Date: 1st April 2025
বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি
বাংলার ইতিহাস, বাঙালিদের ইতিহাস এবং বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। আমরা এগুলোর উদাহরণ দেব। জয়ানন্দ মিশ্র যখন তাঁর চৈতন্য মঙ্গলে বলেন:
রাজা নাহি পালে প্রজা স্নেচ্ছের আচার।
দুই তিন চারি বর্ণে হইল একাকার।।
দেবতা ব্রাহ্মণ হিংসা করে ম্লেচ্ছ জাতি।
ক্ষেত্ৰী যুদ্ধে শক্তিহীন নাহি যতি সতী।।
তখন তিনি নদীয়ায় তার সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। বাংলার ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন। তিনি বাংলা নৃতাত্ত্বিকতা বা বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলছেন না।
আবার যখন কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর কবিতায় নদীয়া এবং নবদ্বীপ সম্পর্কে বলছেন, তখন তিনি বাংলার ইতিহাস নিয়ে কথা বলছেন।
“গঙ্গারে লইয়া জান আনন্দিত হইয়া
আসিয়া মিলিল গঙ্গা তীর্থ যে নদীয়া।
সপ্তদ্বীপ মধ্যে সার নবদ্বীপ গ্রাম।
একঅরাত্রি গঙ্গা তথা করিল বিশ্রাম।।”
বাংলার ইতিহাস
কমবেশি ৭০০ খ্রিষ্টাব্দে ভূরিশ্রেষ্টি এলাকার রাজা আনন্দদেবের কুমিল্লার ময়নামতির তাম্রশাসনে “বাঙ্গালা” শব্দের একটি প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন আমরা জানতে পারলাম যে একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ছিল যার নাম ছিল বাংলা। রাষ্ট্রকূট রাজবংশের ৩য় গোবিন্দ তার নেসারী তাম্রশাসনে (৮০৫ খ্রিষ্টাব্দ) “বাংলার রাজা” হিসেবে ধর্মপালের নাম উল্লেখ করেছেন।
বাংলা ভূমি চিহ্নিত করার পর আমরা বলতে পারি যে পূর্বে এই ভূমি বিম্বিসারের (৫৪৪-৪৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) মগধের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আলেকজান্ডার কখনও ইরানের বর্তমান সীমানা অতিক্রম করেননি, তাই এই মগধ বা বাংলার কোনও গ্রেসিও-রোমান বর্ণনা নেই।
রাজা শশাঙ্ক ৫৯৩ সালের দিকে স্বাধীন বাংলা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দ্বিতীয় গোপালের সময়, ভূরিশ্রেষ্ঠ সম্ভবত বাংলা রাজ্যের একটি প্রধান প্রদেশ ছিল। অথবা এটিও হতে পারে যে মগধের পূর্ব অংশ এবং ভূরিশ্রেষ্ঠ নিয়ে শশাঙ্কের অধীনে বাংলা সাম্রাজ্য গঠন হয়েছিল। তাঁর রাজ্য বর্তমান পাটনা থেকে শুরু হয়ে পূর্ব দিকে কামরূপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দক্ষিণে এটি বর্তমান ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
শশাঙ্ক তার রাজ্যকে গৌড় রাজ্য বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি কর্ণ সুবর্ণে (মুর্শিদাবাদ জেলা) তার রাজধানী স্থাপন করেন। কর্ণ সুবর্ণ ছিলেন দুর্যধনের অঙ্গ রাজ্য, যা তার বন্ধু কর্ণকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। আবার মঞ্জুশ্রী-মূলকল্পে চতুর্থ শতাব্দীতে বাংলায় গৌড় রাজ্যের অস্তিত্বের কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং শৈব রাজা লোক’র জন্ম বর্ধমানে বলা হয়েছে। মঞ্জুশ্রী-মূলকল্পে ‘বর্ধমান’ শব্দের উল্লেখ আছে। শশাঙ্ক তাঁর গৌড় রাজ্যে বাংলা পঞ্জিকা শুরু করেছিলেন। পাল ও সেন রাজারা তাদের নিজেদের গৌড়েশ্বর বলতেন।
