প্রেমবিবর্ত্ত-নবদ্বীপে পূর্ব্বাহ্ণলীলা-পীরিতি কিরূপ-ভক্তভেদে আচারভেদ-শ্রীএকাদশী
Home » Law Library Updates » Sarvarthapedia » Law » প্রেমবিবর্ত্ত-নবদ্বীপে পূর্ব্বাহ্ণলীলা-পীরিতি কিরূপ-ভক্তভেদে আচারভেদ-শ্রীএকাদশী
শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত Prema Vivarta of Jagadananda Pandit (INDEX PAGE)
১৫। শ্রীনবদ্বীপে পূর্ব্বাহ্ণ-লীলা
যখন যাহা মনে পড়ে গৌরাঙ্গ-চরিত ।
তাহা লিখি, হইলেও ক্রম-বিপরীত ॥১॥
Read Next
গৌরাঙ্গ-প্রসাদ
শচী আই একদিন বড় যত্ন করি’ ।
গোরা-অবশিষ্ট-পাত্র মোরে দিল ধরি’ ॥২॥
আমি খাইলাম যেন অমৃতাস্বাদন ।
গৌরাঙ্গ-প্রসাদ পাঞা আহ্লাদিত মন ॥৩॥
কভু কি করিব আমি সে ভূরি ভোজন ।
আবোনা অচ্যুত শাক আইয়ের রন্ধন ॥৪॥
Read Next
মোচাঘণ্ট, কচুশাক তাহে ফুলবড়ি ।
মানচাকি, নিম্বপটোল, আর দধি কড়ি ॥৫॥
গাদিগাছা গ্রামে গমন
ভোজনে আনন্দমতি চলিলাম হংসগতি
নিতাই-গৌরাঙ্গগণ-সঙ্গে ।
গঙ্গাতীরে তীরে যাই গাদিগাছা গ্রাম পাই
হরিনাম-গানের প্রসঙ্গে ॥৬॥
Read Next
গোবিন্দ মৃদঙ্গ বায় বাসুঘোষ নাম গায়
নাচে গদাধর বক্রেশ্বর ।
হরিবোল রব শুনি’ চারিদিকে হুলুধ্বনি
গোরাপ্রেমে সবে মাতোয়ার ॥৭॥
নাচ গান নাহি জানি তবু নাচি ঊর্দ্ধপাণি
গৌরাঙ্গ নাচায় অঙ্গে পশি’ ।
সুরতালবোধ নাই তবু নাচি, তবু গাই
কি জানি কি জানে গৌরশশী ॥৮॥
তথায় গোপগণের সেবা
গাদিগাছা গ্রামে আসি’ গোপপল্লী মাঝে পশি’
গোরা বলে, “শুন ভক্তগণ ।
দহকূলে বিচরণ আজি মোদের বিচরণ
বৃক্ষমূলে করিব শয়ন ॥৯॥
এই বটবৃক্ষতলে গাভী আছে কুতূহলে
গোপ-সহ করিব বিহার” ।
বহু গোপগণ আইল দধি, ছানা, ননী দিল
পথশ্রম না রহিল আর ॥১০॥
নৃসিংহানন্দের সঙ্গে প্রদ্যুম্ন আইল রঙ্গে
পুরুষোত্তমাচার্য্য মিলিল ।
মৃদঙ্গের বাদ্যরবে গৃহ ছাড়ি’ আইল সবে
হরিধ্বনি গগনে উঠিল ॥১১॥
ভীম গোপ
ভীম-নামে গোপ এক পরম উদার ।
অগ্রসর হঞা বলে, “শুনহ গোহার ॥১২॥
আমার জননী শ্যামা গোয়ালিনী ধন্যা ।
গঙ্গানগরের সাধু গোয়ালার কন্যা ॥১৩॥
শচী আইকে মা বলিয়া সদা করে সেবা ।
সে সম্পর্কে তুমি আমার মাতুল হইবা ॥১৪॥
চল মামা মোর ঘরে চল দল লঞা ।
শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন কর আনন্দিত হঞা ॥১৫॥
দধি-দুগ্ধ যাহা কিছু রাখিয়াছে মা ।
সব খাওয়াইব আর টীপে দিব পা” ॥১৬॥
গৌরাঙ্গের ভীমের গৃহে গমন ও ক্ষীর-ভোজন
নাছোড় হইয়া যবে সকলে ধরিল ।
গোপপ্রেমে গোরা গোপগৃহেতে চলিল ॥১৭॥
শ্যামা গোয়ালিনী তবে উলুধ্বনি দিয়া ।
সকলকে গোয়াল-ঘরে দিল বসাইয়া ॥১৮॥
শ্যামা বলে, “পণ্ডিত দাদা, কেমন আছেন মা ?” ।
“ভাল ভাল” বলি’ গোরা নাচাইল গা ॥১৯॥
কলাপাতা পাতি’ শ্যামা দেয় দধি-ক্ষীর ।
ভক্তগণ লঞা নিমাঞি ভোজনে বসে ধীর ॥২০॥
গোরাদহ
ভোজন সমাপি’ চলে সেই দহের তীরে ।
হরিগুণগান সবে করে ধীরে ধীরে ॥২১॥
রামদাস গোপ আসি’ করে নিবেদন ।
“দহের জল পান নাহি করে গাভীগণ ॥২২॥
দহে নক্র
নক্র এক ভয়ঙ্কর বেড়ায় দহের জলে ।
জল না খাইয়া গাভী ডাকে হাম্বা বোলে” ॥২৩॥
তাহা শুনি’ গোরা করে শ্রীনামকীর্ত্তন ।
কীর্ত্তনে আকৃষ্ট হইল নক্র তত ক্ষণ ॥২৪॥
নক্র নহে, দেবশিশু
শীঘ্র করি’ উঠিয়া আইল গোরা-পায় ।
