সভ্যতার পাণ্ডা – গিরিশচন্দ্র ঘোষ -1894

মেয়ে আমার বিয়ে পাস করেছে। রাইডীং, বক্‌সীং, জিম্‌ন্যাস্‌টীক্‌ পর্য্যন্ত পর্য্যন্ত শিখেছে। তবে বৌটা মানুষ হলনা। আমি বারণ করেছিলুম যে ছোট ঘরের মেয়ে এন না, কর্ত্তা শুনলে না। সে সেই আইবুড়ীর মত ঘোম্‌টা দেবে, ছেলের সঙ্গে বেড়াতে যাবেনা, ঘোড়া চড়বে না, গাউন পরবে না, দুপাত ইংরেজিও পড়বে না।

উন্নত বঙ্গের ছবি দেখুন

SABHYATAR PANDA- GIRISH ACHANDRA GHOSH

সভ্যতার পাণ্ডা।

পঞ্চরং 

প্রথম দৃশ্য।

সভ্যতার বাটী।

সভ্যতা। (গীত)—

আমার মুখে হাসি চোখে ফাঁশি ভূবনমোহিনী।
মাদকতা প্রবঞ্চন। চিরসঙ্গিনী॥
অনাচার আমার কণ্ঠহার,
দাসী হ’য়ে চরণ সেবা করে ব্যভিচার,
আমি মধুমাখা কথা কয়ে আগে ভোলাই কামিনী ৷
হৃদাসনে সযতনে পুজি অহঙ্কার,
সে যে প্রাণপতি আমার,
আমার হৃদয় রতন, যতনের ধন, জোর করি ত তার,
আমি তার গরবে গরবিনী অাদরে আদরিণী॥

পুরাতন বর্ষের প্রবেশ।

সভ্যতা। গুডমর্ণিং ওল্ড ইয়ার! নিউ ইয়ার কে হবে কিছু ঠিক করলে?

পু-বর্ষ। আজ্ঞে আপনি দেখে শুনে নিন্, মনের মত তো কারুকে ঠেকে না, মহাত্মা নব্বই সাল, একানববই, বিরানব্বই, তিরানব্বই সাল যে সকল বঙ্গের উন্নতি সাধন করে গিয়েছেন তার ত আর তুলনাই হয় না। বিধবা-বিবাহ, স্ত্রী-স্বাধীনতা, বাল্য-বিবাহ রহিত, কন্‌সেন্ট-অ্যাক্ট প্রভৃতি মহা মহা কীর্ত্তি স্থাপন করে গিয়েছেন; অামি যথাসাধ্য চেষ্টা করে রোদ্‌, বৃষ্টি, হিম সয়ে, সে সকল কীর্ত্তি যে বজায় রাখতে পেরেছি, আজও যে আপনার নামে কলঙ্ক অর্পণ করিনি, এইতেই আপনাকে ধন্যবাদ দি। কাজে আন্‌তে পারি বা না পারি, হিদুর ডাইভোর্স অ্যাক্ট সম্বন্ধে কথা উত্থাপন করেছি।

সভ্যতা। না তুমি খুব উপযুক্ত! খুব উপযুক্ত!

পু বর্ষ। এখন আমার দারুণ চিন্তা হয়েছে কে যে পঁচানব্বই সালত্ব গ্রহণ করবে, তা কিছু ঠিক কর্ত্তে পারচ্ছিনে, দেখ্‌ছি সব ছেলেমানুষ, এ হিন্দু ডাইভোর্স অ্যাক্ট যে চলিত করতে পারবে এমন ত আমার ঠেকে না।

সভ্যতা। দ্যাখ তুমি ভেব না, এই তুমিও তো ছেলেমানুষ ছিলে তোমায় আমার সম্মান কে শেখালে! আমারি তো সহচরীরা, প্রবঞ্চনা, মাদকতা, অনাচার, ব্যভিচার, এরাইতো তোমায় শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছে? ওরির ভেতর একটা সেয়ানা সট্ট ছোঁড়া দেখে নাও।

পু-বর্ষ। একটা ছোঁড়া নিতান্ত মন্দ নয়, সে যা যা ক’র্‌বে বল্‌ছে যদি পারে, ছোঁড়াটা নাম রেখে যাবে, কিন্তু তার কথায় বিশ্বাস হচ্ছে না। সে সব ফটোগ্রাফ্‌ এনেছে চমৎকার চমৎকার, বল্‌ছে সে এই সব পারবে।

সভ্যতা। তুমি এ সব অবিশ্বাস ক’র না। তোমার পূর্ব্ব পূৰ্ব্ব মহাত্মারা কি কাজ না করে গেছেন, আর তুমিইবা কি না কর্‌লে? একি কেউ সম্ভব ভেবেছিল, হিঁদুতে মুরগী খাবে? বামুন খৃষ্টান হবে? কূলের বধু মেম সেজে হাওয়া খাবে, পূজায় সাহেবের খানা হবে, বাপ ব্যাটায় গার্ডণ পার্টি করবে, বেশ্যার সঙ্গে স্ত্রীর আলাপ করে দেবে, বাপ মাকে পৃথক করবে? তুমি তো সব জান, তোমায় আর কি বলবো! আর ধর না, তুমিই যখন ফটোগ্রাফ দেখিয়েছিলে, তিরানব্বই সাল কি না বলেছিল? যে “ও ছেলে মানুষ পেরে উঠ্‌বে না। তুমি হিন্দু ডাইভোর্স অ্যাক্‌ট কল্পনা করলে, আর যার বাড়া নাই, রামায়ণ মহাভারতকে অশ্লীল প্রমাণ করলে।

পু-বর্ষ। তা পারে ভাল। দেখুন ঐ আসছে, আমি বু্ড় হয়েছি, শীতে অার দাঁড়াতে পারচ্ছিনে, এই কটাদিন কাজ কর্‌ছি, পয়লা থেকে আমায় ছুটী দেবেন।

সভ্যতা। অবিশ্যি! কালগর্ভে তোমার জন্য যশের মন্দির হয়েছে, পেন্‌সেন্ নিয়ে সেখানে গে বিরাম ক’রো। তবে যদি কখন কোন নূতন বৎসরে তোমার কীৰ্ত্তির কোন নজীর দরকার হয়, তা এক্ এক্‌বার এ’সে সাক্ষী দিয়ে যেও।

পু-বর্ষ। তা আমার সাক্ষী দিতে আস্‌তে হবে না, রাজবাড়ি থেকে কুটীর পর্য্যন্ত আমার নজীর পড়ে আছে, আমার শীল মোহর করা। তা অনুমতি হয় তো আসি।
সভ্যতা। দ্যাখ, এই কৃষ্টমাস আসছে, এই কীর্ত্তি রেখে যাবার দিন, এ সময় আলিস্যি ক’রনা।

পু বর্ষ। হা, তা কি হয়!

সভ্যতা। গুড্ ডে।

[পুরাতন বর্ষের প্রস্থান।

(নূতন বর্ষের প্রবেশ।)

নব-বর্ষ। গুডমর্ণিং লেডি!

সভ্যতা। তুমি কি নুতন সাল হবার প্রার্থনা কর?

নব-বর্ষ। ইয়েস, ধ্রুবং, নিশ্চয়, জরুর। আমার এই চারখানা ফটোগ্রাফ্ দেখুন। এমনি কাজ ক’রে যশের মন্দিরে গে শোব ইচ্ছে ক’রেছি। এর সজীব ছবি আমার আছে, দেখতে চান্‌ দেখ্‌বেন আসুন।

সভ্যতা। এ সব তুমি পারবে?

নব-বর্ষ। আজ্ঞে হাঁ। না পারি, কাজ দেবেন না। চুরানব্বই আমায় বিশ্বাস করছেন না, আচ্ছা উনি দেখুন, ওঁর চক্ষের উপর দেখাই। আমি নাম চাইনি, এই কৃষমাসেতে ওঁর কদ্দুর মুখ উজ্জ্বল করি।

সভ্যতা। আচ্ছা তুমি কাজ আরম্ভ কর। এক একটা কাজ করে, অামায় খবর দিও, আমি দেখে নেবো। যাও কাজে যাও।

নব-বর্ষ। যে আজ্ঞেঁ।

[সভ্যতা ও নব বর্ষের প্রস্থান]


দ্বিতীয় দৃশ্য।

চৌরঙ্গীর রাস্তা —(বেঙ্গলক্লাবের সম্মুখ)

(এক জন বিউগেল ও ছয়জন হ্যাণ্ডবিল লইয়া প্রবেশ।)

বিউ-বাদক। কৃস্‌মাসের দিন সাতপুকুরে বরের নীলেম হবে। যে যেমন চাও তেম্নি পাবে,এই হ্যাণ্ডবিল নিন, আর গান শুনুন নেচে গাই।

গীত।

হবে নূতন নীলেমে, নূতন বরের আমদানী।
হর রকম বর পাওয়া যাবে, বুড় যুব বাচ্‌কানী॥
বিকুবে হায়েষ্টবিডারে,
ক্যাসপ্রাইসে পাবেন ধারে,
পয়সা ফেল, হাত ধরে নাও পছন্দ যারে,
হররকম প্যাটেনের গড়ন, বে প্যাটেন নাই একখানি॥
আড়ংছাঁটা, টেরিকাটা ফিট্,
ফ্যাসানেবল্ ড্রেসকরা নিট্,
সব্য ভব্য জেক করা ঢিট্,
হবে না সিক্ অর সরি, আড়্‌লে দিও চাবকানী॥

(হ্যাণ্ডবিলওয়ালার হ্যাণ্ডবিল পাঠ।)

১ম হ্যাণ্ড। নিউ অক্‌সন! নিউ অক্‌সন!! নিউ অক্‌সন!!!
সেভেন ট্যাঙ্কস্ ভিলা!
এক্‌স মাস ড়ে—টোইণ্টী ফিফ্‌ত্ ডিসেম্বর,
এইট্টীন্ নাইণ্টী ফোর,
টু বি সোল্ড টু দি হায়েষ্ট বিডার,
ফার্ষ্টক্ল্যাস ব্রাইড গ্রুমস্!
ওয়েল ড্রেষ্ট, সিভিলাইজড্‌-ডোসাইল, এণ্ড টেম!
কাম্ ওয়ান্ এণ্ড অল্‌!

নূতন নীলেম! নুতন নীলেম!! নুতন নীলেম!!!
সাতপুকুর বাগানে।
বড় দিন ২৫শে ডিসেম্বর, ১৮৯৪ সাল।
হায়েষ্ট বিডারে বিক্রি।
প্রথম শ্রেণীর ভাল বর! ভাল পোষাক।
সভ্য—নিমু—পোষমানা!
এস একজন ও সকলে!

[সকলের প্রস্থান]


তৃতীয় দৃশ্য।

ভবতারিণীর বাটী।

(ভবতারিণী ও বিশ্বেরীর প্রবেশ।)

ভব। এস এস, অনেক দিনের পর দেখা হ’ল। পাঁচ ঝঞ্জাটে আর হাওয়া খেতে যেতে পারি নি, দ্যাখাও হয় না, তবে কি মনে করে?

বিশ্বে। ভাই, নেমন্তন্ন কর্ত্তে এসেছি।

ভব। কি, পার্টি টার্টি কি কিছু আছে নাকি?

বিশ্বে। না, তা নয়, কন্যা যাত্রের।

ভব। বে কার?

বিশ্বে। কেন, কিছু শোন নি? বক্তৃতাও পড়নি? এড্‌ভারটাইজ্‌মেণ্টও দেখনি?

ভব। আর ভাই, পাঁচ ঝঞ্জাটে কি আর কিছু দেখ্‌তে শুন্‌তে পাই! হাওয়া খেতে তো যেতে পারিই নি, একদিন যে জিম্‌ন্যাসিয়েমে যাব, তাও হয়ে উঠে না। কার বে?

বিশ্বে। অামার।

ভব। বটে বটে, ইস্‌ তাই তো!

বিশ্বে। তোমায় ভাই যেতেই হবে।

ভব। ভাই, তাইতো ভাবছি!

বিশ্বে। না, ও ভাবছি না।

ভব। আমার কি ভাই অসাধ? আমি তোমার কোন্‌ বে তে কন্যাযাত্রী যাই নি বল? প্রথমকার বেতে বাসর জাগি, দ্বিতীয় বে তে তেরাত্তির ছিলুম, যদি না ঝঞ্ঝাটে পড়তুম, তুমি জোড়ে ফিরে আসা অবধি তোমাদের বাড়িতে থাকতুম। তুমি কি ভাই আমার পর?
বিশ্বে। এত ঝঞ্ঝাট্‌টা কিসের বল দেখি?

ভব। সে কথা আর তোমায় কি বল্‌বো বল! এই ভোরে ওঠা, টিথ্ বুরূশ দিয়ে দাঁত মাজা, গোষলখানায় যাওয়া, ছোট হাজ্‌রে বড় হাজ্‌রে খাওয়া—কর্ত্তার সঙ্গে বসে খেতে হয়, কর্ত্তা একলা খায়না—টীফিন্‌, ডিনার, তিনবার ড্রেস করা, তারপর মেয়েকে বৌকে পড়ান।

বিশ্বে। কেমন শিখ্‌ছে কেমন?

ভব। মেয়ে আমার পেটের, বিয়ে পাস করেছে। রাইডীং, বক্‌সীং, জিম্‌ন্যাস্‌টীক্‌ পর্য্যন্ত পর্য্যন্ত শিখেছে। তবে বৌটা মানুষ হলনা। আমি বারণ করেছিলুম যে ছোট ঘরের মেয়ে এন না, কর্ত্তা শুনলে না। সে সেই আইবুড়ীর মত ঘোম্‌টা দেবে, ছেলের সঙ্গে বেড়াতে যাবেনা, ঘোড়া চড়বে না, গাউন পরবে না, দুপাত ইংরেজিও পড়বে না।

বিশ্বে। তবে তো বউ টা বয়ে গেল।

ভব। তা গেল বই কি! আসুক ছিষ্টিধর বিলেত থেকে আসুক, বল্‌ছে মেম্ বে করে আস্‌বে। তদ্দিনে ডাইভোর্স অ্যাক্টাও পাস হবে, উরির মধ্যে দেখে শুনে বৌটার একটা বে দেব।

বিশ্বে। দেখ, ঘর ঘরকন্নার কাজ কর্ম্মতো আছেই, কাল এক বার ফুরসুত করে শুভদৃষ্টির সময় গিয়ে দাঁডিও।

ভব। ভাই একটু ফুরসুত নেই, কাল কর্ত্তার শ্রাদ্ধ।

বিশ্বে।সে কি? আস্‌বের সময় তো দেখলুম তিনি গাড়িতে উঠ্‌ছেন।

ভব। হাঁ, ডেথ্ রেজেস্ট্রী কৰ্ত্তে গেল।

বিশ্বে। বটে! তোমার কি বে দেবেন?

ভব। না, তা না। কি জান, ছিষ্টিধর পরশু মেলে বিলেত যাবে, ঘেসেড়াগিরী শিখ্‌বে! কাজটা বড় শক্ত, ব্যারিষ্টারী ডাক্তারী নয়, সে দু এক বছরে হবে; এসে ঘেসেড়ার আফিস খুলবে। সেখানে অন্তত বছর দশেক শিখতে কবে, অ্যাদ্দিনে কৰ্ত্তার ভাল মন্দ হোক্, শেষ কি ব্যাটা থাক্‌তে ব্যাড়া আগুনে পুড়বে, না জ্ঞাতে শ্রাদ্ধ করবে? তাই পুরুৎ ঠাকুর পরামর্শ দিয়েছেন, আজ ছিষ্টিধর মুখ-অগ্নি করে কাচা নিয়ে থাক্‌বে, কাল্ সকালে শ্রাদ্ধ করে, পরশু মেলে উঠবে।

বিশ্বে। বটে? তবে ভাই আর তোমায় কি বলবো!

ভব। তোমারো বে শুন্‌ছি, তোমায়ই বা কি বল্‌বো! তা নৈলে একবার শ্রাদ্ধ টাদ্ধ দেখে যেতে। তা সকাল সকাল তে বে চুকে যাবে, একবার তোমার নিউডিয়ারকে নিয়ে এদিকে আস্‌তে পারবে না?

বিশ্বে। দেখি কদ্দুর হয় বল্‌তে পারিনি।

ভব। হাঁ, ভাল কথা মনে হলো, কর্ত্তা ডেথ্ রেজেষ্ট্রী করে এলেই আমার কাঁদ্‌তে হবে; কখনোত স্বামী মরেনি, কি করে কাঁদতে হয় জানিনি, অসভ্য কারাত কাঁদতে পারবোনা।

বিশ্বে। ও সোজা। আমার স্বামী মরতে, রুমালে এক্‌টু অডিকলোম দিয়ে মুখে দিলুম, অডিকলমের ঝাঁজে চোক্‌ দে জল পড়তে লাগলো, আর ফোঁপাতে লাগলুম।
ভব। থ্যাঙ্ক্ ইউ! বড় বাধিত হলেম!

