সভ্যতার পাণ্ডা – গিরিশচন্দ্র ঘোষ -1894
মেয়ে আমার বিয়ে পাস করেছে। রাইডীং, বক্সীং, জিম্ন্যাস্টীক্ পর্য্যন্ত পর্য্যন্ত শিখেছে। তবে বৌটা মানুষ হলনা। আমি বারণ করেছিলুম যে ছোট ঘরের মেয়ে এন না, কর্ত্তা শুনলে না। সে সেই আইবুড়ীর মত ঘোম্টা দেবে, ছেলের সঙ্গে বেড়াতে যাবেনা, ঘোড়া চড়বে না, গাউন পরবে না, দুপাত ইংরেজিও পড়বে না।
উন্নত বঙ্গের ছবি দেখুন
SABHYATAR PANDA- GIRISH ACHANDRA GHOSH
সভ্যতার পাণ্ডা।
পঞ্চরং
প্রথম দৃশ্য।
সভ্যতার বাটী।
সভ্যতা। (গীত)—
আমার মুখে হাসি চোখে ফাঁশি ভূবনমোহিনী।
মাদকতা প্রবঞ্চন। চিরসঙ্গিনী॥
অনাচার আমার কণ্ঠহার,
দাসী হ’য়ে চরণ সেবা করে ব্যভিচার,
আমি মধুমাখা কথা কয়ে আগে ভোলাই কামিনী ৷
হৃদাসনে সযতনে পুজি অহঙ্কার,
সে যে প্রাণপতি আমার,
আমার হৃদয় রতন, যতনের ধন, জোর করি ত তার,
আমি তার গরবে গরবিনী অাদরে আদরিণী॥
পুরাতন বর্ষের প্রবেশ।
সভ্যতা। গুডমর্ণিং ওল্ড ইয়ার! নিউ ইয়ার কে হবে কিছু ঠিক করলে?
পু-বর্ষ। আজ্ঞে আপনি দেখে শুনে নিন্, মনের মত তো কারুকে ঠেকে না, মহাত্মা নব্বই সাল, একানববই, বিরানব্বই, তিরানব্বই সাল যে সকল বঙ্গের উন্নতি সাধন করে গিয়েছেন তার ত আর তুলনাই হয় না। বিধবা-বিবাহ, স্ত্রী-স্বাধীনতা, বাল্য-বিবাহ রহিত, কন্সেন্ট-অ্যাক্ট প্রভৃতি মহা মহা কীর্ত্তি স্থাপন করে গিয়েছেন; অামি যথাসাধ্য চেষ্টা করে রোদ্, বৃষ্টি, হিম সয়ে, সে সকল কীর্ত্তি যে বজায় রাখতে পেরেছি, আজও যে আপনার নামে কলঙ্ক অর্পণ করিনি, এইতেই আপনাকে ধন্যবাদ দি। কাজে আন্তে পারি বা না পারি, হিদুর ডাইভোর্স অ্যাক্ট সম্বন্ধে কথা উত্থাপন করেছি।
সভ্যতা। না তুমি খুব উপযুক্ত! খুব উপযুক্ত!
পু বর্ষ। এখন আমার দারুণ চিন্তা হয়েছে কে যে পঁচানব্বই সালত্ব গ্রহণ করবে, তা কিছু ঠিক কর্ত্তে পারচ্ছিনে, দেখ্ছি সব ছেলেমানুষ, এ হিন্দু ডাইভোর্স অ্যাক্ট যে চলিত করতে পারবে এমন ত আমার ঠেকে না।
সভ্যতা। দ্যাখ তুমি ভেব না, এই তুমিও তো ছেলেমানুষ ছিলে তোমায় আমার সম্মান কে শেখালে! আমারি তো সহচরীরা, প্রবঞ্চনা, মাদকতা, অনাচার, ব্যভিচার, এরাইতো তোমায় শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছে? ওরির ভেতর একটা সেয়ানা সট্ট ছোঁড়া দেখে নাও।
পু-বর্ষ। একটা ছোঁড়া নিতান্ত মন্দ নয়, সে যা যা ক’র্বে বল্ছে যদি পারে, ছোঁড়াটা নাম রেখে যাবে, কিন্তু তার কথায় বিশ্বাস হচ্ছে না। সে সব ফটোগ্রাফ্ এনেছে চমৎকার চমৎকার, বল্ছে সে এই সব পারবে।
সভ্যতা। তুমি এ সব অবিশ্বাস ক’র না। তোমার পূর্ব্ব পূৰ্ব্ব মহাত্মারা কি কাজ না করে গেছেন, আর তুমিইবা কি না কর্লে? একি কেউ সম্ভব ভেবেছিল, হিঁদুতে মুরগী খাবে? বামুন খৃষ্টান হবে? কূলের বধু মেম সেজে হাওয়া খাবে, পূজায় সাহেবের খানা হবে, বাপ ব্যাটায় গার্ডণ পার্টি করবে, বেশ্যার সঙ্গে স্ত্রীর আলাপ করে দেবে, বাপ মাকে পৃথক করবে? তুমি তো সব জান, তোমায় আর কি বলবো! আর ধর না, তুমিই যখন ফটোগ্রাফ দেখিয়েছিলে, তিরানব্বই সাল কি না বলেছিল? যে “ও ছেলে মানুষ পেরে উঠ্বে না। তুমি হিন্দু ডাইভোর্স অ্যাক্ট কল্পনা করলে, আর যার বাড়া নাই, রামায়ণ মহাভারতকে অশ্লীল প্রমাণ করলে।
পু-বর্ষ। তা পারে ভাল। দেখুন ঐ আসছে, আমি বু্ড় হয়েছি, শীতে অার দাঁড়াতে পারচ্ছিনে, এই কটাদিন কাজ কর্ছি, পয়লা থেকে আমায় ছুটী দেবেন।
সভ্যতা। অবিশ্যি! কালগর্ভে তোমার জন্য যশের মন্দির হয়েছে, পেন্সেন্ নিয়ে সেখানে গে বিরাম ক’রো। তবে যদি কখন কোন নূতন বৎসরে তোমার কীৰ্ত্তির কোন নজীর দরকার হয়, তা এক্ এক্বার এ’সে সাক্ষী দিয়ে যেও।
পু-বর্ষ। তা আমার সাক্ষী দিতে আস্তে হবে না, রাজবাড়ি থেকে কুটীর পর্য্যন্ত আমার নজীর পড়ে আছে, আমার শীল মোহর করা। তা অনুমতি হয় তো আসি।
সভ্যতা। দ্যাখ, এই কৃষ্টমাস আসছে, এই কীর্ত্তি রেখে যাবার দিন, এ সময় আলিস্যি ক’রনা।
পু বর্ষ। হা, তা কি হয়!
সভ্যতা। গুড্ ডে।
[পুরাতন বর্ষের প্রস্থান।
(নূতন বর্ষের প্রবেশ।)
নব-বর্ষ। গুডমর্ণিং লেডি!
সভ্যতা। তুমি কি নুতন সাল হবার প্রার্থনা কর?
নব-বর্ষ। ইয়েস, ধ্রুবং, নিশ্চয়, জরুর। আমার এই চারখানা ফটোগ্রাফ্ দেখুন। এমনি কাজ ক’রে যশের মন্দিরে গে শোব ইচ্ছে ক’রেছি। এর সজীব ছবি আমার আছে, দেখতে চান্ দেখ্বেন আসুন।
সভ্যতা। এ সব তুমি পারবে?
নব-বর্ষ। আজ্ঞে হাঁ। না পারি, কাজ দেবেন না। চুরানব্বই আমায় বিশ্বাস করছেন না, আচ্ছা উনি দেখুন, ওঁর চক্ষের উপর দেখাই। আমি নাম চাইনি, এই কৃষমাসেতে ওঁর কদ্দুর মুখ উজ্জ্বল করি।
সভ্যতা। আচ্ছা তুমি কাজ আরম্ভ কর। এক একটা কাজ করে, অামায় খবর দিও, আমি দেখে নেবো। যাও কাজে যাও।
নব-বর্ষ। যে আজ্ঞেঁ।
[সভ্যতা ও নব বর্ষের প্রস্থান]
দ্বিতীয় দৃশ্য।
চৌরঙ্গীর রাস্তা —(বেঙ্গলক্লাবের সম্মুখ)
(এক জন বিউগেল ও ছয়জন হ্যাণ্ডবিল লইয়া প্রবেশ।)
বিউ-বাদক। কৃস্মাসের দিন সাতপুকুরে বরের নীলেম হবে। যে যেমন চাও তেম্নি পাবে,এই হ্যাণ্ডবিল নিন, আর গান শুনুন নেচে গাই।
গীত।
হবে নূতন নীলেমে, নূতন বরের আমদানী।
হর রকম বর পাওয়া যাবে, বুড় যুব বাচ্কানী॥
বিকুবে হায়েষ্টবিডারে,
ক্যাসপ্রাইসে পাবেন ধারে,
পয়সা ফেল, হাত ধরে নাও পছন্দ যারে,
হররকম প্যাটেনের গড়ন, বে প্যাটেন নাই একখানি॥
আড়ংছাঁটা, টেরিকাটা ফিট্,
ফ্যাসানেবল্ ড্রেসকরা নিট্,
সব্য ভব্য জেক করা ঢিট্,
হবে না সিক্ অর সরি, আড়্লে দিও চাবকানী॥
(হ্যাণ্ডবিলওয়ালার হ্যাণ্ডবিল পাঠ।)
১ম হ্যাণ্ড। নিউ অক্সন! নিউ অক্সন!! নিউ অক্সন!!!