পদস্পর্শে দেবশিশু পরিদৃশ্য হয় ॥২৫॥
কাঁদি’ সেই দেবশিশু করেন স্তবন ।
নিজ দুঃখকথা বলে আর করয় রোদন ॥২৬॥
নক্ররূপী দেবশিশুর পূর্ব্ব-বিবরণ
দেবশিশু বলে, “প্রভু দুর্ব্বাসার শাপে ।
নক্ররূপে ভ্রমি আমি, সর্ব্বলোক কাঁপে ॥২৭॥
কাম্যবনে মুনিবর শুতিয়া আছিল ।
চঞ্চলতা করি’ তার জটা কাটি নিল ॥২৮॥
ক্রোধে মুনি কহে, ‘তুমি পাঞা নক্ররূপ ।
চারি যুগ থাক কর্ম্মফল-অনুরূপ’ ॥২৯॥
তবে কাঁদিলাম আমি মিনতি করিয়া ।
দয়া করি’ মুনি মোরে কহিল ডাকিয়া ॥৩০॥
‘ওরে দেবশিশু যবে শ্রীনন্দনন্দন ।
নবদ্বীপে হইবেন শচীপ্রাণধন ॥৩১॥
তাঁহার কীর্ত্তনে তোমার শাপ-ক্ষয় হবে ।
দিব্য দেহ পেয়ে তবে ত্রিপিষ্টপ যাবে’ ॥৩২॥
দেবশিশুর স্তব
জয় জয় শচীসুত পতিতপাবন ।
দীনহীন অগতির গতি মহাজন ॥৩৩॥
চৌদ্দ ভুবনে ঘোষে সুকীর্ত্তি তোমার ।
আমা হেন অধমেরে করিলে উদ্ধার ॥৩৪॥
এই নবদ্বীপধাম সর্ব্বধামসার ।
এখানে হইলে কলি-পাবনাবতার ॥৩৫॥
কলিজীব উদ্ধারিবে দিয়া হরিনাম ।
আসিয়াছ, মহাপ্রভু তোমাকে প্রণাম ॥৩৬॥
চারি যুগ আছি আমি নক্ররূপ ধরি’ ।
এবে উদ্ধারিলে তুমি পতিতপাবন হরি ॥৩৭॥
তব মুখে হরিনাম পরম মধুর ।
স্থাবরাস্থাবর জীব তারিলে প্রচুর ॥৩৮॥
আজ্ঞা দেও যাই আমি ত্রিপিষ্টপ যথা ।
মাতা পিতা দেখি’ সুখ পাইব সর্ব্বথা” ॥৩৯॥
দেবশিশুর স্বরূপপ্রাপ্তি ও স্বস্থানে গমন
এত বলি’ প্রণমিয়া দেবশিশু যায় ।
কীর্ত্তনের রোল তবে উঠে পুনরায় ॥৪০॥
মধ্যাহ্ন হইল দেখি’ সর্ব্ব ভক্তগণ ।
প্রভুসঙ্গে মায়াপুর করিল গমন ॥৪১॥
মহাপ্রভুর এই লীলা যে করে শ্রবণ ।
ব্রহ্মশাপমুক্ত হয় সেই মহাজন ॥৪২॥
গোরাদহ দর্শনের ফল
সেই হইতে ‘গোরাদহ’ নাম পরচার ।
কালীয়দহের ন্যায় হইল তাহার ॥৪৩॥
সেই ‘দহ’ দর্শনে স্পর্শনে পাপক্ষয় ।
কৃষ্ণভক্তি লাভ হয় সর্ব্ববেদে কয় ॥৪৪॥
সেই গোপগণ দেখ মহাপ্রেমানন্দে ।
গৌরাঙ্গে করিল হেথা মামা বলি’ স্কন্ধে ॥৪৫॥
সকলে দেখিল প্রভুর পূর্ব্বাহ্ণ-বিহার ।
তঁহি মধ্যে দেখে রামকৃষ্ণ-লীলাসার ॥৪৬॥
দেখে গোবর্দ্ধন তথা মানস-জাহ্নবীপুলিন ।
কৃষ্ণগোচারণলীলা অতি সমীচীন ॥৪৭॥
গোপগণ জানিল যে নিমাঞি-চরিত ।
শ্রীনন্দনন্দনলীলা নিজ সমীহিত ॥৪৮॥
১৬। পীরিতি কিরূপ ?
শ্রীরঘুনাথদাস গোস্বামীর প্রশ্ন
একদিন রঘুনাথ স্বরূপে জিজ্ঞাসে ।
“কি বস্তু পীরিতি ? মোরে শিখাও আভাসে ॥১॥
বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস যে প্রীতি বর্ণিল ।
সে প্রীতি বুঝিতে মোর শক্তি না হইল ॥২॥
তাঁহাদের বাক্যে বাহ্যে বুঝে যে পীরিতি ।
সে কেবল স্ত্রীপুরুষের প্রণয়ের রীতি ॥৩॥
সে কেমনে পরমার্থ-মধ্যে গণ্য হয় ।
প্রাকৃত কামকে কেন অপ্রাকৃত কয় ॥৪॥
মহাপ্রভু তোমার সঙ্গে সেই সব গান ।
করেন সর্ব্বদা, তার না পাই সন্ধান ॥৫॥
প্রভু তব হস্তে মোরে করিল সমর্পণ ।
আজ্ঞা কৈল, ‘শিখাও একে নিগূঢ তত্ত্বধন’ ॥৬॥
প্রীতি-তত্ত্ব
কৃপা করি’ প্রীতিতত্ত্ব মোরে দেহ বুঝাইয়া ।
কৃতার্থ হইব মুঞি সংশয় ত্যজিয়া” ॥৭॥
উত্তর
স্বরূপ বলিল, “ভাই রঘুনাথদাস ।
নিভৃতে তোমারে তত্ত্ব করিব প্রকাশ ॥৮॥
আমি কিবা রামানন্দ অথবা পণ্ডিত ।
কেহ না বুঝিবে তত্ত্ব প্রভুর উদিত ॥৯॥
তবে যদি গৌরচন্দ্র জিহ্বায় বসিয়া ।
বলাইবে নিজতত্ত্ব সকৃপ হইয়া ॥১০॥
