History of Bengal- Rakhal Das Bandopadhya: Pre-Historic Era

Rakhaldas-Banerji- History of Bengal

বাঙ্গালার ইতিহাস-রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়:প্রাগৈতিহাসিক যুগ

বাঙ্গালার ইতিহাস।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ।

Synopsis 

যুগ বিভাগ—মানবের অস্তিত্বের সর্ব্বপ্রাচীন নিদর্শন—আদিম-মানব নিরামিষাশী—যুগবিপ্লব—আদিম মানবের স্বভাব পরিবর্ত্তন—মানবের প্রথম অস্ত্র—প্রস্তরের যুগ—প্রত্ন-প্রস্তরের যুগ—বাঙ্গালা দেশে আবিষ্কৃত নিদর্শন—বঙ্গবাসী ও মাদ্রাজবাসী আদিম মানব—নব্য-প্রস্তর যুগ—বাঙ্গালাদেশে আবিষ্কৃত নিদর্শন—ধাতু আবিষ্কার—তাম্রের যুগ—বাঙ্গালা দেশের তাম্র নির্ম্মিত অস্ত্র।

জগতে, সর্ব্বপ্রথমে, কোন্ যুগে কত কাল পূর্ব্বে, মানবের সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা এখনও অজ্ঞাত রহিয়াছে। প্রাণিতত্ত্ববিদ্‌গণ স্থির করিয়াছেন যে, বর্ত্তমান সময়ের সকল জীবের পরে মানবের আবির্ভাব হইয়াছিল। ভূতত্ত্ববিদ্‌গণ বলিয়া থাকেন যে, নব্যজীবক যুগের শেষভাগে মানবের অস্তিত্বের চিহ্ন লক্ষিত হয়[১]। অস্ত্যাধুনিক উপযুগ হইতে ভূপৃষ্ঠে মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়, কিন্তু ইহার পূর্ব্ববর্ত্তী দুইটি উপযুগে মানবের অস্তিত্ব সম্বন্ধে ভূতত্ত্ববিদ্‌গণের মধ্যে মতভেদ আছে। কেহ কেহ বলেন যে, মধ্যাধুনিক ও বহ্বাধুনিক উপযুগে মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়; কিন্তু কেহ কেহ এই সকল নিদর্শনের সহিত মানবের সম্পর্ক স্বীকার করেন না[২]। কেহ কেহ বলেন যে, বহ্বাধুনিক উপযুগে মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন আবিষ্কৃত হইবে ইহা আশা করা যাইতে পারে, কিন্তু মধ্যাধুনিক যুগে মানবের অস্তিত্ব প্রমাণ করিবার কোন আশাই নাই। মাদ্রাজ প্রদেশে কর্ণুল নামক স্থানে একটি পর্ব্বতগুহায় জীবাশ্মের (Fossil) সহিত আদিম মানবের অস্তিত্বের নিদর্শন আবিষ্কৃত হইয়াছে। ভূতত্ত্ববিদ্‌গণ অনুমান করেন যে, এই সকল জীবাশ্ম বহ্বাধুনিকযুগের স্তন্যপায়ী জীবের অস্থি[৩]। ব্রহ্মদেশে বহ্বাধুনিকযুগের লুপ্ত স্তন্যপায়ী জীবের অস্থির সহিত আদিম মানব কর্ত্তৃক ব্যবহৃত প্রস্তরনির্ম্মিত অস্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে[৪]। অস্ত্যাধুনিক ও উপাধুনিক যুগে মানবের অস্তিত্ব সম্বন্ধে মনীষিগণের মতদ্বৈধ নাই।

Continue Reading

THE HISTORY OF BENGAL – R.C. Majumdar and Jadunath Sarkar Vol: I, II and III

THE HISTORY OF BENGAL PUBLICATION COMMITTEE

PREFACE- EXTRACT

The idea of writing a comprehensive History of Bengal on modem scientific lines may be traced back to 1912 when Lord Carmichael,  the first Governor of the Bengal Presidency, took the initiative and invited MM. Haraprasad Sastri to prepare a scheme. It was proposed to publish the history in three volumes dealing respectively with the Hindu, Muslim and British periods. Several meetings were held in the Government House, Calcutta, but what became the result of this plan and how far it was matured are not definitely known,  to me years later, the late Raja Prafulla Nath Tagore, the grandson of the famous Kali Krishna Tagore, volunteered to pay the entire cost of such a publication and invited the late Mr. Rakhaldas Banerji to draw up a plan along with some other well-known scholars of his time. Several meetings were held in the bouse of the Baja, but ultimately nothing came out of it.

Ever since the foundation of the University of Dacca, it was felt that the University should take up the task of preparing a  History of Bengal as early as practicable. This idea received on impetus from Sir Jadunath Sarkar, who, in the course of a lecture delivered at the University about the middle of July 19S3, emphasised  ‘that a History of Bengal on modem scientific lines was long overdue,  and that this University, standing as it does in the very heart of an ancient and important seat of Bengal culture, should in the fitness of things take up the work. Sir Jadunath promised his whole-hearted support and active co-operation in this enterprise.

The scheme received a new impetus from Mr. (now Sir)  A. F. Rahman, when he joined the University as Vice-Chancellor in  July 1934. In his first convocation address next month he emphasised  the need of commencing the work, and in his second convocation
speech, in July 1935, he announced that some preliminary work had already been done.

By the end of August 1935, the scheme took a more definite  shape, as Professor R. C. Majumdar, Head of the Department of  History, who was so busy with his own research
work (m Ae history of Ancient Imfian Colonies in the Far East, was now free to take up the world.

Continue Reading

বিশ্বভারতী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

।। যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্ ।।

মানব-সংসারে জ্ঞানালোকের দিয়ালি-উৎসব চলিতেছে। প্রত্যেক জাতি আপনার আলোটিকে বড়ো করিয়া জ্বালাইলে তবে সকলে মিলিয়া এই উৎসব সমাধা হইবে। কোনো জাতির নিজের বিশেষ প্রদীপখানি যদি ভাঙিয়া দেওয়া যায়, অথবা তাহার অস্তিত্ব ভুলাইয়া দেওয়া যায় তবে তাহাতে সমস্ত জগতের ক্ষতি করা হয়।

এ কথা প্রমাণ হইয়া গেছে যে, ভারতবর্ষ নিজেরই মানসশক্তি দিয়া বিশ্বসমস্যা গভীরভাবে চিন্তা করিয়াছে এবং আপন বুদ্ধিতে তাহার সমাধানের চেষ্টা পাইয়াছে। সেই শিক্ষাই আমাদের দেশের পক্ষে সত্য শিক্ষা যাহাতে করিয়া আমাদের দেশের নিজের মনটিকে সত্য আহরণ করিতে এবং সত্যকে নিজের শক্তির দ্বারা প্রকাশ করিতে সক্ষম করে। পুনরাবৃত্তি করিবার শিক্ষা মনের শিক্ষা নহে, তাহা কলের দ্বারাও ঘটিতে পারে।

ভারতবর্ষ যখন নিজের শক্তিতে মনন করিয়াছে তখন তাহার মনের ঐক্য ছিল—এখন সেই মন বিচ্ছিন হইয়া গেছে। এখন তাহার মনের বড়ো বড়ো শাখাগুলি একটি কাণ্ডের মধ্যে নিজেদের বৃহৎ যোগ অনুভব করিতে ভুলিয়া গেছে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে এক-চেতনাসূত্রের বিচ্ছেদই সমস্ত দেহের পক্ষে সাংঘাতিক। সেইরূপ, ভারতবর্ষের যে মন আজ হিন্দু বৌদ্ধ জৈন শিখ মুসলমান খৃস্টানের মধ্যে বিভক্ত ও বিশ্লিষ্ট হইয়া আছে সে মন আপনার করিয়া কিছু গ্রহণ করিতে বা আপনার করিয়া কিছু দান করিতে পারিতেছে না। দশ আঙুলকে যুক্ত করিয়া অঞ্জলি বাঁধিতে হয়—নেবার বেলাও তাহার প্রয়োজন, দেবার বেলাও। অতএব ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈদিক পৌরাণিক বৌদ্ধ জৈন মুসলমান প্রভৃতি সমস্ত চিত্তকে সম্মিলিত ও চিত্তসম্পদকে সংগৃহীত করিতে হইবে; এই নানা ধারা দিয়া ভারতবর্ষের মন কেমন করিয়া প্রবাহিত হইয়াছে তাহা জানিতে হইবে। এইরূপ উপায়েই ভারতবর্ষ আপনার নানা বিভাগের মধ্য দিয়া আপনার সমগ্রতা উপলব্ধি করিতে পারিবে। তেমনই করিয়া আপনাকে বিস্তীর্ণ এবং সংশ্লিষ্ট করিয়া না জানিলে, যে শিক্ষা সে গ্রহণ করিবে তাহা ভিক্ষার মতো গ্রহণ করিবে। সেরূপ ভিক্ষাজীবিতায় কখনো কোনো জাতি সম্পদশালী হইতে পারে না।

Continue Reading

নীল-দর্পণ নাটক – Nil Darpan Natak: Dinabandhu Mitra 1860

নীলকর-বিষধর-দংশিন কাতর-প্রজানিকর-ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণীতং।

ভূমিকা।

নীলকরনিকরকরে নীল-দর্পণ অর্পণ করিলাম। এক্ষণে তাঁহারা নিজ নিজ মুখ সন্দর্শন পূর্ব্বক তাঁহাদিগের ললাটে বিরাজমান স্বার্থপরতা কলঙ্ক-তিলক বিমোচন করিয়া তৎপরিবর্ত্তে পরোপকার শ্বেতচন্দন ধারণ করুন, তাহা হইলেই আমার পরিশ্রমের সাফল্য, নিরাশ্রয় প্রজাব্রজের মঙ্গল এবং বিলাতের মুখ রক্ষা। হে নীলকরগণ! তোমাদিগের নৃশংস ব্যবহারে প্রাতঃস্মরণীয় সিড্‌নি, হাউয়ার্ড, হল প্রভৃতি মহানুভব দ্বারা অলঙ্কৃত ইংরাজকুলে কলঙ্ক রটিয়াছে। তোমাদিগের ধনলিপ্সা কি এতই বলবতী যে তোমরা অকিঞ্চিৎকর ধনানুরোধে ইংরাজ জাতির বহুকালার্জিত বিমল যশস্তামরসে কীটস্বরূপে ছিদ্র করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ। এক্ষণে তোমরা যে সাতিশয় অত্যাচার দ্বারা বিপুল অর্থ লাভ করিতেছ তাহা পরিহার কর, তাহা হইলে অনাথ প্রজারা সপরিবারে অনায়াসে কালাতিপাত করিতে পারিবে। তোমরা এক্ষণে দশ মুদ্রা ব্যয়ে শত মুদ্রার দ্রব্য গ্রহণ করিতেছ, তাহাতে প্রজাপুঞ্জের যে ক্লেশ হইতেছে তাহা তোমরা বিশেষ জ্ঞাত আছ; কেবল ধনলাভপরতন্ত্র হইয়া প্রকাশ করণে অনিচ্ছুক। তোমরা কহিয়া থাক যে তোমাদের মধ্যে কেহ কেহ বিদ্যাদানে অর্থ বিতরণ করিয়া থাকেন এবং সুযোগ ক্রমে ঔষধ দেন; এ কথা যদিও সত্য হয়, কিন্তু তাহাদের বিদ্যাদান পয়স্বিনী ধেনুবধে পাদুকা দানাপেক্ষাও ঘৃণিত এবং ঔষধ বিতরণ কালকূটকুম্ভে ক্ষীর ব্যবধান মাত্র। শ্যামচাঁদ আঘাত উপরে কিঞ্চিৎ টারপিন তৈল দিলেই যদি ডিস্পেন্সারি করা হয়, তবে তোমাদের প্রত্যেক কুটিতে ঔষধালয় আছে বলিতে হইবে।

Continue Reading

Amake tumi – আমাকে তুমি: জীবনানন্দ দাশ

বনলতা সেন-BNANALATA SEN

আমাকে তুমি

জীবনানন্দ দাশ

 

আমাকে
তুমি দেখিয়েছিলে একদিন:

মস্ত বড়ো ময়দান— দেবদারু পামের নিবিড় মাথা— মাইলের পর মাইল;
দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস
দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হ’য়ে হারিয়ে যায়;
জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার;
জানালায়-জানালায় অনেকক্ষণ ধ’রে কথা বলে:
পৃথিবীকে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়।

তারপর
দূরে
অনেক দূরে
খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রূপসীর মতো ধান ভানে— গান গায়— গান গায়
এই দুপুরের বাতাস।

এক-একটা দুপুরে এক-একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হ’য়ে যায় যেন।

বিকেলে নরম মুহূর্ত;
নদীর জলের ভিতর শম্বর, নীলগাই, হরিণের ছায়ার আসা-যাওয়া;
একটা ধবল চিতল-হরিণীর ছায়া
আতার ধূসর ক্ষীরে-গড়া মূর্তির মতো
নদীর জলে
সমস্ত বিকেলবেলা ধ’রে
স্থির।

মাঝে-মাঝে অনেক দূর থেকে শ্মশানের চন্দনকাঠের চিতার গন্ধ,
আগুনের— ঘিয়ের ঘ্রাণ;
বিকেলে
অসম্ভব বিষণ্ণতা।

ঝাউ হরিতকী শাল, নিভন্ত সূর্যে
পিয়াশাল পিয়াল আমলকী দেবদারু—
বাতাসের বুকে স্পৃহা, উৎসাহ, জীবনের ফেনা;

শাদা শাদাছিট কালো পায়রার ওড়াউড়ি জ্যোৎস্নায়— ছায়ায়,
রাত্রি;
নক্ষত্র ও নক্ষত্রের
অতীত নিস্তব্ধতা।

মরণের পরপারে বড়ো অন্ধকার
এই সব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো।


বনলতা সেন[Banalata Sen] ১৩৩৫ – ১৩৫o

Photo donated by: Bhaswati Bhattacharyya

Haowar Rat- হাওয়ার রাত-জীবনানন্দ দাশ

Banalata Sen

গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল-অসংখ্য নক্ষত্রের রাত;

সারারাত বির্স্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে;
মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,
কখনো বিছানা ছিঁড়ে
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে,
এক-একবার মনে হচ্ছিল আমার-আধো ঘুমের ভিতর হয়তো-
মাথার উপরে মশারি নেই আমার
স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো উড়ছে সে!
কাল এমন চমৎকার রাত ছিল।

সমস্ত মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল-আকাশে এক তিল ফাঁক ছিল না;
পৃথিবীর সমস্ত ধূরসপ্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর দেখেছি আমি;
অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চূড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির-ভেজা চোখের মতো
ঝলমল করছিল সমস্ত নক্ষত্রেরা;
জোছনারাতে বেবিলনের রানির ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার
শালের মতো জ্বলজ্বল করছিল বিশাল আকাশ!
কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিল।

যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে।
তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে
যে রূপসীদের আমি এশিরিয়ার, মিশরে বিদিশায় ম’রে যেতে দেখেছি
কাল তারা অতিদূরে আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে করে
কাতারে কাতের দাঁড়িয়ে গেছে যেন-
মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য?
জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?
প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?

আড়ষ্ট-অভিভূত হয়ে গেছি আমি,
কাল রাতের প্রবল নীল অত্যাচার আমাকে ছিঁড়ে ফেলেছে যেন;
আকাশের বিরামহীন বিস্তীর্ণ ডানার ভিতর
পৃথিবী কীটের মতো মুছে গিয়েছে কাল!
আর উত্তুঙ্গ বাতাস এসেছে আকাশের বুক থেকে নেমে
আমার জানালার ভিতর দিয়ে, শাঁই শাঁই করে,
সিংহের হুঙ্কারে উৎক্ষিপ্ত হরিৎ প্রান্তরের অজস্র জেব্রার মতো!

হৃদয় ভরে গিয়েছে আমার বিস্তীর্ণ ফেল্টের সবুজ ঘাসের গন্ধে,
দিগন্ত-প্লাবিত বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে
মিলনোন্মত্ত বাঘিনীর গর্জনের মতো অন্ধকারের চঞ্চল বিরাট সজীব রোমশ উচ্ছ্বাসে,
জীবনের দুর্দান্ত নীল মত্ততায়!

আমার হৃদয় পৃথিবী ছিঁড়ে উড়ে গেল,
নীল হাওয়ার সমুদ্রে স্ফীত মাতাল বেলুনের মতো গেল উড়ে,
একটা দূর নক্ষত্রের মাস্তুলকে তারায়-তারায় উড়িয়ে নিয়ে চলল
একটা দুরন্ত শকুনের মতো।


Haowar Rat- হাওয়ার রাত

বনলতা সেন[Banalata Sen] ১৩৩৫ – ১৩৫ o


Featured: Kuhumita Laha advocate

Durga Puja Paddhyti as per Kalika Puran

Durga Puja in Bengal

How to worship Durga in Saradiya Durga Puja

Durga, as worshipped in Bengal in the season of SARAT KAL, is popularly known Akal Bodhan, which is an untimely invocation. So, what is a timely invocation of the Deity – Basanta Kal – Basanti Puja and it is observed in all over India as Navaratra[शारदीय नवरात्र].

Kalika Puran is an Upapuran, i.e it is not a principal Puran.  Authority of Puran Literatures has been questioned by the Scholars of Sanskrit. Vedas are the valid source of knowledge to know Sanatan Dharma. Navaratra was nine days session[Satra] mentioned in Brahman Literatures. Puja was also not mentioned in Vedas. Puja how originated nobody can comment on it authoritatively. some may say that the origin of Puja was with Jaina Dharma, or Atharva Veda or some Agam Tantra. However, the practice has been here since time immemorial.

Puja is fine mixture of Vedic and Tantric Mantras along with Yoga[pranayama], Meditation, Homa and Agama Tantra… these were called Chatur Byuha[चतूर ब्यूह ].      

The following book was edited by a scholar of his time in 1923 and certified by Mahamohopadhya Hara Prasad Shastri. The short introduction given by him is worth mentioning as he was the authority in that subject at his time.

Continue Reading

তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না

Sree Krishna Chaitanya

তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব , ছেড়ে দেব না !

ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌর
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌর
আমরা আর পাব না, আর পাব না –
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব , ছেড়ে দেব না !
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব , ছেড়ে দেব না !

ভুবণ মোহন গোরা , কোন মণিজনার মনহরা
ভুবন মোহন গোরা , কোন মণিজনার মনহরা
মণিজনার মনহরা
ওরে – রাঁধার প্রেমে মাতোয়ারা
চাঁদ গৌর আমার – রাঁধার প্রেমে মাতোয়ারা
ধুলায় যায় ভাই গড়াগড়ি !
যেতে চাইলে যেতে দেব না না না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব , ছেড়ে দেব না !

যাব ব্রজের কুলে কুলে –
যাব ব্রজের কুলে কুলে –
আমরা মাখব পায়ে রাঙ্গা ধুলি
মাখব পায়ে রাঙ্গা ধুলি
ওরে পাগল মন –
যাব ব্রজের কুলে কুলে –
মাখব পায়ে রাঙ্গা ধুলি
ওরে নয়নেতে নয়ন দিয়ে রাখিব তারে
ওরে নয়নেতে নয়ন দিয়ে রাখিব তারে
চলে গেলে চলে গেলে যেতে দেব না না না
যেতে দেব না !
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব, ছেড়ে দেব না !
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিব , ছেড়ে দেব না !

যে ডাকে চাঁদ গৌর বলে
ওগো ভয়কি গো তার ব্রজের কুলে
যে ডাকে চাঁদ গৌর বলে
ভয়কি গো তার ব্রজের কুলে[2]
ভয়কি তার ব্রজের কুলে
ওরে – দ্বিজ ভূষণ চাঁদে বলে [2]
চরণ ছেড়ে দেব না
না না ছেড়ে দেব না
তোমায় বক্ষ মাঝে
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিব , ছেড়ে দেব না !
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব , ছেড়ে দেব না !


Tomai Hrid Majhare Rakhbo Chhere Debo Na: দ্বিজ ভূষণ চাঁদ

মাইকেল মধুসূদন দত্ত – Michael Madhusudan Dutt

ঈশ্বরচন্দ্র যখন মৃত্যুশষ্যাতে শয়ান, তখন মধুসূদন লোকচক্ষের অগোচয়ে থাকিয়া প্রতিভা-বলে উঠিয়া দাঁড়াইবার জন্য দুরন্ত পরিশ্রম করিতেছিলেন। মধুসূদন যশোর জেলাস্থ সাগরদাঁড়ী নামক গ্রামবাসী রাজনারায়ণ দত্তের পুত্র। তাঁহার পিতা কলিকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের একজন প্রসিদ্ধ উকীল ছিলেন; এবং তদুপলক্ষে কলিকাতায় উপনগরবর্ত্তী খিদিরপুর নামক স্থানে বাস করিতেন। ইংরাজী ১৮০৪ সালে, ১৫ জানুয়ারী তাঁহার জন্ম হয়। তাঁহার জননী জাহ্নবী দাসী কাটিপাড়ার জমিদার গৌরীচরণ ঘোষের কন্যা। জাহ্নবীর জীবদ্দশাতেই বিলাস-পরায়ণ রাজনারায়ণ আর তিনটী বিবাহ করিয়াছিলেন। দুইটী সহোদর ভ্রাতার অকালে মৃত্যু হওরায় মধুসূদন স্বীয় জননীর একমাত্র পুত্র ছিলেন। সুতরাং তিনি শৈশববধি মায়ের অঞ্চলের নিধি, আদুরে ছেলে ছিলেন। রাজনারায়ণেয় অর্থের অভাব ছিল না; সুতরাং অর্থের দ্বারা সস্তানকে যতদূর আদর দেওয়া যায়,


মধুসূদনের পিতামাতা পুত্রকে তাহা দিতে কখনই কৃপণতা করিতেন না। মধুসূদন প্রথমে সাগরদাঁড়ীতে জননীর নিকট থাকিয়া পাঠশালাতে, বিদ্যা শিক্ষা আরম্ভ করেন। ১২ । ১৩ বৎসর বয়সে তাঁহার পিতা তাঁহাকে নিজের খিদিরপুরের বাটীতে আনিয়া হিন্দুকালেজে ভর্তি করিয়া দেন। কালেজে পদার্পণ করিবামাত্র মধুসূদনের আশ্চর্য ধীশক্তি সকলের গোচর হইল। তিনি ১৮৩৭ সালে কালেজে প্রবিষ্ট হইয়া ১৮৪১ সাল পর্যন্ত তথায় পাঠ করিয়াছিলেন। এই অল্পকালের মধ্যে সিনিয়ার স্কলারশিপের শ্রেণী পৰ্যন্ত পাঠ করেন; এবং সকল শ্রেণীতেই অগ্রগণ্য বালকদিগের মধ্যে পরিগণিত হইয়াছিলেন। সে সময়ে যাঁহারা তাঁহার সমাধ্যায়ী ছিলেন, তাঁহারা বলেন যে তিনি গণিত বিদ্যায় একেবারে অবহেলা প্রকাশ করিতেন এবং কাব্য ও ইতিহাস পাঠেই অধিক মনোযোগী ছিলেন। আদুরে ছেলের চরিত্রে যে সকল লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহা এ সময়ে তাঁহার চরিত্রে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হইত। তিনি অমিতব্যয়ী, বিলাসী, আমোদ-প্রিয়, কাব্যানুরাগী ও বন্ধুবান্ধবের প্রতি প্রীতিমান ছিলেন। ধুলিমুষ্টির ন্যায় অর্থমুষ্টি ব্যয় করিতেন। সে সময়ে সুরাপান ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের মধ্যে একটা সৎসাহসের কার্য্য বলিয়া গণ্য ছিল; মধুসূদনের সময়ে কালেজের অনেক ছাত্র সুরাপান করাকে বাহাদুরির কাজ মনে করিত। মধু তাঁহাদের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ছিলেন। এতদ্ব্যতীত অপরাপর অসমসাহসিক পাপকাৰ্য্যেও তিনি লিপ্ত হইতেন। পিতামাতা দেখিয়াও দেখিতেন না; বরং অর্থ যোগাইয়া প্রকারান্তরে উৎসাহদান করিতেন। যাহা হউক, বিবিধ উচ্ছৃঙ্খলতা সত্ত্বেও মধুসুদন জ্ঞানানুশীলনে কখনই অমনোযোগী হইতেন না। কালেজে তিনি কাপ্তেন রিচার্ডসনের নিকট ইংরাজী-সাহিত্য পাঠ করিতেন। সৎক্ষেত্রে পতিত কৃষির ন্যায় রিচার্ডসনের কাব্যানুরাগ মধুর হৃদয়ে পড়িয়া সুন্দর ফল উৎপন্ন করিয়াছিল। তিনি ছাত্রাবস্থাতেই ইংরাজী কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। প্রতিভার শক্তি কোথায় যাইবে! সেই ইংরাজী কবিতাগুলিতে তাঁহার যথেষ্ট কবিত্বশক্তি প্রকাশ পাইয়াছে।

কবিতারচনাতে ও পাঠ্যবিষয়ে তাঁহার কৃতিত্ব দেখিয়া সকলেই অনুমান করিতেন যে মধু কালে দেশের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি হইবেন। মধুর পিতামাতাও বোধ হয় সেই আশা করিতেন। কিন্তু যে প্রতিভার গুণে মধু অসাধারণ শক্তি প্রদর্শন করিতেন; সেই প্রতিভাই তাঁহাকে সুস্থির থাকিতে দিল না। যৌবনের উন্মেষ হইতে না হইতে তাঁহার আভ্যন্তরীণ শক্তি তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিতে লাগিল। গতানুগতিকের চিরপ্রাপ্ত বীথিকা তাঁহার অসহনীয় হইয়া উঠিল। দশজনে যাহা করিতেছে, দশজনে যাহাতে সস্তুষ্ট আছে, তাহা তাঁহার পক্ষে ঘৃণার বস্তু হইয়া উঠিল; তাঁহার প্রকৃতি নুতন ক্ষেত্র, নূতন কাজ, নূতন উত্তেজনার জন্য লালায়িত হইতে লাগিল।

ইত্যবসরে তাহার জনকজননী তাঁহার এক বিবাহের প্রস্তাব উপস্থিত করিলেন। একটা আট বৎসরের বালিকা, যাহাকে চিনি না জানি না, তাঁহাকে বিবাহ করিতে হইবে, এই চিন্তা মধুকে ক্ষিপ্ত-প্রায় করিয়া তুলিল। তিনি পলায়নের পরামর্শ করিতে লাগিলেন। পলাইবেন কোথায়? একেবারে বিলাতে! তাহা না হইলে আর প্রতিভার খেয়াল কি! কার সঙ্গে যাইবেন, টাকা কে দিবে, সেখানে গিয়া কি করিবেন, তাহার কিছুরই স্থিরতা নাই; যখন পলাইতে হইবেই, তখন দেশ ছাড়িয়া একেবারে বিলাতে পলানই ভাল! পরামর্শ স্থির আগে হইল, টাকার চিন্তা পরে আসিল। ‘টাকা কোথায় পাই, বাবা জানিলে দিবেন না, মার নিকটেও পাইব না, আর ত কাহাকেও কোথায়ও দেখি না। শেষে মনে হইল মিশনারিদিগের শরণাপন্ন হই, দেখি তাঁহারা কিছু করিতে পারেন কি না। গেলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের নিকটে; তিনি নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিলেন যে তাঁহার মনে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ অপেক্ষা বিলাত যাওয়ায় বাতিকটাই বেশী। এইরূপে আরও কয়েক দ্বারে ফিরিলেন। শেষে কি হইল, কি দেখিলেন, কি শুনিলেন, কি ভাবিলেন, কি বুঝিলেন, তাঁহার বন্ধুরা কিছুই জানিতে পারিলেন না।

১৮৪৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষে বন্ধুগণের মধ্যে জনরব হইল যে, মধু খ্রীষ্টান হইবার জন্য মিশনারীদিগের নিকট গিয়াছে। অমনি সহরে হুলস্থূল পড়িয়া গেল। হিন্দুকালেজের প্রসিদ্ধ ছাত্র ও সদর দেওয়ানী আদালতের প্রধান উকীল রাজনারায়ণ দত্তের পুত্র খ্ৰীষ্টান হইতে যায়—এই সংবাদে সকলের মন উত্তেজিত হইয়া উঠিল। রাজনারায়ণ পুত্রকে প্রতিনিবৃত্ত করিবার জন্য চেষ্টার অবধি রাখিলেন না। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। উক্ত সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রারম্ভে তিনি খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইলেন।

আমরা সহজেই অনুমান করিতে পারি তাঁহার পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের মনে কিরূপ আঘাত লাগিল। কিন্তু তাঁহারা তাঁহাকে অর্থ সাহায্য করিতে বিরত হইলেন না। খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়া মধু হিন্দু কালেজ পরিত্যাগ করিলেন এবং বিধিমতে খ্ৰীষ্টীয় শাস্ত্র শিক্ষা করিবার জন্য বিশপস কালেজে প্রবেশ করিলেন। এখানে তিনি ১৮৪৩ সাল হইতে ১৮৪৭ সাল পর্য্যন্ত ছিলেন; এবং এখানে অবস্থানকালে হিব্রু, গ্ৰীক, লাটিন প্রভৃতি নানা ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু বিশপস কালেজেই বা কে তাঁহাকে বাঁধিয়া রাখে? তাঁহার বিলাতগমনের খেয়ালটার যে কি হইল তাহার প্রকাশ নাই; কিন্তু বঙ্গদেশ তাঁহার পক্ষে আবার অসহ্য হইয়া উঠিল। আবার গতানুগতিকের প্রতি বিতৃষ্ণ জন্মিল; অবশেষে একদিন কাহাকেও সংবাদ না দিয়া একজন সহাধ্যায়ী বন্ধুর সহিত মাক্সাজে পলাইয়া গেলেন।

মাদ্রাজে গিয়া তিনি এক নুতন অভাবের মধ্যে পড়িলেন। অর্থের জন্য তাঁহাকে কখনও চিন্তিত হইতে হয় নাই। দেশে থাকিতে পিতামাতা তাঁহার সকল অভাব দূর করিতেন। সেখানে তাঁহাকে নিজের উদরায় নিজে উপার্জ্জন করিতে হইল। কিন্তু তিনি ইংরাজী রচনাতে যেরূপ পারদর্শী ছিলেন, তাঁহার কাজের অভাব হইল না। তিনি মান্দ্রাজ সহরের ইংরাজ—সম্পাদিত কতকগুলি সংবাদপত্রে লিখিতে আরম্ভ করিলেন। অল্পকালের মধ্যেই তাঁহার খ্যাতি প্রতিপত্তি হইয়া উঠিল। ১৮৪৯ সালে “Captive Lady” নামে একখানি ইংরাজী পদ্যগ্রন্থ মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলেন। তাহাতে তাঁহার কবিত্বশক্তির ও ইংরাজীভাষাভিজ্ঞতার যথেষ্ট প্রশংসা হইল। কিন্তু মহাত্মা বেথুনের ন্যায় ভাল ভাল ইংরাজগণ তাহা দেখিয়া বলিলেন যে বিদেশীয়ের পক্ষে ইংরাজী কবিতা লিখিয়া প্রতিষ্ঠালাভের চেষ্টা করা মহা ভ্রম; তদপেক্ষা এরূপ প্রতিভা স্বদেশীয় ভাষাতে নিয়োজিত হইলে দেশের অনেক উপকার হইতে পারে। তাঁহার প্রতিভা আবার তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিল। সেখানে একজন ইংরাজমহিলার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক আর একটা ইংরাজমহিলাকে পত্নীভাবে লইয়া ১৮৫৬ সালে, আবার দেশে পলাইয়া আসিলেন। কিন্তু হায় দেশে আসিয়া কি পরিবর্ত্তনই দেখিলেন। পিতা মাতা এ জগতে নাই; আত্মীয় স্বজন বিধৰ্ম্মী বলিয়া তাঁহাকে মন হইতে পরিত্যাগ করিয়াছেন; পৈতৃক সম্পত্ত্বি অপরের গ্রাস করিয়া বসিয়াছে; বাল্যসুহৃদ ও সহাধ্যারিগণ তাঁহাকে ভুলিয়া গিয়াছেন; এবং নানা স্থানে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়াছেন; নব্যবঙ্গের রঙ্গভূমিতে নুতন একদল নেতা আসিয়াছেন, তাঁহাদের ভাব গতি অন্য প্রকার; এইরূপে মধুসূদন স্বদেশে আসিয়াও যেন বিদেশীয়দিগের মধ্যে পড়িলেন। এই অবস্থাতে তাঁহার বন্ধু গৌরদাস বসাকের সাহায্যে কলিকাতা পুলিস আদালতে ইন্টারপ্রিটারি কৰ্ম্ম পাইয়া, তাহা অবলম্বন পুৰ্ব্বক দিন যাপন করিতে লাগিলেন।

কিরূপে তাঁহার বন্ধু গৌরদাস বাবু তাঁহাকে পাইকপাড়ার রাজাদ্বয়ের ও যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর মহাশয়ের সহিত পরিচিত করিয়া দেন, কিরূপে তাঁহারা সংস্কৃত রত্নাবলী নাটকের বাঙ্গালা অনুবাদ করাইয়া বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে তাঁহার অভিনয় করান ও তৎসূত্রে উক্ত অনুবাদের ইংরাজী অনুবাদ করিয়া কিরূপে মধুসূদন শিক্ষিতব্যক্তিগণের নিকট পরিচিত হন, তাহা পূৰ্ব্বে কিঞ্চিৎ বর্ণন করিয়াছি। বলিতে কি ঐ রত্নাবলীর ইংরেজী অনুবাদ মধুসূদনের প্রতিভা বিকাশের হেতুভূত হইল। তিনি সংস্কৃত নাটক রচনার রীতির দোষগুণ ভাল করিয়া অনুভব করিলেন; এবং এক নবপ্রণালীতে বাঙ্গালা নাটক রচনার বাসনা তাঁহার অন্তরে উদিত হইল। তিনি তদনুসারে ১৮৫৮ সালে “শৰ্ম্মিষ্ঠা” নামক নাটক রচনা করিয়া মুদ্রিত করিলেন। মহা সমারোহে তাহা বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে অভিনীত হইল। তৎপরেই মধুসুদন প্রাচীন গ্ৰীসদেশীয় পুরাণ অবলম্বন করিয়া “পদ্মাবতী” নামে আর একখানি নাটক রচনা করেন। এই উভয় গ্রন্থে তিনি যশোলাভে কৃতকাৰ্য্য হইয়া বাঙ্গালা ভাষাতে গ্রন্থ রচন বিষয়ে উৎসাহিত হইয়া উঠিলেন। ইহার পরেই তিনি “একেই কি বলে সভ্যতা” ও “বুড়োশালিকের ঘাড়ের রে” নামে দুই খানি প্রহসন রচনা করেন। তৎপরে ১৮৬০ সালে রাজেদ্রলাল মিত্ৰ-সম্পাদিত “বিবিধার্থসংগ্রহ” নামক পত্রে তাঁহার নব অমিত্ৰাক্ষর ছন্দে প্রণীত “তিলোত্তম-সম্ভব কাব্য” প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয়; এবং অল্পকাল পরেই পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়। তিলোত্তমা বঙ্গসাহিত্যে এক নূতন পথ আবিষ্কার করিল। বঙ্গীয় পাঠকগণ নূতন ছন্দ, নূতন ভাব, নূতন ওজস্বিতা দেখিয়া চমকি উঠিলেন। মধুসূদনের নাম ও কীৰ্ত্তি সৰ্ব্বসাধারণের আলোচনার বিষয় হইল।

ইহার পরে তিনি “মেঘনাদবধ” কাব্য রচনাতে প্রবৃত্ত হন। ইহাই বঙ্গ সাহিত্য সিংহাসনে তাহার আসন চিরদিনের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। তাহার জীবনচরিতকার সত্যকথাই বলিয়াছেন, এবং আমাদেরও ইহা অত্যাশ্চৰ্য্য বলিয়া মনে হয় যে তাঁহার লেখনী যখন “মেঘনাদের” বীররস চিত্রনে নিযুক্ত ছিল, তখন সেই লেখনীই অপরদিকে “ব্ৰজাঙ্গনার” সুললিত মধুর রস চিত্রনে ব্যাপৃত ছিল। এই ঘটনা তাঁহার প্রতিভাকে কি অপুৰ্ব্ববেশে আমাদের নিকট আনিতেছে! একই চিত্রকর একই সময়ে কিরূপে এরূপ দুইটী চিত্র চিত্রিত করিতে পারে! দেখিয়া মনে হয়, মধুসূদনের নিজ প্রকৃতিকে দ্বিভাগ করিবার শক্তিও অসাধারণ ছিল। তাঁহার জন্যই বোধ হয় এত দুঃখ দরিদ্র্যের মধ্যে, এত ঘনঘোর বিধাদের মধ্যে, এত জীবনব্যাপী অতৃপ্তি ও অশাস্তির মধ্যে বসিয়া তিনি কবিতা রচনা করিতে পারিয়াছেন!

যাহা হউক তিনি কলিকাতাতে আসিয়া একদিকে যেমন কাব্য-জগতে নবযুগ আনয়নের চেষ্টা করিতে লাগিলেন, অপরদিকে জ্ঞাতিগণের হস্ত হইতে নিজ প্রাপ্য পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সে বিষয়ে কতদূর কৃতকার্য হইয়াছিলেন, তাহা বলিতে পারি না। তবে এ কথা নিশ্চিত, যে তিনি যাহা কিছু পাইয়াছিলেন ও যাহা কিছু নিজে উপার্জ্জন করিতেন, হিসাব করিয়া চলিতে পারিলে তাহাতেই এক প্রকার দিন চলিবার কথা ছিল। কিন্তু পিতামাতার যে আদুরে ছেলে জীবনে একদিনের জন্য আয় ব্যয়ের সমতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে নাই, সে আজ তাহা করিবে কিরূপে? কিছুতেই মধুর দুঃখ ঘুচিত না। প্রবৃত্তিকে যে কিরূপে শাসনে রাখিতে হয় তাহা তিনি জানিতেন না। মনে করিতেন প্রবৃত্তির চরিতার্থতাই মুখ। রাবণ তাহার আদর্শ, “ভিখারী রাঘব” নহে; সুতরাং হস্তে অর্থ আসিলেই তাহা প্রবৃত্তির অনলে আহুতির ন্যায় যাইত! সুধের জোয়ার দুইদিনের মধ্যে ফুরাইয়া, মধু ভাটার কাটখানার মত, যে চড়ার উপরে, সেই চড়ার উপরে পড়িয়া থাকিতেন। কেহ কি মনে করিতেছেন ঘৃণার ভাবে এই সকল কথা বলিতেছি? তা নয়। এই সরস্বতীর বরপুত্রের দুঃখ দারিদ্র্যের কথা স্মরণ করিয়া চক্ষের জল রাখিতে পারি না; অথচ এই কাব্যকাননের কলকণ্ঠ কোকিলকে ভাল না বাসিয়াও থাকিতে পারি না। অন্ততঃ তাঁহাতে একটা ছিল না; প্রদর্শনের ইচ্ছ ছিল না। কপটতা বা ভণ্ডামির বিন্দুমাত্র ছিল না। এই জন্য মধুকে ভালবাসি। আর একটা কথা, এমন প্রাণের তাজা ভালবাসা মানুষকে অতি অল্পলোকেই দেয়, এজন্যও মধুকে ভালবাসি। মধুসূদনের প্রতিভা আবার তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিল। ইংরাজ কবি সেক্সপীয়র বলিয়াছেন ‘কবিগণ পাগলের সামিল।’ তাই বটে; ১৮৬১ সালে মধুসূদনের মাথায় একটা নূতন পাগলামি বুদ্ধি আসিল। সেটা এই যে তিনি বিলাতে গিয়া বারিষ্টার হইবেন। লোকে বলিতে পারেন, এটা আবার পাগলামি কি? এত সদবুদ্ধি। যদি এ পৃথিবীতে বারিষ্টারি করিবার অনুপযুক্ত কোনও লোক জন্মিয়া থাকেন, তিনি মধুসূদন দত্ত। তাঁহার প্রকৃতির অস্থি মজ্জাতে বারিষ্টারির বিপরীত বস্তু ছিল; আইন আদালতের গতি লক্ষ্য করা, মক্কেলদিগের কাছে বাধা থাকা, নিয়মিত সময়ে নিয়মিত কাজ করা, তিনি ইহার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাহা বুঝলেন ন। ১৮৬২ সালের জুন মাসের প্রারম্ভে পত্নী ও শিশু কন্যা ও পুত্রকে রাখিয়া বারিষ্টার হইবার উদ্দেশ্যে বিলাত যাত্রা করিলেন। সেখানে গিয়া ৫ বৎসর ছিলেন। এই পাঁচ বৎসর তাঁহার দারিদ্র্যের ও কষ্টের সীমা পরিসীমা ছিল না। যাহাদের প্রতি নিজের বিষয় রক্ষা ও অর্থসংগ্রহের ভার দিয়া গিয়াছিলেন, এবং যাহাদের মুখাপেক্ষা করিয়া স্ত্রী পুত্র রাখিয়া গিয়াছিলেন, তাঁহারা সে বিশ্বাসানুরূপ কাৰ্য্য করিল না। হায়! দেশের কি অধোগতিই হইয়াছে! তাঁহার স্ত্রী পুত্র কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া ১৮৬৩ সালে বিলাতে তাঁহার নিকট পলাইয়া গেল। তাহাতে তাঁহার ব্যয়বৃদ্ধি হইয়া দারিদ্র্য ক্লেশ বাড়িয়া গেল। তিনি ইংলণ্ডে প্রাণধারণ করা অসম্ভব দেখিয়া, ফরাসিদেশে পলাইয়া গেলেন। সেখানে ঋণদায় ও কয়েদের ভয়ে তাঁহার দিন অতিকষ্টেই কাটিতে লাগিল। অনেক দিন সপরিবারে অনাহারে বাস করিতে হইতে; প্রতিবেশিগণের মধ্যে দয়াশীল ব্যক্তিদিগের সাহায্যে সে ক্লেশ হইতে উদ্ধার লাভ করিতেন। এরূপ অবস্থাতেও তিনি কবিতা রচনাতে বিরত হন নাই। এই সময়েই তাঁহার “চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী” রচিত হয়। ইহাই তাঁহার অলোকসামান্য প্রতিভার শেষফল বলিলে হয়। ইহার পরেও তিনি কোন কোনও বিষরে হস্তার্পণ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহার পূর্ণতা সম্পাদন করিতে পারেন নাই।

বিদেশবাসের দুঃখ কষ্টের মধ্যে পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার দুঃখের কথা জানিয়া তাঁহাকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন। যথাসময়ে তাঁহার সাহায্য না পাইলে, আর তাঁহার দেশে ফিরিয়া আসা হইত না। যাহা হউক তিনি উক্ত মহাত্মার সাহায্যে রক্ষা পাইয়া কোনও প্রকারে বারিষ্টারিতে উত্তীর্ণ হইয়া দেশে ফিরিয়া আসিলেন। বারিষ্টারি কাৰ্য্যে সুদক্ষ হইবার উপযুক্ত বিদ্যা বুদ্ধি তাঁর ছিল, ছিল না কেবল স্থিরচিত্ততা, তাঁহার মনের স্থিতি-স্থাপকতা শক্তি যেন অসীম ছিল। তিনি দুঃখের মধ্যে যখন পড়িতেন, তখন ভাবিতেন, আপনার প্রবৃত্তিকে সংযত করিয়া চলিবেন, কিন্তু স্বন্ধের জোয়ালটা একটু নামাইলেই নিজ মূৰ্ত্তি ধরিতেন, আবার সুখের আলোর পশ্চাতে ছুটতেন। দেশে যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন তাঁহার নাম সম্ভ‌্রম আছে, বন্ধুবান্ধব আছে, সাহায্য করিবার লোক আছে, যদি আপনাকে একটু সংযত করিয়া, নিজ কৰ্ত্তব্যে মন দিয়া বসিতেন, বারিষ্টারিতেই কিছু করিয়া উঠিতে পারিতেন। কিন্তু পাগলা কীটে তাঁহাকে সুস্থির বা সংযত হইতে দিল না। তিনি কয়েক বৎসর নানাস্থানে ঘুরিয়া নিজ অবস্থার উন্নতির জন্য বিফল চেষ্টা করিলেন। অবশেষে ১৮৭৩ সালের জুন মাসে নিতান্ত দৈন্যদশায় উপায়ান্তর না দেখিয়া, কলিকাতা আলিপুরের জেনারেল হস্পিটাল নামক হাসপাতালে আশ্রয় লইলেন। তাঁহার পত্নী হেনরিয়েটা তখন মৃত্যুশয্যায় শয়ানা! মধুসূদনের মৃত্যুর তিন দিন পূৰ্ব্বে হেনরিয়েটার মৃত্যু হইল। মৃত্যুশয্যাতে সমগ্র জীবনের ছবি মধুসূদনের স্মৃতিতে উদিত হইয়া তাঁহাকে অধীর করিয়াছিল। এরূপ শুনিতে পাওয়া যায় যে মৃত্যুর পূৰ্ব্বে তিনি কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকাইয়া তাঁহার নিকট খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে অবিচলিত বিশ্বাস স্বীকার পূর্ব্বক ও পরমেশ্বরের নিকট নিজ দুস্কৃতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া দেহত্যাগ করেন। ১৮৭৩ সাল, ২৯ শে জুন রবিবার, তিনি ভবধাম পরিত্যাগ করেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

Source: রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ by শিবনাথ শাস্ত্রী – 1909

ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী – Bhakti Siddhanta Saraswati Literatures

Siddhanta Saraswati Prabhupad
  • মণি-মঞ্জরী  (১৯২৫)
  • প্রমেয় রত্নাবলী
  • শ্রীহরিভক্তিকল্পলতিকা
  • সদাচার-স্মৃতিঃ
  • প্রাকৃতরস-শতদূষণী
  • সাধন-পথ

ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী (১৮৭৪–১৯৩৬)

Vaishnava Literature.JPG