সেভেন ট্যাঙ্কস্ ভিলা!
এক্স মাস ড়ে—টোইণ্টী ফিফ্ত্ ডিসেম্বর,
এইট্টীন্ নাইণ্টী ফোর,
টু বি সোল্ড টু দি হায়েষ্ট বিডার,
ফার্ষ্টক্ল্যাস ব্রাইড গ্রুমস্!
ওয়েল ড্রেষ্ট, সিভিলাইজড্-ডোসাইল, এণ্ড টেম!
কাম্ ওয়ান্ এণ্ড অল্!
নূতন নীলেম! নুতন নীলেম!! নুতন নীলেম!!!
সাতপুকুর বাগানে।
বড় দিন ২৫শে ডিসেম্বর, ১৮৯৪ সাল।
হায়েষ্ট বিডারে বিক্রি।
প্রথম শ্রেণীর ভাল বর! ভাল পোষাক।
সভ্য—নিমু—পোষমানা!
এস একজন ও সকলে!
[সকলের প্রস্থান]
তৃতীয় দৃশ্য।
ভবতারিণীর বাটী।
(ভবতারিণী ও বিশ্বেরীর প্রবেশ।)
ভব। এস এস, অনেক দিনের পর দেখা হ’ল। পাঁচ ঝঞ্জাটে আর হাওয়া খেতে যেতে পারি নি, দ্যাখাও হয় না, তবে কি মনে করে?
বিশ্বে। ভাই, নেমন্তন্ন কর্ত্তে এসেছি।
ভব। কি, পার্টি টার্টি কি কিছু আছে নাকি?
বিশ্বে। না, তা নয়, কন্যা যাত্রের।
ভব। বে কার?
বিশ্বে। কেন, কিছু শোন নি? বক্তৃতাও পড়নি? এড্ভারটাইজ্মেণ্টও দেখনি?
ভব। আর ভাই, পাঁচ ঝঞ্জাটে কি আর কিছু দেখ্তে শুন্তে পাই! হাওয়া খেতে তো যেতে পারিই নি, একদিন যে জিম্ন্যাসিয়েমে যাব, তাও হয়ে উঠে না। কার বে?
বিশ্বে। অামার।
ভব। বটে বটে, ইস্ তাই তো!
বিশ্বে। তোমায় ভাই যেতেই হবে।
ভব। ভাই, তাইতো ভাবছি!
বিশ্বে। না, ও ভাবছি না।
ভব। আমার কি ভাই অসাধ? আমি তোমার কোন্ বে তে কন্যাযাত্রী যাই নি বল? প্রথমকার বেতে বাসর জাগি, দ্বিতীয় বে তে তেরাত্তির ছিলুম, যদি না ঝঞ্ঝাটে পড়তুম, তুমি জোড়ে ফিরে আসা অবধি তোমাদের বাড়িতে থাকতুম। তুমি কি ভাই আমার পর?
বিশ্বে। এত ঝঞ্ঝাট্টা কিসের বল দেখি?
ভব। সে কথা আর তোমায় কি বল্বো বল! এই ভোরে ওঠা, টিথ্ বুরূশ দিয়ে দাঁত মাজা, গোষলখানায় যাওয়া, ছোট হাজ্রে বড় হাজ্রে খাওয়া—কর্ত্তার সঙ্গে বসে খেতে হয়, কর্ত্তা একলা খায়না—টীফিন্, ডিনার, তিনবার ড্রেস করা, তারপর মেয়েকে বৌকে পড়ান।
বিশ্বে। কেমন শিখ্ছে কেমন?
ভব। মেয়ে আমার পেটের, বিয়ে পাস করেছে। রাইডীং, বক্সীং, জিম্ন্যাস্টীক্ পর্য্যন্ত পর্য্যন্ত শিখেছে। তবে বৌটা মানুষ হলনা। আমি বারণ করেছিলুম যে ছোট ঘরের মেয়ে এন না, কর্ত্তা শুনলে না। সে সেই আইবুড়ীর মত ঘোম্টা দেবে, ছেলের সঙ্গে বেড়াতে যাবেনা, ঘোড়া চড়বে না, গাউন পরবে না, দুপাত ইংরেজিও পড়বে না।
বিশ্বে। তবে তো বউ টা বয়ে গেল।
ভব। তা গেল বই কি! আসুক ছিষ্টিধর বিলেত থেকে আসুক, বল্ছে মেম্ বে করে আস্বে। তদ্দিনে ডাইভোর্স অ্যাক্টাও পাস হবে, উরির মধ্যে দেখে শুনে বৌটার একটা বে দেব।
বিশ্বে। দেখ, ঘর ঘরকন্নার কাজ কর্ম্মতো আছেই, কাল এক বার ফুরসুত করে শুভদৃষ্টির সময় গিয়ে দাঁডিও।
ভব। ভাই একটু ফুরসুত নেই, কাল কর্ত্তার শ্রাদ্ধ।
বিশ্বে।সে কি? আস্বের সময় তো দেখলুম তিনি গাড়িতে উঠ্ছেন।
ভব। হাঁ, ডেথ্ রেজেস্ট্রী কৰ্ত্তে গেল।
বিশ্বে। বটে! তোমার কি বে দেবেন?
ভব। না, তা না। কি জান, ছিষ্টিধর পরশু মেলে বিলেত যাবে, ঘেসেড়াগিরী শিখ্বে! কাজটা বড় শক্ত, ব্যারিষ্টারী ডাক্তারী নয়, সে দু এক বছরে হবে; এসে ঘেসেড়ার আফিস খুলবে। সেখানে অন্তত বছর দশেক শিখতে কবে, অ্যাদ্দিনে কৰ্ত্তার ভাল মন্দ হোক্, শেষ কি ব্যাটা থাক্তে ব্যাড়া আগুনে পুড়বে, না জ্ঞাতে শ্রাদ্ধ করবে? তাই পুরুৎ ঠাকুর পরামর্শ দিয়েছেন, আজ ছিষ্টিধর মুখ-অগ্নি করে কাচা নিয়ে থাক্বে, কাল্ সকালে শ্রাদ্ধ করে, পরশু মেলে উঠবে।
বিশ্বে। বটে? তবে ভাই আর তোমায় কি বলবো!
ভব। তোমারো বে শুন্ছি, তোমায়ই বা কি বল্বো! তা নৈলে একবার শ্রাদ্ধ টাদ্ধ দেখে যেতে। তা সকাল সকাল তে বে চুকে যাবে, একবার তোমার নিউডিয়ারকে নিয়ে এদিকে আস্তে পারবে না?
বিশ্বে। দেখি কদ্দুর হয় বল্তে পারিনি।
ভব। হাঁ, ভাল কথা মনে হলো, কর্ত্তা ডেথ্ রেজেষ্ট্রী করে এলেই আমার কাঁদ্তে হবে; কখনোত স্বামী মরেনি, কি করে কাঁদতে হয় জানিনি, অসভ্য কারাত কাঁদতে পারবোনা।
বিশ্বে। ও সোজা। আমার স্বামী মরতে, রুমালে এক্টু অডিকলোম দিয়ে মুখে দিলুম, অডিকলমের ঝাঁজে চোক্ দে জল পড়তে লাগলো, আর ফোঁপাতে লাগলুম।
ভব। থ্যাঙ্ক্ ইউ! বড় বাধিত হলেম!
বিশ্বে। তবে ভাই এখন চল্লুম। আমার দাঁড়াবার জো নেই, এখুনি ক’নে দেখ্তে আস্বে।
ভব। একটু দাঁড়াও, আর্ একটা পরামর্শ জিজ্ঞাসা করি। কর্ত্তা ব’ল্ছে যে মরণ বাঁচনের কথা তো কিছু বলা যায় না, এক সঙ্গে মুখ অগ্নিটা করে রাখবে।
বিশ্বে। তা মুখো অগ্নি কর কর্বে, খবরদার শ্রাদ্ধটী কর্ত্তে দিওনা।
ভব। কেন বল দেখি, কেন বল দেখি?
বিশ্বে। না, আর একটা বে আগে হোক্।
ভব। তেমন কি কপাল দিদি, তেমন কি কপাল! কর্ত্তা কি আর সত্যি সত্যি মরতে পারতো না, তা কৈ রাজি হয় কৈ! দুটো বে আমার বরাতে নেই আমি বুঝেছি।
বিশ্বে। কেন, কর্ত্তার শ্রাদ্ধ হলেই তুমি বে করতে পারবে, আইনে বাধবে না।
ভব। তা তুমি বে থা করে এসো, এ গোল্মাল্ গুল চুকে যাক্, তারপর যা হয় পরামর্শ করবো।
বিশ্বে। তবে আসি?