তখনই জানিবে হৈল সুসত্য প্রকাশ ।
শুনিয়া আনন্দ পাবে রঘুনাথদাস ॥১১॥
চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি কর্ণামৃত রায়ের গীতি
এসব অমূল্য শাস্ত্র জান ।
এসবে নাহিক কাম এসব প্রেমের ধাম
অপ্রাকৃত তাহাতে বিধান ॥১২॥
স্ত্রী-পুরুষ-বিবরণ যে কিছু তঁহি বর্ণন
সে সব উপমা মাত্র সার ।
প্রাকৃত-কাম-বর্ণন তাহে কৃষ্ণ-অদর্শন
অপ্রাকৃত করহ বিচার ॥১৩॥
কি পুরুষ, কিবা নারী, এ-তত্ত্ব বুঝিতে নারি
জড়দেহে করে রসরঙ্গ ।
সে গুরু কৃষ্ণের ভাণে শুদ্ধ-রীতি নাহি জানে
তাহার ভজন মায়ারঙ্গ ॥১৪॥
কৃষ্ণপ্রেম
কৃষ্ণপ্রেম সুনির্ম্মল যেন শুদ্ধ গঙ্গাজল
সেই প্রেমা অমৃতের সিন্ধু ।
নির্ম্মল সে অনুরাগ নাহি তাহে জড়দাগ
শুক্লবস্ত্র শূন্যমসীবিন্দু ॥১৫॥
শুদ্ধপ্রেম সুখসিন্ধু পাই তার এক বিন্দু
সেই বিন্দু জগৎ ডুবায় ।
জড়দেহে করি’ প্রীতি কেবল কামের রীতি
শুদ্ধ দেহ না হয় উদয় ॥১৬॥
দূরে শুদ্ধ প্রেমবন্ধ কপট প্রেমেতে অন্ধ
সেই প্রেমে কৃষ্ণ নাহি পায় ।
তবে যে করে ক্রন্দন স্বসৌভাগ্য প্রখ্যাপন
করে ইহা, জানিহ নিশ্চয় ॥১৭॥
কৃষ্ণপ্রেম যার হয় তার বিভাব চিন্ময়
অনুভাব দেহেতে প্রকাশ ।
সাত্ত্বিকাদি ব্যভিচারী চিন্ময়-স্বরূপ ধরি’
চিৎস্বরূপে করয়ে বিলাস ॥১৮॥
ধন্য সেই লীলাশুক কৃষ্ণ তারে হয়ে সম্মুখ
দিল ব্রজের অপ্রাকৃত রস ।
ছাড়িল এদেহ-রঙ্গ প্রাকৃতালম্বন-ভঙ্গ
তাহে কৃষ্ণ পরম সন্তোষ ॥১৯॥
বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস ছাড়ি’ পূর্ব্ব রসাভাস
অপ্রাকৃত-রসলাভ কৈল ।
পূর্ব্বে ছিল তুচ্ছ রস তাহা ছাড়ি’ প্রেমবশ
হঞা, কৃষ্ণভজন লভিল ॥২০॥
তুচ্ছ রসে মাতোয়ার না পায় কৃষ্ণরস-সার
নহে বংশীবদনালম্বন ।
জড় দেহে সাজে সাজ মাথায় তার পড়ে বাজ
প্রাণকীটের করয়ে ধারণ ॥২১॥
সেই তুচ্ছ রস ত্যজি’ শ্রীনন্দনন্দন ভজি’
দেখে কৃষ্ণ শ্রীবংশীবদন ।
নিজে গোপীদেহ পায় ব্রজবনে বেগে যায়
পূর্ব্ব সঙ্গ করয় ত্যজন ॥২২॥
তথাহি মহাপ্রভুর শ্লোক:—
‘ন প্রেমগন্ধোঽস্তি দরাপি মে হরৌ
ক্রন্দামি সৌভাগ্যভরং প্রকাশিতুম্ ।
বংশীবিলাস্যাননলোকনং বিনা
বিভর্ম্মি যৎ প্রাণপতঙ্গকান্ বৃথা’ ॥২৩॥
ব্রজগোপী ব্যতীত পীরিতি বুঝে না
পীরিতি পীরিতি পীরিতি বলে পীরিতি বুঝিল কে ? ।
যে জন পীরিতি বুঝিতে পারে ব্রজগোপী হয় সে ॥২৪॥
পীরিতি বলিয়া তিনটী আঁখর বিদিত ভুবন-মাঝে ।
যাহাতে পশিল সেই সে মজিল কি তার কলঙ্কলাজে ॥২৫॥
ব্রজগোপী হঞা চিদ্দেহ স্মরিয়া জড়ের সম্বন্ধ ছাড়ে ।
বিষয়ে আশ্রয়ে শুদ্ধ-আলম্বন পরকীয়-রস বাড়ে ॥২৬॥
ব্রজ বিনা কোথাও নাহি পরকীয়-ভাব ।
বৈকুণ্ঠ-লক্ষ্মীতে তার সদা অসদ্ভাব ॥২৭॥
সহজিয়ার প্রীতি
সংসারে যতেক পুরুষ, রমণী
আলম্বন-দোষে সদা ।
রক্তমাংসদেহে আরোপ করিতে
নারকী হয় সর্ব্বদা ॥২৮॥
অতএব তারা সহজ-সাধনে
কৃষ্ণকৃপা যবে পায় ।
জড়দেহগন্ধ ছাড়িয়া সে সব
চিদানন্দরসে ধায় ॥২৯॥
রায় রামানন্দের প্রীতি
প্রকৃত সহজ শ্রীকৃষ্ণভজন
করে রামানন্দ রায় ।
সুবৈধ সাধনে এ জড দেহেতে
সুযুক্ত বৈরাগ্য ভায় ॥৩০॥
বিশুদ্ধ দেহেতে ব্রজে কৃষ্ণ ভজে
মহাপ্রভু-কৃপা পাঞা ।
নাটকাভিনয়ে দেবদাসীশিক্ষা
সঙ্গদোষশূন্য হঞা ॥৩১॥
প্রীতি-শিক্ষায় অধিকার কাহার ?
