মাইকেল মধুসূদন দত্ত – Michael Madhusudan Dutt
ঈশ্বরচন্দ্র যখন মৃত্যুশষ্যাতে শয়ান, তখন মধুসূদন লোকচক্ষের অগোচয়ে থাকিয়া প্রতিভা-বলে উঠিয়া দাঁড়াইবার জন্য দুরন্ত পরিশ্রম করিতেছিলেন। মধুসূদন যশোর জেলাস্থ সাগরদাঁড়ী নামক গ্রামবাসী রাজনারায়ণ দত্তের পুত্র। তাঁহার পিতা কলিকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের একজন প্রসিদ্ধ উকীল ছিলেন; এবং তদুপলক্ষে কলিকাতায় উপনগরবর্ত্তী খিদিরপুর নামক স্থানে বাস করিতেন। ইংরাজী ১৮০৪ সালে, ১৫ জানুয়ারী তাঁহার জন্ম হয়। তাঁহার জননী জাহ্নবী দাসী কাটিপাড়ার জমিদার গৌরীচরণ ঘোষের কন্যা। জাহ্নবীর জীবদ্দশাতেই বিলাস-পরায়ণ রাজনারায়ণ আর তিনটী বিবাহ করিয়াছিলেন। দুইটী সহোদর ভ্রাতার অকালে মৃত্যু হওরায় মধুসূদন স্বীয় জননীর একমাত্র পুত্র ছিলেন। সুতরাং তিনি শৈশববধি মায়ের অঞ্চলের নিধি, আদুরে ছেলে ছিলেন। রাজনারায়ণেয় অর্থের অভাব ছিল না; সুতরাং অর্থের দ্বারা সস্তানকে যতদূর আদর দেওয়া যায়,
মধুসূদনের পিতামাতা পুত্রকে তাহা দিতে কখনই কৃপণতা করিতেন না। মধুসূদন প্রথমে সাগরদাঁড়ীতে জননীর নিকট থাকিয়া পাঠশালাতে, বিদ্যা শিক্ষা আরম্ভ করেন। ১২ । ১৩ বৎসর বয়সে তাঁহার পিতা তাঁহাকে নিজের খিদিরপুরের বাটীতে আনিয়া হিন্দুকালেজে ভর্তি করিয়া দেন। কালেজে পদার্পণ করিবামাত্র মধুসূদনের আশ্চর্য ধীশক্তি সকলের গোচর হইল। তিনি ১৮৩৭ সালে কালেজে প্রবিষ্ট হইয়া ১৮৪১ সাল পর্যন্ত তথায় পাঠ করিয়াছিলেন। এই অল্পকালের মধ্যে সিনিয়ার স্কলারশিপের শ্রেণী পৰ্যন্ত পাঠ করেন; এবং সকল শ্রেণীতেই অগ্রগণ্য বালকদিগের মধ্যে পরিগণিত হইয়াছিলেন। সে সময়ে যাঁহারা তাঁহার সমাধ্যায়ী ছিলেন, তাঁহারা বলেন যে তিনি গণিত বিদ্যায় একেবারে অবহেলা প্রকাশ করিতেন এবং কাব্য ও ইতিহাস পাঠেই অধিক মনোযোগী ছিলেন। আদুরে ছেলের চরিত্রে যে সকল লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহা এ সময়ে তাঁহার চরিত্রে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হইত। তিনি অমিতব্যয়ী, বিলাসী, আমোদ-প্রিয়, কাব্যানুরাগী ও বন্ধুবান্ধবের প্রতি প্রীতিমান ছিলেন। ধুলিমুষ্টির ন্যায় অর্থমুষ্টি ব্যয় করিতেন। সে সময়ে সুরাপান ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের মধ্যে একটা সৎসাহসের কার্য্য বলিয়া গণ্য ছিল; মধুসূদনের সময়ে কালেজের অনেক ছাত্র সুরাপান করাকে বাহাদুরির কাজ মনে করিত। মধু তাঁহাদের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ছিলেন। এতদ্ব্যতীত অপরাপর অসমসাহসিক পাপকাৰ্য্যেও তিনি লিপ্ত হইতেন। পিতামাতা দেখিয়াও দেখিতেন না; বরং অর্থ যোগাইয়া প্রকারান্তরে উৎসাহদান করিতেন। যাহা হউক, বিবিধ উচ্ছৃঙ্খলতা সত্ত্বেও মধুসুদন জ্ঞানানুশীলনে কখনই অমনোযোগী হইতেন না। কালেজে তিনি কাপ্তেন রিচার্ডসনের নিকট ইংরাজী-সাহিত্য পাঠ করিতেন। সৎক্ষেত্রে পতিত কৃষির ন্যায় রিচার্ডসনের কাব্যানুরাগ মধুর হৃদয়ে পড়িয়া সুন্দর ফল উৎপন্ন করিয়াছিল। তিনি ছাত্রাবস্থাতেই ইংরাজী কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। প্রতিভার শক্তি কোথায় যাইবে! সেই ইংরাজী কবিতাগুলিতে তাঁহার যথেষ্ট কবিত্বশক্তি প্রকাশ পাইয়াছে।
কবিতারচনাতে ও পাঠ্যবিষয়ে তাঁহার কৃতিত্ব দেখিয়া সকলেই অনুমান করিতেন যে মধু কালে দেশের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি হইবেন। মধুর পিতামাতাও বোধ হয় সেই আশা করিতেন। কিন্তু যে প্রতিভার গুণে মধু অসাধারণ শক্তি প্রদর্শন করিতেন; সেই প্রতিভাই তাঁহাকে সুস্থির থাকিতে দিল না। যৌবনের উন্মেষ হইতে না হইতে তাঁহার আভ্যন্তরীণ শক্তি তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিতে লাগিল। গতানুগতিকের চিরপ্রাপ্ত বীথিকা তাঁহার অসহনীয় হইয়া উঠিল। দশজনে যাহা করিতেছে, দশজনে যাহাতে সস্তুষ্ট আছে, তাহা তাঁহার পক্ষে ঘৃণার বস্তু হইয়া উঠিল; তাঁহার প্রকৃতি নুতন ক্ষেত্র, নূতন কাজ, নূতন উত্তেজনার জন্য লালায়িত হইতে লাগিল।
ইত্যবসরে তাহার জনকজননী তাঁহার এক বিবাহের প্রস্তাব উপস্থিত করিলেন। একটা আট বৎসরের বালিকা, যাহাকে চিনি না জানি না, তাঁহাকে বিবাহ করিতে হইবে, এই চিন্তা মধুকে ক্ষিপ্ত-প্রায় করিয়া তুলিল। তিনি পলায়নের পরামর্শ করিতে লাগিলেন। পলাইবেন কোথায়? একেবারে বিলাতে! তাহা না হইলে আর প্রতিভার খেয়াল কি! কার সঙ্গে যাইবেন, টাকা কে দিবে, সেখানে গিয়া কি করিবেন, তাহার কিছুরই স্থিরতা নাই; যখন পলাইতে হইবেই, তখন দেশ ছাড়িয়া একেবারে বিলাতে পলানই ভাল! পরামর্শ স্থির আগে হইল, টাকার চিন্তা পরে আসিল। ‘টাকা কোথায় পাই, বাবা জানিলে দিবেন না, মার নিকটেও পাইব না, আর ত কাহাকেও কোথায়ও দেখি না। শেষে মনে হইল মিশনারিদিগের শরণাপন্ন হই, দেখি তাঁহারা কিছু করিতে পারেন কি না। গেলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের নিকটে; তিনি নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিলেন যে তাঁহার মনে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ অপেক্ষা বিলাত যাওয়ায় বাতিকটাই বেশী। এইরূপে আরও কয়েক দ্বারে ফিরিলেন। শেষে কি হইল, কি দেখিলেন, কি শুনিলেন, কি ভাবিলেন, কি বুঝিলেন, তাঁহার বন্ধুরা কিছুই জানিতে পারিলেন না।
১৮৪৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষে বন্ধুগণের মধ্যে জনরব হইল যে, মধু খ্রীষ্টান হইবার জন্য মিশনারীদিগের নিকট গিয়াছে। অমনি সহরে হুলস্থূল পড়িয়া গেল। হিন্দুকালেজের প্রসিদ্ধ ছাত্র ও সদর দেওয়ানী আদালতের প্রধান উকীল রাজনারায়ণ দত্তের পুত্র খ্ৰীষ্টান হইতে যায়—এই সংবাদে সকলের মন উত্তেজিত হইয়া উঠিল। রাজনারায়ণ পুত্রকে প্রতিনিবৃত্ত করিবার জন্য চেষ্টার অবধি রাখিলেন না। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। উক্ত সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রারম্ভে তিনি খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইলেন।
