Howrar Mehathar-Jharudar Dharmaghat (হাওড়ায় মেথর-ঝাড়ুদার ধর্মঘট) 1928
Home » Law Library Updates » Howrar Mehathar-Jharudar Dharmaghat (হাওড়ায় মেথর-ঝাড়ুদার ধর্মঘট) 1928
হাওড়ায় মেথর-ঝাড়ুদার ধর্মঘট
মুজাফ্ফর আহ্মদ
From: আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০-১৯২৯: মুজাফ্ফর আহ্মদ
আমরা যখন কলকাতায় মেথর-ঝাড়ুদারদের প্রথম ধর্মঘটের (Strike) পরিচালনা করছিলেম সেই সময়ে কিংবা তার কিছুদিন আগে আমরা হাওড়ায় স্ক্যাভেঞ্জার্স ইউনিয়ন অফ বেঙ্গলের শাখা স্থাপনের চেষ্টাও শুরু করি। এর প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায় নামক একজন যুবক। এই শচীনন্দনের একটা ইতিহাস আছে। সে ১৯২১ সালে যশোহরের কোনো এক হাই স্কুলের ক্লাস সেভেন বা ক্লাস এইটের ছাত্র ছিল। এই সময়ে অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সে স্কুল ছেড়ে দেয়। তখন দেশে মিটিং-এর বান ডেকেছিল। এই ছোট ছেলেটিও সেই সকল সভায় বক্তৃতা দিতে লাগল। ফলে কিছু দিনের ভিতরে দেখা গেল যে সে একজন সুবক্তা হয়ে উঠেছে। লোকে তাকে বাহবা দিতে লাগল। কলকাতার দৈনিক কাগজে তার ফটোও ছাপা হলো। তার নীচে লেখা হলো “যশোহরের বালক বীর”। কিছু দিনের ভিতরেই অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এলো। তখন অন্য অনেক ছেলের মতো শচীনন্দন আর স্কুলে ফিরে গেল না। তার পিতা স্কুল মাস্টার ছিলেন। তিনি নিশ্চয় তাকে স্কুলে ফিরে যেতে অনেক চেষ্টা করে থাকবেন।
Read Next
শচীনন্দনের বয়স যত বাড়ছিল ততই সে নানান রকমের রাজনীতিক আড্ডায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ১৯২৬ সালে হিন্দু-মুস্লিম দাঙ্গার আবহাওয়ায় “অগ্রদূত” নাম দিয়ে সে একখানি সাপ্তাহিক কাগজও বার করেছিল। কবি নজরুল ইস্লাম এই কাগজে লিখেছিল :
“চারদিকে এই গুণ্ডা এবং বদমায়েশির আখড়া দিয়ে
রে অগ্রদূত চলতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?”
১৯২৮ সালে আমরা যখন কলকাতায় (Kolkata) মেথর-ঝাড়ুদারদের (Sweepers) নিয়ে ব্যস্ত তখন শচীনন্দন এলো আমার নিকটে। বলল, “আপনার যদি অনুমিত দেন তবে আমি হাওড়ায় এই ইউনিয়নের একটি শাখা গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারি। সেখানে আমার কিছু চেনা লোক আছেন। তাঁদের সাহায্য আমি পাব।” আমি বললাম বেশ তো দেখ না চেষ্টা করে। যদি সেখানে আমাদের শাখা গঠন করতে পার ভালোই তো।” শচী তার চেনা লোকেদের মধ্যে তিনজনের নাম আমায় বলেছিল। তাঁরা হলেন শিবপুরের-জীবনকৃষ্ণ মাইতি, অগম দত্ত ও প্রমোদ বসু। খোলাখুলিভাবে তাঁরা কংগ্রেসের কর্মী ছিলেন, আর গোপনে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী পার্টির সহিত তাঁদের সংস্রব ছিল। এই তিনজনের দু’জনের সহিত আমরা পরিচিত হয়েছিলেম। জীবনকৃষ্ণ মাইতি ও অগম দত্ত ২/১, আবদুল হালীম লেনে (তখন নাম ছিল ইউরোপীয়ান এসাইলাম