বিশ্বে। তবে ভাই এখন চল্লুম। আমার দাঁড়াবার জো নেই, এখুনি ক’নে দেখ্‌তে আস্‌বে।

ভব। একটু দাঁড়াও, আর্‌ একটা পরামর্শ জিজ্ঞাসা করি। কর্ত্তা ব’ল্‌ছে যে মরণ বাঁচনের কথা তো কিছু বলা যায় না, এক সঙ্গে মুখ অগ্নিটা করে রাখবে।

বিশ্বে। তা মুখো অগ্নি কর কর্‌বে, খবরদার শ্রাদ্ধটী কর্ত্তে দিওনা।

ভব। কেন বল দেখি, কেন বল দেখি?

বিশ্বে। না, আর একটা বে আগে হোক্‌।

ভব। তেমন কি কপাল দিদি, তেমন কি কপাল! কর্ত্তা কি আর সত্যি সত্যি মরতে পারতো না, তা কৈ রাজি হয় কৈ! দুটো বে আমার বরাতে নেই আমি বুঝেছি।

বিশ্বে। কেন, কর্ত্তার শ্রাদ্ধ হলেই তুমি বে করতে পারবে, আইনে বাধবে না।

ভব। তা তুমি বে থা করে এসো, এ গোল্‌মাল্‌ গুল চুকে যাক্, তারপর যা হয় পরামর্শ করবো।

বিশ্বে। তবে আসি?

ভব। এস দিদি এস।

[বিশ্বেশ্বরীর প্রস্থান।

এই যে কর্ত্তা আসছেন!
(নীলাকান্তের প্রবেশ।)

কি গো! এত দেরি?
নীল। কি করবো বল, রেজিষ্টার ব্যাটা আহাম্মুক্‌ কোন রকমেই রেজেষ্ট্রী কৰ্ত্তে চায় না। আর সে ব্যাটার যে কথা, কে মরেছে, কি সে মলো, ব্যাটা যখন চোট্‌পাট্ শুনলে তখন থ হয়ে রৈল।

ভব। তুমি কি বল্লে, তুমি কি বল্লে?

নীল। বল্লেম, আমি মরেছি, চুরট খেয়ে।

ভব। তা এইতে এত দেরি?

নীল। না, আর পাঁচজন বন্ধুবান্ধবকে নেমন্তন্ন করে এলুম, ছিষ্টিধর বলেছে, শ্রাদ্ধর পর গার্ডেন পার্টি হবে।

ভব। বল কি ! তবে আমারো তো দু পাঁচ জন বন্ধু বান্ধবকে বলতে হবে, আমি এই বেলা বেরিয়ে পড়ি।

নীল। দাঁড়াও, পুরুৎ ঠাকুর আসুন, তিনি বলেছেন তোমার মুখঅগ্নির পর তোমার্ শ্রাদ্ধ বন্ধ থাকবে না।

ভব। তুমি কি আমারও ডেথ রেজেষ্ট্রী করে এসেছ নাকি?

নীল। করলুম বৈ কি! এবারে বড় রেজেষ্টার ব্যাটা জব্দ হ’ল। মুদ্দফরাশকে কিছু দিয়ে, একটা কলেজের মুদ্দর্ দেখিয়ে বল্লুম এই আমার স্ত্রী।

ভব। ছিঃ তুমি বড় অসভ্য! আমি চল্লুম, আমি কাটিয়ে আসি গে, আমি কি ওম্‌নি অসভ্য মরণ মরবো?

নীল। তুমি আমায় তেমনিই পেলে বটে! দেখে এস গে এখনো লাস্ জলে নি, আগে গাউন প’রিয়ে তবে লাস দেখিয়েছি।

ভব। তাই তো বলি, তাইতো বলি, তুমি কি এমন অসভ্য কাজটা করবে!

(পুরোহিতের প্রবেশ)

পুরো। কি গো! তুমি আবার কি অমত কর্‌ছো? মুখ অগ্নির পর কি শ্রাদ্ধ বন্ধ থাকে? শ্রাদ্ধ কর্ত্তেই হবে।

ভব। তা যা ভাল বোঝেন, কিন্তু আমার একজন বন্ধুর বড় অমত, সে বলে অার একটা বের পর তবে তোমার শ্রাদ্ধ ক’রো।

পুরো। তা, শ্রাদ্ধের পরও বে চল্‌বে।

ভব। তাহ’লে আর আমার আপত্তি নেই।

পুরো। তা এস, ছিষ্টিধর আসছে, মুখঅগ্নিটে এখন সেরে যাই। ভাবছি আজ রাত্রেই শ্রাদ্ধটা সারবো। কাল আবার একটা বে দিতে হবে।

(ছিষ্টিধরের প্রবেশ)

ছিষ্টি। বাবা! বাবা! প্যাসেজ্‌ এন্‌গেজ করে এলুম।

ভব। পুরুৎ ঠাকুর বল্‌,ছেন আজি তোমায় শ্রাদ্ধটা সারতে হবে।

ছিষ্টি। বেস কথা, কাজটা সেরে রাখাই ভাল। পাঁচ জন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে দেখা করবার কাল ফুরসুৎ পাব।

পুরো। তবে মুখঅগ্নি করবে এস।

ছিষ্টি। এই খানেই হোক না, আমার ঠেঁয়ে লুসিফার ম্যাচ আছে।

পুরো। তবে দুট জ্বালো, দুজনের মুখে দাও।

(ছিষ্টিধরের তথা করণ)

তবে কাচা গলায় দিয়ে বাইরে এস।

ছিষ্টি। আর কাচা গলায় দিতে হবে না, আমার ঠেয়ে কালো ফিতে অাছে।

পুরো। ওঃ! “উদ্যোগী পুরুষো সিংহ“ এমন নৈলে ব্যাটা? তবে বাইরে এস, শ্রাদ্ধটা সেরে যাই। তোমাদের আর কি, মুখঅগ্নি হোয়ে গিয়েছে, যে যার কাজে যাও। ব্রাহ্মণ ভোজনের উজ্জুগ করগে।

[পুরোহিত ও ছিষ্টিধরের প্রস্থান।
নীল। গিন্নি একটা কথা ভাবছি।

ভব। অামিও ভাবছি।

নীল। কি বল দেখি?

ভব। তুমি বল দেখি?

নীল। ভাবছি ফ্যান্‌সি বাজারে যাব।

ভব। ভাবছি বরের নীলেমে যাব।

নীল। বরের নিলেমে যাবে কি কত্তে?

ভব। তুমি ফ্যান্‌সি বাজারে যাবে কি কত্তে?

নীল। তুমি কি বর কিনবে?

ভব। হুঁ। তুমি কি কনে কিনবে?

নীল। হাঁ।

ভব। বেশ কথা।

নীল। বেশ কথা। তবে এস দুজনে কাঁদি।

ভব। নাও এই এসেন্স চোখে নাও।

নীল। হোয়েছে?

ভব। অনেকক্ষণ। আমি চোখের রুমাল খুলেছি।

নীল। আবার কি ভাবছো?

ভব। ভাবছি, আইনে বাধবে কি না।

নীল। না বাধবে না, ডেথ রেজেষ্ট্রী হোয়ে গিয়েছে।

ভব। ঠিক!— গুড্‌ বায়।

[উভয়ের সেক্‌হ্যাণ্ড ও প্রস্থান।]


চতুর্থ দৃশ্য।

ওল্ডকোর্টহাউস ষ্ট্রীট বা লালদিঘীর ধারের রাস্তা।

কুলাঙ্গনাগণ—

গীত।

ফ্যান্‌সি হোয়েছে যাব ফ্যান্‌সি বাজারে।
ফ্যান্‌সি ধাঁজে, ফ্যান্‌সি কাজে, ফ্যান্‌সি বাহারে॥
ফ্যান্‌সি আছে যার,
দেখ্‌তে যাবে সে ফ্যান্‌সি বাজার,
ফ্যান্‌সি দরে কিনে নেবে ফ্যান্‌সি ফুলের হার,
ফ্যান্‌সি কার্পেটের জুত দেব ফ্যানসি হয় যারে॥
ফ্যান্‌সি হেসে কেউ যদি সই ফ্যান্‌সি কথা কয়,
ফ্যান্‌সি চোকে দেখবো চেয়ে ফ্যান্‌সি যদি হয়,

ফ্যান্‌সি নৈলে নয়,
ফ্যান্‌সি প্রাণে সয় কি লো সই,
যে না ফ্যান্‌সির ধার ধারে॥


পঞ্চম দৃশ্য।

বিবাহের সভা।

(সর্ব্বেশ্বর, শশীভূষণ ও দিনুর প্রবেশ।)

সর্ব্বে। মশায়, নশিরাম বাবুর মাতুল?

শশী। আজ্ঞে হ্যাঁ, আর ইনি আমার বন্ধু।

দিনু। ইনি ব’ল্‌লেন চল কন্যে দেখে আসি, এলেম সঙ্গে। পাত্রীটী আপনার কে মশাই?

সর্ব্বে। আজ্ঞে, আমার পরিবার।

শশী। ওহে, কি বলে কি?

দিনু। আরে, কথার ভাব বোঝনা, ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইতে দাও। উনি বলছেন, আমার পরিবারস্থ! তবে বুঝি পাত্রীটির পিতা নাই?

সর্ব্বে। আজ্ঞে না, তিনি আজ ত্রিশ বৎসর পরলোক গমন করেছেন।

শশী। ওহে, কি বলে কি এ?

দিনু। তুমি বৈবাহিক, তোমার সঙ্গে পরিহাস ক’চ্ছেন। আমরা ওসব বুঝি। মশাই, এ সব আয়োজন কি দেখতে পাচ্ছি?
সর্ব্বে। আজ্ঞে, নান্দিমুখের আয়োজন।

দিনু। দেখ শশীভূষণ, আমি বুঝতে পেরেছি, ইনিই তোমার বৈবাহিক। লোকটা দেখ্‌ছি সুরসিক, তোমার সঙ্গে পরিহাস ক’চ্ছে।

সর্ব্বে। আপনি কি বল্‌ছেন মশাই? পরিহাস করছি কি? নশিরাম বাবু আপনাদের কিছু বলেন্‌ নি?

দিনু। নশিরাম আমাদের কন্যা দেখ্‌তে পাঠিয়েছে। তা যাক্, ও সব কথা যাক্, কন্যাটীর পরিচয় কি মশাই?

সর্ব্বে। পরিচয় অতি আশ্চর্য্য! ইনি বিন্দাবন বিশ্বাসের কন্যা, তিরিশ বছরে বিধবা হন, আজ দশ বৎসর আমার প্রণয়িনী, আজ শুভদিনে নশিরাম বাবুর হস্তে অর্পণ করবো।

শশী। ওহে দিনু! বলে কি?

দিনু। মস্করা ক’চ্ছে! মস্করা ক’চ্ছে! বোধ হয় পাত্রীটি এঁর শালী টালি হবে! তা বেশ মশাই পাত্রীটি আনুন।

সর্ব্বে। তিনি আসছেন।

(বিশ্বেশ্বরী ও কুমুদিনীর প্রবেশ)

উভয়ের গীত।

দোজ্ পক্ষের ভাতার ইটি চমৎকার।
আমার হাফ্ সেয়ার, আর হাফ্ সেয়ার পেয়েছে
এই মাইডিয়ার সিস্‌টার॥

এম্নি ভাতার পেলে পরে পর,
বছোর বছোর সাজবো কণে, পাব নতুন বর,
গুণের নিধি ভাতার খুব জবোর,
এমন মুরুব্বি ভাতার আর কি আছে কার।
ভাতারের শুধ্‌বো কিসে ধার॥

দিনু। দেখ্‌ছো দেখ্‌ছো, বলেছিলেম এঁরা সব সুরসিক লোক। এ দুটী কি নর্ত্তকী?

সর্ব্বে। কি! এঁরা আমার পরিবার।

দিনু। তা বটে।

শশী। ও দিনু! আজ বিভ্রাট দেখ্‌ছি।

দিনু। আঃ ছিঃ! তুমি মস্করা বোঝ না?

সর্ব্বে। বড় ডিয়ার!

বিশ্বে। হাফ্‌ডিয়ার!

সর্ব্বে। ইনি তোমার মামাশ্বশুর, এঁর সঙ্গে সেক্‌হ্যাণ্ড কর

বিশ্বে। গুড্‌মর্ণিং! আর হাফডিয়ার ইনি কে?

সর্ব্বে। উনি ওঁর বন্ধু।

কুমু। সিস্‌টার ডিয়ার!

বিশ্বে। সিস্‌টার ডিয়ার!

(উভয়ের আলিঙ্গন)

শশী। ওহে দিনু চলো, বড় বিভ্রাট!

দিনু। দাঁড়াও অভিনয়টা দেখি। এদুটী কি থিয়েটার থেকে আনা হয়েছে?

সর্ব্বে। কি! আমার পরিবারের সাম্‌নে অশ্লীল কথা আপনি উচ্চারণ করেন?

শশী। কেন মশাই থিয়েটার কি অশ্লীল কথা হলো?

সর্ব্বে। খুব অশ্লীল! আপনি যদি নসিরাম বাবুর মাতুল না হতেন তো টেরটা পেতেন।

দিনু। শশী বুঝলে, এও একটী অ্যাক্টার।

সর্ব্বে। মশাই বড় শক্ত শক্ত বলছেন আমায়।

দিনু। না বাপু না, নাচ গাওনা কি কর্‌বে কর। ওগো বাছারা তোমরা অভিনয় সুরু কর।

সর্ব্বে। বড় ডিয়ার! আমি এ উজ্‌বুকের কথায় খুব রাগ্‌ছি।

বিশ্বে। রেগো না প্রাণনাথ, রেগো না।

সর্ব্বে। আচ্ছা রাগ্‌বোনা, আমি গম্ খেয়ে বসি।

দিনু। হাঁ বাছা তোমাদের পালাটা কি?

বিশ্বে। বিবাহ পালা।

শশী। ওহে পালাই চলো। বুঝ্‌ছোনা এই বেটীই কণে।

বিশ্বে। পালাবেন কেন? যদি অনুগ্রহ করে এসেছেন, বে দিয়েই ঘরে নিয়ে চলুন।

(নেপথ্যে ঐক্যতান বাদন।)

সর্ব্বে। বড় ডিয়ার! বুঝি তোমার বর আস্‌ছেন।

কুমু। উলু-উলু-উলু—উলু—

দিনু। হ্যাঁগা এঁর এ বেশ কেন?

সর্ব্বে। উনি ঘোড়ায় চড়্‌তে যাবেন।

দিনু। ইনি কি সার্কাস করেন?

সর্ব্বে। ছোট ডিয়ার। খুব রাগ্‌ছি।

কুমু। তুমি ভারি ষ্টুপিড্ তাই রাগ্‌ছো। আমিতো সার্কাস কর্‌বোই, তবে সিস্‌টার ডিয়ারের বে, এই জন্যেই এতক্ষণ বাড়িতে আছি।

(নসের প্রবেশ।)

শশী। ও দিনু! এ যে আবাগের ব্যাটা নসে হে!

দিনু। বাঃ বাঃ! বড় ঠিক সেজেছে!

শশী। আরে সেজেছে কি? সেই আবাগের বেটা দেখ্‌চ না?

নসে। হাজরা মশায়! কনে তো দেখিয়েছেন, শিগ্‌গির সম্প্রদান করুন।

দিনু। ওহে শশী! আমি কিছু বুঝতে পার্‌চি নে।

শশী। আর বুঝ্‌বে কি, আমার গুষ্টীর পিণ্ডি! ও বেটা এ বুড়ীকে বিয়ে ক’রবে তবে ছাড়বে! ও আবাগের বেটা! তুই এই মাগীকে বিয়ে কর্‌বি নাকি?

নসে। মামা তার অার সন্দেহ রাখ?

দিনু। ও বাবু ও হাজরা মশায়! এখন আমি সব বুঝেছি। তুমি বড় মাগটীর বে দেবে? অার ছোটটির?

কুমু। আমি বরের নীলেম থেকে একটা দেখে শুনে নিয়ে আস্‌বো।

দিনু। ও বাছা এদিকে এসতো, এদিকে এসতো! বরের নীলেমটা কি শুনি?

নসে। দেখতে যাবেন, আপনাকে টিকিট্ দেবো।

শশী। ঐ নসে বেটা নীলেম করেছে। আমি বলি কিসের নীলেম!

