হিন্দুধর্ম্ম-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [An essay on Hinduism – By Bankim Chandra Chattophdya]

খৃষ্টধর্ম্ম রাজার ধর্ম্ম হইয়াও কদাচিৎ একখানি চণ্ডালের বা পোদের গ্রাম অধিকার, অথবা দুই একজন কুক্কুট-মাংস-লোলুপ ভদ্রসন্তানকে দখল ভিন্ন আর কিছুই করিতে পারে নাই। যখন বৌদ্ধধর্ম্ম, ইস্‌লামধর্ম্ম ও খৃষ্টধর্ম্ম, হিন্দুধর্ম্মের স্থান অধিকার করিতে পারে নাই, তখন আর কোন্ ধর্ম্মকে তাহার স্থানে এখন স্থাপিত করিব? ব্রাহ্মধর্ম্মের আমরা পৃথক্ উল্লেখ করিলাম না, কেন না, ব্রাহ্মধর্ম্ম হিন্দুধর্ম্মের শাখা মাত্র। ইহার এমন কোন লক্ষণ দেখা যায় নাই, যাহাতে মনে করা যাইতে পারে যে, ইহা ভবিষ্যতে সামাজিক ধর্ম্মে পরিণত হইবে।

An essay on Hinduism – By Bankim chandra Chattophdya

হিন্দুধর্ম্ম (১৮৮৪ সাল)

সম্প্রতি সুশিক্ষিত বাঙ্গালিদিগের মধ্যে হিন্দুধর্ম্মের আলোচনা দেখা যাইতেছে। অনেকেই মনে করেন যে, আমরা হিন্দুধর্ম্মের প্রতি ভক্তিমান্ হইতেছি। যদি এ কথা সত্য হয়, তবে আহ্লাদের বিষয় বটে। জাতীয় ধর্ম্মের পুনবন ব্যতীত ভারতবর্ষের মঙ্গল নাই, ইহা আমাদিগের দৃঢ় বিশ্বাস। কিন্তু যাঁহারা হিন্দুধর্ম্মের প্রতি এইরূপ অনুরাগযুক্ত, তাঁহাদিগকে আমাদের গোটাকত কথা জিজ্ঞাস্য আছে। প্রথম জিজ্ঞাস্য, হিন্দুধর্ম্ম কি? হিন্দুয়ানিতে অনেক রকম দেখিতে পাই। হিন্দু হাঁচি পড়িলে পা বাড়ায় না, টিকটিকি ডাকিলে “সত্য সত্য” বলে, হাই উঠিলে তুড়ি দেয়, এ সকল কি হিন্দুধর্ম্ম? অমুক শিয়রে শুইতে নাই, অমুক আস্যে খাইতে নাই, শূন্য কলসী দেখিলে যাত্রা করিতে নাই, অমুক বারে ক্ষৌরী হইতে নাই, অমুক বারে অমুক কাজ করিতে নাই, এ সকল কি হিন্দুধর্ম্ম? অনেকে স্বীকার করিবেন যে, এ সকল হিন্দুধর্ম্ম নহে। মূর্খের আচার মাত্র। যদি ইহা হিন্দুধর্ম্ম হয়, তবে আমরা মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি যে, আমরা হিন্দুধর্ম্মের পুনর্জ্জীবন চাহি না।1

Continue Reading

চোদ্দ শতকের বাঙালী [Choddo sataker Bangali]-অতুল সুর [Atul Sur]

PUBLICATION: শ্রাবণ, ১৪০১; জুলাই, ১৯৯৪

চোদ্দ শতকের বাঙালী -অতুল সুর

০১. শতক বিহরণ

কালের অনন্ত প্রবাহে একশ’ বছর এক অতি সামান্য বিন্দুমাত্র। কিন্তু বঙ্গাব্দ চোদ্দ শতকের এই সামান্য সময়কালের মধ্যেই ঘটে গিয়েছে বৈপ্লবিক ঘটনাসমহ যথা, দই মহাযুদ্ধ, এক মন্বন্তর, স্বাধীনতা লাভ ও দেশ বিভাগ, গগনস্পর্শী মূল্যস্ফীতি, নৈতিক শৈথিল্য, মানবিক সত্তার অবনতি, নারী নির্যাতন-ধর্ষন ও বাঙালীর আত্মহনন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে ভারত থেকে ইংরেজের মহাপ্রস্থান ও ভারতের স্বাধীনতা লাভ । সেই ঘটনাই শতাব্দীর ইতিহাসকে বিভক্ত করে দভাগে । সেই ঘটনা ঘটবার আগে আমরা কিরকম ছিলাম ও পরে কি হয়েছি, সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ।

বঙ্গাব্দ ১৩০০-র আগের একশ’ বছরে বাঙলায় ঘটে গিয়েছিল নবজাগরণ বা রেনেসাঁ। যদিও রেনেসাঁর প্রধান হোতাদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু ঘটেছিল ১২৮০ বঙ্গাব্দে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১২৯৮ বঙ্গাব্দে ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৩০০ বঙ্গাব্দে, তা হলেও তাঁদের তিরোধানের সঙ্গে রেনেসাঁর ধারা শুকিয়ে যায়নি। পূর্ণমাত্রায় চলেছিল সেই ধারা । দেশকে বড় ও মহৎ করাই ছিল রেনেসাঁর হোতাদের প্রধান লক্ষ্য । ১৩০০ বঙ্গাব্দেই আমরা স্বামী বিবেকানন্দকে দেখি আমেরিকার শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত ধর্ম মহাসভায় ভারতীয় সংস্কৃতির মহান আদশ সম্বন্ধে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্বজনের মন জয় করতে। ভারত সেদিন গর্বিত হল, যখন পড়ল ‘নিউ ইয়র্ক হেরালড’-এর স্তম্ভে বিবেকানন্দ সম্বন্ধে লিখিত প্রশস্তি—’ভারতের বাত্যাসৃজনী ঋষি ধর্মমহাসভার বৃহত্তম মানুষ ।’

বস্তুত শতাব্দীর প্রথম পাদটা ছিল ভারতের এক অত্যাশ্চর্য ও আনন্দমুখের যােগ । মোহনবাগান জয় করল আই এফ এ শিল্ড । রবীন্দ্রনাথ পেলেন নোবেল পরিস্কার। শরৎচন্দ্র শুরু করলেন তাঁর আবিস্মরণীয় উপন্যাসসমূহ । আমেরিকায় গিয়ে ধনগোপাল মুখোপাধ্যায় পেলেন তাঁর ‘গ্ৰে নেক’ গ্রন্থের জন্য মার্কিন মুলুকের বিখ্যাত পুরস্কার ‘জন নিউবেরি পদক’। প্রথম মহাযদ্ধের সময় বাঙালী দূর করল। সাহেবদের দেওয়া অপবাদ যে বাঙালীর সামরিক শৌর্যবীর্য নেই। সামরিক বাহিনীতে যোগদান করে এক দল বাঙালী বীর সেদিন বিশ্বকে চমৎকৃত করল। পশ্চিম রণাঙ্গনে জার্মানদের গোলাবর্ষণের ব্যূহ ভেদ করে কেড়ে নিয়ে এল জার্মানদের কামানগুলো । বস্তুত, ধর্ম, ক্ৰীড়া, সাহিত্য, সামরিক শৌর্যবীর্য, সব ক্ষেত্রেই স্বীকৃত হল বাঙালীর শ্রেষ্ঠত্ব ।

Continue Reading

Ukiler Buddhi- Sukumar Roy উকিলের বুদ্ধি – সুকুমার রায়

Advocate

উকিলের বুদ্ধি – সুকুমার রায়

গরিব চাষা, তার নামে মহাজন নালিশ করেছে। বেচারা কবে তার কাছে পঁচিশ টাকা নিয়েছিল, সুদে-আসলে তাই এখন পাঁচশো টাকায় দাঁড়িয়েছে। চাষা অনেক কষ্টে একশো টাকা যোগাড় করেছে; কিন্তু মহাজন বলছে, “পাঁচশো টাকার এক পয়সাও কম নয়; দিতে না পার তো জেলে যাও।” সুতরাং চাষার আর রক্ষা নাই।

এমন সময় শামলা মাথায় চশমা চোখে তোখোড়-বুদ্ধি উকিল এসে বলল, “ঐ একশো টাকা আমায় দিলে, তোমার বাঁচবার উপায় করতে পারি।” চাষা তার হাতে ধরল, পায়ে ধরল, বলল, “আমায় বাঁচিয়ে দিন।” উকিল বলল, “তবে শোন, আমার ফন্দি বলি। যখন আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াবে, তখন বাপু হে কথা-টথা কয়ো না। যে যা খুসি বলুক, গাল দিক আর প্রশ্ন করুক, তুমি তার জাবাবটি দেবে না— খালি পাঁঠার মতো ‘ব্যা—’ করবে। তা যদি করতে পার, তা হ’লে আমি তোমায় খালাস করিয়ে দেব।” চাষা বলল, “আপনি কর্তা যা বলেন, তাতেই আমই রাজী।”

আদালতে মহাজনের মস্ত উকিল, চাষাকে এক ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি সাত বছর আগে পঁচিশ টাকা কর্জ নিয়েছিলে?” চাষা তার মুখের দিকে চেয়ে বলল, “ব্যা—”। উকিল বলল, “খবরদার!— বল, নিয়েছিলি কি না।” চাষা বলল, “ব্যা—”। উকিল বলল, “হুজুর! আসামীর বেয়াদবি দেখুন।” হাকিম রেগে বললেন, “ফের যদি অমনি করিস, তোকে আমই ফাটক দেব।” চাষা অত্যন্ত ভয়ে পেয়ে কাঁদ কাঁদ হ’য়ে বলল, “ব্যা— ব্যা—”। হাকিম বললেন, “লোকটা কি পাগল নাকি?”

তখন চাষার উকিল উঠে বলল, “হুজুর, ও কি আজকের পাগল— ও বহুকালের পাগল, জন্মে অবধি পাগল। ওর কি কোনো বুদ্ধি আছে, না কাণ্ডজ্ঞান আছে? ও আবার কর্জ নেবে কি! ও কি কখনও খত লিখতে পারে নাকই? আর পাগলের খত লিখলেই বা কি? দেখুন দেখই, এই হতভাগা মহাজনটার কাণ্ড দেখুন তো! ইচ্ছে ক’রে জেনে শুনে পাগলটাকে ঠকিয়ে নেবার মতলব করেছে। আরে, ওর কি মাথার ঠিক আছে? এরা বলেছে, ‘এইখানে একটা আঙ্গুলের টিপ দে’— পাগল কি জানে, সে অমনি টিপ দিয়েছে। এই তো ব্যাপার!”

দুই উকিলে ঝগড়া বেধে গেল। হাকিম খানিক শুনে-টুনে বললেন, “মোকদ্দমা ডিস্‌মিস্‌।” মহাজনের তো চক্ষুস্থির। সে আদালতের বাইরে এসে চাষাকে বলল, “আচ্ছা, না হয় তোর চারশো টাকা ছেড়েই দিলাম — ঐ একশো টাকাই দে।” চাষা বলল, “ব্যা—!” মহাজন যতই বলে, যতই বোঝায়, চাষা তার পাঁঠার বুলি কিছুতেই ছাড়ে না। মহাজন রেগে-মেগে ব’লে গেল, “দেখে নেব, আমার টাকা তুই কেমন ক’রে হজম করিস।”

চাষা তার পোঁটলা নিয়ে গ্রামে ফিরতে চলেছে, এমন সময় তার উকিল এসে ধরল, “যাচ্ছ কোথায় বাপু? আমার পাওনাটা আগে চুকিয়ে যাও। একশো টাকায় রফা হয়েছিল, এখন মোকদ্দমা তো জিতিয়ে দিলাম।” চাষা অবাক হ’য়ে তার মুখের দিলে তাকিয়ে বলল, “ব্যা—।” উকিল বলল, “বাপু হে, ও-সব চালাকি খাটবে না— টাকাটি এখন বের কর।” চাষা বোকার মতো মুখ ক’রে আবার বলল, “ব্যা—।” উকিল তাকে নরম গরম অনেক কথাই শোনাল, কিন্তু চাষার মুখে কেবলই ঐ এক জবাব! তখন উকিল বলল, “হতভাগা গোমুখ্যু পাড়াগেঁয়ে ভূত—তোর পেটে অ্যাতো শয়তানি কে জানে! আগে যদি জানতাম তা হ’লে পোঁটলাসুদ্ধ টাকাগুলো আটকে রাখতাম।”

বুদ্ধিমান উকিলের আর দক্ষিণা পাওয়া হল না।


Sukumar Roy– 30 October 1887 – 10 September 1923

A SHORT LIFE OF CHAITANYA: JADUNATH SARKAR -1922

The man without bondage

Navadwip, a town in the Nadia district of Bengal, situated on the river Ganges, 75 miles north of Calcutta, was a great trading centre and seat of Hindu learning in the 15th century.

Sanskrit logic (nyáy) for which Bengal is most famous among all the provinces of India, was very highly developed and studied here, and the fame of its scholars was unsurpassed in the land. But, if we may believe the biographers of Chaitanya, the atmosphere of the town was sceptical and unspiritual. There was a lack of true religious fervour and sincere devotion. Proud of their intellectuality, proud of the vast wealth they acquired by gifts from rich Hindus, the local pandits despised bhakti or devotion as weak and vulgar, and engaged in idle ceremonies or idler amusements. Vedantism formed the topic of conversation of the cultured few; wine and goat’s meat were taken to kindly by the majority of the people, and such Shakta rites as were accompanied by the offering of this drink and food to the goddess and their subsequent consumption by her votaries, were performed with zeal and enthusiasm.

Continue Reading

Kumartuli Speech: Sri Aurobindo 1909

Description of the Speech:

Babu Aurobindo Ghose rose amidst loud cheers and said that when he consented to attend the meeting, he never thought that he would make any speech. In fact, he was asked by the organisers of the meeting simply to be present there. He was told that it would be sufficient if he came and took his seat there. Now he found his name among the speakers. The Chairman of the meeting, whose invitation was always an order, had called upon him to speak.

He had two reasons as to why he ought not to speak. The first was that since he was again at liberty to address his countrymen he had made a good many speeches and he had exhausted everything that he had to say and he did not like to be always repeating the same thing from the platform. He was not an orator and what he spoke was only in the hope that some of the things he might say might go to the hearts of his countrymen and that he might see some effect of his speeches in their action. Merely to come again and again to the platform and the table was not a thing he liked. Therefore he preferred to see what his countrymen did.

Another reason was that unfortunately he was unable to address them in their mother language and therefore he always felt averse to inflict an English speech on a Bengali audience.

Continue Reading

History of Bengal-The reign of Mourya and Saka: Rakhal Das Bandopadhya

Rakhaldas-Banerji- History of Bengal

বাঙ্গালার ইতিহাস-রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়:-মৌর্য্যাধিকার ও শকাধিকার

১৩৩০- Bangabda 

মৌর্য্যাধিকার ও শকাধিকার।


আর্য্যাধিকার কালে দ্রবিড়জাতীয় ভারতের আদিম অধিবাসিগণের রীতি নীতি—মগধে শূদ্ররাজগণের অভ্যুত্থান—মৌর্য্য সাম্রাজ্যের সীমা—প্রচলিত মুদ্রা–মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অধঃপতন—ইউচি ও উ-সুন জাতির বিবাদ—শক জাতি কর্ত্তৃক উত্তরাপথ অধিকার ও নূতন শকরাজ্য স্থাপন—সুঙ্গবংশীয় পুষ্যমিত্র কর্ত্তৃক মগধরাজ্য অধিকার—পঞ্চনদ প্রভৃতি দেশের শকগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা—সুঙ্গবংশীয় শেষ রাজা দেবভূমির হত্যা—দেবভূমির মন্ত্রী কাণ্ববংশীয় বাসুদেব কর্ত্তৃক মগধের সিংহাসন অধিকার—তৎকালে মগধরাজ্যের বিস্তৃতি—ভিন্ন ভিন্ন শকজাতির অধিকার—শকক্ষত্রপগণ—ইউচি জাতি কর্ত্তৃক উত্তরাপথ ও ক্ষুদ্র ক্ষুত্র শকরাজ্য অধিকার—কনিষ্কের সময়ে শক রাজ্যের বিস্তৃতি—বুদ্ধগয়ার মন্দির—বোধিসত্ত্বমূর্ত্তি—পুষ্কর্ণরাজ চন্দ্ৰবর্ম্মার দিগ্বিজয়।


মগধ ও বঙ্গ আর্য্যজাতি কর্ত্তৃক অধিকৃত হইলে, দ্রবিড়জাতীয় আদিম অধিবাসিগণ দেশত্যাগ করেন নাই। ভারতবর্ষের অবশিষ্টাংশের ন্যায় এই দুইটি প্রদেশও ক্রমশঃ বিজেতৃগণের ধর্ম্ম, রীতি-নীতি ও ভাষা অবলম্বন করিয়াছিল। দাক্ষিণাত্যবাসী দ্রবিড়গণ সম্পূর্ণরূপে আর্য্যভাষা গ্রহণ করেন নাই; কিন্তু তাঁহারা পুরাতন ধর্ম্মের পরিবর্ত্তে নূতন ধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং আর্য্যগণের অনেক আচারব্যবহারের অনুকরণ করিয়াছিলেন। বঙ্গ ও মগধ, নবাগত বিজেতৃগণের শাসন অধিকদিন সহ্য করে নাই। খৃষ্টপূর্ব্ব প্রথম সহস্রাব্দে উত্তরাপথের পূর্ব্বসীমান্তস্থিত প্রদেশগুলি আর্য্যগণের করায়ত্ত হইয়াছিল; এই ঘটনার তিন বা চারি শতাব্দী পরে, সমগ্র আর্য্যাবর্ত্ত, মগধের শূদ্ৰজাতীয় রাজগণের অধীনতা স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল। ভাষাতত্ত্ববিদ্ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ্‌গণ একবাক্যে স্বীকার করিয়া থাকেন যে, প্রাচীন ভারতের শূদ্রগণ অনার্য্যবংশসম্ভূত। উত্তরাপথে শূদ্ৰবংশজাত রাজবংশের প্রাধান্য স্থাপনের প্রকৃত অর্থ,—আর্য্যজাতীয় বিজেতৃগণের নির্বীর্য্যতা ও ক্ষত্রিয়বংশজাত আর্য্যরাজগণের অধঃপতন। আর্য্যরাজগণের অধঃপতনের পূর্ব্বে উত্তরাপথের পূর্ব্বাঞ্চলে আর্য্যধর্ম্মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল, জৈনধর্ম্ম ও বৌদ্ধধর্ম্ম এই আন্দোলনের ফল। জৈনধর্ম্মগ্রন্থমালা পাঠ করিলে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে, আর্য্যাবর্ত্তের পূর্ব্বাংশই এই নূতন ধর্ম্মমতের জন্মস্থান। জৈনধর্ম্মের চতুর্ব্বিংশতি তীর্থঙ্করের মধ্যে চতুর্দ্দশজন, মগধে ও বঙ্গে নির্ব্বাণ লাভ করিয়াছিলেন[১]। মগধদেশে উরুবিল্ব গ্রামের নিকটে শাক্যরাজপুত্র গৌতম সিদ্ধার্থ বৌদ্ধধর্ম্মের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। জৈন ও বৌদ্ধধর্ম্মের ইতিহাস পর্য্যালোচনা করিলে স্পষ্ট বোধ হয় যে, দীর্ঘকালব্যাপী বিবাদের পরে সনাতন আর্য্যধর্ম্মের বিরুদ্ধবাদী নূতন ধর্ম্মদ্বয় ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠালাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিল। চতুর্ব্বিংশতিতম তীর্থঙ্কর বর্দ্ধমান মহাবীরদেবের আবির্ভাবের পূর্ব্বে, মগধ ও বঙ্গ বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। গৌতমবুদ্ধ ও মহাবীর বর্দ্ধমানে নির্ব্বাণপ্রাপ্তির অতি অল্পকাল পরে শিশুনাগবংশীয় মহানন্দের শূদ্রা পত্নীর গর্ভজাত পুত্র, ভারতের সমস্ত ক্ষত্ৰিয়কুল নির্ম্মূল করিয়া একচ্ছত্র সম্রাট্ হইয়াছিলেন। এই সময় হইতে গুপ্তরাজবংশের অধঃপতন পৰ্য্যন্ত, মগধরাজ উত্তরাপথে একচ্ছত্র সম্রাট্‌রূপে পূজিত হইতেন, এবং পাটলিপুত্রই সাম্রাজ্যের একমাত্র রাজধানী ছিল। মগধে শূদ্রবংশের অভ্যুত্থান ও আর্য্যাবর্ত্ত পুনর্ব্বার নিঃক্ষত্রিয়করণের প্রকৃত অর্থ বোধ হয় যে, এই সময়ে বিজিত অনার্য্যগণ অবসর পাইয়া পুনরায় মস্তকোত্তোলন করিয়াছিলেন এবং মহাপদ্মনন্দের সাহায্যে ক্ষত্রিয়রাজকুল নির্ম্মূল করিয়াছিলেন। মহাপদ্মনন্দের পূর্ব্বে ভারতবর্ষে কোন রাজা সমগ্র আর্য্যাবর্ত্ত অধিকার করিয়া “একরাট্” পদবী লাভ করিতে পারেন নাই[২]। এই সময়ে (অনুমান ৩২৭ খৃষ্টপূর্ব্বাব্দে) মাসিডন্‌রাজ দিগ্বিজয়ী আলেকজন্দর বা সেকেন্দর, পঞ্চনদ অধিকার করিয়া বিপাশা-তীরে উপস্থিত হইয়াছিলেন। বিপাশাতীরে, শিবিরে, তিনি আর্য্যাবর্ত্তের পূর্ব্বপ্রান্তে অবস্থিত “প্রাসিই” এবং “গঙ্গরিডই” নামক দুইটি পরাক্রান্ত রাজ্যের অস্তিত্বের কথা অবগত হইয়াছিলেন[৩]। নন্দবংশ সিংহাসনচ্যুত হইলে, মৌর্য্যবংশের প্রথম নরপতি চন্দ্রগুপ্ত যখন, যবন বা গ্ৰীকগণ কর্ত্তৃক বিজিত পঞ্চনদ প্রদেশ পুনরধিকার করিয়া মাগধসাম্রাজ্যের আয়তন বর্দ্ধিত করিয়াছিলেন, তখন বোধ হয় দক্ষিণবঙ্গে ও দক্ষিণ কোশলে একটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। চন্দ্রগুপ্তের সভায় অবস্থানকালে যবন রাজদূত মেগাস্থিনিস প্রাচ্যজগতের যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহা এখন আর পাওয়া যায় না; কিন্তু পরবর্ত্তী গ্রীক লেখকগণ, স্ব স্ব গ্রন্থে মেগাস্থিনিস-বিরচিত “ইণ্ডিকা” নামক গ্রন্থের যে সকল অংশ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যকালে গঙ্গরিডই রাজ্য, অন্ধ্র রাজ্যের ন্যায় স্বাধীন ছিল। গঙ্গরিডই রাজ্যের সহিত কলিঙ্গী রাজ্য যুক্ত ছিল। গঙ্গানদী গঙ্গরিডই রাজ্যের পূর্ব্বসীমা ছিল[৪]। ইহা হইতে অনুমান হয় যে, মৌর্য্যসাম্রাজ্যের প্রারম্ভে রাঢ় ও কলিঙ্গ মগধরাজের অধীনে ছিল না। মৌর্য্যবংশীয় মাগধরাজগণ প্রবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠিলে, রাঢ় ও বঙ্গ তাঁহাদিগের সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল বলিয়া অনুমান হয়। চন্দ্রগুপ্তের পুত্র বিন্দুসারের রাজ্যকালে দাক্ষিণাত্য, এবং বিন্দুসারের পুত্র অশোকের শাসনকালে কলিঙ্গদেশ মৌর্য্যসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল[৫]। অশোকের অনুশাসনসমূহে রাঢ়, বঙ্গ, গৌড় বা বরেন্দ্রের কোন উল্লেখ নাই; কিন্তু ইহা নিশ্চয় যে, তাঁহার রাজ্যকালে মাগধসাম্রাজ্যের পূর্ব্বসীমান্তে কোন স্বাধীন রাজ্য ছিল না। তাঁহার দ্বিতীয়সংখ্যক অনুশাসনে দেখিতে পাওয়া যায় যে, তাঁহার রাজ্যকালে মৌর্য্যসাম্রাজ্যের দক্ষিণসীমান্তে চোল, পাণ্ড্য, সত্য, কেরল ও তাম্রপর্ণী এবং পশ্চিমসীমান্তে গ্রীকরাজ দ্বিতীয় বা তৃতীয় আন্তিওকের অধিকার ব্যতীত অপর কোন প্রত্যন্তে স্বাধীনরাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না[৬]। উত্তরে তুষারমণ্ডিত হিমালয়ের উপত্যকাসমূহে এবং পূর্ব্বে লৌহিত্যের অপরপারে গিরিসঙ্কুল আটবিক প্রদেশের অধিবাসিগণকে, রাজাধিরাজ মহারাজ স্বতন্ত্র স্বাধীনরাজ্যবাসী বলিয়া স্বীকার করিতে বোধ হয় কুণ্ঠিত হইতেন। ধর্ম্মপ্রচারের উত্তেজনায় যখন বিস্তৃত মৌর্য্যসাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয়বন্ধন শিথিল হইয়া পড়িল, তখন হইতে সুদূর প্রত্যন্তস্থিত প্রদেশগুলি স্বাধীন হইবার সুযোগের প্রতীক্ষা করিতে ছিল। দেবতাদিগের প্রিয় প্রিয়দর্শী অশোকের দেহাবসানের অব্যবহিত পরে পশ্চিমে গান্ধার ও কপিশা, এবং দক্ষিণে অন্ধ্র ও কলিঙ্গদেশ স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিয়াছিল। মৌর্য্যরাজবংশের অধিকারকালে ভারতবর্ষে রাজনামাঙ্কিত সুবর্ণ বা রজতমুদ্রার প্রচলন ছিল না; তৎকালে পুরাণ নামক চতুষ্কোণ রজতখণ্ডই মুদ্রারূপে ব্যবহৃত হইত। শ্রেষ্ঠী ও স্বার্থবাহগণ এই জাতীয় মুদ্রা প্রস্তুত করিত। মগধ ও বঙ্গের নানাস্থানে শত শত “পুরাণ” নামক প্রাচীন রজতমুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে, জিলা ২৪ পরগণার অন্তর্গত জাক্রা গ্রামে এই জাতীয় ছয়টি মুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছিল[৭]। বাঙ্গালা ১২৭৫ সালে দীনবন্ধু মিত্র নামক কোন ব্যক্তি মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত তমলুকনগরে একটি “পুরাণ” আবিষ্কার করিয়াছিলেন[৮]। মগধ ও তীরভুক্তির নানাস্থানে “পুরাণ” আবিষ্কৃত হইয়াছে। গত বৎসর পূর্ণিয়াজেলার একস্থানে প্রায় তিন সহস্র “পুরাণ” আবিষ্কৃত হইয়াছিল[৯]।

Continue Reading

History of Bengal- Rakhal Das Bandopadhya: Pre-Historic Era

Rakhaldas-Banerji- History of Bengal

বাঙ্গালার ইতিহাস-রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়:প্রাগৈতিহাসিক যুগ

বাঙ্গালার ইতিহাস।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ।

Synopsis 

যুগ বিভাগ—মানবের অস্তিত্বের সর্ব্বপ্রাচীন নিদর্শন—আদিম-মানব নিরামিষাশী—যুগবিপ্লব—আদিম মানবের স্বভাব পরিবর্ত্তন—মানবের প্রথম অস্ত্র—প্রস্তরের যুগ—প্রত্ন-প্রস্তরের যুগ—বাঙ্গালা দেশে আবিষ্কৃত নিদর্শন—বঙ্গবাসী ও মাদ্রাজবাসী আদিম মানব—নব্য-প্রস্তর যুগ—বাঙ্গালাদেশে আবিষ্কৃত নিদর্শন—ধাতু আবিষ্কার—তাম্রের যুগ—বাঙ্গালা দেশের তাম্র নির্ম্মিত অস্ত্র।

জগতে, সর্ব্বপ্রথমে, কোন্ যুগে কত কাল পূর্ব্বে, মানবের সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা এখনও অজ্ঞাত রহিয়াছে। প্রাণিতত্ত্ববিদ্‌গণ স্থির করিয়াছেন যে, বর্ত্তমান সময়ের সকল জীবের পরে মানবের আবির্ভাব হইয়াছিল। ভূতত্ত্ববিদ্‌গণ বলিয়া থাকেন যে, নব্যজীবক যুগের শেষভাগে মানবের অস্তিত্বের চিহ্ন লক্ষিত হয়[১]। অস্ত্যাধুনিক উপযুগ হইতে ভূপৃষ্ঠে মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়, কিন্তু ইহার পূর্ব্ববর্ত্তী দুইটি উপযুগে মানবের অস্তিত্ব সম্বন্ধে ভূতত্ত্ববিদ্‌গণের মধ্যে মতভেদ আছে। কেহ কেহ বলেন যে, মধ্যাধুনিক ও বহ্বাধুনিক উপযুগে মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়; কিন্তু কেহ কেহ এই সকল নিদর্শনের সহিত মানবের সম্পর্ক স্বীকার করেন না[২]। কেহ কেহ বলেন যে, বহ্বাধুনিক উপযুগে মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন আবিষ্কৃত হইবে ইহা আশা করা যাইতে পারে, কিন্তু মধ্যাধুনিক যুগে মানবের অস্তিত্ব প্রমাণ করিবার কোন আশাই নাই। মাদ্রাজ প্রদেশে কর্ণুল নামক স্থানে একটি পর্ব্বতগুহায় জীবাশ্মের (Fossil) সহিত আদিম মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন আবিষ্কৃত হইয়াছে। ভূতত্ত্ববিদ্‌গণ অনুমান করেন যে, এই সকল জীবাশ্ম বহ্বাধুনিকযুগের স্তন্যপায়ী জীবের অস্থি[৩]। ব্রহ্মদেশে বহ্বাধুনিকযুগের লুপ্ত স্তন্যপায়ী জীবের অস্থির সহিত আদিম মানব কর্ত্তৃক ব্যবহৃত প্রস্তরনির্ম্মিত অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে[৪]। অস্ত্যাধুনিক ও উপাধুনিক যুগে মানবের অস্তিত্ব সম্বন্ধে মনীষিগণের মতদ্বৈধ নাই।

Continue Reading

THE HISTORY OF BENGAL – R.C. Majumdar and Jadunath Sarkar Vol: I, II and III

THE HISTORY OF BENGAL PUBLICATION COMMITTEE

PREFACE- EXTRACT

The idea of writing a comprehensive History of Bengal on modem scientific lines may be traced back to 1912 when Lord Carmichael,  the first Governor of the Bengal Presidency, took the initiative and invited MM. Haraprasad Sastri to prepare a scheme. It was proposed to publish the history in three volumes dealing respectively with the Hindu, Muslim and British periods. Several meetings were held in the Government House, Calcutta, but what became the result of this plan and how far it was matured are not definitely known,  to me years later, the late Raja Prafulla Nath Tagore, the grandson of the famous Kali Krishna Tagore, volunteered to pay the entire cost of such a publication and invited the late Mr. Rakhaldas Banerji to draw up a plan along with some other well-known scholars of his time. Several meetings were held in the bouse of the Baja, but ultimately nothing came out of it.

Ever since the foundation of the University of Dacca, it was felt that the University should take up the task of preparing a  History of Bengal as early as practicable. This idea received on impetus from Sir Jadunath Sarkar, who, in the course of a lecture delivered at the University about the middle of July 19S3, emphasised  ‘that a History of Bengal on modem scientific lines was long overdue,  and that this University, standing as it does in the very heart of an ancient and important seat of Bengal culture, should in the fitness of things take up the work. Sir Jadunath promised his whole-hearted support and active co-operation in this enterprise.

The scheme received a new impetus from Mr. (now Sir)  A. F. Rahman, when he joined the University as Vice-Chancellor in  July 1934. In his first convocation address next month he emphasised  the need of commencing the work, and in his second convocation
speech, in July 1935, he announced that some preliminary work had already been done.

By the end of August 1935, the scheme took a more definite  shape, as Professor R. C. Majumdar, Head of the Department of  History, who was so busy with his own research
work (m Ae history of Ancient Imfian Colonies in the Far East, was now free to take up the world.

Continue Reading

বিশ্বভারতী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

।। যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্ ।।

মানব-সংসারে জ্ঞানালোকের দিয়ালি-উৎসব চলিতেছে। প্রত্যেক জাতি আপনার আলোটিকে বড়ো করিয়া জ্বালাইলে তবে সকলে মিলিয়া এই উৎসব সমাধা হইবে। কোনো জাতির নিজের বিশেষ প্রদীপখানি যদি ভাঙিয়া দেওয়া যায়, অথবা তাহার অস্তিত্ব ভুলাইয়া দেওয়া যায় তবে তাহাতে সমস্ত জগতের ক্ষতি করা হয়।

এ কথা প্রমাণ হইয়া গেছে যে, ভারতবর্ষ নিজেরই মানসশক্তি দিয়া বিশ্বসমস্যা গভীরভাবে চিন্তা করিয়াছে এবং আপন বুদ্ধিতে তাহার সমাধানের চেষ্টা পাইয়াছে। সেই শিক্ষাই আমাদের দেশের পক্ষে সত্য শিক্ষা যাহাতে করিয়া আমাদের দেশের নিজের মনটিকে সত্য আহরণ করিতে এবং সত্যকে নিজের শক্তির দ্বারা প্রকাশ করিতে সক্ষম করে। পুনরাবৃত্তি করিবার শিক্ষা মনের শিক্ষা নহে, তাহা কলের দ্বারাও ঘটিতে পারে।

ভারতবর্ষ যখন নিজের শক্তিতে মনন করিয়াছে তখন তাহার মনের ঐক্য ছিল—এখন সেই মন বিচ্ছিন হইয়া গেছে। এখন তাহার মনের বড়ো বড়ো শাখাগুলি একটি কাণ্ডের মধ্যে নিজেদের বৃহৎ যোগ অনুভব করিতে ভুলিয়া গেছে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে এক-চেতনাসূত্রের বিচ্ছেদই সমস্ত দেহের পক্ষে সাংঘাতিক। সেইরূপ, ভারতবর্ষের যে মন আজ হিন্দু বৌদ্ধ জৈন শিখ মুসলমান খৃস্টানের মধ্যে বিভক্ত ও বিশ্লিষ্ট হইয়া আছে সে মন আপনার করিয়া কিছু গ্রহণ করিতে বা আপনার করিয়া কিছু দান করিতে পারিতেছে না। দশ আঙুলকে যুক্ত করিয়া অঞ্জলি বাঁধিতে হয়—নেবার বেলাও তাহার প্রয়োজন, দেবার বেলাও। অতএব ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈদিক পৌরাণিক বৌদ্ধ জৈন মুসলমান প্রভৃতি সমস্ত চিত্তকে সম্মিলিত ও চিত্তসম্পদকে সংগৃহীত করিতে হইবে; এই নানা ধারা দিয়া ভারতবর্ষের মন কেমন করিয়া প্রবাহিত হইয়াছে তাহা জানিতে হইবে। এইরূপ উপায়েই ভারতবর্ষ আপনার নানা বিভাগের মধ্য দিয়া আপনার সমগ্রতা উপলব্ধি করিতে পারিবে। তেমনই করিয়া আপনাকে বিস্তীর্ণ এবং সংশ্লিষ্ট করিয়া না জানিলে, যে শিক্ষা সে গ্রহণ করিবে তাহা ভিক্ষার মতো গ্রহণ করিবে। সেরূপ ভিক্ষাজীবিতায় কখনো কোনো জাতি সম্পদশালী হইতে পারে না।

Continue Reading

নীল-দর্পণ নাটক – Nil Darpan Natak: Dinabandhu Mitra 1860

নীলকর-বিষধর-দংশিন কাতর-প্রজানিকর-ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণীতং।

ভূমিকা।

নীলকরনিকরকরে নীল-দর্পণ অর্পণ করিলাম। এক্ষণে তাঁহারা নিজ নিজ মুখ সন্দর্শন পূর্ব্বক তাঁহাদিগের ললাটে বিরাজমান স্বার্থপরতা কলঙ্ক-তিলক বিমোচন করিয়া তৎপরিবর্ত্তে পরোপকার শ্বেতচন্দন ধারণ করুন, তাহা হইলেই আমার পরিশ্রমের সাফল্য, নিরাশ্রয় প্রজাব্রজের মঙ্গল এবং বিলাতের মুখ রক্ষা। হে নীলকরগণ! তোমাদিগের নৃশংস ব্যবহারে প্রাতঃস্মরণীয় সিড্‌নি, হাউয়ার্ড, হল প্রভৃতি মহানুভব দ্বারা অলঙ্কৃত ইংরাজকুলে কলঙ্ক রটিয়াছে। তোমাদিগের ধনলিপ্সা কি এতই বলবতী যে তোমরা অকিঞ্চিৎকর ধনানুরোধে ইংরাজ জাতির বহুকালার্জিত বিমল যশস্তামরসে কীটস্বরূপে ছিদ্র করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ। এক্ষণে তোমরা যে সাতিশয় অত্যাচার দ্বারা বিপুল অর্থ লাভ করিতেছ তাহা পরিহার কর, তাহা হইলে অনাথ প্রজারা সপরিবারে অনায়াসে কালাতিপাত করিতে পারিবে। তোমরা এক্ষণে দশ মুদ্রা ব্যয়ে শত মুদ্রার দ্রব্য গ্রহণ করিতেছ, তাহাতে প্রজাপুঞ্জের যে ক্লেশ হইতেছে তাহা তোমরা বিশেষ জ্ঞাত আছ; কেবল ধনলাভপরতন্ত্র হইয়া প্রকাশ করণে অনিচ্ছুক। তোমরা কহিয়া থাক যে তোমাদের মধ্যে কেহ কেহ বিদ্যাদানে অর্থ বিতরণ করিয়া থাকেন এবং সুযোগ ক্রমে ঔষধ দেন; এ কথা যদিও সত্য হয়, কিন্তু তাহাদের বিদ্যাদান পয়স্বিনী ধেনুবধে পাদুকা দানাপেক্ষাও ঘৃণিত এবং ঔষধ বিতরণ কালকূটকুম্ভে ক্ষীর ব্যবধান মাত্র। শ্যামচাঁদ আঘাত উপরে কিঞ্চিৎ টারপিন তৈল দিলেই যদি ডিস্পেন্সারি করা হয়, তবে তোমাদের প্রত্যেক কুটিতে ঔষধালয় আছে বলিতে হইবে।

Continue Reading