হরিশ রানা মামলা: মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়
Harish Rana, one life is not enough
Home » Law Library Updates » Law Library » Bengali Page » হরিশ রানা মামলা: মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়
হরিশ রানা বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলার গল্প
আইন, ভালোবাসা ও শেষ বিদায়: হরিশ রানা মামলার হৃদয়বিদারক কাহিনি
২০১৩ সালের এক শান্ত সন্ধ্যা। চণ্ডীগড় শহরের আকাশে তখন সূর্য ডুবছে। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র হরিশ রানা তার পেয়িং গেস্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। মাত্র কুড়ি বছরের এক ছেলেকে ঘিরে তখন কত স্বপ্ন—বি.টেক শেষ করবে, ভালো চাকরি করবে, বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করবে। পরিবারে সে ছিল আশা আর গর্বের প্রতীক।
কিন্তু জীবনের গল্প কখনও কখনও এক মুহূর্তেই পাল্টে যায়।
২০ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টার দিকে হরিশ হঠাৎ চারতলা থেকে নিচে পড়ে যায়। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকেরা দ্রুত বুঝতে পারেন আঘাতটি খুবই মারাত্মক। তাকে তড়িঘড়ি করে চণ্ডীগড়ের বিখ্যাত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান Postgraduate Institute of Medical Education & Research, Chandigarh-এ স্থানান্তর করা হয়।
ডাক্তারদের রিপোর্ট ছিল উদ্বেগজনক—হরিশের মস্তিষ্কে “ডিফিউজ অ্যাক্সোনাল ইনজুরি” হয়েছে, যা গুরুতর ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরির একটি রূপ। কয়েকদিন ধরে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ভেন্টিলেশন সাপোর্ট, ওষুধ, ট্র্যাকিওস্টমি, আর রাইলস টিউবের মাধ্যমে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। অবশেষে কয়েকদিন পর হাসপাতাল থেকে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু তার শরীর আর আগের মতো সাড়া দিচ্ছিল না।
হরিশ বেঁচে ছিল, কিন্তু সে যেন আর এই পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না।
সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে সে একটি স্থায়ী ভেজিটেটিভ অবস্থায় চলে গেছে। সে দেখতে পেত না, শুনতে পেত না, কথা বলতে পারত না। শরীরের চারটি অঙ্গই প্রায় নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। তার বেঁচে থাকা নির্ভর করছিল বিভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর—গলায় ট্র্যাকিওস্টমি টিউব, মূত্রনালীতে ক্যাথেটার, আর পেটে বসানো একটি PEG টিউব যার মাধ্যমে তাকে খাবার ও জল দেওয়া হতো। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় Clinically Assisted Nutrition and Hydration।
এই অবস্থার মধ্যেই শুরু হলো তার পরিবারের দীর্ঘ এবং নীরব সংগ্রাম।
হরিশের বাবা-মা তাকে কখনও এক মুহূর্তের জন্য অবহেলা করেননি। প্রতিদিন তার শরীর পরিষ্কার করা, ওষুধ দেওয়া, টিউবের যত্ন নেওয়া—সবই তারা নিজের হাতে করতেন। কখনও কখনও বাবা তার হাত ধরে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, যেন সে এখনও ছোট্ট শিশুটি।
দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যেতে লাগল।
প্রথম বছর তারা আশা করেছিল—হয়তো একদিন সে চোখ খুলবে। দ্বিতীয় বছরেও তারা আশা ছাড়েনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আশার আলো ক্ষীণ হয়ে এল। তবুও তারা হাল ছাড়েননি।
১৩ বছর ধরে এই পরিবার তাদের সমস্ত শক্তি, সময় এবং ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিল হরিশের যত্নে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাবা-মাও বয়সে বৃদ্ধ হয়ে উঠলেন। ডাক্তাররা ধীরে ধীরে স্পষ্ট করে বললেন—হরিশের অবস্থার কোনো উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তার মস্তিষ্কের ক্ষতি স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয়।
একদিন গভীর রাতে হরিশের মা নিঃশব্দে স্বামীকে বললেন, “আমরা কি সত্যিই ওকে বাঁচিয়ে রাখছি… নাকি শুধু তার শরীরটাকে ধরে রেখেছি?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তারা আইনের দ্বারস্থ হলেন।
প্রথমে তারা দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেন, যাতে হরিশের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আদালতের মতে, যেহেতু হরিশ নিজে শ্বাস নিতে পারছে এবং ভেন্টিলেটরে নেই, তাই তাকে “বাহ্যিক সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে” বলা যায় না।
এই সিদ্ধান্ত পরিবারটির কাছে ছিল গভীর হতাশার।
তবুও তারা থামলেন না। শেষ পর্যন্ত তারা ভারতের সর্বোচ্চ আদালত Supreme Court of India-এর শরণাপন্ন হলেন।
মামলাটি শুনলেন বিচারপতি J.B. Pardiwala এবং K.V. Viswanathan। আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিতে বিবেচনা করল। বিচারপতিরা শুধু আইন নয়, মানবিক দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখলেন।
আদালতের নির্দেশে দুটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। তারা হরিশকে পরীক্ষা করে জানায়—সে গত তেরো বছর ধরে অপরিবর্তনীয় ভেজিটেটিভ অবস্থায় রয়েছে এবং তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য।
তখন আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের উত্তর খুঁজল—পেটের PEG টিউবের মাধ্যমে দেওয়া পুষ্টি কি চিকিৎসা হিসেবে গণ্য হবে?
দীর্ঘ আইনি বিশ্লেষণের পর আদালত ঘোষণা করল যে Clinically Assisted Nutrition and Hydration আসলে একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। ফলে প্রয়োজনে এটি প্রত্যাহার করা আইনত সম্ভব।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল পূর্বের একটি ঐতিহাসিক রায়, Common Cause v. Union of India, যেখানে বলা হয়েছিল যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ মানুষের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করে, এবং সেই মর্যাদা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় থাকতে হবে।
আদালত বলল, যদি কোনো চিকিৎসা আর রোগীর উন্নতিতে সাহায্য না করে এবং কেবলমাত্র শরীরকে যান্ত্রিকভাবে টিকিয়ে রাখে, তবে সেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সবসময় মানবিক নয়।
শেষ পর্যন্ত আদালত হরিশের বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাল।
২০২৬ সালে আদালত নির্দেশ দিল যে হরিশের চিকিৎসা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা যেতে পারে। তবে তার শেষ সময় যেন যন্ত্রণা ছাড়া এবং মর্যাদার সঙ্গে কাটে, সেই জন্য তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অধীনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই দায়িত্ব দেওয়া হয় All India Institute of Medical Sciences-কে।
রায় ঘোষণার দিন আদালত একটি কথাও উল্লেখ করেছিল—গত তেরো বছর ধরে বাবা-মা এবং ভাই-বোনেরা যে ভালোবাসা ও ত্যাগের মাধ্যমে হরিশের যত্ন নিয়েছেন, তা এক অসাধারণ মানবিকতার উদাহরণ।
শেষ পর্যন্ত এটি কেবল একটি আইনি মামলা ছিল না।
এটি ছিল এক পরিবারের দীর্ঘ যন্ত্রণার গল্প, ভালোবাসার গল্প, এবং সেই কঠিন সিদ্ধান্তের গল্প যেখানে একজন মানুষকে ধরে রাখার চেয়ে তাকে মর্যাদার সঙ্গে বিদায় দেওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
Read More
বেতন আয় কি ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণ করবে? সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, রোহিত নাথনের আইনি লড়াই