লেন) আমাদের ওয়ার্কাস এন্ড পেজান্ট্স পার্টির আফিসে এসে জানিয়ে গিয়েছিলেন যে সেই সময় হতে তাঁরা আমাদের পার্টির সহিত কাজ করবেন। শচীনন্দনকে তাঁরা বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আমার দেখা করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। শচীন সঙ্গে গিয়ে প্রমোদ বসুর সঙ্গে আমি দেখা করেছিলাম। তিনি তখন প্রচুর উৎসাহ দেখিয়েছিলেন।
হাওড়ায় স্ক্যাভেঞ্জার্স ইউনিয়ন অফ বেঙ্গলের শাখা গঠিত হলো। আমরা তার একটি দু’টি মিটিংও হাওড়া ময়দানে করলাম। হাওড়ায় ঝাড়ুদারদের চেয়ে মেথরের সংখ্যা বেশী ছিল। সেখানকার সব পায়খানাই ছিল খাটা পায়খানা। মাটির তলায় কোনো ড্রেন তখন ছিল না। ১৯২৮ সালের তেতাল্লিশ বছর পরে আজ সবে মাত্র মাটির তলার ড্রেন প্রস্তুতের প্রচেষ্টা হাওড়ায় শুরু হয়েছে।
Read Next
হাওড়া মিউনিসিপালিটির (Howrah Municipality) নিকটে ইউনিয়নের তরফ হতে নিম্নলিখিত দাবীগুলি পেশ করা হয়েছিল।
- মেথর ও ঝাড়ুদারদের মাসিক দুই টাকা হিসাবে বেতন বাড়িয়ে দিতে হবে।
- বছরে সবেতনে ১৫ দিনের ক্যাজুয়েল ছুটি মঞ্জুর করতে হবে।
- বছরে একমাস সবেতনে প্রিভিলেজ ছুটি দিতে হবে।
- ঘুস নেওয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে।
- কোনো মেথর বা ঝাড়ুদারকে বরখাস্ত করতে হলে এক মাস আগে নোটিস দিতে হবে।
মেথর ও ঝাড়ুদারদের সংগঠিত করতে গিয়ে আমরা দেখেছি যে তারা নিজেদের ভিতরে কথা বলে হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দিয়ে ইউনিয়ন আফিসে খবর দেন? কলকাতার প্রথম ধর্মঘটে তাই হয়েছিল। কলকাতার দ্বিতীয় ধর্মঘটে অবশ্য, কয়েকদিন আগে স্থির করে ধর্মঘট করা হয়েছিল।
হাওড়ার মেথর-ঝাড়ুদারেরাও হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দিয়ে ইউনিয়ন আফিসে খবর পাঠালেন। ১৯২৮ সালের ৮ই এপ্রিল তারিখে তাঁরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আট নম্বর ওয়ার্ডের শানাপাড়ার মজুরেরা ধর্মঘট ঘোষণা না করেই ৬ই এপ্রিল হতে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ৮ই এপ্রিল (১৯২৮) তারিখে ছয়, সাত, আট, নয় ও দশ নম্বর ওয়ার্ডের মেথর ও ঝাড়ুদারেরা ধর্মঘট করেছিলেন। পরের দিন বাকী ওয়ার্ডগুলির, অর্থাৎ এক হতে পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের মজুরেরাও ধর্মঘটে যোগ দেন। তার মানে, হাওড়ার মোট তিন হাজার মেথর ও ঝাড়ু দারদের সকলেই ধর্মঘটে যোগ দিলেন।
Read Next
প্রথম দিন ৮ই এপ্রিল তারিখে শিবপুর ট্রামওয়ে টার্মিনাসের নিকটবর্তী শীল বস্তীতে একটা বড় ঘটনা ঘটে যায়। পুলিশের এংলো ইন্ডিয়ান সার্জেন্ট্রা ওখানে গিয়ে জোর-জবরদস্তী করে মেথরদের দিয়ে কাজ করাবার চেষ্টা করে। তাতে উত্যক্ত হয়ে মেথরানীরা পায়খানার বালতি সার্জেদর গায়ে ঢেলে দেয়। সার্জেন্ট্রা ওখানেই তাদের পোশাক (ইউনিফর্ম) খুলে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা বলতে বলতে গেল যে তাদের গুলি করার অনুমতি না দিলে তারা আর কখনও মেথরদের বস্তীতে যাবে না। খবর পেয়ে আমরা শীল বস্তীতে ছুটে গেলাম। দেখলাম পায়খানা মাখা পুলিস সার্জেদের ইউনিফর্মগুলি গিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করলাম।
এরপরে আমরা গেলাম প্রমোদ বসুর বাড়ীতে। গিয়ে দেখলাম তিনি মেথর ঝাড়ুদারদের ওপরে চটে লাল হয়ে আছেন। যে-প্রমোদ বসু ইউনিয়ন গঠন করার শুরুতে আমাদের উৎসাহ জুগিয়েছিলেন এই প্রমোদ বসু তিনি নন। তাঁর পাল্টে যাওয়ার কারণ আছে। আমরা কাজ শুরু করার পরে হাওড়া মিউনিসিপালিটিতে নির্বাচন হয়ে গিয়েছিল। তাতে কংগ্রেসীরা (National Congress) সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়েছিলেন। মিউনিসিপালিটির পরিচালনা কংগ্রেসের হাতেই এসেছিল। প্রমোদ বসু বললেন যে তাঁদের মাথায় অনেক বড় বড় প্লান ছিল। মেথর-ঝাড়ু দারগুলি তাঁদের কিছুই করতে দিল না। আমরা বুঝলাম প্রমোদ বসু আর আমাদের সঙ্গে নেই। কিন্তু জীবন মাইতি আর অগম দত্তের সম্বন্ধে আমাদের সে-ধারণা হয়নি।
ধর্মঘটের পর হতে আমাদের কাজ হলো বস্তীতে বস্তীতে ঘোরা আর বিকাল বেলা হাওড়া ময়দানে মেথর-ঝাড়ুদারদের মিটিং করা। এই মিটিংগুলির কোনো কোনো মিটিং-এ বটুকেশ্বর দত্তও আসতেন এবং বক্তৃতা দিতেন। তিনি হয়তো সব মিটিংয়ে যোগ দিয়ে থাকবেন, তবে বক্তৃতা দিয়েছেন কোনো কোনো মিটিং- এ। কিছু দিন আগে বটুকেশ্বরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। কানপুরে মানুষ হয়েছিলেন বলে হিন্দী লেখাপড়া জানতেন। আমরা তাঁকে দিয়ে হিন্দী ট্রেড ইউনিয়ন ইতিহার লিখিয়েছি। তিনি তখন কলকাতা-বড়বাজারের একটি দর্জি স্কুলে টেলরিং ও কার্টি এর কাজ শিখতেন, থাকতেন হাওড়ার (Howrah) এক মেসে। এই বটুকেশ্বর দত্তই সেনট্রাল এসেীতে ১৯২৯ সালের এপ্রিল মাসে ভগৎ সিং-এর সঙ্গে গিয়ে বোমা ছুঁড়েছিলেন।
১০ই এপ্রিল (১৯২৮) সকাল বেলা হাওড়া মিউনিসিপালিটি মেথর-ঝাড়ুদার ইউনিয়নের নেতাদের ডাকলেন। মিস্টার সি. এফ. এন্ড্রুজকেও ডাকলেন। কমিশনারদের মিটিংও ডাকলেন। আমাদের নিয়ে গিয়ে সেই মিটিং-এ বসালেন। আমাদের হাতে মিউনিসিপালিটির ছাপানো বাজেট দিলেন। যা বললেন তা স্তোক বাক্য, মেথর ঝাড়ুদারদের কোনো দাবী মেটানোর কথায় তাঁরা এলেন না। আমরা সভা থেকে বের হয়ে এলাম, কিন্তু চলে গেলাম না। আমাদের পরে এন্ড্রুজ সাহেব ডেকে নিলেন। তিনি কি বললেন, মজুরদের স্ট্রাইক ভেঙে দিতে বললেন কিনা তা জানিনা। তিনি ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন বটে, তবে স্ট্রাইক ভঙ্গকারী বলে তাঁর দুর্নাম রটে যাচ্ছিল। তিনি তখন সতর্ক হচ্ছিলেন। যাওয়ার সময়ে তিনি আমাদের বলে গেলেন, “তোমরা খানিকটা শক্ত হয়ে থেকো”।
হাওড়া টাউন হলটা মিউনিসিপালিটির বিল্ডিং ছিল। তার নীচের তলায় ছিল মিউনিসিপালিটির আফিস আর ওপরের হলে মিটিং হতো। ১০ই এপ্রিল (১৯২৮) তারিখে হাওড়া টাউন হলের হাতার ভিতরে বহু মেথর ও ঝাড়ুদার জড়ো হয়েছিলেন। হাওড়া মিউনিসিপালিটির সেক্রেটারি ছিলেন শ্রীযোগেশ দাশগুপ্ত। সম্ভবত ফরিদপুর জিলার লোক। তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভ্য ছিলেন। অতএব কংগ্রেসের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। আমিও তখন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির একজন সভ্য ছিলাম কিন্তু আমি যোগেশবাবুর মতো কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলাম না। কংগ্রেসের প্রাদেশিক কমিটির সভায় আমি তাঁর উলটো দিকে বসতাম। যোগেশবাবুই মিউনিসিপালিটির তরফ হতে এগিয়ে এসে সব কথা বলছিলেন, সব কিছু করতেন। এনড্রুজ সাহেব চলে যাওয়ার পরে যোগেশবাবু মোক্ষম দাওয়াই প্রয়োগ করলেন। জীবন মাইতি ও অগম দত্ত খোলাখুলিভাবে কংগ্রেসী-কর্মী ছিলেন।
ইউনিয়ন গঠন করার শুরু হতেই তাঁরা তাতে ছিলেন। মেথর-ঝাড়ু দারেরা তাঁদের চিনতেন। কংগ্রেস শৃঙ্খলার কথা বলে তিনি তাঁদের হাওড়া টাউন হলের হাতার ভিতরে মজুরদের সামনে এনে হাজির করলেন। তাঁদের সঙ্গে নিয়ে টাউন হলের গেটের ভিতরে ঢোকার সময় তিনি আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, “এবারে মজুরদের আপন লোকেরা এসেছেন। তাঁদের কথায় তারা ধর্মঘট তুলে নেবে।” আমাদের সামনে দিয়ে জীবন মাইতি ও অগম দত্ত মাটির দিকে মুখ করে চলে গেলেন। তাঁরা বধ্যভূমিতে নীত হচ্ছেন এমন ছিল তাঁদের অবস্থা। তাঁদের দেখে সেদিন আমাদের রাগ হয়নি, মায়া হয়েছিল। আসল কথায় আসি। জীবন মাইতি ও অগম দত্তের কথায়ও সেদিন হাওড়ার মেথর ঝাড়ু দারেরা তাঁদের ধর্মঘট তুলে নেননি। যোগেশবাবুকে হার মানতে হয়েছিল। এই যোগেশ দাসগুপ্ত বৃদ্ধ বয়সে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সমর্থক হয়েছিলেন। তাঁর ছোট ভাই নরেশ দাসগুপ্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদীর) একজন বিশিষ্ট নেতা।
ধর্মঘট চলেছিল। মজুরদের জোট কেউ ভাঙতে পারেনি। বিকালবেলা রোজই হাওড়া ময়দানের (Howrah Maidan) মিটিং শেষ হওয়ার পরেও কিছু সংখ্যক মজুর দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমরা তাঁদের বাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে স্থান ত্যাগ করতাম। একদিন বিকালে মিটিং শেষ হওয়ার পরে আমি বড় ক্লান্তি বোধ করছিলেম। আমি ধরণীকান্ত গোস্বামীকে অনুরোধ করলেম যে তিনি যেন ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যেকটি মজুরকে বাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে তার পরে চলে যান। আমি তাঁকে বলে গেলাম যে তেলকল ঘাট রোডে কিরণ মিত্রদের ফ্যাকটরি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন আফিসে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে আমি বিশ্রাম গ্রহণ করব। আমার চলে যাওয়ার পরেও ওখানে পনেরো-কুড়িজন মজুর দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধরণী গোস্বামী তাঁদের চলে যেতে বলছিলেন।
এমন সময়ে রোগা মতো একজন উকীল (তাঁর নাম মনে নেই) এসে মজুরদের সামনে বক্তৃতা দিতে লাগলেন। এই উকীল (Advocate)আবার মিউনিসিপপালিটির একজন কমিশনারও (Commissioner) ছিলেন। তিনি প্রাণপণে আমাদের গালি দিয়ে যাচ্ছিলেন। ধরণী গোস্বামী সহ্য করতে না পেরে মজুরদের বললেন তোমরা এই লোকটিকে মার।” হুকুম পেয়েই মজুরেরা উকীলবাবুকে মারতে লাগলেন, তাঁকে তাঁরা মাটিতে ফেলে দিলেন। উকীলবাবু কোনো রকমে ছুটে কোর্টে (Howrah Court) চলে গেলেন। খুব নিকটে ছিল কোর্ট। সেখানেই কোনো ম্যাজিস্ট্রেটকে পেয়েছিলেন, না, ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় গিয়ে দরখাস্ত করেছিলেন তা জানিনে, ধরণীকান্ত গোস্বামীর বিরুদ্ধে গিরেস্তারী পরওয়ানা (arrest warrant) ইসু হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়েই তিনি কলকাতা পালিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি ডক্টর প্রভাবতী দাসগুপ্তাকে খবর দিয়েছিলেন। তিনি ট্যাক্সী নিয়ে হাওড়ায় এলেন এবং আমাকে সেই ইউনিয়ন আফিস হতে খুঁজে বার করলেন। তাঁর কাছ থেকে সব খবর পেলাম। কি আর করব।
পরদিন সকালে নয়টার সময় হাওড়ার ময়দানে উপস্থিত হলাম। পৌঁছানো মাত্রই ওখানকার কজন লোক আমায় খবর দিলেন যে শচীনন্দনকে কয়েকজন যুবক খুব মেরেছে। শচীনন্দন কোথায় গেল সে খবর তাঁরা দিতে পারলেন না। আমি নিজেকে খুবই বিব্রত বোধ করছিলাম। কোথায় খুঁজে পাব এখন শচীনন্দনকে। কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম সে ধীরে ধীরে আমাদের দিকে হেঁটে আসছে। এসেই বলল কালকের উকীল বাবুর (Advocate) ছোট ভাইরা তাকে রাস্তায় একা পেয়ে বেদম প্রহার করেছে।
তখন থেকে একটা নূতন খেলা আরম্ভ হলো। মেথর-ঝাড়ুদারদের দু’চারজনকে রাস্তায় পেলে হিন্দু ভদ্রলোকের ছেলেরা তাদের ঘেরাও করে মারধর আরম্ভ করেছিলেন। এই জন্যই আমরা মিটিং শেষ হওয়া মাত্রই তাদের বাড়ী পাঠিয়ে দিতে চাইতাম। ক্রমেই মারধরের মাত্রা বাড়তে লাগল। খাটা পায়খানায় শহরে নাগরিকদের দুর্গতির কোনো শেষ ছিল না। আমরা নাগরিকদের নিকটে আবেদন জানাই যে তাঁরা দলবদ্ধভাবে মিউনিসিপালিটির আফিসে গিয়ে বলুন তাঁদের দুর্গতির কথা। তাতে তাঁরা রাজী নন। এই সময়ে আমরা খবর পেলাম যে টিকাপাড়ার মুসলমানেরাও দলবদ্ধভাবে মেথর ও ঝাড়ুদারদের আক্রমণ করবেন। তার প্রস্তুতি চলেছে।
আমরা টিকাপাড়ায় গিয়ে মুস্ইলম বাশিন্দাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করলাম। তাঁরা বললেন আমরা মিটিং ডেকে দিচ্ছি। আপনার সেই মিটিং-এর সামনে আপনাদের বক্তব্য বলুন। তাঁরা কথামতো মিটিং ডাকলেন। লোকও খুব জড়ো হয়েছিল সেই সভায়। সভাপতি হয়েছিলেন ওখানকার শরীফ সাহেব। তাঁর অল্প অল্প মদের নেশা হয়েছিল। তবে, কথাবার্তা ঠিকই বলছিলেন। টিকাপাড়ায় তখনকার দিনে এক ‘পাগল কোম্পানী’ ছিল। কেন যে তাঁদের পাগল কোম্পানী বলা হতো তা জানিনে। তাঁরা কয়েক ভাই ছিলেন, ব্যবসায় করতেন। বেশ কিছু সম্পত্তিরও মালিক ছিলেন তাঁরা। শরীফ সাহেব ছিলেন ভাইদের ভিতরে ছোট। বেশ লম্বা, সুপুরষ চেহারা। সভায় দাঁড়িয়ে আমিই প্রথম বললাম। বললাম, স্ট্রাইকের ফলে শত্রুরের বাশিন্দাদের চরম দুর্গতি হয়েছে। কিন্তু মেথর-ঝাড়ুদারদেরও স্ট্রাই ছাড়া প্রতিবাদ জানানোর অন্য কোনো উপায় নেই। তাঁদের সকলে ঘৃণা করেন, তাঁদের নালিশের কোনো প্রতিকার নেই।
হাওড়া মিউনিসিপালিটি ইচ্ছা করলেই ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেই ধর্মঘট মিটিয়ে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তান না করে তাঁরা ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টাই শুরু করেছেন। হাওড়ার বাশিন্দাদের নিকটে আমাদের একান্ত অনুরোধ ছিল যে তাঁরা দলবদ্ধভাবে মিউনিসিপালিটিতে যাবেন না। তাঁরা মারধর করে মেথরদের দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করাবেন। তা না করলে তাঁদের শিশু সন্তানেরা কলেরা ও অন্য ব্যাধিতে মরে যাবে।
মেথর ও ঝাড়ুদারেরাও বুঝেছিলেন যে স্ট্রাইক তাঁরা আর চালাতে পারবেন না। মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত নাগরিকেরা এটা সহজেই বুঝেছিলেন যে ট্যাক্স বাড়ালে তা তাঁদেরই বহন করতে হবে। তাঁদের বিচারে শ্রেণীস্বার্থই প্রবল হয়ে দেখা দিল। মেথরেরা আমাদের বললেন যে নাগরিকেরা তাঁদের ওপরে যে-ভাবে জুলুম আরম্ভ করেছেন তাতে ধর্মঘট ভেঙে যাবে। আপনাদের অনুরোধে নাগিরকদের একটি দলও মিউনিসিপাল আফিসে গেলেন না। তাঁরা ঠিক করেছেন আমাদের মারধর করে আমাদের দ্বারা কাজ করিয়ে নিবেন। এখন আপনারা যে-কোনো শর্তে ধর্মঘট মিটিয়ে নিন। আপনাদের সম্মানটা তবু বাঁচুক।
হাওড়ার মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষের সহিত আমাদের কথাবার্তা তো চলছিলই। ১৬ই এপ্রিল (১৯২৮) তারিখে হাওড়া ময়দানে মজুরদের নিয়ে বড় সভা করলাম। তাঁদের জানালাম কি কি পাওয়া যেতে পারে। তাঁরা আমাদের বললেন যে তাতেই আপনারা সমঝতা করে আসুন। ডক্টর মিস্ প্রভাবতী দাসগুপ্তা “স্ক্যাভেঞ্জার্স ইউনিয়ন অফ বেঙ্গলের” প্রেসিডেন্ট্ ছিলেন। তাঁকেই মিউনিসিপাল আফিসে সই করার জন্যে পাঠালাম। আমি মজুরদের সঙ্গে নিয়ে হাওড়া ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ বৃষ্টি এসে আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে গেল। তবুও আমরা ভিজা কাপড়েই দাঁড়িয়ে থাকলাম। রাত প্রায় দশটার সময় প্রভাবতী ময়দানে ফিরে এসে মজুরদের নিকটে মিটমাটের নিম্নলিখিত শর্তগুলি পড়ে শোনালেন :
(১) জুন মাসের প্রথম হতে প্রত্যেক মজুরের মাসে আট আনা হিসাবে বেতন বাড়বে;
(২) ধর্মঘট করার জন্যে কোনো মজুরের চাকরী যাবে না;
(৩) যে-সময়টা মজুরেরা ধর্মঘট করে কাজ করেননি তাঁরা সেই সময়ের পুরো বেতন পাবেন;
(৪) ১৭ই এপ্রিল (১৯২৮) ভোর বেলা হতে সমস্ত মজুরকে কাজে যোগ দিতে হবে;
(৫) মজুরেরা যতটা সময় কাজ করার জন্যে চুক্তিবদ্ধ আছে ততটা সময় তাদের কাজ করতে হবে;
(৬) মিউনিসিপালিটির তরফ হতে ডাক্তার পি. কে. ব্যানার্জি ও মিস্টার কে. এন. গাঙ্গলীকে এবং “স্ক্যাভেঞ্জার্স ইউনিয়ন অফ বেঙ্গলের” তরফ হতে ডক্টর মিস্ প্রভাবতী দাসগুপ্তা ও মিস্টার মুজফফর আদকে নিয়ে একটি সালিসি বোর্ড গঠন করা হলো। এই বোর্ড মজুরদের বিরোধগুলি সম্বন্ধে বিবেচনা করবেন। বলা বাহুল্য হাওড়া মিউনিসিপালিটির ভদ্রলোকেরা এই বোর্ডের সভা কখনও ডাকেননি।
এইভাবে হাওড়ার মেথর ও ঝাড়ুদারদের ধর্মঘটের সমাপ্তি ঘটেছিল। জীবনকৃষ্ণ মাইতি উনিশ শ ত্রিশের দশকে বিনা বিচারে বন্দী হয়েছিলেন। এই দশকের শেষ ভাগে মুক্তি পেয়েই তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে পার্টি দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরে তিনি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিলেন। দুশমনের ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার ফলে ১৯৭০ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে তার মৃত্যু হয়েছে। শুনেছি অগম দত্তও আমাদের পার্টির সঙ্গে ছিলেন। তিনি আর বেঁচে নেই। আশার করি শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায় আজও বেঁচে আছে। সে কখনও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে (Communist Party of India) যোগ দেয়নি। দীর্ঘকাল হতে সে বোধ হয় কোনো রাজনীতিতেই নেই। যখন আমি চলাফেরা করতে পারতাম তখন দু’একবার তার সঙ্গে পথে দেখা হয়েছে। সারের ব্যবসায় করছিল। ডক্টর মিস্ প্রভাবতী দাসগুপ্তা হায়দরাবদের মির্জা বাকের আশলীকে বিয়ে করে হায়দরাবাদে থাকেন, বেঁচে আছেন।
আমরা যখন স্ক্যাভেঞ্জার্স ইউনিয়ন অফ বেঙ্গল গঠন করেছিলেম তখন আমরা আশা করেছিলেম যে বাঙলা দেশের (যুক্ত বাঙলার) প্রত্যেক জিলা শহরে আমরা তার শাখাসমূহ গঠন করব। মেথর ও ঝাড়ুদারেরা অতি সহজে সংগঠিত হয়ে থাকেন, আর সংগ্রামে তাঁরা অটল। আমরা যদি বাঙলার প্রতি শহরে এই ইউনিয়নের শাখা গড়তে পারতাম তবে বাঙলার প্রতি শহরের সহিত আমাদের পার্টির, কমিউনিস্ট পার্টির পরিচয় ঘটে যেত। মেথর ও ঝাড়ুদারেরা এমন মজুর যাঁদের কাজে সহিত শহরের প্রতিটি লোকের যোগ রয়েছে। কিন্তু আমরা যা চাইছিলাম তা আমরা করতে পারিনি। সারা বাঙলার ছোটাছুটি করার মতো লোক আমাদের ছিল না, আর অর্থও ছিল না। সেই কালে মেথর ও ঝাড়ুদারের নিকট হতে টাকা যে তুলব সে রকম অবস্থা তাঁদের ছিল না। আমি আবার ছিলাম পুলিসের সর্বক্ষণের দৃষ্টি-জর্জরিত। যখন যাঁদের নিকইে যেতাম তাঁরা আমাকে নিয়ে বিব্রত বোধ করবেন, এমন ছিল আমার অবস্থা।
Go back to : আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০-১৯২৯: মুজাফ্ফর আহ্মদ