দিনু। তবে চল আর কি, চুড়োন্ত হ’লো!

নসে। মামা যেওনা যেওনা, আর বেশী দেরি নাই, উনি ৫ মিনিটের ভেতর নান্দীমুখ সেরেই কন্যা সম্প্রদান করবেন। এই যে পুরুৎ মশাই এয়েচেন।

(পুরোহিতের প্রবেশ।)

দিনু। মশায় বুঝি এই বিবাহের পুরোহিত?

পুরো। কেন, আপত্য কি?

দিনু। এ রকম বিবাহ আর কটি দিয়েছেন?

পুরো। আপনি আমার সঙ্গে ব্যঙ্গ কর্‌ছেন? অামায় চেনেন না, আমি স্মৃতিরত্ন, নূতন স্মৃতি ক’রেছি তাতে সম্পূর্ণ ব্যবস্থা আছে যে, কন্যা সম্প্রদান করতে পারে এক বাপ্‌ আর স্বামী।

নসে। মামা, মামা, ইনি বড উচুদরের পণ্ডিত, ইনি বঢ উচু দরের পণ্ডিত, এঁর সঙ্গে তামাসা না।

দিনু। তবে পুরোহিত মশায়! স্বামী কন্যাকর্ত্তা হ’লে বরের সঙ্গে কি সুবাদ হবে?

পুরে। অতি আশ্চর্য্য সম্বন্ধ! এরূপ সম্বন্ধ কেউ কখন শোনেনি, ভায়রাভাই শশুর!

দিনু। পুরুৎ মশাই! আপনি বেঁচে থাকবেন তো?

শশী। এরা কেউ মর্‌বে না! কেউ মর্‌বে না! তা তুমি দেখো!

পুরো। তুমিতো দেখ্‌চি খুব মেধাবী! তুমি একটা কাজ কর, আমার ব্রাহ্মণীকে বিবাহ কর। তুমিও অমরত্ব পাবে, দেশে দেশে যশ করবে। এ সব নতুন কারখানা, কোন দেশে নাই।

দিনু।এইটি ভট্‌চাজ্যি মশাই ঠিক্‌ বলেছেন! হিন্দু মুসলমানে, খ্রীষ্টানে এ আইন নাই!

পুরো। এই হিন্দুর ভেতর চলন ক’ল্লেম আমি।

শশী। ওহে চল চল।

দিনু। আরে দা্ঁডাও, তোমরা মামা ভাগ্‌নেতে ক’নে জোটালে, আমার অদৃষ্টে কি হয় দেখি।

কুমু। তোমার আদেষ্টও ক’নে জুটতে পারে।

দিনু। তা কই জুটুক না।

কুমু। যদি স্বীকার পাও তিন দিনের ভেতর মর্‌বে, আমি তোমার ক’নে হ’তে স্বীকার।

পুরো। মশাই মশাই, স্বীকার পান, স্বীকার পান, মলেনই বা? খুব নাম রেখে যা’বেন।

নসে। আর ম’রতে কোন কেলেশ হবে না, আমি ইলেক্ট্রীক ব্যাটারি দে আপনাকে মার্‌বো।

সর্ব্বে। উঃ আপনার দেখচি ভারি অদৃষ্ট! আপনার বৈজ্ঞানিক মৃত্যু হবে!

দিনু। তোর সাতগুষ্টীর হোক্‌! ওঠহে ওঠো।

পুরে। কেন, আপনারা যাচ্চেন কেন?

দিনু। যাচ্চি মতিচ্ছন্ন হ’য়েছে, আর কেন।

সর্ব্বে। সেকি সেকি যখন পদার্পণ করেছেন, কিঞ্চিৎ জলযোগ করে যেতে হবে।

দিনু। ভোরপুর আনন্দ হয়ে গিয়েচে! বাবু ভোরপুর আনন্দ হয়ে গিয়েচে! যে সব কথা শুনলেম তিন দিন আর খেতে হবে না চাঁদ!

কুমু। আপনি আমায় ইন্‌সাল্ট করছেন! যদি না বসেন, আপনাকে চাব্‌কে দেব।

শশী। ও দিনু, বোসো, বোসো, বোসো। ছুঁড়ী সত্যি চাব্‌কাবে। আগে পালাতে তো পালাতে, ও মাগী তেড়ে চাবুক মারবে।

পুরো। মশাই রাজি হোন, আমি ব্রাহ্মণীকে ডেকে পাঠাই, এক দিনে তিন্‌টে শুভ বিবাহ সম্পন্ন হোক।

শশী। নে নে নসে কি কর্‌বি কর, আমরা বসে আছি। পুরুৎ ঠাকুর একটা বে সারুন, তারপর কাল আমাদের বে দেবেন।

পুরো। আচ্ছা না করেন ভাল। এতে জোর নেই। একটা নাম রেখে যেতে পারতেন। বোসো হে নসিরাম! বিশ্বেশ্বরী এস, নাও এখন হাতে হাতে সঁপে দাও, আমি একটু ব্যস্ত আছি, কাল এসে নান্দীমুখ ক’রবো। নিদে! এগুলো এখন সরিয়ে রাখ।

(নিদের প্রবেশ ও দ্রব্যাদি লইয়া প্রস্থান।)

বলো এতদিন এ বড় ডিয়ার আমার ছিল, আজ তোমার হ’ল।

(ভবতারিণীর প্রবেশ।)

ভব। বিশ্বেশ্বরী! ভাই, আমার শ্রাদ্ধ হোয়ে গিয়েছে, আমি এসেছি।

বিশ্বে। তবে দাঁড়াও হাফ্ ডিয়ার। এখন হাতে হাতে সোঁপো না! আমার ফ্রেণ্ড ভবতারিণী সাক্ষী হবে।

(নীলাকান্তর প্রবেশ।)

নীল। সর্ব্বেশ্বর বাবু! আমার শ্রাদ্ধ হয়ে গিয়েছে, আমি এসেছি।

ভব। কি তুমি ফ্যান্‌সী বাজারে গেলে না?

নীল। না, বরযাত্রের নেমন্তন্নটা সেরে যাব। তুমি বরের নীলেমে গেলে না?

ভব। আমি কন্যাযাত্র সেরে যাব।

পুরো। আপনারা দুজন বর ক’ণে আনতে যাবেন না কি?

নীল। আজ্ঞে হাঁ।

নসে। কি মশাইদের বিবাহ কর্‌বের ইচ্ছে আছে?

ভব। অাছে।

নসে। মশাই অনুগ্রহ করে আমার একটা কাজ কর্ত্তে হবে। আমার নীলেমে তিনটী লাটের অভাব। এড্‌ভাটাইজ করে ফেলেছি, না বর জোটাতে পারলে বড় অপমান হতে হবে, মামা, আপনি আর এই ভদ্রলোককে আমার এই উপকারটা করতেই হবে।

পুরো। না, আপনি এইখানেই বিবাহ করুন। আপনি আপনার দ্বিতীয় পরিবারটী ছাড়ুন। আপনি ভবতারিণীকে নিন্‌, আপনি কুমুদিনীকে নিন্‌, রাজচটক হবে।

নসে। তবে আমার বরের কি হবে?

পুরো। ঐ তো তোমার মামা অার উনি রইলেন।

(বদ্যিনাথের প্রবেশ।)

বদ্যি। ছিষ্টিধর বাবুকে কুমুদিনী গুঁই মিনেজারিতে টেনে নিয়ে গেল, তানইলে তিনি আসতেন, কি? বরের দরকার, তা আমি আছি ভয় কি নসিরাম বাবু?

শশী। ও দিনু, ধরে যে!

দিনু। ধরে ধরুক্‌, আমিও মরিয়া হয়েছি, তুমিও মরিয়া হও।

শশী। আচ্ছা মরিয়া হলেম।

পুরো। বেশ বেশ, তবে আপনারা বে করুন, অাহা রাজচটক হবে, রাজচটক হবে!

(শশী ও দিনু ব্যতীত) সকলে। বেশ বেশ বেশ! আপনি তবে মন্তর পড়ান্।

পুরো। তোমরা অাপনা আপনি মন্তর পড়ে নাও।

দিনু। সে কি হয়! আপনি মন্তর পড়ান।

পুরো। এ বের এই মন্তর!

দিনু। এই কথাটা ঠিক্‌ বলেছেন!

(সকলের নৃত্য-গীত।)

কারখানা জমকাল—
এখন চলন হলে খুব ভাল॥
এই মলো তো এই মলো, বে হলো তো বে হলো,
খুব সোজা ওর বোঝা এ নিলে,
খুব মজা ফের বোঝা এ দিলে,
ক্যা জুৎ, ক্যা পুরুৎ কণে বর মজ্‌বুৎ,
উমেদার বর আবার বাঙ্গলা হলে উজ্জ্বলো,
মুখআলো॥


ষষ্ঠ দৃশ্য।

রাস্তা।

(ওল্‌ড ইয়ার নিউ ইয়ার ও কৃষ্‌মাসের প্রবেশ ও নৃত্য)

(সভ্যতার প্রবেশ।)

সভ্যতা।

গীত।

তোম্‌ তোম্ ফার্ষ্ট্ ক্ল্যাস্ নিউইয়র।
তোম্‌সে কাম্ চলেগা বেহেতর্‌
ওল্ড ইয়ার নো ফিয়ার!
এ তোমরা কাম্,
মেরা বাড়েগা নাম,
তোম্‌কো দেগা এনাম;
বাড়তে রহো, কাম কর্‌তে রহো,
বাংলা চায়েন কর, বাংলা মেরি ডিয়ার।
দেখো কৃষ্টমাস্‌ ভেরি মেরি,
মেরি ময়বি ভেরি।
তোম পিয়ারা মেরা মেরি ল্যাড চেরি।
দিয়া বাংলা তুঝেমে,
খেলো মজেমে
কেষ্কো কেয়ার, খেল্‌তে রহে হিয়ার॥


সপ্তম দৃশ্য।

সাতপুকুরের বাগান।

নীলাম ঘর।

(বিডার (নসে), সেলমাষ্টার, রাইটার, ক্রায়ার, বুককিপার, বেহারা, বৃদ্ধা, ফিমেল ক্রেতাগণ, বিশ্বেশ্বরী, বরগণ ইত্যাদি।)

ক্রায়ার। লাট সাবুন্টীওয়ান। নিয়ে অায়, নিয়ে অায়। ও দাঁত দেখ্‌চেন কি? পঁচিশের ঊর্দ্ধ বয়স নয়। পা দেখ্‌তে হবে না, বেশ নাচ্‌তে পারে, থিয়েটারে ক্লাউন সাজ্‌তো, মাজখানে সিঁতে, গালে জুল্‌পি, পাজীর পাজী রোজ দু তিন ঘা লাথি মার তাতে রাজী। হাওয়া খেতে নিয়ে যাবার সাথি আর এমন পাবেন না। সিগারেট ধরিয়ে দেবে, পাইপ টান্‌বে, যে কিন্‌বে তারে মনিব জান্‌বে।

১ম স্ত্রী। আট আনা।

বিডার। গোইং, গোইং, এইট্ অ্যানাজ, এইট অ্যানাজ্।

বৃদ্ধা। টেন অ্যানাজ্।

বিডার। বাড়ুন বাড়ুন, দশ আনায় এমন মাল্‌টা বিকিয়ে যাচ্চে।

৩য় স্ত্রী। এগার আনা।

১ম স্ত্রী। ইলেভেন হাফ্‌।

বৃদ্ধা। ইলেভেন অানাজ্ থ্রি পাই।

বিডার। পৌনে বার আনায় যাচ্চে পৌনে বার আনায় যাচ্চে। ডাকুন ডাকুন, ইলেভেন অ্যানাজ্ থ্রি পাই, ইলেভেন্‌ অ্যানাজ থ্রি পাই। ইলেভেন অ্যানজ থি, পাই (বিড)
রাইটার। আপনার নাম কি?

বৃদ্ধা। ধনমণি পোদ্দার।

রাই। কুমারী না বিধবা?

বৃদ্ধা। সধবা।

রাই। তা বুঝি হাওয়া টাওয়া খাওয়ার মতন নিলেন্‌?

বৃদ্ধা। তা বইকি।

রাই। এই টিকিট নিন্, ক্যাসঘরে টাকা জমা দিন্‌গে, রসিদ পাঠিয়ে দেবেন, মাল ডিলিভারি দেব।

বৃদ্ধা। দাঁড়াও, আমি আরো মাল কিন্‌বো, একেবারে টাকা জমা দেবো। কি জানেন্‌ পাঁচটি স্বামী আমার মারা গিয়েছে, গোটা পাঁচ ছয় কিনে রাখি, যটা মরে যটা থাকে।

রাই। তা নিন্ না যটা নেবেন মালের অভাব কি।

ক্রায়ার। লাট সাবুণ্টী টু। জেতে চাষা, বড্ড পোষা, জুত বুরুষ করে খাস। ফুলগাছে জল দেবে, ফুলের তোড়া করবে, আর চাবুক বা লাথি জঘা মার তা খাবে।

১ম স্ত্রী। ফাইভ্‌ অ্যানাজ্‌।

বৃদ্ধা। টেন্‌ অ্যানাজ্‌।

৩য় স্ত্রী। ওয়ান রূপি।

বৃদ্ধা। টু-রূপিজ্।

বিডার। টু রূপিজ্, টু রূপিজ্, টু রূপিজ্ (বিড্‌)

যুবা। ওরে মেদো। এই যে বুডী বেটীই সব কিনচেরে! ওগো ও খদ্দের! শোনো না, তুমি আমায় কিনো, আমি বড় খাসা বর।
১ম স্ত্রী। দাঁড়াও, তুমি আগে লাটে ওঠো তারপর বিবেচনা।

যুবা। দোহাই বাবা! ও বুড়ীবেটী না কিনে নেয়!

ক্রায়ার। লাট সাবন্টী থ্রি। বয়েস আটাশ, খাট্‌বে এটওটা ফাই ফরমাস, গান গাবে, হারমোনিয়ম্‌ শেখাবে, জ্যুয়েলা জিকেল গার্ডন দেখাবে। আর হাই সার্কেলে ইন্ট্রোডিয়ুস করে দেবে।

বুদ্ধা। টু রূপিজ।

১ম স্ত্রী। থ্রি রূপিজ।

বৃদ্ধ। সিক্‌স।

বিডার। সিক্‌স রূপিজ, সিক্‌স রূপিজ, সিক্‌স রূপিজ (বিড)!

যুবা। মেদো! তুই থাকতে হয় থাক অামি আর বরগিরি করবে না।

বেয়ারা। এই চোপ্।

ক্রায়ার। লাট সাবুন্টী ফোর! দেখ্‌তে বুড়ো, কিন্তু আটে পিটে দড়। খোঁপা বেঁধে দেবে, সেজ সাজাবে, ছারপোকা মারবে, মশারি সেলাই করবে। আর যদি কেউ ভদ্দরলাক দেখা কর্ত্তে এসে, তখনি সেখান্‌ থেকে সরবে।

১ম স্ত্রী। টু পাইস।

৩য় স্ত্রী। থ্রি পাইস।

১ম স্ত্রী। থ্রি হাপ্।

৩য় স্ত্রী। ফোর।

বিড়ার। গোইং, গোইং ফোর। ফোর পাইস্, ফোর পাইস্। মাইডিয়ার! বড সস্তাদরে মাচ্চে তুমিই ডেকে রাখ।

বিশ্বে। না মাইডিয়ার!

বিডার। আরে বোঝোনা; ডেকে রাখ, মালটা লাভে ছাড়তে পার্‌বে।

বিশ্বে। না মাইডিয়ার! ও রদি মাল আমি রাখ্‌বোনা।

বিডার। তবে বোঝো। ফোর পাইস্ (বিড)

রাইটার। আপনার নাম?

৩য় স্ত্রী। মনমোহিনী কুণ্ডু।

রাইটার। সধবা না বিধবা?

৩য় স্ত্রী। বিধবা।

রাইটার। ভালই হয়েছে। উনিও তেজ পক্ষের।

৩য় স্ত্রী। কি ওঁর দুই স্ত্রী মারা গিয়েছে নাকি?