রামানন্দ বিনা তাহে অধিকার
কেহ নাহি পায় আর ।
পরস্ত্রী-দর্শন স্পর্শন, সেবন
বুদ্ধি হৃদে আছে যার ।
পীরিতি শিক্ষায় জানিবে নিশ্চয়
নাহি তার অধিকার ॥৩২॥
স্ত্রীপুরুষবুদ্ধি থাকিতে প্রীতিসাধন অসম্ভব
কভু এ সংসারে স্ত্রী-পুং-ব্যবহারে
না হয় পীরিতি-ধন ।
চর্ম্মসুখ যত অনিত্য নিয়ত
নহে নিত্য সংঘটন ॥৩৩॥
গোপীভাব ধরি’ চিদ্ধর্ম্ম আচরি’
পীরিতি সাধিবে যেই ।
স্ত্রী-পুং-ব্যবহার নাহিক তাহার
ভিতরে গোপিনী সেই ॥৩৪॥
বাহিরে সজ্জন ধর্ম্ম-আচরণ
আমরণ বৈধাচার ।
অন্তরেতে গোপী চিত্তে কৃষ্ণ সেবে
কেবল পীরিতি তার ॥৩৫॥
‘যঃ কৌমার হর’ ইত্যাদি কবিতা
কেবল উপমাস্থল ।
নায়ক-নায়িকা চিৎস্বরূপ হঞা
কৃষ্ণ ভজে সুনির্ম্মল ॥৩৬॥
জড়েতে এই ভাব আরোপ, নরক—কলির ছলনা
কেহ যদি বলে ইহা আরোপ চিন্তায় ।
পরপুরুষেতে কৃষ্ণভজন উপায় ॥৩৭॥
চৈতন্য আজ্ঞায় আমি একথা না মানি ।
জড়েতে এরূপ বুদ্ধি নরক বলি’ মানি ॥৩৮॥
জড়দেহে চিদারোপ, সঙ্গ তুচ্ছ অতি ।
তাহে কৃষ্ণভাব আনা, সমূহ দুর্ম্মতি ॥৩৯॥
কলির ছলনা এই জানিহ নিশ্চয় ।
ইহাতে বৈষ্ণব-ধর্ম্ম অধঃপথে যায় ॥৪০॥
সুকৃতি পুরুষ মাত্র উপমা বুঝিয়া ।
স্বীয় অপ্রাকৃতদেহে কৃষ্ণ ভজে গিয়া ॥৪১॥
চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি আদি মহাজন ।
পূর্ব্ববুদ্ধি দূরে রাখি’ করিল ভজন ॥৪২॥
সে সবার শেষ বাক্য চিন্ময়ী পীরিতি ।
আছে তবু নাহি বুঝে দুষ্কৃতির রীতি ॥৪৩॥
রঘুনাথ, এ বিষয়ে করহ বিচার ।
তোমা হেন ভক্ত প্রচারিবে সদাচার ॥৪৪॥
এ বিষয় একবার প্রভুকে জানাঞা ।
চিত্ত দৃঢ় করি’ লও, দৃঢ় কর হিয়া” ॥৪৫॥
তবে রঘুনাথ শ্রীমৎ প্রভুপদে গিয়া ।
ঠারে ঠোরে জিজ্ঞাসিল বিনীত হইয়া ॥৪৬॥
প্রভু তারে আজ্ঞা দিল আমার সম্মুখে ।
রঘুনাথ আজ্ঞা পেয়ে ভজে মনসুখে ॥৪৭॥
শ্রীরঘুনাথ-প্রতি শ্রীমন্মহাপ্রভুর আজ্ঞা ঃ—
“গ্রাম্য কথা না শুনিবে, গ্রাম্য বার্ত্তা না কহিবে ।
ভাল না খাইবে, আর ভাল না পরিবে ॥৪৮॥
অমানী, মানদ, কৃষ্ণনাম সদা লবে ।
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ-সেবা মানসে করিবে” ॥৪৯॥
এই আজ্ঞা পাঞা রঘু বুঝিল তখন ।
পীরিতি না হয় কভু জড়েতে সাধন ॥৫০॥
মানসেতে সিদ্ধদেহ করিয়া ভাবন ।
সেই দেহে রাধানাথের করিবে সেবন ॥৫১॥
অমানী মানদ ভাবে অকিঞ্চন হঞা ।
বৃক্ষ হেন সহিষ্ণুতা আপনে করিয়া ॥৫২॥
বাহ্যদেহে কৃষ্ণনাম সর্ব্বকাল গায় ।
অন্তর্দেহে থাকে রাধাকৃষ্ণের সেবায় ॥৫৩॥
ভাল খাওয়া, ভাল পরা পরিত্যাগ করি’ ।
প্রাণবৃত্তি দ্বারা জড়দেহযাত্রা ধরি’ ॥৫৪॥
মর্কট-বৈরাগী
এই জড়দেহে রাধাকৃষ্ণ বুদ্ধ্যারোপ ।
মর্কট বৈরাগী করে সর্ব্বধর্ম্ম লোপ ॥৫৫॥
প্রভু বলিয়াছেন, “মর্কট বৈরাগী সে জন ।
বৈরাগীর প্রায় থাকি’ করে প্রকৃতি-সম্ভাষণ” ॥৫৬॥
বিশুদ্ধ বৈরাগী
বিশুদ্ধ বৈরাগী করে নাম সঙ্কীর্ত্তন ।
মাগিয়া খাইয়া করে জীবন-যাপন ॥৫৭॥
বৈরাগী হইয়া যেবা করে পরাপেক্ষা ।
কার্য্যসিদ্ধি নহে, কৃষ্ণ করে উপেক্ষা ॥৫৮॥
বৈরাগী হইয়া করে জিহ্বার লালস ।
পরমার্থ যায়, আর হয় রসের বশ ॥৫৯॥
বৈরাগী করিবে সদা নাম-সঙ্কীর্ত্তন ।
শাক-পত্র-ফল-মূলে উদর ভরণ ॥৬০॥
