ভক্তিবিনোদ ঠাকুর Bhakti Vinod Thakur Literatures

  • দত্তকৌস্তুভম্  (১৯৪২)
  • শ্রীভজনরহস্যম্‌
  • শ্রীশ্রীভক্তিবিনোদ-গীতসংগ্রহ
  • শ্রীহরিনাম
  • শ্রীহরিনাম চিন্তামণি
  • শ্রীজৈবধর্ম্ম
  • শ্রীনবদ্বীপ ভাবতরঙ্গ
  • শ্রীভজনরহস্যম্‌
  • শ্রীশ্রীচৈতন্য শিক্ষামৃত

ভক্তিবিনোদ ঠাকুর (১৮৩৮–১৯১৪)

Kunjabihari Vidyabhusan

একখানি প্রাচীন পত্র-1555 CE

Ek khani Prachin Parta -1555 CE

১৪৭৭ শকাব্দে কুচবিহারের মহারাজ নরনারায়ণ-কর্তৃক আহোমরাজ চুকাম্‌ফা স্বৰ্গদেবের ( খোড়া রাজার ) নিকটে লিখিত পত্র।

১৯০১/২৭ জুনের ‘আসামবস্তি হইতে উদ্ধৃত।


স্বস্তি

সকল-দিগদন্তি-কর্ণতালাল্ফাল-সমীরণপ্রচলিত-হিমকর-হার-হাসকাশ-কৈলাস-প্রান্তর-যশোরাশি-বিরাজিত-ত্রিপিষ্টপ ত্ৰিদশতরঙ্গিণী-সলিলনিৰ্ম্মল-পবিত্র-কলেবর ভীষণ-প্রচণ্ড-ধীর-ধৈর্য্য-মৰ্য্যাদা-পারাবার সকল-দিক্‌কামিনী-গীয়মান-গুণসন্তান

শ্ৰীশ্ৰী স্বৰ্গনারায়ণ মহারাজ-প্রতাপেষু ।

লেখনং কাৰ্য্যঞ্চ ।

এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তরে বাঞ্ছা করি । অখন তোমার আমার সন্তোষ-সম্পাদক পত্রাপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকূল প্রতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে। তোমার আমার কৰ্ত্তবে সে বৰ্দ্ধতাক পাই পুষ্পিত ফলিত হইবেক। আমরা সেই উদ্যোগত আছি । তোমারো এ গোট কর্তব্য উচিত হয়, না কর তাক আপনে জান। অধিক কি লেখিম। সত্যানন্দ কৰ্ম্মী রামেশ্বর শম্ম । কালকেতু ও ধুম সর্দার উদ্ভণ্ড চাউলিয়া শুামরাই ইমারাক পাঠাইতেছি। তামরার মুখে সকল সমাচার বুঝিয়া চিতাপ বিদায় দিবা ।

অপর উকীল সঙ্গে ঘুড়ি ২ ধনু ১ চেঙ্গরমৎস ১ জোর বালিচ ১ জকাই ১ সারি ৫ খান এই সকল দিয়া গৈছে। আর সমাচার বুজি কহি পাঠাইবেক । তোমার অর্থে সন্দেশ সোমচেং ১ ছিট ৫ ঘাগরি ১০ কৃষ্ণচামর ২০ শুক্লচামর ১০ ।

ইতি শক ১৪৭৭ মাস আষাঢ় ।


প্রাচীন গদ্য-সাহিত্য।VANGA SAHITYA PARICHAYA 1914 CE

Source: বঙ্গ-সাহিত্য-পরিচয় (দ্বিতীয় খণ্ড) –Dinesh Chandra Sen, B.A

ধর্ম্মপালদেবের তাম্রশাসন-The Copper Plate of Dharma Pala Deva

The Copper Plate of Dharma Pala Deva

Discovered at Khalimpur Maldah District

ধর্ম্মপালদেবের[770-810 CE] তাম্রশাসন।

[খালিমপুর-লিপি]
প্রশস্তি-পরিচয়।

মালদহ জেলার অন্তর্গত খালিমপুর গ্রামের উত্তরাংশে হলকর্ষণ করিতে গিয়া, এক কৃষক এই তাম্রপট্টলিপি প্রাপ্ত হইয়াছিল। সে ইহাকে সিন্দুর লিপ্ত করিয়া, আমরণ পূজা করিয়াছিল;আবিষ্কার-কাহিনী।—কাহাকেও দান বা বিক্রয় করিতে সম্মত হয় নাই। পরলোকগত উমেশচন্দ্র বটব্যাল, এম, এ, মহোদয় মালদহের কলেক্টর হইয়া আসিবার পর, এই সমাচার অবগত হইয়া, ১৮৯৩ খৃষ্টাব্দে কৃষক-পত্নীর নিকট হইতে তাম্রপট্টখানি ক্রয় করিয়া লইলে, ইহার কথা সুধীসমাজে সুপরিচিত হইবার সূত্রপাত হয়। ইহা পালবংশীয় দ্বিতীয় নরপাল ধর্ম্মপালদেবের ভূমিদানের তাম্রশাসন;—খালিমপুরে আবিষ্কৃত হইয়াছিল বলিয়া, এক্ষণে “খালিমপুর-লিপি” নামে কথিত হইয়া আসিতেছে।

এই তাম্রশাসনখানি ক্রয় করিবার পর, বটব্যাল মহাশয় ইহার পাঠোদ্ধারে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। তৎকালে তাঁহার উদ্ধৃত পাঠে অনেক অসঙ্গতি এবং ভ্রমপ্রমাদ বর্ত্তমান থাকিলেও,পাঠোদ্ধার-কাহিনী। তাহাই এসিয়াটিক্ সোসাটীর পত্রিকায়[১] প্রকাশিত হইয়াছিল। পরে পরলোকগত অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ বহুযত্নে একটি বিশুদ্ধ পাঠ প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন।[২] কিন্তু বটব্যাল মহাশয়ের ভ্রমপ্রমাদপূর্ণ পাঠই এখনও সময়ে সময়ে অন্যান্য লেখকের গ্রন্থে উদ্ধৃত হইতেছে। ষষ্ঠ শ্লোকের প্রথম চরণে লিখিত আছে—

“ताभ्यां श्रीधर्म्मपालः समजनि सुजन-स्तूयमानावदानः।”

বটব্যাল মহাশয় ধর্ম্মপালের सुजन-स्तूयमानावदान: বিশেষণ-পদটি “सुजन-स्तूपमानावदानः” বলিয়া উদ্ধৃত করিয়াছিলেন। ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে এই পাঠ মুদ্রিত হয়। ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে অধ্যাপক কিল্‌হৰ্ণ প্রকৃত পাঠটি মুদ্রিত করিয়া দিয়াছিলেন। তাহার দ্বাদশ বৎসর পরেও [১৯১০ খৃষ্টাব্দে], এশিয়াটিক্ সোসাইটী কর্ত্তৃক প্রকাশিত “রামচরিত” নামক প্রাচীন কাব্যের ভূমিকায়, মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এম, এ, [এই বিশেষণ-পদ হইতে “সুজন” শব্দটি ত্যাগ করিয়া,] “स्तूपमानावदातः” পাঠ কল্পনা করিয়া লিখিয়ছেন,—“ধর্ম্মপাল স্তূপের ন্যায় বৃহৎ এবং শুভ্রবর্ণ ছিলেন”।[৩] মূল তাম্রশাসনে এরূপ পাঠ নাই; রাজকবির পক্ষে এরূপ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিবারও সম্ভাবনা ছিল না।

বটব্যাল মহাশয় ইহার ব্যাখ্যা-কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া, [কোনরূপ প্রতিবাদে কর্ণপাত না করিয়া] ইহাকে ধর্ম্মপাল-কর্ত্তৃক ভট্টনারায়ণ নামক স্বনামখ্যাত ব্ৰাহ্মণ-কবিকে ভূমিদান করিবারব্যাখ্যা-কাহিনী। তাম্রশাসন বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন, এবং স্বমত-সমর্থনের জন্য নানা বিচার-বিতণ্ডারও অবতারণা করিয়াছিলেন। সে ব্যাখ্যা যে প্রকৃত ব্যাখ্যা নহে, তাহা এক্ষণে সুধীসমাজে সুপরিচিত হইয়াছে।[৪] কিন্তু এই তাম্রশাসনের মর্ম্ম এ পর্য্যন্ত বঙ্গভাষায় অনূদিত হয় নাই। ইহাতে বাঙ্গালার ইতিহাসের যে সকল তথ্য প্রচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে, তাহাও বঙ্গসাহিত্যে সুপরিচিত হইতে পারে নাই।

এই তাম্রপট্টখানির আয়তন ১ ফুট ৪.৩/ ৮
ইঞ্চ দীর্ঘ এবং ১১.৩/ ৮
ইঞ্চ প্রস্থ। ইহার শীর্ষদেশে—মধ্যস্থলে—একটি রাজমুদ্রা সংযুক্ত আছে, এবং তন্মধ্যে “श्रीमान् धर्म्मपालदेवः” এই কয়েকটিলিপি-পরিচয়। অক্ষর উৎকীর্ণ রহিয়াছে। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা একটি বৌদ্ধমত-বিজ্ঞাপক ধর্ম্মচক্র-মুদ্রা,—মধ্যস্থলে ধর্ম্মচক্ৰচিহ্ন, উভয় পার্শ্বে মৃগ-মূর্ত্তি। এই তাম্রপট্টের এক পৃষ্ঠে ৩৩ পংক্তি এবং অপর পৃষ্ঠে ২৯ পংক্তি [সংস্কৃত ভাষায় রচিত পদ্যগদ্যাত্মক লিপি] উংকীর্ণ রহিয়াছে। তিন চারিটি অক্ষর ভিন্ন সমগ্র লিপিটি অক্ষুণ্ণ অবস্থায় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে।

এই তাম্রশাসন উৎকীর্ণ করাইয়া, “পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ শ্ৰীধর্ম্মপাল দেব” [৩০ পংক্তি] তদীয় বিজয়-রাজ্যের “সম্বৎ ৩২ মার্গ দিন ১২” [৬১ পংক্তি] তারিখে “পাটলিপুত্র-সমাবাসিতলিপি-বিবরণ। [২৮—২৯ পংক্তি] জয়স্কন্ধাবার হইতে “শ্রীপুণ্ড্রবর্দ্ধন-ভুক্ত্যন্তঃ-পাতি-ব্যাঘ্রতটীমণ্ডলসম্বদ্ধ-মহন্তাপ্রকাশ-বিষয়ে” [৩০—৩১ পংক্তি] এবং “স্থালীক্কটবিষয়সম্বদ্ধাম্রষণ্ডিকা-মণ্ডলান্তঃ-পাতি” [৪১-৪২ পংক্তি] স্থানে “মহাসামন্তাধিপতি শ্রীনারায়ণবর্ম্মার” [৪৯ পংক্তি] প্রার্থনাক্রমে, নারায়ণবর্ম্মা-কর্ত্তৃক “শুভস্থলীতে” নির্ম্মিত দেবকুলে প্রতিষ্ঠিত “ভগবন্নন্ন-নারায়ণের” ও “তৎপ্রতিপালক লাট-দ্বিজাদির” [৪৯-৫১ পংক্তি] ব্যবহারার্থ ভূমিদান করিয়াছিলেন। ইহাতে প্রসঙ্গক্রমে পাল-রাজবংশের অভ্যুদয় কাহিনী বিধৃত হইয়া রহিয়াছে। তজ্জন্য ইহা বাঙ্গালার ইতিহাসের একটি বিশিষ্ট উপাদান বলিয়া সুপরিচিত। এ পর্য্যন্ত পাল-রাজগণের যে সকল শাসন-লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তন্মধ্যে ইহাই সর্ব্বাপেক্ষা পুরাতন। ইহা এক্ষণে কলিকাতায় [এসিয়াটিক্ সোসাইটি কর্ত্তৃক] রক্ষিত হইতেছে। এই তাম্রফলকে কবির নাম উল্লিখিত নাই; শিল্পীর নাম উল্লিখিত আছে;一“ভোগটের পৌত্র, সুভটের পুত্র, গুণশালী শ্ৰীমান্ তাতট কর্ত্তৃক এই তাম্রশাসন উৎকীর্ণ হইয়াছিল।”

প্রশস্তি-পাঠ।

१ ॐ स्वस्ति [॥]
सर्व्वज्ञतां श्रियमिव स्थिर मास्थितस्य
वज्रास-
२ नस्य बहुमार-कुलोपलम्भाः।
देव्या महाकरुणया परिपा-
३ लितानि
रक्षन्तु वो दशबलानि दिशो जयन्ति॥(১)
श्रिय इव सुभगा-
४ याः सम्भवो वारिराशि-
श्‌शशधर इव भासो विश्व माह्लादयन्त्याः।
प्रकृति रवनिपानां सन्तते रुत्तमाया
अ-
५ जनि दयितविष्णुः सर्व्वविद्यावदातः॥(২)
आसीदासागरादुर्व्वीं गुर्व्वीभिः कीर्त्तिभिः कृती।
मण्डयन्

६ खण्डितारातिः श्लाघ्यः श्रीवप्यट स्ततः॥(৩)
मात्‌स्य‑न्याय मपोहितुं प्रकृतिभि र्लक्ष्म्याः करं ग्राहितः
श्रीगोपा-
७ ल इति क्षितीश-शिरसां चूड़ामणि स्तत्‌सुतः।
यस्यानुक्रियते सनातन-यशोराशि र्दिशामाशये
श्वेतिम्ना य-
८ दि पौर्णमास-रजनी ज्योत्‌स्नातिभारश्रिया॥(৪)
शीतांशो रिव रोहिणी हुतभुजः स्वाहेव तेजोनिधः
सर्व्वाणी-
९ व शिवस्य गुह्यकपते र्भद्रेव भद्रात्मजा।
पौलोमीव पुरन्दरस्य दयिता श्रीदेद्ददेवीत्यभूत्
देवी तस्य विनो-
१० दभू र्मुररिपो र्लक्ष्मी रिव क्ष्मापतेः॥(৫)
ताभ्यां श्रीधर्म्मपालः समजनि सुजन-स्तूयमानावदानः
स्वामी भूमी-
११ पतीना मखिल-वसुमती-मण्डलं शासदेकः।
चत्वार स्तीरमज्जत्-करिगण-चरण-न्यस्तमुद्राः समुद्रा
यात्रां य-
१२ स्य क्षमन्ते न भुवन-परिखा विश्वगाशा-जिगीषोः॥(৬)
यस्यिन्न द्दामलीला-चलित-बलभरे दिग्‌जयाय प्रवृत्ते
यान्त्या-
१३ म्बिश्वम्भरायां चलित-गिरि-तिरश्चीनतां तद्वशेन।
भाराभुग्नावमज्जन्-मणिविधुर-शिरश्चक्र-साहायकार्थं
शेषे-
१४ नोदस्त-दोष्णा त्वरिततर मधोध स्तमेवानुयातम्॥(৭)
यत्‑प्रस्थाने प्रचलित-बलास्फालना-दुल्ललद्भि-
र्धूलीपूरैः पिहि-
१५ त-सकल-व्योमभि र्भूतधात्र्याः।
संप्राप्तायाः परमतनुतां चक्रवालं फणानां
मग्नोन्मीलन्-मणि फणिपते र्ला-
१६ घवादुल्ललास॥(৮)
विरुद्ध‑विषय‑क्षोभाद् यस्य कोपाग्नि रौर्ववत्।
अनिर्वृति प्रजज्वाल चतुरम्भोधिवारितः॥(৯)
१७ येऽभूवन् पृथु-रामराघव-नल-प्राया धरित्रीभुज-
स्तानेकत्र दिदृक्षुणेव निचितान् सर्व्वान् सम म्वेधसा।
ध्व-
१८ स्ताशेष-नरेन्द्र-मानमहिमा श्रीधर्म्मपालः कलौ
लोल-श्री-करिणी-निबन्धन-महास्तम्भः समुत्तम्भितः॥(১০)
यासां
१९ नासीर-धूली-धवल-दशदिशां द्रागपश्यन्नियत्तां
धत्ते मान्धातृसैन्य-व्यतिकरचकितो ध्यानतन्द्री म्महेन्द्रः।
२०तासामप्याहवेच्छा-पुलकित-वपुषा म्वाहिनीना म्विधातुं
साहाय्यं यस्य वाह्वो र्निखिल-रिपुकुलध्वंसिनो र्ना-
२१ वकाशः॥(১১)
भोजैर्मत्स्यैः समद्रैः कुरु-यदु-यवनावन्ति-गन्धार-कीरै-
र्भूपै र्व्यालोल-मौलिप्रणति-परिणतैः
२२ साधु-सङ्गीर्य्यमाणः।
हृष्यत्-पञ्चालवृद्धोद्धृत-कनकमय-स्वाभिषेकोदकुम्भो
दत्तः श्रीकन्यकुब्ज स्‌सललित-च
२३ लित-भ्रूलता-लक्ष्म येन॥(১২)
गोपैः सीम्नि वनेचरै र्वनभुवि ग्रामोपकण्ठे जनैः
क्रीड़द्भिः प्रतिचत्वरं शिशुगणैः
२४ प्रत्यापणं मानपैः
लीला-वेश्मनि पञ्जरोदर-शुकै रुद्गीत मात्म-स्तवं
यस्याकर्णयत स्त्रपा-विवलिता-नम्रं स-
२५ दैवाननं॥(১৩)
स खलु भागीरथीपथ प्रवर्त्तमान-नानाविध-नौवाटक-सम्पादित-सेतुबन्ध-निहित-शैलशि-
२६खरश्रेणी-विभ्रमात् निरतिशय-घन-घनाघन-घटा-श्यामायमान-वासरलक्ष्मी-समारब्ध-सन्तत-जलदस-
२७ मय-सन्देहात् उदीचीनानेक-नरपति-प्र[ा]भृतिकृता-प्रमेय-हयवाहिनी-खरखुरोत्खात-धूली-धूसरित-दि-
२८ गन्तरालात् परमेश्वर-सेवासामायात-समस्तजम्बूद्वीप-भूपालानन्त-पादात-भर-नमदवनेः पाठलिपु-

२९त्र-समावासित-श्रीमज्जयस्कन्धावारात् परमसौगतो महाराजाधिराज-श्रीगोपालदेव-पादानुध्यातः प-
३०रमेश्वरः परमभट्टारको महाराजाधिराजः श्रीमान् धर्म्मपालदेवः कुशली॥ श्रीपुण्ड्रवर्द्धनभु-
३१क्त्यन्तःपाति-व्याघ्रतटी मण्डलसम्बद्ध-महन्ताप्रकाश-विषये क्रौञ्चश्वभ्र नाम ग्रामोऽस्य च सीमा पश्चि-
३२मेन गङ्गिनिका। उत्तरेण कादम्बरी-देवकुलिका खर्ज्जूरवृक्षश्च| पूर्व्वोत्तरेण राजपुत्र-देवट-कृतालिः। वी-
३३जपुरकङ्गत्वा प्रविष्टा। पूर्व्वेण विटकालिः खातकयानिकां गत्वा प्रविष्टा। जम्बूयानिका माक्रम्य जम्बूयानकं
३४गता। ततो निःसृत्य पुण्याराम-बिल्वार्द्ध-स्रोतिकां। ततोपि निःसृत्य न-
३५ल-चर्म्मटोत्तरान्तं गता नलचर्म्मटात् दक्षिणेन नामुण्डिकापि [हे
३६सदुम्मि] कायाः। खण्डमुण्डमुखं खण्डमुखा[त्]वेदसबिल्विका वेद[स]विल्विकातो रोहितवाटिः पिण्डारविटि-जोटिका-सीमा
३७उक्तारजोटस्य दक्षिणान्तः ग्रामबिल्वस्य च दक्षिणान्तः। देविका-सीमाविटि। धर्म्मायो-जोटिका। एवम्माढ़ा-शाल्मली ना-
३८म ग्रामः। अस्य चोत्तरेण गङ्गिनिका-सीमा ततः पूर्व्वेणार्द्धस्रोतिकया आम्रयानकोलर्द्धयानिकङ्गतः त-
३९तोपि दक्षिणेन कालिकाश्वभ्रः। अतोपि निःसृत्य श्रीफलभिषुकं यावत् पश्चिमेन ततोपि बिल्वङ्गोर्द्ध स्रोति-
४०कया गङ्गिनिकां प्रविष्टा। पालितके सीमा दक्षिणेन काणा-द्वीपिका। पूर्व्वेण कोण्ठिया-स्रोतः। उत्तरेण
४१गङ्गिनिका। पश्चिमेन जेनन्दायिका। एतद्ग्राम-सम्पारीण-परकर्म्मकृद्वीपः। स्थालीक्कट-विषय-
४२सम्बद्धाम्रषण्डिका-मण्डलान्तःपाति-गोपिप्पली-ग्रामस्य सीमा। पूर्व्वेण उड्रग्राम-मण्डल-पश्विमसीमा। दक्षि-

४३णेन जोलकः। पश्विमेन वेसानिकाख्या खाटिका। उत्तरेणोड्रग्राम-मण्डलसीमा-व्यवस्थितो गोमार्गः। एषु च-
४४तुरुषु (चतुर्षु) ग्रामेषु समुपगतान् सर्व्वानेव राजराजनक-राजपुत्र-राजामात्य-सेनापति-विषयपति-भोगपति-षष्ठाधि-
४५कृत-दण्डशक्ति-दण्डपाशिक-चौरोद्धरणिक-दौस्साधसाधनिक-दूत-खोल-समागमिकाभित्वरमाण-हस्त्यश्व-गोमहिषाजा-
४६विकाध्यक्ष-नाकाध्यक्ष٭১ बलाध्यक्ष-तरिक-शौल्किक-गौल्मिक-तदायुक्तक-विनियुक्तकादि-राजपादोपजीविनोऽन्यांश्चाकीर्त्ति-
४७तान् चाटभटजातीयान् यथाकालाध्यासिनो ज्येष्ठकायस्थ-महामहत्तर-महत्तर-दाशग्रामिकादि-विषयव्यवहारिणः
४८सकरणान् प्रतिवासिनः क्षेत्रकरांश्च ब्राह्मण-माननापूर्व्वकं यथार्हं मानयति बोधयति समाज्ञापयति च। मतमस्तु
४९भवतां महासामन्ताधिपति-श्रीनारायणवर्म्मणा दूतक-युवराज-श्रीत्रिभुवनपालमुखेन वय मेवं विज्ञापिताः यथाऽस्मा-
५०भि र्म्मातापित्रो रात्मनश्च पुण्याभिवृद्धये शुभस्थल्यान्देवकुलं कारित न्तत्र प्रतिष्ठापित-भगवन्नन्न-नारायण-भट्टारकाय तत्प्र-
५१तिपालक लाटद्विज-देवार्च्चकादि-पादमूल-समेताय पूजोपस्थानादि-कर्म्मणे चतुरो ग्रामान् अत्रत्य-हट्टिका-तलपाटक-
५२समेतान् ददातु देव इति। ततोऽस्माभि स्तदीय विज्ञप्त्या एते उपरिलिखितका श्चत्वारो ग्रामा स्तलपाटक-हट्टिकासमेताः स्व-
५३सीमापर्य्यन्ताः सोद्देशाः सदशापचाराः अकिञ्चित्प्रग्राह्याः परिहृत-सर्व्वपीड़ाः भूमिच्छिद्रन्यायेन चन्द्रार्कक्षिति-समकालं
५४तथैव प्रतिष्ठापिताः। यतो भवद्भि स्सर्व्वै रेव भूमे र्द्दानफल-गौरवादपहरणे च महानरक पातादि भयाद्दानमिद मनुमो-
५५द्य परिपालनीयम्। प्रतिवासिभिः क्षेत्रकरै श्वाज्ञाश्रवणविधेयै-

र्भूत्वा समुचित-कर-पिण्डकादि-सर्व्व-प्रत्यायोपनयः٭২ कार्य्य
५६इति॥

बहुभि र्व्वसुधा दत्ता राजभि स्सगरादिभिः।
यस्य यस्य यदा भूमि स्तस्य तस्य तदा फलम्॥(১৪)
षष्ठिं वर्षसहस्राणि स्वर्गे
५७मोदति भूमिदः।
आक्षेप्ता चानुमन्ता च तान्येव नरके वसेत्॥(১৫)
स्वदत्ताम्परदत्ताम्बा यो हरेत वसुन्धराम्।
स विष्ठायां कृमि र्भूत्वा पितृ-
५८भि स्सह पच्यते॥(১৬)
इति कमल-दलाम्बु-विन्दु-लोलां
श्रिय मनुचिन्त्य मनुष्य-जीवितञ्च।
सकलमिदमुदाहृत ञ्च बुद्ध्वा
न हि पुरु-
५९षैः पर-कीर्त्तयो विलोप्या:॥(১৭)
तड़ित्तुल्या लक्ष्मी स्तनुरपि च दीपानल-समा
भवो दुःखैकान्तः पर-कृतिमकीर्त्तिः क्षपयताम्।
यशां
६०स्याचन्द्रार्क्कं नियत मवताम[त्र] च नृपाः
करिष्यन्ते बुद्ध्वा यदभिरुचितं किं प्रवचनैः॥(১৮)
अभिवर्द्धमान-विजयराज्ये
६१सम्बत् ३२ मार्ग-दिनानि १२।
श्रीभोगटस्य पौत्रेण श्रीमत् सुभटसूनुना।
श्रीमता तातटेनेदं उत्कीर्णं गुण-शालिना॥(১৯)

বঙ্গানুবাদ।-Bengali Translation

ওঁ স্বস্তি॥

(১)

যিনি সর্ব্বজ্ঞতাকেই রাজশ্রীর ন্যায় স্থিরভাবে ধারণ করিয়াছিলেন, সেই বজ্রাসনের [বুদ্ধদেবের] বিপুল-করুণা-পরিপালিত বহু-মার-[৫] সেনাসমাকুল-দিঙ্মণ্ডল-বিজয়সাধনকারী দশবল[৬] তোমাদিগকে রক্ষা করুক।

(পক্ষান্তরে)

বজ্রতুল্য সুদৃঢ় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত, সর্ব্বজ্ঞতার ন্যায় রাজশ্রীর স্থির আশ্রয় স্বরূপ, রাজাধিরাজ [ধর্ম্মপালের] মহাকরুণা-পরিপালিত যে সেনাসমূহ দুর্দ্দান্ত-শত্রুসেনাপরিব্যাপ্ত-দশদিকের বিজয় সাধন করিতেছে, তাহারা তোমাদিগকে রক্ষা করুক।

(২)

মনোহারিণী লক্ষ্মীর উৎপত্তিস্থান যেমন সমুদ্র, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আহ্লাদ-জনয়িত্রী কান্তির উৎপত্তিস্থান [সম্ভব] যেমন শশধর, সেইরূপ অবনিপালকুলের সর্ব্বোৎকৃষ্ট বংশধরের বীজিপুরুষ [প্রকৃতি] সর্ব্ববিদ্যাবিশুদ্ধ[৭] দয়িতবিষ্ণু জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।

(৩)

যিনি বিপুলকীর্ত্তিকলাপে সসাগরা বসুন্ধরাকে বিভূষিত করিয়াছিলেন, অরাতি-নিধনকারী, [সর্ব্বকার্য্যে] কুশল, প্রশংসনীয়, সেই বপ্যট [দয়িতবিষ্ণু হইতে] জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।

(৪)

[দুর্ব্বলের প্রতি সবলের অত্যাচারমূলক] “মাৎস্য ন্যায়”[৮] [অরাজকতা] দূর করিবার অভিপ্রায়ে, প্রকৃতিপুঞ্জ যাঁহাকে রাজলক্ষ্মীর কর গ্রহণ করাইয়া [রাজা নির্ব্বাচিত করিয়া] দিয়াছিল, পূর্ণিমা-রজনীর [দিঙ্‌মণ্ডল-প্রধাবিত] জ্যোৎস্নারাশির অতিমাত্র ধবলতাই যাঁহার স্থায়ী যশোরাশির অনুকরণ করিতে পারিত, নরপাল-কুলচূড়ামণি গোপাল নামক সেই প্রসিদ্ধ রাজা বপ্যট হইতে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।

(৫)

চন্দ্রের যেমন রোহিণী, অগ্নির যেমন স্বাহা, শিবের যেমন সর্ব্বাণী, গুহ্যকপতি কুবেরের যেমন ভদ্রকন্যা[৯] ভদ্রা, ইন্দ্রের যেমন পুলোমজা, এবং বিষ্ণুর যেমন লক্ষ্মী, সেইরূপ সেই [গোপালদেব] রাজার দেদ্দদেবী নাম্নী চিত্তবিনোদনকারিণী প্রিয়তমা মহিষী ছিলেন।

(৬)

সেই গোপালদেব এবং দেদ্দদেবী হইতে ধর্ম্মপালদেব জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার বিশুদ্ধ ক্রিয়াকলাপ [অবদান] সুজন কর্ত্তৃক প্রশংসিত [স্তূয়মান]।[১০] নৃপতিবৃন্দের অধীশ্বর সেই রাজা একাকী সমগ্র বসুমতীর শাসনকার্য্য পরিচালনা করিতেছেন। ভুবনমণ্ডলের পরিখা স্বরূপ দিঙ্মণ্ডলের বিজয়াভিলাষী সেই রাজার [যুদ্ধ] যাত্রাকালে তীর হইতে জলনিমজ্জনোন্মত্ত-করিচরণ-সংস্পর্শে সমুদ্রের চিহ্ন বিলুপ্ত হওয়ায়, চতুঃসমুদ্র সে বিজয়যাত্রার বেগ সহ্য করিতে পারে না।

(৭)

সেই রাজা [ধর্ম্মপাল] প্ৰকট-লীলাচলিত-সেনাবল-সমভিব্যাহারে দিগ্বিজয়ার্থ বহির্গত হইলে, সেনাভারাক্রান্ত বিচলিত পর্ব্বতমালা বক্রভাব প্রাপ্ত হয়; এবং তাহাতে মস্তকস্থিত নম্রীকৃত মণিদ্বারা মস্তকে বেদনা অনুভব করিয়া, সেই বেদনাক্রান্ত শিরঃসমূহের সাহায্যার্থে হস্তোদ্গম করিয়া, অনন্তদেব অধোদেশে [সেই রাজার] অনতিদূরবর্ত্তিরূপে ত্বরিতপদে অনুগমন করিয়া থাকেন।

(৮)

সেই রাজা যুদ্ধার্থ প্রস্থিত হইলে, প্রচলিত সেনাসমূহের আস্ফালনোত্থিত ধূলিপটলে আকাশমণ্ডল পরিব্যাপ্ত হইবার জন্য, পৃথিবী সূক্ষ্মভাব ধারণ করিলে, ভারের লাঘববশতঃ, মণিগুলি উন্মীলিত হইলে, অনন্তদেবের ফণাসকল উল্লসিত হইয়া থাকে।

(৯)

কেহ তাঁহার চিত্তকে অপ্রিয় আচরণের দ্বারা বিচলিত করিলে, যে কোপাগ্নি সমুদ্ভূত হয়, তাহা বাড়বাগ্নির ন্যায় চতুঃসাগর-বেষ্টিত ভূমণ্ডলে নিরন্তর [অনির্বৃতি] প্রজ্জ্বলিত হইয়া থাকে।

(১০)

পৃথু, রঘুবংশধর রামচন্দ্র,[১১] নল প্রভৃতি যে সকল [গুণাধার] নরপালগণ [ভিন্ন ভিন্ন সময়ে] ধরিত্ৰীতলে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তাঁহাদিগকে [এক সময়ে] একত্র দর্শন করিবার ইচ্ছায়, বিধাতা যেন নরপালকুল-গৌরব-সংহারক ধর্ম্মপাল নামক নরপালকে কলিযুগে চিরচঞ্চল-লক্ষ্মী-করিণীর বন্ধনোপযোগী মহাস্তম্ভরূপে সংস্থাপিত করিয়াছিলেন।

(১১)

অগ্রগামী [নাসীর নামক] সেনাসমূহের (চরণাঘাতোত্থিত] ধূলিপটলে দশদিক্ আচ্ছন্নকারী সেনাদলকে অগ্রসর হইতে দেখিয়া, তাহার ইয়ত্তা করিতে না পারিয়া, তাহাকে [পুরাণপ্রসিদ্ধ অসংখ্য] মান্ধাতৃ-সৈন্যের সংমিশ্রণ [ব্যতিকর] মনে করিয়া, মহেন্দ্র [ভয়ে] চক্ষু নিমীলিত করিয়াছিলেন; [কিন্তু] সেই সেনাদল যুদ্ধবাসনায় পুলকিতগাত্র হইলেও, তাহাদের পক্ষে [ধর্ম্মপাল] রাজার শত্ৰুকুলক্ষয়কারী বাহুযুগলের সাহায্য করিবার অবকাশ উপস্থিত হয় নাই।[১২]

(১২)

তিনি মনোহর ভ্রূভঙ্গি-বিকাশে [ইঙ্গিতমাত্রে] ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তি, গন্ধার, এবং কীর[১৩] প্রভৃতি বিভিন্ন জনপদের [সামন্ত?] নরপালগণকে প্রণতি-পরায়ণ-চঞ্চলাবনত-মস্তকে সাধু সাধু বলিয়া কীর্ত্তন করাইতে করাইতে, হৃষ্টচিত্ত পাঞ্চালবৃদ্ধকর্ত্তৃক মস্তকোপরি আত্মাভিষেকের স্বর্ণকলস উদ্ধৃত করাইয়া, কন্যকুব্জকে [অভিষিক্ত করাইয়া] রাজশ্রী প্রদান করিয়াছিলেন।[১৪]

(১৩)

সীমান্তদেশে গোপগণকর্ত্তৃক, বনে বনেচরগণকর্ত্তৃক, গ্রামসমীপে জনসাধারণকর্ত্তৃক, [গৃহ] চত্বরে ক্রীড়াশীল শিশুগণকর্ত্তৃক, প্রত্যেক ক্রয়বিক্রয়স্থানে বণিক্‌সমূহ (?) কর্ত্তৃক, এবং বিলাসগৃহের পিঞ্জরস্থিত শুকগণকর্ত্তৃক গীয়মান আত্মস্তব শ্রবণ করিয়া, [এই নরপতির] বদনমণ্ডল লজ্জাবশে নিয়ত ঈষৎ বক্রভাবে বিনম্র হইয়া রহিয়াছে।[১৫]

যেখানে[১৬] ভাগীরথী-প্রবাহ-প্রবর্ত্তমান নানাবিধ [নৌবাটক[১৭]] রণতরণী [সুবিখ্যাত] সেতুবন্ধনিহিত শৈলশিখরশ্রেণীরূপে [লোকের মনে] বিভ্রমের উৎপাদন করিয়া থাকে,—যেখানে নিরতিশয় ঘনসন্নিবিষ্ট [ঘনাঘন-নামক[১৮]] রণকুঞ্জর-নিকর [জলদজালবৎ প্রতিভাত হইয়া] দিনশোভাকে শ্যামায়মান করিয়া, [লোকের মনে] নিরবচ্ছিন্ন জলদসময়-সমাগম-সন্দেহের উৎপাদন করিয়া থাকে,—যেখানে উত্তরাঞ্চলাগত অগণ্য [মিত্র] রাজন্য-কর্ত্তৃক [প্রাভৃতীকৃত[১৯]] উপঢৌকনীকৃত অসংখ্য অশ্বসেনার প্রখর-খুরোৎক্ষিপ্ত-ধূলিপটল-সমাবেশে দিঙ্মণ্ডলের অন্তরাল নিরন্তর ধূসরিত হইয়া থাকে,—যেখানে রাজরাজেশ্বর-সেবার্থ-সমাগত সমস্ত জম্বূদ্বীপাধিপতিগণের অনন্ত-পদাতি-পদভরে[২০] বসুন্ধরা অবনত হইয়া থাকে,—সেই পাটলিপুত্রনগর-সমাবাসিত-শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবার হইতে, পরম সুগত-[বুদ্ধ]-মতাবলম্বী মহারাজাধিরাজ শ্রীগোপালদেবের পাদানুধ্যান-পরায়ণ, পরমেশ্বর পরমভট্টারক[২১] মহারাজাধিরাজ কুশলী[২২] শ্রীমান্ ধর্ম্মপালদেব শ্রীপুণ্ড্রবর্দ্ধন-“ভুক্তির” অন্তঃপাতি, ব্যাঘ্রতটী-“মণ্ডলের” অন্তর্ভুক্ত, মহন্তাপ্রকাশ নামক “বিষয়ের”[২৩] অন্তর্গত ক্রৌঞ্চশ্বভ্র নামক গ্রাম।[২৪] ইহার সীমা,—পশ্চিমে “গঙ্গিনিকা”,[২৫] উত্তরে “কাদম্বরী-দেবকুলিকা”[২৬] ও খর্জ্জূরবৃক্ষ। পূর্ব্বোত্তরে রাজপুত্র দেবট কৃত “আলি”,[২৭] [এই আলি] “বীজপূরকে”[২৮] গিয়া প্রবিষ্ট হইয়াছে। পূর্ব্বদিকে বিটক-কৃত “আলি”, তাহা[২৯] খাটক-যানিকাতে গিয়া প্রবেশ করিয়াছে।[৩০] [তাহার পর] জম্বূ যানিকা[৩১] আক্রমণ করিয়া [তন্নিকটবর্ত্তী হইয়া] জম্বূ-যানক পর্য্যন্ত গিয়াছে। তথা হইতে নিঃসৃত হইয়া, পুণ্যারাম-বিল্বার্দ্ধস্রোতিকা পর্য্যন্ত গিয়াছে। তথা হইতে নিঃসৃত হইয়া, নলচর্ম্মটের উত্তর সীমা পর্য্যন্ত গিয়াছে। নলচর্ম্মটের দক্ষিণে নামুণ্ডি-কায়িকা হইতে খণ্ডমুণ্ডমুখ পর্য্যন্ত, খণ্ডমুণ্ডমুখ হইতে বেদস-বিল্বিকা, তাহার পরে রোহিতবাটী-পিণ্ডারবিটি-জোটিকা-সীমা, উক্তারযোটের দক্ষিণ এবং গ্রামবিল্বের দক্ষিণ পর্য্যন্ত দেবিকা সীমাবিটি ধর্ম্মাযোজোটিকা। এই প্রকার মাঢ়াশাল্মলী নামক গ্রাম। তাহার উত্তরেও গঙ্গিনিকার সীমা; তাহার পূর্ব্বে অর্দ্ধস্রোতিকার সহিত [মিলিত হইয়া] আম্রযানকোলার্দ্ধযানিকা পর্য্যন্ত গিয়াছে। তাহার দক্ষিণে কালিকাশ্বভ্র, তথা হইতেও নিঃসৃত হইয়া, শ্ৰীফলভিষুক পর্য্যন্ত গিয়াছে, তাহার পশ্চিমে [গিয়া] বিল্বঙ্গর্দ্ধস্রোতিকার গঙ্গিনিকায় গিয়া প্রবিষ্ট হইয়াছে। পালিতকের সীমা দক্ষিণে কাণা-দ্বীপিকা, পূর্ব্বে কোণ্ঠিয়া-স্রোতঃ, উত্তরে গঙ্গিনিকা, পশ্চিমে জেনন্দায়িকা[৩২] এই গ্রামের শেষ সীমায় পরকর্ম্মকৃদ্বীপ,[৩৩] স্থালীক্কট-“বিষয়ের” অধীন আম্রষণ্ডিকা-“মণ্ডলের” অন্তর্গত গো-পিপ্পলীগ্রামের সীমা,—পূর্ব্বে উড্রগ্রামমণ্ডলের পশ্চিম সীমা, দক্ষিণে জোলক, পশ্চিমে বেসানিকা নামক খাটিকা, উত্তরে উড্রগ্রামমণ্ডলেব সীমায় অবস্থিত গোপথ[৩৪] এই গ্রামচতুষ্টয়ে সুবিদিত [সমুপগত] রাজ-রাজনক,[৩৫] রাজপুত্র, রাজামাত্য, সেনাপতি, বিষয়পতি, ভোগপতি, ষষ্ঠাধিকৃত, দণ্ডশক্তি, দণ্ডপাশিক, চৌরোদ্ধরণিক, দৌঃসাধসাধনিক, দূতখোল-গমাগমিক, অভিত্বরমাণ, হস্ত্যধ্যক্ষ, অশ্বাধ্যক্ষ, গবাধ্যক্ষ, মহিষাধ্যক্ষ, ছাগাধ্যক্ষ, মেষাধ্যক্ষ, নাকাধ্যক্ষ, বলাধ্যক্ষ, তরিক, শৌল্কিক, গৌল্মিক, তদাযুক্তক, বিনিযুক্তক, প্রভৃতি রাজপাদোপজীবিসকল,—এবং অকথিত আরও চাটভটজাতীয় যথাকালবাস্তব্য লোকসকল; জ্যেষ্ঠকায়স্থ মহামহত্তর দাশগ্রামিক প্রভৃতি বিষয়ব্যবহারী সকল; করণ ও প্রতিবাসী ক্ষেত্রকরসকল,[৩৬] ইহাদিগকে ব্রাহ্মণসম্মানপূর্ব্বক [অর্থাৎ অগ্ৰে ব্ৰাহ্মণের সম্মান করিয়া, পরে ইহাদিগকে যথাযোগ্যভাবে সম্মান করিয়া,] জানাইতেছেন ও আজ্ঞা করিতেছেন যে,—আপনাদিগের সম্মতি হউক, মহাসামন্তাধিপতি শ্রীনারায়ণ বর্ম্মা দূতক যুবরাজ শ্রীত্রিভুবনপাল[৩৭] দ্বারা আমাদিগকে জানাইয়াছেন যে,—“মাতাপিতার ও নিজের পুণ্যাভিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আমরা “শুভস্থলী”-নামক স্থানে দেবগৃহ নির্ম্মাণ করাইয়াছি, সেই দেবগৃহ-রক্ষক লাটদেশীয় ব্রাহ্মণ[৩৮] ও দেবপূজক প্রভৃতি পাদমূল-সমেত[৩৯] [তাহাতে] প্ৰতিষ্ঠাপিত ভগবন্নন্ন-নারায়ণ[৪০] দেবের পূজোপস্থানাদি কর্ম্মের[৪১] জন্য তত্ৰত্য হট্টিকা ও তলপাটকসমেত চারিটি গ্ৰাম আপনি দান করুন।” তদনন্তর আমি, তদীয় বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, তলপাটক ও হট্টিকাসমেত উপরি লিখিত এই চারিটি গ্ৰাম স্বসীমা পর্য্যন্ত যথোদ্দেশে দশাপচারের[৪২] সহিত, কোন কর ধার্য্য না করিয়া, [অৰ্থাৎ বিনা করে] সকল উৎপাত দূর করিয়া, “ভূমিচ্ছিদ্র-ন্যায়ানুসারে” চন্দ্ৰ, সূর্য্য ও পৃথিবীর অবস্থানকাল পর্য্যন্ত [নারায়ণ বর্ম্মা যেরূপভাবে প্ৰাৰ্থনা করিয়াছিলেন] সেইরূপেই প্ৰতিষ্ঠাপন করিলাম। আপনারা সকলেই ভূমির দানফলগৌরব ও তদপহরণে মহানরকপাতাদি ভয় [স্মরণ করিয়া] এই দান অনুমোদন করিয়া পরিপালন করিবেন। প্ৰতিবাসী ক্ষেত্ৰকর সকল [এই রাজ] আজ্ঞা শ্রবণ করিয়া, সমুচিত করপিণ্ডকাদি[৪৩] সর্ব্বপ্ৰকাৰ প্ৰদেয় বস্তু [পূর্ব্বোক্ত দেবসেবাৰ্থ] প্ৰদান করুক।

সগর প্রভৃতি বহু রাজগণ ভূমিদান করিয়া গিয়াছেন; যখন যে রাজা ভূমির অধিপতি হন, তখন তাঁহারই ফল হয়॥১৪॥[৪৪]

ভূমিদানকর্ত্তা ষষ্টিসহস্ৰ বৎসর স্বৰ্গভোগ করেন। দত্তভূমির হরণকারী ও হরণ বিষয়ের অনুমোদনকারী তৎ[পরিমিত]কাল পৰ্য্যন্ত নরকভোগ করেন॥১৫॥

যিনি স্বদত্ত অথবা পরদত্ত ভূমি হরণ করেন, তিনি পিতৃগণের সহিত, বিষ্ঠার কৃমি হইয়া, নরকযন্ত্ৰণা ভোগ করেন॥১৬॥

লক্ষ্মী ও মনুষ্যজীবন পদ্ম (কমল) পত্রস্থিত জলবিন্দুর ন্যায় চঞ্চল;—ইহা এবং পূর্ব্বোক্ত বাক্য সকল স্মরণ করিয়া, পরকীর্ত্তির বিলোপসাধন করা কোন পুরুষেরই কর্ত্তব্য নহে॥১৭॥

লক্ষ্মী বিদ্যুতের ন্যায় চঞ্চলা, মনুষ্যশরীর দীপশিখার ন্যায় ক্ষণস্থায়ী, সংসার দুঃখবহুল, পরকীর্ত্তি নষ্টকারীর অযশঃ ও নিয়ত পরকীর্ত্তি রক্ষাকারীর যশঃ, চন্দ্ৰসূর্য্যের স্থিতিকালপর্য্যন্ত স্থায়ী—এই সকল কথা মনে করিয়া, ভবিষ্যৎ রাজগণ যাহা অভিরুচি হয় করিবেন; অধিক বাক্যব্যয়ে ফল নাই॥১৮॥

অভিবর্দ্ধমান-বিজয়রাজ্য-সংবৎসর ৩২, অগ্ৰহায়ণ মাসের দ্বাদশ দিবসে॥[৪৫]

ভোগটের পৌত্ৰ, সুভটের পুত্ৰ, গুণশালী তাতটকর্ত্তৃক ইহা উৎকীৰ্ণ হইল॥১৯॥


মূল পাঠের টীকা


^٭ ওঙ্কার বলিয়া যাহা পঠিত হইতেছে, তাহা একটি মাঙ্গলিক চিহ্ণরূপে উৎকীর্ণ আছে।

^(১) বসন্ততিলক।

^(২) মালিনী। এই শ্লোকের “বারিরাশি” শব্দের পর বিসর্গ-চিহ্ন ব্যবহৃত হয় নাই, “শশধর” শব্দের পূর্ব্বে একটি শ্-অক্ষর সংযুক্ত হইয়াছে।

^(৩) অনুষ্টুভ্।

^(৪) শাৰ্দ্দূল-বিক্রীড়িত। এই শ্লোকের “করংগ্রাহিতঃ” মূল লিপিতে “করঙ্গ্রাহিতঃ” রূপে উৎকীর্ণ আছে। “গৌড়ের ইতিহাসে” তাহাই “করোগ্রাহিতঃ” রূপে মুদ্রিত হইয়াছে। এই গ্রন্থের মুদ্রিত পাঠে কত ভ্রমপ্রমাদ আছে, বাহুল্যভয়ে তাহা উল্লিখিত হইল না।

^(৫) শাৰ্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(৬) স্রগ্ধরা।

^(৮) মন্দাক্রান্তা।

^(৯) অনুষ্টুভ্। এই শ্লোকের “অনির্বৃতি”-শব্দকে “অনির্বৃত্তি” রূপে পাঠ করিবার জন্য অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ নির্দ্দেশ করিয়াছেন। অতীতকাল-বিজ্ঞাপক [প্রজজ্বাল] ক্রিয়াপদের সহিত অন্বিত “অনির্বৃতি”-শব্দ কোনরূপ সঙ্গত অর্থ দ্যোতিত করিতে পারে কি না, তাহা চিন্তনীয়।

^(১০) শাৰ্দ্দূল-বিক্রীড়িত।

^(১১) স্রগ্ধরা।

^(১২) স্রগ্ধরা। এই শ্লোকে “কান্যকুব্জ”-শব্দ মূললিপিতে “কন্যকুব্জ” রূপে উৎকীর্ণ আছে। “दत्तः श्रीकन्यकुब्जः” লিপিকর-প্রমাদ বলিয়াই বোধ হয়। “दत्तश्रीः कन्यकुब्जः” পাঠ গ্রহণ করিলে, অর্থ-সঙ্গতি রক্ষিত হইতে পারে। এক সময়ে “কান্যকুব্জ” যে “কন্যকুব্জ” রূপেই লিখিত হইত, অন্যান্য তাম্রশাসনেও তাহা দেখিতে পাওয়া যায়। অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ তাহার উল্লেখ না করিয়া, এখানে ‘কন্যকুব্জকে’ কান্যকুব্জ পাঠ করিবার উপদেশ দিয়া গিয়াছেন। কিন্তু কন্যকুব্জ-পাঠ লিপিকর-প্রমাদের নিদর্শন বলিয়া স্বীকার করা যায় না। ‘কন্যকুব্জ’ই এখন ‘কনোজ’ হইয়া পড়িয়াছে; আকারটি যে কত কাল বিলুপ্ত হইয়াছে, তাম্রশাসনের পাঠে তাহারই ঐতিহাসিক তথ্য প্রকটিত হইয়া রহিয়াছে।

^(১৩) শাৰ্দ্দূল-বিক্রীড়িত। এই শ্লোকের “মানপৈঃ” শব্দ “মানবৈঃ” হইতে পারে বলিয়া অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ অনুমান করিয়াছেন। প্রথম চরণে “জনৈঃ”-শব্দ থাকায়, পরবর্ত্তী চরণে তুল্যার্থবোধক “মানবৈঃ”-শব্দ প্রযুক্ত হইবার সম্ভাবনা অল্প। “মানপঃ”-শব্দ সংজ্ঞা-শব্দরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়াই বোধ হয়।

^٭১ অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ “नौकाध्यक्ष” পাঠ-যোজনা করিয়া গিয়াছেন; তদপেক্ষা “नाकाध्यक्ष” পাঠ যোজনা করিলেই ভাল হয়। কারণ, কিঞ্চিৎ পরেই আবার “तरिक” রহিয়াছে।

^٭২ অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ “प्रत्ययोपनयः” পাঠ মুদ্রিত করিয়াছেন। (উইকিসংকলন টীকা: কিল্‌হর্ণের পাঠে প্রত্যায়োপনয়ঃ-ই আছে। এখানে দেখুন।)

^(১৪) অনুষ্টুভ্।

^(১৫-১৬) অনুষ্টুভ্।

^(১৭) পুষ্পিতাগ্রা।

^(১৮) শিখরিণী।

^(১৯) অনুষ্টুভ্।


প্রশস্তি-পরিচয় ও অনুবাদ-অংশের টীকা
J. A. S. B. Vol. LXIII, Part I, p. 39.
Epigraphia Indica, Vol. IV, p. 243. অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ যে সকল তাম্রশাসনের পাঠ ও ব্যাখ্যা প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে তাঁহার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য চিরস্মরণীয় হইয়া রহিবে। উত্তরকালে যাঁহারা এই কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিতেছেন বা করিবেন, তাঁহাদিগকে মুক্তকণ্ঠে পরলোকগত অধ্যাপক মহাশয়ের নিকট নানা বিষয়ে ঋণ স্বীকার করিতে হইবে। এই লেখমালা সঙ্কলন করিবার সময়ে তাঁহার প্রকাশিত পাঠ ও ব্যাখ্যা অনেক স্থলেই পথপ্রদর্শকরূপে প্রভূত উপকার সাধন করিয়াছে। যেখানে মত-পার্থক্য ঘটিয়াছে, সেই সকল স্থলে অধ্যাপক কিল্‌হর্ণের ব্যাখ্যা বা মন্তব্য উদ্ধৃত এবং আলোচিত হইয়াছে।
In the Khàlimpur inscription, Dharamapāla is described as স্তূপমানাবদাতঃ i.e., he was fair and as high as a stupa.—Pandita Sástri in the Introduction (p. 6) to the Rāmacarita in the Memoirs of the Asiatic Society of Bengal, Vol III, No. I.
I must just mention here that surely Mr. Batavyāl has been rather rash in stating that the grant recorded in this inscription was made in favour of the poet Bhatta Náráyána—Prof. Kielhorn in Epigraphia Indica, Vol. IV, p. 243 Note.
“বহু-মারকুলোপলম্ভা”-শব্দটি “দিশো” এই কর্ম্মপদের বিশেষণ বলিয়া বোধ হয়। তদনুসারে “বহুমার কুলের উপলম্ভ (উপলব্ধি) হয় যাহাতে”—এইরূপ বহুব্রীহি সমাস সূচিত হইতে পারে। “বজ্রাসন-সাধনা” নামক বৌদ্ধতন্ত্র হইতে অধ্যাপক ফুসে কর্ত্তৃক উদ্ধৃত বজ্রাসন-বুদ্ধের ধ্যানে
“चतुर्म्मार-संघटित-महासिंहासनवरं तदुपरि विश्वपद्मवज्रे वज्रपर्य्यङ्कसंस्थितं”

এইরূপ বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়। শাক্যসিংহকে সাধনপথ হইতে বিচলিত করিবার জন্য [স্কন্ধ, ক্লেশ, মৃত্যু এবং দেবপুত্র নামক] “চতুর্ম্মার” পুনঃ পুনঃ বলপ্রকাশ করিয়া পরাভূত হইবার কথা বৌদ্ধ-সাহিত্যে প্রসিদ্ধ আছে। কালিকা পুরাণে [ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৩০-৫৫ শ্লোকে] মারগণোৎপত্তির যে আখ্যায়িকা দেখিতে পাওয়া যায়, তদনুসারে মারসৈন্য অসংখ্য। এই শ্লোকে বৌদ্ধসাহিত্য বিশ্রুত “চতুর্ম্মার”, অথবা কালিকাপুরাণোক্ত “বহুমার” সূচিত হইয়াছে, তাহা চিন্তণীয়।

दान-शील-क्षमा-वीर्य्य-ध्यान-प्रज्ञा बलानि च।
उपायः प्रणिधि-ज्ञानं दशबुद्धबलानि वै॥

अङ्गानि वेदा श्चत्वारो मीमांसा न्याय विस्तरः।
धर्म्मशास्त्रं पुराणञ्च विद्या ह्येता श्चतुर्द्दश॥
आयुर्व्वेदो धनुर्व्वेदो गान्धर्व्वश्चेति ते त्रयः।
अर्थशास्त्रं चतुर्थञ्च विद्या ह्यष्टादशैव तु॥

বিষ্ণুপুরাণোক্ত এই অষ্টাদশবিদ্যা সূচিত করিবার জন্যই “সর্ব্ববিদ্যাবদাত” বিশেষণটি প্রযুক্ত হইয়া থাকিতে পারে। “সর্ব্ববিদ্যার” মধ্যে “ধনুর্বিদ্যা” অবশ্যই অন্তর্নিবিষ্ট থাকিবে। সুতরাং দয়িতবিষ্ণুর তাহাতেও অধিকার থাকা বুঝিতে হইবে। কিন্তু “রামচরিতের” ভূমিকায় মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এম-এ দয়িতবিষ্ণু সম্বন্ধে লিখিয়াছেন—He was not even a military man. এরূপ সিদ্ধান্ত করিবার কারণ কি, তাহা উল্লিখিত হয় নাই। পক্ষান্তরে সর্ব্ববিদ্যার উল্লেখ থাকায়, তাহা হইতে ধনুর্বিদ্যাকে বর্জ্জন করিবার কারণ দেখিতে পাওয়া যায় না।
‘মাৎস্য ন্যায়’ সংস্কৃত সাহিত্যে সুপরিচিত একটি লৌকিক ন্যায়। তাহার অর্থ,—দুর্ব্বলের প্রতি সবলের অত্যাচারজনিত অরাজকতা। উদাসীন শ্রীরঘুনাথবর্ম্ম বিরচিত “লৌকিক ন্যায়সংগ্রহ” গ্রন্থে “মাৎস্য ন্যায়” এইরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। যথা—
“प्रबल-निर्बल विरोधे सबलेन निर्बल-बाधविवक्षायां तु मात्स्यन्यायावतारः। अयं प्रायः इतिहास-पुराणादिषु दृश्यते, यथाहि वासिष्टे प्रह्लादाख्याने तत्समाधिं प्रस्तुत्योक्त्रम्,—
एतावताय कालेन तद्रसातल-मण्डलं।
बभूवाराजकं तीक्ष्णं मात्स्यन्याय-कदर्थितम्॥
यथा—प्रबला मत्स्या निर्ब्बलां स्तान्नाशयन्तिस्मेति न्यायार्थः।”
অধ্যাপক বোধলিঙ্গ একটি কারিকা উদ্ধৃত করিয়া দেখাইয়াছেন যথা—

“परस्परामिषतया जगतो भिन्नवर्त्मनः।
दण्डाभावे परिध्वंसी मात्स्यो न्यायः प्रवर्त्तते॥”
—Von Bohtlingk’s Inde Spruche.
বঙ্গদেশে এক সময়ে এইরূপ ‘মাৎস্য ন্যায়’ প্রবর্ত্তিত হইলে, প্রজাপুঞ্জ তাহা দূরীভূত করিয়া, গোপালদেবকে রাজা নির্ব্বাচিত করিয়াছিল। গোপালদেবের পুত্র ধর্ম্মপালদেবের তাম্রশাসনের এই বিবরণটি তারানাথের গ্রন্থেও উল্লিখিত আছে। ইহা বাঙ্গালার ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ঘটনা। ‘মাৎস্য ন্যায়ের’ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া, “রামচরিতের” ভূমিকায় মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এম্ এ লিখিয়াছেন—“to escape from being absorbed into another kingdom or to avoid being swallowed up like a fish.”

অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ দেদ্দদেবীকে ভদ্র নামক এক রাজার কন্যা বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। তিনি তাহার কোনরূপ প্রমাণের উল্লেখ করেন নাই। এখানে কোন ঐতিহাসিক তথ্য প্রকটিত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয় না, এখানে কেবল পৌরাণিক আখ্যায়িকাই সূচিত হইয়াছে।
পুরাতন বঙ্গলিপির ‘যকার’ এবং ‘পকার’ দেখিতে একরূপ বলিয়াই, অর্থসঙ্গতির প্রতি লক্ষ্য না করিয়া, কেহ কেহ স্তূয়মানকে ‘স্তূপমান’ পাঠ করিয়া থাকিবেন।
কেবল ‘রাম’ বলিলে পুরাণপ্রসিদ্ধ তিন ব্যক্তি সূচিত হইতে পারেন বলিয়া, এখানে রাম-শব্দের সঙ্গে ‘রাঘব’ শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে।
এই শ্লোকে এবং ইহার পরবর্ত্তী শ্লোকে ধর্ম্মপালের শাসন সময়ের দুইটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা সূচিত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়। একটি ঘটনা কান্যকুব্জাধিপতি ইন্দ্র [মহেন্দ্র] নামক নরপতির ধর্ম্মপালের হস্তে পরাজয়; অপর ঘটনা মহেন্দ্রের রাজ্যে ধর্ম্মপালকর্ত্তৃক চক্রায়ুধ নামক সামন্ত-নরপালের অভিষেক। মহেন্দ্র ধর্ম্মপালকে অসংখ্য সেনাবল লইয়া অগ্রসর হইতে দেখিয়া, যুদ্ধে পরাভব অনিবার্য্য মনে করিয়া, এতদূর বিহ্বল হইয়াছিলেন যে, ধর্ম্মপালের অসংখ্য সেনাবল যুদ্ধার্থ উৎসুক থাকিলেও, তাহাদিগকে রণশ্রম স্বীকার করিতে হয় নাই,—ধর্ম্মপাল রাজধানীতে উপনীত হইবামাত্রই তাহা অধিকার করিতে পারিয়াছিলেন। এই শ্লোকের মহেন্দ্র শব্দকে দেবরাজ ইন্দ্র বলিয়া গ্রহণ করিয়া, অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ ইন্দ্রের সহিত মান্ধাতার সখ্য প্রভৃতি পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণা করিতে গিয়া, ব্যতিকর শব্দের ভিন্নার্থ গ্রহণে একটি ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। স্বর্গীয় বটব্যাল মহাশয়ের ব্যাখ্যাকেও মূলানুগত বলিয়া গ্রহণ করিবার উপায় নাই। তিনিও পাদটীকায় মান্ধাতার সহিত ইন্দ্রের সখ্যের ইঙ্গিত করিয়া লিখিয়া গিয়াছেন,—The God Indra, when suddenly he sees the ten quarters of the globe whitened by the dust raised by the vanguard of his army, and fancies it to be the approach of the army of Mandhata, shuts his eyes and ponders. But there is no occasion today for his all conquering arms rendering the assistance of his warlike troops to Indra এবং অর্থটি সুব্যক্ত করিবার অভিপ্রায়ে পাদটীকায় লিখিয়া গিয়াছেন,—The meaning of the text is that, under the sway of Dharmapála the enemies of the Gods had ceased to exist. এই শ্লোকের ‘মহেন্দ্র’-শব্দ কান্যকুব্জাধিপতিকে না বুঝাইয়া, মান্ধাতৃ-বন্ধু দেবরাজ ইন্দ্রকে বুঝাইলে, তাঁহার পক্ষে মান্ধাতৃ-সৈন্যের [ব্যতিকরে] ‘চকিত’ হইয়া ‘ধ্যানতন্দ্রী’ ধারণ করিবার কারণ থাকিতে পারে না। এখানে ‘ব্যতিকর’-শব্দটি সংমিশ্রণ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়াই বোধ হয়।
ভোজ মৎস্যাদি দেশ সম্বন্ধে অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ লিখিয়া গিয়াছেন,—Kányakubja itself was in the country of the Pánchàlas in Madhyadesha. According to the topographical list of the Brihatsamhitá, the Kurus and Matsyas also belong to the middle country, the Madras to the North-West, the Gandháras to the northern and the Kiras to the North-East division of India. The Avantis are the people of Ujjayini in Málava. Yadus, according to the Lakkha Mandal Prasasti, were long ruling in part of the Punjab, but they are found also south of the Jamuná; and south of this river and north of the Narmadá probably were also the Bhojas who head the list — Epigraphia Indica Vol. IV, p. 246.
শ্রীধর্ম্মপালদেব [কান্যকুব্জেশ্বর] ইন্দ্ররাজকে পরাভূত করিয়া তাঁহার [মহোদয় নামক] কান্যকুব্জ-রাজ্যে চক্রায়ুধ নামক আপন সামন্তনরপালকে অভিষিক্ত করিবার কথা নারায়ণপালদেবের [ভাগলপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে [৩য় শ্লোকে] উল্লিখিত আছে। ধর্ম্মপাল কান্যকুব্জের স্বাধীনতা হরণ করিয়াও, তাহার জন্য একজন স্বতন্ত্র রাজা নিযুক্ত করায়, কান্যকুব্জ পুনরায় রাজশ্রী প্রাপ্ত হইয়াছিল; এবং [তদ্দেশের নিকটবর্ত্তী] অন্যান্য জনপদের নরপালগণও সাধু সাধু বলিয়া তৎকার্য্যের সাধুবাদ করিয়াছিলেন।
ধর্ম্মপাল কিরূপ লোকপ্রিয় ছিলেন, এই শ্লোকে তাহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। পরবর্ত্তীকালে বরেন্দ্রমণ্ডলের ঘরে ঘরে মহীপালের গীত প্রচলিত হইয়াছিল। হয়ত একসময়ে ধর্ম্মপালের গীতও সেই ভাবে সকল স্থানেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই শ্লোক ভিন্ন, তাহার অন্য কোনরূপ উল্লেখ সাহিত্যে বা জনশ্রুতিতে বর্ত্তমান নাই। এই শ্লোকের “मानप” শব্দ অপরিচিত, এবং “त्रपाविवलितानम्रं” একটি উল্লেখযোগ্য রচনা-মাধুর্য্যের নিদর্শন। বটব্যাল মহাশয় ইহাকে “त्रपाविचलितानम्रं” পাঠ করায়, ইহা একটি রচনা-দোষের নিদর্শন বলিয়াই প্রতিভাত হইয়াছিল। অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ প্রকৃত পাঠ মুদ্রিত করিবার পরেও, বটব্যাল মহাশয়ের উদ্ধৃত পাঠই “গৌড়ের ইতিহাসে” মুদ্রিত হইয়াছে। সজ্জনগণ লজ্জায় “বিবলিত” হইতে পারেন; কিন্তু [কাহারও পক্ষেই] লজ্জায় “বিচলিত” হইবার সম্ভাবনা নাই। “त्रपाविवलितानम्रं सदैवाननं” ব্যাখ্যা করিবার জন্য অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ লিখিয়া গিয়াছেন,—“He always bashfully turns aside and bows down his face”.—Epigraphia Indica Vol. IV., P. 252.
পালবংশীয় নরপালগণের সকল তাম্রশাসনেই [বংশবিবৃতিসূচক শ্লোকাবলীর শেষে] এই গদ্যাংশের আরম্ভ দেখিতে পাওয়া যায়, এবং ইহাতেই তাঁহাদের “জয়স্কন্ধাবারের” পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু এই গদ্যাংশে অপ্রচলিত সংজ্ঞাশব্দের বাহুল্য এবং লিপিকর-প্রমাদের আতিশয্য বর্ত্তমান থাকায়, এপর্য্যন্ত কোন ভাষায় ইহার আদ্যন্তের মূলানুগত অনুবাদ প্রকাশিত হইতে পারে নাই। প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় মদনপালদেবের [মনহলিগ্রামে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনের একটী সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ “সাহিত্যপরিষৎ-পত্রিকায়” [১৩০৫ সালের দ্বিতীয় সংখ্যার ১৫৬-১৫৭ পৃষ্ঠায়] প্রকাশিত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। নানা কারণে, তাহাকে মূলানুগত অনুবাদ বলিয়া স্বীকার করিতে সাহস হয় না।
পালবংশীয় নরপালগণের কোন কোন তাম্রশাসনে “নৌবাটক” এবং কোন কোন তাম্রশাসনে “নৌবাট”-শব্দ উৎকীর্ণ আছে। নারায়ণপালদেবের [ভাগলপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনের গদ্যাংশের ইংরাজি অনুবাদসাধনে প্রবৃত্ত হইয়া, ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র “নৌবাটক” শব্দের “নৌ-সেতু” অর্থ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। ডাক্তার হুল্‌জ্ তৎপ্রতি কটাক্ষ করিয়া, সে ব্যাখ্যা গ্রহণ করিতে না পারিয়া, [Indian Antiquary vol. XV., p. 309, Note 29] লিখিয়া গিয়াছেন,—“R. Mitra concludes from this passage that Náráyanapáladeva had made a bridge of boats across the Ganges. But the two words pravartamána and nánávidha render this explanation inadmissible. The panegyrist merely wants to say that the broad line of boats floating on the river resembled the famous bridge of Ráma. অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ “নৌবাটক”-শব্দকে বিজয়সেনদেবের [দেওপাড়ায় আবিষ্কৃত] প্রস্তরলিপির [২২ শ্লোকের] “নৌ-বিতান”-শব্দের তুল্যার্থ-বোধক মনে করিয়া, [Epigraphia Indica, Vol. IV., p. 252] “নৌ-সেতু”—অর্থ গ্রহণ করিতে অসমর্থ হইয়া, লিখিয়া গিয়াছেন,—“where the manifold fleets of boats, proceeding on the path of the Bhágirathi, make it seem as if a series of mountain-tops had been sunk to build another (?) causeway (for Ráma’s passage)” আদ্যন্তের সমালোচনা করিলে, “নৌ-সেতু” অর্থ গ্রহণ করিবার আকাঙ্ক্ষা উপস্থিত হয় না। “বাট” বা “বাটক” শব্দ “অমরকোষে” স্থান প্রাপ্ত হয় নাই। “বাট”-শব্দ [পুরুষোত্তমদেব-কৃত] “ত্রিকাণ্ড শেষে” এবং [হেমচন্দ্র-কৃত] “অভিধান-চিন্তামণিতে” যথাক্রমে
“वाटः पथश्च मार्गश्च,”
এবং
“वाटः पथि वृतौ वादं,”

বলিয়া উল্লিখিত থাকিলেও, “নৌবাটক”-শব্দকে “নৌপথ” বলিয়া ব্যাখ্যা করা যায় না। বাঙ্গালীর “নৌবল” চিরপরিচিত। মহাকবি কালিদাস বাঙ্গালীকে “নৌসাধনোদ্যতান্” বলিয়া তাহার পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। পালবংশীয় নরপালগণ বাঙ্গালী বলিয়া, তাঁহাদের “জয়স্কন্ধাবারে” হস্ত্যশ্বপদাতিবলের ন্যায় “নৌবলও” দেখিতে পাওয়া যাইত; এবং রাজ-কবি তজ্জন্যই “নৌবাটক”-শব্দের ব্যবহারে তাহার পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। ইহাই যে “নৌবাটক”-শব্দের প্রকৃত অর্থ, সৌভাগ্যক্রমে বৈদ্যদেবের [কমৌলিগ্রামে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে [একাদশ শ্লোকে] উল্লিখিত [নৌযুদ্ধ-বর্ণনায় ব্যবহৃত] “नौवाट हीहीरव” তাহার পরিচয় প্রদান করিতেছে। নৌবাট, নৌবিতান প্রভৃতি শব্দ যে নৌবাহিনীর প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হইত, তাহা এইরূপে বুঝিতে পারা যায়। মুসলমান-শাসন-সময়ে এই “নৌবাট” “নওয়ারা”-নামে পরিচিত হইয়াছিল। “নওয়ারা”-শব্দ এখনও অপ্রচলিত হয় নাই; কিন্তু তৎপূর্ব্ববর্ত্তী “নৌবাট”-শব্দ একেবারে অপ্রচলিত হইয়া পড়িয়াছে!