রাজা লোক কর্তৃক নির্মিত দামোদর নদীর ধারে লোকনাথ শিব মন্দিরটি শশাঙ্ক জীর্ণোদ্ধার করেন। মুসলিম আক্রমণকারীরা বিশাল লোকনাথ মন্দিরটি ধ্বংস (1205 CE) করে, কিন্তু আক্রমণের আগেই ব্রাহ্মণরা লোক এবং শশাঙ্ক পূজিত শিব লিঙ্গটিকে মাটির নিচে চাপা দেয়। বর্তমানে এটি বর্ধমানের আলমগঞ্জ এলাকায় আবিষ্কৃত হয়েছে।
বাঙালিদের ইতিহাস
বাংলার ইতিহাস উল্লেখ এবং ব্যাখ্যা করার পর, আমরা বাঙালিদের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রবেশ করব। সাধারণত যারা বাংলায় বাস করে তারা যদি বাঙালি হয়, তবে পাঞ্জাবিদেরও বাঙালি হওয়া উচিত, আর মারোয়ারিদেরও তখন বাঙালি হওয়া উচিত। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। যখনই আমরা বলি আসলে বাঙালি কারা, তখন আমরা জাতিতত্ত্ব অনুসন্ধান করি। আমরা এখানে বাংলার প্রাচীনতম সময়ে কারা বাস করত এই সমস্যাটি সমাধান করতে আসিনি। প্রত্যেক বাবার একজন বাবা থাকে, অবশ্যই আনুমানিক প্রাচীনতমের আগে কেউ না কেউ থাকবে।
বস্তুনিষ্ঠ কল্পনা ছাড়া এই গৌড় ভূমির আদি বাসিন্দাদের মধ্যে কে প্রাচীনতম ছিল তা নির্ধারণের কোনও ভিত্তি নেই। আমরা ‘ইন্দো-আর্য’, অস্ট্রিক ইত্যাদি ভূ-রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করি না। যদি আমরা পশ্চিমা নৃতাত্ত্বিকদের বিশ্বাস করি, তাহলে আর্য, জার্মান, রোমান, গ্রীক, সাঁওতাল, নাগা সকল হোমো স্যাপিয়েন্স ৬০,০০০ থেকে ১০০,০০০ বছর আগে আফ্রিকা থেকে এসেছিল। মিঃ ডারউইনের মতে, আদিম যুগে বাঙালিরা ছিল বানর, এবং তারপর তারা আখ চাষ শিখে গুড় তৈরি করে। গুড় থেকেই গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় ইত্যাদি।
ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে কিছু বিকৃত বৈদিক মানুষ বাংলার অন্য বৈদিকদের দ্বারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মনু সংহিতায় গৌড়-বাংলা হল আর্যভূমি এবং মানুষের তাদের কাছ থেকে চরিত্র শিক্ষা নেওয়া উচিত। ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ নাটকে (৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) কৃষ্ণ মিশ্রও একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
শশাঙ্ক বৈদিক সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত লোকদের নিয়ে তাঁর ৬০০খ্রিস্টাব্দে গৌড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মগধের অশিক্ষিত মানুষদের মাগদ বলা হত। তারাও গৌড়-বাংলার নাগরিক হয়েছিল। সেই সময়েও বাংলায় সেইসব মানুষ বাস করত যারা এখন তফসিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃত। মহাভারতে উপজাতিরা ছিল ধনুর্ধরী এবং যোদ্ধা শ্রেণীর। ভূরিশ্রেষ্ঠে একসময় ধীবর এবং সর্দাররা রাজা ছিলেন। মগধের অশিক্ষিত মানুষদের ‘মাগদ’ (স্ত্রী লিঙ্গে মাগি শব্দের অর্থ অশিক্ষিত নারী, যদি সেই অশিক্ষিত মাগীটি ম্লেচ্ছর সাথে বাস করতো, তাহলে মুঘল আমলে তাকে ‘খানকি মাগী’ বলা হত) বলা হত। এই মাগদদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে চিটা-গুড়/গৌড়ের (বর্তমানে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম/চিটাইঙ্গা) কাছে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে (চিটাগাং) মগের মুলুক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
চট্টগ্রামের ভাষা অর্ধ মাগধী এবং প্রাকৃত মিশ্রিত ছিল, ইসলামী আগ্রাসনের পর প্রাকৃতের সাথে আরবি শব্দ মিশে যায়।
‘চাটগাঁইয়া বুলি’
- ইয়া-তুই হডে/কডে ? = অহে, তুমি কোথায়?
- ইত্তার তুই কডে/হডে? = এখন তুই কোথায়?
- আঁত্তে আর হ়াইত মনত ন হর, ফেট ৱরি গিয়্যই = আর খেতে ইচ্ছে করছে না, পেট ভরা
- তোঁয়ার লাইঅ আঁর ফেড ফুরের = তোমার অভাব অনুভব করছি
এখন আমরা বিশেষভাবে বাঙালি কারা এই ধারণাটি নিয়ে আলোচনা করব।
কিন্তু তার আগে আমরা তর্ক করব যে পাকস্থানী কারা? উত্তর পাকিস্তানীরা হল ভারতীয় আর্য। বাংলার বাঙালি কারা? উত্তর হল বাংলাদেশীরা হল পাকিস্তানী, যারা ভারতীয় ছিল। আমেরিকান কারা? স্পষ্টতই শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা, যারা সেই দেশের আদিবাসীদের হত্যা করেছিল এবং তাদের জমিতে বসতি স্থাপন করেছিল। এখন আমরা বলতে পারি যে জাতীয়তা এবং নাগরিকত্ব দুটি ভিন্ন ধারণা। বঙ্গবাসী গুজ্জররা হল গুজরাটি যারা শতাব্দী ধরে বাংলায় বাস করে, বাংলা বলে, মহল্লায় গুজরাটি সংস্কৃতি এবং সামাজিকতা, বিবাহ ইত্যাদি অনুসরণ করে…..ইত্যাদি।
তুরুগ (উত্তর আরব এবং তুরস্কের মানুষ), মুরুগ (নিম্ন আরব এবং পারস্যের মানুষ) এবং ফারেঙ্গিরা ভারতীয়ও নয়, বাঙালিও নয়। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ করেছিলেন, একজন বাঙালি মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন, সনাতন ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে কালীর পূজা করেছিলেন…… কিন্তু তবুও তিনি দেশী বাঙালি হতে পারেননি। তিনি সারা জীবন একজন সাহেব কবিয়াল ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
পূণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি— তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু ক’রে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালো-ছেলে ক’রে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ সয়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধ’রে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি ক’রে, মানুষ কর নি।
বাঙালিরা মানুষ হতে ব্যর্থ হয়েছে। কেন তিনি বাঙালিদের সম্পর্কে এত নেতিবাচক কথা লিখেছেন? সমগ্র ইউরোপ ধনী হওয়ার জন্য বাংলায় এসেছিল।
বখতিয়ার খিলজি মাল-এ-গণিমত এবং লুটের জন্য বাংলায় এসেছিলেন। চৈতন্য কি বাঙালি ছিলেন? অভয়চরণ ভক্তি বেদান্ত কি রবীন্দ্র মান অনুসারে সঠিক মানুষ হতে পারেন নি এবং কেবল বাঙালি ছিলেন?
স্যার আশুতোষ মুখার্জী তাঁর পিএইচডি ছাত্রদের বাংলায় থিসিস লিখতে বলেছিলেন এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মুড়ি ও নারিকেল খেতেন, কখনও স্যান্ডউইচ খাইনি, জার্মান অপেরা সঙ্গীত কখনও শোনেননি এবং তিনি কখনও ইউরোপও যাননি, তারা কি কেবল বাঙালিই থেকে গেলো, মানুষ হলো না?
তাই আমরা রবীন্দ্রনাথের কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমাদের থিসিস এবং আমাদের গভীর অহম সত্তার তৃপ্তির জন্য আমরা ধারণা করি যে, বাঙালিরা হলেন সেইসব মানুষ যারা বৈদিক সভ্যতার অংশ বহন করে, যারা মহান রাজা শশাঙ্কের রাজনৈতিক জগতে বাস করত, যারা নিজেদের ভূরিশ্রেষ্ঠ (বুদ্ধিমান/ মহান ব্যক্তি) বলে বর্ণনা করত এবং নিজেদের ভূরিশ্রেষ্ঠী (মহান ব্যবসায়ী) বলেও বর্ণনা করত।
যারা কালের গতিপথ অতিক্রান্ত কৃত্তিবাসের মহাকাব্যের সোমারাসে আচ্ছন্নে হয়ে, শ্রী চৈতন্যের চৈতন্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমগ্র ভারত কে প্লাবিত করেছিল, এবং বর্তমানে সমগ্র বিশ্বকে বৈষ্ণবযানের যাত্রী করে বাংলা দেশে টেনে আনছে তারা বাঙালি ।
বাঙালিরা দুইশত বৎসর নিজ রক্ত আহুতি দিয়ে বিদেশিক শক্তিকে পরাভূত করেছে, ফিরিয়ে এনেছে গৌড়ের ধ্রুপদী শান্তি। বাঙালি সত্তা প্রার্থীবতার উর্দ্ধে চৈতন্যের চেতনা হতে চাতকের মতো অম্রিত বিন্দু আস্বাদন করে।
বাংলা ভাষার ইতিহাস
বাংলা ভাষার অস্তিত্ত নিশ্চিত রূপে লিখিত বাংলার আগেথেকেই প্রচলিত ছিল। ললিতবিস্তারে (৪০০ খ্রি.) শাক্যমুনি গৌতম বিশ্বামিত্রের কাছ থেকে বাংলা অঙ্গ লিপি শিখেছিলেন (এখানে দেখুন)। আমরা জানি না যে তিনি বিশ্বামিত্র কলেজ থেকে বাংলা ভাষা শিখেছিলেন কিনা। আমরা সনাক্ত করেছি যে কৃষ্ণ মিশ্র (৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এর সময় একটি বাংলা উপভাষা ছিল, যা ভূরিশ্রেষ্ঠে প্রচলিত ছিল।
প্রাক-আধুনিক বাংলা (১০০০-১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিল বাংলা ভাষার বিকাশপর্ব, যেখানে সংস্কৃত, অপভ্রংশ ও দেশীয় উপাদানের সংমিশ্রণে একটি শক্তিশালী সাহিত্যভাষার জন্ম হয়। এই সময়ের ভাষা আধুনিক বাংলার তুলনায় অধিকতর লৌকিক ও পরিবর্তনশীল ছিল। শব্দগঠনে সংস্কৃত ও অপভ্রংশের প্রচুর প্রভাব থাকলেও ব্যাকরণগত কাঠামো এখনকার মতো সংহত হয়নি। প্রাক-আধুনিক বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মগুলির মধ্যে রয়েছে মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে), বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ (১৪শ শতক), কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’ (১৪শ শতক) ও মাধব কন্দলীর ‘কন্দলী রামায়ণ’ (১৩শ শতক)।
চর্যাপদের ভাষাকে (৯৫০-১০৫০ খ্রিস্টাব্দে) বাংলার প্রাচীনতম রূপ বলা হলেও, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়, এর ভাষা মৈথিলি, অপভ্রংশ ও পূর্ব প্রাকৃতের (Prakrit) মিশ্রণে গঠিত।
কৃত্তিবাসী রামায়ণ :
কাণ্ডারের প্রতি গঙ্গা মুক্তিপদ দিয়া।
গৌড়ের নিকটে গঙ্গা মিলিয়া আসিয়া।।
পদ্ম নামে এক মুনি পূর্ব্বমুখে যায়।
ভগীরথ বলি গঙ্গা পশ্চাৎ গোড়ায়।।
যোড়হাত করিয়া বলেন ভগীরথ।
পূর্ব্বদিক যাইতে আমার নাহি পথ।।
পদ্ম মুনি লয়ে গেল নাম পদ্মবতী।
ভগীরথ সঙ্গেতে চলিল ভাগীরথী।।
শাপবাণী সুরধুনী দিলেন পদ্মারে।
মুক্তপদ যেন নাহি হয তব নীরে।।
একবার গেল গঙ্গা ভৈরব-বাহিনী।
আরবার ফিরিলেন সাগর-গামিনী।।
এখানে আমরা বাংলা ভাষার ক্ষেত্র পাচ্ছি ।
গঙ্গারে লইয়া যান আনন্দিত হৈয়া।
আসিয়া মিলিল গঙ্গা তীর্থ যে নদীয়া।।
সপ্তদ্বীপ মধ্যে আর নবদ্বীপ গ্রাম।
এক রাত্রি গঙ্গা তথা করিল বিশ্রাম।।
রথে চড়ি ভগীরথ যান আগুয়ান।
আসিয়া মিলিলা গঙ্গা সপ্তগ্রাম স্থান।।
সপ্তগ্রাম তীর্থ জান প্রয়াগ সমান।
সেখান হইতে গঙ্গা করেন প্রয়াণ।।
৭০০ খ্রিস্টাব্দের তিরহুতা লিপি
𑒁𑒢𑒳𑒔𑓂𑒕𑒹𑒠 𑓑: 𑒮𑒦 𑒧𑒰𑒢𑒫 𑒖𑒢𑓂𑒧𑒞𑓁 𑒮𑓂𑒫𑒞𑒢𑓂𑒞𑓂𑒩 𑒁𑒕𑒱 𑒞𑒟𑒰 𑒑𑒩𑒱𑒧𑒰 𑒂 𑒁𑒡𑒱𑒏𑒰𑒩𑒧𑒹 𑒮𑒧𑒰𑒢 𑒁𑒕𑒱। 𑒮𑒦𑒏𑒹𑒿 𑒁𑒣𑒢–𑒁𑒣𑒢 𑒥𑒳𑒠𑓂𑒡𑒱 𑒂 𑒫𑒱𑒫𑒹𑒏 𑒕𑒻𑒏 𑒂𑒍𑒩 𑒮𑒦𑒏𑒹𑒿 𑒋𑒏 𑒠𑒼𑒮𑒩𑒏 𑒣𑓂𑒩𑒞𑒱 𑒮𑒾𑒯𑒰𑒩𑓂𑒠𑒣𑒴𑒩𑓂𑒝 𑒫𑓂𑒨𑒫𑒯𑒰𑒩 𑒏𑒩𑒥𑒰𑒏 𑒔𑒰𑒯𑒲।
অনুচ্চেদ 1: সভ মানব জন্মগতভাবে সবতন্ত্র আচি 𑒞𑒟𑒰 গরিমা আ অধিকার সমান আচি। সভাকেম— আপন–আপান বিজনতা আ বিবেক চাইকা আ’ওর সবকেম—একা দোসারক প্রতি সৌহার্দপুরীণ ব্যাবহার করবাকা চাহি।
মাইথিলিতে বিদ্যাপতির পদাবলী
“राधा कहि हंसी कहु, कृष्ण बिनु किछु काज नहि।
जहि केर मन महि बास करै हरि के संग जुड़ि।”
“রাধা কহি হাসি কহু, কৃষ্ণ বিনু কিছুও কাজ নহি।
যহি কের মন মহি বাস করই হরি কে সংগে জুড়ি।”
মাধব কন্দলীর ‘কন্দলী রামায়ণ’ (১৩শ শতক):
১৩ তম শতাব্দীর মাধাব কান্দালীর ভাষা আজও সহজেই বোধগম্য হতে পারে। আমরা বাংলা ভাষার প্রথম দিকের প্যাটার্ন পেতে নিরাপদে 400 বছর পিছনে ঠেলাঠেলি করতে পারি, যাতে নবম শতাব্দীর বাংলার একটা রূপ বুঝতে পারি ।

ত্রিহুত বা তিরহুট লিপিতে আমরা বাংলা লিপির উৎস দেখতে পাই। প্রকৃত থেকে নির্গত মাইথিলি পদে আমরা ভাষার গতি বুঝতে পাই , এবং কাঁদালির লেখায় বাংলার পূর্ণ রূপ দেখতে পাই। তাহলে ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ নাটকে (৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) যে ভূরিশ্রেষ্ঠার কথা বলা আছে , সেখানের বাঙালিরা কি ভাবে কথা বলতো তা একরকম বুঝতে পারি।
Tanmoy Bhattacharyya
