বেতন আয় কি ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণ করবে? সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, রোহিত নাথনের আইনি লড়াই
Supreme Court of India
Home » Law Library Updates » Law Library » Bengali Page » বেতন আয় কি ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণ করবে? সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, রোহিত নাথনের আইনি লড়াই
ওবিসি সংরক্ষণ ও ক্রিমি লেয়ার নিয়ে বড় আইনি মোড় – PSU কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ওবিসি সংরক্ষণে স্বস্তি
Supreme Court judgment in Union of India v. Rohith Nathan & Ors., 2026 INSC 230.
কলকাতার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রোহিত নাথন ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিল। তার বাবা অরুণ নাথন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কেরানির চাকরি করতেন এবং মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। পরিবারের আয় খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সম্মানজনকভাবে সংসার চলত। রোহিতের পরিবার অন্যান্য অনেক ওবিসি পরিবারের মতোই বিশ্বাস করত যে সংবিধান যে সংরক্ষণ নীতি দিয়েছে, তা তাদের মতো পিছিয়ে পড়া মানুষদের এগিয়ে আসার সুযোগ দেবে। রোহিত কঠোর পরিশ্রম করে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে তখনই, যখন তাকে জানানো হয় যে সে “ক্রিমি লেয়ার” হিসেবে গণ্য হয়েছে এবং তাই ওবিসি সংরক্ষণের সুবিধা পাবে না।
সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা জানালেন, রোহিতের বাবার বেতনের আয় হিসাব করে তাদের পরিবার ক্রিমি লেয়ারের (creamy layer status) মধ্যে পড়ে গেছে। রোহিত হতবাক হয়ে গেল। সে জানত যে ১৯৯৩ সালের অফিস মেমোরেন্ডামে বেতনের (salary) আয়কে ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলল যে ২০০৪ সালের একটি ব্যাখ্যামূলক চিঠির ভিত্তিতে তারা বেতনের আয়কেও গণনায় ধরেছে। এর ফলে রোহিতের মতো অনেক প্রার্থী, যাদের বাবা-মা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তারা সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রোহিত এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। সে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করল। মামলার সময় তার সঙ্গে আরও কয়েকজন প্রার্থী যোগ দিলেন, যাদের অবস্থাও একই রকম ছিল। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীর সন্তান, কেউ আবার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার নিম্নপদস্থ কর্মচারীর সন্তান। তারা সবাই বললেন, সরকার যেভাবে নিয়ম ব্যাখ্যা করছে, তা সংবিধানের সমতার নীতির বিরোধী।
ট্রাইব্যুনাল তাদের বক্তব্য শুনে রোহিতদের পক্ষে রায় দিল। আদালত বলল, ১৯৯৩ সালের অফিস মেমোরেন্ডামই মূল নীতি এবং সেখানে স্পষ্ট বলা আছে যে বেতন ও কৃষিজমির আয় ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণনা করা হবে না। কিন্তু ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হল না। তারা মাদ্রাজ, দিল্লি এবং কেরালা হাইকোর্টে আপিল করল। আশ্চর্যের বিষয়, তিনটি হাইকোর্টই ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত বহাল রাখল। তবুও সরকার শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে গেল।
সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে পরিণত হল। বিচারপতি শ্রী নারাসিমহা এবং বিচারপতি আর. মহাদেবনের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি শুনতে শুরু করলেন। আদালতে সরকারের আইনজীবীরা যুক্তি দিলেন যে ২০০৪ সালের ব্যাখ্যামূলক চিঠির উদ্দেশ্য ছিল নিয়ম পরিষ্কার করা এবং সেই অনুযায়ী বেতনের আয়ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
রোহিতদের পক্ষের আইনজীবীরা বললেন, একটি ব্যাখ্যামূলক চিঠি কখনোই মূল নীতিকে বদলে দিতে পারে না। ১৯৯৩ সালের অফিস মেমোরেন্ডামটি ইন্দ্রা সহানি মামলার পর সংবিধানের নির্দেশ অনুযায়ী জারি করা হয়েছিল এবং সেটিই ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের ভিত্তি। যদি সরকার সত্যিই নিয়ম পরিবর্তন করতে চাইত, তাহলে নতুন নীতি জারি করতে হত; একটি সাধারণ চিঠি দিয়ে তা করা যায় না।
বিচারপতিরা দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষের যুক্তি শুনলেন। আদালতে আলোচনা চলল সংবিধানের ১৪ এবং ১৬ অনুচ্ছেদের সমতার নীতি নিয়ে। বিচারপতিরা প্রশ্ন তুললেন, যদি একজন সরকারি কর্মচারীর সন্তান ক্রিমি লেয়ার না হয় শুধুমাত্র বেতনের কারণে, তাহলে একই ধরনের পদে কর্মরত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মচারীর সন্তান কেন ক্রিমি লেয়ার হিসেবে গণ্য হবে?
সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া গেল না। তখন আদালত আরও গভীরভাবে বিষয়টি পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তারা ১৯৯৩ সালের নীতির বিভিন্ন শ্রেণি বিশ্লেষণ করলেন। দেখা গেল, প্রথম তিনটি শ্রেণি মূলত পদমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ধারিত। অর্থাৎ কেউ যদি গ্রুপ এ বা ক্লাস ওয়ান অফিসার হন, তাহলে তার সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রিমি লেয়ারের মধ্যে পড়বেন। কিন্তু নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের ক্ষেত্রে আয় পরীক্ষাটি ছিল একটি সহায়ক ব্যবস্থা মাত্র।
বিচারপতিরা পর্যবেক্ষণ করলেন যে সরকারের ব্যাখ্যা এই পুরো কাঠামোটিকেই ভেঙে দিচ্ছে। শুধু আয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে মূল নীতির উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়। আদালত উল্লেখ করলেন যে বেতন একটি পরিবর্তনশীল বিষয় এবং অনেক সময় মূল্যস্ফীতির কারণে বেতন বাড়লেও সামাজিক অবস্থান তেমন পরিবর্তিত হয় না।
রোহিত আদালতের গ্যালারিতে বসে এই সব শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন তার নিজের জীবনের লড়াই দেশের হাজার হাজার মানুষের লড়াই হয়ে উঠেছে। অনেক প্রার্থী আদালতে উপস্থিত ছিলেন, যাদের চাকরি আটকে ছিল একই কারণে।
অবশেষে রায় ঘোষণার দিন এল। আদালত তাদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে বললেন যে ১৯৯৩ সালের অফিস মেমোরেন্ডামই ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের মূল ভিত্তি এবং একটি ব্যাখ্যামূলক চিঠি কখনোই সেই নীতিকে বদলাতে পারে না। আদালত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলেন যে বেতন ও কৃষিজ আয় ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
বিচারপতিরা আরও বললেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের সন্তানদের আলাদা করে দেখা সংবিধানের সমতার নীতির পরিপন্থী। যদি দুইজন কর্মচারীর পদমর্যাদা একই হয়, তবে শুধু চাকরির প্রতিষ্ঠানের ভিন্নতার কারণে তাদের সন্তানদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করা যায় না।
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার সব আপিল খারিজ করে দিল। আদালত নির্দেশ দিল যে রোহিত এবং অন্যান্য প্রার্থীদের দাবি নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে তাদের নিয়োগ দিতে হবে।
রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। তারপর ধীরে ধীরে সেই নীরবতা ভাঙল স্বস্তির নিঃশ্বাসে। রোহিত অনুভব করল যেন তার কাঁধ থেকে বিশাল এক বোঝা নেমে গেছে।
এই রায় শুধু রোহিতদের ব্যক্তিগত জয় ছিল না; এটি ছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তা। আদালত স্পষ্ট করে দিলেন যে সংরক্ষণ নীতির উদ্দেশ্য হল প্রকৃতপক্ষে পিছিয়ে পড়া মানুষদের সুযোগ দেওয়া, এবং প্রশাসনিক বিভ্রান্তি বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে কাউকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
রোহিত বুঝতে পারল যে আইনের লড়াই কখনো কখনো ব্যক্তিগত স্বপ্নের থেকেও বড় হয়ে যায়।
দেশজুড়ে অনেক তরুণ এই রায় থেকে নতুন আশা পেল। যারা এতদিন মনে করত যে নিয়মের জটিলতায় তাদের ভবিষ্যৎ আটকে গেছে, তারা বুঝল যে ন্যায়বিচার পেতে সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়।
11th March 2026
IN THE SUPREME COURT OF INDIA
CIVIL APPELLATE JURISDICTION
CIVIL APPEAL NO(S). 2827 – 2829 of 2018
UNION OF INDIA AND OTHERS … APPELLANT(S)
VERSUS
ROHITH NATHAN AND ANOTHER, ETC. … RESPONDENT(S)
Judgment Dated 11th March 2026
Read More
- বাংলার ইতিহাস, বাঙালিদের ইতিহাস এবং বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি
- বঙ্গের আদিসুর
- বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