে পাকানো সেই শুরু।১৮৫৮ সালে মিউনিসিপালিটি গঠনের প্রস্তাব নেওয়া হয় । ১৮৬১, এলো পাঁচ আইন, এক্ট ফাইভ, যারা পথে ঘাটে নোংরা করবে পুলিশ তাদের শাস্তি দিতে পারবে।১৮৬৪ সালে হাওড়া মিউনিসিপাল বোর্ড গঠিত হয়,

হাওড়া আইন আদালত / সেকাল থেকে একাল

হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান

Alok Bhattacharyya

Alak Bhattacharyya  

BULLET 2 হাওড়া আইন আদালত / সেকাল থেকে একাল।

সংযোজন পর্ব। 

ইতিপূর্বে চার পর্বে হাওড়া আইন আদালত, আলোচনা করার সময় বুঝেছি অনেক কিছুই বাদ পরে গেছে। তাই এই সংযোজন পর্ব। এই পর্বের বিষয় হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান।স্বল্প পরিসরে এই বিশাল বিষয় কে উপস্থাপনা করা আর বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করা দুই সমান । তবু চেষ্টা করছি কিছু অলোকপাত করতে ।হাওড়ার আইন আদালত নিয়ে আলোচনা করবো আর সেখানে হাওড়া মিউনিসিপালিটি বাদ থাকে কি করে ? হাওড়া আইন আদালতের সঙ্গে মিউনিসিপালিটি বিশেষ ভাবে জড়িয়ে আছে । আমার সবাই জানি মিউনিসিপালিটির দায়িত্ব হাওড়ার নাগরিকদের সেবা সাচ্ছন্দ প্রদান করা । আর নাগরিকদের দায়িত্ব মিউনিসিপালিটির নিয়ম কানুন, বিশেষত বাড়ী নির্মাণ আইন ইত্যাদি মানা, এবং ট্যাক্স প্রদান করা , তা না করলে তার বিরুদ্ধে আইন মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয় ।

হাওড়া আদালতে সিভিল মামলার সিংহ ভাগ মামলা বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত। তাই মিউনিসিপালিটির ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা হয়ে যাক। হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেসানের পোস্টাল ঠিকানা হলো ৪ মহাত্মা গান্ধী রোড। এর অবস্থান হলো ঠিক হাওড়া আদালতের উত্তরে, মাঝে রাস্তা। আদি পর্বে আসি। গঙ্গার পূর্ব কূলে যখন গোবিন্দপুর, সুতানটি কলকাতা তিনটি গ্রাম পশ্চিমকূলে তখন বেতর রামকৃষ্ণপুর হারিরা কাসুন্দিয়া সলিকা পাঁচটি গ্রামএর নাম পাওয়া যায়। যা পরবর্তীকালে এক হয়ে যে জনপদ গড়ে উঠেছিল আদিতে তার নাম হাবড়া পরে হাওড়া । বলা বাহুল্য তা ছিল নিতান্তই গ্রামীণ।খানা খন্দ খাল বিল পুকুর ভর্তি। [হাওড়া শব্দর অর্থ জলা হাওড় থেকে হাওড়া কিনা সে আলোচনা অন্য একদিন করবো ]

১৮৫৪ সাল শুরু হলো হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন চলা চল। ১৮৯৭ শুরু হলো হাওড়া তেলকল ঘাট থেকে হাওড়া – আমতা, পরে পরে হাওড়া – সিয়াখালা, হাওড়া – চাপাডাঙ্গা মার্টিন লাইট রেলওয়ে চলা চল । ১৮৭৪ তৈরী হলো হাওড়া কলকাতা সংযোগকারী পন্টুন ব্রিজ। গড়ে উঠছে চট কল। জাহাজ নির্মাণ কারখানা। রং কারখানা,সহ অন্যান কারখানা। বাড়ছে হাওড়া আদালতের কাজকর্ম। । ধীরে ধীরে শহরের রূপ নিতে শুরু করে । বাড়ছে জনবসতি। দেখতে দেখতে গ্রামীণ হাওড়া হয়ে গেলো ভারতের অন্যতম ব্যাস্ত ঘিঞ্জি শহর ।লোক বসতি বাড়তেই পৌর ব্যবস্থা জনস্বাস্থ অত্যন্ত খারাপ হতে শুরু করলো। সবথেকে শোচনীয় হলো নিকাশি ব্যবস্থা ও পানীয় জল এর যোগান। রোগ ব্যধির প্রকোপ বাড়তে লাগলো। ১৮৫৬ সালে গঠিত হয় হাওড়া ইউনিয়ন ও পঞ্চায়েত পরিষদ । কিন্তু তা বিশেষ কিছু উপকারে এলো না।শহর কে পরিষ্কার রাখার জন্য সরকার একটি আইন করলেন ১৮৫৭ সালে, হাওড়া অফেন্স এক্ট। এই আইনে বিধি ভেঙ্গে সহরকে নোংরা করলে মেজিস্ট্রেট শাস্তি দিতে পারতেন। মিউনিসিপালিটি গঠনের সলতে পাকানো সেই শুরু।১৮৫৮ সালে মিউনিসিপালিটি গঠনের প্রস্তাব নেওয়া হয় । ১৮৬১, এলো পাঁচ আইন, এক্ট ফাইভ, যারা পথে ঘাটে নোংরা করবে পুলিশ তাদের শাস্তি দিতে পারবে।১৮৬৪ সালে হাওড়া মিউনিসিপাল বোর্ড গঠিত হয়, [ক্যালকাটা গেজেট ২.৮.১৮৬৪।]

এই কমিটির সুপারিসে রাজস্য / ট্যাক্স নেওয়া শুরু হয় । সে সময় বালী গ্রাম ও এর অন্তরভূক্ত ছিল । পর ১৮৮৬ সালের ১ এপ্রিল পৃথক হয়ে বালী মিউনিসিপালিটির অধীন হয়। এরপর পর পর ধীরে ধীরে মিউনিসিপালিটি কাজ শুরু করে । শহরে গ্যাস বাতির আলো জলে আর তার জন্য ট্যাক্স নেওয়া শুরু হয়। ১৮৬৪ সালে হাওড়া প্রথম মিউনিসিপালিটি বোর্ড গঠিত হলে সেই বোর্ডে চেয়ারম্যান হন ডিসর্টিক্ট মেজিস্ট্রেট ই সি কাস্টার। বোর্ডে যে তিন জন হাওড়াবাসী বাঙালির নাম আছে তারা হলেন গোপাল লাল চৌধুরী ক্ষেত্র মোহন মিত্র রামমোহন বসু । পরবর্তী কালে বোর্ডে স্থানীয় বাঙালিদের আধিপত্য বাড়তে থাকে । ১৮৭২ সালে এলো স্বয়ত শাসন, নির্বাচন প্রথা । সেই সঙ্গে মিউনিসিপালিটিকে ওয়ার্ড এ বিভক্ত করা হয় । বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ক্যালকাটা গেজেট এ ১৮৮৪ সালের ১ নভেম্বর । প্রথম নির্বাচন সালটা ১৮৮৪ সালের ১ ডিসেম্বর। ততো দিনে হাওড়ার বুকে চলতে শুরু করেছে ট্রাম, সাল ১৮৮৩ । বয়ে গেলো গঙ্গা দিয়ে বহু জল । দেশ স্বাধীন হলো । হুঁ হুঁ করে বেড়ে চললো মিউনিসিপালিটির কাজ কর্ম ও তার পরিধি [ টেরিটোরিয়াল জুড়িসডি কসান ]। হাওড়া মিউনিসিপালিটি থেকে হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান ।

১৯৮০ সালে পাস হলো হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান এক্ট। লাগু হয় [নোটিফিকেশন] ৩০ নভেম্বর ১৯৮১। হাওড়ার যে সব বিশিষ্ট মানুষ হাওড়া মিউনিসিপালিটির কর্মকর্তা রূপে বিশেষ সুনামের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে কয়েক জন হলেন, বিশিষ্ট আইনজীবী বরোদা প্রসন্ন পাইন, সাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৈলো মুখার্জী , বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, নরসিংহ দত্ত, রামেশ্বর মালিয়া অমৃতলাল পাইন চন্দ্র কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ । সেকালের মিউনিসিপ্সলিটি নিয়ে নানা মজার কথাও আছে। তার একটা বলছি । আমরা জানি তিন দফায় বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাওড়ার ডেপুটি মেজিস্ট্রেট ছিলেন । সে সময় মেজিস্ট্রেট ছিলেন সি এস বাকল্যান্ড । সে সময় ”হাবড়া ”[তাই বানান লেখা হতো ] মিউনিসিপালিটি একটি নোটিশ জারি করলো , দাহ্য / জ্বলীয় বস্তু দ্বারা ঘর ছাওয়া চলবে না। কর্মচারীদের কল্যানে ববাদ গিয়ে হয়ে গেলো জলীয়। এক বুড়ি সেই নোটিশ মোতাবেক তার ঘরের চাল করলো শুখনো গোল পাতা দিয়ে।ব্যাস পুলিশ তার বিরুদ্ধে কেস দিলো। সেই মামলা উঠলো বঙ্কিম চন্দ্রর এজলাসে । তিনি বুঝলেন ব বাদ যাওয়াতে সব গন্ডগোল। বুড়ি বেকসুর খালাস । বাকল্যান্ড সেহেব রেগে বঙ্কিম চন্দ্র র বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন উপর মহলে, তবে তাতে বঙ্কিম চন্দ্র কে সিধে করা যায় নি।

চলুন এবার মিউনিসিপালিটির ভেতরে ঢুকে পরি। যে বিল্ডিংটি প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সেটি হলো টাউন হল আদি ভবন। উদ্বোধন ১৮৮৪ সালের ১৪ মার্চ । ইমারত বাটির মনোরম স্থাপত্য চোখ কে আরাম দেয়। তবে বাড়িটির ঐতিহ্য ও ইতিহাস অসীম । বাংলার তাবড় তাবড় মনীষীর পদধূলি ধন্য এই ভবন যা হাওড়ার গর্ব। কে আসেনি এই বাড়ীতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, শরৎ চন্দ্র, নেতাজী সুভাষ শ্রী অরবিন্দ । আরও বহুজন । এই বাড়ীর দোতলায় আছে বিশাল সভাঘর সেখানে ১৯২৩ সালের জুন মাসে একইসাথে সভায় হাজির ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎ চন্দ্র। চন্দ্র সূর্যর যুগল মিলন প্রত্যক্ষ করার জন্য হাজির ছিল বহু শহর বাসী। নেতাজী এসেছিলেন মিটিং করতে । শ্রী অরবিন্দ এসেছিলেন ১৯০৯ সালে ২৭ জুন সভা করতে । এটি স্মরণ করে একটি ফলক স্থাপন করা আছে । বলা বাহুল্য এটি ঐতিহাসিক বাড়ী। পরবর্তী কালে প্রয়োজনের তাগিদে আরও নতুন ভবন নির্মাণ হয়েছে । তার একটি হলো বহুতল বিশিষ্ট অনেক্সড বিল্ডিং।নির্মাণ কাল ১৯৮২ । পাশে আছে আর একটি বিল্ডিং । এখানে আছে একটি জুডিসিয়াল মেজিস্ট্রেট কোর্ট। উকিলবাবুরা এখানে আসেন মামলা করতে । একতলায় আছে হাওড়া প্রেস ক্লাব । হাওড়া শহরের উত্তরে বালী বেলুড় অঞ্চলের জন্য আছে বালী মিউনিসিপালিটি। কিছু বছর আগে বালী মিউনিসিপালিটি হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশানের সাথে সংযুক্ত করা হয়।সেই সঙ্গে বালী মিউনিসিপালিটি তার স্বাতন্ত্রতা হারায় । বর্তমানে আবার তাকে হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান থেকে বিযুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান একটি স্বয়ং স্বসিত সংস্থা বা অটোনমাস বডি। পরিচালনার দায়িত্বে থাকে বোর্ড। বোর্ড গঠিত হয় জনগন দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি / কউন্সিলর দের নিয়ে। এনাদের যিনি লিডার তিনি হলেন মেয়র ।

এই মুহূর্তে হাওড়ায় কোনো বোর্ড নেই। তাই মেওর ও নেই। আছে সরকার নিযুক্ত চেয়ারম্যান । বর্তমানে সেই দায়িত্ব সামলাছেন ডঃ সুজয় চক্রবর্তী । হাওড়ার সকলেই অপেক্ষা করছে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বোর্ড কবে গঠিত হয় সেই দিকে। আজ এই পর্যন্ত।আবার আসবো সময় সুযোগ মতো ইতিহাসের ঝাঁপি নিয়ে। নমস্কার ।

Alak Bhattacharya (Advocate)

Read also

হাওড়া – আইন আদালত, সেকাল থেকে একাল


 Ref

  1.  হাওড়ার ইতিবৃত্ত — অসিত কুমার বন্ধোপাধ্যায়। ২য় খণ্ড
  2. হাওড়া জেলার ইতিহাস —– অচল ভট্টাচার্য । ১ ম খণ্ড ও ২ য় খণ্ড।

%d bloggers like this: