Bengali to English Translation-page-9

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES 

সেই দিনই, শেষরাত্রে, তখন ভোরবেলা।

ঘুমের ঘোরের মধ্যে আর্তনাদ করে উঠল বনওয়ারী। তার স্ত্রী গোপালীবালা চমকে জেগে উঠে তাকে ঠেলা দিয়ে ডাকলে–ওগো, বলি–ওগো! ওগো!

ফাল্গুন মাসের শেষ, বিশ তারিখ পার হয়ে গিয়েছে। কঠিন মাটির দেশ। এরই মধ্যে এখানে বেশ গরম পড়েছে, সন্ধ্যাবেলা বেশ গরম ওঠে; কিন্তু শেষরাত্রে শীত শীত। বনওয়ারী বলে গাশিরশির করে। সমস্ত রাত্রি বনওয়ারীর ভাল ঘুম হয় নাই। শেষত্রে গায়ে কথাটা টেনে নিয়ে আরামে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ বু-বু করে চিৎকার করে উঠল। গোপালীবালা তাকে ঠেলে তুলে দিলে–ওগো! ওগো!

বনওয়ারী ঘুম ভেঙে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। তারপর উঠে বসল।

গোপালীবালা জিজ্ঞাসা করলে—কি হয়েছিল? স্বপন দেখছিলা নাকি গো? এমন করে চাঁচালা কেনে গো!

সেও কাঁপছিল ভয়ে।

–হুঁ। একবার তামুক সাজ দেখি।

—কি স্বপন দেখলা বল দি-নি? এমন করে তরাসে বুবিয়ে উঠলে কেনে গো?

-কত্তা আইছিলেন। হাত দুটো জোড় করে কপালে ঠেকালে বনওয়ারী।

–কত্তা! শিউরে উঠল গোপালী।

–হুঁ কত্তা। পিসির কথাই ঠিক গোপালী। একটু চুপ করে থেকে আবার বললে—লে, শিগগির তামুক সাজু। খেয়ে আটপৌরে-পাড়া হয়ে তবে যাব নদীর ধারে। লইলে হয়ত ওদের কারোর দেখা পাব না।-বাবার পুজো দিতে হবে। আটপৌরে-পাড়ার চাঁদা চাই।

পরম কাহার আটপৌরে-কাহারপাড়ার মাতব্বর। তার কাছে যাবে বনওয়ারী।

বাঁশবাঁদি পুরোপুরি কাহারদের গ্রাম গ্রাম ঠিক নয়, ওই জাঙল গ্রামেরই একটা পাড়া। তবে জমিদারি সেরেস্তায় মৌজা হিসেবে ভিন্ন বলে—ভিন্ন গ্রাম বলেই ধরা হয়। দুটি পুকুরের পাড়ে দুটি কাহারপাড়া। বেহারাকাহার এবং আটপৌরে-কাহার। বেহারাকাহারপাড়াতেই চিরকাল লোকজন বেশি, প্রায় পঁচিশ ঘর বসতি; পুব দিকে নীলের মাঠের বড় সেচের পুকুর, নীলের বাঁধের চার পাড় ঘিরে বেহারাদের বসবাস। কোশকেঁধে-বাড়ির বনওয়ারী বেহারাপাড়ার মুরব্বি। বেহারা-কাহারেরা পালকি বয়। বনওয়ারীর পূর্বপুরুষ এক কাঁধে পালকি নিয়ে এক ক্ৰোশ পথ চলে যেত, কাঁধ পর্যন্ত বদল করত না—তাই ওদের বাড়ির নামই কোশ-কেঁধেদের বাড়ি। ওদের বংশটাই খুব বলশালীর বংশ। লম্বা চওড়া দশাসই চেহারা, কিন্তু গড়ন-পিটনটা কেমন যেন মোটা হাতের; অথবা গড়নের সময় ওরা যেন অনবরত নড়েছে, পালিশ তো নাই-ই।

বেহারাপাড়া থেকে রশিখানেক পশ্চিমে আটপৌরে-কাহারদের বসতি। গোরার বাঁধ বলে মাঝারি একটা পুকুরের পাড়ের উপর ঘর কয়েক আটপৌরে-কাহার বাস করে। আটপৌরেরা পালকি কাঁধে করে না, ওরা বেহারাদের চেয়ে নিজেদের বড় বলে জাহির করে। খুব ভাল কথা ব্যবহার করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে। বলে-আটপৌরে হল অট্টপহরী।

অর্থাৎ অষ্টপ্রহরী।

আসল অর্থ পাওয়া যায় চৌধুরীদের বাড়ির পুরনো কাগজে। সেসব কাগজ এখন প্রায় উইয়ে খেয়ে শেষ করে এনেছে। উইয়ে-খাওয়া কাগজের স্তুপের মধ্যে কিছু কিছু এখনও পুরো আছে। তার মধ্যে ১২২৫-২৬ সালের থোকা জমাওয়াসিল বাকি থেকে পাওয়া যায়—গোটা বাঁশবাঁদি মৌজাটাই ছিল পতিত ভূমি। ওখানে কোনো পুকুরও ছিল না, বসতিও না। জাঙল গ্রামে মোটমাট দশ ঘর বাস্তুর উল্লেখ পাওয়া যায়, সবাই তারা ছিল চাষী সদ্‌গোপ। ১২৫০ সালের কাগজে দেখা যায়—এক নতুন জমাপত্তন-নীলকর শ্রীযুক্ত মেস্তর জেনকিন্‌স সাহেবের নামে। সেই জমার মধ্যে সেই জাঙলের যাবতীয় পতিত ভূমি, তার সঙ্গে গোটা বাঁশবাঁদি মৌজাটাই প্রায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। জাঙলের পশ্চিম দিকে উঁচু ডাঙার উপর এখনও কুঠিবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এবং হ্রদের পুকুর বলে একটা পুকুর দেখা যায়। ওই হ্রদের পুকুরের জল পাকা নালা বেয়ে এসে নীল। পচানোর পাকা চৌবাচ্চাগুলি ভর্তি করে দিত। সেখানটা এখন জঙ্গলে ভরে গিয়েছে এবং ওইখানেই বুনো শুয়োরের একটা উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। বাঁশবাঁদি মৌজা বন্দোবস্ত নিয়ে সায়েবরাই ওখানে পুকুর কাটায় এবং বাঁশবাঁদির সমস্ত পতিতকে নীলচাষের জন্য হাসিল করে তোলে। সেই হাসিল করবার জন্যই এই কাহারপাড়ার লোকেরা বাঁশবাঁদিতে আসে। এসেছিল। অনেক লোক। তার মধ্যে এই কাহার কয়েক ঘরই এখানে বসবাস করে। কয়েকজন পেয়েছিল। কুঠিবাড়িতে চাকরি, লাঠি নিয়ে ঘুরত ফিরত, আবার দরকারমত সাহেব মহাশয়দের ঘরদোরে। কাজ করত; এজন্য তাদের জমি দেওয়া হয়েছিল, এবং এখানকার প্রচলিত রীতি অনুযায়ী চব্বিশ ঘণ্টার কাজের জন্য চাকরানভোগী হিসেবে খেতাব পেয়েছিল—অষ্টপ্রহরী বা আটপৌরে। বেহারা-কাহারেরা নীলের জমি চাষ করত এবং প্রয়োজনমত সাহেব-মেমদের পালকি বইত। নীলের জমি সেচ করবার জন্য পুকুরটা কাটানো হয়েছিল বলে ওটার নাম নীলের বাঁধ, আর গোরার বাঁধ নামটা হয়েছে গোরা অর্থাৎ সাহেবদের বাঁধ বলে। পুকুরটার জল ভাল—ওই পুকুরে সেকালে কারও নামবার হুকুম ছিল না, ওখান থেকেই যেত সাহেবের ব্যবহারের জল, মধ্যে মধ্যে কুঠিয়াল সাহেবের কাছে সমাগত বন্ধুবান্ধব গোরা সাহেবেরা এসে স্নান করতে নামত। স্নান করত নাকি উলঙ্গ হয়ে। সেই আমল থেকে কাহারদের কয়েকটা ঘরে রূপ এসে বাসা বেঁধেছে। পরম কাহারদের গুষ্টিটার রঙই সেই আমল থেকে ধবধবে ফরসা। সুচাঁদপিসির কর্তাবাবা অর্থাৎ বাবার বাবার রঙ একেবারে সাহেবের মত ছিল। সুচাঁদপিসির রঙও ফরসা। মেয়ে বসন্ত খুব ফরসা নয়। কিন্তু ওর মেয়ে পাখী তো একেবারে হলুদমণি পাখি; চৌধুরী বাড়ির কর্তার ছেলে অকালে মরে গেল মদ খেয়ে, নইলে যুবতী পাখীর এখনকার মুখের সঙ্গে তার মুখের আশ্চর্য মিল দেখা যেত। তেমনিই বড় বড় চোখ, তেমনিই সুডৌল নাক, চুলের সামনেটা পর্যন্ত তেমনিই ঢেউখেলানো। চৌধুরীকর্তা আজ নিঃস্বও বটে, তার উপর হাড়কৃপণও বটে, তবু তিনি বসন্তের মেয়ে পাখীকে মায়ামমতা করেন। বসন্তের ও-বাড়ির সঙ্গে সম্বন্ধ। আজও ঘোচে নাই, সে আজও ও-বাড়ি যায়, যোজখবর করে, দুধের রোজ দেয়, কিন্তু টাকার তাগাদা করে না।

এই চৌধুরীকর্তার বাবার বাবা ছিলেন সাহেবদের নায়েব। তিনি নাকি ছিলেন লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ, আর তেমনিই নাকি ছিলেন জবরদস্ত জাহাবাজ বেটাছেলে; তার দাপে নাকি বাঘে-বলদে এক ঘাটে জল খেত। তাঁকেই দয়া করেছিলেন এই বেলবনের মহারাজ যিনি নাকি এখানে কর্তা বলে পরিচিত—গেরুয়া কাপড় পরে, খড়ম পায়ে, দণ্ড হাতে, গলায় রুদ্ৰাক্ষ আর ধবধবে পৈতের শোভায় বুক ঝলমলিয়ে, ন্যাড়া মাথায় যিনি রাত্রে চারদিকে ঘুরে বেড়ান। চন্দনপুরের ভদ্রলোকেরা বলেও কথাটা নেহাতই কাহারদের রচনা করা উপকথা। আসল কথা নীলকুঠি সব জায়গায় যেমনভাবে উঠেছে এখানেও তেমনভাবেই উঠেছে, তবে কোপাইয়ের বান আর। কুঠি-ওঠা ঘটেছে একসঙ্গে। সে সময় কুঠিয়াল সাহেবদের খারাপ সময় চলছিল, কারবার। উঠিয়ে দেবার কথা হচ্ছিল, সেই সময় হঠাৎ একদিন রাত্রে কোপাই ভাসল। তেমন ভাসা কোপাই নাকি কখনও ভাসে নাই। সে বান কুঠিবাড়ি পর্যন্ত ড়ুবিয়ে দিয়েছিল। লোকে বলে, সাহেব-মেম সেই বানে ভেসে গিয়েছিল। কিন্তু সুচাঁদপিসি যে-কথা বললে, সেইটাই হল আসল কথা। সেই কথাটাই বিশ্বাস করে বনওয়ারী। ওই কর্তার কথা অমান্য করতে গিয়েই সাহেব মহাশয় মেমকে নিয়ে তলিয়ে গেল ঘুরনচাকির মধ্যে পড়ে। নইলে সাহেব-মেম—যারা সাত সমুদ্দর পার হয়ে ভাসতে ভাসতে আসে, তারা কোপাইয়ের বানে মরে যাবে? কর্তার লীলা, কর্তার ছলনা সব। চৌধুরীকর্তা দেবতার দয়ায় শুধু যথের ধনই পেলেন না, সাহেব কোম্পানির তামাম সম্পত্তিও পেয়ে গেলেন জলের দামে। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।

চৌধুরীকর্তাদের আমলেও কাহাররা বেহারার কাজ করেছে। চৌধুরীদের পালকি ছিল দুখানা। ড়ুলি ছিল খানচারেক। আটপৌরেরা তাদের বাড়িতেও আটপৌরের কাজ করেছে। [WORDS:-953]