জিহ্বার লালসে যেই সমাজে বেড়ায় ।
শিশ্নোদরপরায়ণ কৃষ্ণ নাহি পায় ॥৬১॥
১৭। ভক্তভেদে আচারভেদ
আর দিনে শ্রীস্বরূপ রঘুনাথে কয় ।
“তোমারে নিগূঢ় কিছু কহিব নিশ্চয়” ॥১॥
ভজনবিহীন-ধর্ম্ম কেবল কৈতব
যে বর্ণেতে জন্ম যার যে আশ্রমে স্থিতি ।
তত্তদ্ধর্ম্মে দেহযাত্রা এই শুদ্ধ নীতি ॥২॥
এইমতে দেহযাত্রা নির্ব্বাহ করিয়া ।
নিরন্তর কৃষ্ণ ভজে একান্ত হইয়া ॥৩॥
সেই সে সুবোধ, সুধার্ম্মিক, সুবৈষ্ণব ।
ভজনবিহীন-ধর্ম্ম কেবল কৈতব ॥৪॥
কৃষ্ণ নাহি ভজে, করে ধর্ম্ম-আচরণ ।
অধঃপথে যার তার মানব-জীবন ॥৫॥
গৃহী, ব্রহ্মচারী, বানপ্রস্থ বা সন্ন্যাসী ।
কৃষ্ণভক্তিশূন্য অসম্ভাষ্য দিবানিশি ॥৬॥
সম্বন্ধজ্ঞানলাভ ও যুক্ত-বৈরাগ্য-আশ্রয়
সকলেই করিবেন যুক্ত-বৈরাগ্য-আশ্রয় ।
কৃষ্ণ ভজিবেন বুঝি’ সম্বন্ধ নিশ্চয় ॥৭॥
সম্বন্ধনির্ণয়ে হয় আলম্বন বোধ ।
শুদ্ধ-আলম্বন হৈলে হয় প্রেমের প্রবোধ ॥৮॥
প্রেমে কৃষ্ণ ভজে সেই বাপের ঠাকুর ।
প্রেমশূন্য জীব কেবল ছাঁচের কুকুর ॥৯॥
কৃষ্ণভক্তি আছে যার বৈষ্ণব সে জন ।
গৃহ ছাড়ি’ ভিক্ষা করে, না করে ভজন ।
বৈষ্ণব বলিয়া তারে না কর গণন ॥১০॥
অন্য দেব-নির্ম্মাল্যাদি না করে গ্রহণ ।
কর্ম্মকাণ্ডে কভু না মানিবে নিমন্ত্রণ ॥১১॥
গৃহী ও গৃহত্যাগী-বৈষ্ণবের আচার
গৃহী গৃহত্যাগী ভেদে বৈষ্ণব-বিচার ।
দুঁহ ভক্তি-অধিকারী পৃথক্ আচার ॥১২॥
দুঁহার চাহিয়ে যুক্ত-বৈরাগ্য বিধান ।
সুজ্ঞান, সুভক্তি দুঁহার সমপরিমাণ ॥১৩॥
গৃহস্থ-বৈষ্ণবের কৃত্য
গৃহস্থ-বৈষ্ণব সদা স্বধর্ম্মে অর্জ্জিবে ।
আতিথ্যাদি সেবা যথাসাধ্য আচরিবে ॥১৪॥
বৈধপত্নী সহবাসে নহে ভক্তি হানি ।
সার্ষপ সুতৈল ব্যবহারে দোষ নাহি মানি ॥১৫॥
দধি দুগ্ধ স্মার্ত্ত-উপচরিত আমিষ ।
যুক্ত-বৈরাগীর হয় গ্রহণে নিরামিষ ॥১৬॥
গৃহস্থ-বৈষ্ণব সদা নামাপরাধ রাখি’ দূরে ।
আনুকূল্য লয়, প্রাতিকূল্য ত্যাগ করে ॥১৭॥
ঐকান্তিক নামাশ্রয় তাহার মহিমা ।
গৃহস্থ বৈষ্ণবের নাহি মাহাত্ম্যের সীমা ॥১৮॥
পরহিংসা ত্যাগ, পর-উপকারে রত ।
সর্ব্বভূতে দয়া গৃহীর এইমাত্র ব্রত ॥১৯॥
গৃহত্যাগী বা বৈরাগী বৈষ্ণবের কৃত্য
বৈরাগী বৈষ্ণব প্রাণবৃত্তি অঙ্গীকরি’ ।
অসঞ্চয় স্ত্রীসম্ভাষণশূন্য, ভজে হরি ॥২০॥
এইরূপ আচারভেদে সকল বৈষ্ণব ।
কৃষ্ণ ভজি’ পায় কৃষ্ণের অপ্রাকৃত বৈভব ॥২১॥
বৈষ্ণবের কুটীনাটী নাই
গৃহী হউক ত্যাগী হউক ভক্তে ভেদ নাই ।
ভেদ কৈলে কুম্ভীপাকে নরকেতে যাই ॥২২॥
মূল-কথা, কুটীনাটী ব্যবহার যার ।
বৈষ্ণবকুলেতে সেই মহাকুলাঙ্গার ॥২৩॥
সরল ভাবেতে গঠি’ নিজ ব্যবহার ।
জীবনে মরণে কৃষ্ণভক্তি জানি সার ॥২৪॥
কুটীনাটী কপটতা শাঠ্য কুটীলতা ।
না ছাড়িয়া হরি ভজে, তার দিন গেল বৃথা ॥২৫॥
সেই সব ভাগবত কদর্থ করিয়া ।
ইন্দ্রিয় চরাঞা বুলে প্রকৃতি ভুলাইয়া ॥২৬॥
ভাগবত-শ্লোক যথা ঃ—
অনুগ্রহায় ভক্তানাং মানুষং দেহমাশ্রিতঃ ।
ভজতে তাদৃশীঃ ক্রীড়া যাঃ শ্রুত্বা তৎপরো ভবেৎ ॥২৭॥
লম্পট পাপিষ্ঠ আপনাকে কৃষ্ণ মানি’ ।
কৃষ্ণলীলা অনুকৃতি করে ধর্ম্মহানি ॥২৮॥
শুদ্ধভক্তের রাধাকৃষ্ণের সেবা
শুদ্ধভক্ত ভক্তভাবে চিৎস্বরূপ হঞা ।
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ সেবে সখীভাব লঞা ॥২৯॥
