হাওড়া – আইন আদালত, সেকাল থেকে একাল

Alok Bhattacharyya , Advocate Howrah District Court

Howrah – Court And Law From Past To Present

Alak Bhattacharya (Advocate)

DATE: 30/1/2022

হাওড়া – আইন আদালত, সেকাল থেকে একাল

Law

1

শিরোনাম থেকেই অনুমান করা যেতে পারে বিষয়টির ব্যাপকতা গভীরতা সেইসঙ্গে জটিলতা । সোজা কোথায় বিষয়টি মোটেই সহজ নয় । কারণ আদালতের ইতিহাস মানে তো শুধু কবে কথায় আদালত ভবন নির্মিত হয়েছে তার তথ্য পেশ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে শাসন ব্যাবস্থার ক্রম বিবর্তন, তারি সাথে আইনের বিবর্তন ,এরই সাথে আছে বিখ্যাত সব আইনজীবি, বিচারক দের কথা, বিখ্যাত কিছু মামলার কথা । এই অতি কঠিন বিষয় মুন্সিয়ানা দেখাবো, সে এলেম আমার নেই। ইতিহাস – বিশেষজ্ঞ তো দূরের কথা , সে অর্থে আমি ইতিহাসের ছাত্র ও নই। তবে ইতিহাস প্রেমী। আর, নয় নয় করে আদালতের অলিন্দে আমিও তো কম দিন ঘুরলাম না। চক্ষের সামনে দেখলাম আদালতের কত পরিবর্তন। সে অর্থে এ ইতিহাসের আমিও এক সাক্ষী । তাই এ রচনা কিছুটা আমার স্মৃতি কথন ও বটে ।

বিচার ব্যাবস্থার বিবর্তনের সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে শাসন ব্যাবস্থার বিবর্তন। যেমন যেমন রাজা পাল্টায় তেমন তেমন বিচারের ধারা পাল্টায়।তাই আলোচনার গোড়ায় বাংলার শাসন ব্যাবস্থার পর্যায় গুলি একটু উল্লেখ করি। এক, নবাবী আমল, যা শেষ হলো ১৭৫৭, পলাশীর যুদ্ধ । পতন হলো সিরাজুদৌল্লার, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব । দুই, শুরু হলো কোম্পানি আমল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বনিকের মান দণ্ড দেখা দিলো রাজদন্ড রূপে। চললো পাক্কা একশো বছর । শেষ হলো সিপাহী বিদ্রোহ এ । ১৮৫৭ । তিন এলো রানী ভিক্টরিয়ার রাজত্ত। ইংরেজ আমল । শেষ হলো স্বাধীনতায় ১৯৪৭ । চার স্বাধীনতা উত্তর যুগ যা চলছে ।

এবার আসি আসল কথায়, নবাবী আমলে কেমন ছিল হাওড়ার বিচার ব্যবস্থা? কোথায় ছিল সে আদালত ? সকলেই জানি বিচারের দুটো ভাগ, দেওয়ানী আর ফৌজদারি, মানে সিভিল আর ক্রিমিনাল। নবাবী আমলে দেওয়ানী বিচার করতো হাবিলদার আর ফৌজদারি বিচার করতো কাজী । বিচার হতো ইসলাম আইন অনুসারে।হাওড়ায় নবাবী আমলের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায় চন্দ্র কান্ত ব্যানার্জীর “হাওড়া – এন একাউন্ট অফ পাস্ট এন্ড প্রেসেন্ট” বইটিতে (1) । চন্দ্র কান্ত ব্যানার্জী ছিলেন ইংরেজ আমলের ম্যাজিস্ট্রেট (2) । মূল বইটি পড়ার সৌভাগ্য হয় নি। তবে অচল ভট্টাচার্য তার হাওড়া জেলার ইতিহাস ২য় খন্ড পৃ : ৬ গ্রন্থে সি আর ব্যানার্জী র বইটি থেকে যা উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা উল্লেখ করছি । “বর্তমান কোম্পানীর বাগানের (3) মধ্যে বাঙ্গালার নবাবের দরবার গৃহ ও হওয়া খানায় একটি ক্ষুদ্র অট্টালিকা ছিল । নবাব যখন মফস্বল সফরে বার হতেন তখন এখানে সময় সময় আসিয়া দরবার করিতেন ও মহাসমারোহে পান ভোজন আনন্দ উৎসব চলিত । বছরের অন্য সময়ে এই দরবার গৃহে ফৌজদারী বিচারক কাজি সাহেবরা ও দেওয়ানী বিচারক হাবিলদার বা হালদার মহাশয়রা কাছারি করিতেন । বিচার প্রার্থী গণ একটি মোরগ ও একটি পাঁঠা বলি দিয়ে এই আদালতে উপস্থিত হইতেন । “সি.আর. ব্যানার্জী র বইটি ইংরেজি ভাষায় রচিত। এই অংশ টির অনুবাদক শিবপুর কাহিনী গ্রন্থর রচয়িতা অন্নদা প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় । কোম্পানি বাগান অর্থাৎ বোটানিকাল গার্ডেন। আমার নিজের অনুমান শুধু কোম্পানি বাগান নয় হাওড়া জনপদে [ তখনও হাওড়া জেলা হয় নি ] এই রকম নবাবী আদালত নিশ্চয় আরও ছিল। তবে তা কোথায় কেমন ছিল তা ইতিহাস অনুসন্ধানের বিষয় ।