রাই। মারা কেউ যায় নি। একটী সার্কাস কর্‌তে বর্ম্মায় গিয়েছে, আর একটি বেম্ম বিবাহ করেছে। তবে আর বলছি কি, মাল বড় ভাল মাল, আপনি যদি থিয়েটার ক’রতে যান্ ম্যানেজারকে রেকমেণ্ড করবে। ক্যাস্‌ ঘরে পয়সা জমা দিন, রসিদ পাঠাবেন, মাল ডিলিভার দেব।

ক্রায়ার। লাট্ সাবুন্টীফাইভ। এটির বয়েশ পাঁচ বচ্ছর, হুইস্কী টানে খুব জবোর, কথা কয় হেসে ছেলে, যে কিন্‌বে তুলে রেখো গেলাশ কেশে।

ক্ষুদে বর—
গীত।—
হাম্‌টী ডাম্‌টী টম্‌টী টম্‌।
কাম্ লেডি কাম্, খাসা বর্ হ্যায় হাম্‌,
লাল্ লালা তারা রারা তারা রারা তারা রারা রা।

টেক্ মাই হ্যাণ্ড ওল্‌ড্‌ লেডী ফেয়ার,
হুয়া ক্যাসা খাশা পেয়ার,
লেট্‌ আস্ বি জলি, কাম ওল্‌ড্ পলি,
কিস্‌মি কুইক্‌ নো ডিলিড্যালি,
লাল্‌ লালা্ সা নি ধা পা নি সা সা,
তারা রা রা রা তার রা রা রা॥

ক্রায়ার। এ বরের বড় বেশি দর। বড় বেশি দর। পঞ্চাশ টাকা বাঁধা, বিট্‌ তার ওপোর। তা দেখুন, আপনার সব শেয়ারে নিন, এক এক উইক্ এক এক জন গেলাশ কেশে রেখে দিন।

ফিমেলগণ। লাটে চড়াও, লাটে চড়াও।

বৃদ্ধা। কি, বিড্ করবে? পারবে না।

ফিমেলগণ। আমরা শেয়ারে নেব, আমরা শেয়ারে নেব।

বৃদ্ধা। আচ্ছা লাটে উঠুক, আমার বিড্‌ সিক্সটী রূপিজ।

ফিমেলগণ। হাণ্ড্রেড।

বৃদ্ধা। বড্‌ড বেশি দর হলো।

বিডার। গোইং গোইং, হাণ্ড্রেড্‌, হাণ্ড্রেড্‌, হাণ্ড্রেড্‌ (বিড্)

ক্ষুদে বর। আমি যাবনা। আমি একে ছেড়ে যাব না। খুব হুইস্কী খায়।

এক ফিমেল্। এস যাদু এস! আমি কেক্ দেব।

ক্ষুদে বর। না, ফাউল্‌ রোষ্ট আর হুইস্কী।

এক ফিমেল। এই নাও। আমার কেটীংয়ে বসে গে।

ক্ষুদে বর। আর লেগ্‌ মটোন্।

এক ফিমেল। এই নাও।

ক্ষুদে বর। আর ডাইনীং নাইফ, ডাইনীং ফর্ক, কর্ক স্ক্রু।

এক ফিমেল। এই নাও।

ক্ষুদে বর। আর টাম্ব্‌লার গেলাশ।

এক ফিমেল। এই নাও।

ক্ষুদে বর। আর সোডাওয়াটার।

এক ফিমেল। এই নাও।

বৃদ্ধা। এর বয়েস কত?

যুব-বর। যত হোক্‌ না, তোর বাবার কি? খবরদার গায়ে হাত দিস্ নি। তোর বরগিরীর মুখে মারি বিশ্ লাথি!

বেহারা। চোপ্‌ চোপ।

যুব-বর। চোপ রাও। ওস্কো হটায় লেও। হাম কামড়ায়েগা।

বেহারা। আরে চোপ্‌রাও, চোপ্‌রাও।

যুবা বর। আজ খুনোখুনি হব। নেইরহেঙ্গে! ছোড় দেও ছোড়দেও!

[ষ্টল কঁধে করিয়া পলায়ন।
বেয়ারাগণ। পাক্‌ড়ো, পাক্‌ড়ো। (পশ্চাদ্ধাবন)

ফিমেলগণ।
(গীত।)
খেংরা মারো অকসানে।
কে জানে আস্‌তো কে এখানে॥
মালগুলো পালালো, সয় বল কার প্রাণে॥

ক্ষুদে বর। মাইজডিয়ার ডোন্টক্যার এই আছি।

ফিমেলগণ। এই কচি, বখরাদার এর আবার।

রিডার। কে বিডার? আমরা ফ্রেষ লট্ এবার।

সেলমাষ্টার। সেল্ মাষ্টার,

বুক্‌কিপার। বুক্‌কিপার,

বেয়ারার। বেয়ারার,

বিশ্বে। কে শোনে, রদিমাল কে কেনে।

মহিলাগণ। ভারি খেদ, ছেল জেদ,

পাঁচটা লাট্‌বিট দেবো মাল নেবো,
সাজিয়ে রাখবো বাগানে।
ফেটিনে নিয়ে যাব ময়দানে॥


অষ্টম দৃশ্য।

রাস্তা।

কৃস্‌মাস্ ওল্ডইয়ার উইয়ার। বড়দিনের খেল।


নবম দৃশ্য।

গ্রীষ্ম ঋতু।

(নায়ক-নায়িকার গীত।)

টলে লালরবি, টলে লাল রবি।
লাল তোমারি বদন ছবি॥
লাল আভা নয়নে, গগনে লাল মেঘদল,
রবি টলে, টলে টলে ঢলে জলে;
চাহি ফটিকজল চাতক কাতর,
থাকি থাকি পাখী সকরুণ বোলে,
দে জলদে কত নিদয় হবি।
পাখী কহিছে ছলে,
চাহ ফটিক জল দারুণ তৃষা কেন সহ;
চ্যুত লতিকাদল ধীর সমীরে দোলে,
ডাকি কহে পাখী ছলে,—
পিও পিও বারি মোহন মোহিনী,
হের মোহিনী মাধুরী মাধবী॥

(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)

বর্ষা ঋতু।

(নায়ক-নায়িকার গীত।)

গভীর মেঘদল গরজে।
বাজে বাজে প্রাণে, থেকনা থেকনা,
থেকনা থেকনা দূরে,
চাহি চুমিতে মুখ সরোজে।
চমকি চাকিচূকি, চমকি চমকি লুকি
চপলা, মন উতলা,
নীরদ ঢালিছে ধারা তর তর ঝর ঝর,
চমকি শিহরি ঘন, নয়ন নীর ধারা নেহার,
কাতর কুলিস কঠোর কত বাজে।
বাজে বাজে, না জেনে না বুঝে তোরি প্রেমে মজে॥

( রঙ্গদার রঙ্গদারণীর-রঙ্গ।)

শরৎ ঋতু।

নায়ক-নায়িকার গীত।

মেঘে আর চাঁদ ঢাকে না।
বদন খানি আর ঢেকনা॥

চাও হে চাও দেখি আঁখি,
ফুটলো কলি ঐ দেখনা॥
সোহাগে কইছে কথা তরুলতা,
কেন ব্যথা দাও বলনা॥
ছলনা আর কোরনা,
রাগের ভরে তার থেকনা।
কোরনা পর কোরনা,
সাধের শরত বাদ সেধন॥
হাসবে কমল হেরে হাসি,
শশির হাসির মান রেখনা॥

(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)

হেমন্ত ঋতু।

তোরি অাশে।
হের বেশভূষা পরি দাঁডায়ে রয়েছে উষা,
হেরিতে সাধ তব রাঞ্জিত অধরে,
আদরে এখন দাঁড়ায়ে উষা তোরি তরে,
তোরি আশে॥
প্রাণ মন মম আশে বিলাসে, ভাসে ভাসে॥

নীহার হার পরি; ঝর ঝর তর তর-
ঝরিছে মুকুতা পাঁতি,
রঞ্জিত কুসুমিত রমিত মোহিত বনরাজি;
হেমন্ত হিল্লোলে, হেমশির্ষ দোলে,
প্রান্তরে তরঙ্গ মালা,
হেলা দোলা, অঙ্গ তরঙ্গিত,
হেরিতে পিয়াস বিভোলা;
কপোত কপতী কত সোহাগে কহিছে কথা,
ব্যাকুল খেলিতে ভাসিতে সমিরে,
হেমকিরণ মাখি সাজি;
পাখী জাগে,
মাতি তরুণ রাগে গাইছে,
পবন কাকলি বহে,
গায়িছে পাখী অনুরাগে;
হৃদয়ে তোমারে ধরি,
বদন রাগ হেরি,
নয়নে নয়ন অভিলাষে॥

( রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)

শীত ঋতু।

নায়ক-নায়িকার গীত।

হের ধূসর দিশা।
ধূসর ধূমরাশি নিবিড় কুয়াশা—
অাদরে করিছে মানা,
যেওনা যেওনা নিশা,
যুবক যুবতী সাধ রহিল,
রহিল তোমারি বিধুমুখ সুধা পান তৃষা॥
বরিষা ইরিষা করি ধূসর রেণু কত উড়িছে ঝরিছে,
কিশোর অরুণ কর বারিছে;
লোহিত সিত পীত তরে তরে ফুল কলি,
তারকা মেঘ ঢাকা;
না হেরি উষা ব্যাকুল পাখী,
শাখা শীরে বসি রহি রহি বোলে,
চ্যুত মুকুল দোলে কিরণ চুম্বন আশা॥
চঞ্চল চিত মম নয়ন কিরণ তব চুমিতে পিপাসা॥

(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)

বসন্ত ঋতু।

নায়ক-নায়িকার গীত।

স্বরে তোর মন মেতেছে কোকিলে ঐ কুহরে।
গাঁদা গোলাপ হার গেঁথেছে,
চেয়ে আছে তোর অধরে॥
কিশলয় কাঁপিয়ে মলয়,
তোর কথা কয় আমোদ ভরে,
বয় ধিরে সৌরভ বয়ে,
গা ছুঁয়ে তোর যায় আদরে॥
গুঞ্জরে ঐ ভ্রমরা ফুলে টলে ধায় বিভোরে,
চায় তোরে মন বিভোরা,
অাঁখি বিভোর হেরে তোরে॥

(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)


দশম দৃশ্য।

পশুশালা।

কিপার কিপারেস্ প্রভৃতি গীত।

সকলে। তামাসা চল্‌তা হায় বহুৎ উমদা।
হোগা ফায়দা, দেখো হিঁয়া ক্যাসা জুদা কায়দা॥

পুগণ। জানি মস্তি হুয়া,

স্ত্রীগণ। কেত্‌না কুস্তী কিয়া,

সকলে। ট্রাপেজ প্যারালেল্‌ বারমে ক্যা কহে তুমে,
উল্‌টি পাল্‌টি লট্ লট্ তব্ ছুটী,

স্ত্রীগণ। উনে কিরা খায়া,

পুগণ। জানি না হায়রাণ ভয়া,

স্ত্রীগণ। যেসা সেঁইয়া পেয়ার,

পুগণ। পিয়ারি যেসি জানি মেরা।

সকলে। খেলে গা জানোয়ার মাদি মরদা।

কিপার। আমাদের প্রথম তামাসা-সংস্কারক বৃষ ও গাভী।

(বৃষ ও গাভী লইয়া বেহারার প্রবেশ।)

গাভী। মাইডিয়ার বুল! তুমি আর ঘাস খেওনা।

বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমি আর দুদ্ দিওনা।

গাভী। না দুদ্‌ দেব না, তুমি বল ঘাস খাবে না?

বৃষ। না।

গাভী। প্রতিজ্ঞে?

বৃষ। প্রতিজ্ঞে।

গাভী। এসো সেক্‌হ্যাণ্ড করি। মাইডিয়ার বুল! তুমি উলঙ্গ ষাঁড় দেখ্‌লে গুঁতিও।

বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমিও উলঙ্গ গাভী দেখ্‌লে গুঁতিও।

গাভী। প্রতিজ্ঞে?

বৃষ। প্রতিজ্ঞে।

গাভী। এস সেক্‌হ্যাণ্ড করি। মাই ডিয়ার বুল্! জবাই হইও, অম্‌নি মরনা।

বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমি ও জবাই হইও অম্‌নি মরো না।

গাভী। না।

বৃষ। না।

গাভী। প্রতিজ্ঞে?

বৃষ। প্রতিজ্ঞে।

গাভী। এস সেক্‌হ্যাণ্ড করি। মাইডিয়ার বুল্‌! এখন ত’মলে আর কি করবে?

বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমিও তো মলে আর কি করবে?

গাভী। তাই তো!

বৃষ। তাই তো!

গাভী। প্রতিজ্ঞে?

বৃষ। প্রতিজ্ঞে।

(উভয়ের গীত।)

রিফর্ম্মার আমরা দুজনে।
দুজনে প্রথমে দেখা ময়দানে॥
তর্ক প্রথম অব্ সিনিটী নে,
তার পর কোর্ট-সিপ করে বে,
তার পর শুনলে প্রতিজ্ঞে,
শুন্‌লেন তো গুণ, এখন মানুন না মানুন,
যত ষাঁড় অাছে আর গরু অাছে,
আমাদের খুবজানে, খুবমানে॥

কিপার। আমাদের দ্বিতীয় তামাসা—অধ্যাপক গর্দ্দভ।

(গর্দ্দভ লইয়া বেহারার প্রবেশ।)

গর্দ্দভ! আমার এমন সুশ্রী গড়ন ছিলনা। মাথাটা গোল, মুখ খানা চেপ্‌টা, দুপায়ে হাঁট্‌তুম, গায়ে মাছি বস্‌লে একটী লেজ নেই যে তাড়াই।

কিপার। আচ্ছা তবে এমন সুঠাম চেহারা হলো কিসে?

গর্দ্দভ। ছেলে বয়সে এক বোঝা বই মাথার চাপালে, মাথাটা চেপ্‌টে গেল। চড়িয়ে মুখ লম্বা করলে। তার পর পিটের ওপর দু ছালা বই দিতেই হুম্‌ড়ি খেয়ে পড়লুম, চার পায়ে হাঁট্‌তে শিখ্‌লুম। কান্‌ দুটো টেনে টেনে লম্বা হলো, আর লেজ্‌ বেরুলো আপ্‌নি।

কিপার। ডাক্‌তে শিখ্‌লে কি করে?

গর্দ্দভ। ও লেজও বেরুনো ডাক ও খোল!

কিপার। এখন কি করবে?

গর্দ্দভ। ট্রেনিংস্কুল।

কিপার। তার পর?

গর্দ্দভ। যারা ভর্ত্তি হবে তারা ঠিক্ আমার মতন হয়ে বেরুবে।

কিপার। তারা কি করবে?

গর্দ্দভ। ঘাস খাবে, ধোপার বোঝা বইবে, আর বেয়াড়া ডাক্‌ ডাক্‌বে।

গর্দভ।
গীত।
কে আস্‌বে আমার স্কুলে।
যাবে তিন দিনে তার লেজ ঝুলে॥
আমার এমনি কসে টান্,
এক্‌টানে তার লম্বা হবে কান্‌
চল্‌বে চারটি-খুরে,
গলাবাজী করবে জোরে,
ফুলে ফুলে ঘাড় তুলে॥

কিপার। আমাদের তৃতীয় তামাসা— স্মার্ত্ত বানর বানরি।

(বানর বানরী লইয়া বেহারার প্রবেশ।)

বানরি। প্রত্যেক বানর ও বানরি কি মানুষের অনুকরণ করিতে বাধ্য?

বানর। বাধ্য। কারণ বিজ্ঞান মতে তারা স্বজাত।

বানরি। চুরি কর্‌তে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। বড় বানরের লেজ ধর্‌তে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। ঝগ্‌ড়া করতে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। দাঁত খিঁচুতে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। আঁচড়তে কামড়াতে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। বানরি বানরকে লাথি মারিতে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। ডাইভোর্স অর্থাৎ ফারখৎ করিতে বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। এখনি বাধ্য?

বানর। বাধ্য।

বানরি। তবে যাও।

বানর। আচ্ছ চল্লুম, দেখি এমন বাঁদর কোথা পাও।

বানরি। অারে নাও নাও, তোমার মতন ধাড়ী বাঁদর গণ্ডা গণ্ডা। যে দিকে চাও, দেখে নাও, আমি দেখ্‌বো কোথা বাঁদরি পাও।

বানর। অভাব কি? রাস্তায় ঘাটে মাঠে—

বানরি। তবে ডাইভোর্স?

বানর। ডাইভোর্স।

উভয়ে গীত।

দুজনে ছিলাম রেতে দুডালে।
হোলে শুভ দৃষ্টি সকালে॥
দুপুর বেলা এক ডালে বসে,
সজ্‌নে পাতা ঠুসেছি ক’সে,
কিচি কিচি দুপুর থেকে
ফারখৎ হলো বিকেলে॥

কিপার। আমাদের চতুর্থ তামাসা—ভলেণ্টীয়ার ভেড়া।

(ভেড়া লইয়া বেহারার প্রবেশ।)

কিপার। তুমি লড়্‌বে?