কৃষ্ণভাবে তৎপর হয় যে পামর ।
কুম্ভীপাক প্রাপ্ত হয় মরণের পর ॥৩০॥
অন্তরঙ্গ ভক্তি দেহে নহে—আত্মায়
অন্তরঙ্গ ভক্তি মনে, দেহে কিছু নয় ।
কুটীনাটী বলে মূঢ় আচরণ হয় ॥৩১॥
সেই সব অসৎসঙ্গ দূরে পরিহরি’ ।
কৃষ্ণ ভজে শুদ্ধভক্ত সিদ্ধদেহ ধরি ॥৩২॥
কৃষ্ণই পুরুষ, আর সব প্রকৃতি
ভক্তসব প্রকৃতি হইয়া মজে কৃষ্ণ পায় ।
পুরুষ একলে কৃষ্ণ, দাস মহাশয়” ॥৩৩॥
রঘুনাথদাস তবে বিনীত হইয়া ।
স্বরূপেরে নিবেদন করে দু’হাত জুড়িয়া ॥৩৪॥
“বল প্রভু, আছে এক জিজ্ঞাস্য আমার ।
স্বধর্ম্মবিহীনভক্তি সর্ব্বভক্তিসার ॥৩৫॥
গৃহস্থ ও স্বধর্ম্ম
তবে কেন গৃহস্থ থাকিবে স্বধর্ম্মেতে ।
স্বধর্ম্ম ছাড়িয়া ভক্তি পারে ত’ করিতে” ॥৩৬॥
স্বরূপ বলে, “শুন, ভাই, ইহাতে যে মর্ম্ম ।
বলিব তোমাকে আমি শুদ্ধভক্তি ধর্ম্ম ॥৩৭॥
স্বধর্ম্মে জীবনযাত্রা সহজে ঘটয় ।
পরধর্ম্মে কষ্ট আছে, স্বাভাবিক নয় ॥৩৮॥
স্বধর্ম্মে ভক্তির অনুকূল যাহা হয় ।
তাই ভক্তিমান্ জন গ্রহণ করয় ॥৩৯॥
যাহা যখন ভক্তি-প্রতিকূল হঞা যায় ।
তাহা ত্যাগ করিলে ত’ শুদ্ধভক্তি পায় ॥৪০॥
অতএব স্বধর্ম্মনিষ্ঠা চিত্ত হইতে ত্যজি’ ।
ভক্তিনিষ্ঠা করিলেই সাধুধর্ম্ম ভজি’ ॥৪১॥
স্বধর্ম্মত্যাগের নাম নিষ্ঠাপরিহার ।
নিয়মাগ্রহ দূর হইলে হয় বৈষ্ণব আচার ॥৪২॥
কৃষ্ণস্মৃতি বিধি, কৃষ্ণবিস্মৃতি নিষেধ
নিরন্তর কৃষ্ণস্মৃতি মূলবিধি ভাই ।
শ্রীকৃষ্ণবিস্মৃতি যাহে নিষেধ মূল তাই” ॥৪৩॥
তবে রঘুনাথ বলে, “কথা এক আর ।
আজ্ঞা হয় শুনি যাহে বৈষ্ণব-বিচার ॥৪৪॥
শ্রীঅচ্যুতগোত্র ও স্বধর্ম্ম
শ্রীঅচ্যুতগোত্র বলি’ বৈষ্ণব-নির্দ্দেশ ।
ইহার তাৎপর্য্য কিবা, ইথে কি বিশেষ” ॥৪৫॥
স্বরূপ বলে, “গৃহী, ত্যাগী উভয়ে সর্ব্বথা ।
এই গোত্রে অধিকারী নাহিক অন্যথা ॥৪৬॥
শ্রীঅচ্যুতগোত্রে থাকে শুদ্ধভক্ত যত ।
স্বধর্ম্মনিষ্ঠায় কভু নাহি হয় রত ॥৪৭॥
সংসারের গোত্র ত্যজি’ কৃষ্ণগোত্র ভজে ।
সেই নিত্যগোত্র তার, যেই বৈসে ব্রজে ॥৪৮॥
কেহ বা স্বদেহে বৈসে ব্রজগোপী হঞা ।
কেহ বা আরোপসিদ্ধ-মানসে লইয়া ॥৪৯॥
প্রবর্ত্ত, সাধক, সিদ্ধ
(১) প্রবর্ত্ত, (২) সাধক, (৩) সিদ্ধ—তিন যে প্রকার ।
বুঝিতে পারিলে বুঝি ভক্তিধর্ম্মসার ॥৫০॥
‘কনিষ্ঠাধিকারী’ হয় ‘প্রবর্ত্তে’ গণন ।
‘মধ্যমাধিকারী’ ‘সাধক’ ভক্ত মহাজন ॥৫১॥
‘উত্তমাধিকারী’ হয় ‘সিদ্ধ’ মহাশয় ।
হৃদয়ে স্বধর্ম্মনিষ্ঠা কভু না করয় ॥৫২॥
মধ্যমাধিকারী আর উত্তমাধিকারী ।
সকলে অচ্যুতগোত্র দেখহ বিচারি’” ॥৫৩॥
আরোপ
রঘুনাথ বলে, “এবে আরোপ বুঝিব ।
তাৎপর্য্য বুঝিয়া সব সন্দেহ ত্যজিব” ॥৫৪॥
দামোদর বলে, “শুন আরোপ-সন্ধান ।
ইহাতে চাহিয়ে ভক্তিস্বরূপের জ্ঞান ॥৫৫॥
ত্রিবিধা বৈষ্ণবী ভক্তি—
ত্রিবিধা বৈষ্ণবী ভক্তি করহ বিচার ।
(১) ‘আরোপ-সিদ্ধা’, (২) ‘সঙ্গসিদ্ধা’, (৩) ‘স্বরূপ-সিদ্ধা’ আর ॥৫৬॥
(১) আরোপ-সিদ্ধা ভক্তি—কনিষ্ঠাধিকারীর
আরোপ-সিদ্ধার কথা বলিব প্রথমে ।
সুস্থির হইয়া বুঝ চিত্তের সংযমে ॥৫৭॥
বদ্ধ বহির্ম্মুখ জীব বিষয়ী প্রধান ।
জড়সঙ্গমাত্র করি’ করে অবস্থান ॥৫৮॥
জড়সুখ জড়দুঃখ নিয়ত তাহার ।
প্রাকৃত সংসর্গ বিনা কিছু নাহি আর ॥৫৯॥
অপ্রাকৃত বলি’ কিছু নাহি পায় জ্ঞান ।
অপ্রাকৃত-তত্ত্ব মনে নাহি পায় স্থান ॥৬০॥
নিজে অপ্রাকৃত বস্তু তাহাও না জানে ।
অরক্ষিত শিশু যেন সদাই অজ্ঞানে ॥৬১॥
কোন ভাগ্যে কোন জন্মে সুকৃতির ফলে ।
শ্রদ্ধার উদয় হয় হৃদয়কমলে ॥৬২॥
প্রথম সন্ধানে শুনে, ‘আমি কৃষ্ণদাস’ ।
এ সংসার হইতে উদ্ধারে করে আশ ॥৬৩॥
কৃষ্ণার্চ্চন
গুরু বলে, ‘শুন, বাছা, কর কৃষ্ণার্চ্চন’ ।
কৃষ্ণার্চ্চনে তবে তার ইচ্ছা-সংঘটন ॥৬৪॥
কৃষ্ণ যে অপ্রাকৃত প্রভু, এই মাত্র শুনে ।
কৃষ্ণস্বরূপ অপ্রাকৃত তাহা নাহি জানে ॥৬৫॥
নিজ চতুর্দিকে যাহা করে দরশনে ।
তঁহি মধ্যে ইষ্ট যাহা বুঝি দেখ মনে ॥৬৬॥
ইষ্টদ্রব্যে ইষ্টমূর্ত্তির করয় পূজন ।
এই স্থলে হয় তার আরোপ-চিন্তন ॥৬৭॥
মনুষ্যমূরতি এক করিয়া গঠন ।
গন্ধ-পুষ্প-ধূপ-দীপে করয়ে অর্চ্চন ॥৬৮॥
আরোপ-বুদ্ধ্যে ভাবে সব অপ্রাকৃত ধন ।
আরোপ চিন্তিয়া কভু অপ্রাকৃতাপন ॥৬৯॥
ইহাতে যে কর্ম্মার্পণ আরোপের স্থল ।
আরোপে ক্রমশঃ ভক্তিতত্ত্বে পায় বল ॥৭০॥
এই ত’ আরোপ-সিদ্ধা ভক্তির লক্ষণ ।
কনিষ্ঠাধিকারীর হয় এই সমর্চ্চন ॥৭১॥
তত্ত্ববোধে শ্রীমূর্ত্তি পূজা
তত্ত্বটী বুঝিয়া যবে শ্রীমূর্ত্তি পূজয় ।
তবে মধ্যম অধিকার হয় ত’ উদয় ॥৭২॥
উত্তমাধিকারে আরোপের নাহি স্থান ।
মানসে অপ্রাকৃত তত্ত্বের পায় ত’ সন্ধান ॥৭৩॥
প্রেমের উদয় হয় প্রেমচক্ষে হেরি’ ।
প্রাণেশ্বরে ভজে পূর্ব্ব-আরোপ দূর করি’ ॥৭৪॥
ভক্তি স্বভাবতঃ নহে হেন কর্ম্মার্পণে ।
আরোপসিদ্ধা ভক্তিমধ্যে হয় ত’ গণনে ॥৭৫॥
(১) আরোপ-সিদ্ধার মূল তত্ত্ব
আরোপ-সিদ্ধার এক মূলতত্ত্ব এই ।
জড়বস্তু, জড়কর্ম্ম ভক্তিভাবে লই ॥৭৬॥
জড়বস্তু, জড়কর্ম্মমধ্যে ঘৃণ্য যাহা ।
অর্পণেও ভক্তি নাহি হয় কভু তাহা ॥৭৭॥
উপাদেয় ইষ্ট বলি’ কর্ম্মার্পণ করে ।
‘আরোপসিদ্ধা ভক্তি’ বলি’ বলিব তাহারে ॥৭৮॥
মায়াবাদে অর্চ্চনাঙ্গ আরোপ-লক্ষণ ।
ভক্তিবাদে স্বরূপসিদ্ধা ভক্তির দর্শন ॥৭৯॥
(২) সঙ্গ-সিদ্ধা ভক্তি
এবে শুন, ‘সঙ্গ-সিদ্ধা ভক্তি’ যেইরূপ ।
শুদ্ধজ্ঞান সুবৈরাগ্য সঙ্গসিদ্ধার স্বরূপ ॥৮০॥
যথা ভক্তি তথা যুক্তবৈরাগ্য শুদ্ধজ্ঞান ।
সাহচর্য্যে সঙ্গসিদ্ধ বুঝহ সন্ধান ॥৮১॥
দৈন্য দয়া সহিষ্ণুতা ভক্তি-সহচর ।
সঙ্গসিদ্ধ-ভক্তি-অঙ্গ জান অতঃপর ॥৮২॥
(৩) স্বরূপ-সিদ্ধা ভক্তি
সাক্ষাৎ ভক্তির কার্য্য যাহাতে নিশ্চয় ।
‘স্বরূপসিদ্ধা ভক্তি’র ক্রিয়া তাহাই হয় ॥৮৩॥
শ্রবণ-কীর্ত্তন-আদি নববিধ ভজন ।
স্বরূপসিদ্ধা ভক্তি বলি’ তন্নামকীর্ত্তন ॥৮৪॥
কৃষ্ণেতে সাক্ষাৎ তাহাদের মুখ্যগতি ।
আরোপসিদ্ধা, সঙ্গসিদ্ধার গৌণভাবে স্থিতি ॥৮৫॥
স্বতঃসিদ্ধ আত্মবৃত্তি শুদ্ধভক্তিসার ।
বদ্ধজীবে মনোবৃত্তে উদয় তাহার ॥৮৬॥
কৃষ্ণোন্মুখ জড়দেহে তাহার বিস্তৃতি ।
এ জগতে ভক্তিদেবীর এইরূপ স্থিতি ॥৮৭॥
ত্রিবিধা ভক্তির ত্রিবিধা ক্রিয়া
সেই ভক্তি ‘স্বরূপসিদ্ধা’ সাক্ষাৎ ক্রিয়া যথা ।
‘সঙ্গসিদ্ধা’ সহচর সাহায্যে সর্ব্বথা ॥৮৮॥
‘আরোপসিদ্ধা’ হয় যথা প্রাকৃত বস্তু ক্রিয়া ।
অপ্রাকৃত ভাবে সাধে প্রাকৃত নাশিয়া” ॥৮৯॥
স্বরূপের উপদেশে, বুঝে রঘুনাথ ।
পীরিতি-স্বরূপতত্ত্ব জগাইয়ের সাথ ॥৯০॥