আমরা সহজেই অনুমান করিতে পারি তাঁহার পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের মনে কিরূপ আঘাত লাগিল। কিন্তু তাঁহারা তাঁহাকে অর্থ সাহায্য করিতে বিরত হইলেন না। খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়া মধু হিন্দু কালেজ পরিত্যাগ করিলেন এবং বিধিমতে খ্ৰীষ্টীয় শাস্ত্র শিক্ষা করিবার জন্য বিশপস কালেজে প্রবেশ করিলেন। এখানে তিনি ১৮৪৩ সাল হইতে ১৮৪৭ সাল পর্য্যন্ত ছিলেন; এবং এখানে অবস্থানকালে হিব্রু, গ্ৰীক, লাটিন প্রভৃতি নানা ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু বিশপস কালেজেই বা কে তাঁহাকে বাঁধিয়া রাখে? তাঁহার বিলাতগমনের খেয়ালটার যে কি হইল তাহার প্রকাশ নাই; কিন্তু বঙ্গদেশ তাঁহার পক্ষে আবার অসহ্য হইয়া উঠিল। আবার গতানুগতিকের প্রতি বিতৃষ্ণ জন্মিল; অবশেষে একদিন কাহাকেও সংবাদ না দিয়া একজন সহাধ্যায়ী বন্ধুর সহিত মাক্সাজে পলাইয়া গেলেন।
মাদ্রাজে গিয়া তিনি এক নুতন অভাবের মধ্যে পড়িলেন। অর্থের জন্য তাঁহাকে কখনও চিন্তিত হইতে হয় নাই। দেশে থাকিতে পিতামাতা তাঁহার সকল অভাব দূর করিতেন। সেখানে তাঁহাকে নিজের উদরায় নিজে উপার্জ্জন করিতে হইল। কিন্তু তিনি ইংরাজী রচনাতে যেরূপ পারদর্শী ছিলেন, তাঁহার কাজের অভাব হইল না। তিনি মান্দ্রাজ সহরের ইংরাজ—সম্পাদিত কতকগুলি সংবাদপত্রে লিখিতে আরম্ভ করিলেন। অল্পকালের মধ্যেই তাঁহার খ্যাতি প্রতিপত্তি হইয়া উঠিল। ১৮৪৯ সালে “Captive Lady” নামে একখানি ইংরাজী পদ্যগ্রন্থ মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলেন। তাহাতে তাঁহার কবিত্বশক্তির ও ইংরাজীভাষাভিজ্ঞতার যথেষ্ট প্রশংসা হইল। কিন্তু মহাত্মা বেথুনের ন্যায় ভাল ভাল ইংরাজগণ তাহা দেখিয়া বলিলেন যে বিদেশীয়ের পক্ষে ইংরাজী কবিতা লিখিয়া প্রতিষ্ঠালাভের চেষ্টা করা মহা ভ্রম; তদপেক্ষা এরূপ প্রতিভা স্বদেশীয় ভাষাতে নিয়োজিত হইলে দেশের অনেক উপকার হইতে পারে। তাঁহার প্রতিভা আবার তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিল। সেখানে একজন ইংরাজমহিলার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক আর একটা ইংরাজমহিলাকে পত্নীভাবে লইয়া ১৮৫৬ সালে, আবার দেশে পলাইয়া আসিলেন। কিন্তু হায় দেশে আসিয়া কি পরিবর্ত্তনই দেখিলেন। পিতা মাতা এ জগতে নাই; আত্মীয় স্বজন বিধৰ্ম্মী বলিয়া তাঁহাকে মন হইতে পরিত্যাগ করিয়াছেন; পৈতৃক সম্পত্ত্বি অপরের গ্রাস করিয়া বসিয়াছে; বাল্যসুহৃদ ও সহাধ্যারিগণ তাঁহাকে ভুলিয়া গিয়াছেন; এবং নানা স্থানে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়াছেন; নব্যবঙ্গের রঙ্গভূমিতে নুতন একদল নেতা আসিয়াছেন, তাঁহাদের ভাব গতি অন্য প্রকার; এইরূপে মধুসূদন স্বদেশে আসিয়াও যেন বিদেশীয়দিগের মধ্যে পড়িলেন। এই অবস্থাতে তাঁহার বন্ধু গৌরদাস বসাকের সাহায্যে কলিকাতা পুলিস আদালতে ইন্টারপ্রিটারি কৰ্ম্ম পাইয়া, তাহা অবলম্বন পুৰ্ব্বক দিন যাপন করিতে লাগিলেন।
কিরূপে তাঁহার বন্ধু গৌরদাস বাবু তাঁহাকে পাইকপাড়ার রাজাদ্বয়ের ও যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর মহাশয়ের সহিত পরিচিত করিয়া দেন, কিরূপে তাঁহারা সংস্কৃত রত্নাবলী নাটকের বাঙ্গালা অনুবাদ করাইয়া বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে তাঁহার অভিনয় করান ও তৎসূত্রে উক্ত অনুবাদের ইংরাজী অনুবাদ করিয়া কিরূপে মধুসূদন শিক্ষিতব্যক্তিগণের নিকট পরিচিত হন, তাহা পূৰ্ব্বে কিঞ্চিৎ বর্ণন করিয়াছি। বলিতে কি ঐ রত্নাবলীর ইংরেজী অনুবাদ মধুসূদনের প্রতিভা বিকাশের হেতুভূত হইল। তিনি সংস্কৃত নাটক রচনার রীতির দোষগুণ ভাল করিয়া অনুভব করিলেন; এবং এক নবপ্রণালীতে বাঙ্গালা নাটক রচনার বাসনা তাঁহার অন্তরে উদিত হইল। তিনি তদনুসারে ১৮৫৮ সালে “শৰ্ম্মিষ্ঠা” নামক নাটক রচনা করিয়া মুদ্রিত করিলেন। মহা সমারোহে তাহা বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে অভিনীত হইল। তৎপরেই মধুসুদন প্রাচীন গ্ৰীসদেশীয় পুরাণ অবলম্বন করিয়া “পদ্মাবতী” নামে আর একখানি নাটক রচনা করেন। এই উভয় গ্রন্থে তিনি যশোলাভে কৃতকাৰ্য্য হইয়া বাঙ্গালা ভাষাতে গ্রন্থ রচন বিষয়ে উৎসাহিত হইয়া উঠিলেন। ইহার পরেই তিনি “একেই কি বলে সভ্যতা” ও “বুড়োশালিকের ঘাড়ের রে” নামে দুই খানি প্রহসন রচনা করেন। তৎপরে ১৮৬০ সালে রাজেদ্রলাল মিত্ৰ-সম্পাদিত “বিবিধার্থসংগ্রহ” নামক পত্রে তাঁহার নব অমিত্ৰাক্ষর ছন্দে প্রণীত “তিলোত্তম-সম্ভব কাব্য” প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয়; এবং অল্পকাল পরেই পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়। তিলোত্তমা বঙ্গসাহিত্যে এক নূতন পথ আবিষ্কার করিল। বঙ্গীয় পাঠকগণ নূতন ছন্দ, নূতন ভাব, নূতন ওজস্বিতা দেখিয়া চমকি উঠিলেন। মধুসূদনের নাম ও কীৰ্ত্তি সৰ্ব্বসাধারণের আলোচনার বিষয় হইল।
ইহার পরে তিনি “মেঘনাদবধ” কাব্য রচনাতে প্রবৃত্ত হন। ইহাই বঙ্গ সাহিত্য সিংহাসনে তাহার আসন চিরদিনের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। তাহার জীবনচরিতকার সত্যকথাই বলিয়াছেন, এবং আমাদেরও ইহা অত্যাশ্চৰ্য্য বলিয়া মনে হয় যে তাঁহার লেখনী যখন “মেঘনাদের” বীররস চিত্রনে নিযুক্ত ছিল, তখন সেই লেখনীই অপরদিকে “ব্ৰজাঙ্গনার” সুললিত মধুর রস চিত্রনে ব্যাপৃত ছিল। এই ঘটনা তাঁহার প্রতিভাকে কি অপুৰ্ব্ববেশে আমাদের নিকট আনিতেছে! একই চিত্রকর একই সময়ে কিরূপে এরূপ দুইটী চিত্র চিত্রিত করিতে পারে! দেখিয়া মনে হয়, মধুসূদনের নিজ প্রকৃতিকে দ্বিভাগ করিবার শক্তিও অসাধারণ ছিল। তাঁহার জন্যই বোধ হয় এত দুঃখ দরিদ্র্যের মধ্যে, এত ঘনঘোর বিধাদের মধ্যে, এত জীবনব্যাপী অতৃপ্তি ও অশাস্তির মধ্যে বসিয়া তিনি কবিতা রচনা করিতে পারিয়াছেন!
যাহা হউক তিনি কলিকাতাতে আসিয়া একদিকে যেমন কাব্য-জগতে নবযুগ আনয়নের চেষ্টা করিতে লাগিলেন, অপরদিকে জ্ঞাতিগণের হস্ত হইতে নিজ প্রাপ্য পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সে বিষয়ে কতদূর কৃতকার্য হইয়াছিলেন, তাহা বলিতে পারি না। তবে এ কথা নিশ্চিত, যে তিনি যাহা কিছু পাইয়াছিলেন ও যাহা কিছু নিজে উপার্জ্জন করিতেন, হিসাব করিয়া চলিতে পারিলে তাহাতেই এক প্রকার দিন চলিবার কথা ছিল। কিন্তু পিতামাতার যে আদুরে ছেলে জীবনে একদিনের জন্য আয় ব্যয়ের সমতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে নাই, সে আজ তাহা করিবে কিরূপে? কিছুতেই মধুর দুঃখ ঘুচিত না। প্রবৃত্তিকে যে কিরূপে শাসনে রাখিতে হয় তাহা তিনি জানিতেন না। মনে করিতেন প্রবৃত্তির চরিতার্থতাই মুখ। রাবণ তাহার আদর্শ, “ভিখারী রাঘব” নহে; সুতরাং হস্তে অর্থ আসিলেই তাহা প্রবৃত্তির অনলে আহুতির ন্যায় যাইত! সুধের জোয়ার দুইদিনের মধ্যে ফুরাইয়া, মধু ভাটার কাটখানার মত, যে চড়ার উপরে, সেই চড়ার উপরে পড়িয়া থাকিতেন। কেহ কি মনে করিতেছেন ঘৃণার ভাবে এই সকল কথা বলিতেছি? তা নয়। এই সরস্বতীর বরপুত্রের দুঃখ দারিদ্র্যের কথা স্মরণ করিয়া চক্ষের জল রাখিতে পারি না; অথচ এই কাব্যকাননের কলকণ্ঠ কোকিলকে ভাল না বাসিয়াও থাকিতে পারি না। অন্ততঃ তাঁহাতে একটা ছিল না; প্রদর্শনের ইচ্ছ ছিল না। কপটতা বা ভণ্ডামির বিন্দুমাত্র ছিল না। এই জন্য মধুকে ভালবাসি। আর একটা কথা, এমন প্রাণের তাজা ভালবাসা মানুষকে অতি অল্পলোকেই দেয়, এজন্যও মধুকে ভালবাসি। মধুসূদনের প্রতিভা আবার তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিল। ইংরাজ কবি সেক্সপীয়র বলিয়াছেন ‘কবিগণ পাগলের সামিল।’ তাই বটে; ১৮৬১ সালে মধুসূদনের মাথায় একটা নূতন পাগলামি বুদ্ধি আসিল। সেটা এই যে তিনি বিলাতে গিয়া বারিষ্টার হইবেন। লোকে বলিতে পারেন, এটা আবার পাগলামি কি? এত সদবুদ্ধি। যদি এ পৃথিবীতে বারিষ্টারি করিবার অনুপযুক্ত কোনও লোক জন্মিয়া থাকেন, তিনি মধুসূদন দত্ত। তাঁহার প্রকৃতির অস্থি মজ্জাতে বারিষ্টারির বিপরীত বস্তু ছিল; আইন আদালতের গতি লক্ষ্য করা, মক্কেলদিগের কাছে বাধা থাকা, নিয়মিত সময়ে নিয়মিত কাজ করা, তিনি ইহার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাহা বুঝলেন ন। ১৮৬২ সালের জুন মাসের প্রারম্ভে পত্নী ও শিশু কন্যা ও পুত্রকে রাখিয়া বারিষ্টার হইবার উদ্দেশ্যে বিলাত যাত্রা করিলেন। সেখানে গিয়া ৫ বৎসর ছিলেন। এই পাঁচ বৎসর তাঁহার দারিদ্র্যের ও কষ্টের সীমা পরিসীমা ছিল না। যাহাদের প্রতি নিজের বিষয় রক্ষা ও অর্থসংগ্রহের ভার দিয়া গিয়াছিলেন, এবং যাহাদের মুখাপেক্ষা করিয়া স্ত্রী পুত্র রাখিয়া গিয়াছিলেন, তাঁহারা সে বিশ্বাসানুরূপ কাৰ্য্য করিল না। হায়! দেশের কি অধোগতিই হইয়াছে! তাঁহার স্ত্রী পুত্র কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া ১৮৬৩ সালে বিলাতে তাঁহার নিকট পলাইয়া গেল। তাহাতে তাঁহার ব্যয়বৃদ্ধি হইয়া দারিদ্র্য ক্লেশ বাড়িয়া গেল। তিনি ইংলণ্ডে প্রাণধারণ করা অসম্ভব দেখিয়া, ফরাসিদেশে পলাইয়া গেলেন। সেখানে ঋণদায় ও কয়েদের ভয়ে তাঁহার দিন অতিকষ্টেই কাটিতে লাগিল। অনেক দিন সপরিবারে অনাহারে বাস করিতে হইতে; প্রতিবেশিগণের মধ্যে দয়াশীল ব্যক্তিদিগের সাহায্যে সে ক্লেশ হইতে উদ্ধার লাভ করিতেন। এরূপ অবস্থাতেও তিনি কবিতা রচনাতে বিরত হন নাই। এই সময়েই তাঁহার “চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী” রচিত হয়। ইহাই তাঁহার অলোকসামান্য প্রতিভার শেষফল বলিলে হয়। ইহার পরেও তিনি কোন কোনও বিষরে হস্তার্পণ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহার পূর্ণতা সম্পাদন করিতে পারেন নাই।
বিদেশবাসের দুঃখ কষ্টের মধ্যে পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার দুঃখের কথা জানিয়া তাঁহাকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন। যথাসময়ে তাঁহার সাহায্য না পাইলে, আর তাঁহার দেশে ফিরিয়া আসা হইত না। যাহা হউক তিনি উক্ত মহাত্মার সাহায্যে রক্ষা পাইয়া কোনও প্রকারে বারিষ্টারিতে উত্তীর্ণ হইয়া দেশে ফিরিয়া আসিলেন। বারিষ্টারি কাৰ্য্যে সুদক্ষ হইবার উপযুক্ত বিদ্যা বুদ্ধি তাঁর ছিল, ছিল না কেবল স্থিরচিত্ততা, তাঁহার মনের স্থিতি-স্থাপকতা শক্তি যেন অসীম ছিল। তিনি দুঃখের মধ্যে যখন পড়িতেন, তখন ভাবিতেন, আপনার প্রবৃত্তিকে সংযত করিয়া চলিবেন, কিন্তু স্বন্ধের জোয়ালটা একটু নামাইলেই নিজ মূৰ্ত্তি ধরিতেন, আবার সুখের আলোর পশ্চাতে ছুটতেন। দেশে যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন তাঁহার নাম সম্ভ্রম আছে, বন্ধুবান্ধব আছে, সাহায্য করিবার লোক আছে, যদি আপনাকে একটু সংযত করিয়া, নিজ কৰ্ত্তব্যে মন দিয়া বসিতেন, বারিষ্টারিতেই কিছু করিয়া উঠিতে পারিতেন। কিন্তু পাগলা কীটে তাঁহাকে সুস্থির বা সংযত হইতে দিল না। তিনি কয়েক বৎসর নানাস্থানে ঘুরিয়া নিজ অবস্থার উন্নতির জন্য বিফল চেষ্টা করিলেন। অবশেষে ১৮৭৩ সালের জুন মাসে নিতান্ত দৈন্যদশায় উপায়ান্তর না দেখিয়া, কলিকাতা আলিপুরের জেনারেল হস্পিটাল নামক হাসপাতালে আশ্রয় লইলেন। তাঁহার পত্নী হেনরিয়েটা তখন মৃত্যুশয্যায় শয়ানা! মধুসূদনের মৃত্যুর তিন দিন পূৰ্ব্বে হেনরিয়েটার মৃত্যু হইল। মৃত্যুশয্যাতে সমগ্র জীবনের ছবি মধুসূদনের স্মৃতিতে উদিত হইয়া তাঁহাকে অধীর করিয়াছিল। এরূপ শুনিতে পাওয়া যায় যে মৃত্যুর পূৰ্ব্বে তিনি কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকাইয়া তাঁহার নিকট খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে অবিচলিত বিশ্বাস স্বীকার পূর্ব্বক ও পরমেশ্বরের নিকট নিজ দুস্কৃতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া দেহত্যাগ করেন। ১৮৭৩ সাল, ২৯ শে জুন রবিবার, তিনি ভবধাম পরিত্যাগ করেন।