বর্তমানে কোর্ট সম্পর্কে আমাদের যা ধ্যান ধারণা তার সূচনা কোম্পানি আমলে । ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যাবসার স্বার্থে পত্তন করলো আইন, বিচার ব্যবস্থা, বিচারলয় । বলার অপেক্ষা রাখেনা তা হলো ইংল্যান্ড এর তদকালীন আইন ও বিচার ব্যাবস্থার ওপর ভিত্তি করে । ভারতে প্রথম হাইকোর্ট স্থাপিত হলো কলকাতায় । ১৮৬২ সালে । হাই কোর্টের সাথে সাথে জেলা গুলিতে স্থাপিত হলো হাইকোর্টের অধীনস্থ জেলা আদালত । সেই ভাবে হাওড়া তেও পত্তন হলো আদালত বা কোর্ট।বর্তমানে হাওড়া জেলা জর্জ আদালত প্রাঙ্গন টি কোথায় তা আমরা সকলেই জানি । সচেতন ভাবেই আমি ‘প্রাঙ্গন’ শব্দটি ব্যবহার করলাম । কারণ আদালত ভবন একটি নয় , অনেক গুলি বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে । আসলে এই ভবন গুলি সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা করে নির্মিত হয় নি । হয়েছে প্রয়োজনের তাগিদে যখন যেখানে স্থান পাওয়া গেছে, সেই ভাবে । হাওড়া শহরে স্থানাভাব নতুন নয় । আসল কথায় ফিরি । এই আদালত ভবন কবে নির্মিত হলো, তার কি কি পরিবর্তন হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তার বিস্তারিত আলোচনায় আমি পরে আসছি । তার আগে জানাই, উত্তর হাওড়ায় সালকিয়াতে ছিল কোর্ট । নাম সিভিল কোর্ট অফ সালকিয়া । কি ভাবছেন, এ তথ্য কোথায় পেলাম ? পেলাম সেই অচল বাবুর বইতে । দ্বিতীয় খন্ড পৃষ্ঠা ৬ এবং ৭ । প্রিয়নাথ মান্না প্রজা বনাম জমিদার প্রতাপচন্দ্র ঘোষ, নং ২৮৪ অফ ১৮৭৫, মামলার বিচার হয় সিভিল কোর্ট অফ সালকিয়া আদালতে । এখন প্রশ্ন সালকিয়ার কোথায় ছিল এ আদালত । অচল বাবু জানাচ্ছেন সালকিয়ার সীতানাথ বসু লেনে কাছারি বাড়ীতে বসতো এই আদালত । পরে হাওড়া আদালত প্রাঙ্গনে এটি সাথে স্থানান্তরিত হয় । অনুমান ক্রমে সালকিয়া নামটি উঠে গিয়ে হাওড়া আদালত রূপে পরিচিতি পায় । এবার আসি আসল কথায় । এই দেখুন কথায় কথায় আসল কথা বলা আমার মুদ্রা দোষ হয়ে গেছে । এতক্ষন যা বললাম তা কি নকল কথা ! যাক ছাড়ুন আমরা বরং প্রবেশ করি আদালত প্রাঙ্গনে। কবে নির্মিত হলো আদালত ভবন, তার আগে এখানে কি ছিল। শ্বেতাঙ্গ মি : লিভলেট এর হাওড়া ময়দান এলাকায়, [ তখন হাওড়া ময়দান নাম হয় নি ] ১৬০ বিঘা জমির ওপর বাড়ী ১৭৮০ সালে অরফান সোসাইটি কিনে নিয়ে অনাথ সৈনিক সন্তানদের জন্য বাসস্থান সহ স্কুল প্রতিষ্ঠা করে । সাল ১৮১৫ তে স্কুল উঠে যায়, এবং এই সম্পত্তির এক অংশে ধীরে ধীরে আদালত চালু হয়। আমি অনত্র পড়েছি আদি হাওড়া স্টেশন নাকি এই ওরফান সোসাইটির সম্পত্ততে নির্মিত হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে কোনটি ঠিক, হাওড়া স্টেশন না হাওড়া আদালত। এই ব্যাপারে আমার নিজস্ব বিচার হলো, সবথেকে প্রাচীন আদালত ভবন থেকে পূর্ব মুখে এগোলে, হাওড়া স্টেশনের সর্ব পশ্চিম প্রান্তের মধ্যে সরাসরি [ ইন স্ট্রেট লাইন ] ফিতে ফেলা দুরত্ব বেশি নয় । ওরফান সোসাইটির সম্পত্তি ছিল বিশাল। তাই ওই সম্পত্তির এক অংশে আদি স্টেশন এক অংশে আদি আদালত ভবন সবই নির্মিত হয়েছিল । এবার আসি আদি আদালত ভবন টির বর্ণনায় । আমার মতো প্রাচীন উকিল বাবুরা এই ভবনটি লালবাড়ী / ক্রিমিনাল কোর্ট হিসেবে চিনি (4) । ডি. এম বাংলো ছাড়িয়ে নিউ কালেক্টর বিল্ডিং ছাড়িয়ে সামান্য এগোলেই হাওড়া হাসপাতালের লাগোয়া রাস্তার ওপর প্রান্তে দেখবেন লালরঙের একটি অতি প্রাচীন দোতলা বাড়ী, যার গায়ে খোদাই করা আছে স্থাপিত সাল ১৮৯৬ । যে ভবন গুলি এখনো টিকে আছে তার মধ্যে এটি সর্বাপেক্ষা প্রাচীন । এই আদালতে মামলা করার স্মৃতি আমার আছে । ১৯৮৬ সালে যখন আদালতে আসি তখন সি. জে.এম. সহ জুডিশিয়াল মেজিস্ট্রেট আদালত চলতো । খোরপোষ সহ অন্যান ফৌজদারি মামলা হতো । একেবারে গম গম করতো । পরবর্তী কালে ফৌজদারি আদালত নতুন বাড়ীতে স্থানান্তর হয় । তারপর নতুন চালু হওয়া ক্রেতা সুরক্ষা আদালত [ কনসুমার কোর্ট ]’এখানে চালু হয় । পরবর্তী কালে সে আদালতও অন্যত্র স্থানান্তর হয় । বাড়িটি অতি জীর্ণ হয়ে পরে । কিছু মেরামত করা হয় । বর্তমানে এখানে পচিমবঙ্গ সরকারের পুলিশ বিভাগের কয়েকটি দপ্তরযেমন অফিস অফ আসিস্টেন্ট কমিশনার অফ পুলিশ ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট হাওড়া । এখানে চালু আছে । বাড়িটির অবস্থা ভালোনয় । বাড়িটির চেহারা অবিকৃত রেখে এর যথা যথ সংরক্ষণ প্রয়োজন । সর্বোপরি এ বাড়ী কি হেরিটেজ বিল্ডিং এর তকমা পেতে পারে না ?

2

পাঁচশো বছরের হাওড়া। কিন্তু বিচার ব্যাবস্থায় স্বাতন্ত্রতা বা স্বাধীনতা পেতে হাওড়াকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর। আগের পর্বে বলেছিলাম বিচার ব্যাবস্থার সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে শাসন ব্যবস্থা। আর শাসন ব্যাবস্থার সাথে জড়িয়ে আছে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা। আদি পর্বে এই তিনটি বিষয়ে হাওড়া ছিল বর্ধমানের অধীন । তারপর বর্ধমানের অধীনতা থেকে মুক্ত হলেও হাওড়া হলো হুগলীর অধীন (1) । তারও পরে হাওড়া স্বাধীন ভাবে এই তিন বিভাগে কার্য শুরু করে । হাওড়ার এই স্বাধীনতা প্রাপ্তি মোটেই সহজ সরল ছিল না । এর অতি দীর্ঘ ইতিহাস আছে । এখানে শুধুমাত্র কয়েকটি সন তারিখ সহ তথ্য পেস করছি । সাল ১৭৯৩, হুগলী – হাওড়া জন্য সিভিল জজ ও মেজিস্ট্রেট নিযুক্ত হলো । আমার বিচারে হাওড়া বর্ধমানের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে হুগলীর অধীন হলো । হুগলী – হাওড়া রাজস্ব [রেভিনিউ ] বিষয়ে বর্ধমান থেকে পৃথক হলো ১৮১৯ । সাল ১৮৩২ হাওড়া জেলা জজ ও দায়রা জজ নিযুক্ত হলো, কিন্তু তা হুগলীর জেলা ও দায়রা জজের অধীন । বা বলা যেতে পারে একই জজ দুই জেলার কার্য সমাধা করছেন । শুধুমাত্র মেজিস্টারিয়াল কার্য হুগলী থেকে হাওড়া পৃথক হলো ১৮৪৩ । এই ভাবেই চললো বহু বছর। সম্পূর্ণ স্বাধীন স্বতন্ত্র হাওড়া জেলা ও দায়রা জজ নিযুক্ত হলো ১লা জানুয়ারি ১৯৮৩ । প্রথম জেলা জজ ছিলেন এ এম আহমেদ

এই দিনটিকে আমরা স্বাধীন হাওড়া আদালতের জন্ম দিন রূপে পালন করতে পারি । ঠিক এই মুহূর্তে হাওড়া জেলা ও দায়রা জজ হলেন মাননীয়া শ্রীমতি সম্পা দত্ত [পাল]। হাওড়া আদালতের উনি প্রথম মহিলা জেলা জজ । বলা বাহুল্য এই সুদীর্ঘ সময়ে বহু বিচারক জেলা জজ এর দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে অনেকে উচ্চ আদালত [হাই কোর্ট] এর বিচারক হয়েছেন এবং বিচার কার্যে উজ্জ্বল সাক্ষর রেখেছেন , সে সব পরে আলোচনা করবো । প্রথম পর্বে বলেছিলাম হাওড়ার প্রাচীন আদালত ভবনটি যেটির ডাক নাম লাল বাড়ী সেটি ১৮৯৬ সালে অরফান সোসাইটির সম্পত্তিতে নির্মিত হয়েছিল । এবার আসি বর্তমান প্রধান আদালত ভবনে ,এটিকে জেলা জজ আদালত বলেও অভিবিহিত করা হয় । যদিও সকলেরই প্রায় জানা তবু এই ভবনটির অবস্থানটি বর্ণনা করছি । আকারে প্রায় চতুরভূজ,এই ভবনটি র মাঝে আছে কিছুটা উন্মুক্ত স্থান, কিছুটা বাগান আর তার চার দিকে ইমারত । ভবনের উত্তর দিকে মহাত্মা গান্ধী রোড, আর তার ঠিক বিপরীতে হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান। এই দিকে আদালতে প্রবেশের একটি পথ আছে তবে তা শুধু পায়ে হেঁটে । পশ্চিমে দিকে লাগোয়া বিপ্লবী হরেন্দ্র নাথ ঘোষ সরনী, তার ঠিক ওপারে প্রথমে টেলিগ্রাফ অফিস, তারপর হাওড়া জিলা স্কুল, তারপর হাওড়া জিলা পরিষদ । দক্ষিণে হাওড়া জেলা হাসপাতাল। এই দিকে আদালতে প্রবেশের প্রধান প্রবেশ পথ, যেখান দিয়ে গাড়ী নিয়ে প্রবেশ করা যাবে । আর পূর্বে সরকারি অন্যান দপ্তর, উকিল বাবুদের সেরেস্থা [ আট চালা ] ইত্যাদি । মোটামুটি এই হলো চৌহুদ্দী ।