১৮। শ্রীএকাদশী
একদিন গৌরহরি শ্রীগুণ্ডিচা পরিহরি’
‘জগন্নাথবল্লভে’ বসিলা ।
শুদ্ধা একাদশী দিনে কৃষ্ণনাম-সুকীর্ত্তনে
দিবস রজনী কাটাইলা ॥১॥
সঙ্গে স্বরূপদামোদর রামানন্দ, বক্রেশ্বর
আর যত ক্ষেত্রবাসিগণ ।
প্রভু বলে, “একমনে কৃষ্ণনাম-সঙ্কীর্ত্তনে
নিদ্রাহার করিয়ে বর্জ্জন ॥২॥
কেহ কর সঙ্খ্যানাম কেহ দণ্ডপরণাম
কেহ বল রামকৃষ্ণকথা” ।
যথা তথা পড়ি’ সবে ‘গোবিন্দ’ ‘গোবিন্দ’ রবে
মহাপ্রেমে প্রমত্ত সর্ব্বথা ॥৩॥
হেন কালে গোপীনাথ পড়িছা সার্ব্বভৌম সাথ
গুণ্ডিচা-প্রসাদ লঞা আইল ।
অন্নব্যঞ্জন, পিঠা, পানা, পরমান্ন, দধি, ছানা
মহাপ্রভু-অগ্রেতে ধরিল ॥৪॥
প্রভুর আজ্ঞায় সবে দণ্ডবৎ পড়ি’ তবে
মহাপ্রসাদ বন্দিয়া বন্দিয়া ।
ত্রিযামা রজনী সবে মহাপ্রেমে মগ্নভাবে
অকৈতবে নামে কাটাইয়া ॥৫॥
প্রভু-আজ্ঞা শিরে ধরি’ প্রাতঃস্নান সবে করি’
মহাপ্রসাদ সেবায় পারণ ।
করি’ হৃষ্ট চিত্ত সবে প্রভুর চরণে তবে
করযোড়ে করে নিবেদন ॥৬॥
শ্রীক্ষেত্রে শ্রীএকাদশী
“সর্ব্বব্রত-শিরোমণি শ্রীহরিবাসরে জানি
নিরাহারে করি জাগরণ ।
জগন্নাথ-প্রসাদান্ন ক্ষেত্রে সর্ব্বকালে মান্য
পাইলেই করিয়ে ভক্ষণ ॥৭॥
এ সঙ্কটে ক্ষেত্রবাসে মনে হয় বড় ত্রাসে
স্পষ্ট আজ্ঞা করিয়ে প্রার্থনা ।
সর্ব্ববেদ আজ্ঞা তব যাহা মানে ব্রহ্মা শিব
তাহা দিয়া ঘুচাও যাতনা” ॥৮॥
শ্রীমহাপ্রভুর বিচার
প্রভু বলে, “ভক্তি-অঙ্গে একাদশী-মান-ভঙ্গে
সর্ব্বনাশ উপস্থিত হয় ।
প্রসাদ-পূজন করি’ পরদিনে পাইলে তরি
তিথি পরদিনে নাহি রয় ॥৯॥
শ্রীহরিবাসর-দিনে কৃষ্ণনামরসপানে
তৃপ্ত হয় বৈষ্ণব সুজন ।
অন্য রস নাহি লয় অন্য কথা নাহি কয়
সর্ব্বভোগ করয়ে বর্জ্জন ॥১০॥
প্রসাদ ভোজন নিত্য শুদ্ধ বৈষ্ণবের কৃত্য
অপ্রসাদ না করে ভক্ষণ ।
শুদ্ধা একাদশী যবে নিরাহার থাকে তবে
পারণেতে প্রসাদ ভোজন ॥১১॥
অনুকল্পস্থানমাত্র নিরন্ন প্রসাদপাত্র
বৈষ্ণবকে জানিহ নিশ্চিত ।
অবৈষ্ণব জন যারা প্রসাদ-ছলেতে তারা
ভোগে হয় দিবানিশি রত ।
পাপপুরুষের সঙ্গে অন্নাহার করে রঙ্গে
নাহি মানে হরিবাসর-ব্রত ॥১২॥
ভক্তি-অঙ্গ সদাচার ভক্তির সম্মান কর
ভক্তি-দেবী-কৃপা-লাভ হবে ।
অবৈষ্ণবসঙ্গ ছাড় একাদশীব্রত ধর
নামব্রতে একাদশী তবে ॥১৩॥
প্রসাদসেবন আর শ্রীহরিবাসরে ।
বিরোধ না করে কভু বুঝহ অন্তরে ॥১৪॥
এক অঙ্গ মানে, আর অন্য অঙ্গে দ্বেষ ।
যে করে নির্ব্বোধ সেই, জানহ বিশেষ ॥১৫॥
যে অঙ্গের যেই দেশকালবিধিব্রত ।
তাহাতে একান্তভাবে হও ভক্তিরত ॥১৬॥
সর্ব্ব অঙ্গের অধিপতি ব্রজেন্দ্রনন্দন ।
যাহে তেঁহ তুষ্ট তাহা করহ পালন ॥১৭॥
একাদশী-দিনে নিদ্রাহার বিসর্জ্জন ।
অন্য দিনে প্রসাদ নির্ম্মাল্য সুসেবন” ॥১৮॥
শুনিয়া বৈষ্ণব সব আনন্দে গোবিন্দরব
দণ্ডবৎ পড়িলেন তবে ।
স্বরূপাদি রামানন্দ পাইলেন মহানন্দ
‘উড়িয়া’ ‘গৌড়িয়া’ ভক্ত সবে ॥১৯॥
ওহে ভাই, গৌরাঙ্গ আমার প্রাণধন ।
অকৈতবে ভজ তাঁরে যাবে তবে ভবপারে
শীতল হইবে তনুমন ॥২০॥
শ্রীনামভজন ও একাদশী এক
শ্রীনামভজন আর একাদশী ব্রত ।
একতত্ত্ব নিত্য জানি’ হও তাহে রত ॥২১॥
শ্রীশ্রীপ্রেমবিবর্ত্ত Prema Vivarta of Jagadananda Pandit (INDEX PAGE)