“ঘনাঘন”-শব্দে এক শ্রেণীর হস্তী সূচিত হইয়াছে। সেকালে এক শ্রেণীর রণদুর্ম্মদ ঘাতুক মত্ত হস্তী প্রতিপালিত হইত; তাহাই “ঘনাঘন”-নামে সুপরিচিত ছিল। ধরণি-কোষে তাহা
“आन्योन्यघट्टने चैव घातुके च घनाघनः”

বলিয়া উল্লিখিত আছে। অমর-কোষের নানার্থবর্গেও [৩৷৩৷১২০] সেই অর্থ সূচিত হইয়াছে। এই “ঘনাঘন”-নামক হস্তীর ব্যূহকে “ঘটা” বলিত। অমর-কোষে [২৷৮৷১০৭]

“करिणां घटनं घटा”

বলিয়া তাহা উল্লিখিত আছে। সেই অর্থে কথাসরিৎসাগরে [১৯৷১০৯] “গজেন্দ্র-ঘটা” ব্যবহৃত হইয়াছে। “ঘনাঘন-ঘটা,” ঘনঘটার ন্যায় প্রতিভাত হইয়া, জয়স্কন্ধাবারের দিনশোভাকে শ্যামায়মান করিয়া রাখিত বলিয়া, লোকের মনে বর্ষাসমাগমের সন্দেহ উপস্থিত হইত।

অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ এবং বটব্যাল-ধৃত এই তাম্রশাসনের “প্রভৃতীকৃত” শব্দ লিপিকর প্রমাদের নিদর্শন। প্রকৃত পাঠ—“প্রাভৃতীকৃত”। তাহার অর্থ—“উপঢৌকনরূপে উপহৃত”। অমরকোষে [২৷৮৷২৭] “প্রাভৃত”-শব্দ
“प्राभृतं तु प्रदर्शनं”

বলিয়া উল্লিখিত আছে। দেবতাকে বা মিত্ররাজাকে যাহা উপহাররূপে প্রদান করা যায়, তাহারই নাম “प्राभ्रतं” বলিয়া ভানুজীদীক্ষিত-কৃত অমর-টীকায় ব্যাখ্যা দেখিতে পাওয়া যায়। উত্তরাঞ্চলের রাজন্যগণ পালবংশীয় নরপালগণকে উপঢৌকনরূপে হয়-বাহিনী “প্রাভৃতীকৃত” করিতেন; রাজকবি রচনাকৌশলে এই ঐতিহাসিক তথ্যের সন্ধান প্রদান করিয়া গিয়াছেন,—সুতরাং তৎকালে উত্তরাঞ্চলের রাজন্যবর্গ পালবংশীয় নরপালগণের মিত্র-রাজন্য মধ্যে পরিগণিত হইতেন বলিয়াই বুঝিতে হইবে।

“पादात-भर-नमदवनेः” পাঠটি মদনপালদেবের [মনহলিগ্রামে-আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে [৩০ পংক্তিতে] “पादाभर नमदवनेः” রূপে উৎকীর্ণ আছে, এবং সাহিত্যপরিষৎ-পত্রিকায় “পাদভর নমদবনেঃ” রূপে মুদ্রিত হইয়াছে। উহা লিপিকর-প্রমাদ বলিয়াই বোধ হয়। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় মুদ্রিত “ভূপালগণের অনন্ত পাদভরে” সঙ্গত ব্যাখ্যা বলিয়া স্বীকৃত হইতে পারে না। কারণ ভূপালগণ, পদব্রজে গমনাগমন করিতেন না। “পাদাত”-শব্দের অর্থ অমরকোষে [২৷৮৷৬৭] এইরূপ লিখিত আছে,—
“अथ पादातं पत्तिसंहतिः,”

তাহার অর্থ “पदातीनां समूहः” বলিয়া, ভানুজীদীক্ষিত-কৃত টীকায় উল্লিখিত আছে। এই অর্থ প্রকটিত করিবার জন্য “पादात” শব্দই ব্যবহৃত হইয়াছিল। অতি পুরাকালে “हस्त्यश्वरथपादातं” লইয়া চতুরঙ্গ সেনা গঠিত হইত। কালক্রমে রথের ব্যবহার উঠিয়া গেলে, হস্তী অশ্ব ও পদাতি মাত্রই প্রচলিত ছিল। এখানে সেই সকল সেনাঙ্গের কথাই উল্লিখিত হইয়াছে। ভাগীরথীপ্রবাহ-প্রবর্ত্তমান “নৌবাট”-সমূহ এবং “ঘনাঘন”-নামক মদমত্ত হস্তিব্যূহ রাজাধিরাজের প্রবল প্রতাপ সূচিত করিত; উ্তরাঞ্চলের প্রসিদ্ধ অশ্ব তদ্দেশের মিত্ররাজকর্ত্তৃক উপঢৌকনরূপে প্রেরিত হইয়া, তত্তদ্দেশে রাজাধিরাজের আধিপত্যের পরিচয় প্রদান করিত; এবং যাহারা [দরবার উপলক্ষে] রাজধানীতে সমাগত হইতেন, সেই সকল সামন্তরাজ অসংখ্য পদাতিসেনা-সমভিব্যাহারে সম্মিলিত হইয়া, রাজধানীর গৌরব বর্দ্ধন করিতেন। রাজকবি রচনা-কৌশলে এই সকল ঐতিহাসিক তথ্যের উল্লেখ করিয়া, রাজাধিরাজের রাজধানীর একটি অত্যুজ্জ্বল দৃশ্যপট উদ্ঘাটিত করিয়া গিয়াছেন। এই বর্ণনা কেবল পালবংশীয় নরপালগণের তাম্রশাসনেই দেখিতে পাওয়া যায়।

“राजा भट्टारको देवः” বলিয়া অমরকোষে [১৷৩৷১৩] উল্লিখিত আছে।
“कुशली श्रीमान् धर्म्मपालदेवः” কর্ত্তৃপদ। ৪৮ পংক্তিতে উল্লিখিত “मानयति बोधयति समाज्ञापयति च” ইহার ক্রিয়াপদ। অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ এবং ডাক্তার হুল্‌জ্, উভয়েই “কুশলী”-শব্দের “স্বাস্থ্য-সম্পন্ন”-অর্থ গ্রহণ করিয়া, “being in good health” বলিয়া, তাহার ইংরাজি অনুবাদ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। বটব্যাল মহাশয় ইহাকে Prosperous বলিয়া গিয়াছেন।
এখানে “বিষয়” নামক বিভাগ “মণ্ডল” নামক বিভাগের অন্তর্গত, এবং “মণ্ডল” নামক বিভাগ “ভুক্তি” নামক বিভাগের অন্তর্গত বলিয়া উল্লিখিত। পাল-সাম্রাজ্য নানা “ভুক্তিতে” বিভক্ত ছিল। তন্মধ্যে দেবপালদেবের [মুঙ্গেরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে (৩০ পংক্তিতে) “শ্রীনগর-ভুক্তির”; নারায়ণপালদেবের [ভাগলপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে [২৯ পংক্তিতে] তীরভুক্তির, এবং অন্যান্য পাল-নরপালের তাম্রশাসনে “শ্রীপুণ্ড্রবর্দ্ধন-ভুক্তি” নামে আর একটি “ভুক্তির” পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। এই তাম্রশাসনোক্ত “শ্রীপুণ্ড্রবর্দ্ধন”-ভুক্তির” অন্তর্গত “মণ্ডল”সমূহের মধ্যে ব্যাঘ্রতটী-নামক একটি “মণ্ডল” ছিল, তদন্তর্গত “বিষয়”-সমূহের মধ্যে মহন্তাপ্রকাশ নামক একটি “বিষয়” ছিল, ক্রৌঞ্চশ্বভ্র গ্রাম সেই “বিষয়ের” অন্তর্গত ছিল।
এই সকল স্থানের মধ্যে “শ্রীপুণ্ড্রবর্দ্ধন-ভুক্তির” নাম “বরেন্দ্ৰ” বলিয়া সুপরিচিত হইলেও, অনেক সময়ে “বরেন্দ্রের” বাহিরেও “শ্রীপুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তি” বিস্তৃতি লাভ করিবার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ব্যাঘ্রতটী, মহন্তাপ্রকাশ পালিতক এবং ক্রৌঞ্চশ্বভ্র কোথায় ছিল, তাহা এখনও নির্ণীত হয় নাই বলিয়া, তৎসম্বন্ধে নানা তর্ক বিতর্ক প্রচলিত হইয়াছে।
“গঙ্গিনিকা”-শব্দ এখনও “গাঙ্গিনা”-নামে বরেন্দ্র-মণ্ডলে প্রচলিত আছে। মরা নদীর পুরাতন খাত এই নামে কথিত হইয়া থাকে। সুতরাং বরেন্দ্র-মণ্ডলের কোন স্থানেই “গঙ্গিনিকার” অসদ্ভাব নাই।
“দেবকুল”-শব্দ হইতে “দেউল”-শব্দ প্রচলিত হইয়াছিল। “দেবকুলিকা” শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র দেউল বা “মন্দির”। অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ “দেবকুলিকাকে” ক্ষুদ্র দেবমন্দির [Small temple] বলিয়াই ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন। নীলাম্বর বলরাম “কদম্বর” বলিয়া, তাঁহার স্ত্রী “কাদম্বরী” নামে পরিচিতা। সরস্বতীও “কাদম্বরী” নামে পরিচিতা ছিলেন। তাহার পরিচয় “মেদিনীকোষে” উল্লিখিত আছে। যথা,—
“कादम्बरस्तु दध्यग्रे मद्यभेदे नपुंसकं।
स्त्री वारुणि-परभृता भारती-सारिकासु च॥”

অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ বা বটব্যাল মহাশয় ইহার ব্যাখ্যা করেন নাই, কিন্তু এখানে “কাদম্বরী-দেবকুলিকা” একটি “সরস্বতী-মন্দিরের” পরিচয় প্রদান করিতেছে বলিয়াই বোধ হয়।

“अालिः सग्वी सेतुगलि रालि रावलि रिष्यते।”

শাশ্বত-কোষের এই নির্দ্দেশে “আলি”-শব্দের “সেতু”-অর্থ থাকিলেও, এখানে আদ্যন্তের সঙ্গে তাহার সামঞ্জস্য না থাকায়, অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ ইহাকে dike বলিয়া, এবং বটব্যাল মহাশয় embankment বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন। বরেন্দ্র-মণ্ডলে প্রচলিত “বান্ধাইল”-শব্দে “আলির” স্মৃতি চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। কোন্ রাজপুত্র দেবট এই তাম্রশাসনোক্ত “আলি” বান্ধাইয়া দিয়া স্মরণীয় হইয়াছিলেন, তাহার পরিচয় অদ্যাপি আবিষ্কৃত হয নাই।

অমরকোষে [২৷৪৷৭৮] “বীজপূরঃ”—শব্দই দেখিতে পাওয়া যায়। স্বামিকৃত টীকায় “বীজপূরক”-শব্দেরও উল্লেখ আছে। যথা,—
“फलपूरो वीजपूरः केसरी वीजपूरकः।
वीजकः केसराम्लश्च मातुलुङ्गश्च पूरकः॥”

শব্দকল্পদ্রুমে “टावा लेवु इति वङ्गभाषा” এবং “विजौरा इति हिन्दीभाषा” বলিয়া তাহার ব্যাখ্যা লিখিত আছে। অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ [কিঞ্চিৎ সংশয় প্রকাশ করিয়া] ইহাকে citron-grove, এবং বটব্যাল মহাশয় [নিঃসংশয়ে] grove of lemons বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন।

অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ সমগ্র বর্ণনাটির অনুবাদ সাধনে অসমর্থ হইয়া লিখিয়া গিয়াছেন,—From here up to the end of the description of the boundaries of the village of Kraunchasvabhra I am unable to translate the text. গ্রামাদির চতুঃসীমার উল্লেখ করিতে গিয়া, কর্ত্তৃকর্ম্মক্রিয়াপদের সুপরিচিত সমাবেশরীতি সুরক্ষিত হইতে পারে নাই, এবং সংজ্ঞাশব্দের বাহুল্যের সঙ্গে লিপিকর-প্রমাদের আতিশয্য মিলিত হইয়া, এই গদ্যাংশকে দুর্ব্বোধ করিয়া রাখিয়াছে!
বটব্যাল মহাশয় “যানিকা”-শব্দের artificial water course বলিয়া অনুবাদ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।
জম্বূ-যানিকাও water-course lined with Jambu trees বলিয়া অনূদিত হইয়াছে।
বটব্যাল মহাশয় “জৈনন্যায়িকা” পাঠ উদ্ধৃত করিয়া গিয়াছেন।
পরকর্ম্মকৃদ্বীপ burning ground of the village বলিয়া বটব্যাল মহাশয় কর্ত্তৃক ব্যাখ্যাত হইয়াছে।
সংজ্ঞা শব্দগুলির অর্থবোধ করা কঠিন। সংস্কৃত ভাষা-নিবদ্ধ তাম্রশাসনে উল্লিখিত হইলেও, সকল শব্দ সংস্কৃত ভাষার সুপরিচিত শব্দ বলিয়া বোধ হয় না। অনেক “দেশজ”-শব্দকেও সংস্কৃতের আবরণ প্রদান করা হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়। যথা,—“খাটিকা”-শব্দ “খাড়ি” হইতে পারে।
“রাজনক” শব্দটি “রাজন্যক”-শব্দের অপভ্রংশ বলিয়াই বোধ হয়।
এই সকল রাজপুরুষাদির রাজপদের ও রাজকার্য্যের বিবরণ যথাযথভাবে নির্ণয় করিবার উপায় নাই। যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে, তাহা “উপসংহারে” উল্লিখিত হইবে।
এই তাম্রশাসনে “যুবরাজ ত্রিভুবন পালের” নাম উল্লিখিত আছে। ইহা দেবপালদেবের নামান্তর কিনা, জানা যায় নাই। তজ্জন্য অনেকে অনুমান করিয়াছেন,—ধর্ম্মপালদেব বর্ত্তমান থাকিতেই, ত্রিভুবনপাল পরলোক গমন করায়, দেবপালদেব পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন! ইহার কোনরূপ প্রমাণ এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই।
লাটদেশ বর্ত্তমানে গুজরাট নামে পরিচিত।
পাদমূলিক-শব্দ পালি সাহিত্যে ভৃত্যকে সূচিত করে, এবং এখানেও পাদমূল-শব্দ সেই অৰ্থে ব্যবহৃত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়।
“নন্ন-নারায়ণ”—শব্দ নন্ননামক কোনও ব্যক্তির নামানুসারে নারায়ণের নাম করণের পরিচয় প্ৰদান করিতে পারে। এরূপ প্ৰথা এখনও প্ৰচলিত আছে। পুরাকালেও যে ইহা প্ৰচলিত ছিল, তাম্রশাসনাদিতে তাহার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। Epigraphia Indica, Vol. IV, p. 247, Note 6 দ্রষ্টব্য।
পূজা এবং উপস্থান।
দশাপচার-পাঠ সংশয়হীন বলিয়া বোধ হয় না।
অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ এই অংশের অনুবাদে লিখিয়া গিয়াছেন—
“Should make over (to the donee) the customary taxes, means of subsistence, and all other kinds of revenue.”
“যাহার যাহার যেমন ভূমিদান, তাহার তাহার তেমনি ফল” বলিয়া প্ৰাচ্যবিদ্যামহার্ণব শ্রীযুক্ত নগেন্দ্ৰনাথ বসু সাহিত্যপরিষৎ-পত্ৰিকায় [১৩০৫ সালের দ্বিতীয় সংখ্যার ১৫৭ পৃষ্ঠায়] ব্যাখ্যা করিয়াছেন কেন, তাহা বোধগম্য হয় না। এরূপ ব্যাখ্যায়, এই শ্লোকটির তাম্রশাসনে উদ্ধৃত হইবার উদ্দেশ্যই ব্যৰ্থ হইয়া যায়। ভবিষ্যৎ ভূপালবৰ্গ যাহাতে কীর্ত্তিনাশ না করেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই সকল শ্লোক উদ্ধৃত হইয়াছে; এবং প্ৰথম শ্লোকেই বলা হইয়াছে,—যিনি যখন ভূমির অধিপতি হইবেন, তিনি নিজে দান করেন নাই বলিয়া ইহা যেন নষ্ট না করেন; কারণ যিনিই দান করুন না কেন, যিনি যখন ভূমির অধিপতি থাকেন, তিনিই তখন তাহার পুণ্যফল লাভ করেন।
তারানাথের গ্রন্থে ধর্ম্ম-পালদেব দীৰ্ঘকাল রাজ্যভোগ করিবার যে কিংবদন্তী উল্লিখিত আছে, ইহাতে তাহার প্ৰমাণ প্ৰাপ্ত হওয়া যায়।

Source : গৌড়লেখমালা (প্রথম স্তবক) by অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়


ॐ  स्वस्ति [॥]
सर्व्वज्ञतां श्रियमिव स्थिर मास्थितस्य वज्रासनस्य बहुमार-कुलोपलम्भाः।
देव्या महाकरुणया परिपालितानि रक्षन्तु वो दशबलानि दिशो जयन्ति॥(১)
श्रिय इव सुभगायाः सम्भवो वारिराशि-
श्‌शशधर इव भासो विश्व माह्लादयन्त्याः।
प्रकृति रवनिपानां सन्तते रुत्तमाया अजनि दयितविष्णुः सर्व्वविद्यावदातः॥(২)
आसीदासागरादुर्व्वीं गुर्व्वीभिः कीर्त्तिभिः कृती।
मण्डयन् खण्डितारातिः श्लाघ्यः श्रीवप्यट स्ततः॥(৩)
मात्‌स्य‑न्याय मपोहितुं प्रकृतिभि र्लक्ष्म्याः करं ग्राहितः
श्रीगोपाल इति क्षितीश-शिरसां चूड़ामणि स्तत्‌सुतः।
यस्यानुक्रियते सनातन-यशोराशि र्दिशामाशये
श्वेतिम्ना यदि पौर्णमास-रजनी ज्योत्‌स्नातिभारश्रिया॥(৪)
शीतांशो रिव रोहिणी हुतभुजः स्वाहेव तेजोनिधः
सर्व्वाणीव शिवस्य गुह्यकपते र्भद्रेव भद्रात्मजा।
पौलोमीव पुरन्दरस्य दयिता श्रीदेद्ददेवीत्यभूत्
देवी तस्य विनोदभू र्मुररिपो र्लक्ष्मी रिव क्ष्मापतेः॥(৫)
ताभ्यां श्रीधर्म्मपालः समजनि सुजन-स्तूयमानावदानः
स्वामी भूमीपतीना मखिल-वसुमती-मण्डलं शासदेकः।
चत्वार स्तीरमज्जत्-करिगण-चरण-न्यस्तमुद्राः समुद्रा
यात्रां यस्य क्षमन्ते न भुवन-परिखा विश्वगाशा-जिगीषोः॥(৬)
यस्यिन्न द्दामलीला-चलित-बलभरे दिग्‌जयाय प्रवृत्ते
यान्त्याम्बिश्वम्भरायां चलित-गिरि-तिरश्चीनतां तद्वशेन।
भाराभुग्नावमज्जन्-मणिविधुर-शिरश्चक्र-साहायकार्थं
शेषेनोदस्त-दोष्णा त्वरिततर मधोध स्तमेवानुयातम्॥(৭)
यत्‑प्रस्थाने प्रचलित-बलास्फालना-दुल्ललद्भि-
र्धूलीपूरैः पिहित-सकल-व्योमभि र्भूतधात्र्याः।
संप्राप्तायाः परमतनुतां चक्रवालं फणानां
मग्नोन्मीलन्-मणि फणिपते र्लाघवादुल्ललास॥(৮)
विरुद्ध‑विषय‑क्षोभाद् यस्य कोपाग्नि रौर्ववत्।
अनिर्वृति प्रजज्वाल चतुरम्भोधिवारितः॥(৯)
येऽभूवन् पृथु-रामराघव-नल-प्राया धरित्रीभुज स्तानेकत्र दिदृक्षुणेव निचितान् सर्व्वान् सम म्वेधसा।
ध्वस्ताशेष-नरेन्द्र-मानमहिमा श्रीधर्म्मपालः कलौ
लोल-श्री-करिणी-निबन्धन-महास्तम्भः समुत्तम्भितः॥(১০)
यासां नासीर-धूली-धवल-दशदिशां द्रागपश्यन्नियत्तां
धत्ते मान्धातृसैन्य-व्यतिकरचकितो ध्यानतन्द्री म्महेन्द्रः।
तासामप्याहवेच्छा-पुलकित-वपुषा म्वाहिनीना म्विधातुं
साहाय्यं यस्य वाह्वो र्निखिल-रिपुकुलध्वंसिनो र्नावकाशः॥(১১)
भोजैर्मत्स्यैः समद्रैः कुरु-यदु-यवनावन्ति-गन्धार-कीरै र्भूपै र्व्यालोल-मौलिप्रणति-परिणतैः
साधु-सङ्गीर्य्यमाणः।
हृष्यत्-पञ्चालवृद्धोद्धृत-कनकमय-स्वाभिषेकोदकुम्भो दत्तः श्रीकन्यकुब्ज स्‌सललित-चलित-भ्रूलता-लक्ष्म येन॥(১২)
गोपैः सीम्नि वनेचरै र्वनभुवि ग्रामोपकण्ठे जनैः
क्रीड़द्भिः प्रतिचत्वरं शिशुगणैः प्रत्यापणं मानपैः
लीला-वेश्मनि पञ्जरोदर-शुकै रुद्गीत मात्म-स्तवं
यस्याकर्णयत स्त्रपा-विवलिता-नम्रं सदैवाननं॥(১৩)
स खलु भागीरथीपथ प्रवर्त्तमान-नानाविध-नौवाटक-सम्पादित-सेतुबन्ध-निहित-शैलशिखरश्रेणी-विभ्रमात् निरतिशय-घन-घनाघन-घटा-श्यामायमान-वासरलक्ष्मी-समारब्ध-सन्तत-जलदसमय-सन्देहात् उदीचीनानेक-नरपति-प्रभृतिकृता-प्रमेय-हयवाहिनी-खरखुरोत्खात-धूली-धूसरित-दि-
गन्तरालात् परमेश्वर-सेवासामायात-समस्तजम्बूद्वीप-भूपालानन्त-पादात-भर-नमदवनेः पाठलिपुत्र-समावासित-श्रीमज्जयस्कन्धावारात् परमसौगतो महाराजाधिराज-श्रीगोपालदेव-पादानुध्यातः परमेश्वरः परमभट्टारको महाराजाधिराजः श्रीमान् धर्म्मपालदेवः कुशली॥ श्रीपुण्ड्रवर्द्धनभुक्त्यन्तःपाति-व्याघ्रतटी मण्डलसम्बद्ध-महन्ताप्रकाश-विषये क्रौञ्चश्वभ्र नाम ग्रामोऽस्य च सीमा पश्चिमेन गङ्गिनिका। उत्तरेण कादम्बरी-देवकुलिका खर्ज्जूरवृक्षश्च| पूर्व्वोत्तरेण राजपुत्र-देवट-कृतालिः। वीजपुरकङ्गत्वा प्रविष्टा। पूर्व्वेण विटकालिः खातकयानिकां गत्वा प्रविष्टा। जम्बूयानिका माक्रम्य जम्बूयानकं गता। ततो निःसृत्य पुण्याराम-बिल्वार्द्ध-स्रोतिकां। ततोपि निःसृत्य नल-चर्म्मटोत्तरान्तं गता नलचर्म्मटात् दक्षिणेन नामुण्डिकापि [हे
सदुम्मि] कायाः। खण्डमुण्डमुखं खण्डमुखा[त्]वेदसबिल्विका वेद[स]विल्विकातो रोहितवाटिः पिण्डारविटि-जोटिका-सीमा उक्तारजोटस्य दक्षिणान्तः ग्रामबिल्वस्य च दक्षिणान्तः। देविका-सीमाविटि। धर्म्मायो-जोटिका। एवम्माढ़ा-शाल्मली नाम ग्रामः। अस्य चोत्तरेण गङ्गिनिका-सीमा ततः पूर्व्वेणार्द्धस्रोतिकया आम्रयानकोलर्द्धयानिकङ्गतः ततोपि दक्षिणेन कालिकाश्वभ्रः। अतोपि निःसृत्य श्रीफलभिषुकं यावत् पश्चिमेन ततोपि बिल्वङ्गोर्द्ध स्रोतिकया गङ्गिनिकां प्रविष्टा। पालितके सीमा दक्षिणेन काणा-द्वीपिका। पूर्व्वेण कोण्ठिया-स्रोतः। उत्तरेणगङ्गिनिका। पश्चिमेन जेनन्दायिका। एतद्ग्राम-सम्पारीण-परकर्म्मकृद्वीपः। स्थालीक्कट-विषयसम्बद्धाम्रषण्डिका-मण्डलान्तःपाति-गोपिप्पली-ग्रामस्य सीमा। पूर्व्वेण उड्रग्राम-मण्डल-पश्विमसीमा। दक्षिणेन जोलकः। पश्विमेन वेसानिकाख्या खाटिका। उत्तरेणोड्रग्राम-मण्डलसीमा-व्यवस्थितो गोमार्गः। एषु चतुरुषु (चतुर्षु) ग्रामेषु समुपगतान् सर्व्वानेव राजराजनक-राजपुत्र-राजामात्य-सेनापति-विषयपति-भोगपति-षष्ठाधिकृत-दण्डशक्ति-दण्डपाशिक-चौरोद्धरणिक-दौस्साधसाधनिक-दूत-खोल-समागमिकाभित्वरमाण-हस्त्यश्व-गोमहिषाजाविकाध्यक्ष-नाकाध्यक्ष बलाध्यक्ष-तरिक-शौल्किक-गौल्मिक-तदायुक्तक-विनियुक्तकादि-राजपादोपजीविनोऽन्यांश्चाकीर्त्तितान् चाटभटजातीयान् यथाकालाध्यासिनो ज्येष्ठकायस्थ-महामहत्तर-महत्तर-दाशग्रामिकादि-विषयव्यवहारिणः सकरणान् प्रतिवासिनः क्षेत्रकरांश्च ब्राह्मण-माननापूर्व्वकं यथार्हं मानयति बोधयति समाज्ञापयति च। मतमस्तु भवतां महासामन्ताधिपति-श्रीनारायणवर्म्मणा दूतक-युवराज-श्रीत्रिभुवनपालमुखेन वय मेवं विज्ञापिताः यथाऽस्माभिर्म्मातापित्रो रात्मनश्च पुण्याभिवृद्धये शुभस्थल्यान्देवकुलं कारित न्तत्र प्रतिष्ठापित-भगवन्नन्न-नारायण-भट्टारकाय तत्प्रतिपालक लाटद्विज-देवार्च्चकादि-पादमूल-समेताय पूजोपस्थानादि-कर्म्मणे चतुरो ग्रामान् अत्रत्य-हट्टिका-तलपाटक-समेतान् ददातु देव इति। ततोऽस्माभि स्तदीय विज्ञप्त्या एते उपरिलिखितका श्चत्वारो ग्रामा स्तलपाटक-हट्टिकासमेताः स्व- सीमापर्य्यन्ताः सोद्देशाः सदशापचाराः अकिञ्चित्प्रग्राह्याः परिहृत-सर्व्वपीड़ाः भूमिच्छिद्रन्यायेन चन्द्रार्कक्षिति-समकालं तथैव प्रतिष्ठापिताः। यतो भवद्भि स्सर्व्वै रेव भूमे र्द्दानफल-गौरवादपहरणे च महानरक पातादि भयाद्दानमिद मनुमोद्य परिपालनीयम्। प्रतिवासिभिः क्षेत्रकरै श्वाज्ञाश्रवणविधेयैर्भूत्वा समुचित-कर-पिण्डकादि-सर्व्व-प्रत्यायोपनयः कार्य्य इति॥

बहुभि र्व्वसुधा दत्ता राजभि स्सगरादिभिः।
यस्य यस्य यदा भूमि स्तस्य तस्य तदा फलम्॥(১৪)
षष्ठिं वर्षसहस्राणि स्वर्गे मोदति भूमिदः।
आक्षेप्ता चानुमन्ता च तान्येव नरके वसेत्॥(১৫)
स्वदत्ताम्परदत्ताम्बा यो हरेत वसुन्धराम्।
स विष्ठायां कृमि र्भूत्वा पितृभि स्सह पच्यते॥(১৬)
इति कमल-दलाम्बु-विन्दु-लोलां
श्रिय मनुचिन्त्य मनुष्य-जीवितञ्च।
सकलमिदमुदाहृत ञ्च बुद्ध्वा
न हि पुरुषैः पर-कीर्त्तयो विलोप्या:॥(১৭)
तड़ित्तुल्या लक्ष्मी स्तनुरपि च दीपानल-समा
भवो दुःखैकान्तः पर-कृतिमकीर्त्तिः क्षपयताम्।
यशांस्याचन्द्रार्क्कं नियत मवताम[त्र] च नृपाः
करिष्यन्ते बुद्ध्वा यदभिरुचितं किं प्रवचनैः॥(১৮)
अभिवर्द्धमान-विजयराज्ये सम्बत् ३२ मार्ग-दिनानि १२।
श्रीभोगटस्य पौत्रेण श्रीमत् सुभटसूनुना।
श्रीमता तातटेनेदं उत्कीर्णं गुण-शालिना॥
(১৯)


King Dharmapala [8th Century CE]

ব্রহ্মবাদিনী ও সদ্যো-বধূ – প্যারীচাঁদ মিত্র

ব্রহ্মবাদিনী ও সদ্যো-বধূ

পূর্ব্বে স্ত্রীলোকেরা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলেন। ব্ৰহ্মবাদিনী ও সদ্যোবধূ। উহাদিগের উপনয়ন হইত। ব্ৰহ্মবাদিনীরা পতি গ্রহণ করিতেন না। তাঁহারা বেদ পড়িতেন ও পড়াইতেন, জ্ঞানানুশীলনার্থে তাঁহারা অন্যান্য স্থানে ভ্রমণ করিতেন। গরুড় পুরাণে লিখিত আছে যে, মিনা ও বৈতরণী নামে দুই জন ব্রহ্মবাদিনী নারী ছিলেন। হরিবংশে লেখে যে বরুনার এক তপঃশালিনী কন্যা ছিল। মহাভারতে দৃষ্ট হয় যে, মহাত্মা আসুরি আত্ম-জ্ঞানার্থে কপিলের শিষ্য হইয়া শাবরীর বিষয় বিলক্ষণ অবগত হইয়াছিলেন। কপিলা নামে এক ব্রাহ্মণী তাঁহার সহ-ধৰ্ম্মিণী ছিলেন। প্রিয় শিষ্য পঞ্চশিখ ঐ কপিলার নিকট ব্রহ্মনিষ্ঠ বুদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন।

মিথিলাধিপতি জনক ব্ৰহ্মজ্ঞানানুশীলনার্থে অনেক তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিকে আহ্বান করেন। গার্গী নাম্নী এক তত্ত্বজ্ঞা সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া যাজ্ঞবল্ক্যের সহিত অনেক তর্ক বিতর্ক করেন। মহাভারতে লেখে যে সলভা নামে একটী স্ত্রীলোক দর্শন শাস্ত্র ভাল জানিতেন। তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান বিষয়ে আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ব্ৰহ্মবাদিনীরা জ্ঞানানুশীলন ত্যাগ করিয়া ধ্যানাবৃত হইতেন। ধ্যান কাণ্ড জ্ঞান কাণ্ডের চরমাবস্থা। রঘুবংশে এক ব্রহ্মবাদিনীর উল্লেখ আছে। “এই সুতীক্ষ্ণনামা শান্তচরিত্র আর এক তপস্বী ইন্ধন প্রজ্বলিত হুতাশন চতুষ্টয়ের মধ্যবৰ্ত্তী ও সূৰ্য্যাভিমুখী হইয়া তপোনুষ্ঠান করিতেছেন।” আরণ্যকাণ্ডে লেখে “চীরধারিণী জটিলা তাপসী শবরী” রাম দর্শনে অগ্নিতে প্রবেশ করত “আপন বিদ্যুতের ন্যায় দেহ প্রভায় চতুর্দ্দিক উজ্জ্বল করিয়া স্বীয় তপঃপ্রভাবে যে স্থানে সেই সুকৃতাত্মা মুনিগণ বাস করিতেছিলেন, তিনি সেই পুণ্য স্থানে গমন করিলেন।”

যদিও ব্রহ্মবাদিনীরা ঈশ্বর ও আত্মজ্ঞানানুশীলনে মগ্ন থাকিতেন, তথাচ সদ্যোবধূরা পতিগ্রহণ করিয়াও উক্ত জ্ঞানে বিখ্যাত হইয়াছিলেন। অত্রিবংশীয় দুই নারী ঋগ্বেদের কতিপয় স্তোত্র রচনা করেন। উত্তর রামচরিতেও লেখে যে অত্ৰিমুনির বনিতা আত্ৰেয়ী পথে আসিতেছিলেন, একজন পথিক জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কোথায় যাইতেছেন? মুনিপত্নী বলিলেন, আমি বাল্‌মীকির নিকট অধ্যয়ন করিয়া অগস্ত্যের আশ্রমে বেদ অধ্যয়ন করিতে গিয়াছিলাম, সেখানে অনেক তত্ত্বজ্ঞানী ঋষিরা বাস করেন। যাজ্ঞবল্ক্যের স্ত্রী মৈত্রেয়ী অতি উচ্চতা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি স্বামীর নিকট তত্ত্বজ্ঞান উপদেশ পান। ঈশ্বর বিষয়ক যে সকল প্রশ্ন স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাহা ঋগ্বেদে প্রকাশিত আছে

সদ্যোবধূরা উত্তম রূপে শিক্ষিত হইতেন, তাঁহাদিগের শিক্ষা ঈশ্বর ও আত্মা সম্বন্ধীয়, পারলৌকিক উন্নতিই জীবনের উদ্দেশ্য। এই প্রকার শিক্ষিত কতিপয় আধ্যাত্মিক সদ্যোবধূর সংক্ষেপ বিবরণ দেওয়া হইতেছে।

Source:এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্ব্বাবস্থা : প্যারীচাঁদ মিত্র

Brahmabadini o Sadya Badhu: শকাব্দা ১৮০০

স্ত্রীলোকের বাহিরে গমন – প্যারীচাঁদ মিত্র

 ঋগ্বেদে প্রকাশ হইতেছে যে, স্ত্রীলোকেরা সালঙ্কৃত হইয়া উৎসব ও বিদ্যানুরঞ্জন সভাতে গমন করিতেন। মহাবীর চরিতে লিখিত আছে যে, ঋষি কন্যা ও পত্নী সকল, পিতা ও স্বামীর সহিত ভোজে ও যজ্ঞে গমন করিতেন। মনুসংহিতা পাঠে স্পষ্ট বোধ হয় যে, স্ত্রীলোকেরা নাট্যশালায় ও উৎসবে গমন করিতেন। প্রকাশ্য স্থানে মঞ্চোপরি স্ত্রীলোক বসিয়া মল্লযুদ্ধ ও বাণ শিক্ষা ইত্যাদি দেখিতেন। কি মৃগয়ায়, কি যুদ্ধস্থানে, কি শব-সৎকারে, কি যজ্ঞস্থানে, স্ত্রীলোক সঙ্গে থাকিতেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকালীন দ্রৌপদী, সুভদ্রা ও উত্তরা পাণ্ডবদিগের শিবিরে ছিলেন। দ্রৌপদীর বিবাহ বিবেচনার্থে, দ্রুপদের সভায় কুন্তী উপস্থিত থাকিয়া, আপন অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। রাজসূয়ে, অশ্বমেধ যজ্ঞে ও রাজা যুধিষ্ঠিরের অভিষেকের সময়ে নারীরা উপস্থিত ছিলেন। অশ্বমেধ যজ্ঞে নারীদিগের জন্য স্বতন্ত্র স্থান ছিল ও যুবতীর সভার মধ্যে ইতস্ততঃ বেড়াইয়া ছিলেন।


Source:এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্ব্বাবস্থা : প্যারীচাঁদ মিত্র

Etad Desiya Strilok Diger Purvabasta -শকাব্দা ১৮০০

আরও দূরে চলো যাই ঘুরে আসি-Aro Dure Cholo Jai

আরও দূরে চলো যাই ঘুরে আসি
মন নিয়ে কাছাকাছি তুমি আছো আমি আছি
পাশাপাশি ঘুরে আসি

পায়ে পায়ে পথ চলা সেই কথা হোক বলা
সেই ধ্বনি যেন শুনি ভালবাসি ভালবাসি
মন নিয়ে কাছাকাছি তুমি আছো আমি আছি
পাশাপাশি ঘুরে আসি

রেখেছি এ হাত ধরে এক হয়ে অন্তরে
সব শেষে তাই এসে ঝরে হাসি
মন নিয়ে কাছাকাছি তুমি আছো আমি আছি
পাশাপাশি ঘুরে আসি


Bengali Song Romantic

বর্তমান রাজনৈতিক প্রসঙ্গ -শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-১৩৪১ বঙ্গাব্দ

প্রত্যেক হিন্দুই মনে-প্রাণে ন্যাশন্যালিস্ট । ধৰ্ম্মবিশ্বাসেও তারা কারও হতে ছোট নয়। তাদের বেদ, তাদের উপনিষৎ, বহু মাহুষের বহু তপস্তার ফল । তপস্তার মানেই হলো চিন্তা ।

Bartaman Rajnaitik Prasanga : Sarat Chandra Chattopadhya

বৰ্ত্তমান রাজনৈতিক প্রসঙ্গ কংগ্রেস ভূল করেছে—এমনি একটা চীংকার কিছুদিন ধরে শুনছি। এই কোলাহলের মধ্যে সত্য বস্তু আছে কতটুকু, তার বিচার কিন্তু হয়নি । নিজে আমি কোনদিনই হঠাৎ কোন বিষয়ে ধারণা গড়ে নিতে পারিনে। যারা জোর গলায় প্রচার করে যে, তাদের দাবীই প্রবল, সহজে তাদের কথাও আমি স্বীকরে করে নিইনে। তাই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এই যুক্তিহীন নিন্দ-প্রচার আমার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন । যিনি এই নব-আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছেন, তাকে আমি একনিষ্ঠ প্রবীণ কৰ্ম্ম হিসেবে শ্রদ্ধা করি ; দেশের রাজনৈতিক সাধনার ইতিহাসে দান র্তার কম বলেও মনে করিনে। কিন্তু দেশের প্রতি দুঃখবোধ তার কংগ্রেসের চেয়েও বেশী, এ-কথা প্রমাণের জন্য নূতন কোনো দল গঠনের প্রয়োজন বোধ করি ছিল না ।

কংগ্রেস দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, কংগ্রেস চিরকাল লড়াই করে এসেছে সম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে। আজ তাকে ছোট প্রমাণ করার চেষ্টায় ব্যক্তিগত গৌরব কারও কিছুমাত্র বেড়েছে কিনা জানিনে, কিন্তু দেশের গৌরব বুঝি এতটুকুও বড়েনি। দেশসেবা জিনিসটা যতদিন ধৰ্ম্ম হয়ে না দাড়ায়, ততদিন তার মধ্যে খানিকট ফাকি থেকে যায় । এ-কথা আমি প্রতিদিন মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে অনুভব করি। আবার ধৰ্ম্ম যখন দেশের মাথা ছাড়িয়ে ওঠে, তখনও ঘটে বিপদ ।

মহাত্মা জানেন এবং ওয়ার্কিং কমিটিও জানেন যে, ভুল তারা করেননি। মালবাজী এবং অ্যানের বিরুদ্ধাচরণও মহাত্মাকে বিচলিত করেনি । সুতরাং তিনি যদি কংগ্রেসের সম্পর্ক ত্যাগই করেন, তার সঙ্গে এ গোলযোগের কোনো সম্বন্ধ থাকবে না । তার আসল ভয় সোশিয়েলিজমকে। তাকে ঘিরে রয়েছেন ধনিকরা, ব্যবসায়ীরা । সমাজতান্ত্রিকদের তিনি গ্রহণ করবেন কি করে ? এইখানে মহাত্মার দুৰ্ব্বলতা অস্বীকার করা চলে না ।

একটা কথা আমি জানি যে, বাঙলাদেশের মুসলমানরাও জয়েণ্ট ইলেক্‌টোরেট’ চাইতে শুরু করেছেন । তা না হলে, গলদ কোথায়, তা তারা ভাল করেই জানেন । এ-কথা ভুললে চলবে না যে, অধিকাংশ ধনী মুসলমানই নায়েব, গোমস্ত, উকিল, ডাক্তার হিসাবে স্বজাতির চেয়ে হিন্দুদের বিশ্বাস করেন বেশী । সঙ্গে সঙ্গে এও আমি বলব যে, প্রত্যেক হিন্দুই মনে-প্রাণে ন্যাশন্যালিস্ট । ধৰ্ম্মবিশ্বাসেও তারা কারও হতে ছোট নয়। তাদের বেদ, তাদের উপনিষৎ, বহু মাহুষের বহু তপস্তার ফল । তপস্তার মানেই হলো চিন্তা । বহুজনের বহুতর চিন্তার ফলে যে ধৰ্ম্ম গড়ে উঠেছে, আইনসভার গুটিকতক আসন কম হবার আশঙ্কায়, তাকে সৰ্ব্বনাশের ভয় দেখাবার প্রয়োজন বোধ করি ছিল না ।


Originally Published in নাগরিক, শারদীয় সংখ্যা, ১৩৪১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত

  1. কংগ্রেস – Indian National Congress
  2. মহাত্মা- Mohan Das Karamchand Gandhi
  3. মালবাজী- Madan Mohan Malabiya

১৯০৫ সালে বাংলা – 1905 Sale Bangla

বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্টরূপ আছে, একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে, একটা স্বতন্ত্র ধর্ম্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে, অধিকার আছে, সাধনা আছে কর্ত্তব্য আছে। বুঝিলাম, বাঙ্গালীকে প্রকৃত বাঙ্গালী হইতে হইবে। বিশ্ববিধাতার যে অনন্ত বিচিত্র সৃষ্টি, বাঙ্গালী সেই সৃষ্টিস্রোতের মধ্যে এক বিশিষ্ট সৃষ্টি। অনন্তরূপ লীলাধারের রূপ বৈচিত্র্যে বাঙ্গালী একটী বিশিষ্টরূপ হইয়া ফুটিয়াছে। আমার বাঙ্গালা সেইরূপের মূর্ত্তি আমার বাঙ্গালা সেই বিশিষ্টরূপের প্রাণ, যখন জাগিলাম, মা আমার আপন গৌরবে—তাঁহার বিশ্বরূপ দেখাইয়া দিলেন, সে রূপে প্রাণ ডুবিয়া গেল, দেখিলাম, সে রূপ বিশিষ্ট, সে অনন্ত!

 

পূর্ব্বাভাষ

ইংরাজ যখন প্রথমে আমাদের এদেশে আসে, তখন নানা কারণে আমাদের জাতীয় জীবন দুর্ব্বলতার আধার হইয়াছিল। তখন আমাদের ধর্ম্ম একেবারেই নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল, এদিকে চির পুরাতন চিরশক্তির আকর সনাতন হিন্দু ধর্ম্ম কেবল মাত্র মৌখিক আবৃত্তি ও আড়ম্বরের মধ্যে আপনার শিবশক্তিকে হারাইয়া ফেলিয়াছিল ও অপর দিকে যে অপূর্ব প্রেমধর্ম্মের বলে মহা প্রভু সমস্ত বাঙ্গলা দেশকে জয় করিয়াছিলেন, সেই প্রেমধর্ম্মের অনন্ত মহিমা ও প্রাণ-সঞ্চারিণী শক্তি কেবল মাত্র তিলককাটা ও মালা ঠকঠকানিতেই নিঃশেষিত হইয়া যাইতেছিল। বাঙ্গলার হিন্দুর সমগ্র ধর্ম্মক্ষেত্র শক্তিহীন শাক্ত ও প্রেমশূন্য বৈষ্ণবের ধর্ম্মশূন্য কলহে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, তখন নবদ্বীপের চিরকীর্ত্তিময় জ্ঞানগৌরব কেবল মাত্র ইতিহাসের কথা, অতীত কাহিনী, বাঙ্গালী জীবনের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধ ছিল না, এই রূপে কি ধর্ম্মে, কি জ্ঞানে বাঙ্গালার হিন্দু তখন সর্ব্ববিষয়ে প্রাণহীন হইয়া পড়িয়াছিল।

আলিবর্দ্দি খাঁর পর হইতেই বাংলার মুসলমানও ক্রমশঃ নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল এবং সেই সময় তাহাদের সকল জ্ঞানী ও সকল শক্তি বলহীনের বিলাসে ভাসিয়া গিয়াছিল। এমন সময় সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে ইংরাজ বণিক-বেশে আগমন করিল এবং অল্প দিনের মধ্যেই রাজত্ব স্থাপন করিয়া অসাধারণ শক্তির পরিচয় দিল। আমাদের জাতীয় দুর্ব্বলতা নিবন্ধন আমরা ইংরাজ রাজত্বের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ইংরাজ জাতিকে ও তাহাদের সভ্যতা ও তাহাদের বিলাসকে বরণ করিয়া লইলাম। দুর্ব্বলের যাহা হয়, তাহাই হইল। ইংরাজী সভ্যতার সেই প্রখর আলোক সংযতভাবে ধারণ করিতে পারিলাম না। অন্ধ হইয়া পড়িলাম। অন্ধকারাক্রান্ত দিগ্‌ভ্রান্ত পথিক যেমন বিস্ময়ে ও মোহবশতঃ আপনার পদ প্রান্তস্থিত সুপথকে অনায়াসে পরিত্যাগ করিয়া, নিজের শাস্ত্রকে অবজ্ঞা করিয়া, নিজের সাহিত্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিয়া, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ইঙ্গিতে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করিয়া ইংরাজের সাহিত্য ইংরাজের ইতিহাস, ইংরাজের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দিকে নিতান্ত অসংযতভাবে ঝুঁকিয়া পড়িলাম। সেই ঝোঁক অনেকটা কমিয়া আসিয়াছে সত্য, কিন্তু এখনও একেবারে যায় নাই। রামমোহন যে দেশে “বিজ্ঞানের তুর্য্যধ্বনি” করিয়াছিলেন, আমরা তাহাই শুনিয়াছিলাম, বা মনে করিয়াছিলাম শুনিয়াছি, অন্ততঃপক্ষে বিজ্ঞানের বুলি আওড়াইতে আরম্ভ করিলাম। কিন্তু রামমোহন যে গভীর শাস্ত্রালোচনায় জীবনটাকে ঢালিয়া দিয়াছিলেন, তাহার দিকেত আমাদের চোখ পড়ে নাই। তিনি যে আমাদেব সভ্যতা ও সাধনার মধ্যে আমাদের উদ্ধারের পথ খুঁজিয়াছিলেন সে কথা ত আমরা একবারও মনে করি নাই। তারপর দিন গেল। আমাদের স্কুল, কলেজ, প্রতিষ্ঠিত হইল, আমাদের ঝোঁকটা আরও বাড়িয়া গেল, তারপর বঙ্কিম সর্ব্বপ্রথমে বাঙ্গালার মূর্ত্তি গড়িলেন, প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিলেন, বঙ্গজননীকে দর্শন করিলেন, সেই “সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং শস্যশ্যামলাং মাতরম্” তাহারই গান গাহিলেন, সবাইকে ডাকিয়া বলিলেন, “দেখ দেখ, এই আমাদের মা, বরণ করিয়া ঘরে তোল।” কিন্তু আমরা তখন সে মূর্ত্তি দেখিলাম না; সে গান শুনিলাম না, তাই বঙ্কিম আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আমি একা মা মা বলিয়া রোদন করিতেছি।” তার পর শশধর তর্কচূড়ামণির হিন্দু ধর্ম্মের পুনরুখানের আন্দোলন। এই আন্দোলন সম্বন্ধে আমাদের দেশে অনেক মত ভেদ আছে। কেহ বলেন, উহা আমাদের দেশে অনেক অনিষ্ট করিয়াছিল, আবার কেহ কেহ বলেন অমিাদের অশেষ উপকার সাধন করিয়াছিল। সে সব কথা লইয়া আলোচনা করা আমি আবশ্যক মনে করি না। এই আন্দোলন যে অনেক দিকে একেবারেই অল্প ছিল, তাহা আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি যেন সেই আন্দোলনের মধ্যেই বাঙ্গালী জাতির, অন্ততঃ পক্ষে শিক্ষিত বাঙ্গালীর আত্মস্থ হইবার একটা প্রয়াস—একটা উদ্যম দেখিতে পাই। সেইটুকুই আমাদের লাভ। তারপর আরও দিন গেল, ১৯০৩ খৃঃ হইতে স্বদেশী আন্দোলনের বাজনা বাজিতে লাগিল, বাঙ্গালী আপনাকে চিনিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিল। রবীন্দ্র নাথ গাহিলেন—

“বাংলার মাটী বাংলার জল
সত্য কর সত্য কর হে ভগবান্‌”

বাঙ্গালার জল বাঙ্গলার মাটী আপনাকে সার্থক করিতে লাগিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানীগুণী মহাপণ্ডিত আছেন, যাহারা নাকি বলেন যে, এই স্বদেশী আন্দোলন ইহা একটা বৃহৎ ভ্রান্তির ব্যাপার। আমরা নাকি সব দিকে ঠিক হিসাব করিয়া চলিতে পারি নাই। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে আমাদের দেশে একটা প্রাণহীন জ্ঞানের আবির্ভাব হইয়াছে। এই মুখস্ত করা জ্ঞানের ক্ষমতা অল্পই; কিন্তু অহঙ্কার অনেক খানি। এই জ্ঞানে যাঁরা জ্ঞানী, তাঁহারা সব জিনিষ সের দাঁড়ি লইয়া মাপিতে বসেন। তারা অঙ্ক শাস্ত্রের শাস্ত্রী, সব জিনিষ লইয়া আঁক কষিতে বসেন। কিন্তু, প্রাণের যে বন্যা, সে ত অঙ্ক শাস্ত্র মানে না, সে যে সকল মাপ কাঠি ভাসাইয়া লইয়া যায়। স্বদেশী আন্দোলন একটা ঝড়ের মত বহিয়া গিয়াছিল, একটা প্রবল বন্যায় আমাদের ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল। প্রাণ যখন জাগে তখন ত হিসাব করিয়া জাগে না। মানুষ যখন জন্মায়, সেত হিসাব করিয়া জন্মায় না, না জন্মাইয়া পারে না বলিয়াই সে জন্মায়। আর না জাগিয়া থাকিতে পারে না বলিয়াই প্রাণ একদিন অকস্মাৎ জাগিয়া উঠে। এই যে মহাবন্যার কথা বলিলাম, তাহাতে আমরা ভাসিয়া—ডুবিয়া বাঁচিয়াছি। বাঙ্গলার যে জীবন্ত প্রাণ, তাহার সাক্ষাৎ পাইয়াছি। বাঙ্গলার প্রাণে প্রাণে আবহমান যে সভ্যতা ও সাধনার স্রোত, তাহাতে অবগাহন করিয়াছি। বাঙ্গলার যে ইতিহাসের ধারা, তাহাকে কতকটা বুঝিতে পারিয়াছি। বৌদ্ধের বুদ্ধ, শৈবের শিব, শাক্তের শক্তি, বৈষ্ণবের ভক্তি, সবই যেন চক্ষের সম্মুখে প্রতিভাত হইল। চণ্ডিদাস বিদ্যাপতির গান মনে পড়িল। মহাপ্রভুর জীবন-গৌরব আমাদের প্রাণের গৌরব বাড়াইয়া দিল। জ্ঞান দাসের গান, গোবিন্দ দাসের গান, লোচন দাসের গান সবই যেন এক সঙ্গে সাড়া দিয়া উঠিল। কবিওয়ালাদের গানের ধ্বনি প্রাণের মধ্যে বাজিতে লাগিল। রামপ্রসাদের সাধন সঙ্গীতে আমরা মজিলাম। বুঝিলাম, কেন ইংরাজ এদেশে আসিল, রামমোহনের তপস্যার নিগূঢ় মর্ম্ম কি? বঙ্কিমের যে ধ্যানের মূর্ত্তি সেই—

“তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম,
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে,
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা—ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে”—

সেই মাকে দেখিলাম, বঙ্কিমের গান আমাদের “কানের ভতর দিয়া মরমে পশিল,” বুঝিলাম, রামকৃষ্ণের সাধনা কি— সিদ্ধ কোথায়! বুঝিলাম কেশব চন্দ্র কেন কাহার ডাক শুনিয়া ধর্ম্মের তর্ক রাজ্য ছাড়িয়া মর্ম্মরাজ্যে প্রবেশ করিয়া ছিলেন। বিবেকানন্দের বাণীতে প্রাণ ভরিয়া উঠিল। বুঝিলাম, বাঙ্গালী হিন্দু হউক, মুসলমান হউক খৃষ্টান হউক, বাঙ্গালী বাঙ্গালী।

বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্টরূপ আছে, একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে, একটা স্বতন্ত্র ধর্ম্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে, অধিকার আছে, সাধনা আছে কর্ত্তব্য আছে। বুঝিলাম, বাঙ্গালীকে প্রকৃত বাঙ্গালী হইতে হইবে। বিশ্ববিধাতার যে অনন্ত বিচিত্র সৃষ্টি, বাঙ্গালী সেই সৃষ্টিস্রোতের মধ্যে এক বিশিষ্ট সৃষ্টি। অনন্তরূপ লীলাধারের রূপ বৈচিত্র্যে বাঙ্গালী একটী বিশিষ্টরূপ হইয়া ফুটিয়াছে। আমার বাঙ্গালা সেইরূপের মূর্ত্তি আমার বাঙ্গালা সেই বিশিষ্টরূপের প্রাণ, যখন জাগিলাম, মা আমার আপন গৌরবে—তাঁহার বিশ্বরূপ দেখাইয়া দিলেন, সে রূপে প্রাণ ডুবিয়া গেল, দেখিলাম, সে রূপ বিশিষ্ট, সে অনন্ত! তোমরা হিসাব করিতে হয় কর, তর্ক করিতে চাও কর—সেরূপের বালাই লইয়া মরি।

(বাংলার কথা হইতে উদ্ধৃত) “দেশবন্ধু।”

তারপর স্বদেশী আন্দোলনের প্রবল ঢেউ বাংলার হৃদয়-কূলে আঘাতে করিল। দেশবন্ধু বাংলাকে যতটা ভালোবাসিয়াছিলেন ঠিক ততটা আবেগ এবং উন্মাদনা লইয়া বাংলার দুর্গম-পন্থী যুবকগণ এই আন্দোলনের স্রোতে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। শাসকের অমোঘ বজ্র তাহাদের উপর নিক্ষিপ্ত হইল। কিন্তু প্রলয়ের ইঙ্গিত পাইয়া সমুদ্রের ঢেউ যেমন চঞ্চল হইয়া ওঠে। রাজশক্তির এই প্রতিকূলতায় স্বদেশী আন্দোলনের স্রোতে জোয়ার আসিয়া গেল।

প্রলয়ের সেই সংশয় জটিল মুহুর্ত্তে যাহারা লাভ-লোকসানের হিসাব না খতাইয়া ভরা জোয়ারে গা| ভাসাইয়াছিলেন, এবং রাজরোষে পড়িয়| লাঞ্ছিত হইয়াছিলেন, তাঁহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে যাইয়া আমাদের কম বেগ পাইতে হয় নাই।


Writer : লিখেছেন অজ্ঞাত

রসমঞ্জরী Rasa Manjari : ভারতচন্দ্র রায় -1740

জয় জয় রাধা শ্যাম : নিত্য নব রসধাম : নিরুপম নায়িকানায়ক।
সর্ব্বসুলক্ষণধারী : সর্ব্বরসবশকারী : সর্ব্ব প্রতি প্রণয়কারক।।
বীণা বেণু যন্ত্র গানে : রাগরাগিনীর তালে : বৃন্দাবনে নাটিকানাটক।
গোপগোপীগণ সঙ্গে : সদা রাস রসরঙ্গে : ভারতের ভক্তিপ্রদায়ক।।

রাঢ়ীয় কেশরী গ্রামী : গোষ্ঠীপতি দ্বিজস্বামী : তপস্বী শাণ্ডিল্য শুদ্ধাচার।
রাজঋষি গুণযুত : রাজা রঘুরামসুত : কলিকালে কৃষ্ণ অবতার।।
কৃষ্ণচন্দ্র মহারাজ : সুরেন্দ্র ধরণীমাঝ : কৃষ্ণনগরেতে রাজধানী।
সিন্ধু অগ্নি রাহুমুখে : শশী ঝাঁপ দেয় দুঃখে : যার যশে হয় অভিমানী।।
তার পরিজন নিজ : ফুলের মুখটী দ্বিজ : ভরদ্বাজ ভারত ব্রাহ্মণ।
ভুরিশিট রাজ্যবাসী : নানাকাব্য অভিলাষী : যে বংশে প্রতাপ নারায়ণ।।
রাজবল্লভে কার্য্য : কীর্ত্তিচন্দ্র নিজরাজ্য : মহারাজা রাখিলা স্থাপিয়া।
রসমঞ্জরীর রস : ভাষায় করিতে বশ : আজ্ঞা দিলা রসে মিশাইয়া।।
সেই আজ্ঞা অনুসারি : গ্রন্থারম্ভে ভয় করি : ছল ধরে পাছে খল জন।
রসিক পণ্ডিত যত : যদি দেখ দুষ্ট মত : সারি দিবা এই নিবেদন।।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র


নায়িকা প্রকরণ

শৃঙ্গার বীভৎস হাস্য রৌদ্র বীর ভয়। করুণা অদ্ভুত শান্তি এই রস নয়।।
অদ্যরস সকল রসের মধ্যে সার। নায়িকা বর্ণিব অগ্রে তাহার আধার।।

নায়িকার স্বীয়াদি ভেদ
স্বীয়া পরকীয়া আর সামান্য বণিতা। অগ্রে এই তিন ভেদ পণ্ডিতবর্ণিতা।।

স্বীয়া নায়িকা
কেবল আপন নাথে অনুরাগ যার। স্বকীয়া তাহার নাম নায়িকার সার।।
নয়ন অমৃত নদী : সর্ব্বদা চঞ্চল যদি : নিজপতি বিনা কভু অন্য পানে চায় না।
হাস্য অমৃত সিন্ধু : ভুলায় বিদ্যুৎ ইন্দু : কদাচ অধর বিনা অন্য দিকে ধায় না।।
অমৃতের ধারা ভাষা : পতির শ্রবণে আশা : প্রিয়সখা বিনা কভু অন্য কানে যায় না।
নতি রতি গতি মতি : কেবল পতির প্রতি : ক্রোধ হলে মৌনভাব কেহ টের পায় না।।

মুগ্ধাদি ভেদ
মুগ্ধামধ্যে প্রগল্‌ভা তাহার ভেদ তিন। তিনেতে এ তিন ভেদ বুঝহ প্রবীণ।।

মুগ্ধা
মুগ্ধা বলি তারে যার অঙ্কুর যৌবন। বয়ঃসন্ধি সেই কাল বুঝ বিচঃক্ষণ।।
দেখিনু নাগরী : রূপের সাগরী : বয়সসন্ধি সময়।
শিশুগণ মিলি : রাঁধুবাড়ু খেলে :পুরুষে কিঞ্চিৎ ভয়।।
হংস খঞ্জরীটে : দেখি পদে দিঠে : কবে হল বিনিময়।
হৃদয়সরোজ : পূজিতে মনোজ : পণ্ডিতে হয় সংশয়।।

নবোঢ়া
এ যদি রমণে লাজে ভয়ে হয় স্তব্ধ। নবোঢ়া তাহাকে বলি প্রশ্রয়বিশ্রব্ধ।।

স্বকীয়া নবোঢ়া
হস্তেতে ধরিয়া : শয্যায় আনিয়া : যদি বা কোলে বসায়।
নানা বাক্যচ্ছলে : যত্নে কলে বলে : বাহিরে যাইতে চায়।।
নবোঢ়াকে বশ : করণ কর্কশ : সে রস কহিব কায়।
যেই পারা করে : স্থির করে ধরে : সেই জন ব্যামোহ পায়।।

পরকীয়া নবোঢ়া
আপনার পতি আছে : ভয়েতে না শুই কাছে : গায়ে হাত দেয় পাছে : এই ডরে ডরে হে।
প্রীতের বিষম কাজ : সে ভয়ে পড়িল বাজ : লাজে গলাইয়া লাজ : আশা বাসা করে হে।।
মুখের বাড়াও প্রীতি : হৃদয়ের হর ভীতি : তার পরে যেবা রীতি : রাখ রক্ষা কর হে।
যৌবন কমলাঙ্কুর : লোভে না করিও চুর : হিয়া কাঁপে দুরদুর : পাছে যাই মরে হে।।

সামান্য নবোঢ়া
কি ছার ধনের আসে : আইনু তোমার পাশে : আগে জানিতাম নাহি এত দায় হবে হে।
মুখ দেখি শোষে মুখ : বুক দেখি কাঁপে বুক : মনে হতে মন পড়ে কিসে প্রাণ রবে হে।।
কেবা ইহা সহিবেক : আমা হতে নহিবেক : ক্রুদ্ধ হও যদি নিজ ধন ফিরে লবে হে।
যেবা তীর্থে নাইলাম : তারি পুণ্য পাইলাম : অতঃপর ক্ষমা দেহ আমারে না সহে হে।।

বিশ্রব্ধ নবোঢ়া
স্তন দুটি করে ছ্যাঁদা : উরু দুটি ভুজে বাঁধা : লাজে ভয়ে মুদিল নয়ন।
প্রথমেতে নিরুত্তর :না না না তা : টাল টোল এখন তখন।।
যদি খেয়ে লাজ ভয় : কিঞ্চিত সঞ্চিত হয় : তবে আর না যায় ধারণ।
নবীন ভূষণ বাস : নব সুধা হাস বাস : নর রস কে করে গণন।।

মুগ্ধার ভেদ
মুগ্ধার প্রভেদ দুই করিয়া বর্ণনা। অজ্ঞাতযৌবনা আর বিজ্ঞাতযৌবনা।।

অজ্ঞাতযৌবনা
হয়েছে যৌবন যার নহে অনুভব। অজ্ঞাতযৌবনা তাকে বলে কবি সব।।
সখা সখী মেলি : ধাওয়াধাওয়ি লেলি : হারি কেহ যেন চোর।
অন্য দিনে ধাই : সবা আগে যাই : আজ কেন হারি মোর।।
নিতম্ব হৃদয় : ভারি হেন লয় : চক্ষু কর্ণে পড়ে জোর।
কটি দেখি ক্ষীণ : খসে পড়ে চীন : বাড়ে ঘাগরার ডোর।।

বিজ্ঞাতযৌবনা
নিজ নবযৌবন যে ব্যক্ত করে ছলে। বিজ্ঞাতযৌবনা তাকে কবিবর বলে।।
দেখিলাম ঘরে ঘরে : সকলে কাঁচলী পরে : নানা বর্ণে উড়ায় উড়ানি।
পরিহাস্যজন যত : নানা ছলে কহে কত : বাহিরায় হইল পোড়ানী।।
দেহের কি কব কথা : সকল শরীর ব্যথা : কত শত বিছার জ্বলনী।
তোরে বলি প্রিয় সই : লাজে কারে নাহি কই : পাছে জানে জনক জননী।।

মধ্যা
লজ্জা আর রতিআশা সমান যাহার। রসিক পণ্ডিতে কহে মধ্যা নাম তার।।
রতি রসে কৃতি পতি : মোরে ভালবাসে অতি : দেয় নিজাঙ্গুরী কণ্ঠমালা।
আঁখিআড়ে নাহি রাখে : সদা কাছে কাছে থাকে : সুখ বটে কিন্তু এক জ্বালা।।
নখাঘাত দেখি বুকে : দন্তচিহ্ন দেখি মুখে : সখি হাসে কর্ণে লাগে তালা।
শয্যা ঠেকি এই দোষে : না শুইলে পতি রোষে : শরীর হইল ঝালাপালা।।

প্রগল্‌ভা
প্রগল্‌ভা সে রতিরসে পূর্ণ আশা যার। রতি প্রীতি আনন্দেতে মোহ হয় যার।।

মধ্যা প্রগল্‌ভা ধীরাদি ভেদ
মানকালে মধ্যা প্রগল্‌ভার তিন ভেদ। ধীরাধীরা আর ধীরাধীরা পরিচ্ছেদ।।
মুগ্ধার এ ভেদ নাই ভয় তার মূল। ক্রোধ হলে এক ভাব ক্রন্দনআকুল।।
প্রকারে প্রকাশে ক্রোধ যে জন সে ধীরা। সোজাসোজি যার ক্রোধ সে জন অধীরা।।
কিছু সোজা কিছু বাঁকা যার হয় ক্রোধ। ধীরাধীরা বলে তারে পণ্ডিত সুবোধ।।

মধ্যা ধীরা
আজি প্রভু দড় দড় : বেশ বনায়েছ বড় : শ্বেত রক্ত চন্দনের : চাঁদ ভালে ধরেছ।
মন দেখি ভাঙ্গা ভাঙ্গা : নয়ন হয়েছে রাঙ্গা : বুঝি কোন দোষ দেখি : মোরে রোষ করেছ।।
তোমা বিনা প্রভু নাই : যাইবার নাহি ঠাঁই : কুমুদের চাঁদ যেন : তেন মন হরেছ।
অপরাধ ক্ষমা কর : নূতন চন্দন পর : এই লও নবমালা বাসীমালা পরেছ।।

মধ্যা অধীরা
সোহাগ করিয়া নিত্য : বসহ আমার ভৃত্য : আজি দেখি এ কি কৃত্য : দর্পণেতে চাও হে।
অধরে কজ্জলদাগ : নয়নে তাম্বুলরাগ : অলক্তাক্ত ভাল ভাগ : কার কাছে পাও হে।।
মোরে প্রাণ বলে ডাক : অন্যের নিকটে থাক : বুঝিলাম মনে রাখ : মন কলা খাও হে।
তোমা দেখি হয় ভীতি : কঠিন তোমার রীতি : বুঝিনু তোমার প্রীতি : যাও যাও যাও হে।।

মধ্যা ধীরাধীরা
তুমি মোর প্রাণপতি : কখন ধরিলা রতি : বুঝি সুখে ভুলেছিনু : তেঁই নাই মনে হে।
বুকে দেখি নখচিহ্ন : অধর দর্শনে ভিন্ন : ভালে আলতার দাগ : রক্তিমা নয়নে হে।।
শ্রমযাক মুখ ধোও : ক্ষণেক শয্যায় শোও : ছুঁয়ে শুদ্ধ কর মালা : তাম্বুল চন্দন হে।
কত জান ভারিভুরি : দেখিতে দেখিতে চুরি : পরিহার নমস্কার : তোমা হেন জনে হে।।

প্রগল্‌ভা ধীরাধীরা
কাজের সময় : যত কথা হয় : এবে কোথা রয় : মনে না থাকে।
কেমন ধরম : কেমন রকম : কেমন মরম : কহিব কাকে।।
ধিক্ বিধাতায় : এ হেন আমায় : দিয়াছে তোমায় : ইহারি পাকে।
দেখি হে চঞ্চল : ছোঁবে কি অঞ্চল : এ কাজে কি ফল : কে তোমা ডাকে।।

প্রগল্‌ভা অধীরা
কোন ফুলে বঁধু : পান কর মধু : হয়ে এলে যদু : পোড়াতে মোরে।
আল্‌তা কজ্জল : সিন্দুর উজ্জ্বল : জাগিয়া বিকল : নয়ন ঘোরে।।
এতেক বলিয়া : ক্রোধেতে জ্বলিয়া : কমল ফেলিয়া : মারিল জোরে।
কাঁদিয়ে নাগর : গুণের সাগর : কোথায় আদর : থাকয়ে চোরে।।

প্রগল্‌ভা ধীরাধীরা
জাগিয়া নয়ন : তোমার যেমন : আমার তেমন : সকল বটে।
সব কাজে মম : ফলে তরতম : কিসে আমি কম : বুঝিলে বটে।।
বিধি কৈল নারী : লাজ দিল ভারী : তেঁই সে না পারি : তোমার হঠে।
বৃক্ষমূলে হানি : শিরে চাল পানি : চরণ দুখানি : নৌকার তটে।।

জ্যেষ্ঠাদি ভেদ
এই ধীরা এ অধীরা এই ধীরাধীরা। জ্যেষ্ঠা আর কনিষ্ঠা দ্বিভেদ হয় ফিরা।।
পতির অধিক স্নেহ যারে সেই জ্যেষ্ঠা। অল্প স্নেহ যারে তারে বলয়ে কনিষ্ঠা।।

ধীরা জ্যেষ্ঠা
স্ত্রীর বুঝি ধীর ক্রোধ : দূরে গেল শোধবোধ : বন্ধু করে উপরোধ : ধীরে ধীরে কহিছে।
যদি পেয়ে থাক দোষ : তবু যুক্ত নহে রোষ : হাস্য কর পরিতোষ : কামানলে দহিছে।।
রক্তপদ্ম দুটি পায় : ভ্রমর নূপুর তায় : নিত্য নানারস খায় : আজি তাই রহিছে।
আকূল আমার প্রাণ : তবু নহে সমাধান : কঠিন তোমার মান : পরিমাণ নহিছে।।

ধীরা কনিষ্ঠা
স্ত্রীর দেখে স্থির মাস : করিবারে সমাধান : বন্ধু করে অপমান : ক্রোধে ক্রোধ হরিব।
কিসে মোর পেয়ে দোষ : কেন কর এত রোষ : কিসে হবে পরিতোষ : বল তাই করিব।।
কেহ বুঝি কহিয়াছে : গিয়াছিনু কারো কাছে : অঙ্গে বুঝি চিহ্ন আছে : তবে কিসে তরিব।
আরম্ভিয়া ছিল ক্রোধ : তা করিল উপরোধ : এত দূরে শোধবোধ : কত সেধে মরিব।।

অধীরা জ্যেষ্ঠা
যদ্যপি অধীরা হয়ে : গালি দিলা কটু করে : তবু থাকিলাম সয়ে : না সয়ে কি করিব।
তুমি প্রাণ তুমি ধন : তোমা বিনা অন্য জন : যদি জানে মোর মন : পরীক্ষা আচরিব।।
রুষ্ট হলে কটু কও : তুষ্ট হলে কোলে লও : আমা বিনা কারো নও : এই গুণে তরিব।
ছলছুতা মিছা সাঁচা : না জানি বিস্তর প্যাঁচা : প্রাণেশ্বরী প্রাণ বাঁচা : নহে আজ মরিব।।

অধীরা কনিষ্ঠা
বিনা দোষে দেও গালি : মাথে কলঙ্কের ডালি : মুখে যেন চুনকালি : কিসে মুখ চাহিব।
হয়েছি তোমার প্রভু : কত দোষ পাই তবু : গালি নাই দেই কভু : কত গালি খাইব।।
বিনয়ে না মানে বোধ : যদি নাহি ছাড় ক্রোধ : এত দূরে শোধবোধ : দেশ ছেড়ে যাইব।
তোমার যেমন মর্ম্ম : আমার তেমন কর্ম্ম : ইশাদ থাকিও ধর্ম্ম : কার্য্যকালে পাইব।।

ধীরাধীরা জ্যেষ্ঠা
একবাক্যে বুঝি রাগ : আর বাক্যে অনুরাগ : হৃদয়ে হইল দাগ : বুঝিতে না পারিয়া।
কি করিলে হও তুষ্ট : কি কহিলে হও রুষ্ট : অদৃষ্ট হইল দুষ্ট : কিসে যাবে সরিয়া।।
যদি অপরাধী হই : নিতান্ত করিয়া কই : তোমা বিনা কারো নই : দুঃখে লও তারিয়া।
তুমি ধ্যান তুমি জ্ঞান : তুমি মান অপমান : তোমা বিনা নাহি আন : দেখিনু বিচারিয়া।।

ধীরাধীরা কনিষ্ঠা
একবাক্যে দেখি রোষ : আর বাক্যে বুঝি তোষ : না বুঝিনু গুণ দোষ : বড় দায় পড়িল।
কি করিলে ভাল হবে : বল ভাই করি তবে : নহে ঘরে লয়ে রবে : আমার কি বহিল।।
পদ্মিনী ভ্রমরপ্রিয়া : ভ্রমরে খেদায়ে গিয়া : তাহারি বিদরে হিয়া : বুঝি তাই ফলিল।
প্রমোদসময় নইক : আমারে না হয় হউক : ক্রোধটি তোমার রউক : যা হবার হইল।।

পরকীয়া নায়িকা
অপ্রকাশে যার মতি পরপতি সনে। পরকীয়া তাহারে বলয়ে কবিগণে।।

পরকীয়া ভেদ
উঢ়া আর অনূঢ়া বিভেদ হয় তার। উঢ়া সেই বিবাহ হইয়া থাকে যার।।
অনূঢ়া সে জন যার হয় নাই বিয়া। পিত্রাদি অধীন হেতু সেও পরকীয়া।।

অনূঢ়া
শুন শুন প্রাণবঁধু : পিয়াইয়া মুখমধু : এমত করিলে বশ কত গুণ কব হে।
অন্য সঙ্গে যদি পিতা : করে মোরে বিবাহিতা : কেমনে তাহার সঙ্গে তোমা ছাড়ি রব হে।।
এমত করিয়া কর্ম্ম : নহে যেন স্ত্রীর ধর্ম্ম : বুকে মুখে হলে দাগ কলঙ্কিনী হব হে।
যাবৎ না বিভা হয় : তাবৎ এমন হয় : তাবতি এমত পীড়া দুজনেতে সব হে।।

উঢ়া
আপনার পতি আছে : সদা তারে পাই কাছে : তথাপি দারুণ মন পর লাগি মরে গো।
সঙ্কেত তরুর মূলে : সঙ্কেত নদীর কূলে : ঘাটে ভাঙ্গামাঠে মাঠে অন্ধকার ঘরে গো।।
কিঙ্কিণী-কঙ্কণ-রোল : লুকায়ে চুম্বন কোল : মরনে নাহিক সুখ কোটালের ডরে গো।
পরপতিরতি আশ : ঘর ছাড়ি পরবাস : সুখ যদি নহে লোক তবে কেন করে গো।।

পরকীয়ার অন্যভেদ
বিদগ্ধা ললিতা গুপ্তা কুলটা মুদিতা। পরকীয়া নানাভেদ প্রাচীন লিখিতা।।

বিদগ্ধা
বিদগ্ধ দ্বিমত হয় বাক্য আর কাজে। কথা শুনি কার্য্য দেখি বুঝি বা অব্যাজে।।

বাগ্বিদগ্ধা
চিরপরবাসী স্বামী : বিরলে কাতর আমি : বসন্তে মাতিল কাম কেমনে বা থাকিব।
প্রভুর কুসুমোদ্যান : বড় মনোহর স্থান : মনুষ্যের গম্য নহে সেই স্থানে যাইব।।
ডাকে পিক অলিকুল : ফুটে নানাজাতি ফুল : গাইয়া প্রভুর গুণ রজনী পোহাইব।
করিতে আমার তত্ত্ব : হইবে যাহার সত্ত্ব : সেই বঁধু তারে দেখা সেইখানে পাইব।।

ক্রিয়াবিদগ্ধা
সুখে শুয়ে পতি আছা : রামা বসে তার কাছে : ইশারায় উপপতি পিকডাকে ডাকিল।
রামা বলে হলো দায় : পাছে পতি টের পায় : না দেখি উপায় ভেবে স্তব্ধ হয়ে রহিল।।
কোকিল ডাকিছে হোর : কাম ভয়ে পাছে ঘোর : শ্রান্ত আছ নিদ্রা যাও বলে চক্ষু ঢাকিল।
জাগ্রত আমার প্রিয় : কেহ ডাকে বনপ্রিয় : আর কি তোমারে ভয় বলে দুই রাখিল।।

লক্ষিতা
পরপতিমতিআশা ঢাকিতে যে নারে। লক্ষিতা করিয়া কবিগণ বলে তারে।।
আজি প্রভু দেশে এলে : রতিচিহ্ন কিসে পেলে : সোহাগ পড়ুক মরে সতীপনা হরিলে।
তুমি এলে বার্ত্তা পেয়ে : দেখিতে আইনু ধেয়ে : আছাড় খাইনু পথে সে তত্ত্ব না করিলে।।
মুখে বল দন্তচিহ্ন : বুক বলে নহে ছিন্ন : আলু থালু বেশ দেখি বুঝি লতা ধরিলে।
নষ্ট হই দুষ্ট হই : তোমা বিনা কারো নই : কলঙ্ক এড়াবে নাহি সে জন না মরিলে।।

গুপ্তা
হয়েছে হতেছে হবে পরসঙ্গে রতি। গুপ্ত করে যে জন সে জন গুপ্তমতি।।
মুখে বুকে দেখি দাগ : শাশুড়ী করেন রাগ : একে তো বিরহে মরি আর অই ভয় লো।
কান্দিয়া পোহাই নিশা : আবেশে হারাই দিশা : কেমন কেমন করে অধর হৃদয় লো।।
স্তন নিজ নখাঘাতে : অধর পীড়িয়া দাঁতে : কোনমতে নিবারণ করি এ সময় লো।
এইরূপে দিবারাতি : রাখিয়াছি কুজ জাতি : চক্ষু খেয়ে তবু লোক কত কথা কয় লো।।

কুলটা
পতি বর্ত্তমানে যার অনেকেতে কাজ। কুলটা তাহারে বলে পণ্ডিতসমাজ।।
আরে বিধি নিদারুণ : কি তোর স্মরিব গুণ : কুলটার আশা পূর্ণ করিতে না পারিলি।
হস্ত পদ চক্ষু কান : দিলি দুই দুই খান : উড়িবারে দুই খান পাখা দিতে নারিলি।।
চৌদ্দ ভুবনে যত : পুরুষ বিবিধ মত : সবার বুঝিতে বল তাই বুঝি সারিলি।
এ দুঃখ বা কত সব : অন্যের কি কথা কব : চতুর্ম্মুখ রজোগুণ তবু তুই নারিলি।।

মুদিতা
পরসঙ্গে রতিআশে উল্লসিতা যেই। বিঘ্নহীন দেখিয়া মুদিতা হয় সেই।।
প্রবাসে রয়েছে পতি : ননদী প্রসূতবতী : বিধবা শাশুড়ী ঐ দৃষ্টিহীন রয় লো।
দেবর বিলাস রায় : শ্বশুর ভবনে যায় : মন্দ মন্দ গন্ধবহ বিদরে হৃদয় লো।।
অস্ত গেছে দিনমনি : যতেক রসিক ধনি : ওই শুন বংশীধ্বনি : করয়ে ললিত লো।
রোমাঞ্চ হতেছে মোর : খসিছে কাঁচালী ডোর : কেন সই ওষ্ঠাধর : হতেছে কম্পিত লো।।
পরকীয়া সুখ যত : ঘরে ঘরে শুনি কত : অভাগীর ধর্ম্মভয় এত করে মরি লো।
পরপুরুষের মুখ : দেখিয়া যে হয় সুখ : এ কি জ্বালা সদা জ্বলি হরি হরি হরি লো।।

সামান্য বনিতা
ধনলোভে ভজে যেই পুরুষ সকলে। সামান্য বনিতা তারে কবিগণ বলে।।
স্বকীয়া ধর্ম্মের বশে : পরকীয়া প্রীতি রসে : অমূল্য যৌবন ধন পুরুষেরে দেই লো।
আমার যৌবনধন : ভোগ করে যেই জন : মান বুঝি মূল্য করে দিতে পারে যেই লো।।
যখন যে ধন চাই : সেইক্ষণে যদি পাই : আমার মনের মত বন্ধু হবে সেই লো।
ধনিক রসিক জানি : নাগর মিলাবে আনি : আপনার মর্ম্ম কথা কয়ে দিনু এই লো।।

সামান্য বনিতার ভেদ
অন্যভোগ দুঃখিতা আর বক্রোক্তি গর্ব্বিতা। মানবতী আদিভেদে সামান্য বনিতা।।

বক্রোক্তিগর্ব্বিতা
গর্ব্বিতা দ্বিমত হয় রূপে আর প্রেমে। দুইটি একত্র হলে হীরা যেন হেমে।।

রূপগর্ব্বিতা
মুখ দেখি যদি আরশী ধরে। দড় বলে ছায়া সে লয় হরে।।
মদন জানিত অধিক করে। দেখিতাম কিন্তু গিয়াছে মরে।।

প্রেমগর্ব্বিতা
অনিমিষ আঁখি স্থির চরিত্র। আপনার বঁধু করিয়া চিত্র।।
আমারে দেখয়ে এ কি বিচিত্র। কেহ বঁধু সখী শত্রু কি মিত্র।।

অন্যসম্ভোগদুঃখিতা
কহ দূতি গিয়াছিলে কোন বনে। বড় শোভয়ে অঙ্গ ফুলাভরণে।।
নিজবেশ করে দড় আইলি লো। কই গেলি নরাধমসন্নিধি লো।।
ভুলিয়াছিলি আর ভুলাইলি রে। মধু গূঢ় বনে কত পাইলি রে।।

মানবতী
এস পরাণ-পুত্তলি এস : মরে যাই কিবা বেশ : আলোতে রহ হে রূপ ভাল করে হেরি রে।
আলতা কজ্জলদাগ ভালে : অরুণ প্রকাশ রাহু গালে : ভাবে আছ ভাল জানি ভারিভুরি হেরি রে।।

নায়িকার অবস্থাভেদ
এ সব নায়িকা পুনঃ অষ্টমত হয়। বিপ্রলব্ধা সম্ভোগ তাহার পরিচয়।।
বাসসজ্জা উৎকণ্ঠিতা ও অভিসারিকা। বিপ্রলব্ধা তার পর স্বাধীনভর্ত্তৃকা।।
খণ্ডিতা তাহার পর কলহান্তরিতা। প্রোষিতভর্ত্তৃকা এই অষ্ট পরিমিতা।।

বাসসজ্জা
পতি হেতু বাসঘরে যেই করে সাজ। বাসসজ্জা বলে তারে পণ্ডিতসমাজ।।
আঁচড়িয়া কেশপাশ : পরিয়া উত্তম বাস : সখীসঙ্গে পরিহাস গীতবাদ্য ঘটনা।
চামর চন্দন চুয়া : ফুলমালা পানে গুয়া : হাতে লয়ে শারীশুকে কামরস পঠনা।।
কিঙ্কিনীকঙ্কণ হার : বাজুবন্ধ সীঁতি টাড় : নূপুরাদি অলঙ্কার নিতি নব পর না।
যোগী যেন যোগাসনে : বসিয়া ভাবয়ে মনে : কতক্ষণে পতিসঙ্গে হইবে ঘটনা।।

উৎকণ্ঠিতা
স্বামীর বিলম্ব যেই ভাবে অনুক্ষণ। উৎকণ্ঠিতা তাহারে বলয়ে কবিগণ।।
হইল বহু নিশি : প্রকাশ হয় না দিশি : আইল কেন নাহি কালিয়া।
পিকের কলরব : ডাকিছে অলি সব : অনলে দেও দেহ জ্বালিয়া।।
তিমির ঘনতরে : সভয়ে বনচরে : ফিরয়ে কিবা পথ ভুলিয়া।
অপর সখীরসে : রহিল পরবশে : মদন মোরে দিল জ্বালিয়া।।

অভিসারিকা
স্বামীর সঙ্কেতস্থলে যে করে গমন। তারে অভিসারিকা বলয়ে কবিগণ।।
নিকট সঙ্কেতসময় আইল : শুনে রসময়ী মূরলী গাইল : ধরি ধনুঃশর মদন ধাইল : চলে নিধুবনে কামিনী।
পিক কলকলি শারীশুক ধ্বনি : ফুটে বনফুল ভ্রমর গুনগুনী : তাহাতে মিলিত নূপুর রুণরুণী : শীঘ্র চলে মৃদুগামিনী।।
বাছিয়া পরিলেক নীল অম্বর : মদন হেম গৃহে মেঘাড়ম্বর : পথিকজন ডর করিতে সম্বর : ঝাঁপিল তাহে তনু দামিনী।
বদন সরসিজ গন্ধযুত মন : মোহিত সহচরী ভ্রমর শিশুগণ : তথি মলয়াচল গতি মন্দ পবন : যাওল দ্রুত সখি যামিনী।।

বিপ্রলব্ধা
সঙ্কেতে স্থানেতে গিয়া নাহি পায় পতি। বিপ্রলব্ধা বলে তারে পণ্ডিত সুমতি।।
তিল পরিমাণ মান : সদা করি অনুমান : গুরুভয় লঘুভয় গেলা।
গৃহ ছাড়ি ঘন ঘন : করিমাল আরোহণ : সিন্ধু তরিনু ধরি ভেলা।।
হরি হরি মরি মরি : উহু উহু হরি হরি : তব নহে হরি সনে মেলা।
পর দুঃখ পরশ্রম : পরজনে জানে কম : অপরূপ খলজন খেলা।।

স্বাধীনভর্ত্তৃকা
কোলে বসে যার পতি আজ্ঞার অধীন। স্বাধীনভর্ত্তৃকা তারে বলে সুপ্রবীণ।।
শুন শুন প্রাণনাথ : নিবেদি হে যোড়হাত : পূরিল সকল সাধ : কিছু শেষ রয় হে।
বেঁধে দেহ মুক্তকেশ : বিনাইয়া দেহ বেশ : তুমি মোরে ভালবাস : লোকে যেন কয় হে।।
দেখিয়া তোমার মুখ : অতুল হইল সুখ : পাসরিনু যত দুখ : আছিল যে ভয় হে।
যত কাল জীয়ে রই : তোমা ছাড়া যেন নই : নিতান্ত করিয়া কই : মনে যে রয় হে।।

খণ্ডিতা
অন্য ভোগচিহ্ন অঙ্গে আসে যার পতি। খণ্ডিতা তাহার নাম বলে শুদ্ধমতি।।
আইস বঁধু দ্রুত হয়ে : কেন আইস রয়ে রয়ে : মরিব বালাই লয়ে : কিবা শোভা পেয়েছ।
কপালে সিন্দূরবিন্দু : মলিন বদনইন্দু : নয়ন রক্তের সিন্ধু : মোর দিকে ধেয়েছ।।
অধরে কজ্জল দাগ : নয়নে তাম্বুল রাগ : বুঝি কেবা পেয়ে লাগ : মোর মাথা খেয়েছ।।
তোমার কি দোষ দিব : বাপমায়ে কি বলিব : হরি হরি শিব শিব : যম মোরে ভুলেছে।।

কলহান্তরিতা
কলহে খেদয়ে পতি পশ্চাৎ তাপিতা। কবিগণে বলে তারে কলহান্তরিতা।।
ক্রোধে হয়ে হতজ্ঞান : কৈনু তোরে অপমান : এখন আকুল প্রাণ : দেখিতে না পাইয়া।
ফুটিছে বিবিধ ফুল : ডাকে ভৃঙ্গ অলিকুল : সামালিব এই শূল : কার মুখ চাহিয়া।।
কাতর হইয়া অতি : বিস্তর করিয়া নতি : চরণে ধরিল পতি : না চাহিনু ফিরিয়া।
করিনু যেমন কর্ম্ম : ফলিল তাহার ধর্ম্ম : মরুক এমত মর্ম্ম : দুঃখে যাই মরিয়া।।

প্রোষিতভর্ত্তৃকা
পরবাসে পতি যার মলিনা বিরহে। প্রোষিতভর্ত্তৃকা তারে কবিগণ কহে।।
অনল চন্দন চুয়া : গরল তাম্বুল গুয়া : কোকিল বিকল করে অতি।
বিধবার মত বেশ : অস্থিচর্ম অবশেষ : তাপে কাম পোড়ায় বসতি।।
মনোজ তনুজ মত : কোদণ্ড করিয়া হত : হাতে লয় পিণ্ডের পদ্ধতি।
সখীমুখে মান শুনি : পতি এলো হেন গণি : দেখিয়া শ্বাসের গতাগতি।।

প্রোষৎভর্ত্তৃকা
যার কাছে আসি পতি প্রবাসগমন। প্রোষিতভর্ত্তৃকা মধ্যে তাহার গণন।।
এ আট লক্ষণে তার না মিলে লক্ষণ। নবমী নায়িকা হতে পারে কেহ কন।।
কিন্তু অষ্ট নায়িকা সকল গ্রন্থে কয়। নবমী কহিতে গেলে গণ্ডগোল হয়।।
অতএব দ্বিধা বলি প্রোষিতভর্ত্তৃকা। প্রোষিতভর্ত্তৃকা আর প্রোষ্যৎপতিকা।।
পুনঃ শুন ওহে প্রাণ : পতি পরবাসে যান : তুমি কি করিবে এবে সত্য করি কহিবে।
এবে জানিলাম দড় : তোমা হইতে পতি বড় : নহে কেন আগে যান তুমি পাছে রহিবে।।
যদি বড় হতে চাও : তবে আগে আগে যাও : নহে তুমি লঘু হবে আমার কি বহিবে।
এবে সুখ দেয় যারা : পিছে দুঃখ দিবে তারা : কয়ে অবসর আমি কত জ্বালা সহিবে।।
ইত্যাদি কহিয়া দিনু নায়িকা যতেক। পতির গমনকালে সবার প্রত্যেক।।
পুথি বাড়ে সকলের করিতে কবিতা। অনুভবে বুঝি হবে লক্ষণ মিলিতা।।

নায়িকাদি উত্তমাদি ভেদ
উত্তমা মধ্যমা আর অধমা নিয়মে। এ সব নায়িকা তিন মত হয় ক্রমে।।

উত্তমা
অহিত করিলে পতি যেবা করে হিত। উত্তমা তাহার নাম বলয়ে পণ্ডিত।।

মধ্যমা
হিত কৈলে হিত করে অহিতে অহিত। মধ্যমা তাহার নাম মধ্যমচরিত।।

অধমা
হিত কৈলে অহিত করয়ে যেই জন। অধমা তাহার নাম বলে কবিগণ।।

চণ্ডী নায়িকা
পতি প্রতি করে যেই অকারণ ক্রোধ। চণ্ডী তার নাম বলে পণ্ডিত সুবোধ।।


সহচরীকথন
বেশভূষা করে দেয় পরিহাস। কথা কৈতে খেতে শুনে শিখায় বিলাস।।
যার কাছে বিশ্রাম বিশ্বাস কথা কয়। সহচরী সখী সেই পঞ্চ মত হয়।।
সখী নিত্যসখী প্রিয়সখী প্রাণসখী। অতিপ্রিয়সখী এই পঞ্চমত সখী।।

সখী
আমার নিকটে রয়ে : মরম আমারে কয়ে : এমত শিখাব কথা সুধাবৃষ্টি করিবে।
আঁচড়িয়া দিব কেশ : বানাইয়া দিব বেশ : থাকুক পতির মন মুনিমন ভুলিবে।।
হাবভাব লীলা হেলা : শিখাইব নানা খেলা : আসিতে আমার কাছে কাহারে না ডরিবে।
দোষ যত লুকাইব : গুণ যত প্রকাশিব : বড় দায়ে ঠেক যদি আমা হতে তরিবে।।

দূতীসখী
নায়ক নায়িকা যেই করয়ে বচন। বিরহ যাপন করে দূতী সেই জন।।
স্বয়ং দূতী আদ্যদূতী এই যে প্রকার। আদ্যদূতী তিন মত শুন ভেদ তার।।
অমিতার্থ নিশ্চয়ার্থ আর পত্রহারী। বিশেষ বিশেষ শুন করিয়া বিচারি।।
ইঙ্গিতে যে কর্ম্ম করে অমিতার্থ সেই। নিশ্চয়ার্থ আজ্ঞা পায়ে কর্ম্ম করে যেই।।
পত্র লয়ে কর্ম্ম করে পত্রহারী সেই। বিশেষিয়া বুঝ সবে কয়ে দিনু এই।।

আদ্যদূতী
সিন্দূর চন্দন চুয়া : ফুলমালা পান গুয়া : পড়ে দিতে পারি যদি ভুলে চন্দ্রবদনী।
কুমন্ত্র এমত জানি : বিষ দেখে রাজা রাণী : অপ্রীতি করিতে পারি কাম কামকরণী।।
যে নারী না নর জানে : যে নর না নারী মানে : তাহারে মিলাতে পারি দিনে করে যামিনী।
নাগর নাগরী যত : হও মোর অনুগত : সিদ্ধি করে মনোরথ যাই দ্রুতগামিনী।।


নায়ক প্রকরণ
নায়ক নায়িকা দুই শৃঙ্গারে প্রধান। নায়িকা বর্ণিনু শুন নায়ক সন্ধান।।
পতি উপপতি আর বৈশিক নাগর। স্বীয়া পরকীয়া আর সামান্যার ঘর।।
বেদমত বিভা করে যে জন সে পতি। উপপতি সেই যার পিরীতে বসতি।।
কোনরূপে ধনলোভে হয় সংঘটন। বৈষয়িক বৈশিক নাগর সেই জন।।

পতিভেদ
অনুকূল দক্ষিণ ধৃষ্ট শঠ চারি মত। পতিভেদ কেহ বলে তিনে কেহ রত।।
একে অনুরাগ যার সেই অনুকূল। দক্ষিণে সে যার ঘরে পরে হয় তুল।।
ধৃষ্ট সেই দোষ করে পুনঃ করে হঠ। কপট বচনে পটু সেই জন শঠ।।

অনুকূল
ওলো ধনি প্রাণধন : শুন মোর নিবেদন : সরোবরে স্নান হেতু যেয়ো না লো যেয়ো না।
যদ্যপি বা যাও ভুলে : অঙ্গুলে ঘোমটা তুলে : কমলকানন পানে চেয়ো না লো চেয়ো না।।
মরাল মৃণাল লোভে : ভ্রমর কমল ক্ষোভে : নিকটে আইলে ভয় পেয়ো না লো পেয়ো না।
তোমা বিনা নাহি কেহ : ঘামে পাছে গলে দেহ : যায় পাছে ভেঙ্গে কটি ধেয়ো না লো ধেয়ো না।।

দক্ষিণ
তোমার নিকটে যত : দিব্য করি কহি কত : বাহির হইবামাত্র পর দেখি ভুলে লো।
তোমার যেমন প্রীতি : পরসঙ্গে সেই রীতি : কহিলাম আপনার দোষগুণগুলি।।
কি করে ধর্ম্মের ভয় : লোকলাজে কিবা হয় : দেখিতে পরের মুখ ফিরি কুলি কুলি লো।
তুমি যদি হও রুষ্ট : অন্যে করিবেক তুষ্ট : ইহা বুঝি মোর সঙ্গে ছেড়ে দেহ ঠুলি লো।।

ধৃষ্ট
দোষ দেখে একবার : কৈল নানা তিরস্কার : লাজ পেয়ে আনু ফিরে তবু দয়া হল না।
ভুজপাশে বান্ধ্যা ধর : নিতম্ব প্রহার কর : দশনেতে কর ক্ষত অভিমানে গলো না।।
দূর কৈলে দূর হব : গাল দিলে সয়ে রব : আমারে সহিল সব তোমারে তো সলো না।
পুরুষ পরশমণি : যারে ছোঁয় সেই ধনী : ইহা বুঝে অনুক্ষণ দূর দূর বলো না।।

শঠ
কালি করেছিনু : আনিতে ভুলিনু : ক্ষম সেই অপরাধ।
যে বল করিব : যাহা চাহ দিব : পূরাহ সকল সাধ।।
অঙ্গেতে যে দাগ : তোমারি সোহাগ : মিথ্যা দেহ অপবাদ।
আমার পরাণ : হরিণী সমান : তোমার চক্ষু নিবাদ।।

উপপতি
নিজ নারী আছে ঘরে : যাহা বলি তাহা করে : নানা রূপ গুণ ধরে : তাহে মন রয় না।
করিতে অন্যায় সঙ্গ : সদাই সরস অঙ্গ : এ বড় অপূর্ব্ব রঙ্গ : ধর্ম্মভয় হয় না।।
যাইতে সঙ্কেতস্থান : সতত আকূল প্রাণ : অপরাধ জ্ঞান মান : কিছু মনে লয় না।
ব্যক্ত হলে কালামুখ : বাড়ীতে নাহিক সুখ : রমণেতে নানা দুখ : তবু ক্ষমা হয় না।।

বৈশিক নাগর
গিয়াছিনু সরোবরে : স্নান করিবার তরে : দেখিয়াছি একজন অপরূপ কামিনী।
চক্ষু মুখ পদ্ম ছন্দ : কিবা ছন্দ কিবা মন্দ : নীলাম্বরে ঝাঁপে তনু মেঘে যেন দামিনী।।
ঈশ্বর সদয় হন : দূতী মিলে একজন : এই ক্ষণে তার কাছে যায় দ্রুতগামিনী।
যত চাহে দিব ধন : দিব নানা আভরণ : কোনমতে মোর সঙ্গে বঞ্চে এক যামিনী।।

নায়কের উত্তমাদি ভেদ
উত্তম মধ্যম আর অধম নিয়মে। নায়িকার যে ক্রম নায়ক সে ক্রমে।।
বাসসজ্জা আদি নায়িকার ভেদ যত। নায়ক সে ভেদ হয় লক্ষণ সম্মত।।
উপপতি বৈশিকেতে সকলি বিদিত। পতি প্রতি রসাভাষ কেবল খণ্ডিত।।
স্বকীয়ার রসাভাষ জান অভিসার। পতির খণ্ডিত ভাব তেমতি প্রকার।।
সর্ব্বজন সুসম্মত আর ভাব সব। উদাহরণেতে দেখ কর অনুভব।।

বাসসজ্জা
শয়ন সময় : বন্ধু রসময় : করে রমণীর মোহন সাজ।
অন্য কার্য্য ছলে : শয্যাঘরে চলে : সাধিতে আপন গোপন কাজ।।
হাতে লয়ে যন্ত্র : গান কামতন্ত্র : মনে পেয়ে লাজ পায় এ লাজ।
ভাবে খাটে বসি : প্রাণের প্রেয়সী : আসিতে না জানি কতেক ব্যাজ।।

উৎকণ্ঠিত নায়ক
কেন না আইল প্রিয়া : বিরহে বিদরে হিয়া : স্থির হব কি করিয়া : ধৈর্য্য আর রহে না।
কিবা কোন কার্য্যপাকে : ভীতা কিবা দেখে তাকে : নহে এতক্ষণ থাকে : কামে সে কি দহে না।।
পান গুয়া গন্ধমালা : অগ্নিসম দেয় জ্বালা : করিলেক ঝালাপালা : তনু প্রাণ রহে না।
আসিবেক কতক্ষণে : তবে সুখ পাব মনে : বিনা তার দরশনে : আর তাপ সহে না।।

অভিসারক নায়ক
দ্বিতীয় প্রহর রাতে : মোরে কহিয়াছে যেতে : সময় হইল প্রায় স্থির মন টলিল।
সুখের কি জানে লেখা : গেলে মাত্র পাব দেখা : অনেক দিনের পর আজি আশা ফলিল।।
অন্ধকার দেখি আলো : গৌর লোক দেখি কালো : শত্রুজনে মিত্র ভাব জলে স্থল হইল।
রজনীতে দিবা মত : তিমির হইল হত : কুপথে সুপথ জ্ঞান তাহে মন লইল।।

বিপ্রলব্ধ নায়ক
সুখের সময় ঘরে : স্বীয়া নানা রস করে : তাহা ছাড়ি আইলাম পরআশা করিয়া।
গুরু ভয় লঘু করে : অন্ধকারে নাহি ডরে : ছাড়িয়া আপন বেশ পরবেশ ধরিয়া।।
সঙ্কেত স্মরণ করে : এসেছিল বেশ ধরে : আমার বিলম্ব বুঝি ঘরে গেল ফিরিয়া।
আসিয়া সঙ্কেত ঠাঁই : দেখিত পাইল নাই : আহা মরি অন্য কেবা লয়ে গেল হরিয়া।।

স্বাধীনভার্য্যা নায়ক
তুমি প্রাণ তুমি ধন : তুমি মন তুমি গণ : হৃদয়ে যে ক্ষণ থাক সেই ক্ষণ ভাল লো।
যত জন আর আছে : তুচ্ছ করি তোর কাছে : ত্রিভুবনে তুমি ভাল : আর সব কালো লো।।
তোমার বদনচাঁদ : অঞ্চলে চঞ্চল চাঁদ : আমার মোহন ফাঁদ অন্ধকারে আলো লো।
করেছি বিস্তর সেবা : আজি মোরে সাজাইবা : আমার মাথার কিরা : যদি মোরে টালো লো।।

খণ্ডিত নায়ক
আসিব বলিয়া গেলা : অন্য সঙ্গে হল মেলা : শরীরেতে চিহ্ন আছে লুকাবে কি বলিয়া।
মোর সঙ্গে কথা কয়ে : বঞ্চিলা অন্যেরে লয়ে : কতেক করিলা ভাব এ কান্তেরে ছলিয়া।।
ভিন্ন ভিন্ন দেখি বেশ : আলুথালু দেখি কেশ : দেখিয়া তোমার ভাব দেহ যায় জ্বলিয়া।
কে সাধিল মনোরথ : খণ্ডিয়া পীরিতি পথ : নিজ স্থানে যাও তুমি আমি যাই চলিয়া।।

কলহান্তরিত নায়ক
অল্প অপরাধ পেয়ে : কেন বা দিনু খেদায়ে : এবে কার মুখ চেয়ে কামজ্বালা সারিব।
বিবেচনা নাহি করি : এখন ঝুরিয়া মরি : অনুমানে হেন বুঝি রহিতে না পারিব।।
পুনঃ দূতী পাঠাইব : প্রীতি করি আনাইব : সবে এক দোষ তাহে পতি হয়ে হারিব।
হারি মানি দ্বন্দ্ব যাউক : তার অভিমান থাউক : তাহা বিনা এ সঙ্কটে তরিবারে নারিব।।

প্রোষিতভার্য্যা নায়ক
কোথায় রহিল বামা : বিরহে দহিয়া আমা : নিরন্তর কামজ্বালা কত আর সহিব।
পিক ডাকে কুহু কুহু : ভ্রমর গুঞ্জরে মুহু : সাপেখেকো বায়ুজ্বালা কত আর বাহিব।।
চন্দন কমলদল : পোড়া যেন দাবানল : সুধাকর বিষধর কত সয়ে রহিব।
আলো দেখি অন্ধকার : পুরস্কার তিরস্কার : হেন বুঝি অবশেষে উদাসীন হইব।।

প্রোষিতপত্নী নায়ক
যদি যাবে আমা ছেড়ে : প্রাণ কেন লও কেড়ে : আপন উদ্বেগ হেতু অগ্নি লয়ে যাবে লো।
তোমা সঙ্গে যাবে তাপ : আমি এড়াইব শাপ : খেতে শুতে অনুক্ষণ মনস্তাপ পাবে লো।।
প্রবোধ করিয়া তায় : ঠেকিবে দারুণ দায় : এমত হইবে ব্যক্ত সম্বিত হারাবে লো।
কয়ে দিনু শেষ মর্ম্ম : বুঝিয়া করহ কর্ম্ম : পদে পদে পাবে জ্বালা ক পদ এড়াবে লো।।

ইত্যাদি বুঝিয়া নায়কের অষ্টমত। উদাহরণেতে অনুভবে পাবে যত।।


নায়ক সহায় কথন
পীঠমর্দ্দ বিট বলি চেটক বিদূষক। এই সব ভেদ হয় বিস্তর নায়ক।।

পীঠমর্দ্দ
রমণী করিলে ক্রোধ যে করে সান্ত্বনা। ধর্ম্মধী সচিব পীঠমর্দ্দ সেই জনা।।

রমণীরত্ন সহে না আঁচ : টুটয়ে অগ্নি পরশে কাঁচ : করিতে মান দিবে না স্থান দিবে না স্থান।
কি করে ক্ষোভ সহে আমার : অবলাজাতি মৃদু আকার : জ্বলয়ে বহ্নি নহে সে মান নহে সে মান।।
রস তাপে হিমে বিনাশ পায় : তপনে তাপ শুকায়ে যায় : রসিয়ে মান রবে কোথায় রবে কোথায়।
প্রমদা বন্ধন সংসারেরি : প্রমদা আকার আহ্লাদেরি : সতত রাখহ সুযত্নে তায় সুরত্ন প্রায়।।

বিট
কালশাস্ত্রে যেই জন পরমনিপূণ। বিট বলি তার নাম ধরে নানাগুণ।।

চুমু আলিঙ্গন : কামের দীপন : মন্ত্র তন্ত্র আদি যত।
যাহে নারী বশ : যাহে বাড়ে রস : এমত জানিবা কত।।
বেশভূষা বাস : সন্দেহ সম্ভাষ : নৃত্য গীত নানামত।
ফিরি নানা ঠাঁই : আর কর্ম্ম নাই : আমার এই সতত।।

চেটক
সন্ধান চতুর যেই সময় ঘটক। কবিগণ তার নাম বলয়ে চেটক।।

যখন বিরলে পাব : তখন নিকটে যাব : যদি ক্রোধে গালি দেয় তবু সহে রহিব।
নয়নের ভঙ্গি করি : ফল কিম্বা ফুল ধরি : চারি চক্ষে এক হলে ইসারায় কহিব।।
স্নানেতে যখন যায় : ধরিতে বসন তায় : কৌতুকে কুম্ভীর হয়ে জলে ডুবি রহিব।
দুঃখ বিনা নহে সুখ : দেখিতে সে চাঁদমুখ : গ্রীষ্ম হিম বৃষ্টি বাতে পরাঙ্মুখ নহিব।।

বিদূষক
কিবা রোষে কিবা তোষে যার পরিহাস। বিদূষক তার নাম হাস্যের বিলাস।।

চন্দন কজ্জল রাগ : বদনে যে দেখ রাগ : অপমান এই দেখ মুখে কালীচূণ লো।
দেখ দেখ শোভে কিবা : চাঁদে আলো হেন দিবা : দোহাই দোহাই তোর প্রাণ মোর যায় লো।।
করিয়া পরীক্ষা যদি : রসের তরঙ্গ নদী : দুই জনে ডুবি আইস কে হয় নিপুণ লো।
আপনি দোষের ঘর : পরীক্ষা করিতে ডর : আমার মাথায় দোষ এতো বড় গুণ লো।।


আদ্যরসের নিরূপণ
আদ্যরসের দুই ভেদ শুনহ প্রয়োগ। প্রথমতঃ বিপ্রলম্ভ দ্বিতীয় সম্ভোগ।।

বিপ্রলম্ভ
বিপ্রলম্ভ চারিমত শুনহ প্রকাশ। পূর্ব্বরাগ মান প্রেম বৈচিত্ত্য প্রবাস।।

পূর্ব্বরাগ
অঙ্গসঙ্গ হওনের পূর্ব্ব যে লালস। তারে বলি পূর্ব্বরাগ তাহে দশ দশা।।
লালস উদ্বেগ জড় কৃশ জাগরণ। ব্যগ্র রোগা বায়ু মোহ নিদানে মরণ।।
প্রত্যেক বলিতে হয় কবিতা বিস্তর। অনুভবে বুঝে লবে নাগরীনাগর।।

মান
যেই ক্রোধে দম্পতির রসের বিচ্ছেস। সেই মান অহেতু সহেতু দুই ভেদ।।
অহেতু যে মান সেই অনায়াসে বধ্য। সহেতুর তিন ভেদ গুরু লঘু মধ্য।।
অন্যার সহিত পতি যদি কথা কয়। তাহে জন্মে লঘুমান বাক্যে দূর হয়।।
অন্য নামগুণ পতি যদি কানে লয়। তাহে জন্মে মধ্যমান পরীক্ষায় ক্ষয়।।
অন্য ভোগচিহ্ন যদি দেখে পতিগায়। তাহে জন্মে গুরুমান প্রমাণেতে যায়।।
সাম ভেদ ক্রিয়া দান নতি ত্যাগ রোষ। এই সাত মান ভাঙ্গে হয় পরিতোষ।।
প্রিয়বাক্যে স্তব করে তারে বলি সাম। আত্মগুণ তার দোষ ভেদ তার নাম।।
সখী দ্বারা ভয় প্রদর্শন সেই ক্রিয়া। দান যাহে বস্ত্র মাল্য ভূষণাদি দিয়া।।
নতি সেই যাহে পায় ধরে নমস্কার। ঔদাস্য প্রকাশ সেই ত্যাগ নাম যার।।
রোষ সেই যাহে ভয় কষ্টের বিস্তার। মান শান্তি চিহ্ন অশ্রু লোমাঞ্চ সীৎকার।।
অবশ্য এ সব রূপে মানের বিকাশ। অসাধ্য হইলে তারে বলি রসাভাস।।
প্রত্যেক বর্ণিতে হয় কবিতা বিস্তর। অনুভবে বুঝে লবে নাগরী নাগর।।

প্রেমবৈচিত্ত্য
নিকটে পরম অনুরাগের নিমিত্ত। ছলায় বিরহ হয় সে প্রেমবৈচিত্ত্য।।

প্রবাস
প্রবাস দ্বিমত হয় নিকট ও দূর। দশ দশা হয় তাহে বিষাদ প্রচুর।।
প্রথমেতে চিন্তা দ্বিতীয়েতে জাগরণ। তৃতীয়েতে উদ্বেগ চতুর্থে ক্ষীণতন।।
পঞ্চমে মিলন ষষ্ঠে প্রলাপ বিষাদ। সপ্তমেতে ব্যাধি হয় অষ্টমে উন্মাদ।।
নবমেতে মোহ হয় দশমে মরণ। অনুভবে বুঝে লবে দেখিয়া লক্ষণ।।

সহবাস
সহবাসে চারি ভেদ করিয়া বাখান। সংক্ষিপ্ত সঙ্কীর্ণ সম্পূর্ণ সমৃদ্ধিমান্।।
পূর্ব্বরাগ পরে অল্প প্রিয়সম্ভাষণ। সংক্ষিপ্ত তাহার নাম চিত্তবিনোদন।।
মানান্তে পতির সঙ্গে মিলন যে হয়। সঙ্কীর্ণ তাহার নাম কবিগণ কয়।।
কিঞ্চিৎ প্রবাস পরে হয় যে মিলন। সম্পূর্ণ তাহার নাম কহে কবিগণ।।
সুদূর প্রবাস পরে মিলন যে রস। সে রস সমৃদ্ধিমান্ দম্পতি অবশ।।

সহবাসের প্রকার
দর্শন স্পর্শন কথা পথরোষ বাস। বনখেলা জলখেলা গীতবাদ্য হাস।।
লুক্কাওন মধুপান আদি নানা মত। অনন্ত অনন্তভাব বিরচিব কত।।

দর্শন
দরশন তিনমত নাগরী নাগরে। সাক্ষাতে স্বপন আর পটে চিত্রধরে।।

সাক্ষাৎ দর্শন
নয়নে নয়ন : বদনে বদন : চরণে চরণ আদেশি রহ।
হৃদয়ে হৃদয় : প্রাণ সমুদয় : পরাণে আলয় ভাঙ্গিয়া লহ।।
গমনে গমন : রমণে রমণ : বচনে বচন বিনয় কহ।
পেয়েছি দরশ : পরম পরশ : সকলে সরস হইয়া রহ।।

স্বপ্ন দর্শন
নিদ্রার আবেশে : রজনীর শেষে : মনোহর বেশে : বঁধু আসিয়া।
প্রেমপারাবার : করিল বিস্তার : নাহি পাই পার : যাই ভাসিয়া।।
সে সরস হইল : মনেতে রহিল : সে কথা কহিল : মৃদু হাসিয়া।
ধরম করম : সরম ভরম : নরম মরম : গেল নাশিয়া।।

চিত্র দর্শন
দেখিবারে চিত্র : করিলাম চিত্র : এ বড় বিচিত্র : হইল তায়।
দেখিতে বদন : মাতিলেক মন : ছাড়িয়া সদন : চেনন যায়।।
না পানু দেখিতে : নারিনু রাখিতে : লিখিতে লিখিতে হইল দায়।
চিত্রের পুতুল : করিল আকুল : হারানু দুকূল : চিত্রের প্রায়।।


আলম্বনাদি কথন
আলম্বন বিভাবন আর উদ্দীপন। এই তিন ভাবের শুনহ বিবরণ।।
আলম্বন সেই যাহে রসের আশ্রয়। নায়ক নায়িকা দুই তার বিনিময়।।
নানাবিধ অনুভবে বলি বিভাবন। যাহে রস বাড়ে তাহে বলি উদ্দীপন।।

উদ্দীপন
গুণ স্মরা নাম লওয়া নিত্য রূপ দেখা। গীতবাদ্য শুনার আর কর্ম্ম রেখা লেখা।।
সুগন্ধি ভূষণ মেঘ পিকভৃঙ্গরব। চন্দ্র আদি নানামতে উদ্দীপন সব।।

বিভাবন
ভাব হাব হেলা হাস শোভা দীপ্তি কান্তি। মধুরতা উদারতা প্রগলভতা ক্লান্তি।।
ধৈর্য্য লীলা বিলাস বচ্ছিত্তি মৌগ্ধ্য ভ্রম। কিলকিঞ্চিৎ মোট্টায়িত মুট্ট মত শ্রম।।
বির্ব্বোক লালিত্য মন চকিত বিকার। নানামত অনুভব কত কব আর।।

ভাবহাবাদি পরিচয়
চিত্তের প্রথম সেই বিকার যে ভাব। গলা চক্ষু ভুরু আদি বিকাশেতে হাব।।
বক্ষ কাঁপে বস্ত্র খসে তারে বলি হেলা। প্রিয় কৃতকর্ম্ম চেষ্টা তারে বলি লীলা।।
হাসে সেই হাস্যে বলি বৃথা হয় যেই। পরিচ্ছদ বনা শোভা মধুরতা সেই।।
শোভা কান্তি দীপ্তি ভ্রম ব্যাপ্ত আছে এই। শ্রম অঙ্গ শ্লথ যেই ক্লান্তি হয় সেই।।
কার্য্য বিপরীত আদি সেই প্রগল্‌ভতা। ক্রোধেও বিনয় বাক্য সেই উদারতা।।
ধৈর্য্য সেই দুঃখেতে প্রেমের নহে হ্রাস। সাক্ষাতে প্রফুল্ল অঙ্গ সেই সে বিশ্বাস।।
অল্প আভরণে শোভা বিচ্চিত্তি সে হয়। বিভ্রম হইলে ব্যক্ত বেশবিপর্য্যয়।।
ক্রন্দনেতে হাস্য আর অভয়েতে ভয়। আক্রোধেতে ক্রোধ কিলকিঞ্চিৎ সে হয়।।
প্রসঙ্গেতে অঙ্গভঙ্গ সেই মোট্টায়িত। অঙ্গ ছুলে মুখে ক্রোধ সেই কুট্টমিত।।
বির্ব্বোক বাঞ্ছিত বস্তু পেয়ে অনাদর। অঙ্গভঙ্গ ঝনৎকার লালিত্যে সুন্দর।।
লজ্জায় না কহি কার্য্য চেষ্টায় জানায়। বিকার তাহারে বলে বুঝ অভিপ্রায়।।
জ্ঞাতকে অজ্ঞান সম মৌগ্ধ্য সেই হয়। চকিত ভ্রমর আদি দর্শনেতে ভয়।।
যৌবনাদি অভিমান জন্য মদ হয়। মনস্তাপ আদি যত কবিগণ কয়।।
কেশ বাস খসে অঙ্গমোড়া হাই উঠে। লোমাঞ্চ প্রফুল্ল গদ্‌গদি ঘর্ম্ম ছুটে।।

সাত্ত্বিক ভাব
স্তম্ভ হয় ধর্ম্ম বয় লোমাঞ্চ প্রকাশ। বিবর্ণ কম্পন অশ্রু গদ্‌গদ ত্রাস।।
প্রিয় বিনা সুখ যত দুঃখ সে তো হয়। প্রিয় পাইলে দুঃখে সুখ রাগ তারে কয়।।


যৌবন কথন
যৌবনের চারি ভেদ শুন বিবরণ। আগে বয়ঃসন্ধি পরে নবীন যৌব।।
তারপরে যুবা ভাবে উন্মাদ লক্ষণ। তার পরে বৃদ্ধভাব বুঝ বিচক্ষণ।।
যৌবনের সন্ধিকাল দ্বাদশ বৎসর। দশম নিয়ম কন ব্যাস মুনিবর।।

যৌবন পরম ধন : স্ববশ ইন্দ্রিয়গণ : শিশু বৃদ্ধ দেখি লোক রসকথা কহে না।
বালকের নাহি শুদ্ধি : বৃদ্ধ হলে হতবুদ্ধি : যুবা বিনা রস আর : কোনখানে রহে না।।
যুবা সূর্য্য বলমান্ : যুবা চন্দ্র দ্যূতিমান : যুবা বিনা সংসারের ভার অন্যে বহে না।
বিনা নর কিবা অন্য : যৌবন সকল ধন্য : যৌবন হইলে নষ্ট দেখি দেহ রহে না।।

নারীর যৌবন বড় দুরন্ত। শরীর মাঝে পোষে বসন্ত।।
বিনোদ বিননে বিনায়ে বেণী। পুরুষে দংশিতে পোষে সাপিনী।।
কত কত অলি নয়নে ঘোরে। মধুবাক্যে কত কোকিল ঝোরে।।
মলয় বাতাস শ্বাসেতে বহে। সৌরভে সুরভি গৌরব নহে।।
কমলকানন আননে থাকে। বান্ধুলী মধুর অধর রাখে।।
দুখানি বিষাণ নিশান রাগি। হৃদয়ে মলয় রেখেছে ঢাকি।।
লোহিত কমলে মৃণাল সাতে। আভরণে ঢাকি রেখেছে হাতে।।
ত্রিবলীডোরেতে বান্ধি অনঙ্গ। কটিতটে থুয়ে দেখয়ে রঙ্গ।।

সম্বরে অম্বর দিয়া কান্তার। মদন সদন রসভাণ্ডার।।
কিশলয় করিকরের ভয়ে। চরণের তলে শরণ হয়।।
যৌবনমরম জানে না যেবা। পণ্ডিত তাহারে বলয়ে কেবা।।
জপ তপ জ্ঞান দান যে কিছু। সকলি যৌবনধনের পিছু।।
যৌবন এ তিন অক্ষর লেখ। যে জন সরম উত্তম দেখ।।
যৌবনমরম যে জনে নাই। প্রথম ছাড়িয়া তাহার ঠাঁই।।
যদ্যপি যৌবনে উদ্যম করে। প্রথমের মতো গলিয়া মরে।।
ভারতচন্দ্রের ভারতী যোগ। যৌবনেতে কর যৌবন ভোগ।।


স্ত্রীজাতি কথন
অতঃপর চারি জাতি বর্ণিব কামিনী। পদ্মিনী চিত্রিণী আর শঙ্খিনী হস্তিনী।।

পদ্মিনী
নয়নকমল : কুঞ্চিত কুন্তল : ঘন কুচস্থল মৃদু হাসিনী।
ক্ষুদ্র রন্ধ্রনাসা : মৃদু মন্দ ভাষা : নৃত্য গীতে আশা সত্যবাদিনী।।
দেবদ্বিজে ভক্তি : পতি অনুরক্তি : অল্প রতিভক্তি নিদ্রাভোগিনী।
সুললিত কায় : লোম নাহি হয় : পদ্মগন্ধ কয় সেই পদ্মিনী।।

চিত্রিণী
প্রমাণ শরীর : সর্ব্বকর্ম্মে স্থির : নাভি সুগভীর মৃদুহাসিনী।
সুকঠিন স্তন : চিকুর চিকণ : শয়ন ভোজন মধ্যচারিনী।।
তিন রেখাযুত : কণ্ঠ বিভূষিত : হাস্য অবিরত মন্দগামিনী।
কমনীয় কায় : অল্প লোম হয় : ক্ষারগন্ধ কয় সেই চিত্রিণী।।

শঙ্খিনী
দীঘল শ্রবণ : দীঘল নয়ন : দীঘল চরণ দীঘল পাণি।
সুদীঘল কায় : অল্প লোম হয় : মীনগন্ধ কয় শঙ্খিনী জানি।।

হস্তিনী
স্থূল কলেবর : স্থূল পয়োধর : স্থূল পদকর ঘোরনাদিনী।
আহার বিস্তর : নিদ্রা ঘোরতর : বিহারে প্রখর পরগামিনী।।
ধর্ম্ম নাহি ডর : দন্ত ঘোরতর : কর্ম্মেতে তৎপর মিথ্যাবাদিনী।
সুপ্রশস্ত কায় : বহু লোম হয় : মদ গন্ধ কয় সেই হস্তিনী।।

পুরুষ কথন
চারি জাতি নায়িকার শুনহ নায়ক। শশ মৃগ বৃষ অশ্ব সন্তোষদায়ক।।
পদ্মিনীর শশ পতি মৃগ চিত্রিণীর। বৃষে শঙ্খিনীর তুষ্টি অশ্বে হস্তিনীর।।
রূপ গুণ দোষ সব নায়িকার মতো। চারি জাতি নায়কের লক্ষণ সম্মত।।
রসভাণ্ড মত রসদণ্ড ভেদ হয়। ছয় আট দশ বার পরিমাণ কয়।।
নরনারী স্বভাবেতে বিশেষ যে হয়। কহিতে কবিতা বাড়ে ক্ষোভ এই হয়।।


Bengali Documents – রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র

আমাদের জাতীয়ভাব – Amader Jatiya Bhab- Rajani kanta Gupta-1891

অনুকরণশূন্যতা ও একতা না হইলে, জাতীয় ভাবের পরিপুষ্টি হয় না। আমাদের জাতীয় ভাবের অবনতির প্রধান কারণ, অনুকরণপ্রবণতা ও অনৈক্য। এ অংশে আমরা যতদূর অধঃপতিত হইয়াছি, পাঞ্জাবী, হিন্দুস্থানী বা মহারাষ্ট্রীয় ততদূর হয়েন নাই। আমাদের পরিচ্ছদে, আচারব্যবহারে, ভাষায়, নিয়তই বৈষম্য রহিয়াছে। পরিচ্ছদে জাতীয় ভাবের পরিচয় হইয়া থাকে। প্রত্যেক জাতিরই এক একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ আছে। কিন্তু আমাদের বাঙ্গালী জাতির এরূপ পরিচ্ছদসাম্য নাই। আমরা বিভিন্ন পরিচ্ছদে দেহ সজ্জিত করিয়া, হীন অনুকরণের প্রাধান্যরক্ষায় যত্নশীল হই।

আমাদের জাতীয়ভাব

শ্রীরজনীকান্ত গুপ্ত প্রণীত

আল্‌বর্ট হলে পঠিত।

১২৯৮ সাল

বিজ্ঞাপন।

জাতীয় ভাবরক্ষণেচ্ছু কতিপয় শিক্ষিত যুবকের উদ্‌যোগে আলবর্ট হলে একটি সভার অধিবেশন হয়। উপস্থিত প্রবন্ধটি সেই সভায় পঠিত হইয়াছিল। পরে উহা সাহিত্যনামক মাসিক পত্রে প্রকাশিত হয়। এখন সংশোধিত হইয়া স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইল। এই সামান্য প্রবন্ধটি সহৃদয় পাঠকবর্গের কিয়দংশেও প্রীতিপ্রদ হইলে চরিতার্থ হইব।

শ্রীরজনীকান্ত গুপ্ত।

কলিকাতা,
২৮ শে জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৮।


আমাদের জাতীয় ভাব

প্রত্যেক জাতির ভাষায়, পরিচ্ছদে, রীতি নীতিতে তাহদের জাতীয় ধর্ম্মের পরিজ্ঞান হইয়া থাকে। পারসীক যে ভাবের পরিচ্ছদ পরিধান করেন, মহারাষ্ট্রীয় সে ভাবের পরিচ্ছদ ব্যবহার করেন না, হিন্দুস্থানী আবার তাঁহাদের জাতীয়ভাবসূচক অন্যরূপ পরিচ্ছদধারণ করিয়া থাকেন। ইঁহাদের ভাষা, রীতি নীতি প্রভৃতিও পরস্পর পৃথক প্রকৃতির। এক জাতির ভাষা অপর জাতি ব্যবহার করিলে বা একজাতি অপর জাতির পরিচ্ছদ ও রীতি নীতির অনুকরণে প্রবৃত্ত হইলে, তাঁহার জাতিগত বিশেষত্ব থাকে না। সুতরাং সে জাতি তাহার জাতীয় ভাব হইতে পরিভ্রষ্ট হয়। এইরূপে স্বদেশীয় দ্রব্যে উপেক্ষা করিয়া, যে নিরন্তর বিদেশীয় দ্রব্যের ব্যবহারে প্রবৃত্ত হয়, তাহারও জাতীয়ভাবের মর্য্যাদা থাকে না। ভিন্ন জাতির আক্রমণে ও ভিন্ন জাতির আধিপত্যবিস্তারে, অনেক সময়ে আক্রান্ত ও বিজিত জনপদের অধিবাসীদিগের জাতীয় ভাবের বৈলক্ষণ্য হইয়া থাকে। বিজিত জনগণ অনেক বিষয়ে বিজেতারই অনুকরণে প্রবৃত্ত হয়। রোমকদিগের আক্রমণে ইঙ্গলণ্ডের প্রাচীন অধিবাসীদিগের এইরূপ রূপান্তর ঘটিয়াছিল। গ্রীকদিগের আক্রমণে অনেক প্রাচ্য জনপদও গ্রীশের রীতি নীতিপরিগ্রহ করিয়াছিল। ভারতবর্ষ বহুবার বহু বিদেশীয়কর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়াছে। এই সকল আক্রমণে হিন্দু কি পরিমাণে জাতীয় গৌরবরক্ষা করিয়াছে, ভারতবর্ষ কি পরিমাণে বিদেশীয় দ্রব্যের মুখাপেক্ষী হইয়াছে, সংক্ষেপে তাহার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতেছি।

প্রকৃতির বিশালরাজ্যে ভারতবর্ষ অতি সুন্দরস্থানে অবস্থিত। ইহার তিন দিকে অপার অনন্ত জলরাশি; আর একদিকে অনন্তসৌন্দর্য্যময়, অনন্ত শোভার ভাণ্ডার, অভ্রভেদী অটল গিরিবর। সুতরাং ভারতবর্ষ প্রায় চারিদিকেই প্রকৃতিকর্ত্তৃক সুরক্ষিত। স্থলপথে দুর্গম পার্ব্বত্য ভূমি, সঙ্কীর্ণ গিরিসঙ্কট অতিক্রম না করিলে ভারতবর্ষে প্রবেশ করিতে পারা যায় না, আর জলপথে মহাসাগরের তরঙ্গবিক্ষোভী বারিরাশি অতিবাহিত করিতে না পারিলে, ভারতের উপকূলে পদার্পণ করা যায় না। বাহির হইতে দেখিতে গেলে ভারতবর্ষে প্রবেশ করা, বহু আয়াস ও বহু কষ্টসাধ্য বলিয়া বোধ হয়। যেহেতু, পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে যে, ভারতবর্ষ প্রকৃতির দুর্গম ও দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রকৃতি এত যত্ন করিয়া, যে ভারতবর্ষ আগুলিয়া রাখিয়াছেন, তাহাও চিরকাল বিভিন্ন জাতির আক্রমণের বহির্ভূত থাকে নাই। ইতিহাস দেখাইয়া দিতেছে, ভারতবর্ষের ন্যায় আর কোনও ভূখণ্ড বহুবার বহু বিদেশীকর্ত্তৃক আক্রান্ত হয় নাই। যে সুদূর বিস্তৃত পর্ব্বতমালা ভারতের শীর্ষদেশে বিরাট পুরুষের ন্যায় দণ্ডায়মান থাকিয়া অপূর্ব্ব গাম্ভীর্য্যের পরিচয় দিতেছে, তাহার পশ্চিম দিকে একটি গিরিসঙ্কট প্রকৃতির বিশাল প্রাচীর ভেদ করিয়া দিয়াছে। আফ্ গানিস্থান হইতে ঐ গিরিসঙ্কট অতিক্রম করিতে পারিলেই ভারতবর্ষে উপনীত হওয়া যায়। অতি প্রাচীনকাল হইতে যাঁহারা রাজ্যবিস্তার, প্রভুত্বস্থাপন বা সম্পতিলুণ্ঠনের আশায় ভারতবর্ষে আসিয়াছেন, তাঁহারা প্রায় সকলেই ঐ পথ অবলম্বন করিয়াছেন। ভারতবর্ষ, ঐ পথে নয়জন বিদেশী ভূপতিকর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়াছে।

এই সকল আক্রমণে সময়ে সময়ে ভারতবর্ষের সমূহ ক্ষতি হইয়াছে। ভারতবাসীদিগকে সময়ে সময়ে অশ্রুতপূর্ব্ব দৌরাত্ম্য ও অত্যাচার সহিতে হইয়াছে। শেষে দিল্লীর রত্নসিংহাসনে হিন্দু ভূপতির পরিবর্ত্তে পাঠান ভূপতি সমাসীন হইয়াছেন। ক্রমে মোগল ভূপতির আক্রমণে পাঠান রাজত্বের বিলয় হইয়াছে; ভারতে মোগলসাম্রাজ্যের অভ্যুদয় দেখা গিয়াছে। আবার কালের পরিবর্ত্তনে মোগলসাম্রাজ্যেরও বিলয় ঘটিয়াছে। এইরূপে খ্রীষ্টের ৫০০ বৎসর পূর্ব্ব হইতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্য্যস্ত, ভারতবর্ষে এক আক্রমণকারীর পর অার এক আক্রমণকারী উপনীত হইয়াছেন, এক রাজবংশের পর আর এক রাজবংশের আবির্ভাব হইয়াছে এবং এক শাসনবিধির পরিবর্ত্তে আর এক শাসনবিধির বিকাশ দেখা গিয়াছে। ভারতবর্ষীয়গণ দুই হাজার বৎসরেও অধিককাল বিভিন্ন আক্রমণকারীর অত্যাচার সহিয়াছে, বিভিন্ন রাজবিধি অনুসারে পরিচালিত হইয়াছে এবং বিভিন্ন আচার ব্যবহার, বিভিন্ন সভ্যতার আবির্ভাব ও তিরোভাব দেখিয়াছে।

এইরূপ উপর্য্যুপরি আক্রমণে ভারতবর্ষের ধনরত্ন বিলুণ্ঠিত হইয়াছে বটে, কিন্তু ভারতবর্ষ আত্মগৌরবে জলাঞ্জলি দেয় নাই। যখন পারস্যের অধিপতি দরায়ুস হিস্তাম্পিস্ ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, তখন মহামতি শাক্যসিংহের অমৃতময়ী তত্ত্বকথায় ভারতবর্ষ সঞ্জীবিত হইতেছিল, এবং ভারতের ধর্ম্মজ্ঞান, ভারতের সভ্যতা, সমগ্র পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া উঠিয়াছিল। যখন সেকন্দর শাহ সপ্তসিন্ধুর প্রসন্নসলিলবিধৌত পবিত্রভূমিতে সমাগত হয়েন, তখন তৎসহচারী গ্রীকগণ, ভারতবর্ষীয়দিগের সরলতা, সত্যনিষ্ঠা, সদাচার ও জাতীয় গৌরবের অপূর্ব্ব বিকাশ দেখিয়া, অতিমাত্র বিস্ময়ে তাঁহাদের গুণগান করিয়াছিলেন। যখন সুলতান মহমূদ বারংবার ভারতের সম্পত্তিবিলুণ্ঠনে উদ্যত হয়েন, তখনও হিন্দুর আচারব্যবহার, হিন্দুর সভ্যতা অটল ছিল। মহম্মদ গোরীর আক্রমণের পর, যখন দিল্লীতে পাঠান রাজত্বের প্রতিষ্ঠা হয় তখনও ভারতভুমি আপনার সাহিত্য ও আপনার রীতিনীতির সম্মানরক্ষা করিতেছিল। পাঠানরাজত্বেই বঙ্গের গৌরব বদ্ধমূল হয়। এই সময়ে যেরূপ বাঙ্গালা সাহিত্যের বিকাশ হয়, সংস্কৃতচর্চ্চার শ্রীবৃদ্ধি হয়, এবং ধর্ম্মানুশীলনের উন্নতি হয়, সেইরূপ বঙ্গের শিল্পবাণিজ্যেরও গৌরববৃদ্ধি হইতে থাকে। গোবিন্দ দাস প্রভৃতি কবিগণ এই সময়ে চিত্তবিমোহিনী কবিতারচনা করিয়া বাঙ্গালা সাহিত্য গৌরবান্বিত করেন। পণ্ডিত বাসুদেব সার্ব্বভৌম এই সময়ে ন্যায়শাস্ত্রের আলোচনা করিয়া নবদ্বীপ উজ্জ্বল করিয়া তুলেন, রঘুনাথ শিরোমণি এই সময়ে চিন্তামণিদীধিতিপ্রণয়ন করিয়া সমগ্র সভ্যজগতে চিরপ্রসিদ্ধি লাভ করেন, আর চিরপবিত্র ভগবৎপ্রেমে বিশ্ববিজয়ী বিশ্বস্তর এই সময়ে চৈতন্য নামে পরিচিত হইয়া, মোহাচ্ছন্ন জগতে চেতনা সঞ্চারিত করেন। পক্ষান্তরে বাঙ্গালার সোণারূর অলঙ্কার,—বাঙ্গালার কাপড়, এই সময়ে সর্ব্বত্র আদরসহকারে পরিগৃহীত হইতে থাকে। ইউরোপের বিলাসিনীগণ স্বদেশের বস্ত্র দূরে ফেলিয়া, ঢাকার মস্লিনের সম্মান করিতে থাকেন। মুসলমান ভূপতিগণ আধুনিক ইতিহাসে যথেচ্ছাচারী ও পরানিষ্টকারী বলিয়া নিন্দিত হইতেছেন, অনেক ইঙ্গরেজ ঐতিহাসিক এখন নাসিকা সঙ্কুচিত করিয়া, কলঙ্কের মন্ত্র উচ্চারণ পূর্ব্বক, এই ভূপতিদিগের পরলোকগত আত্মার সন্তৃপ্তিসাধনে প্রয়াস পাইতেছেন, কিন্তু এই যথেচ্ছাচারপরায়ণ অধিপতিগণের রাজত্বে, আমাদের দেশে যে সম্মোহন দৃশ্যের বিকাশ হইয়াছিল, উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে, সুসভ্য ব্রিটিশ রাজত্বে সে দৃশ্যের আবির্ভাব হইতেছে না। তখন আমাদের সাহিত্যে, আমাদের কথপোকথনে, বিজাতীয় ভাবের আবির্ভাব হয় নাই। মাঞ্চেষ্টর তখন আমাদের লজ্জানিবারণের ভার গ্রহণ করে নাই; বার্ম্মিংহাম বা সেফাল্ড, লণ্ডন বা লিবরপুল, তখন আমাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসংগ্রহে তৎপর হয় নাই। যাঁহারা আমাদের সমক্ষে অত্যাচারী বলিয়া পরিকীর্ত্তিত হইতেছেন, তাহাদের রাজত্বে আমাদের জাতীয় ধর্ম্ম অক্ষত ছিল। তখন আমাদের শিল্পদ্রব্য বা আমাদের সভ্যতার বলক্ষয় হয় নাই। এখন ইঙ্গলণ্ডের সাহিত্যচর্চ্চার জন্য অক্ষ্ফোর্ডের যেরূপ সমাদর, সমগ্র ভারতে তখন নবদ্বীপের তদপেক্ষা অধিক সমাদর ছিল। আর্য্যাবর্ত্ত হইতে দক্ষিণাপথ পর্য্যন্ত সমস্ত স্থানের ছাত্রেরা সংস্কৃত শিখিতে নবদ্বীপে আসিত, মুসলমানের রাজত্বে আমাদের শিল্পিগণ যে সমস্ত শিল্পদ্রব্য প্রস্তুত করিত, অপক্ষপাত ঐতিহাসিক আজ পর্য্যন্ত তাহার প্রশংসা করিয়া থাকেন।

পাঠান রাজত্বের পর মোগল রাজত্বের সূত্রপাত হয়। ক্রমে মোগল সম্রাটের বিজয়পতাকা কাবুল হইতে গোলকুণ্ডা পর্য্যন্ত উড্ডীন হইতে থাকে। এ সময়েও আমাদিগকে পরমুখপ্রেক্ষী হইতে হয় নাই। এ সময়ে আমাদের শিল্পিগণ যে সকল দ্রব্য প্রস্তুত করিত, আমরা তৎসমুদায়েরই ব্যবহার করিতাম। বিদেশেও ঐ সকল দ্রব্য আদরসহকারে পরিগৃহীত হইত। আমাদের ভাষাতেও, এ সময়ে, সর্ব্বাংশে জাতীয়ভাব প্রতিফলিত হইত। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চণ্ডী, ঘনরামের শ্রীধর্ম্মমঙ্গল, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল, কবিরঞ্জন রামপ্রসাদের সঙ্গীতাবলী, এ সময়ে বাঙ্গালা সাহিত্য উজ্জ্বল করে। ভারতের মস্লিন প্রভৃতি, এ সময়েও, ইঙ্গলণ্ড ও ফ্রান্সের ভূপতিদিগকেও বিস্মিত করিয়া তুলে। ভারতীয় বিচিত্র কারুকার্য্য ও প্রাসাদাবলির অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্য, এ সময়েও, ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদিগের হৃদয় আকৃষ্ট করে। এ সময়ে ভারতের বীরপুরুষগণ যেরূপে বীরত্বকীর্ত্তির সম্মান রক্ষা করিতেন, শিল্পিগণ যেরূপ নৈপুণ্যসহকারে শিল্পকার্য্যে ব্যাপৃত থাকিতেন, কবিগণ যেরূপ মধুরভাবে জাতীয় ভাবের পরিচয় দিতেন, অদ্যাপি ঐতিহাসিকগণ, আহ্লাদ ও প্রীতির সহিত তাহার বর্ণনা করিয়া থাকেন। রাজা মানসিংহ মোগলের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপিত করিলেও স্বজাতিসমাজে সম্মানরক্ষায় সমর্থ হয়েন নাই, মৌলবীগণের প্রাধান্যেও জাতীয় সাহিত্যের অবমাননা ঘটে নাই, এবং বিধর্ম্মী ও বিজাতির সংঘর্ষেও জাতীয় শিল্পেব গৌরব অন্তহিত হইয়া যায় নাই। মোগল রাজত্বে মিবার জাতীয় গৌরবে উন্নত ও জাতীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া মহান্ স্বার্থত্যাগের পরিচয় দেয়। যদি ইতিহাসের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করা যায়, পৃথিবীর মধ্যে কোন জাতি বহু শতাব্দীর অত্যাচার সহিয়াও আপনাদের সভ্যতা অক্ষত ও আপনাদের জাতীয় গৌরবের প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছে, তাহা হইলে নিঃসন্দেহ এই উত্তর পাওয়া যাইবে, মিবারের রাজপুতগণই সেই অদ্বিতীয় জাতি। যুদ্ধের পর যুদ্ধে মিবার হৃতসর্ব্বস্ব হইয়াছে, অসির পর অসির আঘাতে রাজপুতের দেহ ক্ষত বিক্ষত হইয়া গিয়াছে, বিজেতাব পর বিজেতা আসিয়া আপনাদের সংহারিণী শক্তির পরিচয় দিয়াছে, কিন্তু মিবার কখনও চিরকাল অবনত থাকে নাই। মানবজাতির ইতিহাসে কেবল মিবারের রাজপুতেরাই বিজেতার সহিত মিশিয়া, আপনাদের জাতীয় গৌরবে জলাঞ্জলি দেয় নাই। রোমকগণ ব্রিটনদিগের উপর আধিপত্যস্থাপন করিলে, ব্রিটনেরা বিজেতার সহিত একবারে মিশিয়া যায়। তাহাদের পবিত্র বৃক্ষের সম্মান, তাহাদের পবিত্র বেদীর ময্যাদা, তাহাদের পুরোহিতগণের প্রাধান্য, সমস্তই অতীত সময়ের গর্ভে বিলীন হয়। মিবারের রাজপুতেরা কখনও এরূপ রূপান্তর পরিগ্রহ করে নাই। তাহারা অনেকবার ভূসম্পত্তি হইতে স্খলিত হইয়াছে, কিন্তু কখনও আপনাদের পবিত্র ধর্ম্ম বা পবিত্র আচারব্যবহার হইতে বিচ্যুত হয় নাই। ব্রিটিশ ভূমি যাহা দেখাইতে পারে নাই, জগতের ইতিহাসে মিবার তাহা দেখাইয়াছে।

মোগল সাম্রাজ্যের ভগ্নদশায়, ভারতে ইঙ্গরেজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ইঙ্গরেজ সৈন্যসামন্ত লইয়া ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন নাই। ভারতবর্ষ ইঙ্গরেজের বিজয়লব্ধ সম্পত্তির মধ্যেও পরিগণিত নহে। ইঙ্গরেজ সামান্য বণিকের ভাবে, ক্রয়বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এদেশে উপনীত হয়েন, শেষে এতদ্দেশীয়ের সাহায্যে ভারতের রত্নসিংহাসন অধিকার করেন। ইঙ্গরেজ ভারতের আক্রমণকারী না হইলেও ভারতে সুবিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। আয়তনে ও পরিমাণে, ইঙ্গরেজের ভারতসাম্রাজ্য মোগল সাম্রাজ্যকেও অধঃকৃত করিয়াছে। ভারতবর্ষীয়গণ যখন এই বৃহৎ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠায় ইঙ্গরেজের সহায় হয়, তখন তাহারা মনেও ভাবে নাই যে, ইঙ্গরেজের অধিকারে তাহাদিগকে সর্ব্বাংশে পরমুখপ্রেক্ষী হইতে হইবে। তাহাদের গৃহকার্য্যের উপযোগী সামান্য বস্তুটির জন্যও ইঙ্গরেজের অনুগ্রহ প্রার্থনা করিতে হইবে। ভারতবাসী তখন যাহার কল্পনাও করে নাই, যাহা তখন তাহাদের চিন্তার অগম্য ও ধারণাব অতীত ছিল, এখন কার্য্যতঃ তাহাই ঘটিয়াছে। “খ্রীষ্টের ৫৫ বৎসর পূর্বে যখন পরাক্রান্ত জুলিয়স্ সীজর কয়েক সহস্র সৈনিক পুরুষ লইয়া ব্রিটেনিয়ার উপকূলে উপনীত হয়েন, তখন তিনি ইহা দেখিয়াই নিরতিশয় দুঃখিত হইলেন যে, যাহাদের সহিত তাঁহার যুদ্ধের আয়োজন হইয়াছে, তাহারা অর্দ্ধমনুষ্য ও অর্দ্ধপশু। অপক্ব মাংস তাহাদের আহারীয়, ভূগর্ত্ত বা ভূগর্ত্তের ন্যায় মৃন্ময় কুটীর তাহাদের আবাসগৃহ, তরুশাখা তাহাদের বিনোদক্ষেত্র, তাহাদের দেহ বিবিধ বর্ণে চিত্রিত এবং তাহাদের ভাষা বিকটশব্দের দ্যায় শ্রুতিকঠোর। আর যখন বীরচূড়ামণি সেকেন্দর শাহ, জুলিয়স্‌ সীজেররও প্রায় ৩০০ বৎসর পূর্ব্বে, পারস্য হইতে পঞ্চনদের পবিত্র ভূমিতে সমাগত হয়েন, তখন তিনি ও তদীয় সহচরবর্গ ইহা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন যে, তাঁহারা স্বদেশে থাকিয়া, যাহাদিগকে একপ্রকার অসভ্য মনে করিতেন, তাঁহারা সভ্যতায় গ্রীকদিগেরও শিক্ষাগুরু। তাঁহারা রূপে অতুল্য ও বীরত্ব, দয়া, দাক্ষিণ্য প্রভূতিগুণে বিভূষিত, তাহাদের সুরম্য সৌধসমাকীর্ণ নগর বিবিধ ভোগ্য বস্তুতে পরিপূর্ণ, তাহাদের আচারব্যবহার সর্ব্বথা পরিশুদ্ধ ও পরিমার্জ্জিত এবং তাহাদের ভাষা মন্দাকিনীর মৃত্যুতরঙ্গভঙ্গীজন্য কলনাদের ন্যায় শ্রুতিমধুর ও মনোমদ।” গ্রীক পণ্ডিতগণ ইহা দেখিয়া হিন্দুদিগকে আপনাদের শিক্ষাগুরুর পদে প্রতিষ্ঠিত করেন। হিন্দুর সভ্যতা, হিন্দুর বিজ্ঞান, হিন্দুর দর্শন, ক্রমে গ্রীসে প্রচারিত হয়। বহু শত বৎসর পরে, ঐ জ্ঞানালোক অসভ্যভূমি ইঙ্গলণ্ড আলোকিত ও সভ্যতার শ্রীসম্পন্ন হইয়া উঠে। সেকন্দর শাহের আক্রমণে এইরূপে ভারতের সহিত ইউরোপের সংযোগ ঘটে। কে ভাবিয়াছিল, এই সংযোগে বহুযুগের পর ভারতের দশাবিপর্য্যয় ঘটিবে? যাহারা অমানুষভাবে জুলিয়স সীজরের বিস্ময় জন্মাইয়াছিল, কে ভাবিয়াছিল, তাহারা বহুযুগের পর সভ্যতাসম্পন্ন শ্রীসম্পন্ন ও শক্তিসম্পন্ন হইয়া, সভ্যতাজননী ভারতভূমির ভিক্ষাদাতা হইয়া উঠিবে? আর যাহারা এক সময়ে আচারব্যবহারে, ধনসম্পত্তিতে, শিল্পবিজ্ঞানে, গ্রীকদিগেরও বরণীয় ছিল, কে ভাবিয়ছিল, তাহারাই এখন জাতীয়ভাবে জলাঞ্জলি দিয়া, গ্রীসের শিষ্যস্থানীয় রোমের নির্জ্জিত, সেই ব্রিটিশ জাতির দ্বারে সর্ব্ববিষয়ে ভিক্ষাপ্রার্থী হইবে? কালের পরিবর্ত্তনে দুইটি বিভিন্ন জাতি এখন এইরূপ পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। এক জাতির কিছুতেই তৃপ্তি হয় না, কিছুতেই সন্তোষ জন্মে না, এবং কিছুতেই ক্রিয়ার বিরতি ঘটে না। আর এক জাতির নিয়তই তৃপ্তি ও নিয়তই ক্রিয়ার বিরতি। সুতরাং এক জাতি নিত্য ক্রিয়ান্বিত, উদ্যমসম্পন্ন ও চিরনিদ্রাহীন, আর এক জাতি ক্রিয়াশূন্য, আলস্যমগ্ন ও চিরনিদ্রাভিভূত। ইঙ্গরেজ এখন কর্ম্মশীলতায় শ্রেষ্ঠ পদ অধিকার করিয়াছেন। হিন্দু এখন কর্ম্মহীনতায় ইঙ্গরেজের দোষরাশির অনুকরণ করিয়া, পূর্ব্বতন গৌরব বিস্মৃত হইয়াছেন।

অনুকরণশূন্যতা ও একতা না হইলে, জাতীয় ভাবের পরিপুষ্টি হয় না। আমাদের জাতীয় ভাবের অবনতির প্রধান কারণ, অনুকরণপ্রবণতা ও অনৈক্য। এ অংশে আমরা যতদূর অধঃপতিত হইয়াছি, পাঞ্জাবী, হিন্দুস্থানী বা মহারাষ্ট্রীয় ততদূর হয়েন নাই। আমাদের পরিচ্ছদে, আচারব্যবহারে, ভাষায়, নিয়তই বৈষম্য রহিয়াছে। পরিচ্ছদে জাতীয় ভাবের পরিচয় হইয়া থাকে। প্রত্যেক জাতিরই এক একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ আছে। কিন্তু আমাদের বাঙ্গালী জাতির এরূপ পরিচ্ছদসাম্য নাই। আমরা বিভিন্ন পরিচ্ছদে দেহ সজ্জিত করিয়া, হীন অনুকরণের প্রাধান্যরক্ষায় যত্নশীল হই। কোনও মজ্‌লিসে উপস্থিত হইলেই বাঙ্গালীর পরিচ্ছদবৈচিত্র্য দৃষ্টিগোচর হয়। যে স্থলে এরূপ বৈষম্য, সেস্থলে জাতীয়ভাব রক্ষিত হইতে পারে না। এখন আমাদের মধ্যে অনেকেই বিলাতে যাইতেছেন। যাঁহারা বিলাতযাত্রা করেন, প্রায় তাঁহারাই হ্যাট্‌ কোট্‌ পরিয়া, সাহেবী চালচলন শিখিয়া, আমাদের সমক্ষে কিম্ভূতকিমাকার জীবরূপে আবির্ভূত হয়েন। আচারে, পরিচ্ছদে, কার্য্যে, কথাবার্তায়, কিছুতেই তাঁহাদের সহিত আমাদের সমতা থাকে না। তাঁহারা মিল ও বেস্থাম গলাধঃকরণ করিয়াও, নিরবচ্ছিন্নভাবে বৈষম্যনীতিরই পরিচয় দেন। তাঁহারা সেই সাহেবী সাজে সভাস্থলে দণ্ডায়মান হইয়া, জলদগম্ভীর স্বরে স্বদেশহিতৈষিতার গৌরবঘোষণা করেন, এবং ম্যাট্‌সিনি ও গারিবল্‌দির নামোল্লেখ করিয়া, স্বদেশীয়ের হৃদয়ে তাড়িতপ্রবাহ সঞ্চারিত করিতে প্রয়াসবান্‌ হয়েন। কিন্তু তাঁহারা আপনারাই যে, স্বদেশ ও স্বজাতি হইতে বিচ্ছিন্ন, তাহা একবারও মনে করেন না। তাঁহাদের আরাধ্য ম্যাট্‌সিনি বা গারিবলদি যদি বিজাতীয় ভাবে অনুপ্রাণিত ও বিজাতীয় পরিচ্ছদে সজ্জিত হইয়া, বিজাতীয় ভাষায় আলাপ করিতেন, তাহা হইলে, ইতালির উদ্ধার হইত কি না, তাহা তাঁহাদের কুশাগ্র বুদ্ধিতে প্রতিভাত হয় না। তাঁহাদের হিতৈষিতা থাকিতে পারে, ভূয়োদর্শন থাকিতে পারে, কার্য্যপটুতা থাকিতে পারে, কিন্তু একমাত্র বৈষম্যবুদ্ধির বিপত্তিপূর্ণ তরঙ্গাঘাতে, তৎসমুদয়ই বিজাতীয় ভাবের অতল সাগরে নিমজ্জিত হইয়া গিয়াছে।

শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুত রাজনারায়ণ বসু, তাঁঁহার “একাল আর সেকাল” নামক উপদেশপূর্ণ গ্রন্থে এ বিষয়ে যাহা লিখিয়াছেন, আমি এই স্থলে তাহা উদ্ধৃত করিতেছিঃ—“আমরা সকল বিষয়েই সাহেবদের অনুকরণ করিতে ভালবাসি, কিন্তু বিবেচনা করি না যে, সে অনুকরণ আমাদের দেশের উপযোগী কি না, আর তদ্দ্বারা আমাদের দেশের প্রকৃত উপকার সাধিত হইবে কি না? সাহেবেরা পর্য্যন্ত, যে সাহেবী প্রথা এদেশের উপযোগী নহে, মনে করেন, তাহাও আমরা অবলম্বন করিতে সঙ্কুচিত হই না। সাহেবেরা নিজে বলিয়া থাকেন, সাহেবী পোশাক কোনও মতে এদেশের উপযুক্ত নয়; কিন্তু আমাদের দেশের কোনও কোনও ব্যক্তি ঐ পোশাক ব্যবহার করিতে সঙ্কুচিত হয়েন না। আমাদের দেশের কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি ভূতপূর্ব্ব লেপ্‌টেনেন্ট গবর্ণর বীডন সাহেবের সহিত ধুতি চাদর পরিয়া দেখা করিতে যাইতেন। তাহাতে গবর্ণর সাহেব বিরক্তি প্রকাশ করিতেন। একবার গ্রীষ্মের সময় দেখা করিতে গিয়াছেন, গিয়া দেখেন যে, গবর্ণর সাহেব ঢিলে পাজামা ও পাতলা কামিজ পরিয়া বসিয়া আছেন। আমাদের বন্ধুকে দেখিবামাত্র তিনি বলিলেন, ‘তোমাকে দেখিয়া আমার হিংসা হচ্ছে, ইচ্ছা করে তোমাদের ন্যায় পরিচ্ছদ পরিয়া থাকি।’ আমাদের বন্ধু উত্তর করিলেন, ‘তাই কেন করুন না?’ রীডন সাহেব বলিলেন, ‘ওরূপ পরিচ্ছদ পরিধান করা আমাদের দেশাচারবিরুদ্ধ, সুতরাং কেমন করিয়া করি।’ আমাদের বন্ধু উত্তর করিলেন, ‘আপনাদের বেলা দেশাচার বলবৎ, আর আমাদের বেলা কিছুই নহে, আপনারা এরূপ বিবেচনা করেন কেন?” আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয়, এই সদাশয় মহাপুরুষ গবর্ণরের সমক্ষে যেরূপ স্বাধীনভাবে জাতীয় রীতি রক্ষা করিয়াছিলেন, তদনুরূপ আচরণ করা আমাদের সর্ব্বথা কর্ত্তব্য।

পরিচ্ছদ ও আচার ব্যবহারের ন্যায়, সাহিত্যে, শিক্ষায় ও কথাবার্ত্তা প্রভৃতিতে জাতীয়ভাব পরিস্ফুট হইয়া থাকে। কিন্তু এ বিষয়েও আমাদের মধ্যে নানারূপ বিড়ম্বনা দেখা যায়। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ, হরুঠাকুর, রামবসু, ঈশ্বরগুপ্ত প্রভৃতির রচনা কেমন সুন্দর ও সহৃদয়তার উদ্দীপক। পড়িবামাত্র তাহা বাঙ্গালীর বিশুদ্ধ সম্পত্তি বলিয়া বোধ হয়। তাহাতে বিজাতীয়ভাবের আবিলতা নাই, বিজাতীয় ভাষার কুটিল বিভ্রম নাই এবং বিজাতীয় সভ্যতার বিচিত্র আবেশ নাই। তাহা প্রসন্নসলিলা জাহ্নবীর জলপ্রবাহের ন্যায় নিয়তই স্বচ্ছ, নিয়তই আবিলতাবর্জ্জিত ও নিয়তই জীবনতোষিণী। ইদানীন্তন কবিগণের রচনায়, সেরূপ সহৃদয়তা বা সেরূপ বিশুদ্ধির অভাব দৃষ্ট হয়। ইদানীন্তন গ্রন্থকার ইঙ্গরেজীতে শিক্ষিত ও ইঙ্গরেজীভাবে অনুপ্রাণিত, সুতরাং তাহার রচনাও ইঙ্গরেজীর গন্ধবিস্তার করে। জাতীয় সাহিত্যের সম্যক্ অনুশীলন না হইলে ইহার প্রতীকার হইবে না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায়, ইঙ্গরেজী অনুবাদের প্রশ্নে, যেরূপ অপূর্ব্ব বাঙ্গালার সৃষ্টি হইতেছে, আমাদের জাতীয় ভাষার কিরূপ অসম্মান ঘটিতেছে, তাহাতেই স্পষ্ট বোধ হইবে। কোনও স্বাধীন দেশে, মাতৃভাষার এরূপ অবমাননা ঘটিলে,—অপরের সমক্ষে মাতৃভাষা এরূপ উপহাসাস্পদ হইলে, তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইত। মাতা ও মাতৃভাষা, উভয়ই সমান আদর, সম্মান ও শ্রদ্ধার অধিকারিণী, মাতার স্তন্যে যেরূপ আমরা পরিপুষ্ট ও মাতার স্নেহে যেরূপ আমরা পরিবর্দ্ধিত হই, জাতীয় ভাষার গুণে, সেইরূপ আমাদের জাতীয় ভাবের উন্মেষ হয়। মাতা অামাদিগকে মানুষ করেন, জাতীয় ভাষা অামাদিগকে প্রকৃত মনুষ্যত্বের পথে লইয়া যায়। মাতার অসম্মান ও জাতীয় ভাষার অসম্মান, উভয়ই তুল্য। উভয়ই অবজ্ঞাত ও উপেক্ষিত হইলে, জাতীয় – গৌরববৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে না। এজন্য, পিতৃভাষা সংস্কৃতের সহিত মাতৃভাষা বাঙ্গালার অালোচনা করা কর্ত্তব্য।

যে শিক্ষায় স্বজাতিপ্রেমের বিকাশ ও স্বজাতিপ্রিয়তার গৌরববৃদ্ধি না হয়, সে শিক্ষায় জাতীয় ভাব পরিপুষ্ট হয় না। এখন কোমলমতি বালকেরা ইঙ্গরেজী পড়িতে বসিয়া, কেবল বিদেশীভাবেরই দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করে। ডুবাল বা রস্কো তাঁহাদের অধ্যবসায় বা সহিষ্ণুতাশিক্ষার প্রথম পথপ্রদর্শক হয়েন, ওয়েলিংটন বা ওয়াসিংটন তাঁহাদের সমক্ষে বীরত্বজ্ঞানবিকাশ করেন, লুথর বা জেবিয়ার তাহাদিগকে ধার্ম্মিক হইতে শিক্ষা দেন। রঘুনাথ বা জগন্নাথ যে, তাহাদের অধ্যবসায় ও সহিষ্ণুতাশিক্ষার আদর্শ; প্রতাপসিংহ বা প্রতাপাদিত্য যে, তাহাদের বীরপুরুষ; বুদ্ধ বা চৈতন্য যে, তাহাদের ধর্ম্মপ্রচারক, তাহা তাহাদিগকে বুঝাইয়া দেওয়া হয় না। পূজনীয় অার্য্য পিতৃপুরুষের অবদানপরম্পরার অালোচনা করিলে যে, দেশভক্তি, স্বজাতিপ্রীতি এবং আত্মাদর ও আত্মসম্মানের আবির্ভাব হয়, শিক্ষার্থীরা, বাল্যকাল হইতেই তাহাতে বঞ্চিত থাকে। এইরূপ উদাসীন শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে, তাহাদের মানসিক ভাবও ঔদাসীন্যে পূর্ণ হয়। চীন যে অদ্যাবধি চীনই আছে, ইউরোপ বা আমেরিকায় পরিবর্ত্তিত হয় নাই, জাতীয় ভাবের শিক্ষাই তাহার প্রধান কারণ। চীন আধুনিক সভ্যসমাজে অবজ্ঞাত হইতে পারে, কিন্তু এক সময়ে চীনের পরিব্রাজক, চীনের ধর্ম্মপ্রচারক ও চীনের শিল্পকারক যে শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করিয়াছিলেন, অদ্যাপি চীন সেই পথে অটল রহিয়াছে। জাতীয়ভাবমূলক শিক্ষা না হইলে, চীন এরূপ অটলতার পরিচয় দিতে পারিত না।

আমাদের কথোপকথনেও হীন অনুকরণ পরিদৃষ্ট হয়। যাঁহারা জন্মান্তরীণ সুকৃতির বলে যৎসামান্য ইঙ্গরেজী শিখিয়া, আপনাদিগকে কৃতার্থ বোধ করিতেছেন, তাঁহারাও কথাবার্তায় বার অানা ইঙ্গরেজী শব্দ ব্যবহার না করিয়া থাকিতে পারেন না। ইহা যে, তাঁহাদের জাতীয়ভাবশূন্যতা ও হীন অনুকরণের পরিচয়, তাহা তাঁহারা মনেও ভাবেন না। এসম্বন্ধে রাজনারায়ণ বাবুর একাল আর সেকালে এইরূপ উপদেশগর্ভ কথা লিখিত হইয়াছেঃ—“আমরা এক্ষণে যেরূপ কথা কহি, তাহা শুনিলে ইংরেজেরা কিংবা অন্য কোনও বিদেশীয় লোক হাস্য না করিয়া থাকিতে পারে না, সেকালের লোক কৌতুকের জন্য ইংরাজী বাঙ্গালা শব্দ মিশাইয়া ছড়া প্রস্তুত করিতেন। যথা,—

‘শ্যাম Going মথুরায়, গোপীগণ পশ্চাৎ ধায়,
বলে your okroor uncle is a great rascal।’

আমরা কৌতুকের জন্য নহে, গম্ভীরভাবে ঐরূপ ভাষায় কথা কহি। কিন্তু আমরা নিজে বুঝিতে পারি না যে, তাহা কতদূর হাস্যাস্পদ। আমার father yesterday কিছু unwell হওয়াতে Doctor কে call করা গেল, তিনি একটি physic দিলেন। physic বেস্ operate করে ছিল, four five times motion হোলো, অদ্য কিছু better বোধ কোচ্চেন।’ এ বিড়ম্বনা কেন? সমস্তটা বাঙ্গালায় না বলিতে পার, কেবল ইংরেজিতে বল না কেন? তাহা অপেক্ষাকৃত ভাল। কোনও কোনও স্থলে ইংরেজী শব্দ ব্যবহার না করিলে চলে না; যথা ডেস্ক, বেঞ্চ, টাউনহল, গবর্ণরজেনেরল প্রভৃতি। কিন্তু যে স্থলে বাঙ্গালা শব্দ অনায়াসে ব্যবহার করা যাইতে পারে, সে স্থলে ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করা অন্যায়। যাঁহারা ইংরেজী কিছু জানেন না, ইংরেজী ভাষাজ্ঞতা জানাইবার জন্য, তাঁহারা বাঙ্গালার সঙ্গে আরো ইংরেজী শব্দ মিশাল করিয়া বলেন। * * ইংরেজী গ্রন্থকর্ত্তা সদি (Southey) বলিয়াছেন, ‘আমাদিগের ভাষা অতি মহৎ ভাষা, অতি সুন্দর ভাষা। ইংরেজী ও জর্ম্মাণ ভাষার পরস্পর জ্ঞাতিত্ব অনুরোধে জর্ম্মাণভাষোৎপন্ন শব্দ ব্যবহার আমি ক্ষমা করিতে পারি, কিন্তু যেখানে একটি খাঁটি ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করা যাইতে পারে, সেখানে যে ব্যক্তি লাতিন অথবা ফ্রেঞ্চ শব্দ ব্যবহার করে, মাতৃভাষার প্রতি বিদ্রোহাচরণজন্য তাহাকে ফাঁসি দিয়া, তাহার শরীর খণ্ডবিখণ্ড করা উচিত।’ যাঁহারা বাঙ্গালা কথোপকথনের সময় ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করেন, তাঁহাদের একবারে এরূপ উৎকট দণ্ড না করিয়া, প্রথমে একটি ভদ্র উপায় অবলম্বন করিলে ভাল হয় । যদি দেখা যায়, ভদ্রতায় কিছু হইল না, শেষে সদিবিহিত দণ্ড অাছে। সে ভদ্র উপায় এই,—যখন কেহ ইংরেজী মিশাইয়া কথা কহিবেন, তখনই বলা যাইবে ‘ভাষায় আজ্ঞা হউক।’ এ বিষয়ে একটি গল্প আছে। এক ব্রাহ্মণের একটি শ্যামা প্রতিমা ছিল। সেই শ্যামা দেবীমূর্ত্তি তাঁহার উপজীবিকার একমাত্র উপায় ছিল। লোকে সেই ঠাকুরাণীর পূজা দিত, তাহাতে তাঁহার গুজরাণ হইত। একদিন তিনি গাঁজাটি টেনে দেবালয়ের দ্বারে বসিয়া আছেন, মনে হইল, দেবী ঘরের ভিতর হইতে তাঁহার সঙ্গে কথা কহিতেছেন। দেবতারা কখনই ভাষায় কথা কহেন না, দেববাণী সংস্কৃতেই কথা কহিয়া থাকেন; তিনি ত সংস্কৃত জানেন না, অতএব দেবীকে বলা হইল, ‘মা! আমি অতি মূঢ়; ভাষায় আজ্ঞা হউক।’ এই ‘ভাষায় আজ্ঞা হউক’ কথাটা আমাদিগকে শিখিয়া রাখিতে হইবে। ইংরেজী শব্দ মিশাইয়া, কেহ বাঙ্গালা বলিলেই ঐ কথা বলিতে হইবে।” আমি প্রসঙ্গসঙ্গতিক্রমে শ্রদ্ধাস্পদ রাজনারায়ণ বাবুর উৎকৃষ্ট উপদেশ সমস্ত উদ্ধৃত করিলাম। এই উপদেশ মনে না রাখিলে আমাদের জাতীয় ভাবের উন্মেষ হইবে না।

কেবল কথোপকথনে নয়, চিঠিপত্র লিখিতেও এক্ষণে ইঙ্গরেজীর ছড়াছড়ি হয়। স্বদেশীয় পত্র লিখিতে, যে স্থলে স্বদেশীয়কে ভাষার ব্যবহার করিলে চলে, সে স্থলে বিদেশীয় ভাষার আশ্রয় গ্রহণ করা জাতীয়গৌরবের লক্ষণ নয়। অনেকে আবার আপনাদের নাম পর্য্যন্ত ইঙ্গরেজের নামের আকারে পরিণত করিয়াছেন। তাঁহারা ধুতি চাদর ছাড়িয়া হ্যাট কোট ধরিয়াছেন। সুতরাং হেমেন্দ্রনাথ মিত্রও এক্ষণে H. N. Mitterএ পরিণত হইয়াছেন। জাতীয়ভাবেব অধোগতি এইরূপে আমাদের প্রতি কার্য্যে পরিস্ফুট হইতেছে। বিজাতীয় শিক্ষা, যেমন আমাদিগকে ধীরে ধীরে বিজাতীয়ভাবে সংগঠিত করিতেছে, বিজাতীয় পদ্ধতি সেইরূপ আমাদের অন্তঃপুরচারিণী মহিলাদিগকেও বিজাতীয়ভাবে পরিণত করিয়া তুলিতেছে। অবলা চিরদিনই প্রীতির পুত্তলী, এবং অবলা চিরদিনই কোমল হৃদয়ের কোমলতর গুণে আরাধ্যা দেবী। কিন্তু, বিজাতীয়ভাবমূলকশিক্ষায়, আমাদের অবলাগণের কোমলতার গুণ সকল অন্তর্হিত হইতেছে; তৎপরিবর্ত্তে পুরুষোচিত কঠোর গুণ সকলই স্থান পরিগ্ৰহ করিতেছে। তাঁহাদের নামগুলি পর্য্যন্ত বিকৃত হইয়া বিজাতীয় ভাবের প্রাধান্যঘোষণা করিতেছে। এখন কুমুদিনী কারফরমা, বিনোদিনী বটব্যাল, ভবসুন্দরী ভট্টাচার্য্য, রত্নমণি রায়, গঙ্গামণি গঙ্গোপাধ্যায়, আমাদের সম্মুখে নিরন্তর বিভীষিকাময়ী ছায়াবিস্তার করিতেছেন। কোমলতাময়ী কামিনীগণের কমনীয় নামগুলির এইরূপ দুর্দ্দশা দেখিলে কাহার হৃদয়ে বেদনা বোধ না হয়? এইরূপ নামে স্ত্রী, কি পুরুষ, অনেক সময়ে তাহারই নিরূপণ করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠে। স্ত্রীশিক্ষার এইরূপ শোচনীয় পরিণাম,—জাতীয়ভাবের এইরূপ শোচনীয় অধঃপতন, আমাদের দেশে কখনও ঘটে নাই। যে, অবলা জাতীয়ভাবে পরিচালিত ও জাতীয় শিক্ষার অনুবর্ত্তিনী হয়েন, তিনি ভূলোকে থাকিয়াও স্বর্গস্থিতা দেবী বলিয়া পূজিতা হইয়া থাকেন, এবং এই রোগশোকময়—এই পাপতাপজর্জ্জরিত সংসারে, জীবনতোষিণী শান্তির অমৃতময়ী ধারায় সকলকে সন্তৃপ্ত করেন। বর্ত্তমান সময়েও এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল নহে। স্বর্গীয়া মহারাণী শরৎসুন্দরীর পবিত্র নাম আমাদের জাতীয় গৌরবের বিষয়ীভূত হইয়া রহিয়াছে। শরৎসুন্দরী অল্পবয়সেই পতিহীনা, কঠোরব্রহ্মচর্য্যপরায়ণা তপস্বিনী; প্রভূত সম্পত্তির অধিকারিণী হইয়াও, চিরকাল বিষয়বাসনাপরিশূন্যা, পবিত্রতাময়ী মহাদেবী। আধুনিক নারীসমাজে যাহা শিক্ষা বলিয়া অভিহিত হইতেছে, সে অংশে শরৎসুন্দরী অশিক্ষিতা হইতে পারেন, কিন্তু আধুনিক শিক্ষাভিধানে এই অশিক্ষিতা রমণী পবিত্র চরিত্রে, গভীর হিতৈষিতায়, অপূর্ব্ব ধর্ম্মাচরণে, যেরূপ অশান্তির মধ্যে শান্তির রাজ্যবিস্তার করিয়াছিলেন, তাহা সমগ্র সভ্যসমাজের সমগ্র সুশিক্ষিতা রমণীরও অনুকরণীয়।

ফলতঃ, সকল বিষয়েই বিজাতীয় ভাবের অনুকরণ করিলে যেরূপ জাতীয়ভাব বিনষ্ট হয়, সেইরূপ বলবীর্য্যেরও হানি হইয়া থাকে। যাহা আমাদের জাতীয় প্রকৃতির সহিত সমঞ্জসীভূত, আমাদের তদনুসারেই চলা কর্ত্তব্য। আমাদের জাতীয় রীতি অনুসারে যে সকল ব্যায়াম ছিল, এখন তৎসমুদয়ের বিলোপ হইয়াছে, আমাদের মহিলাগণ পূর্ব্বে শ্রমশীলা ছিলেন, আধুনিক শিক্ষায়, ইদানীন্তন সময়ে মহিলারা বিলাসিনী হইয়া পড়িতেছেন। প্রকৃতির পরিবর্ত্তনে,— অনুকরণের হীনতায় আমাদের দিন দিন অধোগতি হইতেছে। সমাজহিতৈষী সংস্কারক, ললাটফলক আকুঞ্চিত করিয়া, বিস্ফারিতনেত্রে গম্ভীরভাবে কহিতেছেন, বাল্যবিবাহ সমস্ত দোষের আকর। এই জন্য ভারতবাসীর বলবীর্য্যের অপচয় ঘটিতেছে। ইঙ্গরেজ বাল্যবিবাহের দোষকীর্ত্তন করিতেছেন, সংস্কারকও তদনুকরণে যৌবনবিবাহের গৌরবঘোষণায় প্রবৃত্ত হইতেছেন। যখন আমাদের দেশে ইঙ্গরেজী শিক্ষা প্রবর্ত্তিত হয় নাই, আমাদের সমাজে ইঙ্গরেজী সভ্যতা গতি প্রসারিত করে নাই, আমাদের অস্থিতে অস্থিতে, মজ্জায় মজ্জায়, ইঙ্গরেজের রীতি নীতি প্রবিষ্ট হয় নাই, তখনও আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। বাল্যবিবাহের প্রতি এখন যে দোষের আরোপ করা হইতেছে, তখন সে দোষের ফল প্রত্যক্ষীভূত হয় নাই। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে, যখন প্রতাপান্বিত মোগল সম্রাট আকবর শাহ, ভারতের উত্তরে ও দক্ষিণে, পূর্ব্বে ও পশ্চিমে বিজয়িনী শক্তি,বদ্ধমূল করিতেছিলেন, “দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো বা” ধ্বনি যখন শতসহস্র কণ্ঠ হইতে উচ্চারিত হইতেছিল, দুই এক দল ইউরোপীয় বণিক যখন ভারতের এক প্রান্তে, সামান্য বিপণীর মধ্যে, ক্ষতিলাভের গণনা করিতেছিল, ভারতবর্ষ যখন হিন্দুর মন্ত্রণায় পরিচালিত ও হিন্দুর বাহুবলে রক্ষিত হইয়া স্ব-তন্ত্র শাসননীতির মহিমার পরিচয় দিতে ছিল, তখন সুদূর দক্ষিণাপথে মালজী ভোস্‌লা-নামক একজন সম্ভ্রান্ত মহারাষ্ট্রীয়ের শাহজীনামে একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। শাহজীর বয়স যখন পাঁচ বৎসর, তখন একদা মালজী তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া, দোলের উৎসবে যদুরাওনামক একজন মহারাষ্ট্রীয়প্রধানের ভবনে গমন করেন ৷ যদুরাওর জিজিবাই নামে একটি তিন বৎসরের দুহিতা ছিল। বালিকা প্রফুল্লচিত্তে পঞ্চবর্ষীয় শাহজীর সহিত আবির খেলিতে প্রবৃত্ত হয়। এই সূত্রে, উভয়ের পিতা, উভয়ের মধ্যে পরিণয়সম্বন্ধ স্থির করেন। চারি বৎসর পরে, অর্থাৎ দশমবর্ষীয় শাহজীর সহিত, অষ্টমবর্ষীয়া জিজিবাইর বিবাহ হয়। এই বিবাহে সে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তাহার বীরত্বে ও তাহার পরাক্রমে, দুর্জ্জয় মোগল সাম্রাজ্যও বিচলিত হয়। ভারতের অদ্বিতীয় সম্রাট আরঙ্গজেবও তাহার লোকাতীত ক্ষমতার নিকট মস্তক অবনত করেন। বাল্যবিবাহের ফল,—প্রাতঃস্মরণীয় শিবজী, হিন্দুজয়ী মুসলমানের মধ্যে স্বাধীন হিন্দুরাজত্বের প্রতিষ্ঠা করিয়া বীরেন্দ্রসমাজের বরণীয় হয়েন। ইহার একশতাব্দী পরে, ভারতের উত্তর প্রান্তে, পঞ্চনদের বিশাল ক্ষেত্রে, আর একটি মহাশক্তির আবির্ভাব হয়। ব্রিটিশসিংহের সমক্ষে, পঞ্জাবকেশরী রণজিৎ সিংহ পঞ্জাবের স্বাধীন ভূপতি বলিয়া গৌরবান্বিত হয়েন। যখন রণজিৎ সিংহের জন্ম হয়, তখন তাঁহার পিতা মহাসিংহের বয়স কুড়ি বৎসর। মহাসিংহের অপূর্ণযৌবনে যে সস্তান ভূমিষ্ঠ হয়, তাহার অতুল্য বীরত্বকীর্ত্তি ইতিহাসের পত্রে পত্রে বিরাজ করিতেছে। লর্ড অক্‌লণ্ডের সময়ে কাবুলে ইঙ্গরেজ সৈন্যের যেরূপ দুর্গতি হয়, তাহা ইতিহাসপাঠকের অবিদিত নাই। কূর্দ্দকাবুল গিরিসঙ্কটে, আফগানদিগের আক্রমণে ইঙ্গরেজের ক্ষমতা বিনষ্ট ও ইঙ্গরেজের বহুসৈন্য অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত হয়। বীরত্বাভিমানী ইঙ্গরেজের পরাক্রম যেস্থলে বদ্ধমূল হয় নাই, বাল্যবিবাহোৎপন্ন রণজিতের পরাক্রমে সেই স্থলে বিজয়পতাকা স্থাপিত হয়। সিন্ধুনদের অপর পারে, নওশেরার যুদ্ধক্ষেত্রে, পঞ্জাবকেশরী আফগানদিগকে পরাজিত করেন। ভারতের যে দুইটি বীরপুরুষ সমগ্র বীরেন্দ্রসমাজে শ্রদ্ধা ও প্রীতির পুষ্পাঞ্জলি পাইতেছেন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিকও যাঁহাদিগকে পৃথিবীর মহৎলোকের শ্রেণীতে সমাবেশিত করিয়ছেন, তাঁহারা উভয়েই বাল্যবিবাহের ফল। মহারাষ্ট্র ও পঞ্জাব ছাড়িয়া, এই অধঃপতিত, বিনষ্টসর্ব্বস্ব, নিপীড়িত ও নির্জ্জিত বাঙ্গালার বিষয় বিবেচনা করুন। রাজা প্রতাপাদিত্যের বীরত্বে, দিল্লীর সেনাপতি মানসিংহও চমকিত হইয়াছিলেন। সীতারাম রায়ের সাহস, পরাক্রম ও অপূর্ব অস্ত্রপ্রয়োগনৈপুণ্যের বিবরণ শুনিয়া, দিল্লীর তদানীন্তন ভূপতি ফররোখশেরও বিস্ময়প্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রতাপাদিত্য ও সীতারামের সময়ে, বাঙ্গালায় যৌবনবিবাহ প্রচলিত ছিল না। নবাব সিরাজউদ্দৌলা এখন ইতিহাসে দুর্ব্বৃত্ত ও নৃশংস বলিয়া ধিক্কৃত হইতেছেন। অপরিপক্কমতি, অষ্টাদশবর্ষীয় যুবকের চরিত্র এখন অনন্ত কলঙ্ককালিমায় আচ্ছন্ন হইতেছে। কিন্তু এই যুবকের রাজত্বে বাঙ্গালীর যেরূপ ক্ষমতা, যেরূপ সাহস ও যেরূপ প্রাধান্য ছিল, সুসভ্য ব্রিটিশ রাজত্বে তাহার কিছুই পরিদৃষ্ট হইতেছে না। ইঙ্গরেজ এখন যৌবনবিবাহের পক্ষপাতী। কিন্তু প্রাচীন সময়ে তাঁহাদের দেশেই অল্পবয়সে বিবাহের প্রথা প্রচলিত ছিল। পূর্ব্বে ইঙ্গলণ্ডে, সাধারণতঃ দ্বাদশবর্ষে বালিকাদের বিবাহ হইত। যখন সপ্তম হেন্‌রির জন্ম হয়, তখন তাহার মাতা লেডী মারগারেটের বয়স চৌদ্দ বৎসরেরও কম ছিল। ভারতের প্রথম গবর্ণর জেনেরল ওয়ারেণ হেষ্টিংসের পিতা পঞ্চদশবর্ষে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েন। এইরূপ আরও অনেক দৃষ্টান্ত সংগৃহীত হইতে পারে। বাল্যবিবাহে সে সময়ে ইঙ্গরেজের বলবীর্য্যের হানি হয় নাই। ইতিহাস সে সময়ের ইঙ্গলণ্ডকে কাপুরুষের আবাসভূমি বলিয়াও পরিচিত করে নাই।

এইরূপে, ইঙ্গরেজের দেখাদেখি, আমরা আমাদের জাতীয় রীতি নীতির সকল অংশেই দোষ দেখিতেছি। ইঙ্গরেজের সবই ভাল, আর আমাদের সবই মন্দ, এইরূপ ধারণাই অামাদের জাতীয় ভাবের অধোগতির মূল হইয়াছে। আমরা যদি ইঙ্গরেজের একতা, উদ্যম, উৎসাহ প্রভৃতি গুণের অনুকরণ করিতাম, তাহা হইলে আমাদের এরূপ দুর্দ্দশা ঘটিত না। কিন্তু আমরা অতি হীন অনুকরণে প্রবৃত্ত হইতেছি। আমাদের নিকট ইঙ্গরেজের বাহ্য ভঙ্গীরই আদর হইতেছে। আমাদের তুলা ও পাট ইঙ্গলণ্ডে যাইতেছে, সেস্থানে কাপড় প্রস্তুত হইয়া আমাদের লজ্জা নিবারণ ও শীতাতপ হইতে দেহরক্ষা করিতেছ। তাঁতী তাঁত ছাড়িয়া ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছে। কর্ম্মকার জাতীয় ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়া উদরান্নের জন্য হাহাকার করিতেছে। যাঁহারা পৃথিবীবিখ্যাত ঢাকাই মস্‌লিন প্রস্তুত করিতেন, এখন তাঁহাদের সঞ্চিত অর্থেই তদীয় সন্তানগণের দিনপাত হইতেছে। আমরা কাঞ্চন ফেলিয়া কাচের আদর করিতেছি, স্বদেশের খাঁটি জিনিসের পরিবর্ত্তে আমাদের নিকট বিদেশের আপাতসৌন্দর্য্যময় দ্রব্যেরই সম্মান হইতেছে। সম্রাট আরঙ্গজেবের সময়ে, একজন ফরাসী ভ্রমণকারী, অনেকদিন এতদ্দেশে বাস করিয়াছিলেন। তিনি স্বীয় ভ্রমণবৃত্তান্তে লিখিয়া গিয়াছেনঃ—“বাঙ্গালার অনেক স্থান মিশরদেশ অপেক্ষাও উর্বর। এই দেশে অপর্য্যাপ্ত ধান্য, তুলা, নীল ও রেসম প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। ভারতবর্ষের অনেক স্থানই বহু লোকাকীর্ণ। শিল্পিগণ শাল, গালিচা, রেসম ও সূতার কাপড় প্রভৃতি প্রস্তুত করে। এই সকল বাণিজ্য দ্রব্যের বিনিময়ে পৃথিবীর অনেকস্থান হইতে স্বর্ণ ও রৌপ্য আসিয়া ভারতবর্ষে জমা হয়। ভারতবর্ষীয়েরা অপরদেশোৎপন্ন দ্রব্য অধিক পরিমাণে ব্যবহার করে না। সুতরাং, এই স্বর্ণ ও রৌপ্য প্রায় সমস্তই, অন্যত্র না গিয়া, ভারতবর্ষে থাকিয়া যায়। এজন্য, অতি সামান্য অবস্থার লোকেও স্ত্রী কন্যাদিগকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার দিয়া থাকে। * * * বঙ্গদেশ শস্যসম্পত্তিপূর্ণ। যে স্থানে যাওয়া যায়, সেই স্থানেই ইহার শ্যামল শোভা দেখিয়া নেত্র পরিতৃপ্ত হয়। এই দেশে এত ধান্য জন্মে যে, তদ্দ্বারা সমস্ত বাঙ্গালার ও অন্যান্য অনেক দেশের লোকের ভরণপোষণনির্ব্বাহ হয়। বাঙ্গালার চিনি, তুলা, রেসম প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন দেশে গিয়া থাকে। * * রাজমহল হইতে সমুদ্র পর্য্যন্ত, গঙ্গার দুই দিকে বহুসংখ্যক খাল দেখা যায়। বাণিজ্যের সুবিধার জন্য, ঐ সকল খাল কাটা হইয়াছে। খালের উভয়পার্শ্বে লোকাকীর্ণ নগর, পল্লী ও শস্যপূর্ণ ক্ষেত্র আছে। যতবার দেখা যায়, ততবারই ঐ সকল দৃশ্য নয়নের অনির্ব্বচনীয় প্রীতিসম্পাদন করে।” কিন্তু এখন আর এই সুন্দর দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয় না। ইহা এখন ইতিহাসের কথামাত্রে পর্য্যবসিত হইয়াছে। সম্পত্তিসম্পন্না, শস্যশ্রামলা ভূমি, আজ ব্রিটিশবাণিজ্যদ্রব্যে পরিপূর্ণ। লোকবিশ্রুত পবিত্র সমাজ আজ ব্রিটিশ রীতিনীতি, ব্রিটিশ আচারব্যবহারের বিহারক্ষেত্র। পূর্ব্ব সমৃদ্ধি ও পূর্ব্ব গৌরবে মহিমান্বিত জনগণ, আজ ব্রিটিশ সিংহের দ্বারে ভিক্ষাপ্রার্থী। প্রলয়পয়োধির জলোচ্ছ্বাসে সে গৌরব, সে মহত্ত্বের চিহ্ন বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। যে এক সময়ে অপরের অভাবমোচন করিত, সে আজ আপনার অভাবে আপনিই দিশাহার হইয়া শিরে করাঘাত করিতেছে।

ইহা অপেক্ষা শোচনীয় অধঃপতন আর সম্ভবে না। ইহা অপেক্ষা মর্ম্মস্পর্শী দৃশ্য আর নেত্রপথবর্ত্তী হয় না। আমরা যতদিন স্বদেশীয় দ্রব্যের অাদর করিতে না শিখিব, ততদিন আমাদের মধ্যে জাতীয় ভাবের বিকাশ হইবে না। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সহিত প্রতিযোগিতা করিতে না পারিয়া, আমাদের শিল্পিগণ দিন দিন হীনাবস্থাপন্ন হইতেছে বটে, কিন্তু প্রধানতঃ আমাদের দোষেই আমাদের দেশের শিল্পদ্রব্যের অবনতি ঘটিতেছে। আমরা সামান্য খেলনাটি,—সামান্য দেশলাইটি পর্য্যন্ত বিলাত হইতে গ্রহণ করিতেছি। যতদূর সম্ভব, আমরা যদি ততদূর স্বদেশীয় দ্রব্যের ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই, তাহা হইলে দিন দিনই আমাদের শিল্পদ্রব্যের উন্নতি হইতে থাকে। অামাদের দেশে উৎকৃষ্ট কাপড় প্রস্তুত হইতেছে,—কাঞ্চননগরে উৎকৃষ্ট ছুরি কাঁচি ও নাটাগড়ে উৎকৃষ্ট কলকব্জার কারখানা হইয়াছে, লিখিবার উৎকৃষ্ট কালী পাওয়া যাইতেছে; যৌথকারবারে কলকারখানা, রেলওয়ে প্রভৃতির সূত্রপাত হইতেছে, এ সময়ে আমাদের নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে; ভিন্নদেশের মুখাপেক্ষী হইয়া, জাতীয় ভাবে জলাঞ্জলি দেওয়াও কর্ত্তব্য নহে। আমরা এতদিন ইঙ্গরেজের শাসনে বাস করিয়া, ইঙ্গরেজের সংস্পর্শে থাকিয়া, যদি ইঙ্গরেজের আত্মনির্ভরের ভাব শিখিতে না পারি, তাহা হইলে আমাদের জীবনধারণ বিড়ম্বনা মাত্র। আমরা যদি ক্রীতদাসের ন্যায়, নিরবচ্ছিন্ন অনুকরণেই ব্যাপৃত থাকি, জাতীয় ভাবে জলাঞ্জলি দিয়া, যদি নিউজিলণ্ডবাসী বা জুলুদিগের ন্যায় সর্ব্বাংশে সাহেবীভাবসংগ্রহ করি, এবং যদি নিয়ত পরমুখপ্রেক্ষী হইয়া দুর্ব্বহ দেহভার বহন করিতে থাকি, তাহা হইলে, আজই হিমালয়ের শৃঙ্গপাতে স্বদেশ বিচূর্ণ বা ভারত মহাসাগরের অতলজলে স্বদেশ নিমগ্ন হউক। পৃথিবীর মানচিত্র হইতে স্বদেশের চিহ্ন পর্য্যন্ত বিলুপ্ত হইয়া যাউক, তাহাতে কিছুমাত্র ক্ষতি নাই।

কিন্তু আমার আশা আছে যে, আমাদের দেশ পুনর্ব্বার জাতীয় ভাবে বলীয়ান্ হইবে। আমরা সকলেই কিছু হীন অনুকরণপ্রিয় ক্রীতদাসে পরিণত হই নাই। আমাদের ঘোরতর দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে; বহুবার, বহুজাতি আসিয়া আমাদিগকে নিপীড়িত, নির্জ্জিত ও নিগৃহীত করিয়াছে। তথাপি আমরা সর্ব্বাংশে পরের সহিত মিশিয়া যাই নাই। আমরা বহুকাল হইতে রাজনীতি বিষয়ে স্বাধীনতা হারাইয়াছি। ধর্ম্মসম্বন্ধে আমাদের যে স্বাধীনতা ছিল, বর্ত্তমান সহবাসসম্মতির আইনে তাহাও হৃত হইবার উপক্রম হইয়াছে। এখন আচার ব্যবহারের সম্বন্ধে যে স্বাধীনতাটুকু আছে, আমরা তাহাও কি হারাইতে বসিব? না, তাহা কখনও হইবে না। জীবন থাকিতে আমরা এরূপ অধঃপতনের চরমসীমায় উপনীত হইব না।

মায়াবাদী উদাসীন পুরুষ, নিত্যসন্তোষ ও নিত্য তৃপ্তিতে বিভোর হইয়া বলিতে পারেন, নিয়তির বিচিত্র লীলায় ভারতের অদৃষ্টচক্র পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। ভারতবর্ষ বিভিন্ন জাতির আবাসভূমি। ইহাদের ভাষা বিভিন্ন, পরিচ্ছদ বিভিন্ন, ধর্ম্মপ্রণালী বিভিন্ন। ইহা ব্যতীত, দুরারোহ পর্ব্বত, দুর্গম অরণ্য, দুস্তর তরঙ্গিণী প্রভৃতিতে ভারতের জনপদ সকল পরস্পর পৃথক্ভাবে অবস্থিত। ইহাতে ভারতবর্ষের জাতীয় ভাবে একীভূত হইবার সম্ভাবনা নাই। বিধাতা, ভারতের অদৃষ্টলিপিতে যাহার বিধান করিয়াছেন, ভারতবর্ষকে তদনুসারেই চলিতে হইবে। যাঁহারা কর্ম্মশীলতায় জলাঞ্জলি দিয়া বৈরাগ্যের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন, এ কথা তাঁহাদের মুখেই শোভা পায়। পৃথিবীর অপরাপর দেশে যখন এরূপ অন্তরায়েও জাতীয় ভাবে একীভূত হইয়ছে, তখন ভারতবর্ষ না হইবে কেন? ইতালির সহিত ভারতবর্ষের অনেক বিষয়ে সাদৃশ্য আছে। এশিয়ার মানচিত্রে যেমন ভারতবর্ষ, ইউরোপের মানচিত্র তেমনি ইতালি। উভয়ই, উভয় মহাদেশের দক্ষিণপ্রান্তবর্ত্তী একটি প্রশস্ত উপদ্বীপ। উভয়ের দক্ষিণ ভাগই সাগরের দিকে যাইয়া শেষ হইয়াছে। উভয়ের শীর্ষদেশেই অটল অচলবর, বিরাট পুরুষের ন্যায় অধিষ্ঠিত থাকিয়া, প্রকৃতির অনুপম শোভা বিকাশ করিয়া দিতেছে। উভয়ের অন্তর্দ্দেশেই প্রসন্নসলিলা তরঙ্গিণী, তরঙ্গরঙ্গ বিস্তার করিয়া বহিয়া যাইতেছে। উভয়ই প্রকৃতিরাজ্যের রমণীয় স্থান। শ্যামল তরুলতায়, শস্যপূর্ণ, প্রশস্ত ক্ষেত্রে উভয়ই চিরশোভিত। অযত্নসম্ভূত সৌন্দর্য্যের গরিমায়, অনায়াসলভ্য ফলসম্পত্তির মহিমায়, উভয়ই বিভূষিত। পক্ষান্তরে, ভারতবর্ষের ন্যায় ইতালিও অনেকগুলি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত। বহুশতাব্দী পর্য্যন্ত উভয় দেশই বিভিন্ন বিদেশী আক্রমণকারীর পরাক্রমে নিপীড়িত, নির্জ্জিত ও স্বাধীনতায় বঞ্চিত। উভয় দেশই বিভিন্ন ভাষার জনগণে অধ্যুষিত। ভারতবাসীর ন্যায়, ইতালিবাসীও তাহাদের পূর্ব্বতন গৌরব হইতে বিচ্যুত হইয়াছিল। তাহারা সীজরের বীরত্বকীর্ত্তিতে গৌরবান্বিত হইত না, ব্রুতসের হিতৈষিতায় আত্মাভিমানপ্রকাশ করিত না এবং সিসিরোর বাগ্মিতায় পূর্ব্বমহত্ত্বের ছবি স্মৃতিপটে অঙ্কিত করিতে প্রয়াস পাইত না। এতদ্ব্যতীত, ইতালির এক জনপদের ভাষা, আর এক জনপদবাসী বুঝিতে পারিত না, তাহারা এক পূর্ব্বপুরুষ হইতে উৎপন্ন, এক ভ্রাতৃভাবে সম্বন্ধ ও একবিধ গৌরবে গৌরবান্বিত হইলেও, পরস্পরকে পৃথকভাবাপন্ন বিদেশী ভাবিত। তথাপি ইতালির এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্তে সমবেদনা সঞ্চারিত হয়, ইতালি অপূর্ব্ব জাতীয়ভাবে একীভূত হইয় উঠে। এইরূপ সুইজর্লণ্ড ও বেলজিয়মও বিভিন্ন ধর্ম্মপ্রণালীর ও বিভিন্ন ভাষার লোকের আবাসস্থান হইলেও, প্রত্যেক দেশই একতায় সম্বন্ধ। ভারতবর্ষে নানা বিষয়ে বৈষম্য থাকিলেও, এই বৈষম্যের অভ্যন্তরে সাম্যের বীজ নিহিত রহিয়াছে। বাঙ্গালী, হিন্দুস্থানী, পঞ্জাবী, রাজপুত, মহারাষ্ট্রীয়, সকলেই এক হিন্দুবংশসম্ভূত। হিন্দুনাম উচ্চারণ করিলে, সকলের হৃদয়েই একটি অপূর্ব্ব ভাবের উদয় হয়। রামচন্দ্রের চিত্তবিমোহিনী কথায় সকলেই বিমোহিত হয়েন, ভীষ্মের উদার চরিত্রে সকলের হৃদয়ই ভক্তিশ্রদ্ধায় অানত হয়, সীতা ও সাবিত্রীকে সকলেই পবিত্রতাময়ী মহাদেবী বলিয়া সম্মানিত করেন। প্রতাপসিংহ ও শিবাজী, গুরু গোবিন্দ সিংহ ও রণজিৎ সিংহকে, সকলেই স্বজাতির ও স্বদেশের গৌরবকর বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। শাক্যসিংহ ও শঙ্করাচার্য্য, চৈতন্য ও নানক, সকলের হৃদয়েই পবিত্র প্রেমস্রোত প্রবাহিত করেন। হিন্দুনাম, হিন্দুকীর্ত্তি, বাঙ্গালী, হিন্দুস্থানী, সকলেরই সাধারণ সম্পত্তি। এই সাধারণ সম্পত্তির মহিমায়, সকলেই সকলকে ভ্রাতৃভাবে আলিঙ্গন করিবে। এতদ্ব্যতীত, এক রাজার অধীন ও এক রাজকীয় বিধিতে পরিচালিত হওয়াতে, সকলেই একবিধ স্বার্থে দৃঢ়সম্বন্ধ হইয়া উঠিবে। বাঙ্গালী, জাতীয় আচারব্যবহার, জাতীয় রীতিনীতির মর্য্যাদারক্ষা করুন, হিন্দুস্থানী প্রভৃতি জাতীয় ভাবে পরিচালিত হউন। শেষে সকলে, একবিধ স্বার্থে,—একবিধ স্বদেশপ্রীতিতে সম্বন্ধ হইয়া, স্বদেশের মুহ্যমান হৃদয়ে তাড়িতবেগ সঞ্চারিত করুন, এবং স্বদেশের শিল্পবিজ্ঞানের উৎকর্ষসাধন পূর্ব্বক পরমুখপ্রেক্ষিতারূপ অপার কলঙ্কের মোচনে বদ্ধপরিকর হউন। হীন বংশ হইতে আমাদের উদ্ভব হয় নাই। আমাদের পিতৃপুরুষগণ যে সভ্যতালোক প্রসারিত করিয়াছিলেন, তাহাতেই এখন জগৎ আলোকিত হইয়াছে। অধ্যাপক সীলি, তাঁহার একখানি গ্রন্থে লিখিয়াছেনঃ—“যখন মহাবীর শেকন্দর শাহ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত প্রাচ্যদেশে আধিপত্য স্থাপন করিয়া, গ্রীসের সভ্যতা ও জ্ঞানের পরিচয় দেন, তখন সেই সকল জনপদের অধিবাসীরা, ভক্তি ও প্রীতির সহিত গ্রীসের ঐ সভ্যতার সমাদর করিয়াছিল। রোম যখন গলের উপর সভ্যতালোক প্রসারিত করে, তখন গলের অধিবাসীরা উহার উজ্জ্বল ভাবে মোহিত হইয়া, বিজেতার প্রতি কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ করিয়াছিল। যে হেতু, রোমের ঐ আলোক তাহাদের হৃদয়কে আলোকিত করিয়া, জীবনের মহাব্রতসাধনে নিয়োজিত রাখিয়াছিল। কিন্তু, ভারতে ইঙ্গলণ্ডের আধিপত্যবিস্তারে, ভারতবর্ষীয় হিন্দুর হৃদয়ে, ঐরূপ কোনও ভাবের উৎপত্তি হয় নাই। অতি প্রাচীনকালে ভারতে জ্ঞানালোক প্রসারিত হইয়াছিল। ভারতে প্রাচীন সভ্যতা ছিল। অনন্ত রত্নের ভাণ্ডার, অনুপম মহাকাব্য ছিল। জ্ঞানগরিমার ভিত্তি, দর্শনশাস্ত্রাদি ছিল। ঐ জ্ঞানালোকই এক সময়ে ধীরে ধীরে প্রতীচ্য ভূখণ্ডের একাংশ আলোকিত করিয়াছিল। আমরা ভারতে যে আলোক সমর্পণ করিয়াছি, তাহা প্রকৃত ও উজ্জ্বল হইলেও, হিন্দুর অধিকতর হৃদয়াকর্ষক ও অধিকতর কৃতজ্ঞতার উদ্দীপক হয় নাই। * * আমরা হিন্দুর অপেক্ষা বুদ্ধিমান্ নহি। আমাদের হৃদয়, হিন্দুর হৃদয় অপেক্ষা অধিকতর প্রশস্ত বা অধিকতর উন্নত নহে। আমরা অজ্ঞাত ও অচিন্ত্যপূর্ব্ব বিষয় সম্মুখে রাখিয়া, অসভ্যদিগকে যেরূপ বিস্ময়াবিষ্ট করিতে পারি, হিন্দুকে সেরূপ পারি না। হিন্দু, তাঁহার কাব্যের গভীর ও উদার ভাব লইয়া, আমাদের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারেন। এমন কি, তাঁহার নিকট অভিনব বলিয়া স্বীকৃত হইতে পারে, এরূপ বিষয় আমাদের বিজ্ঞানেও অল্প আছে।” এই প্রশস্তহৃদয়, সূক্ষ্মদর্শী লেখকের লেখনী হইতে এইরূপ বাক্য নির্গত হইয়াছে। আমরা এইরূপ মহামহিমাময় হিন্দুবংশ হইতে উৎপন্ন হইয়াছি। আমাদের নিরাশ হওয়া উচিত নহে। উৎসাহ ও উদ্যমে বলসম্পন্ন এবং প্রকৃতজ্ঞানে মহিমান্বিত হইয়া, সন্তানোচিত কার্য্য করা আমাদের কর্ত্তব্য। যে সিন্ধু ও সরস্বতীর মনোহর পুলিনে, যোগাসনে উপবিষ্ট হইয়া, প্রাচীন হিন্দুগণ পরম শক্তির ধ্যান করিতেন, সে সিন্ধু সরস্বতী আজও বর্ত্তমান রহিয়াছে। যে শান্তরসাম্পদ স্থানে, মনস্বী আর্য্যপুরুষগণ অমৃতময়ী সারস্বতী শক্তির উপাসনা করিতে করিতে সভ্যতার স্নিগ্ধজ্যোতির বিকাশ করিতেন, সে সকল স্থান আজও দর্শকের নেত্রপথবর্ত্তী হইতেছে। যে সকল নগর শিল্প বাণিজ্যে শ্রীসম্পন্ন হইয়া, সর্ব্বত্র সমৃদ্ধিগৌরবের পরিচয় দিত, তৎসমুদয় আজও মানচিত্রে শোভা পাইতেছে। আশা আছে, হিন্দু, অতীত গৌরবের সাক্ষীভূত এই সকল চিহ্ন দর্শনে আত্মবলে বলীয়ান হইবে, এবং অপূর্ব্ব জাতীয় ভাব ও ধর্ম্মোৎপাদ্য সভ্যতার গুণে, পুনর্ব্বার পৃথিবীতে প্রসিদ্ধি লাভ করিবে। যদি শত সহস্র বিঘ্ন বিপত্তি উপস্থিত হয়, কর্ত্তব্য পথ যদি দুষ্প্রবেশ, দুর্গম ও দুর্গতিজনক হইয়া উঠে, তাহা হইলেও, এই পুণ্যপুঞ্জময় পবিত্র ভূমিতে, সভ্যতা ও জ্ঞানের আদিম আশ্রয়ক্ষেত্র এই লোকপূজিত ভূখণ্ডে, পুনর্ব্বার হিন্দুর জাতীয় ভাবের অমৃতময় ফলের বিকাশ দেখা যাইবে, এবং পুনর্ব্বার হিন্দুর অনন্ত ও অক্ষয় কীর্ত্তি, ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে অঙ্কিত থাকিবে।

সমাপ্ত।