দাঁড়ান ভবনে প্রবেশের আগে এর ইতিহাস নিয়ে একটু চর্চা করে নিই । প্রশ্ন এখানে ভবন নির্মাণের আগে কি ছিল, কার ছিল এবং কবে নির্মিত হলো এই ভবন । সত্যি কথা বলতে কি লাল বাড়ি সম্পর্কে যেমন নির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছি এখানে তা পাই নি । তবে সিনিয়র আইনজীবিদের সাথে কথা বলে যা জানতে পেরেছি তা হলো এই জায়গায় আগে পুকুর ছিল, পুকুর বুজিয়ে ভবন নির্মাণ হয়েছে অনুমান ১৯৫৪ সালের আসে পাশে। তবে প্রশ্ন পুকুরটি কার ছিল ? এটাও কি অরফান সোসাইটির সম্পত্তি ছিল ? এ ব্যাপারে কেউ আলোকপাত করলে খুব ভালো হয় । আসুন বর্তমানে ফিরে আসি । প্রবেশ করি আদালতের অভন্তরে । উত্তর বা দক্ষিণ যে কোনো প্রবেশ পথ দিয়ে প্রবেশ করতে পারেন, তবে গাড়ী নিয়ে প্রবেশের এক মাত্র পথ দক্ষিণে । ভবনটি দ্বিতল শুধুমাত্র দক্ষিণের অংশটি ত্রিতল । এখানে যে যে এজলাস অর্থাৎ কোর্ট রুমে বিচার কার্য হয় সেগুলি হলো জেলা জজ বাহাদুরের এজলাস, চারটে অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম, দ্বিতীয় তৃতীয় আর চতুর্থ । তিনটে সিভিল জজ সিনিয়র ডিভিশন ১ম ২য় ৩য় ,আগে এর নাম ছিল সাব জজ । দুটি ফাস্ট ট্রাক কোর্ট, দ্বিতীয় ও তৃতীয়, এ ছাড়া সাত টি সিভিল জজ জুনিয়র ডিভিশন, প্রথম থেকে সপ্তম । আগে এই কোর্ট গুলি মুন্সিফ কোর্ট নামে অবিভিত করা হতো । পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা আদালত, এবং প্রথম ফাস্ট ট্রাক কোর্ট এর এজলাস এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সহ অন্যান জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর এজলাস এই ভবনের মধ্যে নেই, এ গুলি আছে পার্শ্ববর্তীভবনে । চিন্তা নেই এ দিকটা ঘুরে নিয়ে সেদিকেও যাবো ।

আমি প্রথম পর্বে জানিয়ে ছিলাম বাস্তবিক হাওড়া আদালত ভবন একটি নয়, অনেক গুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে । পরিকল্পনা করে নয় প্রয়োজনের তাগিদে গজিয়ে ওঠা । প্রয়োজনের প্রসঙ্গে মনে পরে গেলো এই ভবনে আর একটি এজলাশের কথা, পসকো কোর্ট নতুন আইনের জন্য নতুন কোর্ট । অনেক ভেবে তৈরি হলো একতলার যাতায়াতের যে পেসেজ তার মাথায় পিলার দিয়ে দোতলায় । বারান্দার সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া হলো প্রবেশ পথ । ২৮ অগাস্ট ২০২০ তারিখে তার উদবোধন হলো । এ ছাড়া এই ভবনের মধ্যে আছে আদালতের বিভিন্ন দপ্তর সহজ কথায় অফিস , নাজিরখানা , নকলখানা, রেকর্ড রুম , রেজিস্টার বাহাদুরের অফিস । এরই মধ্যে আছে ডেলিগেট কোর্ট যেখানে সাকসেশন প্রবেট ইত্যাদি মামলা হয় । তবে আলাদা কোর্ট রুম নেই, সাব জজ সাহেবরাই সেই দায়িত্ব পালন করেন । আর আছে হাওড়া বার এসোসিয়েশন এর চারটে বার লাইব্রেরি । এক দুই তিন চার । লাইব্রেরি নাম থেকেই পরিষ্কার এ হলো আইনের পুস্তকের বিশাল সংগ্রহ । দেখলেই ভয় ধরে যাবে । আছে উকিল বাবুদের বসার স্থান। অনেক উকিল বাবুকে বলতে শুনেছি এ তার বাড়ীর থেকেও প্রিয় । আমি নিজে অবশ্য অতদূর যাচ্ছিনা, তবে নিঃসংকোচে বলছি এই লাইব্রেরি আমার অতি প্ৰিয়, এখানে অন্যান বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে মনে হয় আমি অতি প্রিয়জন দের সঙ্গে আছি । এর দেওয়ালে টাঙানো আছে আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া প্রিয় সিনিয়র আইনজীবি দের ছবি । সে দিকে তাকিয়ে মনে পরে কত স্মৃতি । এ ছাড়া আছে পাবলিক প্রসেকিউটর আর গভর্মেন্ট প্লিডার এর দপ্তর । আর একটি কথা, এই আদালতে আছে তিনজন বিশিষ্ট আইনজীবর অবক্ষ মূর্তি । এর মধ্যে সব থেকে প্রাচীন মূর্তিটি হলো, প্রবাদ প্রতিম আইনজীবি বরোদা প্রসন্ন পাইন এর ।

বরোদা বাবু অবিভক্ত বাংলার এক দিক পাল আইনজীবি ছিলেন, শুধু তাই নয় তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সমাজকর্মী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব । ছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী । ইচ্ছা রইলো এক সময় বিশেষ ভাবে তার সম্পর্কে আলোচনা করবো । ওনার এই মূর্তিটি আছে পশ্চিমের দোতলা বারান্দায় । ওনার প্রয়াণ দিবস ৭ই সেপ্টেম্বর প্রতি বৎসর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওনাকে স্মরণ করা হয় । ঠিক তার নিচের তলায় আছে আর এক বিখ্যাত আইনজীবী শ্রী সুব্রত কুমার বন্দোপাধ্যায় এর মূর্তি । ওনাকে খুব কাছ থেকে শুধু দেখার নয় মামলা করার ও সৌভাগ্য হয়েছে । শুধু হাওড়া নয় সারা পশ্চিমবঙ্গে ওনার ছিল পরিচিতি । এক বিরল ব্যক্তিত্ব এর অধিকারী ছিলেন । তৃতীয় মূর্তিটি হলো বিশিষ্ট আইনজীবি শ্রী প্রভাত কুমার রায় এর । এনাকেও আমি অনেক মামলা করতে দেখেছি । এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছে পূর্ব দিকে একতলায় । প্রভাত বাবুর সুযোগ্য পুত্র শ্রী অরূপ রায়, তিনিও বিশিষ্ট আইনজীবি । বর্তমানে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী । এই প্রসঙ্গে জানাই সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজে যখন আমি ছাত্র সেই সময় অরূপ বাবু আমার সহপাঠী এবং বন্ধু । হাওড়া আদালতে প্রাকটিস শুরু করতে এসে দেখলাম কলেজের অনেক বন্ধু আমার আগেই এখানে প্রাকটিস শুরু করে দিয়েছে । শুরুর সে দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করার ইচ্ছা রইলো, এক সময় করবো । এখন আদালত পরিক্রমা শেষ করি । চলুন সিভিল কোর্ট ছেড়ে আমরা এবার ক্রিমিনাল কোর্ট বিল্ডিং এ যাই । এই দেখুন এই বাড়িটি আমি সিভিল কোর্ট বিল্ডিং বলে উল্লেখ করলাম, অথচ মুন্সিফ কোর্ট বাদ দিলে বাকি কোর্ট গুলিতে কিন্তু সেশন ট্রায়াল অর্থাৎ ফৌজদারি কেস হয় । তাহলে সিভিল কোর্ট নাম কেন ? এ ব্যাপারে আমার বিশ্লেষণ আগে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট গুলি ছিল লাল বাড়ীতে আর মুন্সিফ কোর্ট এ বাড়ীতে, লোকেরা লাল বাড়িকে ক্রিমিনাল কোর্ট আর এই বাড়িটিকে সিভিল কোর্ট বলে ডাকতো । সেই থেকেই এই ডাকটা চলে এসেছে । তা চলুন আমরা সিভিল কোর্ট ছেড়ে ক্রিমিনাল কোর্ট এ যাই ।

পূর্ব দিকে একটা পায়ে চলা পথ আছে, সেটা দিয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে আসি । ঠিক উত্তরে একটি দোতলা বাড়ী । এটা আগে একতলা ছিল । একতলায় খাবারের দোকান জেরক্স টাইপিস্ট স্টেশনারি ইত্যাদির দোকান আছে । কিছু বছর আগে এটিকে দোতলা করা হলো । দোতলায় পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা জজ , প্রথম ফাস্ট ট্রাক কোর্ট, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৫ম, ৬ঠ এবং ৭ম আদালতের এজলাস এবং অফিস আছে । আপনি দক্ষিণ দিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে উত্তর দিকের সিঁড়ি দিয়ে নেমে পড়তে পারবেন । এই বাড়ী থেকে বেরিয়ে চলুন চার পা দক্ষিণে । পেয়ে যাবেন আর একটি দোতলা বাড়ী । কিছু বছর আগে তৈরি । এই বাড়ীর একতলায় ও দোতলায় ১ম ২য়, ৩য় ও ৪থ জে এম কোর্ট এর এজলাস । আর একটি জে এম কোর্ট আছে, সেটি এই আদালত প্রাঙ্গনে নেই, আছে একটু দূরে হাওড়া মিউনিসিপালিটি র ভেতর । সেই জন্য এর ডাক নাম মিউনিসিপাল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। আর একটি কোর্ট হলো রেলওয়ে মেজিস্ট্রেট কোর্ট এটি হাওড়া স্টেশনে মধ্যে অবস্থিত। বাকি রইলো চিফ জুডিসিয়াল মেজিস্ট্রেট এর আদালত । ইনি আবার অন্যদের থেকে একটু বিচ্ছিন্ন, একেবারে পূর্ব দিকে একটি অতি প্রাচীন বাড়ীর এক অংশে। এ ছাড়া হাওড়া জেলা জজের অধীনস্থ কোর্ট আছে উলুবেড়িয়া এবং আমতা সাব ডিভিশনে ।

হাওড়া বার এসোসিয়েশন ছাড়া আরও দুটি আইনজীবী দের এসোসিয়েশন আছে একটি ক্রিমিনাল বার লাইব্রেরি যেটি পূর্ব দিকে একতলায় অবস্থিত । এর ওপরে দোতলায় এস ডি ও সাহেবের অফিস । আর একটি মোক্তার লাইব্রেরি বা ছোটো লাইব্রেরি যেটি এই চত্তরের মাঝে একটি ছোটো ঘরে অবস্থিত । আদিতে কিন্তু এতগুলি দেওয়ানী বা ফৌজদারি কোর্ট ছিল না । প্রয়োজনের তাগিদে আদালতের সংখ্যা বেড়েছে । এবার একটা আসল কথা বলি । হাওড়া আদালতের স্থানের অভাব সুপ্রাচীন, সেই করনেই আদালত বাড়িগুলি বিচ্ছিন্ন ভাবে গড়ে উঠে ছিল । সেই কারণেই বহু বছর ধরে আইনজীবি দের দাবী ছিল একটি জুডিসিয়াল কমপ্লেক্স এর, এক ছাতার তলায় সব কটি কোর্ট, তৎসহ উকিল বাবুদের লাইব্রেরি এবং বিচার প্রার্থী দের বসার সু-ব্যবস্থা যাতে হয় । আইনজীবি দের দীর্ঘ আন্দোলনের পর সেই জুডিসিয়াল কমপ্লেক্স তৈরী হচ্ছে । এটি তৈরী হচ্ছে বর্তমান যে জেলা জজ আদালত [ সিভিল কোর্ট বিল্ডিং ] তার পূর্ব দিকে । আগে এখানে খুব পুরাতন একটি বিশাল ইমারত ছিল, যেখানে তদকালীন সুপারিন্ডেন্ট অফ পুলিশ এর অফিস আরও অন্যান সরকারি অফিস ছিল । এই নতুন ভবনে আদালত চালু হলে উন্মোচিত হবে এক নতুন দিগন্ত । তবে বর্তমান ভবন গুলি ভুলে গেলে চলবে না, কি তাইতো ? এতক্ষন যতগুলি কোর্ট নিয়ে আলোচনা করলাম সেগুলি সবই বিচারবিভাগীয় [ জুডিসিয়াল ] আদালত, কলিকাতা হাই কোর্ট এর নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া আরও কিছু কোর্ট আছে যেটা কিছুটা প্রশাসনিক যেমন ঠিকা কন্ট্রোল, রেন্টকন্ট্রোল, কালেক্টর, একসিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদি যা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন । এ ছাড়া আছে কনসুমার কোর্ট, রেজিস্ট্রি অফিস সাধারণ লোকে তাকেও কোর্ট বলে জানে । এর মধ্যেও লুকিয়ে আছে অনেক ইতিহাস, যেমন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র এর মেজিস্ট্রেট রূপে কার্যকাল, বিবেকানন্দ এর বেলুড় মঠের দলিল রেজিস্ট্রি করতে আসা আরও অনেক ইতি।হাস।[তথ্য সূত্র : অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অফ ইন্ডিয়া ]

3

ইংরাজি কোর্ট শব্দটির প্রতিশব্দ হিসাবে আমরা আদালত / বিচারলয় /ন্যায়লয় শব্দ ব্যাবহার করি।তবে ইংরাজি ভাষায় কোর্ট শব্দটি অনেক ব্যাপক অর্থ বহন করে।প্রশাসনিক দপ্তর / অফিস ও সে ব্যাপক অর্থে কোর্ট। এক্সিকিউটিভ মেজিস্ট্রেট কোর্ট। হাওড়ায় এক্সজিকিউটিভ মেজিস্ট্রেট কোর্ট বর্তমানে দুটি, ফাস্ট এবং সেকেন্ড। থানা অনুসারে ভাগ করা আছে । যে ভবনে এই কোর্ট চলে সেটি একটি প্রাচীন বাড়ীর দোতলায় । ভবনটি আদালত প্রাঙ্গনের পূর্ব দক্ষিণে অবস্থিত । ফৌজদারি আইনের ১৪৪, ১০৭, ১৩৩ সহ আরও বিভিন্ন ধারার মামলা এখানে হয় । এফিডেভিট ইত্যাদি হয়। প্রসঙ্গ ক্রমে বলি, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ডিস্ট্রিট জজ হয়ে কলকাতা হাইকোর্টের অধীন। বিচারপতিরা ডাবলু বি সি এস জুডিশিয়াল পরীক্ষার মাধ্যমে নিযুক্ত হন । এনাদের নিয়োগ প্রমোশন বদলি কলকাতা হাইকোর্ট নিয়ন্ত্রণ করেন । ওপরদিকে একসিকিউটিভ মেজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন ডাবলু বি সি এস পরীক্ষার মাধ্যমে, এনারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন । যে ভবনের কথা বলছি এখানে সরকারের অন্যান কিছু দপ্তর ও আছে । মেজিস্ট্রেট এর কথা যখন উঠলো তখন একটু ইতিহাসের কথাও হয়ে যাক।

হাওড়া আদালত প্রাঙ্গনের পূর্ব দিকে রেজিস্ট্রি অফিসের কাছাকাছি একটি বিশাল পুরাতন ভবন দেখতে পাবেন। যেটির নাম ওল্ড কালেকটারেট বিল্ডিং। আমার নিজের ধারণা হাওড়া শহরের প্রশাসনিক ভবন গুলির মধ্যে যে গুলি এখনো টিকে আছে এটি সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। এখানে একসময় নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেট এর দরবার বসতো। এই বাড়িতেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট রূপে ১৮৮১, ১৮৮৩ এবং ১৮৮৬ সালে কর্মরত ছিলেন । তখন তিনি থাকতেন ২১২ নং পঞ্চাননতলা রোডের বাড়ীতে। এই বাড়ীতেই এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ওনার সাথে দেখা করতে ১৮৮১ সালে । সূর্য চন্দ্রের মিলন কেমন হয়েছিল সে অন্য ইতিহাস। আমরা বরং কোর্টে ফিরে আসি।এই বাড়ীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনেক গুলি দপ্তর ছিল, বর্তমানেও কিছু আছে । অনেক বছর আগে স্ট্যাম্প রিফান্ড এর কেস ,ল্যান্ড সিলিং কেস করার জন্য এখানে আমি যেতাম। বিশাল উচ্চ ঘর সিঁড়ি বারান্দা এক অন্য অনুভূতি তৈরী করতো । বর্তমানে এখানে এস ডি ও সাহেবের দপ্তর সহ আরও নানা অফিস আছে ।একতলায় পূর্বমুখে আছে ক্রিমিনাল বার লাইব্রেরি। দেখুন দেখি কান্ড! ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে এতো আলোচনা করছি কিন্তু ডিস্ট্রিট মেজিস্ট্রেট নিয়ে কিছু বলা হলো না।

ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা শাসক হলেন জেলার প্রশাসনিক প্রধান। হাওড়া আদালত প্রঙ্গনের একদম উত্তর পূর্ব কোনে রাস্তা পেরিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসের মুখোমুখি জেলা শাসকের বিশাল সুদৃশ্য বাংলো এবং অফিস। ঠিক এই মুহূর্তে হাওড়ার জেলা শাসক হলেন শ্রীমতী মুক্তা আর্য্য । তবে দেখলেই বোঝা যায় এই বাংলো বয়েসে অনেক নবীন। ডি এম বাংলো যখন পৌঁছে গেছি তখন আর চিন্তা কি ? দু-পা দক্ষিণে চলুন, পেয়ে যাবেন মাল্টিষ্টরিড ঝাঁ চক চকে বিরাট বাড়ী। নিউ কোলেকটারেট বিল্ডিং। বর্তমানে হাওড়া জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দপ্তর গুলি এই বাড়ীর বিভিন্ন তলায় । এই বাড়ীতে উকিলবাবুদের আনাগোনা লেগেই থাকে। রেন্ট কন্ট্রোল কোর্ট, ঠিকা কন্ট্রোল কোর্ট, ল্যান্ড আকুইসিশান অফিস,মোটর ভেকেল অফিস সহ আরও নানা অফিস আছে এই বাড়ীতে। কোনতলায় কোন অফিস তার একটা সাইন বোর্ড এর ছবিও সঙ্গে দিলাম। এই বাড়ী থেকে নেমে আরও দু পা দক্ষিণে চলুন , এই সেই বিখ্যাত লাল বাড়ী, ফৌজদারি কোর্ট, হাওড়ার সবথেকে প্রাচীন বিচারবিভাগীয় আদালত (প্রাক্তন)। এই বাড়ীর ইতিহাস প্রথম পর্বে বিস্তারিত বলেছি তাই আর পুনরাবৃত্তি করছি না । এবার আসি আর এক আদালতের কথায়, ক্রেতা সুরক্ষা আদালত, কনজুউমার প্রটেকশান কোর্ট। নতুন আইন নতুন কোর্ট। যখন এই আদালত প্রথম চালু হলো তখন জেলা জজ সাহেবের এজ্লাসে নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে কনজু- উমার কোর্ট হতো।পরবর্তীকালে ফৌজদারি কোর্ট /লালবাড়িতে কনজু-উমার কোর্ট স্থানান্তরিত হয় । তারপর এটি স্থানান্তরিত হয় ১৩/১ ডঃ পি কে ব্যানার্জী রোডে, ঠিক টেলিফোন এক্সচেঞ্জ উল্টো দিকে। এখন সেখানেই এই কোর্ট হয় ।

এরপর আসছি সেটেলমেন্ট অফিস । ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তর । এখানে সেটেলমন্ট মিউটেসান, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি হয় । এই অফিস টি আছে ৩ কার্তিক দত্ত লেনে। এবার চলুন হাওড়া রেজিস্ট্রি অফিস। এটি কোর্ট গোত্র ভুক্ত না হলেও , সাধারণ লোকেরা এই অফিস কে কোর্ট বলেও সম্মোধন করে থাকে । সে যাই হোক উকিল মুহুরীরা রেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত। তাই এই আলোচনায় এটিও অন্তর্ভুক্ত করলাম । হাওড়ার প্রাচীন এবং প্রধান রেজিস্ট্রি অফিস টি একটি দোতলা বাড়ি। আদালত এলাকায় একদম উত্তর পূর্ব কোনে অবস্থিত । এর দু দিক দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। এই বাড়িটি অতি প্রাচীন। সম্প্রতি এটি সংস্কার করা হয়েছে । এই বাড়ীতে ১৯০১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী তারিখে স্বামী বিবেকানন্দ এসেছিলেন বেলুড়মঠের ট্রাস্ট ডিড রেজিস্ট্রি করতে । বর্তমানে এখানে ডি এস আর ১ অফিস টি আছে । কাজের চাপ সামলাতে আর একটি রেজিস্ট্রি অফিসের ব্যবস্থা করতে হয়েছে । সেটি কমিশনার অফ পুলিশ এর অফিস এর পাশে, তেলকল ঘাটে যাবার রাস্তায়। এটি নতুন অফিস । এখানে আছে ডি এস আর ২ আর এ ডি এস আর হাওড়া । ডি এস আর (ডিস্ট্রিক্ট সাব রেজিস্ট্রি )অফিসে আপনি হাওড়া জেলার যে কোনো প্রান্তের সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করতে পারবেন।আর এডি এস আর ( আড্ডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট সাব – রেজিস্ট্রি অফিস ] এ এলাকা ভিত্তিক স্থানীয় জায়গা জমির রেজিস্ট্রি হয়। সেই হিসাবে হাওড়া জেলায় বিভিন্ন প্রান্তে আছে আরও কিছু সাব রেজিস্ট্রি অফিস, যেমন ডোমজুড়,উলুবেড়িয়া আমতা,পাচারুল, ইত্যাদি। 

4

আদালতের অলিন্দে ঘুরতে ঘুরতে যে পর্বে এসে পৌঁছেছি সেটি সবথেকে কঠিন পর্ব। কেন এ কথা বললাম তা বলছি । আগেই বলেছিলাম শেষ পর্বে আলোচনা করবো হাওড়া আদালতের বিশিষ্ট কিছু আইনজীবী ও বিচারকের কিছু কথা । কিন্তু এখানেই সমস্যা । যে কজন মুষ্টিমেয় আইনজীবী এবং বিচারকের কথা আমি উল্লেখ করবো তার বাইরে যারা রইলেন তারা কি বিশিষ্ট নন ? তারা সকলেই বিশিষ্ট।তারা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন । আমার নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছি হাওড়া আদালতের সিনিয়র আইনজীবীরা ছিলেন এই পেশায় অত্যন্ত নিষ্ঠাবান পরিশ্রমী এবং দক্ষ । লড়াইয়ের কোর্টে কেও করুর থেকে কম যান না । তবে স্বল্প পরিসরে সকলের কথা উল্লেখ করা সম্ভব নয় । আর আমার সে ক্ষমতাও নেই। আমি খুব কাছ থেকে যে সব সিনিয়র আইনজীবীদের দেখেছি বা তাঁদের কথা খুব শুনেছি বা পড়েছি তাই নিয়েই এ মালা গাঁথা। এক অর্থে এ আমার স্মৃতিকথন । সে দিনটার কথা আমার খুব মনে আছে । ১৯৮৬ সালের ২রা জুন, হাওড়া আদালতে আমার প্রথম দিন। এর আগে আমার কোর্টে আসা হয় নি । জিজ্ঞাসা করতে করতে চলে এলাম ২নং বার লাইব্রেরি। সিনিয়র নলিনী রঞ্জন বশিষ্ট মহাশয় এর সাথে দেখা করতে। অতি রাসভারি গম্ভীর, প্রথম দর্শনে খুব ভয় লাগলো।পরে দেখলাম মানুষটা আদ্দ প্রান্ত অতি রসিক, দারুণ সেন্স অফ হিউমার। কি এজ্লাসে, কি আড্ডায়, হাস্য রস সৃস্ট্রিতে সিদ্ধ হস্ত। সে সময় উনি হাওড়া রার এর প্রেসিডেন্ট। প্রাকটিসের উচ্চ চূড়ায়। সিভিল মামলায় ছিলেন অতি দক্ষ।প্রচুর মামলা। সে দিনের কথায় ফির,নলিনী বাবু উচ্চসরে ডাকলেন,—শঙ্কর নারায়ণ। উল্টো দিকের টেবিল থেকে একজন সারা দিলেন। নলিনী বাবু আমাকে দেখিয়ে বললেন — একে দেখো। সেই দেখা শুরু শঙ্করদা ওরফে শঙ্করনারায়ণ মিত্র এর হাত ধরে চিনতে লাগলাম আদালতের অলি গলি। এ যেন এক ভুলভুলাইয়া।

দীর্ঘ ওকালতি জীবনে বিদ্বান বুদ্ধিমান জ্ঞানবান আইনজীবী অনেক দেখেছি কিন্তু শঙ্করদার তুল্য হৃদয়বান আইনজীবী খুব কম দেখেছি । নলিনিবাবুর কথা উঠলেই মনেপড়ে তার গুরুভাই এর কথা। সন্তোষ চিনা মহাশয়। গুরুভাই সম্মোধনের রহস্য আমি জানিনা তবে দুজনে ছিলেন হরিহর আত্মা। আবার কি আশ্চর্য এজলাসে দুজনে দু পক্ষ। কেও কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ। এজলাসে দু জনের আইনি লড়াই ছিল দেখার মতো। আবার লাইব্রেরিতে ফিরে দুজনে মেতে উঠতো হাঁসি ঠাট্টা আড্ডায়। আড্ডার কথাই যখন এলো তখন বলি সেই আড্ডায় যোগ দিতো আরও বেশ কিছু সিনিয়র লইয়ার। এখনো ও চোখ বুজলে পষ্ট দেখতে পাই দু নং বার লাইব্রেরিতে পর পর বসে আছে সিনিয়র দুদে আইনজীবীরা। কান্তিময় মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, শিবপ্রসন্ন সিনহা,সুকুমার সিংহরায়।সন্তোষ কোলে, প্রমুখ ।সময় সময় এদের সাথে যোগ দিতেন সত্যজিৎ দাসগুপ্ত, সুপ্রভাত মুখার্জী ।এনারা ছিলেন সিভিল কোর্টের দক্ষ আইন জীবি। এনারা সকলেই আমাদের ছেড়ে গেছেন । এই ঘরে বসতেন প্রশান্ত কুমার মিত্র, তপন সিংহ রায় আইনজীবী হিসাবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন । প্রশান্তদা ছিলেন দারুণ মজাদার মানুষ। আড্ডা জমাতে ওস্তাদ।আর এক জনের কথা খুব মনে পড়ছে , সুব্রত ঘোষ, করোনা কালে তাকে হারিয়েছি । ওকালতির বাইরেও উকিলরা কিছু করতে পারে তা দেখিয়েছে সুব্রতদা, ছিলেন দক্ষ অভিনেতা। অভিনয় অন্ত প্রাণ। এই 2 নং লাইব্রেরি বলতে গেলে আমার দ্বিতীয় ঘর , সেকেন্ড হোম আর সদস্যরা যেন ফ্যামিলি মেম্বার। এই ঘরে বসতেন আরও অনেককে আমরা হারিয়েছি , সকলের প্রতি রইলোচলুন 2নং থেকে বেরিয়ে যাই ১ নং লাইব্রেরিতে। এটি সবথেকে পুরাতন এবং আয়তনে বড় । এখানে মিটিং সভা সেমিনার ইত্যাদি হয়ে থাকে । বিভিন্ন সেমিনারে বাংলার বহু বিখ্যাত আইনজীবী হাইকোর্টের বিচারপতি রা এসেছেন এবং মূল্যবান ভাষণ দিয়েছেন ।

এই ঘরে এক সময় বসতেন বহু বিখ্যাত আইনজীবী। তাঁদের মধ্যে দু একটি নাম উল্লেখ করছি । নকড়ি মুখার্জী, অমূল্য ধন মুখার্জী ,অনিল সরকার,পঞ্চানন সমাদ্দার।তারা শঙ্কর মুখার্জী,হিমাংশু মুখার্জী।আর একজনের নাম তো করতেই হবে, যার সাথে পক্ষে বিপক্ষে বহু মামলা করেছি, তিনি আলোক আদক । আমি প্রথম কোর্টে এসে অবাক হয়ে দেখেছিলাম এক তরুণ আইনজীবী সিভিল কোর্টের বাঘা বাঘা লইয়ার দের বিরুদ্ধে লড়াই করছে । আমাদের দুর্ভাগ্য অল্প বয়েসেই প্রাকটিসের মধ্যগগনে হটাৎ মারা যান। চলুন এবার ৩ নং ঘরে। এ ঘর যিনি আলো করে থাকতেন তিনি হলেন, নান আদার দেন রঞ্জিত কুমার মিত্র। সুদর্শন সুপুরুষ প্রাণবন্ত খুরোধার বুদ্ধি। খুব ব্যাস্ত উকিল ছিলেন । এই ঘরে ওপর প্রান্তে যিনি বসেন তিনি হাওড়া বারের অভিভাবক স্বরূপ। বর্তমানে সিভিল কোর্টের সিনিয়র মোস্ট লাইযার। আইনের জ্ঞান ঈর্ষানীয়। তিনি রবি দে। বর্শিয়ান হলেও তারুন্যের তেজে ভরপুর । আর একজন বর্শিয়ান হয়েও এখনো প্র্যাকটিস করছেন তিনি প্রভাত ব্যানার্জী। সালকের শঙ্কর লাল মুখার্জী র কথা মনে পড়ছে , সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন । এক সময় প্রচুর মামলা করতেন ।অনেকেই ভাবছেন আমি এখনো তাঁর নাম উল্লেখ করলাম না কেন যাকে এক কথায় বলাযায় এমিনেন্ট এডভোকেট অফ হাওড়া কোর্ট, তিনি হলেন সুব্রত কুমার বন্দোপাধ্যায়। ওনার সুনাম শুধু হাওড়া কোর্ট নয় বিস্তৃত ছিল অন্যান্য কোর্টেও। আমার সৌভাগ্য ওনার বিপক্ষে মামলা করার সুযোগ পেয়েছিলাম । ওনার একটি অবক্ষ মূর্তি সিভিল কোর্টের একতলায় স্থাপন করা হয়েছে । উনি একসময় হাওড়ায় জিপি হয়েছিলেন । বার কউন্সিল অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল র সভাপতিও হয়েছিলেন ।আর একজনের মূর্তি স্থাপন করা আছে সিভিল কোর্টের একতলায় তিনি মন্ত্রী অরূপ রায়ের প্রয়াত পিতা শ্রী প্রভাত রায়। ওনার পাশে বসতেন সিনিয়র আইনজীবী পুলিন বিহারী সামন্ত। আর এক জনের কথা বলি , তিনি অজিত দাস। আইনের জ্ঞান ছিল দারুণ। জি পি ছিলেন । তবে অতি সরল সাধারণ ছিল তাঁর জীবন চর্চা ।আপনারা একটা কথা হয়তো ভাবছেন ,যা আলোচনা হচ্ছে তা সিভিল কোর্টের আইনজীবীদের নিয়ে, ক্রিমিনাল কোর্টের উকিলরা কি দোষ করলো ! না দোষ করেছি আমি, বরাবর সিভিল কোর্টে কাজ করেছি।

ক্রিমিনাল কোর্টের উকিলবাবুদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয় নি। তবে কাছ থেকে না হলেও দূরথেকে দেখেছি ক্রিমিনাল কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীদের মামলা করতে । যেমন দেখেছি প্রফুল্ল রায় কে যিনি ছেছোদা নামে পরিচিত ছিলেন । উনি ছিলেন অতি সুবক্তা। অন্য আর যাদের কথা মনে পড়ছে তারা হলেন কিরণ ঘোষ, রমেন বাবু,কেষ্ট বেবর্তা, সনাতন মুখার্জী । সনাতনদা শুধু হাওড়া কোর্ট নয় , পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোর্টে ও মামলা করতেন সুনামের সঙ্গে। বার কউন্সিল অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল এর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছিলেন সুবক্তা, বারের সদস্যদের অতি নিকট জন । এ ছাড়া দেখেছি বিধান রায় কে , অনেক মামলা করতেন । কাজি সাহেব, নড়েন পাড়ুই কে দেখেছি মামলা করতে । ক্রিমিনাল কোর্ট ছোটো বার লাইব্রেরির সামনে বসতেন সালকের দুর্গাপদ বোধক। মজার মানুষ। আমাকে খুব স্নেহ করতেন । সিভিলের সাথে সাথে ক্রিমিনাল কোর্টেও কাজ করতে বলতেন । তবে আমার সাহসে কুলোয় নি।।আর এক জন ক্রিমিনাল কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী বর্শিয়ান হয়েও এখনো কাজ করে চলেছেন তিনি হলেন অরবিন্দ নস্কর । ওনার অন্য পরিচিতিও আছে উনি একজন সাহিত্যিক।কিন্তু আমি আদালতে আসার আগে যে সমস্ত বিখ্যাত আইনজীবী রা গত হয়েছেন তাঁদের গল্প সিনিয়ার দের কাছে শুনতাম বা পড়তাম । তাঁদের মধ্যে যার নাম সর্ব প্রথম করতে হয় তিনি হলেন বরোদা প্রসন্ন পাইন। অবিভক্ত বাংলা জুড়ে ছিল ওনার নাম। উনি শুধু বিখ্যাত আইনজীবী ছিলেন তা নয় , উনি ছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজকর্মী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস সহ সে যুগের বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাথে ওনার ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল । কোর্টে দোতলায় ওনার একটি অবক্ষ মূর্তি আছে , যেখানে প্রতি বছর ওনার প্রয়াণ দিবসে ওনার স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় । ওনাকে নিয়ে বহু গল্প কথা ছড়িয়ে আছে লোকের মুখে। এ ছাড়া অন্য যাদের কথা শুনেছি তারা হলেন , শিবপুরের বলাই ব্যানার্জী, ইনি শরৎ চন্দ্রের প্রতিবেশী ছিলেন ।জোৎস্না মিত্র,সালকের ক্ষিতিশ দত্ত, সাক্ষী গোপাল মিত্র প্রভাস মল্লিক বিভাস মিত্র জগৎ বন্ধু ঘোষ, শিবপুরের ক্ষিতিশ রায়চৌধুরী ইনি জরিপ [সার্ভে] পারদর্শী ছিলেন ।এই রকম আরও অনেকের কথা ।

হাওড়া আদালতের আইনজীবী হিসাবে প্রথম ইনিংস শুরুকরে দ্বিতীয় ইনিংসে বিচারপতি এ উদাহরণ অনেক।সবার আগে নাম করতে হয় মহামান্য বিচারপতি সুশান্ত চ্যাটার্জী র। হাওড়া বারের প্রিয় সুশান্তদা।উনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি , তারপর উড়িষ্যা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির আসন অলঙ্কিত করেছিলেন। তবে হাওড়া বারের বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি সর্বদাই যোগদান করেনঅভিভাবকের মতো । আরও কয়েক জন আইনজীবী থেকে বিচারপতি হয়েছেন যেমন রুদ্রেন ব্যানার্জী রাজেন সিনহা এনারাও হাইকোর্ট জজ হয়েছিলেন। রফিক আহমেদ ইনিও আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করে বিচারপতি হয়েছিলেন ।. এইরকম উদাহরণ আরও আছে যেমন সুকুমার সিংহ রায় এর পুত্র শ্রী অপূর্ব সিংহ রায়, সন্তোষ কোলের পুত্র জয়ন্ত্র কোলে, চিন্ময় চ্যাটার্জী। আরও কয়েক জন হাওড়ার আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরে বিচারক হয়েছেন তবে তাদের নাম আমি মনে করতে পারছি না। আবার উল্টোটাও হয়েছে । জজ সাহেব এর কর্ম জীবন থেকে অবসর নিয়ে সুনামের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ওকালতি করেছেন সন্তোষ কোলে রাখাল দাস মহাশয় । হাওড়া আদালতে কর্ম জীবন শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন দুজন এক দুই শ্রী অরূপ রায় যিনি বর্তমানে সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী।হাওড়া আদালতে আইনজীবীদের তিনটি সংঘ আছে একটি হাওড়া বার এসোসিয়েশন বর্তমানে সভাপতি গৌতম মুখার্জী হটাৎ পরলোক গমন করায় এক্টিং প্রেসিডেন্ট হিসাবে শ্যামল মিত্র কাজ চালাচ্ছেন। ক্রিমিনাল কোর্ট বার এসোসিয়েশন সভাপতি সমীর বসু রাইচৌধুরী।আরেকটি হলো ক্রিমিনাল কোর্ট বার লাইব্রেরি বা ছোটো লাইব্রেরি সভাপতি বিমল রক্ষিত। বর্তমানে গভর্মেন্ট প্লিডার [ জি পি ] শ্রী মদন মোহন ব্যানার্জী পাবলিক প্রসিকিউটর শ্রী সোমনাথ মুখার্জী ।পরিশেষে বলি বর্তমানে যারা হাওড়া আদালতের আইনজীবী আছেন তাঁদের অনেকেই অতি দক্ষতার সাধে এবং সুনামের সাথে কাজ করছেন । আইনের জগতে বিচারপতি আইনজীবী দু ভূমিকাতেই মহিলাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি উত্তরউত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

এছাড়া আরও অনেক মহিলা বিচারক আছেন যারা অত্যন্ত দক্ষতার সাধে বিচার কার্য করছেন ।হাওড়ায় বেঞ্চ এন্ড বার এর সম্পর্ক মধুর। এই দীর্ঘ সময়ে কত অতি দক্ষ বিচারপতি কে দেখেছি তাঁদের সাথে কাজ করেছি কত স্মৃতি।এ তালিকা অতি দীর্ঘ। মনেপড়ছে যে সময়ে আমি ওকালতি শুরু করি সেই সময় জেলা জজ গীতিশ রঞ্জন ভট্টাচার্য দারুণ রাসভারি লোক ছিলেন, উনি পরবর্তী কালে হাই কোর্ট জজ হয়েছিলেন ।সেই সময় ফোর্থ মুন্সিফ ছিলেন নন্দ গুইন। সবে দুদিন কোর্ট এ এসেছি। সিনিয়র এর সঙ্গে ওনার এজ্লাসে, উনি সিনিয়রকে বসিয়ে আমাকে হিয়ারিং করতে বললেন । আমার যে কি অবস্থা কি বলবো ,, কোনোক্রমে দুচার কথা বললাম । উনি হেঁসে বললেন ঠিক আছে। উনি জুনিয়র দের খুব উৎসাহ দিতেন। এই রকম আরও অনেক বিচারপতিকে আমরা পেয়েছি ।তবে শুধু জ্ঞানী দক্ষ বিচারপতি হিসাবে নয় তার সাথে হৃদয়বান বিচারপতি হিসাবে যে কজনকে আমি দেখেছি তারমধ্যে কয়েক জন হলেন ,পি এস ব্যানার্জী,, বিবেক চৌধুরী , এনারা দুজনেই পরবর্তী কালে হাইকোর্ট র বিচারপতি হয়েছিলেন । অতি সম্প্রতি হাওড়া থেকে দুজন বিচারপতি অন্যত্র বদলি হয়েছেন একজন দেবদীপ মান্না অন্যজন শ্রীমতী অনামিত্রা ভট্টাচার্য , এনাদের আইনজীবীদের সঙ্গে পক্ষপাত হীন মধুর ব্যবহার এবং বিচারপার্থীদের প্রতি সহনাভূতি আমাকে অবাক করেছে । দীর্ঘ ওকালতি জীবনে বহু বিচারপতির কাছ থেকে সদহৃদয় সুমধুর ব্যবহার পেয়েছি, সকলের নাম উল্লেখ সম্ভব নয়, তবে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করি ।বর্তমানে হাওড়া আদালতে আমার সমসাময়িক এমনকি বয়সে অনুজ অনেক আইনজীবী অতি দক্ষতার সাথে আইনি কার্য করছেন । সকলের জন্য রইলো শুভেচ্ছা।

সঙ্গত ছাড়া যেমন সঙ্গীত হয় না, ঠিক তেমনি মুহুরী ছাড়া উকালতি হয় না। একজন উকিলের সফলতার পেছনে মুহুরীদের অবদান অনেক। আমার উকালতি জীবনে বহু মুহুরীর প্রচুর সাহায্য পেয়েছি। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। উকিলের যেমন মুহুরী তেমনি জজ সাহেব দের বেঞ্চ ক্লার্ক সহ অফিস স্টাফ।আদালতের কাজে এনাদের গুরুত্ব প্রচুর। জজ সাহেব , কোর্ট স্টাফ উকিল মুহুরী চার ফুলে মালা গাঁথা। সকলের প্রয়াসে চলে বিচার কার্য। সম্প্রতি করোনা কালে আমরা অনেক প্রতিভাবান আইনজীবীকে অকালে হারিয়েছি । তাদের কথা খুব মনে পরে । তরুণ সুদর্শন মিষ্টভাসি শুভাশিস ব্যানার্জী, দারুণ সরদ বাজাতো, গুণী শিল্পী। বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে গেলাম , তার মাত্র দু মাস পরে তাকে হারালাম।বছরের শেষে ঠিক বড়দিনের আগের দিন, দিনটাকে ছোটো করে দিলো বন্ধু আসিতাভ মুখার্জী, করোনাক্রান্ত হয়ে চলে গেলো।আরও কত জনকে হারালাম, বড় দীর্ঘ এ তালিকা। আমার দীর্ঘ দিনের সঙ্গী ও সহকারী , মশাটের মোহন সরকার কিছু বছর আগে অকালে চলে গেছে , বড় মনে পরে তার কথা । এ রচনায় অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি বিচ্ছুতির জন্য মার্জনা চাইছি । আপাততো আমার কথা ফুরোলো তবে নোটে গাছ মুড়োলো না। রয়ে গেলো অনেক না বলা কথা। তাই বন্ধু কলম এবার আপনাদের হাতে । শোনান আপনার দেখা শোনা জানা বিশিষ্ট আইনজীবীদের স্মৃতি কথা ।

নমস্কার ।

Read also

হাওড়া মিউনিসিপাল কর্পোরেশান – Howrah Municipal Corporation by Alak Bhattacharya


Notes

(1) An Account of Howrah, Past and Present, C. N. Banerjei ,Daniel Ghose, at the Light Press, 1872 – Howrah (India) – 98 pages. C N Banerji was posted in Howrah district from 1872 to 1897 as Deputy Magistrate.

“But if it be asked why I have included Howrah in Burdwan,” writes C. N. Banerjei by way of explanation, “in preference to attaching it to the 24-Pergunnahs, the officers of which district have had,from time to time, a great deal to do with Howrah, I have to advance the sale in 1800 A.D. of certain lands, now comprised in the Howrah Maidan, by the Collector of Burdwan, for recovery of arrears of rent due by the defaulting proprietor Rughoo Nath Sing. If the district were not attached to Burdwan, it cannot be conceived why the Collector of Burdwan should take steps to realize the rents due. Again, between the years 1793 and 1800 A.D., the non-existence of a Civil court in the 24-Pergunnahs shows at once that Howrah was either attached to Calcutta, or Burdwan which comprised Hooghly, but the laws which obtain in Howrah being such as are not administered in Calcutta, fairly lead to the inference that Howrah was a part of a Mofussil district, and which district could be none other than Burdwan. The only way I can reconcile the fact of the Judge and Magistrate of 24-Pergunnahs having anything to do with Howrah, is by the supposition that the thannahs of Howrah, Seebpore, and Sulkea were placed under the 24-Pergunnahs’ jurisdictionin Civil and Magisterial matters, under the authority of Section 3 of Regulation VIII of 1806 which lays down that ‘the civil jurisdiction of the Court (of 24-Pergunnahs established by that Regulation) shall extend to the whole of the Pergunnahs and Mehals which are now,or may be hereafter, placed under the Criminal and Police jurisdiction of the Magistrate of the 24-Pergunnahs, which are not situated within the limits of the town of Calcutta.’

The history of subsequent administrative changes in the district has been described by C. N. Banerjei as follows: “Howrah had risen to so much importance notwithstanding that the Railway had not opened that, in 1841 there was a proposal to appoint a separate Joint-Magistrate for Howrah, Sulkea and Seebpore. Hitherto the Magis trate of the 24-Pergunnahs used to come over once a week. All criminal cases were however adjudicated at Alipore. Meanwhile two European Seargents were appointed to look after public safety. The Government, in the early part of 1843, determined to appoint a Magistrate to the station in lieu of a Joint Magistrate, on a salary of Rs. 900 a month only.

The new jurisdiction thus formed, comprised the thannahs of Sulkea in 24 Pergunnahs, and Ampta, Rajapore, Oolooberiah, Khotra and Bagnan in Hooghly, but the civil and fiscal jurisdictions remained as heretofore attached to Hooghly. Mr. W. Taylor of the Bengal Civil Service was the first Magistrate here. … He was directed to make his commitments to the Sessions of the 24-Pergunnahs, the Judge of which district also sat on appeals preferred from the Magistrate’s decisions. … In 1845, the recently formed Magistracy of Howrah received an accession of territorial jurisdiction by the transfer to it from Hooghly of certain villages south of Rshra  and Kishtorampore belonging to the thannah of Boydyobattee. In 1846, the Magisterial jurisdiction was further increased by half of the river on its western side. . .. Between this year and 1861, a few thannahs were added and taken away. .. .

“Up to 1863 the Howrah Magistracy remained legally attached to the 24-Pergunnahs district. I say, legally attached, because no provision was made to attach it to the jurisdiction of any other Judge, when the river Hooghly was made by the Government of India the western boundary of the 24-Pergunnahs district. The error was discovered in 1864 and was remedied by attaching to Hooghly the thannahs of which the district was comprised. The Additional Judge of 24-Pergunnahs and Hooghly was vested in that year with power to hold periodical Sessions in Howrah with the aid of a Jury, a special Act being passed to legalize whatever had been done in the interim.

“The importance to which Howrah, from being a small village, had risen during the lapse of a century, and from the heavy work devolving on the Sessions Judge of 24-Pergunnahs and the Civil Judge of Hooghly (for the former had all the duties arising from Magisterial work and the latter the duties arising from the lately established Deputy Collectorate for adjudication of Act X cases, and form the Moonsiffs’ courts), led in 1861 to a proposal by the late Sudder Dewanny Court to appoint a Civil and Sessions Judge for Howrah, who should also be Additional Judge of 24-Pergunnahs and Hooghly, in lieu of the Additional Judge, trying commitments made by the Dacoity Department. It was also then proposed to vest the Small Cause Court Judge, lately appointed, with the powers of a Principal Sudder Ameen and to locate these officers in the circuit house. The necessity was admitted by the Government but the proposal quietly died away, to be renewed in 1865 with a modification, viz, the creation of a fiscal jurisdiction for Howrah, but like the preceding one was nipped in the bud. Again in 1867, a fresh proposal was laid before Government to make Howrah a separate district for all purposes; revenue, civil, and magisterial, with the exception of a regular treasury; but owing to the expenses involved not being worth the change,the subject was dropped.”

(2) Though a Magistrate was appointed exclusively for Howrah as early as in the forties of the 19th century, it did not become a fullfledged and independent district until a long time thereafter. Even in 1909, when the last Gazetteer of the district was written by O’Malley, the administration of revenue and civil justice fell within the jurisdiction of Hooghly. The District and Sessions Judge of Howrah used to be designated as an Additional District and Sessions Judge of Hooghly at Howrah up to 1937, the separation of the administration of civil justice in the two districts being completed under Notification No. 9150-J of December 8, 1937. As a result, a separate judgeship was created at Howrah with effect from January 1, 1938. Before this, the Revenue Departments of the Collectorate had been organized in 1920 when the Collector of Howrah became independent of the Collector of Hooghly in these matters. [An Account of Howrah, Past and Present, C. N. Banerjei]

(3) In 1820 about 50 acres of land belonging to the Botanical Garden at Sibpur was made over by the Government to the Society for the propagation of Christian Knowedge for establishing the Bishop’s College which started functioning
in 1824 and was designed to train missionaries for the propagation of Christianity. In 1847 the land in the Maidan underwent a measurement, and was found to be 137 bighas 2 cottahs and 3 chittacks; the original quantity was said to have been 160 bighas and 1J cottahs; but it must be borne in mind that a part of the land fell in the Grand Trunk Road, besides the detachment of a site of about 5 bighas for the erection of the Church. The annual rental Sicca Rs. 320-2-8 used to be paid by Government to the Zemindars for the original piece of ground. [An Account of Howrah, Past and Present, C. N. Banerjei]

(4) The Maidan, a portion of the Railway Company’s premises, and the different large old buildings in the Maidan were all originally included in one lot. The Cutcherry house was built about the year 1767 A.D. for a rum distillery. In a few short years it passed into the hands of Levett, and was known as ‘Levett’s gardens’. In 1785 A.D. the premises were purchased by the Military Orphan Society, in whose occupation it remained till 1815. … The premises were (thereafter) divided into three portions, one was allowed to the Customs Department Officer, a second to the Magistrate of the 24-Pergunnahs for holding a periodical court. To this portion the Civil court of Sulkea was transferred in a few years. A third portion was made over to the resident Clergy of Bishop’s College, in consideration of their services in performing Divine Service at Howrah. When a Magistracy was established here in 1843, the Magistrate’s court was located in that portion of the building which accommodated also the Court of the Sulkea Moonsiff, and the offices of the Salt Department subordinate to the Custom’s Office. …Three years later (in 1851—Ed.), the Missionaries had to give up using the house, as the portion they occupied was required for a public purpose. The Customs Department vacated the portion occupied by them in 1859. One house is now the residence of the Magistrate, and the other buildings accommodate the different courts. [An Account of Howrah, Past and Present, C. N. Banerjei]


Howrah – Aain Adalat, Sekal Theke Ekal

%d bloggers like this: