Howrar Dakat (হাওড়ার ডাকাত): Alak Bhattacharya
Home » Law Library Updates » Law Library » Bengali Page » Howrar Dakat (হাওড়ার ডাকাত): Alak Bhattacharya
হাওড়া আইন আদালত / সেকাল থেকে একাল। অপরাধ — অপরাধী / ইতিহাসের পাতা থেকে।
“ডাকাতদের চেহারার একটু বর্ণনা না দিলে ঠিক জমছে না। দীর্ঘ বলশালী শরীর। গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণ বর্ণ। ঝাঁকড়া চুল। মোটা গোঁপ। মালকোচা দিয়ে টাইট করে পড়া ধুতি। ওপরে হাতকাটা ফতুয়া। কোমরে কোমরবন্ধ। কপালে লাল ফেট্টি। তার নিচে লাল সিঁদুরের টিপ। গলায় জবা ফুলের মালা।”
হাওড়ার ডাকাত

চুরি ডাকাতি তে সেই সেকাল থেকেই হাওড়া (Howrah) কখনো পিছিয়ে নেই। আগের পর্বে বলেছি হাওড়ার গ্রাম গঞ্জ সমৃদ্ধ জনপদ হওয়ায় বরাবরই দুষ্কৃতীদের পছন্দের জায়গা ছিল হাওড়া। সে পর্তুগীজ (Portuguese), ইংরেজ বা মারাঠি বর্গী যেই হোক।যদিও সে সময় হাওড়া নাম আসে নি। এবারে আলোচনা করবো দেশীয় ডাকাত দের কথা। সে সময় হাওড়া জলবেষ্ঠিত, স্থানে স্থানে জঙ্গল পূর্ণ। ডাকাতরা আসতো জলপথে নৌকা করে। গ্রামে লুটপাট ডাকাতি করে আবার ফিরত জলপথে। কখনো নদীর ধারে জঙ্গল পূর্ণ দুর্গম স্থানে ছিল তাদের ডেরা। ডাকাতরা রণ পা ব্যবহারে উস্তাদ ছিল।
বালীর রতন ডাকাত
একদিকে গঙ্গা (Ganga) আর একদিকে বালি খাল। জলবেষ্ঠিত এই এলাকা ছিল রতন ডাকাতের আস্তানা। সে ও তার দলবল রণ পা ব্যবহার করতো। সেই জন্য তার নাম হয়ে ছিল রত্না পাখি। একটা অঞ্চল এখনো পাখির বাগান নামে পরিচিত। ডাকাতরা কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতো। রত্না ডাকাত ও এই অঞ্চলে কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। বালি খালের কাছে, গঙ্গার ধারে একটি কালী মন্দির আছে। লোকে বলে ” ডাকাত কালী “। বাগনানের ডাকাবেড়ে / ডাকাই চন্ডী।
বাগনানের একটি গ্রামে ডাকাতরা আস্তানা গেড়ে ছিল। অনুমান সেই কারণে গ্রামের নাম হয়ে গেলো ডাকাবেড়ে। সেই গ্রামের পূজিত দেবী ডাকাই চন্ডী (Dakai Chandi)। ডাকাতদের প্রতিষ্ঠিত দেবী, সেই হিসাবে নাম ডাকাত চন্ডী তা থেকে ডাকাই চন্ডী।
ঘুসুড়ির ভোটবাগান মঠে ডাকাতি
ঘুসুড়ির তিব্বতি ভোটবাগান মঠ ও পুরান গিরি।
হাওড়ার অন্যতম ঐতিহাসিক কেন্দ্র। বর্তমানে এই মঠ হেরিটেজ ভবন রূপে ঘোষিত হয়েছে। হাওড়ার ভোটবাগান মঠ ভারতবর্ষে তিব্বতিদের প্রথম মঠ বা মিশন। এখানেই কেটেছে জীবনের শেষ ভাগটা বিখ্যাত তিব্বতি ধর্মগুরু পুরান গিরি র। সে সময় এই মঠ (Mutt) ছিল অতি ধনী ও সমৃদ্ধ মঠ। তিব্বত (Tibet) থেকে আনা সোনা এখানে সঞ্চিত ছিল। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের এক রাত। সোনার লোভে ডাকাত হানা দিলো। পুরান গিরি এবং তার সঙ্গীরা বাঁধা দিলো। সেই রাতেই ডাকাতের সরকি র আঘাতে মারা গেলো পুরান গিরি। ওনাকে সমাধি দেওয়া হলো ঐ মঠে। চার জন ডাকাত ধরা পরলো। তাদের ফাঁসি হলো। সে ও ঐ মঠে।
গঙ্গার পূর্ব পারে একসময় চিতে ডাকাত, বিশু ডাকাত, রঘু ডাকাত মতো বিখ্যাত ডাকাতরা ইংরেজ বাহাদুরের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে ছিল। কিন্তু গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে মানে হাওড়ায় এই ধরণের নামী ডাকাত ছিল? ছিল। তারাও ইংরেজ বাহাদুরের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল। এই রকম বিখ্যাত ডাকাতরা অগ্রিম চিঠি দিয়ে ডাকাতি করতে আসতো। এতটাই তাদের ক্ষমতা ছিল। শিবপুরের বিখ্যাত জমিদার ভৈরব বন্দ্যোপাধ্যায় এর বাড়ীতে চিঠি দিয়ে ডাকাতি করতে এসেছিলো ডাকাত সদানন্দ ঠাকুর ও তার দলবল নিয়ে।
ডাকাতদের চেহারার একটু বর্ণনা না দিলে ঠিক জমছে না। দীর্ঘ বলশালী শরীর। গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণ বর্ণ। ঝাঁকড়া চুল। মোটা গোঁপ। মালকোচা দিয়ে টাইট করে পড়া ধুতি। ওপরে হাতকাটা ফতুয়া। কোমরে কোমরবন্ধ। কপালে লাল ফেট্টি। তার নিচে লাল সিঁদুরের টিপ। গলায় জবা ফুলের মালা। কাজে নামার আগে আরাধ্য মা কালীর পুজা করে আশীর্বাদী ফুল নিয়ে বেরিয়ে পড়তো। দিকবিদিক কাঁপিয়ে আওয়াজ উঠতো, হরে রে রে রে রে………
একটা সময় সারা বাংলা ঠ্যাঙাড়ে (Thangare Dakat) দের অত্যাচারে নাজেহাল হয়ে গিয়েছিলো। হাওড়াও তার ব্যতিক্রম নয়। এই ঠ্যাঙাড়ে রা যাতায়াতের পথে ঝোপ জঙ্গলে ওত পেতে থাকতো। তারপর সুযোগ বুঝে নিরীহ পথিচারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। সঙ্গের টাকা পয়সা জিনিসপত্র কেড়ে নিতো। বাঁধা দিলে মৃত্যু অবধারিত। সেকালে যানবাহন বলতে পালকি কি গরুর গাড়ী। বিত্তশালীরা তাতে যাতায়াত করতো। আম আদমি র ভরসা নিজের চরণ যুগল। আর এই ঠ্যাঙাড়ে রা সেই সুযোগ কাজে লাগতো।
হাওড়ায় নির্বাসন
আমরা জানি কুখ্যাত অপরাধীদের আন্দামান (Andaman) দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হতো। কিন্তু আমরা কজন জানি কোম্পানি আমলে গঙ্গার পূর্ব পাড়ের অর্থাৎ কলকাতার কুখ্যাত অপরাধীদের ধরে নির্বাসনে পাঠানো হতো হাওড়ায়। তার আগে তার গালে কালি লাগিয়ে দেওয়া হতো, যে কালি আমৃত্যু থাকবে। কোথায় পেলাম এ সংবাদ? অচল ভট্টাচার্য বাবু তার হাওড়া জেলার ইতিহাস গ্রন্থে জানিয়েছেন এই সংবাদ পাওয়া যায় সি, আর. উইলসন সাহেবের Early Annals of English in Bengal, গ্রন্থের ১১৯ পাতায়। সে যাইহোক এই দাগি অপরাধীরা কালি মাখা গালে হাওড়ায় এসে সাধু সন্ত হয়ে গিয়েছিল এরকম কোনো সংবাদ পাওয়া যায় নি। ডাকাতরা যে শুধু সাধারণ নাগরিক দের ওপর ডাকাতি করতো তা নয়। সরকারী সম্পত্তি র ওপর ও ডাকাত দের নজর ছিল। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে গঙ্গার ধারে মেজিস্ট্রেট এর কাছারি তে ডাকাতি হয়। হাওড়ার ঘুসুড়ি (Ghusuri) তে ছিল বিখ্যাত নুনের গোলা। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে নুনের চোরা কারবারের অপরাধে ২১ জন কে ধরা হয়। এবং শাস্তি হয়।
কানা গলি গ্যাং।
১৯৪১ সাল থেকে হাওড়ায় এক অপরাধ বাহিনী খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। দলটার নাম ছিল কানাগোলি গ্যাং। সালকিয়া শিবপুর কদমতলা সন্নিহিত এলাকায় এরা দুষ্কৃতি করে বেড়াতো। ১৯৫৮ সালে গ্যাংটিকে নির্মূল করা হয়। সে সময় ব্যাঙ্ক এর লকার ছিল না। গৃহস্থরা মূল্যবান ধন – সম্পত্তি বাড়ীর গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখে দিতো যাতে ডাকাতরা টের না পায়। ডাকাতরাও চালাক। তারা গুপ্তচর লাগিয়ে জেনে নিতো বাড়ীর কোথায় ধন সম্পত্তি লুকিয়ে রাখা আছে। ডাকাতদের প্রতিরোধ করার জন্য গৃহস্থরা নানা পন্থা অবলম্বন করতো। দলবেধে রাতজেগে গ্রাম পাহারা দিতো ।
আজ এ পর্যন্ত। আগামী পর্বে থাকছে আরো কিছু তথ্য।
ক্রমশ……
তথ্য সংগ্রহ ও ঋণ স্বীকার :- হাওড়া জেলার ইতিহাস, ২ য় খন্ড। অচল ভট্টাচার্য।