ভ্যাড়া। লড়্‌বো।

কিপার। কার সঙ্গে?

ভ্যাড়া। কারুর সঙ্গে না, আপনা আপনি।

কিপার। ঘোড়া চড়্‌বে?

ভ্যাড়া। চ’ড়বো।

কিপার। কি ঘোড়া?

ভ্যাড়া।কাটের ঘোড়া।

কিপার। বন্দুক ছুড়বে?

ভ্যাড়া। ছুড়বো।

কিপার। কি করে?

ভ্যাড়া। চোক্ বুজে।

কিপার। ঘোড়া থেকে পড়্‌বে?

ভ্যাড়া। পড়বো।

কিপার। কখন?

ভ্যাড়া। বন্দুক ছুড়বো যখন।

কিপার। যদি কেউ লড়াই কর্‌তে এসে?

ভ্যাড়া। তা আমার কি? দৌড় মারবো ক’সে।

কিপার। তোমার মত ভ্যাড়া ভলেন্‌টীয়ার কটী আছে?

ভ্যাড়া। এক পাল ভ্যাড়া, এম্‌নি সিং মোচড়া, এম্‌নি রোকে এম্‌নি তাল ঠোকে, যদি কারু সাড়া পায়, এমনি চার পা তুলে পালায়।

কিপার। দাঁড়াও দাঁড়াও, একটি গান গাও।

ভ্যাড়া।
গীত।
শেম শেম, কাউয়ার্ড নেম,
রাখ্‌বো না আর ভ্যাড়ার পাল।
তোষ দান বাঁধা বন্দুক কাঁধ,
ভারি মিলিটারি চাল॥
রাগে ফাটি, বাটী বাটী অামানি খাই সাঁজ সকাল॥
লড়তে এলে বন্দুক ফেলে চার পা তুলে
পেরুই খাল॥
হর্‌দম্ হর্‌দম্ রেগে লাল, পুরু ছাল॥

কিপার। আমাদের পঞ্চম তামাসা— হাড়গিলে কমিসনার।

(হাড়গিলে লইয়া বেহারার প্রবেশ।)

কিপার। যখন এসেছ পরিচয় দাও, তুমি হেথায় কেন?

হাড়গিলে। আমায় চেন? অামায় জান? আমি হাড়গিলে।

কিপার। নামটি কোথা পেলে?

হাড়গিলে। সায়েবদের এঁটো হাড় গিলে গিলে।

কিপার। কোথায় থাক?

হাড়গিলে। টেক্সর বিলে।

কিপার। কেন এয়েছো?

হাড়গিলে। কমিসনার হব বলে।

কিপার। তা হে তায় এয়েছ কি করতে?

হাড়গিলে। ভোট নিতে।

কিপার। কমিসনার হোয়ে কি করবে?

হাড়গিলে। দেখছো দুটো ঠোঁট্?

কিপার। দেখছি।

হাড়গিলে। শুনেছ খাই এটোঁ হাঁড়?

কিপার। শুনেছি।

হাড়গিলে। এখন রেয়োতের হাড় মাস খাবে।

কিপার। ত। পারো পারো।

হাড়গিলে
গীত।
আজ ভোট দিয়ে কাল ওপারে যেও উঠে।
বাজাবো ঠোঁটে ঠোটে, নেব লুটে পুটে।
বলি ভালোয় ভালোয়,
পালাও আলোয় আলোয়,

নইলে মুস্কিল, রোজ বস্‌বে শীল,
চাটী ভিটে মাটি, থাক্‌বেনা ঘটী বাটী,
পালাতে হবে ছুটে, এক ছুটে॥}}

কিপার। আমাদের ষষ্ঠ তামাসা—পুজরি ভালুক ও যজমানি ভালুকী।

(ভালুক ভলুকী লইয়া বেহারার প্রবেশ)

ভালুকী। ইস্, তুমি ভারি টল্‌চ্ছো!

ভালুক। তুমি যে থাবা থাবা মোউও খাইয়েছ, তাতে নেশা হয়েছে!

ভালুকী। নৈবিদ্দি কর’বো কোন ঠাকুরের?

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি, নৈবিদ্দি সাজাও!

ভালুকী। পুজা হবে কার?

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি, ফুল দাও!

ভালুকী। মন্তর পড়ছো কি?

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি তুমি শাঁক বাজাও।

ভালুকী। কেন পূজো করছো?

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি আমায় ধর।

ভালুকী। কেন ধরবো কেন?

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি, একটু শোবো।

ভালুকী। তবে মরো।

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনে, ঘুমবো।

ভালুকী। যজমান বাড়ি যাবে না?

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি, ডোরা টান্‌বো।

ভালুকী। পোড়ার মুখো! দু থাবা মৌও খেয়ে চেত্তা মার্‌বি।

ভালুক। তা বল্‌তে পারিনি, কুস্তী লড়বো!

ভালুকী। কুস্তী লড়বি কার সঙ্গে?

ভালুক। তা বলতে পারিনি, নাচ্‌বো।

ভালুকী। নাচ্‌বি কার সঙ্গে?

ভালুক। তা বল্‌তে পারি,—তোমার সঙ্গে, তোমার সঙ্গে, তোমার সঙ্গে।

উভয়ে গীত।

নাচি ঠুম্‌কী ঠুম্‌কী নাচি ঠুম্‌কী ঠুম্‌কী।
আমরা চাঁদমুখো আর চাঁদমুখী॥
পিরীত মাখামাখি, দুজনে মেতে থাকি,
জ্বরে ধুঁকী, আর মৌও চাকি,
পিরীত বাধ্‌লো যখন আমরা খোকা খুকী॥
ভোরে হাওয়া খেতে, পিরীত বাধ্‌লো পথে,
এখন জানাজানি ছিল লুকো লুকী।


শ্রীযুক্ত গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রণীত

১৮৯৪ সালের বডদিনে মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত।

[১৩০১ Sak]

দলাদলি ও বাঙ্গলার ভবিষ্যৎ – শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু -1926

আমি কংগ্রেসের কাজ ছাড়িতে পারি—তবুও সেবাশ্রমের কাজ ছাড়া আমার পক্ষে অসম্ভব। “দরিদ্র নারায়ণের” সেবার এমন প্রকৃষ্ট সুযোগ আমি কোথায় পাইব? এই সেবাশ্রমের পেছনে কত ইতিহাস লুক্কায়িত আছে—কবে এই চিন্তা আমার মধ্যে প্রবেশ করে এবং কেন প্রবেশ করে—কি করিয়া আমি চিন্তারাজ্য ছাড়িয়া কর্ম্মরাজ্যে প্রবেশ করি—সে কথা অন্য সময় বলিব।

Daladali O Banglar Bhabishyat

[দক্ষিণ-কলিকাতা তরুণ সমিতির সহকারী সম্পাদক, ও দক্ষিণ-কলিকাতা চিত্তরঞ্জন জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত ভুপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের নিকট লিখিত]

মান্দালয় জেল

প্রিয়বরেষু,

আপনার ২।৫।২৬ তারিখের পত্র পাইয়া আমি আনন্দিত হইয়াছি। উত্তর দিতে বিলম্ব হইল বলিয়া ক্ষমা করিবেন—আমি এখন অনেক বিষয়ে নিজের মালিক নহি—তা ত বুঝিতেই পারিতেছেন। আপনার পত্রে ভবানীপুরের সকল সমাচার অবগত হইয়া একসঙ্গে সুখী ও দুঃখিত না হইয়া পারি নাই। আজ বাঙ্গলার সর্ব্বত্রই কেবল দলাদলি ও ঝগড়া এবং যেখানে কাজকর্ম্ম যত কম, সেখানে ঝগড়া তত বেশী। ভবানীপুরের কাজকর্ম্ম কিছু হইতেছে, তাই ঝগড়া বিবাদ অপেক্ষাকৃত কম—তবুও যা আছে তাহাতে নিরপেক্ষ লোক ম্রিয়মান না হইয়া পারে নাই। আমি শুধু এই কথা ভাবি—ঝগড়া করিবার জন্য এত লোক পাওয়া যায়—কিন্তু মিলাইতে পারে, মীমাংসা করিয়া দিতে পারে—এ রকম একজন লোকও কি আজ সারা বাঙ্গালার মধ্যে পাওয়া যায় না? এই দলাদলির জন্য বাঙ্গলা আজ শ্রীযুক্ত অনিলবরণ রায়ের মত স্বদেশসেবক হারাইয়াছে—আরও কয়জনকে হারাইবে তা কে বলিতে পারে? বাঙ্গালী আজি অন্ধ, কলহে বিষাদে নিমগ্ন, তাই এই কথা বুঝিয়াও বুঝিতেছে না। নিঃস্বার্থ আত্মদানের কথা আর তো কোথাও শুনিতে পাই না! অত বড় একটা প্রাণ নিজেকে নিঃশেষে বিলাইয়া মহাশূন্যে মিশিয়া গেল; আগুনের ঝলকার মত ত্যাগ মূর্ত্তিপরিগ্রহ করিয়া বাঙ্গালীর সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করিল; সেই দিব্য আলোকের প্রভাবে বাঙ্গালী ক্ষণেকের জন্য স্বর্গের পরিচয় পাইল; কিন্তু আলোকও নিবিল, বাঙ্গালীও পুরাতন স্বার্থের গণ্ডীতে আশ্রয় লইল। আজ বাঙ্গলার সর্ব্বত্র কেবল ক্ষমতার জন্যে কাড়াকাড়ি চলিতেছে। যার ক্ষমতা আছে—সে ক্ষমতা বজায় রাখিতেই ব্যস্ত। যার ক্ষমতা নাই সে ক্ষমতা কাড়িবার জন্য বদ্ধপরিকর। উভয় পক্ষই বলিতেছে, “দেশোদ্ধার যদি হয়, তবে আমার দ্বারাই হউক, নয় তো হইয়া কাজ নাই।” এই ক্ষমতা-লোলুপ রাজনীতিকবৃন্দের ঝগড়া বিবাদ ছাড়িয়া, নীরবে আত্মোৎসর্গ করিয়া যাইতে পারে, এমন কর্ম্মী কি বাঙ্গলায় আজ নাই?

নিজেদের intellectual ও spiritual উন্নতি অবহেলা করিয়া যাহারা জনসেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছে তাহারা যে এই সব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কলহবিবাদে সকলকে মত্ত দেখিয়া নিতান্ত নিরাশ হইয়া রাজনীতিক্ষেত্র হইতে সরিয়া পড়িবে, ইহাতে আর আশ্চর্য্য কি? নিজেদের মানসিক ও পারমার্থিক কল্যাণকে তুচ্ছ করিয়া যাহারা জনহিত ব্রতে ব্রতী হইয়াছে তাহারা কি শেষে এই ক্ষুদ্র ঝগড়া বিবাদের মধ্যে নিজেকে ডুবাইয়া দিবে? জনসেবার আশায় নিরাশ হইলে তাহারা যদি পুনরায় নিজেদের পারমার্থিক কল্যাণে মনোনিবেশ করে তাহা হইলে কি তাহাদিগকে দোষ দেওয়া যায়? আমি আজ স্পষ্ট বুঝিতেছি যে, সমাজের বর্ত্তমান অবস্থা যদি চলে, তবে বাঙ্গলার বহু নিঃস্বার্থ কর্ম্মী ক্রমে ক্রমে অনিলবরণের পন্থা অবলম্বন করিতে বাধ্য হইবে।

আজ বাঙ্গলার অনেক কর্ম্মীর মধ্যে ব্যবসাদারী ও পাটোয়ারী বুদ্ধি বেশ জাগিয়া উঠিয়াছে। তাহারা এখন বলিতে আরম্ভ করিয়াছে, “আমাকে ক্ষমতা দাও—কর্ম্মচারীর পদ দাও—অন্ততঃপক্ষে কার্য্যকরি সমিতির সভ্য করিয়া দাও—নতুবা আমি কাজ করিব না।” আমি জিজ্ঞাসা করি—নরনারায়ণের সেবা ব্যবসাদারীতে, contract-এ কিবে পরিণত হইল? আমি তো জানিতাম সেবার আদর্শ এই—

“দাও দাও ফিরে নাহি চাও,
থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।”

যে বাঙ্গালী এত শীঘ্র দেশবন্ধুর ত্যাগের কথা ভুলিয়াছে—সে যে কতদিনের আগেকার স্বামী বিবেকানন্দের ‘বীরবাণী’ ভুলিবে—ইহা আর বিচিত্র কি?

দুঃখের কথা, কলঙ্কের কথা, ভাবিতে গেলে বুক ফাটিয়া যায়। প্রতিকারের উপায় নাই—করিবার ক্ষমতা নাই—তাই অনেক সময় ভাবি—চিঠিপত্র লেখা বন্ধ করিয়া বাহ্যজগতের সহিত সকল সম্বন্ধ শেষ করিয়া দিই। পারি তো দেশবাসীর পক্ষ হইতে আমরা লোকচক্ষুর অন্তরালে তিলে তিলে জীবন দিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিয়া যাইব। তারপর মাথার উপরে যদি ভগবান থাকেন, পৃথিবীতে যদি সত্যের প্রতিষ্ঠা হয়, তবে আমাদের হৃদয়ের কথা দেশবাসী এক দিন না একদিন বুঝিবেই বুঝিবে। দেশের নামে এত বড় একটা প্রহসনের অভিনয় দেখিব—বিংশ শতাব্দীর বাঙ্গলা দেশে যে ‘Nero is fiddling while Rome is burning’ কথার একটা নূতন দৃষ্টান্ত চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিবে—কোনও দিন ভাবি নাই।

অনেক কথা বলিয়া ফেলিলাম—হৃদয়ের আবেগ চাপিয়া রাখিতে পারিলাম না। আপনাদের নিতান্ত আপনার বলিয়া মনে করি তাই এত কথা বলিতে সাহস করিলাম। আপনার গঠনমূলক কাজে ব্যাপৃত—আশা করি, আপনারা এই দলাদলির পঙ্কিল আবর্ত্তে আকৃষ্ট হইবেন না।

বিদ্যালয়ের কথা পড়িয়া বিশেষ আনন্দিত হইলাম। বাড়ীর কথা শুনিয়া অবশ্য দুঃখিত না হইয়া পারিলাম না। তবে এ-কথা আমি পূর্ব্ব হইতে জানি এবং চণ্ডীবাবু প্রভৃতি বন্ধুদিগকে কয়েকবৎসর পূর্ব্বেই বাড়ীটির পরিণামের কথা বলিয়াছিলাম। আমার সর্ব্বদা মনে হইত যে স্কুলের কর্ত্তৃপক্ষরা unbusiness like ভাবে জমির “লিজ” লইয়া বাড়ী নির্ম্মাণ আরম্ভ করিয়াছিলেন এবং তার ফলে পরিণামে জমিদারেরই লাভ হইবে। যাক, এখন ত “গতস্য শোচনা নাস্তি”। আপনারা যে কিছুমাত্র নির্ভরসা না হইয়া ‘গৃহনির্ম্মাণ-ভাণ্ডার’ সংগ্রহ করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন, ইহা খুব আশাপ্রদ। আপনাদের চেষ্টা যে সফল হইবে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই, কারণ—

“নহি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত! গচ্ছতি।”

সমিতির সকল সংবাদ পাইয়া বিশেষ সুখী হইলাম। আপনারা যদি মেথর মুচি প্রভৃতি তথাকথিত নিম্নশ্রেশীর বালকদের জন্য একটি বিদ্যালয় করিতে পারেন তবে বড় ভাল হয়। এ বিষয়ে অমৃতের সহিত পরামর্শ করিবেন—আমি অনেক দিন হইল তাহার পত্র পাইয়াছি, দুঃখের বিষয় উত্তর দিয়া উঠিতে পারি নাই। আজ কুলদাকে দিলাম—আশা করি আগামী সপ্তাহে অমৃতকে লিখিতে পারিব।

বলা বাহুল্য আমি থাকিলে আপনাদের আলাদা হইতে দিতাম না। অবশ্য ভিন্ন শাখা গঠনের সহায়তা আমি করিতাম কিন্তু একেবারে ভিন্ন নাম দিয়া নূতন প্রতিষ্ঠান করিতে দিতাম না। যাক, এখন আর উপায় নাই। যাহা হইয়াছে ভালই হইয়াছে—এই বলিয়া কাজে লাগিতে হইবে। আপনার constitution করিয়া ভালই করিয়াছেন।

আশা করি চাউল ও চাঁদা গ্রহণ লইয়া বালক সমিতির সহিত আপনাদের গণ্ডগোল হইবে না। এক জায়গায় যদি অনেকগুলি সমিতি চাঁদা ও চাউল গ্রহণ আরম্ভ করে তবে গৃহস্থেরা উত্যক্ত হইয়া ওঠে, সুতরাং সে বিষয়ে একটু দৃষ্টি রাখা দরকার।

আমার মনে হয় যে, আপনার যদি ২।১ জন কর্ম্মী বা শিক্ষককে কাশীমবাজার পলিটেকনিক (Cossimbazar Polytechnic) স্কুলে শিখাইয়া লইতে পারেন তবে technical শিক্ষার খুব সুবিধা হইবে। আমি একবার কাশীমবাজার স্কুলে গিয়াছিলাম। আমার বেশ ভালই লাগিয়াছিল—তাহারা কয়েকটী নূতন জিনিষ শেখায় যাহা সাধারণ স্কুলে হয় না—যেমন বেতের কাজ clay-modelling পুতুল নির্ম্মাণ, কামারের কাজ, সেলাই, electroplating ইত্যাদি। আমি যখন যাই তখন electroplating-এর জন্য machinery-র আমদানি হইতেছে।

আপনার প্রেরিত বিদ্যালয় ও সমিতির constitution আমি পাইয়াছি।

স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ ভাল হইতেছে না—ইহা দুঃখের বিষয়। এর কারণ এই যে, জনসাধারণকে ঠিকভাবে ডাকা হয় নাই। ডাকার মত ডাকিতে পারিলে তাহারা সাড়া না দিয়া পারিবে না। তাহাদের মধ্যে intuition ও কর্ম্ম-প্রেরণা জাগানই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। স্বাস্থ্যবিভাগের উদ্দেশ্য দাতব্য চিকিৎসালয়ের উদ্দেশ্য হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। তাহাদের মধ্যে কর্ম্ম-প্রেরণা জাগাইতে হইলে তাহাদিগকে ভালবাসার দ্বারা আপনার করিতে হইবে।

আপনারা হয় তো জানেন না যে, দক্ষিণ-কলিকাতা সেবাশ্রমের ক্রটির জন্য আমি প্রধানতঃ দায়ী। বাহিরে থাকিতে আমি ভাল রকম organise করিতে পারি নাই। তারপর হঠাৎ আমার গ্রেপ্তার। যখন সেবাশ্রম কালীঘাটে ছিল তখন বাড়ী-ভাড়া ও সহকারী সম্পাদকের বেতন আমি নিজে দিতাম। শুধু বালকদের ভরণপোষণের খরচ সাধারণের দেওয়া চাঁদা হইতে নির্ব্বাহিত হইত। সেবাশ্রম সম্বন্ধে আমার clear conscience আছে, কারণ public-এর দেওয়া টাকার একটী পয়সারও আমি অসদ্ব্যবহার করি নাই। আমার গ্রেপ্তারের পর আমার দেয় অংশ আমার দাদা (শরৎবাবু) দিয়া আসিতেছেন। সম্প্রতি খরচ কমিয়াছে এবং আয় বাড়িয়াছে বলিয়া তাঁহাকে আর পূর্ব্বেকার মত টাকা দিতে হয় না। আমি যখন মাসে মাসে দুই শত টাকা করিয়া সেবাশ্রমের জন্য ব্যয় করিতাম, তখন অনেক বন্ধু বলিয়াছিলেন যে, আমি বৃথা ছয় সাতটী বালকের জন্য এত অর্থব্যয় করিতেছি। এ টাকার সদ্ব্যবহার অন্যভাবে হইতে পারে। কিন্তু তাঁহারা জানেন না যে, আমি খেয়ালের বশবর্ত্তী হইয়া সেবাশ্রমের কার্য্যে হস্তক্ষেপ করি নাই। আজ প্রায় ১২।১৪ বৎসর ধরিয়া যে গভীর বেদন তুষানলের মত আমাকে দগ্ধ করিতেছে, তাহা দূর করিবার জন্য আমি এই কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছি। আমি কংগ্রেসের কাজ ছাড়িতে পারি—তবুও সেবাশ্রমের কাজ ছাড়া আমার পক্ষে অসম্ভব। “দরিদ্র নারায়ণের” সেবার এমন প্রকৃষ্ট সুযোগ আমি কোথায় পাইব? এই সেবাশ্রমের পেছনে কত ইতিহাস লুক্কায়িত আছে—কবে এই চিন্তা আমার মধ্যে প্রবেশ করে এবং কেন প্রবেশ করে—কি করিয়া আমি চিন্তারাজ্য ছাড়িয়া কর্ম্মরাজ্যে প্রবেশ করি—সে কথা অন্য সময় বলিব। পত্রে লিখিবার চেষ্টা করিলে গ্রন্থ হইয়া যাইবে।

অনেক কথা লিখিলাম। এখন শেষ করি। আমার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, কি উত্তর দিব? রবিবাবুর একটী কবিতা আমার খুব ভাল লাগে। কবির ভাষায় উত্তর দিলে কি ধৃষ্টতা হইবে? কবির এত আদর এইজন্য যে, আমাদের অন্তরের কথা কবিরা আমাদের অপেক্ষা স্পষ্টতর ও স্ফুটতর ভাবে ব্যক্ত করিতে পারেন।

তাই বলি—

“এখনো বিহার কল্পজগতে
জেলখানা (অরণ্য) রাজধানী,
এখনো কেবল নীরব ভাবনা
কর্ম্মবিহীন বিজন সাধনা
দিবানিশি শুধু বসে বসে শোনা
আপন মর্ম্মবাণী।
* * *

মানুষ হতেছি পাষাণের কোলে
* * *

গড়িতেছি মন আপনার মনে
যোগ্য হতেছি কাজে!!

* * *

কবে প্রাণ খুলি বলিতে পারিব
“পেয়েছি আমার শেষ!”
তোমরা সকলে এস মোর পিছে
গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,
আমার জীবনে লভিয়া জীবন
জাগরে সকল দেশ!”

শরীর তত ভাল নাই, তবে তার জন্য চিন্তাও নাই। আমার ভালবাসা ও প্রতিসম্ভাষণ জানিবেন। অমৃত প্রভৃতি ভাইরা কেমন আছেন? আপনাদের কুশল সংবাদ পাইলে অত্যন্ত সুখী হইব। তবে কাজের সময় নষ্ট করিয়া পত্র লিখিবার প্রয়োজন নাই। আমার প্রীতিপূর্ণ নমস্কার গ্রহণ করিবেন।

ইতি—

সুভাষ

হিন্দুজাতি – তাহার বর্ত্তমান অভাব ও তাহার কর্ত্তব্য৷

Akhanda Bharat

এক সময় ছিল, যখন পৃথিবীতে হিন্দু দৃশ্য ভিন্ন লোক ব্যবহারের মধ্যে আর সুদৃশ্য কিছুই ছিল না। তখন হিন্দুগণ অন্যান্য জাতির উন্নতি সাধক ছিলেন । তখন প্রকৃত অর্থে আর কোন জাতিরই জাতিত্ব উৎপন্ন হয় নাই; হিন্দু জাতিকে আর কোন জাতির সহিত প্রতিযোগিতায় পড়িয়া উন্নতি শিক্ষা করিতে হয় নাই। হিন্দুগণ আর কোন জাতিকে আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেখেন নাই বলিয়া, তাঁহারা আপনাদের কোন জাতীয় নাম, জাতীয় আকার বা জাতীয় বন্ধন ব্যবস্থাপিত করেন নাই। তাঁহারা আর্য্য নামে প্রথিত হইয়াছেন—তাহাই তাঁহারদের তখনকার ভাবসঙ্গত ও তাঁহাদের উপযুক্ত নাম।

Hindu Jati – Tahar Bartaman Abhab o Kartabya -1871

হিন্দুজাতি;

তাহার বর্ত্তমান অভাব ও তাহার কর্ত্তব্য৷

হিন্দুভ্রাতৃগণ!

হিন্দুমেলার বয়ঃক্রম পাঁচ বৎসর পূর্ণ হইল। আমরা প্রতিবৎসর বন্ধুবান্ধবের সহিত মহোল্লাসে এই মেলা ক্ষেত্রে সমাগত হইয়া থাকি; এখানকার সমাহৃত দ্ৰব্যজগত এবং সঙ্গীত ব্যায়াম ক্রীড়া প্রভৃতি দর্শন ও শ্রবণ করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করি। আমাদের উৎসাহ উদ্যম সৌহার্দ্য ও অনুরাগ দর্শন করিয়া মেলার উদ্যোগীগণ কতই না আনন্দ অনুভব করেন? কেই বা এই মহৎ উদ্যোগ দেখিয়া সুখী না হইবে? যে দেখিবে যে হিন্দুগণ হিন্দু বলিয়া আপনাদিগকে জানিতেছে, হিন্দু বলিয়া আপনাদের পূর্ব্ব কীৰ্ত্তি স্মরণ করিতেছে এবং হিন্দু বলিয়া সেই নষ্ট কীর্ত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করিতেছে—তাহারই হৃদয়ে বিমল আনন্দের সঞ্চার হইবে। হিন্দু নাম নিতান্ত মলিন ও ধূলিধূসরিত হইয়া লোকসাধারণের অদৃশ্য অগ্রাহ্য হইয়া যাইতেছিল; হিন্দুমেলা সেই হিন্দু নামকে উৰ্দ্ধে উত্থাপিত করিয়াছে এবং ইহার মলিনতা বিধৌত করিয়া ইহার পূর্ব্ব পরিচয় সকল প্রকাশ করিতেছে। হিন্দুমেলা সংস্থাপনাবধি হিন্দুদিগের এই সংস্কার জন্মিবার উপায় হইয়াছে যে আমাদের জাতিসাধণরণের বলিয়া একটী কিছু আছে, যাহাতে সকল হিন্দুরই অধিকার—যাহা হিন্দুদিগের দুর্গ স্বরূপ- যেখানে যাহা কিছু হিন্দু বলিয়া পরিজ্ঞাত হয় তাহা স্থান প্রাপ্ত হইবে—যেখানে কেবল হিন্দু দৃশ্যই দৃশ্যমান হইবে।

এক সময় ছিল, যখন পৃথিবীতে হিন্দু দৃশ্য ভিন্ন লোক ব্যবহারের মধ্যে আর সুদৃশ্য কিছুই ছিল না। তখন হিন্দুগণ অন্যান্য জাতির উন্নতি সাধক ছিলেন । তখন প্রকৃত অর্থে আর কোন জাতিরই জাতিত্ব উৎপন্ন হয় নাই; হিন্দু জাতিকে আর কোন জাতির সহিত প্রতিযোগিতায় পড়িয়া উন্নতি শিক্ষা করিতে হয় নাই। হিন্দুগণ আর কোন জাতিকে আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেখেন নাই বলিয়া, তাঁহারা আপনাদের কোন জাতীয় নাম, জাতীয় আকার বা জাতীয় বন্ধন ব্যবস্থাপিত করেন নাই। তাঁহারা আর্য্য নামে প্রথিত হইয়াছেন—তাহাই তাঁহারদের তখনকার ভাবসঙ্গত ও তাঁহাদের উপযুক্ত নাম। এখন আমরা দেখিতেছি, পৃথিবীতে নানা জাতি উৎপন্ন হইয়াছে—এক একটী জাতি সভ্যতা পদবীতে অধিরূঢ় হইয়া আপনাদের জাতীয় গৌরব বৃদ্ধি করিতেছে—এখন স্বজাতির নামে এক এক লোকের শরীর রোমাঞ্চিত হইতে দৃষ্ট হয়। এমন কালে এই প্রাচীন হিন্দুজাতি অন্যান্য জাতির সহিত প্রতিদ্বম্বিতায় প্রবৃক্ত না হইলেও চিরপ্রথিত আপনার স্বতন্ত্র রীতি নীতির গুণে আপনি একটা পৃথক জাতি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অতঃপর এই জাতির ভাগ্যলক্ষী ইহার কি প্রকার গতি বিধান করেন তাই বলা যায় না।

এক্ষণে এই সাগর সমান হিন্দুজাতির রীতি নীতি জ্ঞান ধৰ্ম্ম মান ও মহত্ত্ব বহু প্রকার দোষে মলিনীভূত হইয়াছে। তথাপি তৎসমুদায়ের মধ্যে যে সকল গভীর অর্থ আমরা দেখিতে পাই, তাহা বাক্যেতে বলিব কি, মনেতেও সম্পূর্ণ রূপে আয়ত্ত করিতে পারি না। যেমন শৈলরাজ হিমাচল, যেমন সিন্ধু ও গঙ্গানদী, এই হিন্দুজাতিও তদ্রুপ। এখনো ভারতের মহত্ত্বের পরিচয় স্বরূপ ঐ সকল পৃথিবীবিখ্যাত প্রাকৃতিক বস্তু যেমন বিদ্যমান আছে, সেই রূপ হিন্দুজাতিও ভারতের দীপক স্বরূপ হইয়া দীপ্তি পাইতেছে। যে জন্য ঈশ্বরনির্দেশে এই হিন্দুজাতি মনুষ্য জাতির আদিম উন্নতির প্রমাণ স্বরূপ দণ্ডায়মান আছে—যে জন্য তাঁহারই বিধানে এই প্রলয়ঙ্কর কাল হিন্দুজাতির কোন প্রধান ধৰ্ম্ম ও নীতি শাস্ত্রকে বিলুপ্ত করিতে পারে নাই—যে জন্য হিন্দু রীতি নীতি তৎসহোযোগিনী মিশ্রণভাববর্জ্জিতা সংস্কৃত ভাষার ন্যায় এখনো অন্য কোন দেশীয় রীতি নীতির সহিত মিশ্রিত হইয়া কলঙ্কিত হয় নাই—যে জন্য হিন্দুগণ ভিন্ন ভিন্ন রাজার অধীন হইয়াও সামাজিক রীতি নীতি সম্পর্কে এখনো সম্পূর্ণ স্বাধীন রহিয়াছেন—সেই জন্য এখনো সেই হিন্দুজাতিকে সুদৃঢ় বন্ধনে রক্ষিত হইতে হইতেছে। সেই জন্য এখন আবশ্যক হইতেছে যে, হিন্দুগণ আপনাদের জ্ঞান শক্তি মহত্ত্বে উত্থিত হউন এবং উচ্চশির হইয়া পৃথিবীস্থ সমুদায় উন্নত ও সুসভ্য জাতির সহিত মনুষ্যত্বের মহোচ্চ প্রতিষ্ঠা লাভ করুন। এই নিমিত্ত এখন চেষ্টা হইতেছে যে সমুদায় ভারতবর্ষের সর্ব্বত্র-বিস্তারিত সকল প্রকার হিন্দু দৃশ্য একত্রিত হয়—হিন্দুদিগের কি আছে তাহা হিন্দুগণ বিজ্ঞাত ও তৎতাবতের সহিত পরিচিত হয়েন এবং যত্নের সহিত সমুদায় রক্ষা ও ধারণ করেন। আমি এই মাত্র যাহা বলিলাম তাহা যদি সত্য হয়—যদি এই প্রাচীন ঋগ্বেদের একটী অক্ষর মাত্র বিনষ্ট না হইবার কোন বিশেষ গূঢ় তাৎপৰ্য্য থাকে—যদি এই মহানিধি স্বরূপ মহাভারত ও অতুল্য রামায়ণ এখনো উন্নত-জ্ঞান-সমন্বিত সুপণ্ডিত দিগের হৃদ্য পথ্য বলিয়া পরিগণিত হয়—এবং যদি আমাদের রীতি নীতি এখনো সেই সকল আৰ্য্য শাস্ত্রের উদাহরণ বা ছায়া স্বরূপ হয়, তবে হিন্দুগণ! প্রাণপণে হিন্দু নাম, হিন্দু শাস্ত্র, হিন্দু রীতি নীতি রক্ষা কর—হিন্দুসমাজকে দোষবিমুক্ত ও সেই নামের উপযুক্ত করিয়া ধারণ কর; তাহা হইলে কেবল বঙ্গদেশের কেন—কেবল ভারতবর্ষের কেন—সমস্ত পৃথিবীর মঙ্গল লাভ হইবে।

ভ্রাতৃগণ! এখন প্রণিধান কর, হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য কি? আমরা হিন্দু, আমরা একটী স্বতন্ত্র জাতি—এইটা ভালরূপে আমাদের হৃদয়ঙ্গম করান ইহার প্রধান তাৎপৰ্য্য। পৃথিবীতে যেমন আর পাঁচটী জাতি আছে, যাহারা ধন ধান্য সমৃদ্ধিতে সুসম্পন্ন—যাহাদের নাম যশ সৰ্ব্বত্র শ্রুত হওয়া যায়—যাহারা পৃথিবীর উপরিস্থিত এক এক খণ্ড আকাশকে আলোকিত করিয়া রাখিয়াছে—আমরাও সেই রূপ একটী জাতি, আমাদেরও অন্যান্য জাতির ন্যায় ঐ রূপ প্রতিভান্বিত হওয়া আবশ্যক। ইহাই আমাদের হৃদয়ঙ্গম হইলে হিন্দু মেলার উদ্দেশ্য সফল হয়।

আমাদের যে সকল অভাব তন্মমধ্যে প্রধান অভাব এই যে আমাদের ঐ সামাজিক ভাব বা যথার্থ জাতি বোধটী নাই। এইটি থাকিলে আর সমুদায় শীঘ্র বা বিলম্বে লাভ হইতে পারে। অতএব এই বিষয়টীর সবিশেষ আলোচনা করা কর্ত্তব্য। আমরা সৰ্ব্ব সাধারণ মনুষ্যের প্রতি যে কৰ্ত্তব্য তাহা যেমন পূর্ব্ব পুরুষদিগের নিকট শিখিয়াছি, জাতি সাধারণের প্রতি কৰ্ত্তব্য তেমন শিক্ষা করিতে পারি নাই। পরন্তু ইহাও সুস্পষ্ট সত্য যে আমাদের পূর্ব্ব পুরুষের জাতীয় ভাব বন্ধনে বা তাহার শিক্ষা দানে অপারগ ছিলেন তাছা নহে। তাহারা যে সময়ে জীবিত ছিলেন সে সময়ের উপযোগী যেরূপ কৰ্ত্তব্য তাহা তাঁহারা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা তাঁহাদের উচ্চশিরষ্কতা বহুদৰ্শিতা ও সৰ্ব্ব বিষয়ে দক্ষতা গুণে আমাদের যে সকল সমাজিক নিয়ম বদ্ধন করিয়া দিয়া গিয়াছেন, সে সকল নিয়ম আমাদিগকে বহুল বিপ্লব হইতে এত কাল পর্য্যন্ত রক্ষা করিয়া আসিতেছে—আরো কত কাল পর্য্যন্ত আমাদিগকে রক্ষা করিবে তাহা কে বলিতে পারে? অামাদের ক্রটি এই যে আমরা সেই সকল সমাজিক নিয়মাবলীর অর্থ বা ভাব বিশিষ্ট রূপে অবগত নহি, অথচ আমরা তাহা লোকাচার বা কুলাচার বলিয়া প্রতিপালন করিয়া আসিতেছি। এই কারণে দুইটী অশুভ ফল উৎপন্ন হয়। এক এই যে, আমরা যখন তখন তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলিতে চাই; দ্বিতীয় এই যে, সেই সকল সামাজিক ভাব হইতে যে জাতি সাধারণের প্রতি কর্ত্তব্য কৰ্ম্মের শিক্ষা হয়, তাহা আমাদের নাই। এই শেষোক্ত বিষয়টী এস্থলে বিবেচ্য। সকলেই স্বীকার করিবেন যে, আমাদের বোধ এই রূপ যে আমরা কেবল এক একটী স্বতন্ত্র মনুষ্য। আমরা সামাজিক লোক, সমাজের সহিত আমাদের কোন সম্পর্ক আছে, এরূপ আমাদের ধারণা নাই; সমাজের জন্য আমাদের কিছু করিতে হইবে তাহা আমাদের স্বপ্নের অগোচর। সমাজের প্রতি এই রূপ উদাসীন থাকিয়া, জাতি সাধারণের প্রতিও আমরা সেই রূপ সম্পর্কশূন্য হইয় পড়িয়ছি।

এইটী আমাদের প্রধান দোষ ও প্রধান অভাব; অতএব এই বিষয়টী আমাদের আরো বিশেষ আলোচনা করা কৰ্ত্তব্য। ইহারই উপরে আমাদের জাতীয় উন্নতি অনেক নির্ভর করিতেছে।

আমরা এক্ষণে যে রূপ জীবন যাপন করিতেছি, ইহাতে আমরা সামাজিক মনুষ্য, ইহা কখনই বলা যাইতে পারে না। সমাজের শুভাশুভ বিষয়ে আমরা বিশেষ তত্ত্ব লই না; সমাজের কোন ব্যক্তি পুণ্য অনুষ্ঠান করিলে, কোন ব্যক্তি পাপাচারে রত হইলে, কোন ব্যক্তি অন্যায় রূপে কোন ব্যক্তি কর্ত্তৃক অত্যাচরিত হইলে বা বলাভাবে কোন সৎ পুরুষের দেশহিতকর কোন মহদুদ্দেশ্য সিদ্ধির বাধা জন্মিলে, আমদের তাহাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি বোধ হয় না। তজ্জনিত সমাজের কোন মঙ্গলামঙ্গলের বিষয়ে আমরা চিন্তা করি না। যাহা আমাদের গাত্রে অসিয়া প্রবল রূপে আঘাত না করে, তাহার প্রতি আমাদের দৃষ্টিপাত হয় না। আমাদের প্রথম সম্বন্ধ আপনার সহিত, দ্বিতীয় সম্বন্ধ পরিবারের সহীত, তৃতীয় সম্বন্ধ জীবিকার সহিত; তাহার পর আর কাহা্রো সহিত আমাদের কোন সম্বন্ধ আছে কিনা তাহা আমাদের গোচর নাই। তাহার এক বিশিষ্ট প্রমাণ এই যে, এপর্য্যন্ত আমাদের দেশের সাময়িক ও সংবাদ পত্রাদিতে ঐ রূপ সামাজিক বিষয় সকলের আলোচনা দৃষ্ট হয় না। কেবল মধ্যে মধ্যে কোন কোন মহাত্মা কর্ত্তৃক যে সকল সামাজিক সংস্কার ঘটনা বা তাহার প্রস্তাব উত্থিত হয়, সংবাদ পত্রাদি তাহারই সম্বন্ধে দুই চারি কথা বলিয়া, তাহা সেই সময়ের কাগজ, ইহারই মাত্র পরিচয় দেয়। লোকদিগেরও চর্চ্চা এই রূপ বিপথগামিনী হইয়াছে যে, তাঁহারা সংবাদ পত্রাদিতে কেবল ভিন্ন ভিন্ন দেশের যুদ্ধ বিবরণ, আশ্চৰ্য্য শিশু ও পশুর জন্ম বৃত্তান্ত, রাজকৰ্ম্মচারীদিগের নিয়োগ বা অবকাশের তালিকা প্রভৃতি কৌতূহল জনক বা স্বার্থসম্বন্ধীয় সংবাদ দেখেন, আর কিছুই দেখিতে চান না। নগরের বা গ্রামের কোন স্থানে বিজ্ঞাপন পত্র আলম্বিত হইলে, তাহা কোন দ্রব্য বিক্রয়ের তালিকা অথবা মিউনিসিপালিটী সংক্রান্ত কি না, লোকে প্রথমত এই দেখিতে তথায় আগমন করে; যদি তাহা সেরূপ না হয়, তবে আর, যাহাই হউক, তাহার সহিত তাহদের কোন সম্পর্ক আছে, এরূপ বিবেচনা হয় না।

আমাদের ত এই রূপ ভাব, এই রূপ আচরণ, তার যাহারা জাতীয় গৌরবে গৌরবান্বিত, তাহাদের ব্যবহার কি রূপ, তাহাও প্রণিধান করিয়া দেখা যাউক। আমাদের মধ্যে যাঁহারা সেই সকল দেশে গিয়াছিলেন তাঁহারা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন যে জাতীয় কোন একটী মহৎ কাৰ্য্যে তাহাদের সমুদায় লোকে আসিয়া যোগ দেয়,—চিকিৎসা শিল্প বিজ্ঞান প্রভূতির নিমিত্ত প্রত্যেক ব্যক্তি যথাশক্তি সাহায্য ও উৎসাহ দান করিয়া থাকে,—দূর দেশে বিদেশে অবস্থান করিয়াও তাহারা স্বজাতির প্রতি এক অবিচ্ছেদ্য স্নেহশৃঙ্খলেবদ্ধ থাকেন—স্বজাতির নামে তাঁহাদের আনন্দাশ্রু বিনির্গত হইতে থাকে। এই সকল দেখিয়া আমরা বিশিষ্ট রূপে জানিতে পারিতেছি যে, কেবল বসিয়া বসিয়া অবকাশ কালে দেশোন্নতির আলোচনা করিলে দেশোন্নতি হয় না। তজ্জন্য মনের প্রগাঢ় অভিনিবেশ আবশ্যক এবং দৃঢ় যত্ন ও অধ্যবসায় অবশ্যক। যাহারা ইতিহাসে কোন জাতির অভ্যুদয় বৃত্তান্ত পাঠ করিয়াছেন, তাহারাও দেখিয়াছেন যে, দেশের নিমিত্ত যাঁছাদের মরণে ভয় নাই, বন্ধনে ক্লেশ নাই, দুঃখ দারিদ্র্যে পরিতাপ নাই, রোগ শোকাদিতে সঙ্কপের ভঙ্গ নাই—এমন সকল লোকই সমাজের হিত—জাতির গৌরব—দেশের উন্নতি সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছেন। তাহারা পরের দুঃখ আপনার বলিয়া জ্ঞান করেন, সমাজের মঙ্গলের জন্য সমস্ত জীবন ক্ষেপণ করেন, শয়নে স্বপ্নে দেশের উন্নতি চিন্তা করেন। তাঁহারা এই সকল কার্য্যে সর্ব্বস্ব সমর্পণ করেন—স্বদেশের নিমিত্ত প্রাণ দেওয়াকেও তাঁহারা অতি সামান্য কৰ্ম্ম মনে করেন। এমন সকল মহাশয় ব্যক্তি বিপক্ষ হস্তে আপনার রক্তস্রোত বহাইয়া দিয়া সমাজে শান্তির স্রোত প্রবাহিত করিয়াছেন, কত অন্যায়াচরণ সহ্য করিয়া ন্যায় স্থাপন করিয়াছেন; কত কাল ধরিয়া অশেষ কষ্ট স্বীকার করিয়া তাঁহারা এক একটী রাক্ষস সমাজকে সহৃদয় জন সমাজে পরিণত করিয়া গিয়াছেন।

জাতীয় উন্নতির পক্ষে অন্যান্য দেশে যেমন ঘটিয়াছে,—এখানেও তাহাই ঘটিবে—তবে আমাদিগের উন্নতির সম্ভাবনা। তদ্ভিন্ন এদেশের উন্নতির আশা করা বৃথা। আমরা দুগ্ধফেণ-নিভ সুকোমল শয্যায় শয়ান থাকিয়া আপনাপন ধন মান সম্পদ ভাবিতে ভাবিতে এবং সুখের স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে কখনই জাতীয় উন্নতি সাধনে সমর্থ, হইব না। ইহা নিশ্চয়ই জানিতেছি—নিশ্চয়ই জানিতেছি। আমাদিগেরও শরীর হইতে ঘৰ্ম্ম ও রক্ত প্রবাহ্নিত হইবে—আমরাও এই দেশের ও সমাজের উন্নতির চেষ্টায় দুঃখ দারিদ্র্যের ভার লইয়া দেশ বিদেশে ভ্রমণ করিব—আমরাও সেই সকল বিদেশে বা স্বদেশে হয়ত খলস্বভাব লোকদিগের ষড়্‌ যন্ত্রে উৎপীড়িত হইব—হয়ত বা কোথাও কারারুদ্ধ হইয়া জীবনের অবশিষ্টাংশ বৃথায় অবসান করিব। আমরাও রৌদ্র রাষ্ট ঝটিকাদি সহ্য করিয়া—অনাহারে ক্লিষ্ট শরীর হইয়া—কখন সমুদ্রোপরি, কখন অরণ্য মধ্যে কেবল দেশের কল্যাণ ধ্যান করিতে করিতে রজনী অতিবাহিত করিব। যদি কখন এই দেশ এই জাতি পুনরুন্নত হয়, তাহার শুল্ক স্বরূপ এই সকল কষ্ট ক্লেশ আমাদিগকে সহ্য করিতেই হইবে, ইহার সন্দেহ নাই। এজন্য আমাদিগকে অকাতরে দিন যামিনী পরিশ্রম করিতে হইবে—শরীরের অস্থি গুলি পৰ্য্যন্ত দান করিতে হইবে এবং সহস্র বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে অগ্রসর হইতে হইবে। এতদ্ভিন্ন এতৎসদৃশ কার্য্যের অন্য কোন উপায় নাই; দেশোন্নতির জন্য কোন সুগম রাজবর্ত্ম প্রস্তুত হইতে পারে না।

সকল দেশেই দেশোন্নতির এই সকল উপায়। আমরা কি শুনি নাই যে, এক জন সম্রাট্‌ স্বয়ং ভিন্ন দেশে গিয়া পোত নিৰ্ম্মাণ করিতে শিক্ষা করিয়া স্বদেশীয়দিগকে তাহা শিখাইয়াছিলেন? আমরা কি জানি না যে, যে সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি−যাহা শৈশবাবধি আমাদের পরিচিত হইয়াছে, তাহার এক এক তত্ত্ব উদ্ভাবন করিতে কত শত লোকের সাহায্য এবং কত বিজ্ঞানবেত্তা পণ্ডিতের ২৷৩ শত বৎসরের অপ্রতিহত যত্ন আবশ্যক হইয়াছে। আমরা কি শুনি নাই যে, কোন লোকহিতব্ৰত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুকালে আপনার শরীরকে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদিগের শারীরস্থান তত্ত্ব পরীক্ষার নিমিত্ত খণ্ডিত বিখণ্ডিত হইতে দিয়া মহানন্দে স্বীয় অমূল্য জীবন ব্ৰত উদ্‌যাপন করিয়া ছিলেন? আমাদের দেশের উন্নতির পক্ষেও ঐ সকল উপায়; তদ্ভিন্ন অন্য উপায় নাই।