ভব। এস দিদি এস।
[বিশ্বেশ্বরীর প্রস্থান।
এই যে কর্ত্তা আসছেন!
(নীলাকান্তের প্রবেশ।)
কি গো! এত দেরি?
নীল। কি করবো বল, রেজিষ্টার ব্যাটা আহাম্মুক্ কোন রকমেই রেজেষ্ট্রী কৰ্ত্তে চায় না। আর সে ব্যাটার যে কথা, কে মরেছে, কি সে মলো, ব্যাটা যখন চোট্পাট্ শুনলে তখন থ হয়ে রৈল।
ভব। তুমি কি বল্লে, তুমি কি বল্লে?
নীল। বল্লেম, আমি মরেছি, চুরট খেয়ে।
ভব। তা এইতে এত দেরি?
নীল। না, আর পাঁচজন বন্ধুবান্ধবকে নেমন্তন্ন করে এলুম, ছিষ্টিধর বলেছে, শ্রাদ্ধর পর গার্ডেন পার্টি হবে।
ভব। বল কি ! তবে আমারো তো দু পাঁচ জন বন্ধু বান্ধবকে বলতে হবে, আমি এই বেলা বেরিয়ে পড়ি।
নীল। দাঁড়াও, পুরুৎ ঠাকুর আসুন, তিনি বলেছেন তোমার মুখঅগ্নির পর তোমার্ শ্রাদ্ধ বন্ধ থাকবে না।
ভব। তুমি কি আমারও ডেথ রেজেষ্ট্রী করে এসেছ নাকি?
নীল। করলুম বৈ কি! এবারে বড় রেজেষ্টার ব্যাটা জব্দ হ’ল। মুদ্দফরাশকে কিছু দিয়ে, একটা কলেজের মুদ্দর্ দেখিয়ে বল্লুম এই আমার স্ত্রী।
ভব। ছিঃ তুমি বড় অসভ্য! আমি চল্লুম, আমি কাটিয়ে আসি গে, আমি কি ওম্নি অসভ্য মরণ মরবো?
নীল। তুমি আমায় তেমনিই পেলে বটে! দেখে এস গে এখনো লাস্ জলে নি, আগে গাউন প’রিয়ে তবে লাস দেখিয়েছি।
ভব। তাই তো বলি, তাইতো বলি, তুমি কি এমন অসভ্য কাজটা করবে!
(পুরোহিতের প্রবেশ)
পুরো। কি গো! তুমি আবার কি অমত কর্ছো? মুখ অগ্নির পর কি শ্রাদ্ধ বন্ধ থাকে? শ্রাদ্ধ কর্ত্তেই হবে।
ভব। তা যা ভাল বোঝেন, কিন্তু আমার একজন বন্ধুর বড় অমত, সে বলে অার একটা বের পর তবে তোমার শ্রাদ্ধ ক’রো।
পুরো। তা, শ্রাদ্ধের পরও বে চল্বে।
ভব। তাহ’লে আর আমার আপত্তি নেই।
পুরো। তা এস, ছিষ্টিধর আসছে, মুখঅগ্নিটে এখন সেরে যাই। ভাবছি আজ রাত্রেই শ্রাদ্ধটা সারবো। কাল আবার একটা বে দিতে হবে।
(ছিষ্টিধরের প্রবেশ)
ছিষ্টি। বাবা! বাবা! প্যাসেজ্ এন্গেজ করে এলুম।
ভব। পুরুৎ ঠাকুর বল্,ছেন আজি তোমায় শ্রাদ্ধটা সারতে হবে।
ছিষ্টি। বেস কথা, কাজটা সেরে রাখাই ভাল। পাঁচ জন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে দেখা করবার কাল ফুরসুৎ পাব।
পুরো। তবে মুখঅগ্নি করবে এস।
ছিষ্টি। এই খানেই হোক না, আমার ঠেঁয়ে লুসিফার ম্যাচ আছে।
পুরো। তবে দুট জ্বালো, দুজনের মুখে দাও।
(ছিষ্টিধরের তথা করণ)
তবে কাচা গলায় দিয়ে বাইরে এস।
ছিষ্টি। আর কাচা গলায় দিতে হবে না, আমার ঠেয়ে কালো ফিতে অাছে।
পুরো। ওঃ! “উদ্যোগী পুরুষো সিংহ“ এমন নৈলে ব্যাটা? তবে বাইরে এস, শ্রাদ্ধটা সেরে যাই। তোমাদের আর কি, মুখঅগ্নি হোয়ে গিয়েছে, যে যার কাজে যাও। ব্রাহ্মণ ভোজনের উজ্জুগ করগে।
[পুরোহিত ও ছিষ্টিধরের প্রস্থান।
নীল। গিন্নি একটা কথা ভাবছি।
ভব। অামিও ভাবছি।
নীল। কি বল দেখি?
ভব। তুমি বল দেখি?
নীল। ভাবছি ফ্যান্সি বাজারে যাব।
ভব। ভাবছি বরের নীলেমে যাব।
নীল। বরের নিলেমে যাবে কি কত্তে?
ভব। তুমি ফ্যান্সি বাজারে যাবে কি কত্তে?
নীল। তুমি কি বর কিনবে?
ভব। হুঁ। তুমি কি কনে কিনবে?
নীল। হাঁ।
ভব। বেশ কথা।
নীল। বেশ কথা। তবে এস দুজনে কাঁদি।
ভব। নাও এই এসেন্স চোখে নাও।
নীল। হোয়েছে?
ভব। অনেকক্ষণ। আমি চোখের রুমাল খুলেছি।
নীল। আবার কি ভাবছো?
ভব। ভাবছি, আইনে বাধবে কি না।
নীল। না বাধবে না, ডেথ রেজেষ্ট্রী হোয়ে গিয়েছে।
ভব। ঠিক!— গুড্ বায়।
[উভয়ের সেক্হ্যাণ্ড ও প্রস্থান।]
চতুর্থ দৃশ্য।
ওল্ডকোর্টহাউস ষ্ট্রীট বা লালদিঘীর ধারের রাস্তা।
কুলাঙ্গনাগণ—
গীত।
ফ্যান্সি হোয়েছে যাব ফ্যান্সি বাজারে।
ফ্যান্সি ধাঁজে, ফ্যান্সি কাজে, ফ্যান্সি বাহারে॥
ফ্যান্সি আছে যার,
দেখ্তে যাবে সে ফ্যান্সি বাজার,
ফ্যান্সি দরে কিনে নেবে ফ্যান্সি ফুলের হার,
ফ্যান্সি কার্পেটের জুত দেব ফ্যানসি হয় যারে॥
ফ্যান্সি হেসে কেউ যদি সই ফ্যান্সি কথা কয়,
ফ্যান্সি চোকে দেখবো চেয়ে ফ্যান্সি যদি হয়,
ফ্যান্সি নৈলে নয়,
ফ্যান্সি প্রাণে সয় কি লো সই,
যে না ফ্যান্সির ধার ধারে॥
পঞ্চম দৃশ্য।
বিবাহের সভা।
(সর্ব্বেশ্বর, শশীভূষণ ও দিনুর প্রবেশ।)
সর্ব্বে। মশায়, নশিরাম বাবুর মাতুল?
শশী। আজ্ঞে হ্যাঁ, আর ইনি আমার বন্ধু।
দিনু। ইনি ব’ল্লেন চল কন্যে দেখে আসি, এলেম সঙ্গে। পাত্রীটী আপনার কে মশাই?
সর্ব্বে। আজ্ঞে, আমার পরিবার।
শশী। ওহে, কি বলে কি?
দিনু। আরে, কথার ভাব বোঝনা, ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইতে দাও। উনি বলছেন, আমার পরিবারস্থ! তবে বুঝি পাত্রীটির পিতা নাই?
সর্ব্বে। আজ্ঞে না, তিনি আজ ত্রিশ বৎসর পরলোক গমন করেছেন।
শশী। ওহে, কি বলে কি এ?
দিনু। তুমি বৈবাহিক, তোমার সঙ্গে পরিহাস ক’চ্ছেন। আমরা ওসব বুঝি। মশাই, এ সব আয়োজন কি দেখতে পাচ্ছি?
সর্ব্বে। আজ্ঞে, নান্দিমুখের আয়োজন।
দিনু। দেখ শশীভূষণ, আমি বুঝতে পেরেছি, ইনিই তোমার বৈবাহিক। লোকটা দেখ্ছি সুরসিক, তোমার সঙ্গে পরিহাস ক’চ্ছে।
সর্ব্বে। আপনি কি বল্ছেন মশাই? পরিহাস করছি কি? নশিরাম বাবু আপনাদের কিছু বলেন্ নি?
দিনু। নশিরাম আমাদের কন্যা দেখ্তে পাঠিয়েছে। তা যাক্, ও সব কথা যাক্, কন্যাটীর পরিচয় কি মশাই?
সর্ব্বে। পরিচয় অতি আশ্চর্য্য! ইনি বিন্দাবন বিশ্বাসের কন্যা, তিরিশ বছরে বিধবা হন, আজ দশ বৎসর আমার প্রণয়িনী, আজ শুভদিনে নশিরাম বাবুর হস্তে অর্পণ করবো।
শশী। ওহে দিনু! বলে কি?
দিনু। মস্করা ক’চ্ছে! মস্করা ক’চ্ছে! বোধ হয় পাত্রীটি এঁর শালী টালি হবে! তা বেশ মশাই পাত্রীটি আনুন।
সর্ব্বে। তিনি আসছেন।
(বিশ্বেশ্বরী ও কুমুদিনীর প্রবেশ)
উভয়ের গীত।
দোজ্ পক্ষের ভাতার ইটি চমৎকার।
আমার হাফ্ সেয়ার, আর হাফ্ সেয়ার পেয়েছে
এই মাইডিয়ার সিস্টার॥
এম্নি ভাতার পেলে পরে পর,
বছোর বছোর সাজবো কণে, পাব নতুন বর,
গুণের নিধি ভাতার খুব জবোর,
এমন মুরুব্বি ভাতার আর কি আছে কার।
ভাতারের শুধ্বো কিসে ধার॥
দিনু। দেখ্ছো দেখ্ছো, বলেছিলেম এঁরা সব সুরসিক লোক। এ দুটী কি নর্ত্তকী?
সর্ব্বে। কি! এঁরা আমার পরিবার।
দিনু। তা বটে।
শশী। ও দিনু! আজ বিভ্রাট দেখ্ছি।
দিনু। আঃ ছিঃ! তুমি মস্করা বোঝ না?
সর্ব্বে। বড় ডিয়ার!
বিশ্বে। হাফ্ডিয়ার!
সর্ব্বে। ইনি তোমার মামাশ্বশুর, এঁর সঙ্গে সেক্হ্যাণ্ড কর
বিশ্বে। গুড্মর্ণিং! আর হাফডিয়ার ইনি কে?
সর্ব্বে। উনি ওঁর বন্ধু।
কুমু। সিস্টার ডিয়ার!
বিশ্বে। সিস্টার ডিয়ার!
(উভয়ের আলিঙ্গন)
শশী। ওহে দিনু চলো, বড় বিভ্রাট!
দিনু। দাঁড়াও অভিনয়টা দেখি। এদুটী কি থিয়েটার থেকে আনা হয়েছে?
সর্ব্বে। কি! আমার পরিবারের সাম্নে অশ্লীল কথা আপনি উচ্চারণ করেন?
শশী। কেন মশাই থিয়েটার কি অশ্লীল কথা হলো?
সর্ব্বে। খুব অশ্লীল! আপনি যদি নসিরাম বাবুর মাতুল না হতেন তো টেরটা পেতেন।
দিনু। শশী বুঝলে, এও একটী অ্যাক্টার।
সর্ব্বে। মশাই বড় শক্ত শক্ত বলছেন আমায়।
দিনু। না বাপু না, নাচ গাওনা কি কর্বে কর। ওগো বাছারা তোমরা অভিনয় সুরু কর।
সর্ব্বে। বড় ডিয়ার! আমি এ উজ্বুকের কথায় খুব রাগ্ছি।
বিশ্বে। রেগো না প্রাণনাথ, রেগো না।
সর্ব্বে। আচ্ছা রাগ্বোনা, আমি গম্ খেয়ে বসি।
দিনু। হাঁ বাছা তোমাদের পালাটা কি?
বিশ্বে। বিবাহ পালা।
শশী। ওহে পালাই চলো। বুঝ্ছোনা এই বেটীই কণে।
বিশ্বে। পালাবেন কেন? যদি অনুগ্রহ করে এসেছেন, বে দিয়েই ঘরে নিয়ে চলুন।
(নেপথ্যে ঐক্যতান বাদন।)
সর্ব্বে। বড় ডিয়ার! বুঝি তোমার বর আস্ছেন।
কুমু। উলু-উলু-উলু—উলু—
দিনু। হ্যাঁগা এঁর এ বেশ কেন?
সর্ব্বে। উনি ঘোড়ায় চড়্তে যাবেন।
দিনু। ইনি কি সার্কাস করেন?
সর্ব্বে। ছোট ডিয়ার। খুব রাগ্ছি।
কুমু। তুমি ভারি ষ্টুপিড্ তাই রাগ্ছো। আমিতো সার্কাস কর্বোই, তবে সিস্টার ডিয়ারের বে, এই জন্যেই এতক্ষণ বাড়িতে আছি।
(নসের প্রবেশ।)
শশী। ও দিনু! এ যে আবাগের ব্যাটা নসে হে!
দিনু। বাঃ বাঃ! বড় ঠিক সেজেছে!
শশী। আরে সেজেছে কি? সেই আবাগের বেটা দেখ্চ না?
নসে। হাজরা মশায়! কনে তো দেখিয়েছেন, শিগ্গির সম্প্রদান করুন।
দিনু। ওহে শশী! আমি কিছু বুঝতে পার্চি নে।
শশী। আর বুঝ্বে কি, আমার গুষ্টীর পিণ্ডি! ও বেটা এ বুড়ীকে বিয়ে ক’রবে তবে ছাড়বে! ও আবাগের বেটা! তুই এই মাগীকে বিয়ে কর্বি নাকি?
নসে। মামা তার অার সন্দেহ রাখ?
দিনু। ও বাবু ও হাজরা মশায়! এখন আমি সব বুঝেছি। তুমি বড় মাগটীর বে দেবে? অার ছোটটির?
কুমু। আমি বরের নীলেম থেকে একটা দেখে শুনে নিয়ে আস্বো।
দিনু। ও বাছা এদিকে এসতো, এদিকে এসতো! বরের নীলেমটা কি শুনি?
নসে। দেখতে যাবেন, আপনাকে টিকিট্ দেবো।
শশী। ঐ নসে বেটা নীলেম করেছে। আমি বলি কিসের নীলেম!
দিনু। তবে চল আর কি, চুড়োন্ত হ’লো!
নসে। মামা যেওনা যেওনা, আর বেশী দেরি নাই, উনি ৫ মিনিটের ভেতর নান্দীমুখ সেরেই কন্যা সম্প্রদান করবেন। এই যে পুরুৎ মশাই এয়েচেন।
(পুরোহিতের প্রবেশ।)
দিনু। মশায় বুঝি এই বিবাহের পুরোহিত?
পুরো। কেন, আপত্য কি?
দিনু। এ রকম বিবাহ আর কটি দিয়েছেন?
পুরো। আপনি আমার সঙ্গে ব্যঙ্গ কর্ছেন? অামায় চেনেন না, আমি স্মৃতিরত্ন, নূতন স্মৃতি ক’রেছি তাতে সম্পূর্ণ ব্যবস্থা আছে যে, কন্যা সম্প্রদান করতে পারে এক বাপ্ আর স্বামী।
নসে। মামা, মামা, ইনি বড উচুদরের পণ্ডিত, ইনি বঢ উচু দরের পণ্ডিত, এঁর সঙ্গে তামাসা না।
দিনু। তবে পুরোহিত মশায়! স্বামী কন্যাকর্ত্তা হ’লে বরের সঙ্গে কি সুবাদ হবে?
পুরে। অতি আশ্চর্য্য সম্বন্ধ! এরূপ সম্বন্ধ কেউ কখন শোনেনি, ভায়রাভাই শশুর!
দিনু। পুরুৎ মশাই! আপনি বেঁচে থাকবেন তো?
শশী। এরা কেউ মর্বে না! কেউ মর্বে না! তা তুমি দেখো!
পুরো। তুমিতো দেখ্চি খুব মেধাবী! তুমি একটা কাজ কর, আমার ব্রাহ্মণীকে বিবাহ কর। তুমিও অমরত্ব পাবে, দেশে দেশে যশ করবে। এ সব নতুন কারখানা, কোন দেশে নাই।
দিনু।এইটি ভট্চাজ্যি মশাই ঠিক্ বলেছেন! হিন্দু মুসলমানে, খ্রীষ্টানে এ আইন নাই!
পুরো। এই হিন্দুর ভেতর চলন ক’ল্লেম আমি।
শশী। ওহে চল চল।
দিনু। আরে দা্ঁডাও, তোমরা মামা ভাগ্নেতে ক’নে জোটালে, আমার অদৃষ্টে কি হয় দেখি।
কুমু। তোমার আদেষ্টও ক’নে জুটতে পারে।
দিনু। তা কই জুটুক না।
কুমু। যদি স্বীকার পাও তিন দিনের ভেতর মর্বে, আমি তোমার ক’নে হ’তে স্বীকার।
পুরো। মশাই মশাই, স্বীকার পান, স্বীকার পান, মলেনই বা? খুব নাম রেখে যা’বেন।
নসে। আর ম’রতে কোন কেলেশ হবে না, আমি ইলেক্ট্রীক ব্যাটারি দে আপনাকে মার্বো।
সর্ব্বে। উঃ আপনার দেখচি ভারি অদৃষ্ট! আপনার বৈজ্ঞানিক মৃত্যু হবে!
দিনু। তোর সাতগুষ্টীর হোক্! ওঠহে ওঠো।
পুরে। কেন, আপনারা যাচ্চেন কেন?
দিনু। যাচ্চি মতিচ্ছন্ন হ’য়েছে, আর কেন।
সর্ব্বে। সেকি সেকি যখন পদার্পণ করেছেন, কিঞ্চিৎ জলযোগ করে যেতে হবে।
দিনু। ভোরপুর আনন্দ হয়ে গিয়েচে! বাবু ভোরপুর আনন্দ হয়ে গিয়েচে! যে সব কথা শুনলেম তিন দিন আর খেতে হবে না চাঁদ!
কুমু। আপনি আমায় ইন্সাল্ট করছেন! যদি না বসেন, আপনাকে চাব্কে দেব।
শশী। ও দিনু, বোসো, বোসো, বোসো। ছুঁড়ী সত্যি চাব্কাবে। আগে পালাতে তো পালাতে, ও মাগী তেড়ে চাবুক মারবে।
পুরো। মশাই রাজি হোন, আমি ব্রাহ্মণীকে ডেকে পাঠাই, এক দিনে তিন্টে শুভ বিবাহ সম্পন্ন হোক।
শশী। নে নে নসে কি কর্বি কর, আমরা বসে আছি। পুরুৎ ঠাকুর একটা বে সারুন, তারপর কাল আমাদের বে দেবেন।
পুরো। আচ্ছা না করেন ভাল। এতে জোর নেই। একটা নাম রেখে যেতে পারতেন। বোসো হে নসিরাম! বিশ্বেশ্বরী এস, নাও এখন হাতে হাতে সঁপে দাও, আমি একটু ব্যস্ত আছি, কাল এসে নান্দীমুখ ক’রবো। নিদে! এগুলো এখন সরিয়ে রাখ।
(নিদের প্রবেশ ও দ্রব্যাদি লইয়া প্রস্থান।)
বলো এতদিন এ বড় ডিয়ার আমার ছিল, আজ তোমার হ’ল।
(ভবতারিণীর প্রবেশ।)
ভব। বিশ্বেশ্বরী! ভাই, আমার শ্রাদ্ধ হোয়ে গিয়েছে, আমি এসেছি।
বিশ্বে। তবে দাঁড়াও হাফ্ ডিয়ার। এখন হাতে হাতে সোঁপো না! আমার ফ্রেণ্ড ভবতারিণী সাক্ষী হবে।
(নীলাকান্তর প্রবেশ।)
নীল। সর্ব্বেশ্বর বাবু! আমার শ্রাদ্ধ হয়ে গিয়েছে, আমি এসেছি।
ভব। কি তুমি ফ্যান্সী বাজারে গেলে না?
নীল। না, বরযাত্রের নেমন্তন্নটা সেরে যাব। তুমি বরের নীলেমে গেলে না?
ভব। আমি কন্যাযাত্র সেরে যাব।
পুরো। আপনারা দুজন বর ক’ণে আনতে যাবেন না কি?
নীল। আজ্ঞে হাঁ।
নসে। কি মশাইদের বিবাহ কর্বের ইচ্ছে আছে?
ভব। অাছে।
নসে। মশাই অনুগ্রহ করে আমার একটা কাজ কর্ত্তে হবে। আমার নীলেমে তিনটী লাটের অভাব। এড্ভাটাইজ করে ফেলেছি, না বর জোটাতে পারলে বড় অপমান হতে হবে, মামা, আপনি আর এই ভদ্রলোককে আমার এই উপকারটা করতেই হবে।
পুরো। না, আপনি এইখানেই বিবাহ করুন। আপনি আপনার দ্বিতীয় পরিবারটী ছাড়ুন। আপনি ভবতারিণীকে নিন্, আপনি কুমুদিনীকে নিন্, রাজচটক হবে।
নসে। তবে আমার বরের কি হবে?
পুরো। ঐ তো তোমার মামা অার উনি রইলেন।
(বদ্যিনাথের প্রবেশ।)
বদ্যি। ছিষ্টিধর বাবুকে কুমুদিনী গুঁই মিনেজারিতে টেনে নিয়ে গেল, তানইলে তিনি আসতেন, কি? বরের দরকার, তা আমি আছি ভয় কি নসিরাম বাবু?
শশী। ও দিনু, ধরে যে!
দিনু। ধরে ধরুক্, আমিও মরিয়া হয়েছি, তুমিও মরিয়া হও।
শশী। আচ্ছা মরিয়া হলেম।
পুরো। বেশ বেশ, তবে আপনারা বে করুন, অাহা রাজচটক হবে, রাজচটক হবে!
(শশী ও দিনু ব্যতীত) সকলে। বেশ বেশ বেশ! আপনি তবে মন্তর পড়ান্।
পুরো। তোমরা অাপনা আপনি মন্তর পড়ে নাও।
দিনু। সে কি হয়! আপনি মন্তর পড়ান।
পুরো। এ বের এই মন্তর!
দিনু। এই কথাটা ঠিক্ বলেছেন!
(সকলের নৃত্য-গীত।)
কারখানা জমকাল—
এখন চলন হলে খুব ভাল॥
এই মলো তো এই মলো, বে হলো তো বে হলো,
খুব সোজা ওর বোঝা এ নিলে,
খুব মজা ফের বোঝা এ দিলে,
ক্যা জুৎ, ক্যা পুরুৎ কণে বর মজ্বুৎ,
উমেদার বর আবার বাঙ্গলা হলে উজ্জ্বলো,
মুখআলো॥
ষষ্ঠ দৃশ্য।
রাস্তা।
(ওল্ড ইয়ার নিউ ইয়ার ও কৃষ্মাসের প্রবেশ ও নৃত্য)
(সভ্যতার প্রবেশ।)
সভ্যতা।
গীত।
তোম্ তোম্ ফার্ষ্ট্ ক্ল্যাস্ নিউইয়র।
তোম্সে কাম্ চলেগা বেহেতর্
ওল্ড ইয়ার নো ফিয়ার!
এ তোমরা কাম্,
মেরা বাড়েগা নাম,
তোম্কো দেগা এনাম;
বাড়তে রহো, কাম কর্তে রহো,
বাংলা চায়েন কর, বাংলা মেরি ডিয়ার।
দেখো কৃষ্টমাস্ ভেরি মেরি,
মেরি ময়বি ভেরি।
তোম পিয়ারা মেরা মেরি ল্যাড চেরি।
দিয়া বাংলা তুঝেমে,
খেলো মজেমে
কেষ্কো কেয়ার, খেল্তে রহে হিয়ার॥
সপ্তম দৃশ্য।
সাতপুকুরের বাগান।
নীলাম ঘর।
(বিডার (নসে), সেলমাষ্টার, রাইটার, ক্রায়ার, বুককিপার, বেহারা, বৃদ্ধা, ফিমেল ক্রেতাগণ, বিশ্বেশ্বরী, বরগণ ইত্যাদি।)
ক্রায়ার। লাট সাবুন্টীওয়ান। নিয়ে অায়, নিয়ে অায়। ও দাঁত দেখ্চেন কি? পঁচিশের ঊর্দ্ধ বয়স নয়। পা দেখ্তে হবে না, বেশ নাচ্তে পারে, থিয়েটারে ক্লাউন সাজ্তো, মাজখানে সিঁতে, গালে জুল্পি, পাজীর পাজী রোজ দু তিন ঘা লাথি মার তাতে রাজী। হাওয়া খেতে নিয়ে যাবার সাথি আর এমন পাবেন না। সিগারেট ধরিয়ে দেবে, পাইপ টান্বে, যে কিন্বে তারে মনিব জান্বে।
১ম স্ত্রী। আট আনা।
বিডার। গোইং, গোইং, এইট্ অ্যানাজ, এইট অ্যানাজ্।
বৃদ্ধা। টেন অ্যানাজ্।
বিডার। বাড়ুন বাড়ুন, দশ আনায় এমন মাল্টা বিকিয়ে যাচ্চে।
৩য় স্ত্রী। এগার আনা।
১ম স্ত্রী। ইলেভেন হাফ্।
বৃদ্ধা। ইলেভেন অানাজ্ থ্রি পাই।
বিডার। পৌনে বার আনায় যাচ্চে পৌনে বার আনায় যাচ্চে। ডাকুন ডাকুন, ইলেভেন অ্যানাজ্ থ্রি পাই, ইলেভেন্ অ্যানাজ থ্রি পাই। ইলেভেন অ্যানজ থি, পাই (বিড)
রাইটার। আপনার নাম কি?
বৃদ্ধা। ধনমণি পোদ্দার।
রাই। কুমারী না বিধবা?
বৃদ্ধা। সধবা।
রাই। তা বুঝি হাওয়া টাওয়া খাওয়ার মতন নিলেন্?