ভ্রাতৃগণ! ইহার জন্য তোমাদিগকে উত্থিত হইতেই হইবে। এই কাল—এই দেশ—এই কালের সমুদায় ঘটনাবলি—তোমাদিগকে উত্থিত হইতে বলিতেছে। তোমরা যদি স্বেচ্ছাপূর্বক এই ভারত মাতার উন্নতির নিমিত্ত বদ্ধপরিকর না হও, অন্য প্রকারে বাধ্য হইয়া তোমাদিগকে তাহা হইতে হইবে। যখন সকল দেশ সুসভ্যতার অালোকে সমুজ্জ্বলিত, ভারতবর্ষ কখনই দীন ও মলিন হুইয়া থাকিবে না। যখন অন্যান্য জাতি উন্নতি শিখরে অধিরোহণ করিতেছে—হিন্দুজাতি সকলের অধম হইয়া থাকিবে না, বিলুপ্ত হইয়াও যাইবে না। ইহার নিমিত্ত সহস্ৰ অনুকূল ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছি; যাহা প্রতিকূল বলিয়া আপাততঃ বোধ হয়, তাহাও অন্য প্রকারে অনুকূল ঘটনা বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। ভারতের কল্যাণ নিমিত্ত সকলে মুক্ত-হস্ত ও বদ্ধ-পরিকর হও, আর নিরস্ত থাকিলে চলিবে না। পূর্ব্বেই উল্লেখ করিয়াছি—এক কাল ছিল, যখন হিন্দুজাতি ভিন্ন আর কোন জাতি সভ্যতার স্বাদ জানিত না, যখন উন্নতি হউক বা না হউক, হিন্দুজাতিকে কাহারো সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়োজিত হইতে হইত না। সুতরাং সে সময়ে হিন্দুগণ কিছু কাল কোন নূতনতর উন্নতির সোপানে পদ নিঃক্ষেপ না করিলেও কতক অংশে এক প্রকার স্থিরপদে থাকিতে পারিয়াছিলেন। এখন আর সেরূপ থাকিবার যো নাই। এখন পৃথিবীর বহুল দেশে সভ্যতার আলোক বিকীর্ণ হইয়াছে এবং ঘটনা বশতঃ সেই সকল আলোক কিরণ এই ভারতবর্ষে—আমাদের গৃহাভ্যন্তরে—আসিয়া প্রকাশ পাইতেছে। জ্ঞান-ধর্ম্ম-সমুন্বত হিন্দুগণ চিরাস্বাদিত সভ্যতার সেই সকল প্রতিভাপুঞ্জ যেমন দেখিতেছেন; অমনি তাহার মৰ্ম্ম বুঝিতে সমর্থ হইতেছেন এবং কেহ বা তাহা গ্রহণ করিতে ব্যস্ত হইতেছেন। এই সময়ে, হিন্দুগণ! আর এক স্থানে সংস্থিত হইয়া। থাকিতে পার না। হয় অগ্রসর হও, নতুবা পশ্চাদ্বর্ত্তী হইতে হইবে। পশ্চাদ্বর্ত্তী হইয়াও সচ্ছন্দে থাকিতে পরিবে না, ঘরে বাহিরে সহস্র প্রকারে আঘাত ও নির্যাতন সহ্য করিতে হইবে। উদ্ভিদের বর্দ্ধন পক্ষে এই রূপ এক নিয়ম দেখা যায় যে, সে যদি আপনার মস্তকোপরি রৌদ্রের উত্তাপ প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে সে সেই উর্দ্ধ দিকেই উত্থিত হইতে থাকে এবং সুস্থ সবল ও সরল শরীরে শাখা পল্লবে সুশোভিত হয়। কিন্তু যদি আপনার মস্তকোপরি সূর্য্য-রশ্মি প্রাপ্ত না হয়, তাহা হইলে চতুষ্পার্শ্বের আর যে দিকে তাহা প্রাপ্ত হয়, সেই দিকেই সে বক্রভাবে উত্থিত হয় এবং যথাকথঞ্চিত রূপে সেই সূর্য্য কিরণ গ্রহণ করিয়া, কতকঅংশে বিশুদ্ধ কতক অংশে প্রফুল্লিত, এইরূপ বিকলাঙ্গ লাভ করে। ঠিক ইহাই এখন হিন্দু-সমাজের অবস্থা। হিন্দুগণ! তোমরা যদি তোমাদের সমাজের উন্নতি সাধন না কর, যদি ইহার নিমিত্ত তোমাদের হৃদয় মন চেষ্টা ও যত্ন প্রযুক্ত না হয়, তাহা হইলে তোমরা অকৰ্ম্মণ্য হইয়া কেবল পরপ্রত্যাশী ও পরভাগ্যোপজীবী হইবে। তাহা হইলে সুখ স্বচ্ছন্দতার অন্যে যে আদর্শ প্রদান করিবে তাহাই তোমাদের শিরোধাৰ্য্য হইবে;—আর তাহা হইলে ইহাও জানিবে যে, সেই অন্য দেশীয়—অন্য জাতীয় উন্নতির আদর্শ উদ্ভিদের পার্শ্ববর্ত্তী আলোকের ন্যায় তোমাদিগকে কেবল বিকলাঙ্গ করিবে—কখনই সুস্থ ও প্রকৃতিস্থ হইতে দিবে না—কখনই যথার্থ উন্নত হইতে দিবে না। ইহার উদাহরণ এখনই সহস্ৰ সহস্ৰ লক্ষিত হইতেছে। অনেকে বিজাতীয় সভ্যতা দর্শন করিয়া তল্লাভার্থ নিতান্ত লোলুপ হইতেছেন। তাঁহারা উন্নতি বলিয়া এমন কিছু গ্রহণ করিতেছেন, যাহা হিন্দুদিগের চিরকালের রুচি-বিরুদ্ধ; তাঁহারা মঙ্গলকর বলিয়া যাহা মনে করিতেছেন, হিন্দুগণ হয়ত বহুকালের পরীক্ষা দ্বারা তাহা নিশ্চয় অমঙ্গলকর বলিয়া জানিয়া রহিয়াছেন। এই জন্যই, যাঁহারা সেই সকল আদর্শকে আপনাদেরও সমুদায় হিন্দুদিগের আদর্শ করিতে চান, তাঁহারা হিন্দুদিগের পক্ষে বিকৃত-দর্শন ও গর্হণীয় হইয়া উঠিতেছেন। পরে এরূপ উদাহরণ আরো কত দেখা যাইবে, তাহার আশ্চৰ্য্য নাই। এমন অবস্থায় হিন্দুগণ! কোন্‌ দিকে গমন করিবেন? কেমন করিয়া আপনাদের উন্নতির স্পৃহা চরিতার্থ করিবেন? কি রূপে সমাজের শান্তি রক্ষা ও মঙ্গল বিধান করিবেন? ইহার নিমিত্ত আপনারা চিন্তা আলোচনা ও সর্ব্ব প্রযত্নে চেষ্টা করুন্‌, নতুবা আপনাদের পরস্পরের মধ্যে মতের ও ভাবের ও স্বাদের বিভিন্নতা ও অস্থিরতা প্রযুক্ত উত্তরোত্তর সমাজের আরো দুৰ্গতিই দর্শন করিতে হইবে। সংক্ষেপে এই বলা যাইতেছে, যে এক্ষণে আমাদের রাশি রাশি অভাব, তৎপুরণার্থ আমাদের বহুল শিক্ষার প্রয়োজন; সেই শিক্ষার এই উপযুক্ত সময়; যদি আমরা আত্ম চেষ্টা দ্বারা সুশিক্ষা প্রাপ্ত না হই, কুশিক্ষকে আমাদের সর্বনাশ করিবে।

আমার অত্যন্ত দুঃখোদয় হয়, যখন দেখি যে ইংলণ্ডীয়গণ আমাদের বিবাহ নিয়মের দোষ গুণ বিচার করিয়া থাকেন। আমাদের বিবাহ নিয়মের বাস্তবিক কয়েকটী দোষ আছে, তজ্জন্য আমরা বাক্য নিঃসারণ করিতে পারি না, যদি তাহা না থাকে, তাহা হইলে সমুদায় পৃথিবীকে আমরাই দেখাইতে পারি, বিবাহ কি গুরুতর ও পবিত্র বন্ধন। আমাদের আতিথ্যের যে নিয়ম আছে, তাহা আমরা অতি অল্পই পালন করিয়া থাকি; যদি তাহা যথাবৎ প্রতিপালিত হয়, তাহা হইলে আর কোন দেশের আতিথ্যের নিয়মকে তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বলিয়া আমাদের বোধ জন্মে না। আমাদের কতক খানি বৃথা মর্য্যাদা বোধ আছে এবং আমরা পরিশ্রমে কাতর; এই দুইটী দোষ যদি পরিত্যক্ত হয়, তাহা হইলে আমরা দেখাইতে পারি যে আমাদের গার্হস্থ্য নিয়ম ও পরিবার বন্ধন যথার্থ মনুষ্যোচিত, সুখকর ও মঙ্গলদায়ক। বিবিধ দোষে আমাদের হৃদয় ও মন সঙ্কুচিত সংক্ষোভিত ও মলিন হইয়া রহিয়াছে। আমাদের এক ক্রটি অন্য ক্রটির পোষকতা করতেছে—এক অভাব অন্য অভাবের উদ্ভব করিয়া দিতেছে—এই সকল দোষসমাকীর্ণ আমাদের এই হিন্দু সমাজের যদি দোষ সকল পরিত্যক্ত হয়, তাহা হইলে আমরা একবারেই উন্নত হইয়া দাড়াইতে পারি। পিতৃপিতামহ কর্ত্তৃক উপার্জ্জিত যে অমূল্য রত্নরাজি আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি, যদি উপযুক্ত হইয় তাহার সদ্ব্যবহার করিতে পারি, তাহা হইলেই আমরা উন্নত পদবীতে অধিরূঢ় হইয়া ক্রমশঃ উৎকৃষ্টতর গতি প্রাপ্ত হইতে পারিব, সন্দেহ নাই।

হে ভ্রাতৃণণ! অসীম আকাশের প্রতিচ্ছায়া একখানি ক্ষুদ্র অস্পষ্ট আদর্শে যেমন অতি অল্প মাত্র প্রতিফলিত হয়, সমুদায় হিন্দুজাতির ভাব ও অভাব সেইরূপ এই ক্ষুদ্র বক্তৃতার মধ্যে যৎসামান্য মাত্র পরিব্যক্ত হইল। কত কথা স্মরণ হইল না, কত কথা সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করিতে পারিলাম না। বিস্তীর্ণ সাগর সদৃশ হিন্দুজাতি চিন্তার চক্ষুতে আবির্ভূত, এ দিকে আপনার অক্ষমতা অনুভূত, এ অবস্থায় কেবল ক্ষোভ মাত্র মনোমধ্যে উদিত হইতেছে। কিন্তু যাঁহারা হিন্দুদিগের ভাব ও অবস্থা সম্যক পৰ্য্যালোচনা করিয়া দেখিরাছেন—এই মহতী মেলাতে যে সকল স্বদেশহিতৈষী মহাশয়েরা সমাগত হইয়াছেন—তাঁহাদের কিছু অপরিজ্ঞাত নাই। এখন সকলে বিবেচনা করুন, অামাদের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম কি? আমরা কি করিব? কোথায় যাইব? কি প্রকারে ভারত মাতার দুঃখ নিবারণ করিতে সমর্থ হইব? ইহার জন্য সকলে সচেষ্ট হও; যাহা কৰ্ত্তব্য বিবেচনা হইবে তাহাই করিব, এইরূপ প্রতিজ্ঞারূঢ় হও; সকলে এক-হৃদয় এক-প্রাণ হইয়া উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে পদ নিঃক্ষেপ কর। আমরা জাত্যভিমানপরবশ হইয়া কিছুই করিব না, আমরা ভারত মাতার এই সকল প্রত্যক্ষ দৃষ্ট নিদারুণ দুঃখের প্রতীকারের উপায় অন্বেষণ করিব—হিন্দুজাতির অসামান্য জ্ঞান ও গৌরবকে বিলোপ দশা হইতে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিব। প্রভাব বিস্তার আমাদের লক্ষ্য নহে, আমরা কেবল মনুষ্য নামের যোগ্য হইব, এই আকাঙ্ক্ষা করি। আমরা বিজয় পতাকা উড্‌ডীন করিতে অভিলাষী নহি—সুখে স্বচ্ছন্দে ঈশ্বর সেবায় জীবন যাত্রা নির্ব্বাহ করিব, এই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা কোন কুসংস্কারে বদ্ধ থাকিব না, কোন বৃথা অভিমানেরও দাসত্ব করিব না, সৰ্ব্ব প্রকারে মনুষ্যোচিত সুখ স্বচ্ছন্দ অবস্থায় কল্যাণের পথে বর্ত্তমান থাকিয়া মনুষ্য জীবনের সার্থকতা লাভ করিব এই আমাদের সঙ্কল্প। বিদেশীয় সাহায্য—অন্য জাতির উন্নতির উপাদান যতদূর আমাদিগকে স্বপদে প্রতিষ্ঠিত রাখে, তাহা গ্রহণ করিতে আমরা সঙ্কুচিত হইব না, কিন্তু আমরা চির দিন হিন্দুই থাকিব, হিন্দু নাম কদাচ পরিত্যাগ করিতে পারিব না। হিন্দু ভাব পরিত্যাগ করিলে আমরা মনুষ্যত্ব হইতেই কতক বঞ্চিত হইব। আমরা স্ত্রী শিক্ষার বিরোধী নহি, আমরা জানি যে সুশিক্ষা ব্যতীত স্ত্রীলোকেরা কখন সুরক্ষিত হইতে পারে না। কিন্তু আমরা সুশিক্ষাই চাই, কুশিক্ষার আমরা সম্পূর্ণ বিরোধী। আমাদের স্ত্রীলোকেরা যদি অবরোধ পরিত্যাগ করিয়া সতী লক্ষ্মীর ন্যায় স্বামীর বামপার্শ্ব শোভান্বিত করেন, তাহাই বা কেন অবাঞ্ছনীয় হইবে? কিন্তু যথেচ্ছাচারের সহিত আমাদের সম্মুখ সংগ্রাম। হিন্দুগণ সকল দেশের ভাষা ও সকল দেশের শাস্ত্র অধ্যয়ন করিবেন, তাহার সন্দেহ কি? কিন্তু তাঁহারা আপনাদের দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃত শাস্ত্রকে কখনই অবহেলা করিতে পরিবেন না। তদুভয় অগ্ৰেই আয়ত্ত করিতে হইবে, নতুবা তাঁহারা উন্নতির সুপথ প্রাপ্ত হইবেন না। যথার্থ সুখ, যথার্থ স্বচ্ছন্দতা, যথার্থ স্বাধীনতা, যথার্থ সভ্যতা, যথার্থ মঙ্গল, হিন্দুদিগের চিরদিনের আকাঙ্ক্ষিত ও উপভোগ্য বিষয়; এক দিনের নিমিত্তও আমরা তাহা গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হইব না ; এক দিনও আমরা উন্নতি-বিমুখ হুইব না; উন্নতির গণনায় কোন জাতির—কোন মনুষ্যের নিকট হীন প্রতিপন্ন হওয়া আর্য্য-ধৰ্ম্ম-সঙ্গত নহে, ইহা চির দিনই আমাদের স্মরণে থাকিবে।

বয়োবৃদ্ধ পিতৃগণ! বয়ঃকনিষ্ঠ ভ্রাতৃগণ! সমবয়স্ক বন্ধুগণ ! আইস আমরা সকলে সমবেত চেষ্টা দ্বারা আমাদের সমাজের উন্নতি—দেশের উন্নতি সংসাধন করি। আর্য্যদিগের উপাৰ্জ্জিত মহামূল্য জ্ঞান ধৰ্ম্মের উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করি—হিন্দু নামের চির গৌরব রক্ষা করি। কি আশ্চৰ্য্য! পিতৃপুরুষগণ আমাদিগকে অক্ষয় ধনে ধনী করিয়া গিয়াছেন এবং আমাদের উন্নতির উচ্চতর ও বহুকালস্থায়ী সুদৃঢ় সোপান বাঁধিয়াও দিয়া গিয়াছেন। আমরা কি ঐ সকল সম্পদ ভোগ করিতেও পারিব না? সৎপুত্রের ন্যায় পিতৃ পুরুষ দিগের আসন পরিগ্রহ করিতে পারিব না? কিসের বিঘ্ন! কিসের বাধা! যদি আমরা সেই উন্নত পুরুষদিগের সন্তান হইয়া ঐ চিরপ্রথিত সুদৃঢ় উচ্চ পদবীতে অধিরোহণ করিতে সঙ্কুচিত বা অসমর্থ হই, তাছা হইলে আমাদিগকে ধিক্‌। আর বিলম্ব করিবার কাল নাই—অারো নিরস্ত থাকিলে নিশ্চিত অমঙ্গল। চারিদিকে নানা প্রকার কোলাহল শ্রুত হওয়া যাইতেছে; নানা আশঙ্কা উপস্থিত হইতেছে।—উত্থান কর, জাগ্রত হও, হিন্দুনাম বিলুপ্ত বা কলঙ্কিত হইতে দিও না। বঙ্গ দেশের জন্য—ভারতবর্ষের জন্য—সমুদায় পৃথিবীর জন্য হিন্দু নাম—হিন্দু কীৰ্ত্তি—হিন্দু গরিমা উজ্জ্বলভাবে রক্ষা কর। চারিদিকের ঘটনাবলী অামাদিগকে এই জন্য কৃতসঙ্কল্প হইতে বলিতেছে। যদি আমরা এই কার্য্যে অগ্রসর হই, আমাদের দুর্ব্বল শরীরে বল আসিবে, নির্ব্বীৰ্য্য মনে বীর্য্য আসিবে, উদ্যম চেষ্টা সাহস কিছুরই অভাব থাকিবে না; সকল বিঘ্ন চলিয়া যাইবে, যাহা এক্ষণে প্রতিবন্ধকতাচরণ করিতেছে, আমরা কাৰ্য্যানুবর্ত্তী হই, সে সকলই আমাদের অনুকূল হইয়া আসিবে। সিদ্ধিদাতা ঈশ্বর আমাদের সহায় হইবেন।


Source :১৭৯৩ শকের হিন্দুমেলা

Writer Unknown

Bharat Amar Bharatbarsha [Bengali Nationalist Song]

ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো
তোমাতে আমরা লভিয়া জন্ম, ধন্য হয়েছি ধন্য গো

কিরীটধারিণী তুষারশৃঙ্গে সবুজ সাজানো তোমার দেশ
তোমার উপমা তুমিই তো মা, তোমার রুপের নাহি তো শেষ
সঘন গহন তমসা সহসা, নেমে আসে যদি আকাশ তোর
হাতে হাত রেখে মিলি একসাথে, আমরা আনিব নতুন ভোর

শক্তিদায়িনী দাও মা শক্তি, ঘুচাও দীনতা ভীরু আবেশ
আঁধার রজনী ভয় কি জননী, আমরা বাঁচাব এ মহাদেশ
রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, বীর সুভাষের মহান দেশ
নাহি তো ভাবনা করি না চিন্তা, হৃদয়ে নাহি তো ভয়ের লেশ…….


Writer : শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।

Lyric : অজয় দাস।

Singer : মান্না দে।