বৃদ্ধা। তা বইকি।
রাই। এই টিকিট নিন্, ক্যাসঘরে টাকা জমা দিন্গে, রসিদ পাঠিয়ে দেবেন, মাল ডিলিভারি দেব।
বৃদ্ধা। দাঁড়াও, আমি আরো মাল কিন্বো, একেবারে টাকা জমা দেবো। কি জানেন্ পাঁচটি স্বামী আমার মারা গিয়েছে, গোটা পাঁচ ছয় কিনে রাখি, যটা মরে যটা থাকে।
রাই। তা নিন্ না যটা নেবেন মালের অভাব কি।
ক্রায়ার। লাট সাবুণ্টী টু। জেতে চাষা, বড্ড পোষা, জুত বুরুষ করে খাস। ফুলগাছে জল দেবে, ফুলের তোড়া করবে, আর চাবুক বা লাথি জঘা মার তা খাবে।
১ম স্ত্রী। ফাইভ্ অ্যানাজ্।
বৃদ্ধা। টেন্ অ্যানাজ্।
৩য় স্ত্রী। ওয়ান রূপি।
বৃদ্ধা। টু-রূপিজ্।
বিডার। টু রূপিজ্, টু রূপিজ্, টু রূপিজ্ (বিড্)
যুবা। ওরে মেদো। এই যে বুডী বেটীই সব কিনচেরে! ওগো ও খদ্দের! শোনো না, তুমি আমায় কিনো, আমি বড় খাসা বর।
১ম স্ত্রী। দাঁড়াও, তুমি আগে লাটে ওঠো তারপর বিবেচনা।
যুবা। দোহাই বাবা! ও বুড়ীবেটী না কিনে নেয়!
ক্রায়ার। লাট সাবন্টী থ্রি। বয়েস আটাশ, খাট্বে এটওটা ফাই ফরমাস, গান গাবে, হারমোনিয়ম্ শেখাবে, জ্যুয়েলা জিকেল গার্ডন দেখাবে। আর হাই সার্কেলে ইন্ট্রোডিয়ুস করে দেবে।
বুদ্ধা। টু রূপিজ।
১ম স্ত্রী। থ্রি রূপিজ।
বৃদ্ধ। সিক্স।
বিডার। সিক্স রূপিজ, সিক্স রূপিজ, সিক্স রূপিজ (বিড)!
যুবা। মেদো! তুই থাকতে হয় থাক অামি আর বরগিরি করবে না।
বেয়ারা। এই চোপ্।
ক্রায়ার। লাট সাবুন্টী ফোর! দেখ্তে বুড়ো, কিন্তু আটে পিটে দড়। খোঁপা বেঁধে দেবে, সেজ সাজাবে, ছারপোকা মারবে, মশারি সেলাই করবে। আর যদি কেউ ভদ্দরলাক দেখা কর্ত্তে এসে, তখনি সেখান্ থেকে সরবে।
১ম স্ত্রী। টু পাইস।
৩য় স্ত্রী। থ্রি পাইস।
১ম স্ত্রী। থ্রি হাপ্।
৩য় স্ত্রী। ফোর।
বিড়ার। গোইং, গোইং ফোর। ফোর পাইস্, ফোর পাইস্। মাইডিয়ার! বড সস্তাদরে মাচ্চে তুমিই ডেকে রাখ।
বিশ্বে। না মাইডিয়ার!
বিডার। আরে বোঝোনা; ডেকে রাখ, মালটা লাভে ছাড়তে পার্বে।
বিশ্বে। না মাইডিয়ার! ও রদি মাল আমি রাখ্বোনা।
বিডার। তবে বোঝো। ফোর পাইস্ (বিড)
রাইটার। আপনার নাম?
৩য় স্ত্রী। মনমোহিনী কুণ্ডু।
রাইটার। সধবা না বিধবা?
৩য় স্ত্রী। বিধবা।
রাইটার। ভালই হয়েছে। উনিও তেজ পক্ষের।
৩য় স্ত্রী। কি ওঁর দুই স্ত্রী মারা গিয়েছে নাকি?
রাই। মারা কেউ যায় নি। একটী সার্কাস কর্তে বর্ম্মায় গিয়েছে, আর একটি বেম্ম বিবাহ করেছে। তবে আর বলছি কি, মাল বড় ভাল মাল, আপনি যদি থিয়েটার ক’রতে যান্ ম্যানেজারকে রেকমেণ্ড করবে। ক্যাস্ ঘরে পয়সা জমা দিন, রসিদ পাঠাবেন, মাল ডিলিভার দেব।
ক্রায়ার। লাট্ সাবুন্টীফাইভ। এটির বয়েশ পাঁচ বচ্ছর, হুইস্কী টানে খুব জবোর, কথা কয় হেসে ছেলে, যে কিন্বে তুলে রেখো গেলাশ কেশে।
ক্ষুদে বর—
গীত।—
হাম্টী ডাম্টী টম্টী টম্।
কাম্ লেডি কাম্, খাসা বর্ হ্যায় হাম্,
লাল্ লালা তারা রারা তারা রারা তারা রারা রা।
টেক্ মাই হ্যাণ্ড ওল্ড্ লেডী ফেয়ার,
হুয়া ক্যাসা খাশা পেয়ার,
লেট্ আস্ বি জলি, কাম ওল্ড্ পলি,
কিস্মি কুইক্ নো ডিলিড্যালি,
লাল্ লালা্ সা নি ধা পা নি সা সা,
তারা রা রা রা তার রা রা রা॥
ক্রায়ার। এ বরের বড় বেশি দর। বড় বেশি দর। পঞ্চাশ টাকা বাঁধা, বিট্ তার ওপোর। তা দেখুন, আপনার সব শেয়ারে নিন, এক এক উইক্ এক এক জন গেলাশ কেশে রেখে দিন।
ফিমেলগণ। লাটে চড়াও, লাটে চড়াও।
বৃদ্ধা। কি, বিড্ করবে? পারবে না।
ফিমেলগণ। আমরা শেয়ারে নেব, আমরা শেয়ারে নেব।
বৃদ্ধা। আচ্ছা লাটে উঠুক, আমার বিড্ সিক্সটী রূপিজ।
ফিমেলগণ। হাণ্ড্রেড।
বৃদ্ধা। বড্ড বেশি দর হলো।
বিডার। গোইং গোইং, হাণ্ড্রেড্, হাণ্ড্রেড্, হাণ্ড্রেড্ (বিড্)
ক্ষুদে বর। আমি যাবনা। আমি একে ছেড়ে যাব না। খুব হুইস্কী খায়।
এক ফিমেল্। এস যাদু এস! আমি কেক্ দেব।
ক্ষুদে বর। না, ফাউল্ রোষ্ট আর হুইস্কী।
এক ফিমেল। এই নাও। আমার কেটীংয়ে বসে গে।
ক্ষুদে বর। আর লেগ্ মটোন্।
এক ফিমেল। এই নাও।
ক্ষুদে বর। আর ডাইনীং নাইফ, ডাইনীং ফর্ক, কর্ক স্ক্রু।
এক ফিমেল। এই নাও।
ক্ষুদে বর। আর টাম্ব্লার গেলাশ।
এক ফিমেল। এই নাও।
ক্ষুদে বর। আর সোডাওয়াটার।
এক ফিমেল। এই নাও।
বৃদ্ধা। এর বয়েস কত?
যুব-বর। যত হোক্ না, তোর বাবার কি? খবরদার গায়ে হাত দিস্ নি। তোর বরগিরীর মুখে মারি বিশ্ লাথি!
বেহারা। চোপ্ চোপ।
যুব-বর। চোপ রাও। ওস্কো হটায় লেও। হাম কামড়ায়েগা।
বেহারা। আরে চোপ্রাও, চোপ্রাও।
যুবা বর। আজ খুনোখুনি হব। নেইরহেঙ্গে! ছোড় দেও ছোড়দেও!
[ষ্টল কঁধে করিয়া পলায়ন।
বেয়ারাগণ। পাক্ড়ো, পাক্ড়ো। (পশ্চাদ্ধাবন)
ফিমেলগণ।
(গীত।)
খেংরা মারো অকসানে।
কে জানে আস্তো কে এখানে॥
মালগুলো পালালো, সয় বল কার প্রাণে॥
ক্ষুদে বর। মাইজডিয়ার ডোন্টক্যার এই আছি।
ফিমেলগণ। এই কচি, বখরাদার এর আবার।
রিডার। কে বিডার? আমরা ফ্রেষ লট্ এবার।
সেলমাষ্টার। সেল্ মাষ্টার,
বুক্কিপার। বুক্কিপার,
বেয়ারার। বেয়ারার,
বিশ্বে। কে শোনে, রদিমাল কে কেনে।
মহিলাগণ। ভারি খেদ, ছেল জেদ,
পাঁচটা লাট্বিট দেবো মাল নেবো,
সাজিয়ে রাখবো বাগানে।
ফেটিনে নিয়ে যাব ময়দানে॥
অষ্টম দৃশ্য।
রাস্তা।
কৃস্মাস্ ওল্ডইয়ার উইয়ার। বড়দিনের খেল।
নবম দৃশ্য।
গ্রীষ্ম ঋতু।
(নায়ক-নায়িকার গীত।)
টলে লালরবি, টলে লাল রবি।
লাল তোমারি বদন ছবি॥
লাল আভা নয়নে, গগনে লাল মেঘদল,
রবি টলে, টলে টলে ঢলে জলে;
চাহি ফটিকজল চাতক কাতর,
থাকি থাকি পাখী সকরুণ বোলে,
দে জলদে কত নিদয় হবি।
পাখী কহিছে ছলে,
চাহ ফটিক জল দারুণ তৃষা কেন সহ;
চ্যুত লতিকাদল ধীর সমীরে দোলে,
ডাকি কহে পাখী ছলে,—
পিও পিও বারি মোহন মোহিনী,
হের মোহিনী মাধুরী মাধবী॥
(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)
বর্ষা ঋতু।
(নায়ক-নায়িকার গীত।)
গভীর মেঘদল গরজে।
বাজে বাজে প্রাণে, থেকনা থেকনা,
থেকনা থেকনা দূরে,
চাহি চুমিতে মুখ সরোজে।
চমকি চাকিচূকি, চমকি চমকি লুকি
চপলা, মন উতলা,
নীরদ ঢালিছে ধারা তর তর ঝর ঝর,
চমকি শিহরি ঘন, নয়ন নীর ধারা নেহার,
কাতর কুলিস কঠোর কত বাজে।
বাজে বাজে, না জেনে না বুঝে তোরি প্রেমে মজে॥
( রঙ্গদার রঙ্গদারণীর-রঙ্গ।)
শরৎ ঋতু।
নায়ক-নায়িকার গীত।
মেঘে আর চাঁদ ঢাকে না।
বদন খানি আর ঢেকনা॥
চাও হে চাও দেখি আঁখি,
ফুটলো কলি ঐ দেখনা॥
সোহাগে কইছে কথা তরুলতা,
কেন ব্যথা দাও বলনা॥
ছলনা আর কোরনা,
রাগের ভরে তার থেকনা।
কোরনা পর কোরনা,
সাধের শরত বাদ সেধন॥
হাসবে কমল হেরে হাসি,
শশির হাসির মান রেখনা॥
(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)
হেমন্ত ঋতু।
তোরি অাশে।
হের বেশভূষা পরি দাঁডায়ে রয়েছে উষা,
হেরিতে সাধ তব রাঞ্জিত অধরে,
আদরে এখন দাঁড়ায়ে উষা তোরি তরে,
তোরি আশে॥
প্রাণ মন মম আশে বিলাসে, ভাসে ভাসে॥
নীহার হার পরি; ঝর ঝর তর তর-
ঝরিছে মুকুতা পাঁতি,
রঞ্জিত কুসুমিত রমিত মোহিত বনরাজি;
হেমন্ত হিল্লোলে, হেমশির্ষ দোলে,
প্রান্তরে তরঙ্গ মালা,
হেলা দোলা, অঙ্গ তরঙ্গিত,
হেরিতে পিয়াস বিভোলা;
কপোত কপতী কত সোহাগে কহিছে কথা,
ব্যাকুল খেলিতে ভাসিতে সমিরে,
হেমকিরণ মাখি সাজি;
পাখী জাগে,
মাতি তরুণ রাগে গাইছে,
পবন কাকলি বহে,
গায়িছে পাখী অনুরাগে;
হৃদয়ে তোমারে ধরি,
বদন রাগ হেরি,
নয়নে নয়ন অভিলাষে॥
( রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)
শীত ঋতু।
নায়ক-নায়িকার গীত।
হের ধূসর দিশা।
ধূসর ধূমরাশি নিবিড় কুয়াশা—
অাদরে করিছে মানা,
যেওনা যেওনা নিশা,
যুবক যুবতী সাধ রহিল,
রহিল তোমারি বিধুমুখ সুধা পান তৃষা॥
বরিষা ইরিষা করি ধূসর রেণু কত উড়িছে ঝরিছে,
কিশোর অরুণ কর বারিছে;
লোহিত সিত পীত তরে তরে ফুল কলি,
তারকা মেঘ ঢাকা;
না হেরি উষা ব্যাকুল পাখী,
শাখা শীরে বসি রহি রহি বোলে,
চ্যুত মুকুল দোলে কিরণ চুম্বন আশা॥
চঞ্চল চিত মম নয়ন কিরণ তব চুমিতে পিপাসা॥
(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)
বসন্ত ঋতু।
নায়ক-নায়িকার গীত।
স্বরে তোর মন মেতেছে কোকিলে ঐ কুহরে।
গাঁদা গোলাপ হার গেঁথেছে,
চেয়ে আছে তোর অধরে॥
কিশলয় কাঁপিয়ে মলয়,
তোর কথা কয় আমোদ ভরে,
বয় ধিরে সৌরভ বয়ে,
গা ছুঁয়ে তোর যায় আদরে॥
গুঞ্জরে ঐ ভ্রমরা ফুলে টলে ধায় বিভোরে,
চায় তোরে মন বিভোরা,
অাঁখি বিভোর হেরে তোরে॥
(রঙ্গদার রঙ্গদারণীর রঙ্গ।)
দশম দৃশ্য।
পশুশালা।
কিপার কিপারেস্ প্রভৃতি গীত।
সকলে। তামাসা চল্তা হায় বহুৎ উমদা।
হোগা ফায়দা, দেখো হিঁয়া ক্যাসা জুদা কায়দা॥
পুগণ। জানি মস্তি হুয়া,
স্ত্রীগণ। কেত্না কুস্তী কিয়া,
সকলে। ট্রাপেজ প্যারালেল্ বারমে ক্যা কহে তুমে,
উল্টি পাল্টি লট্ লট্ তব্ ছুটী,
স্ত্রীগণ। উনে কিরা খায়া,
পুগণ। জানি না হায়রাণ ভয়া,
স্ত্রীগণ। যেসা সেঁইয়া পেয়ার,
পুগণ। পিয়ারি যেসি জানি মেরা।
সকলে। খেলে গা জানোয়ার মাদি মরদা।
কিপার। আমাদের প্রথম তামাসা-সংস্কারক বৃষ ও গাভী।
(বৃষ ও গাভী লইয়া বেহারার প্রবেশ।)
গাভী। মাইডিয়ার বুল! তুমি আর ঘাস খেওনা।
বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমি আর দুদ্ দিওনা।
গাভী। না দুদ্ দেব না, তুমি বল ঘাস খাবে না?
বৃষ। না।
গাভী। প্রতিজ্ঞে?
বৃষ। প্রতিজ্ঞে।
গাভী। এসো সেক্হ্যাণ্ড করি। মাইডিয়ার বুল! তুমি উলঙ্গ ষাঁড় দেখ্লে গুঁতিও।
বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমিও উলঙ্গ গাভী দেখ্লে গুঁতিও।
গাভী। প্রতিজ্ঞে?
বৃষ। প্রতিজ্ঞে।
গাভী। এস সেক্হ্যাণ্ড করি। মাই ডিয়ার বুল্! জবাই হইও, অম্নি মরনা।
বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমি ও জবাই হইও অম্নি মরো না।
গাভী। না।
বৃষ। না।
গাভী। প্রতিজ্ঞে?
বৃষ। প্রতিজ্ঞে।
গাভী। এস সেক্হ্যাণ্ড করি। মাইডিয়ার বুল্! এখন ত’মলে আর কি করবে?
বৃষ। মাইডিয়ার কাউ! তুমিও তো মলে আর কি করবে?
গাভী। তাই তো!
বৃষ। তাই তো!
গাভী। প্রতিজ্ঞে?
বৃষ। প্রতিজ্ঞে।
(উভয়ের গীত।)
রিফর্ম্মার আমরা দুজনে।
দুজনে প্রথমে দেখা ময়দানে॥
তর্ক প্রথম অব্ সিনিটী নে,
তার পর কোর্ট-সিপ করে বে,
তার পর শুনলে প্রতিজ্ঞে,
শুন্লেন তো গুণ, এখন মানুন না মানুন,
যত ষাঁড় অাছে আর গরু অাছে,
আমাদের খুবজানে, খুবমানে॥
কিপার। আমাদের দ্বিতীয় তামাসা—অধ্যাপক গর্দ্দভ।
(গর্দ্দভ লইয়া বেহারার প্রবেশ।)
গর্দ্দভ! আমার এমন সুশ্রী গড়ন ছিলনা। মাথাটা গোল, মুখ খানা চেপ্টা, দুপায়ে হাঁট্তুম, গায়ে মাছি বস্লে একটী লেজ নেই যে তাড়াই।
কিপার। আচ্ছা তবে এমন সুঠাম চেহারা হলো কিসে?
গর্দ্দভ। ছেলে বয়সে এক বোঝা বই মাথার চাপালে, মাথাটা চেপ্টে গেল। চড়িয়ে মুখ লম্বা করলে। তার পর পিটের ওপর দু ছালা বই দিতেই হুম্ড়ি খেয়ে পড়লুম, চার পায়ে হাঁট্তে শিখ্লুম। কান্ দুটো টেনে টেনে লম্বা হলো, আর লেজ্ বেরুলো আপ্নি।
কিপার। ডাক্তে শিখ্লে কি করে?
গর্দ্দভ। ও লেজও বেরুনো ডাক ও খোল!
কিপার। এখন কি করবে?
গর্দ্দভ। ট্রেনিংস্কুল।
কিপার। তার পর?
গর্দ্দভ। যারা ভর্ত্তি হবে তারা ঠিক্ আমার মতন হয়ে বেরুবে।
কিপার। তারা কি করবে?
গর্দ্দভ। ঘাস খাবে, ধোপার বোঝা বইবে, আর বেয়াড়া ডাক্ ডাক্বে।
গর্দভ।
গীত।
কে আস্বে আমার স্কুলে।
যাবে তিন দিনে তার লেজ ঝুলে॥
আমার এমনি কসে টান্,
এক্টানে তার লম্বা হবে কান্
চল্বে চারটি-খুরে,
গলাবাজী করবে জোরে,
ফুলে ফুলে ঘাড় তুলে॥
কিপার। আমাদের তৃতীয় তামাসা— স্মার্ত্ত বানর বানরি।
(বানর বানরী লইয়া বেহারার প্রবেশ।)
বানরি। প্রত্যেক বানর ও বানরি কি মানুষের অনুকরণ করিতে বাধ্য?
বানর। বাধ্য। কারণ বিজ্ঞান মতে তারা স্বজাত।
বানরি। চুরি কর্তে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। বড় বানরের লেজ ধর্তে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। ঝগ্ড়া করতে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। দাঁত খিঁচুতে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। আঁচড়তে কামড়াতে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। বানরি বানরকে লাথি মারিতে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। ডাইভোর্স অর্থাৎ ফারখৎ করিতে বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। এখনি বাধ্য?
বানর। বাধ্য।
বানরি। তবে যাও।
বানর। আচ্ছ চল্লুম, দেখি এমন বাঁদর কোথা পাও।
বানরি। অারে নাও নাও, তোমার মতন ধাড়ী বাঁদর গণ্ডা গণ্ডা। যে দিকে চাও, দেখে নাও, আমি দেখ্বো কোথা বাঁদরি পাও।
বানর। অভাব কি? রাস্তায় ঘাটে মাঠে—
বানরি। তবে ডাইভোর্স?
বানর। ডাইভোর্স।
উভয়ে গীত।
দুজনে ছিলাম রেতে দুডালে।
হোলে শুভ দৃষ্টি সকালে॥
দুপুর বেলা এক ডালে বসে,
সজ্নে পাতা ঠুসেছি ক’সে,
কিচি কিচি দুপুর থেকে
ফারখৎ হলো বিকেলে॥
কিপার। আমাদের চতুর্থ তামাসা—ভলেণ্টীয়ার ভেড়া।
(ভেড়া লইয়া বেহারার প্রবেশ।)
কিপার। তুমি লড়্বে?
ভ্যাড়া। লড়্বো।
কিপার। কার সঙ্গে?
ভ্যাড়া। কারুর সঙ্গে না, আপনা আপনি।
কিপার। ঘোড়া চড়্বে?
ভ্যাড়া। চ’ড়বো।
কিপার। কি ঘোড়া?
ভ্যাড়া।কাটের ঘোড়া।
কিপার। বন্দুক ছুড়বে?
ভ্যাড়া। ছুড়বো।
কিপার। কি করে?
ভ্যাড়া। চোক্ বুজে।
কিপার। ঘোড়া থেকে পড়্বে?
ভ্যাড়া। পড়বো।
কিপার। কখন?
ভ্যাড়া। বন্দুক ছুড়বো যখন।
কিপার। যদি কেউ লড়াই কর্তে এসে?
ভ্যাড়া। তা আমার কি? দৌড় মারবো ক’সে।
কিপার। তোমার মত ভ্যাড়া ভলেন্টীয়ার কটী আছে?
ভ্যাড়া। এক পাল ভ্যাড়া, এম্নি সিং মোচড়া, এম্নি রোকে এম্নি তাল ঠোকে, যদি কারু সাড়া পায়, এমনি চার পা তুলে পালায়।
কিপার। দাঁড়াও দাঁড়াও, একটি গান গাও।
ভ্যাড়া।
গীত।
শেম শেম, কাউয়ার্ড নেম,
রাখ্বো না আর ভ্যাড়ার পাল।
তোষ দান বাঁধা বন্দুক কাঁধ,
ভারি মিলিটারি চাল॥
রাগে ফাটি, বাটী বাটী অামানি খাই সাঁজ সকাল॥
লড়তে এলে বন্দুক ফেলে চার পা তুলে
পেরুই খাল॥
হর্দম্ হর্দম্ রেগে লাল, পুরু ছাল॥
কিপার। আমাদের পঞ্চম তামাসা— হাড়গিলে কমিসনার।
(হাড়গিলে লইয়া বেহারার প্রবেশ।)
কিপার। যখন এসেছ পরিচয় দাও, তুমি হেথায় কেন?
হাড়গিলে। আমায় চেন? অামায় জান? আমি হাড়গিলে।
কিপার। নামটি কোথা পেলে?
হাড়গিলে। সায়েবদের এঁটো হাড় গিলে গিলে।
কিপার। কোথায় থাক?
হাড়গিলে। টেক্সর বিলে।
কিপার। কেন এয়েছো?
হাড়গিলে। কমিসনার হব বলে।
কিপার। তা হে তায় এয়েছ কি করতে?
হাড়গিলে। ভোট নিতে।
কিপার। কমিসনার হোয়ে কি করবে?
হাড়গিলে। দেখছো দুটো ঠোঁট্?
কিপার। দেখছি।
হাড়গিলে। শুনেছ খাই এটোঁ হাঁড়?
কিপার। শুনেছি।
হাড়গিলে। এখন রেয়োতের হাড় মাস খাবে।
কিপার। ত। পারো পারো।
হাড়গিলে
গীত।
আজ ভোট দিয়ে কাল ওপারে যেও উঠে।
বাজাবো ঠোঁটে ঠোটে, নেব লুটে পুটে।
বলি ভালোয় ভালোয়,
পালাও আলোয় আলোয়,
নইলে মুস্কিল, রোজ বস্বে শীল,
চাটী ভিটে মাটি, থাক্বেনা ঘটী বাটী,
পালাতে হবে ছুটে, এক ছুটে॥}}
কিপার। আমাদের ষষ্ঠ তামাসা—পুজরি ভালুক ও যজমানি ভালুকী।
(ভালুক ভলুকী লইয়া বেহারার প্রবেশ)
ভালুকী। ইস্, তুমি ভারি টল্চ্ছো!
ভালুক। তুমি যে থাবা থাবা মোউও খাইয়েছ, তাতে নেশা হয়েছে!
ভালুকী। নৈবিদ্দি কর’বো কোন ঠাকুরের?
ভালুক। তা বল্তে পারিনি, নৈবিদ্দি সাজাও!
ভালুকী। পুজা হবে কার?
ভালুক। তা বল্তে পারিনি, ফুল দাও!
ভালুকী। মন্তর পড়ছো কি?
ভালুক। তা বল্তে পারিনি তুমি শাঁক বাজাও।
ভালুকী। কেন পূজো করছো?
ভালুক। তা বল্তে পারিনি আমায় ধর।
ভালুকী। কেন ধরবো কেন?
ভালুক। তা বল্তে পারিনি, একটু শোবো।
ভালুকী। তবে মরো।
ভালুক। তা বল্তে পারিনে, ঘুমবো।
ভালুকী। যজমান বাড়ি যাবে না?
ভালুক। তা বল্তে পারিনি, ডোরা টান্বো।
ভালুকী। পোড়ার মুখো! দু থাবা মৌও খেয়ে চেত্তা মার্বি।
ভালুক। তা বল্তে পারিনি, কুস্তী লড়বো!
ভালুকী। কুস্তী লড়বি কার সঙ্গে?
ভালুক। তা বলতে পারিনি, নাচ্বো।
ভালুকী। নাচ্বি কার সঙ্গে?
ভালুক। তা বল্তে পারি,—তোমার সঙ্গে, তোমার সঙ্গে, তোমার সঙ্গে।
উভয়ে গীত।
নাচি ঠুম্কী ঠুম্কী নাচি ঠুম্কী ঠুম্কী।
আমরা চাঁদমুখো আর চাঁদমুখী॥
পিরীত মাখামাখি, দুজনে মেতে থাকি,
জ্বরে ধুঁকী, আর মৌও চাকি,
পিরীত বাধ্লো যখন আমরা খোকা খুকী॥
ভোরে হাওয়া খেতে, পিরীত বাধ্লো পথে,
এখন জানাজানি ছিল লুকো লুকী।
শ্রীযুক্ত গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রণীত
১৮৯৪ সালের বডদিনে মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত।
[১৩০১ Sak]