Tag Archives: translation Bengali to english

Bengali to English Translation-Page-21

PAGE :- 1 – 2 – – 4 – 5 – – 7 – – – 10 – 11 – 12 13 –14 – 15-16 – 17 – 18 – 19 – 20

Legal discourse

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES 

নাপিত চুল ছাঁটা বা কাটার কাজে নিয়োজিত বিশেষ পেশার লোক। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে নাপিত ছিল একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্বরূপ। আগেকার দিনে হিন্দু সস্প্রদায়ের বিয়ে ও জন্ম উৎসবে নাপিতরা কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করত। মুসলিম পরিবারবর্গও নবাগত শিশুর মাথা ন্যাড়া করার জন্যে নরসুন্দরের দ্বারস্থ হতো। হিন্দু পরিবারে কারও মা অথবা বাবা মারা গেলেও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর নাপিত তার ছেলেদের মাথা ন্যাড়া করে দেয়। গ্রামের বাজারে নাপিতদের নির্দিষ্ট দোকান আছে।

সেখানে গ্রামের লোকেরা তাদের চুল কাটা, ছাঁটা, নখ কাটা এবং ছোটখাট কাটাছেঁড়ার কাজ করায়। এসব সেবা প্রদানের মাধ্যমে নাপিত উপার্জন করে। এই উপার্জন অর্থ হতে পারে, আবার কোন দ্রব্যসামগ্রীও হতে পারে। আগেকার দিনে নাপিতদেরকে কাজের বিনিময়ে সাধারণত দ্রব্যসামগ্রী দেওয়া হতো। এই বিনিময় প্রথার নাম ছিল যজমানি ব্যবস্থা। গ্রামের লোকজন সারা বৎসরের সেবার বিনিময়ে নাপিতদের ফসলের মৌসুমে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্য দিত। চালাকিপনা, রসিকতা, আড্ডাবাজি ও গল্প বলায় নাপিতদের বিশেষ দক্ষতা ছিল। এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে এবং এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে তথ্য আদানপ্রদান হতো নাপিতদের মাধ্যমে।

এছাড়া শিশুর জন্ম-সংবাদের বাহক হিসেবে তারা কাজ করত। আর নবজাতক ছেলে শিশু হলে সে খবর সরবরাহ করে উভয় পক্ষ থেকে তারা উপহার পেত।

কেউ কেউ মনে করেন, নাপিত এসেছে  ক্ষত্রিয় পিতা এবং  শূদ্র মাতার পরিবার থেকে। অনেকের ধারণা নাপিতের উৎপত্তি দেবতা  শিব থেকে, যিনি তাঁর স্ত্রীর নখ কেটেছিলেন। নাপিতরা কতিপয় অনুসস্প্রদায়ে বিভক্ত, যথা আনারপুরিয়া, বামানবেন, বরেন্দ্র, রাঢ়ী, মাহমুদাবাজ, সপ্তগ্রাম, সাতঘরিয়া, খোট্টা ইত্যাদি। নাপিত নিম্ন সস্প্রদায়ের হলেও অস্পৃশ্য নয়। এমনকি ব্রাহ্মণরাও নাপিতের হাতে পানি পান করে। অধিকাংশ নাপিতই বৈষ্ণব। ধর্মীয় কাজে তারা ব্রাহ্মণদের ও পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত করে থাকে। তাদের মৃতদেহ আগুনে পোড়ানো হয়। মৃত্যুর একত্রিশ দিন পর শাস্ত্রমতে তাদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। খাবারদাবার পরিবেশনে তারা হিন্দুশাস্ত্র মেনে চলে। বৈষ্ণব নাপিত মাংস খায় না, কিন্তু মাছ খায়।

শহুরে নাপিতদের অবস্থান ও চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এখানে নারীপুরুষ বা ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য সেলুন আছে। সবধর্মের লোকই নাপিত হিসেবে কাজ করে। তারা চুল কাটার আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দক্ষতার সাথে সেলুনে কাজ করে। গ্রামের নাপিতদের চেয়ে তাদের উপার্জন অনেক বেশি। শহুরে নাপিত চুলকাটা ও কেশসজ্জা এবং কখনও বা মাথা মালিশ করা ছাড়া অন্য কিছু করে না। গ্রামের নাপিতরা কেশবিন্যাস বা মালিশের কাজ  প্রায় করে না বললেই চলে।

Barbers[Napits] are known as paramaniks, is an occupational Hindu caste traditionally engaged in hair cutting. In olden times, the napit was a social institution. On the occasions of births and marriages of Hindu families, a napit used to perform some rituals.

Muslim families also engaged napits for the ceremonial shaving of the heads of the new-born babies. Napits shave the heads of Hindu males after obsequies. Traditionally, in rural markets, a napit has a fixed shop where people visit to have haircuts, to cut their nails and to have small surgeries done. He was paid for these services either in cash or in kind. In the long past, payment was generally made in kind. The system of exchange between service and kind was called Jajmani. The village people paid him in crops at harvest time in exchange of the services that they received from the napit throughout the year.

The napits were well known for their cleverness, sense of humour, and penchant for gossiping and story telling. Inter-family and inter-village information was normally obtained through the napits. The village people invariably engaged napits to carry the news of births of male children. And, for the good news that they served, they received gifts.

Many hold the opinion that the first napit of Bengal was the son of a ksatriya father and a shudra mother. Many others say that it was a person engaged by shiva for cutting his wife’s nails. Napits are divided into several sub-castes, such as Anarpuria, Bamanbane, Barendra, Radhi, Mahmudabaz, Saptagram, Satgharia, and Khotta. Unlike many other lower castes, napits are not considered as untouchables. Even a brahman can take water from the hand of a napit. Most napits are Vaishnavas. They employ Brahmans as priests. Napits burn their dead bodies and perform shraddha in the orthodox fashion on the thirty-first day of death. Their rules regarding diet are the same as those followed by most respectable Hindus. Vaishnava napits do not eat meat, but as a rule, they eat fish.

Barbers belong to different categories in cities. In urban areas there are saloons for men and women and the workers in these saloons are skilled hands, use modern equipment for hair cutting, and come from all religions. They have higher incomes than their rural counterparts. The urban barbers play no other role than hair cutting and hair dressing and sometimes, messaging the head, neck and hands of customers. Hair dressing and messaging are not in vogue in the rural areas. The institution of napit is now almost extinct. Now any one can take to the profession as a business and leave it any time for other jobs. In older times, massaging was also a job of the napit. Massaging is also there in the saloon, a hair dressing place. But it is more a specialization than a caste job as of the past.

_____________________________________

TRANSLATE WITHIN 30 MINUTES 

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খলজী বঙ্গ জয় করার পর জমির খাজনা উৎপাদিত ফসলের ছয় ভাগের এক ভাগ থেকে পাঁচ ভাগের একভাগে বা চার ভাগের একভাগে পরিবর্তিত হয়। এই রাজস্ব নগদ অর্থ অথবা দ্রব্যের আকারে প্রদান করতে হতো। যে সকল প্রজা জমির খাজনা নগদ প্রদান করত তাদের ইচ্ছানুযায়ী জমি হস্তান্তরে বাধা ছিল না। তবে যারা খাজনা হিসেবে ফসলের হিস্যার বিনিময়ে জমি চাষ করত তাদের এ ধরনের জমি হস্তান্তরের কোন অধিকার ছিল না। এই জমি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রজাদের সন্তানরা পেত এবং তারা তাদের পূর্বপুরুষের মতো শর্তাধীনে এসব জমি চাষ করতে পারত। যারা জমির খাজনা নগদে পরিশোধ করত তাদেরকে নিজ দায়িত্বেই তা করতে হতো। পাওনা আদায়ের জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যেত এবং অনাদায়ি খাজনার জন্য জমি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করা যেত। রাজকীয় কর্মকর্তাদের বেতন হিসেবে এবং ধর্মীয় ও পন্ডিত ব্যক্তিদের জীবনযাপনের জন্য কেবল পতিত জমি জায়গির বা আয়েমা হিসেবে দান করা হতো। কোন পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এনে নির্ধারিত খাজনা প্রদানের বিনিময়ে ঐ জমির মালিক হওয়া যেত। পতিত জমি ছিল সরকারের খাস জমি এবং বাদবাকি চাষকৃত জমিতে সরকারি কর পরিশোধের মাধ্যমে মালিকানা লাভ করা যেত। কালক্রমে, গ্রামপ্রধানদের ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করা হলে অনেকেই স্থানীয় তালুকদার হিসেবে রূপান্তরিত হয়। তারা চাষিদের কাছ থেকে সরকার কর্তৃক ধার্যকৃত রাজস্ব আদায় করে উপরস্থ ভূস্বামী জমিদারকে প্রদান করত। বিনিময়ে তারা সম্মানী হিসেবে আদায়কৃত অর্থের একটা অংশ পেত। নির্ধারিত রাজস্বের বিনিময়ে সরকার খাসজমি অন্যকে ইজারা দিতে পারত এবং ইজারাদাররা এ ধরনের জমি নিজে অথবা বর্গাদারের মাধ্যমে চাষ করত। বর্গাদারদের ফসলের অর্ধেকের হিস্যা ছাড়া জমির ওপর কোন অধিকার ছিল না। সরকারি ইজারাদার যেমন জায়গিরদার এবং আয়েমাদারগণ তাদের জমি অন্যের নিকট খাজনার বিনিময়ে ইজারা দিতে পারত।

মুগল শাসনামলে গোটা দেশের জমির খাজনা ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ ধার্যের মাধ্যমে ভূমি কর ব্যবস্থা আরও অধিকতর নিয়মবদ্ধ ও সুসঙ্গত করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা আমিন কর নির্ধারণ করত এবং তারা জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদও মীমাংসা করত। কানুনগো, কারকুন, চৌধুরী, মুকাদ্দাম বা গ্রামপ্রধান পাটোয়ারি এবং অন্যান্য জরিপ কর্মকর্তাদের সহায়তায় আমিন প্রতিটি প্লটের বিগত ১০ বছরের গড় উৎপাদন ও উৎপাদিত পণ্যের বাজার মূল্য যাচাই-পূর্বক রাজস্ব নির্ধারণ করত। কানুনগোরা জমি সম্পর্কিত প্রথা ও আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিল, চৌধুরীরা প্রতিনিধিত্ব করত পরগনা বা মহালবাসীর, মুকাদ্দাম বা গ্রামপ্রধান প্রতিনিধিত্ব করত গ্রামবাসীদের আর পাটোয়ারিরা ছিল গ্রামের হিসাবরক্ষক। চাষিদের বলা হতো রায়ত। তারা নগদ অথবা দ্রব্যের আকারে কর পরিশোধ করত, তবে নগদ পরিশোধ অগ্রাধিকার পেত। জমিদার, জায়গিরদার বা সরকারি খাজনা আদায়কারী যেমন আমিন, শিকদার, আমলগুজার অথবা ক্রোড়ি রায়তদের নিকট থেকে আবওয়াব বা নির্ধারিত করের অতিরিক্ত আদায় নিষিদ্ধ ছিল। এসব ব্যক্তি এবং জায়গিরদার ও আয়েমাদারগণ যেমন রায়তদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারত না তেমনি তাদের জমি খাসজমি হিসেবে দখলেও নিতে পারত না। যখন কোন রায়ত নিজ জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেত অথবা জমি চাষ করার মতো পরিবারে কোন পুরুষ সদস্য থাকত না, কেবল সেক্ষেত্রে অন্যের কাছে তার জমি বন্দোবস্ত দেওয়া যেত। জমিদার, জায়গিরদার বা আয়েমাদাররা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন জমির মালিক ছিল না। তারা শুধু সরকার নির্ধারিত রাজস্ব রায়তদের নিকট থেকে আদায় করতে পারত। যদি জমিদারির অধিকার বংশানুক্রমিক হতো তাহলেই কেবল তা হস্তান্তরযোগ্য ছিল। কিন্তু ইজারাদারি, জায়গিরদারি বা আয়েমাদারি বংশানুক্রমিক বা হস্তান্তরযোগ্য ছিল না। পরবর্তীকালে আয়েমাদারি হস্তান্তরযোগ্য করা হয়। জমিদার বা ইজারাদারগণ আদায় খরচ ও আদায় সম্মানী হিসেবে ভূমিকরের একটা অংশ পেত।

গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা, যারা নিজেরাই বা অন্যের মাধ্যমে, নিজ গ্রামে জমি চাষ করত তাদেরকে বলা হতো খুদকাশ্ত রায়ত। তাদেরকে পরগনা বা নিরিখের জন্য প্রথানুযায়ী অথবা তাদের অনুকূলে সম্পাদিত ইজারা দলিলে বা পাট্টাতে উল্লিখিত হারে রাজস্ব প্রদান করতে হতো। যদি তারা নিয়মিত কর পরিশোধ করত তাহলে তাদেরকে জমি থেকে উচেছদ করা যেত না এবং তারা বংশপরম্পরায় এই জমির মালিকানা ভোগ করত। তাদের খুশিমতো তারা জমি পরিত্যাগও করতে পারত না। ভিন্ন গ্রামের মানুষ যারা জমি চাষ করত তাদের বলা হতো পাইকাশ্ত রায়ত। তারা চুক্তিভিত্তিতে খাজনা পরিশোধ করতে পারত। কিন্তু জমি দখলে রাখার কোন অধিকার তাদের ছিল না। তারা আসলে ছিল উচ্ছেদযোগ্য চাষি এবং ফসল কাটার পর যে কোন সময় তাদেরকে বিতাড়ন করা যেত। তারাও ইচ্ছেমতো এ ধরনের জমি পরিত্যাগ করতে পারত। জমিদার জায়গিরদার, চৌধুরী, তালুকদাররা তাদের দখলীকৃত খাসজমি বর্গাদারদের দ্বারা অথবা কৃষিশ্রমিকের সাহায্যে চাষাবাদ করতে পারত। এক্ষেত্রে বর্গাদার বা শ্রমিকদের ফসলের হিস্যা বা মজুরি পাওনা ছাড়া জমির ওপর তাদের কোন অধিকার ছিল না।

When Bengal was conquered by Bakhtiar Khalji at the beginning of the 13th century, the rulers merely changed the rate of land revenue from one-sixth to one-fifth or one fourth of the produce, payable either in cash or in kind. Customary rights of landowners to transfer the land in any manner they liked, were not interfered with in case of those tenants who used to pay rent. But those who paid a share of the produce of the land cultivated by them as rent or revenue, had no such right to transfer the land. However, such land was heritable by the heirs of such tenants and could be cultivated by such heirs on the same terms and conditions as their predecessors enjoyed. Those who paid rent or revenue in cash were personally liable for the same, and could be sued for the recovery of arrears of dues, but could not be evicted from their land for non-payment of revenue. Only wastelands were given as jagir or ayma to royal officers in lieu of their salary, and to religious and learned persons for their maintenance. Whoever brought under cultivation any wasteland became owner of the same, subject to payment of rent or revenue assessed.

In course of time, when the power of the grampradhanas (village heads) was substantially curtailed, many of them were turned into local talukdars. These talukdars used to collect revenue from the cultivators at the rate assessed by the government and paid the same to superior landlords also known as zamindars, although they got a share of the collection as their remuneration. The government could lease out the khas lands on fixed revenue to others. The lessees of such lands could themselves cultivate the same or get the same cultivated through bargadars (sharecroppers) who had no rights to the land beyond getting half of the produce. Government grantees such as jagirdars and aymadars could, in their turn, also lease out their land to others on a rental basis, but they could not disturb possession of the cultivators whose land was included in their respective grant except realizing rent from them.

During Mughal rule, the land revenue system was systematised and consolidated by assessing the land revenue of the entire country at the rate of one-third of the produce. Revenue was then assessed by government officers known as amins, who also settled land disputes. Such officers used to assess revenue with the help of the kanungo, who knew the customs and regulations regarding land. Karkuns preserved records regarding land surveys and land revenue assessment and chowdhuris represented the inhabitants of the pargana, also called mahal or mukaddam. Patwaris or village accountants and other survey officers surveyed each and every plot of land on the basis of average production and market price of the produce for the previous ten years. Cultivators known as raiyats could pay revenue either in cash or kind, but cash payment was preferred. Zamindars, jagirdars or government rent collectors such as amils, sikdars, amalguzars or croris were prohibited from realising any additional amount known as abwab other than the assessed revenue from the raiyats. Those persons, as well as jagirdars and aymadars, could neither evict the raiyats from their land nor bring the land to their khas possession or let it out to others. Only when raiyats went elsewhere leaving their land, or when there was no male person in the family to cultivate the land, could the land be settled with others. Zamindars, jagirdars or aymadars were not proprietors of the land under their control. They could only collect revenue from the cultivating raiyats at government assessed rates. Zamindari right was hereditary but ijaradari, jagirdari or aymadari rights were neither hereditary nor transferable. Later, aymadari was made heritable. Zamindars or ijaradars got a share of their collection of land revenue as their remuneration and collection cost.

Permanent settlers of villages who themselves cultivated lands of their own village or through others were known as khudkast raiyats. They had to pay revenue at the customary rate of their pargana called nirikh, or at the rate mentioned in the patta or lease deed executed in their favour. If they paid the revenue fixed for their land, they could not be evicted, and could possess their lands from generation to generation. They also could not abandon their land at their sweet will. Those who cultivated the land of the village where they did not live, were known as paikast raiyats and could pay rent on a contract basis. But they had no right to continue in possession and were merely tenants-at-will, and could be denied the right to cultivate the land any time after harvesting was over. Such raiyats could also abandon such land at their sweet will. Zamindars, jagirdars, chowdhuries and talukdars could get land in their khas possession cultivated through bargadars or agricultural labourers who had no rights on such land except to get a half share of the produce or wages for their labour.

 

Bengali to English Translation-Page-20

PAGE :- 12 – 3 456 78 9 10 – 1112 131415 -16 – 17 – 18 – 19 – 20 – 21 

Legal discourse

TRANSLATE WITHIN 60 MINUTES

1

বিদ্যাসাগরের অনেক গুণ। প্রথম — বিদ্যানুরাগ। একদিন মাস্টারের কাছে এই বলতে বলতে সত্য সত্য কেঁদেছিলেন, “আমার তো খুব ইচ্ছা ছিল যে, পড়াশুনা করি, কিন্তু কই তা হল! সংসারে পড়ে কিছুই সময় পেলাম না।” দ্বিতীয় — দয়া সর্বজীবে, বিদ্যাসাগর দয়ার সাগর। বাছুরেরা মায়ের দুধ পায় না দেখিয়া নিজে কয়েক বৎসর ধরিয়া দুধ খাওয়া বন্ধ করিয়াছিলেন, শেষে শরীর অতিশয় অসুস্থ হওয়াতে অনেকদিন পরে আবার ধরিয়াছিলেন। গাড়িতে চড়িতেন না — ঘোড়া নিজের কষ্ট বলিতে পারে না। একদিন দেখলেন, একটি মুটে কলেরা রোগে আক্রান্ত হইয়া রাস্তায় পড়িয়া আছে, কাছে ঝাঁকাটা পড়িয়া অছে। দেখিয়া নিজে কোলে করিয়া তাহাকে বাড়িতে আনিলেন ও সেবা করিতে লাগিলেন। তৃতীয় — স্বাধীনতাপ্রিয়তা। কর্তৃপক্ষদের সঙ্গে একমত না হওয়াতে, সংস্কৃত কলেজের প্রধান অধ্যক্ষের (প্রিন্সিপালের) কাজ ছাড়িয়া দিলেন। চতুর্থ — লোকাপেক্ষা করিতেন না। একটি শিক্ষককে ভালবাসিতেন; তাঁহার কন্যার বিবাহের সময়ে নিজে আইবুড়ো ভাতের কাপড় বগলে করে এসে উপস্থিত। পঞ্চম — মাতৃভক্তি ও মনের বল। মা বলিয়াছেন, ঈশ্বর তুমি যদি এই বিবাহে (ভ্রাতার বিবাহে) না আস তাহলে আমার ভারী মন খারাপ হবে, তাই কলিকাতা হইতে হাঁটিয়া গেলেন। পথে দামোদর নদী, নৌকা নাই, সাঁতার দিয়া পার হইয়া গেলেন। সেই ভিজা কাপড়ে বিবাহ রাত্রেই বীরসিংহায় মার কাছে গিয়া উপস্থিত! বলিলেন, মা, এসেছি!

Vidyasagar is a man of many facets. One of his great loves is of learning. One day he actually began to weep when he said to M, “How much I wanted to continue my studies! But it was not to be. I was so entangled in worldly affairs, I didn’t have time.’

A second love is for all beings. Vidyasagar is an ocean of compassion. Seeing a calf deprived of its mother’s milk, he could not drink milk for many years – not until his health declined considerably. He does not travel in a carriage, because the horse pulling it cannot speak of its burden. One day he saw a workman lying on the road struck by cholera, his basket lying near. He picked the man up, brought him home, and nursed him.

A third love is independence. Because of a disagreement with his proprietors, Vidyasagar resigned from the post of Principal of the Sanskrit College.

His fourth characteristic is that he does not care for social decorum. He loved a teacher. At the time of his daughter’s marriage, Vidyasagar went to the feast with a gift of cloth under his arm.

A fifth love is devotion to his mother. She had said to him, “Iswar, if you don’t come to the marriage of your brother, I will feel very bad.”  On strength of will, Vidyasagar walked on foot all the way from Calcutta to his village of Beersingh. On the way he had to cross the Damodar river and there was no boat available, so he swam across. He presented himself before his mother, dripping wet, the very night of the marriage.  He said, “Mother, here I am!”


2

চৈতন্য চরিতামৃত  কৃষ্ণদাস কবিরাজ কর্তৃক প্রণীত। এটি কৃষ্ণ চৈতন্যের (১৪৭৮-১৫৩৩) প্রতি নিবেদিত চরিত সাহিত্য ধারার চূড়ান্ত প্রামাণ্য রচনা হিসেবে মর্যাদাময় আসনে অধিষ্ঠিত। গ্রন্থটিকে বৈষ্ণব মতবাদের সংক্ষিপ্ত সার বলা হয় যার মধ্যে আছে চৈতন্য জীবনের অনুপুঙ্খ বর্ণনা, বিশেষ করে তাঁর সন্ন্যাস জীবনের বছরগুলি এবং কিভাবে সে জীবন ভক্তির আদর্শ হিসেবে উদাহরণে পরিণত হলো সে বৃত্তান্ত। গ্রন্থটির মূল পাঠ ষড় গোস্বামীদের দ্বারা বিকশিত অধিবিদ্যা, তত্ত্ববিদ্যা ও নন্দনতত্ত্বের মৌলিক তত্ত্বীয় অবস্থানের রূপরেখা দান করে এবং ভক্তজনোচিত ধর্মীয় কৃত্যের সারবস্ত্ত ব্যক্ত করে। এটি যেহেতু বিশ্বকোষের মতো, সে কারণে এটি ঐতিহ্যের ধারায় সবচেয়ে পুনর্গঠিত পাঠ এবং অন্যসব রচনার মাপকাঠিতে বলা যায় যে, এটি ধর্মতাত্ত্বিক রচনার যথার্থ মান সৃষ্টি করেছে। এটিই সে গ্রন্থ যার মধ্যে চৈতন্য ভক্তরা সুসঙ্গত ও সুশৃঙ্খল রচনা হিসেবে গোম্বামীদের শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি ও চৈতন্য জীবনীর সম্পর্ক প্রথম অনুধাবন করতে পারল। এটিও তারা বুঝল, কৃষ্ণদাস ছিলেন মুষ্টিমেয় ভক্তদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ যিনি এগুলি ভালোভাবে অধ্যয়ন করেছেন।

বৃন্দাবনে লেখা শুরু করে কৃষ্ণদাস তাঁর জীবনের উপান্তে এ সুবৃহৎ গ্রন্থ সমাপ্ত করেন, যদিও সম্যকভাবে তখনও যেমন এখনও তেমনি এটি বিদ্বুৎ সমাজে বরাবর আলোচিত। গ্রন্থোদ্ধৃতিগুলি জানিয়ে দেয় যে, বইটির রচনাকাল ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দের পরে। কিন্তু প্রচিলত মত অনুযায়ী এর রচনাকাল আরও পরে ১৬০৯ থেকে ১৬১৫-খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এ তারিখগুলির যে-কোন একটি গ্রন্থটির রচনাকাল মুরারি গুপ্তের সংস্কৃত রচনা কৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃত অর্থাৎ মুরারি গুপ্তের কড়চা (আনুমানিক ১৫৩৩) এবং বৃন্দাবন দাসের বাংলা রচনা চৈতন্য ভাগবত (আনুমানিক ১৫৪০-এর মাঝামাঝি) দিয়ে সূচিত চৈতন্য চরিতাখ্যানগুলির সৃষ্টিশীল রচনা পর্বের অন্তিম পর্যায়ে স্থাপন করে। যদিও আকৃতিতে বিশাল, গ্রন্থটি তখনও জীবিত গোস্বামীদের ও কৃষ্ণদাসের তিনজন প্রশিক্ষিত শিষ্য শ্রীনিবাস, নরোত্তম দাস ও শ্যামানন্দ দ্বারা সতেরো শতকের প্রথম দিকে বাংলা ও উড়িষ্যায় বারবার অনুলিপিকৃত ও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।

শুধু বইটির আয়তনই নিঃসন্দেহে এর প্রভাব সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে, কারণ এর সাম্প্রতিক সম্পূর্ণ সংস্করণে রয়েছে অসংখ্য ত্রিপদী চরণসহ প্রধানত দ্বিপদী পয়ার মিল বিশিষ্ট আনুমানিক ২৪,০০০ (চবিবশ হাজার) বাংলা চরণ। অধিকন্তু, গ্রন্থটিতে রয়েছে ইতিহাস ও পুরাণ, বিশেষত ভাগবত ও গীতা ইত্যাদি পঁচাত্তরটি সংস্কৃত উৎস থেকে গৃহীত এক হাজারেরও অধিক সংস্কৃত দ্বিপদী শ্লোক এবং ধর্মীয় কৃত্যের বহুসংখ্যক নির্দেশনামা (তন্ত্র), কাব্য, নন্দনতত্ত্ব (রসশাস্ত্র ও নাটক) এবং বেশ কিছু অধিবিদ্যক, ভাষ্যমূলক ও স্তুতিমূলক রচনা (তত্ত্ব, ভাষ্য, স্তোস্ত্র) ইত্যাদি। আকৃতিক দিক থেকে কিঞ্চিদধিক বড় চৈতন্য ভাগবতের তুলনায় এটি দ্বিতীয় বৃহৎ রচনা এবং এর গঠনরীতি চৈতন্য ভাগবতের অনুরূপ।

চৈতন্য ভাগবত-এর মতো চৈতন্য চরিতামৃতও তিনটি খন্ডে বিভক্ত আদি, মধ্য ও অন্ত্য; এবং এগুলির সর্গসংখ্যা যথাক্রমে ১৭, ২৫ ও ২০। কৃষ্ণদাস সুস্পষ্টভাবে চৈতন্য ভাগবত ও তাঁর নিজের রচনার মধ্যে অসংখ্যবার তুলনা করেছেন যাতে মনে হয় যে, অবিকল গঠন রূপ একান্তই ইচ্ছাকৃত। রচনারীতির এ কৌশল পরিশেষে পাঠকদের মনে এ ধারণা দেয় যে, প্রায় সাত অথবা আট দশক আগে চৈতন্য ভাগবত যে কাহিনী শুরু করেছিল চৈতন্য চরিতামৃত কেবল তারই ধারাবাহিকতা। চৈতন্য ভাগবতের কাহিনী যেখানে নবদ্বীপে গৃহী চৈতন্যের জীবনকাহিনী নিয়ে কেন্দ্রীভূত থেকেছে, সেখানে চৈতন্য চরিতামৃত পুরীতে সন্ন্যাস গ্রহণের পরে চৈতন্যের জীবন ও তাঁর তীর্থ ভ্রমণের উপর আলোক সম্পাত করেছে। এসব তুলনাবাচক বিবরণের ফল চৈতন্য চরিতামৃতকে চৈতন্য জীবনী রচনার পরিসমাপ্তি রূপে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেয়।

অ-বিরোধ ও সৌহার্দ্যের কৌশল অনুসরণ করে কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রত্যেকটি চলমান আধ্যত্মিক তত্ত্বকে শ্রেয়োতর রূপের অগ্রগতিশীল ও ব্যাপক ক্রমাধিকারে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন (১.১-৪, ২.২০-২১)। যেমন, অংশ বা আংশিক অবতার, কলিযুগের যুগাবতার এবং অন্যসব দৈবী রূপ যথা মন্বন্তর, দশাবতার, ব্যূহ এবং এ রকম আরও। এরূপ নির্বিশেষত্ব সম্ভব ছিল, কারণ চৈতন্য ভাগবতের অনুসরণে কৃষ্ণদাস চৈতন্যকে কেবল ঈশ্বরের সাধারণ এক অবতার হিসেবে নয়, বরং স্বয়ং ভগবান অর্থাৎ পূর্ণ ঈশ্বর রূপে ঘোষণা করেছিলেন। এর অর্থ হলো, চৈতন্য হলেন সে অবতর যা পূর্ববর্তী সব অবতারকে যোগ রূঢ় করে। ভক্তির এ বিস্তৃত রূপ ব্যাখ্যাকে ফলপ্রসূ করতে যে কলাকৌশল ছিল তা হলো চৈতন্যকে পরিবৃত বৈষ্ণব সম্প্রদায় কর্তৃক চৈতন্যকে ভক্তদের প্রতিনিধিত্বকারী চৈতন্য, অদ্বৈত আচার্য, নিত্যানন্দ, গদাধর ও শ্রীবাসকে পক্ষতত্ত্ব রূপে জ্ঞান করা। কিন্তু এ ধর্মতত্ত্বের মহত্তম দিক হলো এ রকম ধারণা যে, স্বয়ং কৃষ্ণই চৈতন্যরূপ নিয়েছেন নিজের মধ্যে রাধাপ্রেম অনুভব করার জন্য, যাকে বলা যেতে পারে, তথাকথিত দ্বৈতাদ্বৈত বা যুগলাবতার। রাধা ও কৃষ্ণ অভিন্ন সত্তায় বিলীন; চিরদিন বিচ্ছিন্ন ও চিরদিন মিলিত। এ দৃষ্টিভঙ্গি ভক্তির স্বরূপ ব্যাখ্যায় রামানন্দ রায়ের বিখ্যাত প্রশ্নোত্তরমূলক আলেখ্যে উন্মোচিত হয়েছে (২.৮), কিন্তু এ তত্ত্ব চৈতন্যের জীবনের শেষাংশে পুরীতে চৈতন্যের অনুলেখক স্বরূপ দামোদরের উপর আরোপিত। এ মহান ধর্মতত্ত্ব চৈতন্যের অবতারত্ব সম্পর্কে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের পরবর্তী সকল ব্যাখ্যায় যথোপযুক্ত মান তৈরি করেছে।

ভক্তি কল্পতরুর রূপকসংগঠনের সাহয্যে আদি লীলার সর্গগুলি চৈতন্যের পরিচয় ও বংশধারা (১. ১-৪, ১-১০), তাঁর ঘনিষ্ঠতম পরিকরেরা এবং তাদের পরম্পরা যেমন নিত্যানন্দ (১.৫ ; ১.১১), অদ্বৈত আচার্য (১.৬ ; ১.১২), গদাধর (১.৭ ; ১.১২) এবং অন্যান্য ভক্তের (১.৮-৯) প্রতি নিবেদিত। এ খন্ডে গৃহত্যাগ করে চৈতন্যের সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ পর্যন্ত কাহিনী সংক্ষিপ্ত বর্ণনার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে (১. ১৩-১৭)। এটি চৈতন্যভাগবতের বিষয়বস্ত্তর কার্যকর রোমন্থন।

মধ্য লীলায় রয়েছে চৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণের বিশদ বিবরণ (২. ১-৩), মাধবেন্দ্র পুরীর আখ্যান (২. ৪-৫), চৈতন্য কর্তৃক পন্ডিত সার্বভৌম-এর ধর্মান্তরণ (২.৬), দক্ষিণে চৈতন্যের তীর্থভ্রমণ (২. ৭-১০)। মধ্য লীলার মধ্য-অংশে পাওয়া যায় জগন্নাথের রথযাত্রা ও অন্যান্য উৎসবের কালে চৈতন্য ও তাঁর ভক্তদের প্রাত্যহিক ও বাৎসরিক কর্মকান্ড। মধ্য লীলার শেষাংশে আছে রূপ ও সনাতনের সঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের বিশদ বর্ণনা (২. ১৭-২৫), যার মধ্যে রয়েছে পার্থিব ভক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ষড় গোস্বামীদের দ্বারা বিকশিত ধর্মতত্ত্ব ও নান্দনিক তত্ত্বের অবস্থান।

অন্ত্যলীলা ভক্তিরস সৃষ্টির বাহন হিসেবে রূপ গোস্বামী প্রণীত নাটকগুলির জরিপ দিয়ে শুরু হয়েছে। চৈতন্যের জীবনের অন্তিম পর্বে অসংখ্য ভক্তের ও কখনও কখনও ভাষ্যকারের কর্মাবলি এবং চৈতন্যের সঙ্গে তাঁদের পারস্পরিক ভাব বিনিময় বিশেষত হরিদাস, রঘুনাথ দাস ও জগদানন্দের তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী গল্পকাহিনী আকারে পরিবেশিত হয়েছে। বিরহ অর্থাৎ কৃষ্ণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার আকুল উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার পরে রয়েছে চৈতন্য জীবনীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ। খন্ডটি সমাপ্ত হয়েছে চৈতন্যের নামে আরোপিত বিখ্যাত ‘শিক্ষাষ্টক’ অর্থাৎ আটটি শ্লোকে ব্যক্ত চৈতন্যের নির্দেশ দিয়ে।

চৈতন্য চরিতামৃতের পান্ডুলিপিগুলি একই রকমের এবং মুদ্রিত সংস্করণে অতি সামান্য হেরফের হয়েছে। একইভাবে এটি ষোল শতকে জীবনী রচনায় গুরু-পরম্পরার আদর্শ তৈরীতে তাৎপর্য সৃষ্টি করেছে। আর টীকাভাষ্য দিয়ে পুথির মুদ্রণে উনিশ ও বিশ শতকের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি এমনই রীতি যা আজ পর্যন্ত অনুসৃত হয়ে চলেছে এবং একটি বৃহত্তর গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন দলকে একাত্ম করার ব্যবস্থা করেছে। [WORDS:-918]

Chaitanya Charitamrita of Krishnadasa Kaviraja holds the place of honor as the authoritative final word in the hagiographical tradition devoted to Krsna Chaitanya (1486-1533 AD). The book serves as a compendium of Vaisnava lore that provides the details of Chaitanya’s life, especially the years of his renunciation, and how that life exemplified model devotion. The text outlines the basic theological positions developed by the Gosvamis in metaphysics, ontology, and aesthetics, and provides synopses of rituals appropriate to devotees. Because it is encyclopedic, it is the most often reproduced text within the tradition and serves as a theological standard against which all other writings are measured. It is from this text that devotees first understood the connection between the Gosvami writings as a coherent and systematic theology and the life of Chaitanya, for Krsnadasa was senior among the handful of devotees who studied with all of them.

Writing from Vrndavana, he finished this lengthy book toward the end of his life, although precisely when that was, is still debated within the scholarly community. Citations within the text declare a date some time after 1592, but the consensus argues for a considerably later date between 1609 and 1615. Any of these dates place the text at the end of the creative period of Chaitanya hagiography, which began in Sanskrit with Murari Gupta’s Krsna Chaitanyacharitamrta or Kadacha (c 1533) and the Bengali chaitanya bhagavata of Vrndavana Dasa (c mid-1540s). Although massive in size, the book was frequently copied and widely circulated in Bengal and Orissa in the early decades of the 17th century by a trio of students trained by the surviving Gosvamis and Krsnadasa: Srinivasa, Narottamadasa, and Shyamananda.

The sheer volume of the text undoubtedly contributed to its influence, for in its current critical edition the text stretches to approximately 24,000 lines of Bengali, written primarily in payara couplet with numerous passages in tripadi or three-footed metre. In addition the text intersperses more than one thousand couplets from seventy-five Sanskrit sources starting with the itihasas and puranas, especially the Bhagavata and the Gita, but also numerous citations of ritual manuals (tantra), poetry (kavya), aesthetic theory (rasa-shastra, nataka), and a host of metaphysical, commentarial, and eulogistic texts (tattva, bhasya, stotra, etc). Its size makes it second in length only to the slightly larger Chaitanya Bhagavata, and its organisation likewise parallels that of the Chaitanya Bhagavata.

Like the Chaitanya Bhagavata, the Chaitanya Charitamrta is divided into three sections- adi, madhya, antya – of 17, 25, and 20 chapters respectively. Krsnadasa explicitly drew numerous comparisons between the Chaitanya Bhagavata and his own narrative, which suggests that the mirror organisation was very deliberate. This rhetorical strategy invites the reader to conclude that the Chaitanya Charitamrta simply continued what the Chaitanya Bhagavata began with its narrative some seven or eight decades earlier. While the Chaitanya Bhagavata concentrates on Chaitanya’s life in Navadvipa when he was still a householder devotee, the Chaitanya Charitamrta focuses on his life after renunciation in Puri and on his pilgrimages. The result of these many comparisons has led the tradition tacitly to acknowledge that the Chaitanya Charitamrta is the conclusion of the hagiographical tradition.

Following a strategy of non-contradiction and conciliation, he included each of the current theories of divinity into a progressive or inclusive hierarchy of preferred forms (1.1-4; 2.8; 2.20-21): angsha or ‘partial incarnations’, yugavatara for the Kali Age, and all other forms such as manvantara, dashavatara, vyuha, and so forth. This inclusiveness was possible because, following the Chaitanya Bhagavata, Krsnadasa declared Chaitanya not to be simply a descent of God, but svayang bhagavan, the complete godhead, which meant that Chaitanya was the avatarin that included all forms of descent. The mechanism for effecting this wide dispersal of devotion was the community around Chaitanya himself, personified as the pancha tattva composed of Chaitanya, Advaitacharya, Nityananda, Gadadhara, and Shrivasa, who represents the other devotees. But the most novel aspect of this theology was the assertion that Chaitanya was the form assumed by Krsna in order to experience Radha’s love for himself, the so-called androgynous or ‘dual’ incarnation: Radha and Krsna fused into a single entity, forever separate, forever in union. This perspective was revealed in the narrative by Ramananda Raya in the famous exchange of questions and answers about the nature of devotion (2.8), but its theory attributed to Svarupa Damodara, Chaitanya’s amanuensis in Puri during the last half of his life. This novel theology has become the standard interpretation for all subsequent Gaudiya Vaisnava interpretations of Chaitanya’s descent.

Organised through the metaphor of the wishing tree of devotion (bhaktikalpataru), the adi lila devotes chapters to Chaitanya’s identity and personal lineage (1.1-4; 1.10), and his closest companions and their paramparas: Nityananda (1.5; 1.11), Advaitacharya (1.6; 1.12), Gadadhara (1.7; 1.12), and the other devotees (1.8-9). This section ends with a brief summary of the years of Chaitanya’s life up to his renunciation (1.13-17), an effective recapitulation of the contents of the Chaitanya Bhagavata.

The madhya lila details his renunciation (2.1-3), stories of Madhavendra Puri (2.4-5), Caityanya’s conversion of the scholar Sarvabhauma (2.6), his pilgrimage south (2.7-10). The mid-portion of madhya lila gives examples of the daily and annual activities of Chaitanya and his devotees during the Jagannatha car festival or rathayatra, and other festivities (2.11-16). The last part of madhya lila details his important meetings with Rupa and Sanatana (2.17-25), and which includes extensive outlines of the theological positions of Gosvami-developed theology and aesthetic theory as applied to practical devotion.

The antya lila begins with surveys of the plays composed by Rupa as vehicles to produce devotional rasa (3.1). Activities of various devotees and occasional critics and their interactions with Chaitanya during the last phase of his life are given anecdotally (3.2-12), especially including significant tales of Haridasa, Raghunatha Dasa, and Jagadananda. Chaitanya’s increasing experience of the searing agony of separation from Krsna known as viraha (3.13-19) is followed by the summary of the life of Chaitanya, and concludes with the famous siksastaka or instruction in eight verses attributed to Chaitanya himself.

Manuscripts are uniform and printed editions vary only slightly. In the same way that writing a biography signified legitimacy for a guru-parampara in the 16th century, printing the text with a commentary established legitimacy in the 19th and 20th centuries, a practice that continues today and which serves to align different groups within the larger Gaudiya group.

Go top


TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES 

3

জৈব কৃষিব্যবস্থা (Organic Farming)  সাংশ্লেষিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না হয়ে শস্য উৎপাদনের এক প্রকার কৃষিব্যবস্থা। সম্পূর্ণরূপে জৈববস্ত্ত ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল কৃষিব্যবস্থাকে বর্তমানে ইকোলজিক্যাল কৃষিব্যবস্থা বলা হয়। ইকোলজিক্যাল বা জৈব কৃষিব্যবস্থায় পরিবেশের ওপর চিরাচরিত কৃষিব্যবস্থায় সৃষ্ট কিছু নেতিবাচক প্রভাব হ্রাসের সম্ভাবনা আছে। জৈব কৃষিব্যবস্থায় সাংশ্লেষিক সারের ব্যবহার হ্রাস বা সাংশ্লেষিক সার ব্যবহার না করার ফলে পরিবেশগত মারাত্মক ক্ষতি এবং বন্যপ্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব হ্রাস করতে পারে। সাংশ্লেষিক সার মৃত্তিকার ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব ধর্মাবলি উন্নত করে না কিন্তু এসব ধর্মের ওপর জৈববস্ত্তর অনুকূল প্রভাব রয়েছে। সুতরাং জৈববস্ত্তর ব্যবহার মৃত্তিকার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে এবং সে সঙ্গে মৃত্তিকার উত্তম অবস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয়। সারা পৃথিবীব্যাপী বর্তমান সময়ে ব্যবহূত অতি পরিচিত জৈব বস্ত্তগুলো হলো জীবাণুসার, হিউমেট সার, শস্যের অবশেষ, সবুজ সার, গোয়ানো (এক প্রকার পাখির বিষ্ঠা), হাড়ের গুঁড়া, কম্পোস্ট, খামারজাত সার, মাছের গুঁড়া, মাছের বর্জ্য, তরল জৈব সার, নর্দমার আবর্জনা, স্লারি (slurry) ইত্যাদি। রাসায়নিক সার আগমনের পূর্বে বাংলাদেশের কৃষি সম্পূর্ণরূপে জৈব পদার্থ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রাণিজ সার, শস্য অবশেষ এবং গৃহস্থালির বর্জ্য এ তিনটি প্রধান উৎস থেকে জৈব সার ব্যবহার করা হতো। কিন্তু রাসায়নিক সার ব্যতীত কৃষি কাজ অবাস্তব বলে মনে হয়। কারণ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিতে উন্নতমানের কৃষি সামগ্রীর চেয়ে বরং অধিক খাদ্যের প্রয়োজন।

বাংলাদেশের মোট আবাদী এলাকার মধ্যে প্রায় ১৩% তিন ফসলী, ৫০% দো-ফসলী এবং বাদবাকি ৩৭% এলাকা এক ফসলী চাষের অন্তর্ভুক্ত। এসব মৃত্তিকাতে বোরো, আমন ও রবিশস্য আবাদ করা হয়। কৃষকদের মধ্যে অনেকেই কেবল রাসায়নিক সার, কেউ কেউ রাসায়নিক ও জৈব সার এবং কেউ কেউ কেবল জৈব সার ব্যবহার করছে। জৈব সারের মধ্যে খৈল, গৃহস্থালির বর্জ্য, খামার সার, খামারজাত সার এবং কচুরিপানা অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং বাংলাদেশের সার্বিক কৃষিব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল।

সাংশ্লেষিক সার ও অন্যান্য রাসায়নিক বস্ত্তর অবিরত ব্যবহার মৃত্তিকার ধর্মাবলির ওপর ইতোমধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে এবং এর ফলে উৎপাদন মাত্রায় স্থবির বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিম্নমুখী হয়েছে। মৃত্তিকার স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা উদ্ধার করতে জৈব পদার্থ অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। অধিকন্তু, জৈব কৃষিব্যবস্থাকে  শাকসবজি ও উদ্যান শস্য উৎপাদনের জন্যও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।

Organic Farming is a system of farming practices which is different from conventional farming that is heavily dependent on the use of synthetic fertilisers and pesticides. Organic farming is currently termed as ecological farming based solely on organic inputs. Ecological or organic farming systems have the potentials to reduce some of the negative impacts of conventional agriculture on the environment. The reduction or non-use of synthetic chemicals with organic farming system can decrease the environmental hazards and possible adverse effects on wildlife. Organic materials improve the physical, chemical and biological properties of soil in contrast to synthetic fertilisers. Use of organic materials is, therefore, necessary to sustain the productivity of soils as well as soil health. The most common organic materials which are currently used throughout the world are biofertilisers, humate fertilisers, manure spreaders, crop residues, green manure, guano, bone meals, compost, farmyard manure, fish meal, fish wastes, liquid manure, sewage sludge, slurry, etc.

Before the advent of chemical fertilisers the agriculture of Bangladesh was solely dependent on the use of organic materials. Three major sources of organic materials were animal manure, crop residues and domestic wastes. But agricultural practices without chemical fertilisers seem to be impractical because the country demands more production to keep pace with increasing population rather than quality products.

In Bangladesh, approximately 13% of the total cropped area is triple cropped, 50% double cropped and the remaining 37% areas are single cropped, settlement and water bodies. These soils are mainly used for Boro, Aman and Rabi crops. Some of the farmers are using chemical fertilisers, some are using chemical and organic fertilisers and some of the farmers are using only organic manure. Manure includes oil cake, household wastes, farm manure, farmyard manure and water hyacinth. Thus overall farming system of Bangladesh is very complex.

Continuous application of synthetic fertiliser and other chemicals has already created adverse effects on soil properties and as a consequence yield stagnation or even yield decline have resulted. To restore natural productivity of the soils use of organic materials is a must. Moreover, organic farming can also be extended for the production of vegetables and horticultural crops.

Go top

 

Bengali to English Translation-page-18

TRANSLATE WITHIN 60 MINUTES

1

যেহেতু [WHEREAS]সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী পূর্ণরূপে কার্যকর করিবার এবং তৎসংক্রান্ত বিষয়ের জন্য বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন[ expedient to provide] ও প্রয়োজনীয়;

সেহেতু এতদ্‌দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল:-

১৷ সংক্ষিপ্ত শিরোনামা[short title]

১৷ (১) এই আইন বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ নামে অভিহিত হইবে৷

(২) ইহা অবিলম্বে বলবৎ হইবে৷

সংজ্ঞা

২৷ বিষয় বা প্রসংগের পরিপন্থী[anything repugnant] কোন কিছু না থাকিলে, এই আইনে “অনুচ্ছেদ” অর্থে সংবিধানের অনুচ্ছেদ বুঝাইবে।

প্রবর্তন ও কার্যকরী

৩। (১) এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে।

(২) ৩(১) উপ-ধারায়[sub-clause] উল্লেখিত কোন কর্ম স্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনী ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।

(৩) যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপীল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপীল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।

বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা

৪৷ সরকার সরকারী গেজেট বিজ্ঞপ্তি দ্বারা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবেন৷

______________________________________

2

Translate into Bengali

No one has any right to endanger the life of the people which includes their health and normal longevity[স্বাভাবিক দীর্ঘমেয়াদী ]of an ordinary healthy person. Articles 31 and 32 of the Constitution not only means protection of life and limbs necessary for full enjoyment of life but also includes amongst others protection of health and normal longevity of an ordinary human being. It is the obligation of the State to discourage smoking and consumption of tobacco materials and the improvement of public health by preventing advertisement of tobacco made products[তামাকজাত দ্রব্যগুলির ধূমপান,ব্যবহার এবং তামাকজাত দ্রব্যগুলির বিজ্ঞাপনের]. Though the obligation under Article 18(1) of the Constitution cannot be enforced, State is bound to protect the health and longevity of the people living in the country as right to life guaranteed under Articles 31 and 32 of the Constitution includes protection of health and longevity[দীর্ঘায়ু] of a man free from threats of man-made hazards. Right to life under the aforesaid Articles of the Constitution being fundamental right it can be enforced by this Court to remove any unjustified threat to health and longevity of the people as the same are included in the right to life.

__________________________________________________

3

আদালতের এখতিয়ার এবং প্রদেয় কোর্ট ফির পরিমান নির্ধারনের উদ্দেশ্যে দেওয়ানী মামলার মূল্য বা প্রার্থিত প্রতিকারের বা মামলার বিষয়বস্তুর মূল্য দেখাতে হয় । একে মামলার মূল্যমান (valuation of the suit) বলে । মামলার সঠিক মূল্য নির্ধারন করা হয়েছে কিনা এবং সঠিক কোর্ট ফি দেয়া হয়েছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব আদালতের ।

কোনো মামলার মূল্যমান এবং প্রদেয় মূল্যানুপাতিক কোর্ট ফির হার কিভাবে নির্ধারিত হবে তা Court Fees Act, ১৮৭০ এর ৭ ধারার বিভিন্ন উপ-ধারায় বর্নিত আছে :-

১. ৭ ধারার (১) ও (২) উপধারা অনুযায়ী টাকার মামলায় দাবীকৃত টাকাই হলো মামলার মূল্যমান ।

২. ৭ ধারার (৩) উপধারা অনুযায়ী টাকা ব্যতীত অস্হাবর মামলা যার বিষয়বস্তুর বাজার মূল্য আছে সেই বাজার মূল্য অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে ।

৩. ৭ ধারার (৪) উপধারার ক্লজ (সি), (ডি), (ই) এবং (এফ) অনুযায়ী আনুসঙ্গিক প্রতিকার (consequential relief) সহ ঘোষনামূলক মামলা, নিষেধাÁvর মামলা, জমি সংক্রান্ত বর্তসত্বের মামলা এবং হিসাব সংক্রান্ত মামলায় আরজিতে উল্লেখিত প্রতিকারের মূল্য অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে । তবে এই সব মামলার এমন মূল্য নির্ধারন করা যাবেনা যার advalorem court fee ৩০০/- র নিচে হয় ।

৪. ৭ ধারার (৫) উপধারা অনুযায়ী জমি/বাড়ীর দখল সংক্রান্ত মামলায় জমি বা বাড়ীর বাজার মূল্য বা মামলা দায়ের করার আগের ১৫ বছরে এই জমি হতে আয় এর ১৫ গুন ধরে মামলার মূল্যমান নির্ধারিত হবে ।

৫. ৭ ধারার (৬) উপধারা অনুযায়ী অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার মামলায় নালিশী জমি/ বাড়ীর মূল্য অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে ।

৬. ৭ ধারার (৬এ) উপধারা অনুযায়ী সত্ব ঘোষনা সহ এজমালী সম্পত্তি বণ্টন এবং খাস দখল পাওয়ার মামলায় বাদীর অংশের বাজার মূল্য অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে ।

৭. ৭ ধারার (৮) উপধারা অনুযায়ী ডিক্রি রদের মামলায় তর্কিত ডিক্রি নির্ধারিত মূল্যমানের হয়ে থাকলে সেই মূল্যই হবে মামলার মূল্য । আর তর্কিত ডিক্রি নির্ধারিত মূল্যমানের না হয়ে থাকলে আগের মামলায় যে কোর্ট ফি দেয়া হয়েছে এই মামলাতেও সেই একই কোর্ট ফি প্রদেয় ।

৮. ৭ ধারার (৯) উপধারা অনুযায়ী বন্ধকী সম্পত্তি বন্ধক মুক্ত করা (redemption of mortgage) এবং বন্ধকী সম্পত্তি বন্ধক খালাসের অধিকার হরণের (foreclosure of mortgage) মামলায় বন্ধকী দলিলে উল্লেখিত কর্জের টাকা অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে ।

৯. ৭ ধারার (১০) উপধারা অনুযায়ী চুক্তি প্রবলের মামলায় চুক্তিকৃত পণ অনুসারে মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে ।

১০. ৭ ধারার (১১) উপধারা অনুযায়ী ভাড়াটিয়া উচ্ছেদের মামলায় মামলা দায়ের করার আগের ১ বছরের ভাড়ার সমান মামলার মূল্য নির্ধারিত হবে ।

Court Fees Act, ১৮৭০ এর ৮গ ধারা অনুযায়ী আদালত যদি মনে করে যে আরজিতে মামলার যে মূল্যমান দেয়া হয়েছে তা সঠিক নয় তাহলে আদালত সঠিক মূল্যমান নির্ণয় করতে এবং মূল্যমান পরিবর্তন করতে পারবেন ।[WORDS:-400]

___________________________________________________

 GO TO FIRST PAGE – TRANSLATION

Bengali to English Translation-page-17

GO TO FIRST PAGE – TRANSLATION

Legal discourse

মেয়ের বিয়েতে উপহার দেওয়া খাট বছর ঘুরতে না-ঘুরতেই[before the completion of the year] ভেঙে গিয়েছে। খাট এত তাড়াতাড়ি[within a short time] ভাঙল কেন, তার উত্তর খুঁজতে বাবা দৌড়লেন জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত থেকে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালত পর্যন্ত। একটা হেস্তনেস্ত[to see the end] চান তিনি। অভিযুক্ত সংস্থাকে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের নির্দেশ, নতুন খাট দিতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে হবে আট হাজার টাকা।

হুগলির গুড়াপের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক সোমনাথ মিত্র ২০১২ সালে নভেম্বরে একমাত্র মেয়ের বিয়েতে উপহার দেওয়ার জন্য একটি কাঠের খাট কিনেছিলেন।[  Somnath Mitra,  a retired officer,resident of Gurap of Hoogly , bought a wooden cot to give gift to his only daughter in November 2012.] খাটটি তৈরি করেছিল ধনিয়াখালির একটি সংস্থা। সোমনাথবাবুর অভিযোগ, সেগুন কাঠের বক্সখাটের জন্য তিনি ওই সংস্থাকে ৩২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু এক বছর যেতে না-যেতেই খাট ভেঙে যায়। বারবার বলা সত্ত্বেও[Despite repeatedly saying] বিক্রেতা সংস্থার মালিক বিষয়টিকে আমল দেননি। ‘‘তিন বছর পরে, ২০১৫ সালে ওই সংস্থা লিলুয়ায় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে[at the  daughter-in-law’s house]দু’জন কর্মীকে পাঠায়। কিন্তু সেই কর্মীরা জানিয়ে দেন, খাট সারিয়ে লাভ নেই। ফের তা ভেঙে যেতে পারে,’’ বলেন সোমনাথবাবু।

বাধ্য হয়েই সোমনাথবাবু ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ধনিয়াখালির অভিযুক্ত সংস্থা ‘ভারত ট্রেডিং কোম্পানি’র বিরুদ্ধে হুগলি জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা করেন।[Without having option, Somnath Babu  filed a case in July 2015 against the accused company ‘India Trading Company’ of Dhaniakhali in Hooghly District consumer Protection Court.] ২০১৬-র ডিসেম্বরে সেই আদালত নির্দেশ দেয়, অভিযুক্ত সংস্থাকে নতুন সেগুন কাঠের বক্সখাট এবং নগদ ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিযুক্ত সংস্থা মামলা করে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে। সেই আদালতের বিচারক শ্যামল গুপ্ত ও বিচারক উৎপলকুমার ভট্টাচার্য গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাঁদের রায়ে বলেন, ‘‘অত্যন্ত নিম্ন মানের কাঠের জন্যই এক বছরের মধ্যে নতুন খাটের খুঁত ধরা পড়েছে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী বেআইনি ভাবে ব্যবসা চালানোর দায় এড়াতে পারেন না।’’

রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালত নির্দেশ দেয়, অভিযুক্ত সংস্থাকে দে়ড় মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ বাবদ আট হাজার টাকা এবং নতুন খাট অথবা ২০ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে।[State CONSUMER Protection Court directed the accused company to pay eight thousand rupees for compensation within a fortnight and a new bed or  to pay Rs 20,500] কিন্তু মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণের টাকা বা নতুন খাট পাননি সোমনাথবাবু। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘‘এত দূর যখন এসেছি, শেষ দেখে ছাড়ব। আদালত অবমাননার অভিযোগে ওই সংস্থার বিরুদ্ধে শীঘ্রই মামলা করব।’’ অভিযুক্ত সংস্থা ভারত ট্রেডিং কোম্পানির কর্ণধার শঙ্করচন্দ্র দত্ত অবশ্য বলেন, ‘‘আমরা আদালতের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য। সোমনাথবাবুকে শীঘ্রই নগদ টাকা এবং নতুন খাট দিয়ে দেব।’’ [WORDS:-319]


2

আফশোস যাচ্ছে না বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের দুর্ঘটনায় জোধপুর পার্কের নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন ১৭ বছরের কিশোরের। [ A teenager undergoing treatment at the Jodhpur Park nursing home in an accident at Belghariya Expressway is notable to consume his grief.]

শনিবার রাতে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বাড়ি ফেরার সময় দশ চাকার লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় [was crushed to death by the wheelদমদমের বাসিন্দা অভিষেক আচার্য (১৮) এবং শিবনাথ টুডুর (১৭)। ঘটনার বাহাত্তর ঘণ্টা পরেও আতঙ্ক কাটেনি ঘটনাচক্রে বেঁচে যাওয়া ঋত্বিক সিংহের[Eventually surviving Ritika Singh failed to overcome the panic]। তিন বন্ধুর কারও মাথায় হেলমেট ছিল না। স্থানীয় সূত্রের খবর, বাইকচালক অভিষেকের ড্রাইভিং লাইসেন্সও ছিল না। চোখের সামনে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা দুই বন্ধুর পরিণতি দেখার পরে মঙ্গলবার নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে ঋত্বিক বলে, ‘‘বাইকে আর কোনও দিন চাপতে পারব কি না জানি না। যে ভুল আমরা করেছি, তা যেন আর কেউ না করে। হেলমেট না পরার এত বড় মাসুল দিতে[ to pay the cost] হবে, দু’বন্ধুকে হারিয়ে ফেলতে হবে, কখনও ভাবিনি।’’

ঋত্বিক জানিয়েছে, সুকুর আলি মোড়ে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া শেষে সাইকেল নিয়ে পাড়ায় ঘুরছিল সে। সেই সময় ফোন করে মালঞ্চের কুলিন অ্যাভিনিউয়ে তার বাড়িতে আসার জন্য ঋত্বিককে বলে শিবনাথ। সেখানে আগে থেকেই হাজির ছিল মানিকপুর খালপাড়ের বাসিন্দা অভিষেক। এর পর তিন বন্ধু মিলে ঘুরতে বেরোয় মোটরবাইকে। ঋত্বিকের কথায়, ‘‘প্রথমে নীচের রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলাম। তখন শিবনাথ বাইক চালাচ্ছিল। এক জায়গায় খাওয়ার পরে ফিরছিলাম আমরা। সে সময়ে অভিষেক বাইক চালাচ্ছিল। একে বৃষ্টি, তার উপরে নীচের রাস্তা অন্ধকার[ It was raining, over that the road below was dark]। দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে[due to getting late] এক্সপ্রেসওয়ে ধরলাম। সেটাই কাল হল।’’

অভিষেকের সঙ্গে গত বছর মাধ্যমিকের পরে আলাপ। শিবনাথের সঙ্গে একেবারে নিচু ক্লাস থেকে বন্ধুত্ব। ঋত্বিক জানিয়েছে, তাদের বাইকের সামনে একটি চার চাকার ছোট গাড়ি ছিল। পিছনে বড় লরি। অভিষেক বাইক চালাচ্ছিল, মাঝে শিবনাথ। বাইকের একেবারে পিছনে বসেছিল ঋত্বিক। মুখ ঘুরিয়ে [turning around the face]ঋত্বিককে কিছু বলতে যায় অভিষেক। ‘‘কথা শেষ করে সামনের দিকে তাকিয়েই দেখে আচমকা ব্রেক কষেছেন সামনের গাড়ির চালক। সজোরে বাইকের ব্রেক কষলেও নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি অভিষেক। তিন জনেই রাস্তার উপরে ছিটকে পড়ি।’’— বলল ঋত্বিক। এর পরবর্তী দৃশ্য এখনও বিভীষিকার মতো তাড়া করছে[chasing like a horror] ঋত্বিককে।

এ দিন সে বলে, ‘‘রাস্তার উপরে পড়ার পরে কয়েক মিনিটের জন্য জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম আমি লরির মাঝ বরাবর পড়ে রয়েছি। চাকা চলছে। লরির চাকা অভিষেক এবং শিবনাথকে ঘষটে নিয়ে যাচ্ছে। ওই অবস্থায় শিবনাথকে চাকার তলা থেকে বার করার চেষ্টা করি। অভিষেক যে নেই তখনই বুঝে গিয়েছিলাম[ I understood that Avishek is no more] । ট্যাক্সিতে তোলার পরও শিবনাথ বেঁচে ছিল। আমার চোখের সামনে…[Sibnath  was still survived  after he was loaded into the taxi in front of my eyes]’’

বাক্য শেষ করতে পারল না বছর সতেরোর কিশোর। ঋত্বিকের বাবা তপন সিংহ বলেন, ‘‘ছেলে সুস্থ হয়ে উঠলে কাউন্সেলিং করাব। এ ভাবে বন্ধুদের মৃত্যু দেখেছে তো। কতটুকু আর বয়স।’’ ঋত্বিকের ডান পায়ের একাধিক জায়গা ভেঙে গিয়েছে। আজ, বুধবার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরে অভিষেক ও শিবনাথের বাড়ি যাবে বলে ঠিক করেছে সে। ‘‘ওদের বাড়ি যেতেই হবে। হয়তো অভিমান করবেন, হয়তো আমায় দেখে ওঁদের দুঃখ বহু গুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু তবুও যাব[ but still I shall go ]।’’ এ কথা বলেই[having said so একরাশ আফশোস[with a load of regret] নিয়ে তার স্বগতোক্তি[in a mood of soliloquy], ‘‘কেন যে এত ঝুঁকি নিয়ে হেলমেট ছাড়া বড় রাস্তায় উঠলাম[Why  I took so much risk, and getting into a big street without helmets।’’[WORDS:- 432]


3

আজ, বুধবার সকাল ১১টা থেকে ত্রিস্তর[three tire] পঞ্চায়েতের মনোনয়ন[nomination paper] পত্রের স্ক্রুটিনির কাজ শুরু হওয়ার কথা। পাশাপাশি[besides] এ দিনই সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে মনোনয়ন দাখিল করতে না পারা নিয়ে বিরোধীদের দু’টি মামলার শুনানি হবে। সেই মামলা দুটি থেকে [out of this two cases] তৎক্ষণাৎ কোনও রায় না হলে আপাতত পঞ্চায়েত ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে কোনও রদবদলের সম্ভাবনা নেই বলেই কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে।

সোমবার রাতে নির্বাচন কমিশনার অমরেন্দ্রকুমার সিংহ মনোনয়ন জমা এক দিন বাড়িয়ে[extended] দিয়েছিলেন। তা নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল সরকার ও তৃণমূলের। মঙ্গলবার সকালেই মনোনয়ন বাড়ানো সংক্রান্ত নির্দেশটি প্রত্যাহার[withdrawn] করেন কমিশনার। তা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে যায় বিজেপি। বিচারপতি সুব্রত তালুকদার কমিশনের সেই নির্দেশের উপর স্থগিতাদেশ[granted stay order] দেন। প্রশ্ন উঠেছিল, তা হলে কি মনোনয়নের দিনক্ষণ আবার বাড়বে। কিন্তু কমিশনের দাবি, সময় বাড়িয়ে ১০ এপ্রিল বেলা ৩টে পর্যন্ত করা হয়েছিল। আদালতের স্থগিতাদেশ তারা হাতে পেয়েছে সেই সময়ের পরে। ফলে দিন বাড়ানোর আর প্রশ্ন নেই। এখন আদালত নতুন করে[a fresh order from the court] কিছু না বললে নির্বাচন পুরনো নির্ঘন্ট[old schedule] মেনেই হবে।


4

মেধা চলে যাচ্ছে, আক্ষেপ শোনা যায়। এ রাজ্য থেকে মেধাবীরা পরিযায়ী হচ্ছেন বলে হা-হুতাশ শোনা যায়। কেন মেধার নির্গমন ঘটছে, তা কিন্তু অনেকেই তলিয়ে ভাবার চেষ্টা করি না। যদি বা কেউ তলিয়ে ভাবি, মেধাবীদের ধরে রাখার বৈধ উপায় আমরা খোঁজার চেষ্টা করি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন পদে চাকরি পাওয়ার জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। বিএসসি, বি টেক, এম টেক-এর তো ছড়াছড়ি। পিয়ন পদের জন্য আবেদন করছেন এঁরা!

আমরা আঁতকে উঠছি আজ। কিন্তু আজ নয়, আরও অনেক আগে এই আঁতকে ওঠাটা জরুরি ছিল। উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে যে দিন থেকে ভয়ঙ্কর আপসটা শুরু হয়েছিল, শিক্ষাকে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করার চেষ্টা যে দিন থেকে রূপ পেয়েছিল, তরুণ জনসংখ্যার মধ্যে দ্রুতবেগে বাড়তে থাকা উচ্চশিক্ষার হার যে দিন থেকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছিল, সেই দিনই আঁতকে ওঠা উচিত ছিল আমাদের। সেই মুহূর্তে বোঝার চেষ্টা করা উচিত ছিল, ভবিষ্যতটা কতখানি মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারে। যদি সে দিন আঁতকে উঠতাম, আজ আর পিয়ন পদের জন্য গবেষকের দৌড়ঝাঁপ দেখতে হত না।

মেধার জন্য শুধু হা-হুতাশ করলেই চলে না। মেধার সমাদর করতেও জানতে হয়। সে আমরা কতটুকু করেছি? প্রশ্নটা নিজেদেরই করা দরকার।
মেধাবী ছেলেমেয়ের অভাব নেই এ রাজ্যে। কিন্তু মেধার বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি জরুরি, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো জরুরি।
মেধার সমাদর বলতে আমরা কী বুঝি? প্রথমত, মেধার বিকাশের বন্দোবস্তকে বুঝি। দ্বিতীয়ত, মেধা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানকে বুঝি।

মেধার বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো জরুরি। উচ্চশিক্ষার জন্য শ’য়ে শ’য়ে প্রতিষ্ঠান মাথা তুলেছে রাজ্য জুড়ে। কিন্তু সে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পরিকাঠামো কেমন, মেধার বিকাশের সহায়ক বন্দোবস্ত কতটা রয়েছে, ভারতের অন্যান্য প্রদেশের বা পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মানের সঙ্গে আমাদের রাজ্যে মাথা তোলা এই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানের কোনও তুলনা আদৌ হয় কি না, আমরা খুব একটা খোঁজ নিয়ে দেখতে যাইনি। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ইতিউতি। কিন্তু সে সব প্রতিষ্ঠানে তীক্ষ্ণধী ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হয়, নাকি শুধু বি টেক বা এম টেক ডিগ্রি বিতরণ হয়, তা সে ভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি। ফলে বাংলার ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতার বাজারে অন্য বেশ কিছু রাজ্যের পড়ুয়াদের থেকে পিছিয়ে পড়েছে।

কর্মসংস্থান তো আরওই দেওয়া যায়নি। না সরকারি প্রতিষ্ঠানে বড় সংখ্যক কর্মসংস্থান রয়েছে, না বেসরকারি উদ্যোগের বিপুল বিকাশ ঘটেছে এ রাজ্যে। অতএব, শিক্ষান্তে উপযুক্ত কাজ মিলবে, এমন নিশ্চয়তা বা প্রোত্সাহন পড়ুয়াদের অধিকাংশই পান না এ রাজ্যে।


 

Bengali to English Translation-page-16

PAGE :- 1 – 2 – – 4 – 5 – – 7 – – – 10 – 11 – 12 13 –14 – 15 - 16
1
ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু,
পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু||
এই-যে হিয়া থরোথরো কাঁপে আজি এমনতরো
এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু ॥
এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু, পিছন-পানে তাকাই যদি কভু।
দিনের তাপে রৌদ্রজ্বালায় শুকায় মালা পূজার থালায়,
সেই ম্লানতা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু ॥
“Forgive me my weariness O Lord Should I ever lag behind, for this heart that this day trembles so, and for this pain, forgive me, forgive me, O Lord For this weakness, forgive me O Lord,
If perchance I cast a look behind And in the day’s heat and under the burning sun, the garland on the platter of offering wilts, For its dull pallor, forgive me, forgive me O Lord
_______________________________
2
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়–
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,
পৌরুষেরে করে নি শতধা; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা–
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।
Where the mind is without fear and the head is held high
Where knowledge is free
Where the world has not been broken up into fragments
By narrow domestic walls
Where words come out from the depth of truth
Where tireless striving stretches its arms towards perfection
Where the clear stream of reason has not lost its way
Into the dreary desert sand of dead habit
Where the mind is led forward by thee
Into ever-widening thought and action
Into that heaven of freedom, my Father, let my country awake
_________________________________________________

3

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল – সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় – সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার – অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি ; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে ;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু – দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন ।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি – দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন ?’
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন ।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত
সন্ধ্যা আসে ; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল ;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল ;
সব পাখি ঘরে আসে – সব নদী – ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন ;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন ।

 

It has been a thousand years since I started trekking the earth
A huge travel in night’s darkness from the Ceylonese waters
to the Malayan sea
I have been there too: the fading world of Vimbisara and Asoka
Even further—the forgotten city of Vidarva,
Today I am a weary soul although the ocean of life around continues to foam,
Except for a few soothing moments with Natore’s Banalata Sen.Her hair as if the dark night of long lost Vidisha,
Her face reminiscent of the fine works of Sravasti,
When I saw her in the shadow it seemed
as if a ship-wrecked mariner in a far away sea
has spotted a cinnamon island lined with greenish grass.
“Where had you been lost all these days? ”
yes, she demanded of me, Natore’s Banalata Sen
raising her eyes of profound refuge.At the day’s end evening crawls in like the sound of dews,
The kite flaps off the smell of sun from its wings.
When all colours take leave from the world
except for the flicker of the hovering fireflies
The manuscript is ready with tales to be told
All birds come home, rivers too,
All transactions of the day being over
Nothing remains but darkness
to sit face to face with Banalata Sen.

__________________________________
4
দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার

গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!

কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!

_____________________________
5
বল বীর –
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!
আমি দুর্ব্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম,
ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
বল বীর –
চির উন্নত মম শির!আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠুমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর।
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।
বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!

আমি চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ,
আমি দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম্
ভরপুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য,
মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য।
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর –
চির উন্নত মম শির।

আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক!
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনা ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্ত্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!
আমি প্রাণ-খোলা-হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
আমি কভু প্রশান্ত, – কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্ দোল!

আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি।
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত
বুকে গতি ফের!
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত- চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্।
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি! –
আমি তুরিয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে
সব বাঁধ!

আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন!
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ-মর্ত্ত্য করতলে,
তাজি বোরবাক্ আর উচ্চৈস্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে!
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথর-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,
আণি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চরি’ ভূমি-কম্প!
ধরি বাসুকির ফনা জাপটি’, –
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’!
আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!

আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্
ঘুম্ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্
মম বাঁশরী তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

আমি প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরণীরে করি বরণিয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা –
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির দুর্জ্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্ত্য
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে
সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।

মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

আমি চির-বিদ্রোহী বীর –
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

Say, Valiant,
Say: High is my head!Looking at my head
Is cast down the great Himalayan peak!
Say, Valiant,
Say: Ripping apart the wide sky of the universe,
Leaving behind the moon, the sun, the planets
and the stars
Piercing the earth and the heavens,
Pushing through Almighty’s sacred seat
Have I risen,
I, the perennial wonder of mother-earth!
The angry God shines on my forehead
Like some royal victory’s gorgeous emblem.
Say, Valiant,
Ever high is my head!I am irresponsible, cruel and arrogant,
I an the king of the great upheaval,
I am cyclone, I am destruction,
I am the great fear, the curse of the universe.
I have no mercy,
I grind all to pieces.
I am disorderly and lawless,
I trample under my feet all rules and discipline!
I am Durjati, I am the sudden tempest of ultimate summer,
I am the rebel, the rebel-son of mother-earth!
Say, Valiant,
Ever high is my head!

I am the hurricane, I am the cyclone
I destroy all that I found in the path!
I am the dance-intoxicated rhythm,
I dance at my own pleasure,
I am the unfettered joy of life!
I am Hambeer, I am Chhayanata, I am Hindole,
I am ever restless,
I caper and dance as I move!
I do whatever appeals to me, whenever I like,
I embrace the enemy and wrestle with death,
I am mad. I am the tornado!
I am pestilence, the great fear,
I am the death of all reigns of terror,
I am full of a warm restlessness for ever!
Say, Valiant,
Ever high is my head!

I am creation, I am destruction,
I am habitation, I am the grave-yard,
I am the end, the end of night!
I am the son of Indrani
With the moon in my head
And the sun on my temple
In one hand of mine is the tender flute
While in the other I hold the war bugle!
I am the Bedouin, I am the Chengis,
I salute none but me!
I am thunder,
I am Brahma’s sound in the sky and on the earth,
I am the mighty roar of Israfil’s bugle,
I am the great trident of Pinakpani,
I am the staff of the king of truth,
I am the Chakra and the great Shanka,
I am the mighty primordial shout!
I am Bishyamitra’s pupil, Durbasha the furious,
I am the fury of the wild fire,
I burn to ashes this universe!
I am the gay laughter of the generous heart,
I am the enemy of creation, the mighty terror!
I am the eclipse of the twelve suns,
I herald the final destruction!
Sometimes I am quiet and serene,
I am in a frenzy at other times,
I am the new youth of dawn,
I crush under my feet the vain glory of the Almighty!

I am the fury of typhoon,
I am the tumultuous roar of the ocean,
I am ever effluent and bright,
I trippingly flow like the gaily warbling brook.
I am the maiden’s dark glassy hair,
I am the spark of fire in her blazing eyes.
I am the tender love that lies
In the sixteen year old’s heart,
I am the happy beyond measure!
I am the pining soul of the lovesick,
I am the bitter tears in the widow’s heart,
i am the piteous sighs of the unlucky!
I am the pain and sorrow of all homeless sufferers,
i am the anguish of the insulted heart,
I am the burning pain and the madness of the jilted lover!

I am the unutterable grief,
I am the trembling first touch of the virgin,
I am the throbbing tenderness of her first stolen kiss.
I am the fleeting glace of the veiled beloved,
I am her constant surreptitious gaze.
I am the gay gripping young girl’s love,
I am the jingling music of her bangles!
I am the eternal-child, the adolescent of all times,
I am the shy village maiden frightened by her own budding youth.
I am the soothing breeze of the south,
I am the pensive gale of the east.
I am the deep solemn song sung by the wondering bard,
I am the soft music played on his lyre!
I am the harsh unquenched mid-day thirst,
I am the fierce blazing sun,
I am the softly trilling desert spring,
I am the cool shadowy greenery!
Maddened with an intense joy I rush onward,
I am insane! I am insane!
Suddenly I have come to know myself,
All the false barriers have crumbled today!
I am the rising, I am the fall,
I am consciousness in the unconscious soul,
I am the flag of triumph at the gate of the world,
I am the glorious sign of man’s victory,
Clapping my hands in exultation I rush like the hurricane,
Traversing the earth and the sky.
The mighty Borrak is the horse I ride.
It neighs impatiently, drunk with delight!
I am the burning volcano in the bosom of the earth,
I am the wild fire of the woods,
I am Hell’s mad terrific sea of wrath!
I ride on the wings of the lightning with joy and profound,
I scatter misery and fear all around,
I bring earth-quakes on this world!

I am Orpheus’s flute,
I bring sleep to the fevered world,
I make the heaving hells temple in fear and die.
I carry the message of revolt to the earth and the sky!
I am the mighty flood,
Sometimes I make the earth rich and fertile,
At another times I cause colossal damage.
I snatch from Bishnu’s bosom the two girls!
I am injustice, I am the shooting star,
I am Saturn, I am the fire of the comet,
I am the poisonous asp!
I am Chandi the headless, I am ruinous Warlord,
Sitting in the burning pit of Hell
I smile as the innocent flower!
I am the cruel axe of Parsurama,
I shall kill warriors
And bring peace and harmony in the universe!
I am the plough on the shoulders of Balarama,
I shall uproot this miserable earth effortlessly and with ease,
And create a new universe of joy and peace.
Weary of struggles, I, the great rebel,
Shall rest in quiet only when I find
The sky and the air free of the piteous groans of the oppressed.
Only when the battle fields are cleared of jingling bloody sabres
Shall I, weary of struggles, rest in quiet,
I the great rebel.

I am the rebel eternal,
I raise my head beyond this world,
High, ever erect and alone!

______________________________________________

7

কল করেছেন আজবরকম চণ্ডীদাসের খুড়ো—
সবাই শুনে সাবাস বলে পাড়ার ছেলে বুড়ো।
খুড়োর যখন অল্প বয়স— বছর খানেক হবে—
উঠল কেঁদে ‘গুংগা’ বলে ভীষন অট্টরবে।
আর তো সবাই ‘মামা’ ‘গাগা’ আবোল তাবোল বকে,
খুড়োর মুখে ‘গুংগা’ শুনে চম্‌কে গেল লোকে।
বল্‌লে সবাই, “এই ছেলেটা বাঁচলে পরে তবে,
বুদ্ধি জোরে এ সংসারে একটা কিছু হবে।”
সেই খুড়ো আজ কল করেছেন আপন বুদ্ধি বলে,
পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা যাবে দেড় ঘণ্টায় চলে।
দেখে এলাম কলটি অতি সহজ এবং সোজা,
ঘণ্টা পাঁচেক ঘাঁটলে পরে আপনি যাবে বোঝা।
বলব কি আর কলের ফিকির, বলতে না পাই ভাষা,
ঘাড়ের সঙ্গে যন্ত্র জুড়ে এক্কেবারে খাসা।

সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যেরকম রুচি—
মণ্ডা মিঠাই চপ্‌ কাট্‌লেট্‌ খাজা কিংবা লুচি।
মন বলে তায় ‘খাব খাব’, মুখ চলে তায় খেতে,
মুখের সঙ্গে খাবার ছোটে পাল্লা দিয়ে মেতে।
এমনি করে লোভের টানে খাবার পানে চেয়ে,
উত্সাহেতে হুঁস্ রবে না চলবে কেবল ধেয়ে।
হেসে খেলে দু‐দশ যোজন চলবে বিনা ক্লেশে,
খাবার গন্ধে পাগল হয়ে জিভের জলে ভেসে।
সবাই বলে সমস্বরে ছেলে জোয়ান বুড়ো,
অতুল কীর্তি রাখল ভবে চণ্ডীদাসের খুড়ো।

Chandidas’s uncle has invented a device
Which is causing everyone to praise it to the skies.
When Uncle was a year old, or maybe even younger,
He came out with a lusty yell that sounded just like’Goonga.’
At such an age most other tots just manage ‘Glug’ and ‘Mum,’
So “Goonga’ like a thunderbolt, struck everybody dumb.
And all who heard, said ‘Here’s a boy – provided hesurvives –
Will one day surely bring about a change in humanlives.’
It seems the day is here at last, and victory is won
With what will make a five miles walk seem like only one.
I’ve seen the contrivance myself, and say with confidence
Never had invention had such greater significance.
Let me tell you how it strikes the eyes of a beholder:
First of ail, one notes that you must strap it to yours houlder.
An arm extends, and from its end one notes there hangs a hook
To which you bait some food – stuff which you eitherbuy or cook.
Naturally the choice depends upon you predilections
(It’s wiser to restrict yourself to hookable confections).
The sight of morsel dangling close provokes the urge to eat
Which, transcribed to your motive force, soon propels the feet.
Before you know you’re on the go, your mind, intent on feeding,
But since the food is travelling too you never stop your speeding
The outcome, I need hardly add, will change our whole existence
Because we’ll walk for nourishment, and never mind the distance.
No wonder’s there’s a move afoot, to honour, Uncle soon
For bestowing on humanity an everlasting boon. [Translated by Satyajit Roy]

________________________________

8

শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে—
তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে ?
গঙ্গারামকে পাত্র পেলে ?
জানতে চাও সে কেমন ছেলে ?
মন্দ নয় সে পাত্র ভালো
রঙ যদিও বেজায় কালো ;
তার উপরে মুখের গঠন
অনেকটা ঠিক পেঁচার মতন ;
বিদ্যে বুদ্ধি ? বলছি মশাই—
ধন্যি ছেলের অধ্যবসায় !
উনিশটিবার ম্যাট্রিকে সে
ঘায়েল হয়ে থামল শেষে ।
বিষয় আশয় ? গরীব বেজায়—
কষ্টে–সৃষ্টে দিন চলে যায় ।

মানুষ তো নয় ভাইগুলো তার—
একটা পাগল একটা গোঁয়ার ;
আরেকটি সে তৈরী ছেলে,
জাল করে নোট গেছেন জেলে ।
কনিষ্ঠটি তবলা বাজায়
যাত্রাদলে পাঁচ টাকা পায় ।
গঙ্গারাম তো কেবল ভোগে
পিলের জ্বর আর পাণ্ডু রোগে ।
কিন্তু তারা উচ্চ ঘর,
কংসরাজের বংশধর !
শ্যাম লাহিড়ী বনগ্রামের
কি যেন হয় গঙ্গারামের ।—
যহোক, এবার পাত্র পেলে,
এমন কি আর মন্দ ছেলে ?

Heard your daughter’s getting married,
From Posta, the news I carried.
Gangaram, the groom you chose,
I wish to describe, the quality he owes.
Now listen, listen, Hark, Hark!
His complexion is awfully dark.
His facial cutting, is somewhat round,
Rather an owl, just to sound.
Education? Oh, just wait!
Not so bright under any rate.
Nineteen times he had to pluck,
Till he left for his rotten luck.
Financial career? Poor indeed,
Somehow makes both ends meet.
And his brothers who are there,
Rather inhuman, know you dear.
One is stubborn, the other insane,
Quite a troupe of hollow men.
Oh, I missed the other two
Real gems are they, not to rue.
One was smart, but now in prison,
Forged bank notes, (So petty a reason!)
The youngest one in profession grand
Earns five bucks from a rustic band.
And Gangaram – is real meek,
Weak, feeble, and always sick.
But they are royal, Is that clear?
Tell you, they are King Kansha’s heirs.
And Shyam Lahiri of Banagram,
Is somehow kin to Gangaram.
Overall the groom is not so bad,
Cheer up, cheer up, don’t be sad.

________________________________________________

9

এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মত মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা।
সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি
লাঙল লইয়া ক্ষেতে ছুটিতাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত
এ-কথা লইয়া ভাবী-সাব মোরে তামাশা করিত শত।
এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে
ছোট-খাটো তার হাসি-ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।
বাপের বাড়িতে যাইবার কালে কহিত ধরিয়া পা
“আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু, উজান-তলীর গাঁ।”
শাপলার হাটে তরমুজ বেচি দু-পয়সা করি দেড়ী,
পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।
দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
সন্ধ্যাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!
হেসো না-হেসো না- শোন দাদু, সেই তামাক মাজন পেয়ে
দাদী যে তোমার কত খুশি হত দেখতিস যদি চেয়ে!
নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, “এতদিন পরে এলে,
পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেদে মরি আঁখিজলে”।
আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়!
হাতজোড় করে দোয়া মাঙ- দাদু, ‘আয় খোদা দয়াময়,
আমার দাদীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।’

তারপর এই শূন্য জীবনে কত কাটিয়াছি পাড়ি
যেখানে যাহার জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।
শত কাফনের শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
গণিয় গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
আয়- আয় দাদু, গলাগলি ধরি- কেঁদে যদি হয় সুখ।

এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
সেই ফাল্গুনে বাপ তোর আসি কহিল আমারে ডাকি,
‘বা-জান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।’
ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম, ” বাছা শোও”
সেই শোয়া তার শেষ শোয়া হবে তাহা কি জানিত কেউ?
গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,
তুমি যে কহিলা, ‘বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?’
তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,
সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!

তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দু-হাতে জড়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিত সারা দিনমান ভরি।
গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শূন্য-মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে গেঁয়ে পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,
চোখের জলের গহিন সায়রে ডুবায়ে সকল গা।

উদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,
কবর দেশের আন্ধার ঘরে পথ পেয়েছিল খুঁজি।
তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,
হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।
মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, ‘বাছারে যাই,
‘বড় ব্যথা র’ল, দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;
দুলাল আমার, জাদুরে আমার, লক্ষী আমার ওরে,
কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।’
ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গণ্ড ভিজায়ে নয়ন-জলে,
কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ-ব্যথার ছলে।

ক্ষণপরে মোরে ডাকিয়া কহিল, ‘আমার কবর গায়
স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।’
সেই সে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,
পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এই খানে তরু-ছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে পায়।
জোনাকি মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিঁরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
হাতজোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, ‘রহমান খোদা! আয়;
ভেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!’

এই খানে তোর বু-জির কবর, পরীর মতন মেয়ে,
বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বুনিয়াদি ঘর পেয়ে।
এত আদরেরর বু-জিরে তাহারা ভালোবাসিত না মোটে,
হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।
খবরের পর খবর পাঠাত, ‘দাদু যেন কাল এসে
দু-দিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।’
শ্বশুর তাহার কসাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে,
অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।
সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,
কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।
বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,
কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ-বীণ!
কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,
এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে!

ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে কেউ বাসে নাই ভালো,
কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।
বনের ঘুঘুরা উহু-উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,
পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।
হাতজোড়া করি দোয়া মাঙ দাদু, ‘আয় খোদা! দয়াময়!
আমার বু-জির তরেতে যেন গো ভেস্ত নাজেল হয়!’

হেথায় ঘুমায়ে তোর ছোট ফুপু, সাত বছরেরর মেয়ে,
রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।
ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,
অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!
ফুলের মতোন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,
তোমার দাদীর ছবিখানি মোর হৃদয়ে উঠিত ছেয়ে।
বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,
রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।

একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,
ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায়ে পথের ‘পরে।
সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে,
কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।
আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,
দাদু! ধর- ধর- বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।

এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,
কথা কস নাকো, জাগিয়া উঠিবে ঘুম-ভোলা মোর যাদু।
আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,
দীন দুনিয়ার ভেস্ত আমার ঘুমায় কিসের ছলে!
ওই দুর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবীরের রাগে,
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর,
মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূর।
জোড়হাতে দাদু মোনাজাত কর, ‘আয় খোদা! রহমান!
ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু-ব্যথিত-প্রাণ।

_________________________________________________________

 

Bengali to English Translation-page-15

PAGE :- 1 – 2 – – 4 – 5 – – 7 – – – 10 – 11 – 12 13 –14 – 15  – 16 – 17 – 18 – 19 – 20 – 21 
TRANSLATE WITHIN 60 MINUTES

2

সেদিন আপিসে মাইনে পেয়েছি।
বাড়ী ফেরবার পথে ভাবলাম ‘ওর’ জন্যে একটা ‘বডিস্‌’ কিনে নিয়ে যাই। বেচারী অনেক দিন থেকেই বলছে।
এ-দোকান সে-দোকান খুঁ’জে জামা কিনতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। জামাটি কিনে বেরিয়েছি–বৃষ্টিও আরম্ভ হল। কি করি–দাঁড়াতে হল। বৃষ্টিটা একটু ধরতে–জামাটি বগলে ক’রে–ছাতাটি মাথায় দিয়ে যাচ্ছি। বড় রাস্তাটুকু বেশ এলাম–তার পরই গলি, তা-ও অন্ধকার।
গলিতে ঢুকে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি–অনেকদিন পরে জা নতুন জামা পেয়ে তার মনে কি আনন্দই না হবে! আজ আমি–
এমন সময় হঠাৎ একটা লোক ঘাড়ে এসে পড়ল। সেও পড়ে গেল, আমিও পড়ে গেলাম–জামাটি কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল।
আমি উঠে দেখি–লোকটা তখনও ওঠেনি–ওঠ্‌বার উপক্রম করছে। রাগে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল–মারলাম এক লাথি!
“রাস্তা দেখে চলতে পারো না শুয়ার!”
মারের চোটে সে আবার পড়ে গেল–কিন্তু কোন জবাব করলে না! তাতে আমার আরও রাগ হল–আরও মারতে লাগলাম।
গোলমাল শুনে পাশের বাড়ীর এক দুয়ার খুলে গেল। লণ্ঠন হাতে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন–“ব্যাপার কি মশাই?”
“দেখুন দিকি মশাই–রাস্কেলটা আমার এত টাকার জামাটা মাটি করে দিলে। কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে একেবারে। পথ চলতে জানে না–ঘাড়ে এসে পড়ল–”
“কে–ও? ওঃ–থাক্‌ মশাই মাফ করুন, ওকে আর মারবেন না! ও বেচারা অন্ধ বোবা ভিখারী–এই গলিতেই থাকে–”
তার দিকে চেয়ে দেখি–মারের চোটে সে বেচারা কাঁপছে–গা’ময় কাদা। আর আমার দিকে কাতরমুখে অন্ধদৃষ্টি তুলে হাত দুটি জোড় করে আছে।


2

আমি আর ক্যাবলা টপাটপ নীচে নেমে পড়লুম। নেমেই দেখি, কোথাও কিছু নেই। টেনিদা নয়—গজেশ্বর নয়—স্বামী ঘুটঘুটানন্দর হেঁড়া দাড়ির টুকরোটুকুও নয়।

ব্যাপার কী! ঘচাং ফুঃর দল টেনিদাকেও ভ্যানিশ করে দিয়েছে নাকি?

ক্যাবলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, টেনিদা তো এখানেই এক্ষুনি পড়ল রে। গেল কোথায়?

আমি এতক্ষণে কিন্তু আবছা আবছা আলোয় সাবধানে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই কাঁকড়াবিছেটাকে খুঁজছিলুম। সেটা আশেপাশে কোথাও ল্যাজ উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কি না কে জানে! তার মোক্ষম ছোবল খেয়ে ওই গুণ্ডা গজেশ্বর কোনওমতে সামলেছে কিন্তু আমাকে কামড়ালে আর দেখতে হচ্ছে না—পটলডাঙার পালাজ্বর-মাকা প্যালারামের সঙ্গে সঙ্গেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি।

ক্যাবলা আমার মাথায় একটা থাবড়া মেরে বললে, এই টেনিদা গেল কোথায়?

—আমি কেমন করে জানব!

ক্যাবলা নাক চুলকে বললে, বড়ী তাজ্জব কী বাত! হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি?

কিন্তু পটলডাঙার টেনিদা—আমাদের জাঁদরেল লিডার—এত সহজেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার পাত্র? তৎক্ষণাৎ কোথেকে আবার টেনিদার অশরীরী চিৎকার : ক্যাবলা—প্যালা—চলে আয় শিগগির! ভীষণ ব্যাপার।

যাব কোথায়! কোন্‌খান থেকে ডাকছ? এ যে সত্যিই ভুতুড়ে ব্যাপার দেখতে পাচ্ছি। আমার মাথার চুলগুলো সঙ্গে সঙ্গে কড়াং করে দাঁড়িয়ে উঠল।

ক্যাবলা চেঁচিয়ে বললে, টেনিদা, তুমি কোথায়? তোমার টিকির ডগাও যে দেখা যাচ্ছে না!

আবার কোথা থেকে টেনিদার অশরীরী স্বর : আমি একতলায়।

–একতলায় মানে?

টেনিদা এবার দাঁত খিচিয়ে বললে, কানা নাকি? সামনের দেওয়ালে গর্ত দেখতে পাচ্ছিসনে?

আরে—তাই তো! এদিকের পাথরের দেওয়ালে একটা গর্তই তো বটে! কাছে এগিয়ে দেখি, তার সঙ্গে একটা মই লাগানো ভেতর থেকে। যাকে বলে, রহস্যের খাসমহল।

টেনিদা বললে, বেয়ে নেমে আয়। এখানে ভয়াবহ কাণ্ড—লোমহর্ষণ ব্যাপার।

অ্যাঁ!

ক্যাবলাই আগে মই বেয়ে নেমে গেল—পেছনে আমি। সত্যিই তো—একতলাই বটে। যেখানে নামলুম, সেটা একটা লম্বা হলঘরের মতো—কোথেকে আলো আসছে জানি

কিন্তু বেশ পরিষ্কার। তার একদিকে একটা ইটের উনুন—গোটা-দুতিন ভাঙা হাঁড়িকুঁড়ি—এক কোনায় একটা ছাইগাদা আর তার মাঝখানে

টেনিদা হাঁ করে দাঁড়িয়ে। ওধারে হাবুল সেন পড়ে আছে—একেবারে ফ্ল্যাট।

টেনিদা হাবুলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললে, ওই দ্যাখ!

ক্যাবলা বললে, হাবুল!

আমি বললাম, অমন করে আছে কেন?

টেনিদার গলা কাঁপতে লাগল : নিশ্চয় ওকে খুন করে রেখে গেছে!

আমার যে কী হল জানি না। খালি মনে হতে লাগল, ভয়ে একটা কচ্ছপ হয়ে যাচ্ছি। আমার হাত-পা একটু-একটু করে পেটের মধ্যে ঢোকবার চেষ্টা করছে। আমার পিঠের ওপরে যেন শক্ত খোলা তৈরি হচ্ছে একটা। আর একটু পরে গুড়গুড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি একেবারে জলের মধ্যে গিয়ে নামব।

আমি কোনওমতে বলতে পারলাম : ওটা হাবুল সেনের মৃতদেহ!

কথা নেই বার্তা নেই—টেনিদা হঠাৎ ভেউ-ভেউ করে কেঁদে ফেললে : ওরে হাবলা রে! এ কী হল রে! তুই হঠাৎ খামকা এমন করে বেঘোরে মারা গেলি কেন রে! ওরে কলকাতায় গিয়ে তোর দিদিমাকে আমি কী বলে বোঝাব রে! ওরে—কে আর আমাদের এমন করে আলুকাবলি আর ভীমনাগের সন্দেশ খাওয়াবে রে!

ক্যাবলা বললে, আরে জী, রোও মৎ। আগে দ্যাখো—জিন্দা আছে কি মুদা হয়ে গেছে।

আমারও খুব কান্না পাচ্ছিল। হাবুল প্রায়ই ওর দিদিমার ভাঁড়ার লুঠ করে আমের আচার আর কুলচুর এনে আমায় খাওয়াত। সেই আমের আচারের কৃতজ্ঞতায় আমার বুকের ভেতরটা হায়-হায় করতে লাগল। আমি কোঁচা দিয়ে নাক-টাক মুছে ফেললুম। আমার আবার কী যে বিচ্ছিরি স্বভাব কান্না পেলেই কেমন যেন সর্দি-উর্দি হয়ে যায়।

বারতিনেক নাক টেনে আমি বললুম, আলবাত মরে গেছে। নইলে অমন করে পড়ে থাকবে কেন?

ক্যাবলাটার সাহস আছে—সে গুটিগুটি এগিয়ে গিয়ে হাবুলের মৃতদেহের পেটে একটা খোঁচা মারল। আর, কী আশ্চর্য ব্যাপার—অমনি মৃতদেহ উঠে বসল ধড়মড়িয়ে।

বাপ রে ভূত হয়েছে! বলেই আমি একটা লাফ মারলুম। আর লাফিয়ে উঠতেই টেনিদার খাঁড়ার মতো খাড়া নাকটার একটা ধাক্কা আমার মাথায়। কী শক্ত নাক—মনে হল যেন চাঁদিটা স্রেফ ফুটো হয়ে গেছে!নাক গেলনাক গেল বলে টেনিদা একটা পেল্লায় হাঁক ছাড়ল, আর ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লুম আমি।

আর তক্ষুনি দিব্বি ভালো মানুষের মতো গলায় হাবুল বললে, একহাঁড়ি রসগোল্লা খাইয়া খাসা ঘুমাইতে আছিলাম, দিলি ঘুমটার দফা সাইর্যা!

তখন আমার খটকা লাগল। ভূতেরা তো চন্দ্রবিন্দু দিয়ে কথা বলে—এ তো বেশ ঝরঝরে বাংলা বলে যাচ্ছে। আর, পরিষ্কার ঢাকাই বাংলা।

টেনিদা খ্যাঁচখ্যাঁচ করে উঠল :

—আহা-হা কী আমার রাজশয্যে পেয়েছেন রে—যে নবাবি চালে ঘুমোচ্ছন। ইদিকে তখন থেকে আমরা খুঁজে মরছি হতচ্ছাড়ার আকেলটা দ্যাখো একবার।

হাবুল আয়েশ করে একটা হাই তুলে বললে, একহাঁড়ি রসগোল্লা সাঁইট্যা জব্বর ঘুমখানা আসছিল। তা, গজাদা কই? স্বামীজী কই গেলেন?

টেনিদা বললে, ইস, বেজায় যে খাতির দেখছি। স্বামীজী—গজাদা!

হাবুল বললে, খাতির হইব না ক্যান? কাইল বিকালে আইছি—সেই থিক্যা সমানে খাইতাছি। কী আদর-যত্ন করছে—মনে হইল য্যান ঠিক মামাবাড়ির আইছি। তা, তারা গেল কই?

ক্যাবলা বললে, তারা গেল কই—সে আমরা কী করে জানব? তা, তুই কী করে ওদের পাল্লায় পড়লি? এখানে এলিই বা কী করে?

ক্যান আসুম না? একটা লোক আইস্যা আমারে কইল, খোকা—এইখানে পাহাড়ের তলায় গুপ্তধন আছে। নিবা তো আইস। বড়লোক হওনের অ্যাঁমন সুযোগটা ছাড়ুম ক্যান? এইখানে চইল্যা আইছি। স্বামীজী—গজাদা—আমারে যে যত্ন করছে কী কমু!

টেনিদা ভেংচি কেটে বললে, হ, কী আর কব! এখানে বসে উনি রাজভোগ খাচ্ছেন, আর আমরা চোখে অন্ধকার দেখছি।

ক্যাবলা বললে, এসব কথা এখন থাক। এই গর্তের মধ্যে ওরা কজন থাকত রে?

জনচারেক হইব।

কী করত?

কেমনে জানুম? একটা কলের মতো আছিল—সেইটা দিয়া খুটুর-খুটুর কইরা কী য্যান ছাপাইত। সেই কলডাও তো দ্যাখতে আছি না। চা গেল নাকি? আহা হা, বড় ভালো খাইতে আছিলাম রে!—হাবুলের বুক ভেঙে দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরুল একটা।

-থাক তোর খাওয়া।—টেনিদা বললে, চল এবার বেরুনো যাক এখান থেকে। আমরা সময়মতো এসে পড়েছিলুমনইলে খাইয়ে খাইয়েই তোকে মেরে ফেলত।

আমি বললুম, উহু, মোটা করে শেষে কাটলেট ভেজে খেত!

ক্যাবলা বললে, বাজে কথা বন্ধ কর। হ্যাঁ রে হাবুল—ওরা কী ছাপ রে?

ক্যামন কইরা কই? ছবির মতো কী সব ছাপাইত।

—ছবির মতো কী সব! ক্যাবলা নাক চুলকোতে লাগল : পাহাড়ের গর্তের মধ্যে চুপি চুপি! বাংলোতে লোক এলেই তাড়াতে চাইত। জঙ্গলের মধ্যে একটা নীল মোটর! শেঠ ঢুণ্ডুরাম।

টেনিদা বললে, চুলোয় যাক শেঠ ঢুণ্ডুরাম! হাবুলকে পাওয়া গেছে-আপদ মিটে গেছে। ওটা নয় হাঁড়িভর্তি রসগোল্লা সাবড়েছে কিন্তু আমাদের পেটে যে ছুঁচোর দল সংকীর্তন গাইছে রে! চল বেরোই এখান থেকে–

আমি বললুম, আবার ওই মই বেয়ে?

হাবুল বললে, মই ক্যান্? এইখান দিয়েই তো যাওনের রাস্তা আছে।

—কোন্ দিকে রাস্তা?

—ওই তো সামনেই।

হাবুলই দেখিয়ে দিলে। হলঘরের মতো সুড়ঙ্গটা পেরুতেই দেখি, বাঃ। একেবারে যে সামনেই পাহাড়ের একটা ভোলা মুখ! আর কাছেই সেই নদীটা—সেই শালবন।

ক্যাবলা বললে, কী আশ্চর্য, তুই তো ইচ্ছে করলেই পালাতে পারতিস হাবলা।

হাবুল বললে, পালাইতে যামু ক্যান? অমন আরামের খাওন-দাওন। ভাবছিলাম—দুই-চাইরটা দিন থ্যাইকা স্বাস্থ্যটারে এইটু ভালো কইর্যা লই।

টেনিদা চেঁচিয়ে বললে, ভালো কইরা। হতচ্ছাড়া–পেটুকদাস! তোকে যদি গজেশ্বর কাটলেট বানিয়ে খেত, তাহলেই উচিত শিক্ষা হত তোর।

কিন্তু বলতে বলতেই–

হঠাৎ মোটরের গর্জন। মোটর! মোটর আবার কোখেকে? আবার কি শেঠ ঢুণ্ডুরাম?

হ্যাঁ—ঢুণ্ডুরামই বটে। সেই নীল মোেটরটা। কিন্তু এদিকে আসছে না। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে ক্রমশ—তারপর পাতার আড়ালে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। যেন আমাদের ভয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাল ওটা।

আর আমি স্পষ্ট দেখলুম—সেই মোটরে কার যেন একমুঠো দাড়ি উড়ছে হাওয়ায়। তামাক-খাওয়া লালচে পাকা দাড়ি।

স্বামী ঘুটঘুটানন্দের দাড়ি?

Bengali to English Translation-page-14

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES

সত্যবতীর গল্প আমার লেখা নয়। এ গল্প বকুলের খাতা থেকে নেওয়া। বকুল বলেছিল, একে গল্প বলতে চাও গল্প, সত্যি বলতে চাও সত্যি।

বকুলকে আমি ছেলেবেলা থেকে দেখছি। এখনও দেখছি। বরাবরই বলি, বকুল, তোমাকে নিয়ে গল্প লেখা যায়। বকুল হাসে। অবিশ্বাস আর কৌতুকের হাসি। না, বকুল নিজে কোনদিন ভাবে না—তাকে নিয়েও গল্প লেখা যায়। নিজের সম্বন্ধে কোন মূল্যবোধ নেই বকুলের, কোন চেতনাই নেই।

বকুলও যে সত্যিই পৃথিবীর একজন এ কথা মানতেই পারে না। বকুল। সে শুধু জানে, সে কিছুই নয়, কেউই নয়। অতি সাধারণের একজন, একেবারে সাধারণ–যাদের নিয়ে গল্প লিখতে গেলে কিছুই লেখবার থাকে না।

বকুলের এ ধারণা গড়ে ওঠার মূলে হয়তো ওর জীবনের বনেদের তুচ্ছতা। হয়তো এখন অনেক পেয়েও শৈশবের সেই অনেক কিছু না পাওয়ার ক্ষোভটা আজও রয়ে গেছে তার মনে। সেই ক্ষোভই স্তিমিত করে রেখেছে তার মনকে। কুণ্ঠিত করে রেখেছে তার সত্তাকে।

বকুল সুবৰ্ণলতার অনেকগুলো ছেলেমেয়ের মধ্যে একজন। সুবৰ্ণলতার শেষদিকের মেয়ে।

সুবৰ্ণলতার সংসারে বকুলের ভূমিকা ছিল অপরাধীর।

অজানা কোন এক অপরাধে সব সময় সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হবে বকুলকে, এ যেন বিধি-নির্দেশিত বিধান।

বকুলের শৈশব-মন গঠিত হয়েছিল তাই অদ্ভুত এক আলোছায়ার পরিমণ্ডলে। যার কতকাংশ শুধু ভয় সন্দেহ আতঙ্ক ঘৃণা, আর কতকাংশ জ্যোতির্ময় রহস্যপুরীর উজ্জ্বল চেতনায় উদ্ভাসিত। তবু মানুষকে ভাল না বেসে পারে না বকুল। মানুষকে ভালবাসে বলেই তো—

কিন্তু থাক, এটা তো বকুলের গল্প নয়। বকুল বলেছে, আমার গল্প যদি লিখতেই হয় তো সে আজ নয়। পরে। জীবনের দীর্ঘ পথ পার হয়ে এসে বুঝতে শিখেছে বকুল, পিতামহী প্রপিতামহীর ঋণশোধ না করে নিজের কথা বলতে নেই।

নিভৃত গ্রামের ছায়ান্ধকার পুষ্করিণীই ভরা বর্ষায় উপচে উঠে নদীতে গিয়ে মিশে স্রোত হয়ে ছোটে। সেই ধারাই ছুটে ছুটে একদিন সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। সেই ছায়ান্ধকারের প্রথম ধারাকে স্বীকৃতি দিতে হবে বৈকি।

আজকের বাংলাদেশের অজস্র বকুল-পারুলদের পিছনে রয়েছে অনেক বছরের সংগ্রামের ইতিহাস। বকুল-পারুলদের মা দিদিমা পিতামহী আর প্রপিতামহীদের সংগ্রামের ইতিহাস। তারা ংখ্যায় অজস্র ছিল না, তারা অনেকের মধ্যে মাত্র এক-একজন। তারা একলা এগিয়েছে। এগিয়েছে খানা ডোবা ডিঙিয়ে পাথর ভেঙে কাটাঝোঁপ উপড়ে। পথ কাটতে কাটতে হয়তো দিশেহারা হয়েছে, বসে পড়েছে নিজেরই কাটা-পথের পথ জুড়ে। আবার এসেছে আর একজন; তার আরব্ধ। কর্মভার তুলে নিয়েছে নিজের হাতে। এমনি করেই তো তৈরী হল রাস্তা। যেখান দিয়ে বকুল-পারুলরা এগিয়ে চলেছে। বকুলরাও খাটছে বৈকি। না খাটলে চলবে কেন? শুধু তো পায়ে চলার পথ হলেই কাজ শেষ হল না।

রথ চলার পথ চাই যে!

সে পথ কে কাটবে কে জানে? সে রথ কারা চালাবে কে জানে?

যারা চালাবে তারা হয়তো অলস কৌতূহলে অতীত ইতিহাসের পাতা উলটে দেখতে দেখতে সত্যবতীকে দেখে হেসে উঠবে।

নাকে নোলক, আর পায়ে মাল পরা আট বছরের সত্যবতীকে।

বকুলও একসময় হাসত।

এখন হাসে না। অনেকটা পায় পার হয়ে বকুল পথের মর্মকথা বুঝতে শিখেছে। তাই যে সত্যবতীকে বকুল কোনোদিন চোখেও দেখে নি, তাকে দেখতে পেয়েছে স্বপ্নে আর কল্পনায়, মমতায় আর শ্রদ্ধায়।

তাই তো বকুলের খাতায় সত্যবতীর এমন স্পষ্ট চেহারা আঁকা রয়েছে।

নাকে নোলক, কানে সার মাকড়ি, পায়ে ঝাঁঝর মিল, বৃন্দাবনী-ছাপের আটহাতি শাড়িপরা আট বছরের সত্যবতী। বিয়ে হয়ে গেছে। বছরখানেক আগে—এখনও ঘরবসতি হয় নি। অপ্রতিহত প্ৰতাপে পাড়াসুদ্ধ ছেলেমেয়ের দলনেত্রী হয়ে যথেচ্ছ খেলে বেড়ায়। সত্যবতীর মা ঠাকুমা জেঠী পিসী ঐটে উঠতে পারে না ওকে।

পারে না হয়তো সত্যবতীর যথেচ্ছাচারের ওপর ওর বাপের কিছু প্রশ্ৰয় আছে বলে।

সত্যবতীর বাপ রামকালী চাটুয্যে, চাটুয্যে বামুনের ঘরের ছেলে হলেও ব্রাহ্মণ-জনোচিত পেশা তাঁর নয়। অন্য শাস্ত্ৰপালা বেদ-বেদান্ত বাদ দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন আয়ুৰ্বেদ। ব্ৰাহ্মণের ছেলে হয়েও কবিরাজী করেন রামকালী। তাই গ্রামে ওঁর নাম নাড়ীটেপা বামুন। ওঁর বাড়ির নাম নাড়ীটেপা বাড়ি।

রামকালীর প্রথম জীবনটা ওঁর অন্য সব ভাই আর অন্যান্য জ্ঞাতিগোত্রের চাইতে ভিন্ন। কিছুটা হয়তো বিচিত্ৰও। নইলে ওই আধাবয়সী লোকটার ওইটুকু মেয়ে কেন? সত্যবতী তো রামকালীর প্রথম সন্তান। সে যুগের হিসেবে বিয়ের বয়স একেবারে পার করে ফেলে তবে বিয়ে করেছিলেন রামকালী। সত্যবতী সেই পার হয়ে যাওয়া বয়সের ফল।

শোনা যায় নিতান্ত কিশোর বয়সে বাপের ওপর অভিমান করে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন রামকালী। কারণটা যদিও খুব একটা ঘোরালো নয়, কিন্তু কিশোর রামকালীর মনে বোধ করি সেটাই বেশ জোরালো ছাপ মেরেছিল।

কি একটা অসুবিধেয় পড়ে রামকালীর বাবা জয়কালী একদিনের জন্যে সদ্য উপবীতধারী পুত্ৰ রামকালীর উপর ভার দিয়েছিলেন গৃহদেবতা জনাৰ্দনের পূজা-আরতির। মহোৎসাহে সে ভার নিয়েছিল রামকালী। তার আরতির ঘণ্টাধ্বনিতে সেদিন বাড়িসুদ্ধ লোক ত্ৰাহি জনাৰ্দন ডাক ছেড়েছিল। কিন্তু উৎসাহের চোটে ভয়ঙ্কর একটা ভুল ঘটে গেল। মারাত্মক ভুল।

রামকালীর ঠাকুমা ঠাকুরঘর মার্জনা করতে এসে টের পেলেন সে ভুল। টের পেয়ে ন্যাড়া মাথার উপর কদমছাট চুল সজারুর কাটার মত খাড়া হয়ে উঠল তার ৷ ছুটে গিয়ে ভাইপোর অর্থাৎ রামকালীর বাবা জয়কালীর কাছে প্ৰায় আছড়ে পড়লেন।

সর্বনাশ হয়েছে জয়!

জয়কালী চমকে উঠলেন কি হয়েছে পিসী?

ছেলেপুলেকে দিয়ে ঠাকুরসেবা করালে যা হয় তাই হয়েছে। সেবা-অপরাধ ঘটেছে। রেমো জনাৰ্দনকে ফল-বাতাসা দিয়েচে, জল দেয় নি।

চড়াৎ করে সমস্ত শরীরের রক্ত মাথায় গিয়ে উঠল জয়কালীর। অ্যাঁ করে একটা আর্তনাদধ্বনি তুললেন তিনি।

পিসী একটা হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে সেই সুরেই সুর মিলিয়ে বললেন, হ্যাঁ! জানি না এখন কার কি অদৃষ্ট আছে! ফুল তুলসীর ভুল নয়, একেবারে তেষ্টার জল!

সহসা জয়কালী পায়ের খড়মটা খুলে নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, রেমো! রেমো!

চিৎকারে রামকালী প্রথমটায় বিশেষ আতঙ্কিত হয় নি, কারণ পুত্র-পরিজনদের প্রতি স্নেহসম্ভাষণও জয়কালীর এর চাইতে খুব বেশী নিম্নগ্রামের নয়। অতএব সে বেলের আঠার হাতটা মাথায় মুছতে মুছতে পিতৃসকাশে এসে দাঁড়াল।

কিন্তু এ কী! জয়কালীর হাতে খড়ম!

রামকালীর চোখের সামনে কতকগুলো হলুদ রঙের ফুল ভিড় করে দাঁড়াল।

ভগবানকে স্মরণ করা রেমো, জয়কালী ভীষণ মুখে বললেন, তোর কপালে মৃত্যু আছে!

রামকালীর চোখের সামনে থেকে হলুদ রঙের ফুলগুলোও লুপ্ত হয়ে গেল, রইল। শুধু নিরন্ধ অন্ধকার। সেই অন্ধকার হাতড়ে একবার খুঁজতে চেষ্টা করল রামকালী কোন অপরাধে বিধাতা আজ তার কপালে মৃত্যুদণ্ড লিখেছেন। খুঁজে পেল না, খোঁজবার সামর্থ্যও রইল না। সেই অন্ধকারটা ক্রমশ রামকালীর চৈতন্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

জনার্দনের ঘরে আজ পূজো করেছিলি তুই না?

রামকালী নীরব।

পূজার ঘরেই তা হলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কই? কি? যথারীতি হাত-পা ধুয়ে তার পৈতেয় পাওয়া চেলির জোড়টা পরেই তো ঘরে ঢুকেছিল রামকালী। তারপর? আসন। তারপর? আচমন। তারপর? আরতি। তারপর—ঠাঁই করে মাথায় একটা ধাক্কা লাগল।

জল দিয়েছিলি ভোগের সময়?

এই প্রশ্নটি পুত্ৰকে করছেন জয়কালী খড়মের মাধ্যমে।

দিশেহারা রামকালী আরও দু-দশটা ধাক্কার ভয়ে বলে বসল—হ্যাঁ, দিয়েছি তো!

দিয়েছিলি?? জল দিয়েছিলি? জয়কালীর পিসী যশোদা একেবারে নামের বিপরীত ভঙ্গীতে বলে উঠলেন, দিয়েছিলি তো সে জল গেল কোথায় রে হতভাগা? গেলাস একেবারে শুকনো?

প্ৰশ্নকর্ত্রী ঠাকুমা।

বুকের গুরু-গুরু ভাবটা কিঞ্চিত হালকা মনে হল, রামকালী ক্ষীণস্বরে বলে বসিল, ঠাকুর খেয়ে নিয়েছে বোধ হয়!

কী? কী বললি? আর একবার ঠিক করে একটা শব্দ, আর চোখে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আরও গভীরতম অনুভূতি।

লক্ষ্মীছাড়া, শুয়োর বনবরা! ঠাকুর জল খেয়ে নিয়েছে? শুধু ভূত হও নি তুমি, শয়তানও হয়েছ। ভয় নেই প্ৰাণে তোমার? ঠাকুরের নামে মিছে কথা?

অর্থাৎ মিথ্যা কথাটা যত না অপরাধ হোক, ঠাকুরের নামের সঙ্গে জড়িত হয়ে ভীষণ অপরাধে পরিণত হয়েছে। রামকালী ভয়ের বশে আবারও মিছে কথা বলে বসে, হ্যাঁ, সত্যি বলছি। ঠাকুরের নামে দিব্যি। দিয়েছিলাম জল।

বটে। রে হারামজাদা! বামুনের ঘরে চাঁড়াল! ঠাকুরের নামে দিব্যি? জল দিয়েছিস তুই? ঠাকুর জল খেয়ে ফেলেছে? ঠাকুর জল খায়?

মাথার মধ্যে জ্বলছে।

রামকালী মাথার জুলায় অস্থির হয়ে সমস্ত ভয়-ডর ভুলে বলে বসল, খায় না জানো তো দাও কেন?

ও, আবার মুখে মুখে চোপা! জয়কালী আর একবার শেষবেশ খড়মটার সদ্ব্যবহার করলেন। করে বললেন, যা দূর হ, বামুনের ঘরের গরু! দূর হয়ে যা আমার সুমুখ থেকে!

এই।

এর বেশী আর কিছুই করেন নি জয়কালী। আর এরকম ব্যবহার তো তিনি সর্বদাই সকলের সঙ্গে করে থাকেন। কিন্তু কিসে যে কি হয়!

রামকালীর চোখের সামনে থেকে যেন একটা পর্দা খসে গেল।

চিরদিন জেনে আসছে জনাৰ্দন বেশ একটু দয়ালু ব্যক্তি, কারণে-অকারণে উঠতে বসতে বাড়ির সকলেই বলে, জনাৰ্দন, দয়া করো। কিন্তু কোথায় সে দয়ার কণিকামাত্ৰ!

রামকালী যে মনে মনে প্ৰাণ ফাটিয়ে চিৎকার করে প্রার্থনা করল, ঠাকুর এই অবিশ্বাসীদের সামনে একবার নিজমূর্তি প্রকাশ করো, একবার অলক্ষ্য থেকে দৈববাণী করো, ওরে জয়কালী, বৃথা ওকে উৎপীড়ন করছিস। জল আমি সত্যই খেয়ে ফেলেছি। একমুঠো বাতাসা খেয়ে ফেলে বড্ড তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল।

নাঃ, দৈববাণীর ছায়ামাত্র নেই।

সেই মুহূর্তে আবিষ্কার করল রামকালী, ঠাকুর মিথ্যে, দেবতা মিথ্যে, পূজোপাঠ প্রার্থনা–সবই মিথ্যে, অমোঘ সত্য শুধু খড়ম।

পৈতের সময় তারও একজোড়া খড়ম হয়েছে। তার উপর্যুক্ত ব্যবহার কবে করতে পারবে রামকালী কে জানে!

অথচ এই দণ্ডে সমস্ত পৃথিবীর উপরই সে ব্যবহারটা করতে ইচ্ছে করছে।

পৃথিবীতে আর থাকব না আমি।

প্ৰথমে সংকল্প করল রামকালী।

তারপর ক্রমশ পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যাবার কোনো উপায় আবিষ্কার করতে না পেরে মনের সঙ্গে রিফা করল।

পৃথিবীটা আপাতত হাতে থাক, ওটা তো যখন ইচ্ছেই ছাড়া যাবে। ছাড়বার মত আরও একটা জিনিস রয়েছে, পৃথিবীরই প্রতীক যেটা।

বাড়ি।

বাড়িই ছাড়বে রামকালী।

জন্মে আর কখনও জনার্দনের পূজো যাতে না করতে হয়।

তখন নাড়ীটেপার বাড়ি নাম হয় নি, আদি ও অকৃত্রিম চাটুয্যে বাড়িই ছিল। সকলের শ্রদ্ধাসুমী ও সাধার ছিল। কাজেই বেশ কিছুদিন গ্রামে সাড়া পড়ে রইল, চাটুয্যেদেরর ছেলে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে।

গ্রামের সমস্ত পুকুরে জাল ফেলা হল। গ্রামের সকল দেবদেবীর কাছে মানসিক মানা হল। রামকালীর মা রোজ নিয়ম করে ছেলের নামে ঘাটে প্ৰদীপ ভাসাতে লাগল, জয়কালী নিয়ম করে জনার্দনের ঘরে তুলসী চড়াতে লাগলেন, কিছুই হল না।

ক্রমশ সকলে যখন প্ৰায় ভুলে গেল। চাটুয্যেদের রামকালী বলে একটা ছেলে ছিল, তখন গ্রামের কোনো একটি যুবক একদিন ঘোষণা করল, রামকালী আছে। সে মুকণ্ডদাবাদে গিয়েছিল, সেখানে নিজের চোখে দেখে এসেছে রামকালী নবাব বাড়ির কবরেজ গোবিন্দ গুপ্তর বাড়িতে রয়েছে, তার সাকরেদি করে কবরেজি শিখছে।

শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন জয়কালী। ছেলের বেঁচে থাকার খবর, আর ছেলের জাত যাওয়ার খবর, যুগপৎ উল্টোপাল্টা দুটো খবরে তিনি ভুলে গেলেন, আনন্দে হৈহৈকার করতে হবে কি শোকে হাহাকার করতে হবে!

ছেলে বদ্যিবাড়ির ভাত খাচ্ছে, বদ্যিবাড়ির আশ্রয় গ্ৰহণ করেছে, এ তো মৃত্যুসংবাদেরই সামিল।

অথচ রামকালী এযাবৎ মরে নি, একথা জেনে প্ৰাণের মধ্যে কী যেন ঠেলে উঠছে। কী সে? আনন্দ? আবেগ? অনুতাপের যন্ত্রণা-মুক্তির সুখ?

গ্রামের সকলের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন জয়কালী। অবশেষে রায় বেরোল, জয়কালীর নিজের একবার যাওয়া দরকার। সরেজমিনে তদন্ত করে দেখে আসুন প্রকৃত অবস্থাটা কি! তা ছাড়া সেই লোক প্রকৃতই রামকালী। কিনা— তাই বা কে জানে! যে দেখেছে সে তো নিকট-আত্মীয় নয়, চোখের ভ্রম হতে কতক্ষণ?

কিন্তু পরামর্শ শুনে জয়কালী আকাশ থেকে পড়লেন, আমি যাব? আমি কি করে যাব? জনার্দনের সেবা ফেলে আমার কি নড়বার জোর আছে?

রামকালীর মা, জয়কালীর দ্বিতীয় পক্ষ দীনতারিণী শুনে কেঁদে ভাসাল। মুখে এসেছিল, বলে, জনাৰ্দনই তোমার এত বড় হল?

বলতে পারল না। সাহস করে, শুধু চোখের জল ফেলতে লাগল।

অবশেষে অনেক পরিকল্পনান্তে স্থির হল, জয়কালীর এক ভাগ্নে যাবে, বয়স্থ ভাগ্নে। তার সঙ্গে জয়কালীর প্রথম পক্ষের বড় ছেলে কুঞ্জকালী যাবে।

কিন্তু এই গন্ডগ্রিাম থেকে মুকণ্ডদাবাদে যাওয়া তো সোজা নয়! গরুর গাড়ি করে গঞ্জে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে কবে নৌকা যাবে মুকগুদাবাদ। তারপর আবার চাল চিড়ে বেঁধে নিয়ে গরুর গাড়িতে তিন ক্রোশ রাস্তা ভেঙে নৌকোর কিনারে গিয়ে ধর্না পাড়া।

খরচও কম নয়।

জয়কালী ভাবলেন, খরচের খাতায় বসানো সংখ্যা আবার জমার খাতায় বসাতে গেলে ঝঞ্ঝাট বড় কম নয়। এত ঝঞাটের দরকারই বা কি ছিল? রাগ হল সেই ফাজিল ছোঁকরাটার ওপর; যে এসে খবর দিয়েছে। যে এত ঝঞাট বাধানোর নায়ক।

রামকালী তো খবচ হয়েই গিয়েছিল। ওই ফাজিলটা এসে খবর না দিলে আর—

কিন্তু দরকার ছিল রামকালীর মার দিক থেকে, তাই সব ঝঞাট পুইয়ে ভাগ্নেকে আর ছেলেকে পাঠালেন জয়কালী। আর কদিন পরে তারা এসে জানাল খবর ঠিক। রামকালী নিঃসন্তান গোবিন্দ বন্দির পুষ্যি হয়ে রাজার হালে আছে, এর পর নাকি পাটনা যাবে। এদের কাছে বলেছে একেবারে রাজবদ্যি হয়ে টাকার মোট নিয়ে দেশে যাবে, তার আগে নয়।

শুনে যাদের বেশী ঈর্ষা হল, তারা বলল, এমন কুলাঙ্গার ছেলের মুখদর্শন করতে নেই। তা ছাড়া ও তো জাতিচ্যুত।

যাদের একটু কম ঈর্ষা হল, তারা বলল, তবু বলতে হবে উদ্যোগী পুরুষ! আর জাতিচু্যতই বা হবে কেন? কুঞ্জ তো বলছে নাকি জেনে এসেছে গোবিন্দ গুপ্ত রামকালী চাটুয্যের জন্যে কোন এক বামুনবাড়িতে ভাতের ব্যবস্থা করে রেখেছে।

গ্রামে আবার কিছুদিন এই নিয়ে আলোচনা চলল। এবং যখন এসব আলোচনা ঝিমিয়ে গিয়ে ক্রমশ আবার সবাই রামকালীর নাম ভুলতে বসল, তখন একদিন রামকালী সশরীরে হাজির হল টাকার বস্তা নিয়ে।

গোবিন্দ গুপ্ত পরামর্শ দিয়েছেন, তোমার আর রাজবদ্যি হয়ে কাজ নেই বাপু, রাজ্যে এখন ভেতরে ভেতরে ঘুণ ধরতে বসেছে, নবাবের নবাবী তো শিকেয় উঠেছে। আমার এই দীর্ঘকালের সঞ্চিত অৰ্থরাশি নিয়ে দেশে পালিয়ে গিয়ে নিজে নবাবী করো গে। আমরা স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে কাশীবাসে মনঃস্থির করেছি!

অগত্যা চলে এসেছে রামকালী।

গঞ্জের ঘাট থেকে নিজের পালকি করে।

গোবিন্দ গুপ্তের পালকিটাও পেয়েছে রামকালী। নৌকায় চাপিয়ে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু তখন জয়কালী মারা গেছেন এই এক মস্ত আপসোস।

বাবাকে একবার দেখাতে পারল না। রামকালী, সেই তাড়িয়ে দেওয়া ছেলেটা মানুষ হয়ে ফিরল।


Bengali to English Translation-page-13

TRANSLATE WITHIN 60 MINUTES

1

অনেকেই উঁচু জুতা পরতে পছন্দ করেন। তবে উঁচু জুতা পরার কিছু সমস্যাও রয়েছে। উঁচু জুতা পরে হাঁটাচলার সময় মেরুদণ্ডের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়ে। মেরুদণ্ড একটু অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে থাকে। ফলে কোমরব্যথা হতে পারে। এ ধরনের উঁচু জুতা পরলে পায়ের ওপরও অস্বাভাবিকভাবে চাপ পড়ে।

উঁচু জুতা পরে হাঁটার সময় ভারসাম্য রক্ষার জন্য শরীর যে ভঙ্গিতে থাকে, তা স্বাস্থ্যকর নয়। আবার হাঁটার সময় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই খুব উঁচু জুতা না পরাই ভালো। পরলেও একটানা বেশি সময়ের জন্য নয় এবং অতিরিক্ত উচ্চতার হিল নয়। উঁচু জুতা পরার আগে ও পরে খানিকটা সময়ের জন্য পায়ের পেশি স্ট্রেচ (টান টান) করুন। প্রতিদিন বা সব সময় উঁচু জুতা পরবেন না।

জেনে নেওয়া যাক কোন ধরনের জুতা পায়ের জন্য ভালো:

যে জুতা পরে হাঁটলে কোনো অস্বস্তি হয় না, সে রকম জুতা বেছে নিন। পায়ের মাপের চেয়ে বড় বা ছোট জুতা, কোনোটিই ভালো নয়। পায়ের সবচেয়ে বড় আঙুলটার চেয়ে আধা ইঞ্চি সামনে বেড়ে থাকা জুতা পরুন। জুতা পরার পর পায়ের আঙুলগুলো যেন আঁটসাঁট হয়ে না থাকে। যে জুতার সামনের দিকটায় আঙুল নাড়ানোর মতো যথেষ্ট জায়গা রয়েছে, তেমন জুতা পরুন। মজবুত সোলের জুতা কিনুন। তবে শক্ত জুতা পরিহার করুন। জুতার ভেতরের অংশটা আরামদায়ক হওয়া চাই।

যে জুতা পরলে সহজেই পিছলে যেতে পারেন, তেমন জুতা পরবেন না। জুতা সঠিকভাবে পায়ে না লাগলে পায়ে ফোসকা পড়তে পারে; পায়ের তলার কিছু অংশ শক্ত হয়ে কড়া বা ক্যালাস হতে পারে।


2

স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে এই বিষয়ের উপর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মুরগির মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় খামারীরা উৎপাদন বাড়াতে সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করছেন। কৃত্রিম এই উপায়গুলো বয়ে আনছে ভক্ষকের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

মুরগির মাংসের গুণগত মান বোঝার জন্য, তা কেমন পরিবেশে প্রতিপালিত হয়েছে সে সম্পর্কে ধারণা উচিত। এই ধারণা পাওয়ার একটি উপসর্গ হল বুকের মাংসে সাদা রেখা রেখা দাগ।

মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধির গতি কৃত্রিম উপায়ে দ্রুত করা হলে এই দাগ দেখা দেয়।

এ থেকে আরও বোঝা যায় যে নির্দিষ্ট ওই মুরগির পেশিজনিত সমস্যা ছিল, যার নাম ‘হোয়াইট স্ট্রাইপিং’।

এই ধরনের মুরগির মাংসের গুণগত মান কমে এবং চর্বিজাতীয় উপাদানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে ২২৪ শতাংশ পর্যন্ত।

আমেরিকার ‘ন্যাশনাল চিকেন কাউন্সিলের জরিপ অনুযায়ী, বর্তামানে একটি মুরগি গড়ে ৬ পাউন্ড ওজন নিয়ে বাজারে আসছে জন্মের ৪৭ দিনের মধ্যেই। পঞ্চাশের দশকে এর অর্ধেক ওজনে পৌঁছাতেই সময় লাগত প্রায় ৭০ দিন।

২৮৫টি মুরগির উপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায় ৯৬ শতাংশ মুরগির বুকের মাংসে আছে ওই সাদা দাগ এবং মাংসও শক্ত।

তাই চর্বিরহীন মনে করে ফার্মের মুরগির মাংস বেশি খেলে তেমন কোনো লাভ হবে না।


3

একদিন করলাম, তারপর তিন দিন কোনো খবর নেই—এভাবে হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের ব্যায়াম (যেমন হাঁটা) করা যথেষ্ট, কিন্তু এক দিনের বেশি বিরতি দেওয়া চলবে না। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন। প্রতিদিন ব্যায়াম বা হাঁটার এই উদ্দীপনা কীভাবে বাড়ানো যায়?

যে ধরনের ব্যায়াম করতে ভালো লাগে, সেটিই করুন। কঠিন কিছু বেছে নিলে কদিন পরই আগ্রহ চলে যাবে। তাই হাঁটা, জগিং, সাঁতরানো বা সাইক্লিং হতে পারে আপনার পছন্দ। জিম করলে কাছাকাছি জায়গা বেছে নিন। ব্যায়ামটা যেন আপনার জীবনের ওপর বাড়তি বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যায়ামের সঙ্গী হিসেবে কাউকে বেছে নিতে পারেন। কোনো বন্ধু বা পরিবারের সদস্য সঙ্গে থাকলে সময়টাও ভালো কাটল। এ ক্ষেত্রে বাড়তি লাভ হলো ব্যায়ামটা নিয়মিত হবে।

ব্যায়ামের মাঝে আনন্দ খুঁজে নিন। জোর করে করতে হচ্ছে এমনটা ভাবলে ক্লান্তি আসবে। সময়টা উপভোগ করুন। যাঁরা গান শুনতে ভালোবাসেন, তাঁরা ব্যায়ামের সময় গান শুনতে পারেন। আবার ঘরে বা ব্যায়ামাগারে বদ্ধ পরিবেশে হাঁপিয়ে উঠলে বাইরে গিয়ে ব্যায়াম করতে পারেন। পছন্দের খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।

ব্যায়ামের কারণে কী কী উপকার পাচ্ছেন, তা নিয়ে ভাবুন। এই ভাবনা উৎসাহ জোগাবে। নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করার জন্য অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন। সকালে ব্যায়ামের অভ্যাস করলে রাতেই পোশাক-আশাক গুছিয়ে রাখার মতো কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

ব্যায়ামের জন্য নতুন জুতা বা পোশাক কিনে নিন। বিশেষ ধরনের ঘড়ি বা মোবাইল অ্যাপস অনেকে ব্যবহার করেন, যা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার পর বা কতটুকু ক্যালরি ক্ষয় হচ্ছে তা জানিয়ে দেয়। এতে উৎসাহ বাড়ে।

ব্যায়ামের কারণে নিজের ফিটনেস কতটা বাড়ল তা লিখে রাখতে পারেন। আগে কতটা ওজন তুলতে পারতেন, কতখানি দৌড়ালে হাঁপিয়ে যেতেন বা কত বেশি দূর যেতে পারেন এখন তা তুলনা করুন।


4

অনেকেরই সুগঠিত দেহ। কিন্তু কেন জানি হঠাৎ করে পেটে মেদ জমতে শুরু করেছে। পোশাকের ভেতর থেকে উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে ভুঁড়ি। সে বড় বিব্রতকর অবস্থা। ভুঁড়ির জন্য কাজেকর্মেও গদাই লস্করি একটা ভাব চলে এসেছে। পেটের মেদ ঝরাতে চাইলে মেনে চলুন কিছু সাধারণ নিয়মকানুন। আর দেখুন না শরীরটাও কেমন ঝরঝরে হয়ে ওঠে। শরীর মেদহীন রাখতে কী খাবেন আর কী খাবেন না, এ বিষয়ে পরামর্শ দিলেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ।

 শর্করা ও চিনি আছে এমন খাবার কমাতে হবে।
 প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে।
 চর্বিজাতীয় খাবার সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে।
 খাওয়ার পরপরই বসে থাকা কিংবা শুয়ে থাকা যাবে না।
 একাধারে অনেকক্ষণ বসে থাকা যাবে না।
 কোমল পানীয় এবং কৃত্রিম ফলের রস খাওয়া মানা।
 আঁশযুক্ত শর্করা খেতে হবে, কিন্তু পরিমাণে অল্প।
 দিনে প্রচুর পানি খাবেন, কিন্তু খাবারের সঙ্গে কিংবা একবারে অনেক পানি খেয়ে ফেলা যাবে না।
 মেদ কমানোর ডায়েট শুরু করার আগে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
পেটের ব্যায়াম
 প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময়ে দৌড়াতে হবে কমপক্ষে ১০ মিনিট।
 সাইকেলিং করতে পারেন কমবেশি পাঁচ মিনিট। যদি সাইকেলিং করার সুযোগ না থাকে, অন্য ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করুন।
 প্রথমেই খালি হাতে খানিকটা ব্যায়াম করে মাংসপেশিকে উজ্জীবিত করে নিন। এটা হবে নিদেনপক্ষে পাঁচ মিনিট।
 দড়ি লাফানোর অভ্যাস করতে পারেন। পাঁচ মিনিট করে করুন।

ফিটনেস ওয়ার্ল্ড হেলথ ক্লাবের ব্যবস্থাপক ও প্রশিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বললেন, ‘ওপরের এই ব্যায়ামগুলো সব ধরনের ব্যায়াম শুরু করার আগেই করে নিলে ভালো। এতে মাংসপেশি শিথিল হয়ে শরীর ব্যায়ামের উপযোগী হয়ে ওঠে।’ এবার পেটের মেদ কমাতে করতে হবে নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম। প্রশিক্ষক মনিরুজ্জামানের কাছ থেকেই জেনে নেওয়া যাক তা।

 প্রথমেই শক্ত বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে মাথার পেছনে দুই হাত সোজা করে রাখুন। পা মাটির সঙ্গে জোড়া করে লাগানো থাকবে। এবার পুরো শরীর আস্তে আস্তে ওপরে তুলে হাত দিয়ে পা স্পর্শ করতে হবে। এভাবে ১০ বার করে তিনবার করুন।
 শোয়া অবস্থাতেই এবার হাত থাকবে কোমরের নিচে, দুই পা থাকবে সোজা। শরীর ও হাত স্থির হয়ে থাকবে। এবার পা দুটো আস্তে আস্তে একসঙ্গে ওপরে তুলতে হবে আবার নামাতে হবে। পুরো সময়ে পা মাটিতে ছোঁয়ানো যাবে না। এভাবে ১০ বার করে তিনবার করুন।
 বিছানায় শুয়ে থেকেই এবার দুই হাত ভাঁজ করে মাথার পেছনে নিন। ডান পা ভাঁজ করে মাটি থেকে তুলে ডান হাঁটু বাঁ কনুইয়ে লাগানোর চেষ্টা করুন। এবার হবে ঠিক উল্টো, বাঁ পা ভাঁজ করে মাটি থেকে তুলে বাঁ হাঁটু ডান কনুইয়ে লাগানোর চেষ্টা করুন। এভাবে ১০ সেকেন্ড করে তিনবার করুন।


Bengali to English Translation-page-12

TRANSLATE WITHIN 15 MINUTES

যখন বয়স কম ছিল তখন দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর একটা শখ ছিল, এখন আর সেই শখ নেই। পৃথিবীর নানা বিচিত্র দেশ থেকে নিজের সাদামাটা দেশটাকেই বেশি ভালো লাগে। তবে আমি কখনও বিষুব রেখা পার হইনি। তাই দক্ষিণ গোলার্ধের রাতের আকাশের নক্ষত্ররাজি দেখতে কেমন লাগে সেটা নিয়ে একটা সূক্ষ্ম কৌতূহল ছিল।

আকাশের নক্ষত্রদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল একাত্তরে। বিনিদ্র রাতে যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম তখন মনে হত সেগুলো বুঝি গভীর মমতা নিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। দক্ষিণ গোলার্ধে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালে আরও নূতন নক্ষত্রের সঙ্গে পরিচয় হবে; তাছাড়া রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্রটি দক্ষিণ গোলার্ধে একটা ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে দেখা দেয়, সেটা দেখারও আগ্রহ ছিল।

তাই যখন অস্ট্রেলিয়ার বাংলা সাহিত্য সংসদ আমাকে মেলবোর্নে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, আমি যেতে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভীতু ধরনের মানুষ, একা ভ্রমণ করতে সাহস পাই না। তাই যখন আমার স্ত্রী সঙ্গে যেতে রাজি হল তখন শেষ পর্যন্ত প্লেনে চড়ে বসলাম।

মেলবোর্ন পৌঁছানোর পর একটি অত্যন্ত অভিজাত ধরনের বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া কুকুর আমাদের সবকিছু শুঁকে যখন অনুমতি দিল যে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় পা দিতে পারি তখন আমরা বের হয়ে এলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে মেলবোর্নের বাংলা সাহিত্য সংসদের প্রায় সব সদস্য এয়ারপোর্টে চলে এসেছেন। তারা আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যেন আমি খুব বড় একজন সাহিত্যিক এবং আমার সন্দেহ হতে শুরু করল যে আমি ভুল জায়গায় চলে এসেছি কি না!

বাংলা সাহিত্য সংসদ বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের একটা সংগঠন। বিদেশের মাটিতে যারা থাকেন দেশের জন্যে তাদের ভিন্ন এক ধরনের মায়া থাকে। যারা কখনও দেশ ছেড়ে যাননি তারা আসলে কখনও দেশের জন্যে এই বিচিত্র মায়াটি অনুভব করতে পারবেন না।

দেশের প্রতি এই মমত্ববোধ থেকে বাংলা সাহিত্য সংসদ মেলবোর্ন শহরে নানা কিছুর আয়োজন করে থাকে; তার একটি হচ্ছে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলা থেকে সাহিত্যিকদের নিয়ে আসা। তাদের আয়োজনে সুনীল-শীর্ষেন্দু–সমরেশ মজুমদারের মতো সাহিত্যিকেরা এসেছেন এবং সেই একই আয়োজনে আমিও চলে এসেছি। নিজের সাহস দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম!

দেশে আমাকে নানা অনুষ্ঠানে যেতে হয়, শিক্ষকতা করি, তাই কথা বলাই আমার কাজ। সেজন্যে বক্তৃতা দিতেও আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তাই বলে সাহিত্যিক হিসেবে শত শত মানুষের সামনে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য নয়। কিন্তু সেটা কাকে বোঝাব!

সাহিত্য-সভাটি শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছিল। শিক্ষক হওয়ার কিছু বিশেষ সুবিধে আছে। সারা পৃথিবীতেই আমার ছাত্রছাত্রী। এখানেও তারা অনেকে আছে, সবাই দলবেঁধে চলে এল। বক্তব্যের শেষে একটা প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল, আয়োজকেরা সেটা নিয়ে একটু দুর্ভাবনায় ছিলেন।

এটি নূতন শুরু হয়েছে। রাজাকার টাইপের মানুষেরা দেশে সুবিধে করতে পারে না বিদেশে সভা-সমিতিতে এসে নাকি যা কিছু করে ফেলতে পারে। আমি আয়োজকদের অভয় দিলাম রাজাকার টাইপের মানুষদের কেমন করে সামলাতে হয় সেটি নিয়ে। কবি রবীন্দ্রনাথ কবিতা পর্যন্ত লিখে গেছেন, “যখনি দাড়াঁবে তুমি সম্মুখে তাহার তখনি সে/পথ কুকুরের মত সংকোচে সত্রাসে যাবি মিশে।”

কিন্তু সে রকম কিছুই হল না। সাহিত্য থেকে দর্শক-শ্রোতার বেশি আগ্রহ ছিল শিক্ষা নিয়ে, দেশ নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এগুলো আমারও প্রিয় বিষয়, দেশ নিয়ে সবসময় স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্নের কথা দশজনকে বলতে আমার কখনও সমস্যা হয় না। (তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে যখন একজন দর্শক আমার কাছে জানতে চাইল আমি কেন গোঁফ রাখি, আমি পুরোপুরি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। আমি কিছু বলার আগেই আমার স্ত্রী যখন হলভরা মানুষকে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল তখন আমার মুখ দেখানোর উপায় নেই!)

বাংলা সাহিত্য সংসদের আনুষ্ঠানিক সাহিত্য-সভাটি ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। কিন্তু আমরা সংসদের সদস্যদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে সময় কাটিয়েছি। প্রতি রাতেই কারও বাসায় সবাই একত্র হয়েছে এবং আমরা বাঙালিরা যে কাজগুলো খুব ভালো পারি– খাওয়া এবং চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া– অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেগুলো করা হয়েছে।

যে মানুষগুলোকে আগে কখনও দেখিনি তাদের থেকে বিদায় নেবার সময় সবার চোখে পানি– এ রকম বিচিত্র ঘটনা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো মানুষের জীবনে ঘটেছে কি না আমার জানা নেই। মাঝে মাঝেই মনে হয়, ভাগ্যিস বাঙালি হয়ে জন্মেছিলাম, তা না হলে কত কিছু যে অজানা থেকে যেত! [ WORDS:- 598]

Bengali to English Translation-page-11

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES

মৃগাঙ্কমোহন বলে, করালীচরণ যে ঠিক খুন হয়েছে, তা আমার মনে হয় না। মিঃ রায়। কেউ তাকে হত্যা করেনি, সে নিজেই আত্মহত্যা করেছে। দারোগীবাবুর মত অবিশ্যি তা নয়।

আমাকে ব্যাপারটা আগাগোড়া বলুন মৃগাঙ্কবাবু।

মৃগাঙ্কমোহন আবার বলতে শুরু করে, দাদার শরীরটা আজ কিছুদিন থেকে খারাপ যাচ্ছিল। তাই তিনি ও বৌদি শিলং বেড়াতে গেছেন। এই সময় এই বিপদ।। দাদাকে টেলিগ্ৰাম করেছি, হয়ত আজ কালই তিনি এসে পৌঁছবেন। করালী আজ আমাদের বাড়ীতে প্ৰায় কুড়ি বছরেরও উপর আছে-যেমন বিশ্বাসী তেমনি অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। তার মত লোকের যে এ সংসারে শত্রু থাকতে পারে এইটাই আশ্চর্য।

কান্নায় মৃগাঙ্কমোহনের স্বর বুঁজে এল।

কিন্তু আপনি যে বলছেন আত্মহত্যা করেছে সে, তাই বা কেন বলছেন? কিরীটী প্রশ্ন করে এবার।

তা ছাড়া আর কি হতে পারে বলুন। হাতে ভেজালী ছিল ধরা।

সেটা এমন কিছু একটা বড় কথা নয়।

কিন্তু আত্মহত্যারও তো একটা কারণ থাকা দরকার। সেরকম কিছু–

না। সে রকম কিছু অবিশ্যি আমি দেখতে পাচ্ছি না—

তবে?

তবে একটা কথা আছে মিঃ রায়।

কি বলুন?

ইদানীং মাস দুই ওকে যেন কেমন বিষন্ন, চিন্তিত মনে হতো।

কারণ কিছু কখন জিজ্ঞাসা করেছেন?

করেছিলাম—

কি জবাব দিয়েছিল?

কিছুই বলেনি। আমাকেও না দাদাকেও না। দাদা ওকে সঙ্গে করে শিলং নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাও ও গেল না।

হুঁ। আচ্ছা চলুন-মৃতদেহটা একেবার দেখে আসা যাক।

চলুন।

সকলে তখন মালির ঘরে পাশে ছোট ঘরটায় যার মধ্যে মৃতদেহ পুলিশ প্রহরায় রাখা ছিল সেখানে এসে দাঁড়াল।

ওরা আসতেই প্রহরী সরে দাঁড়ায়, ওরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে।

ছোট একটা ঘর।

করালীর মৃতদেহটা মেঝের ওপরে একটা চাদর ঢাকা ছিল। চাদরটা তুলে নেওয়া হলো কিরীটীর নির্দেশে।

ষাটের কাছাকাছিই প্রায় বয়স বলে মনে হয়। মাথার চুল পাতলা এবং সবই প্ৰায় পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে।

দুটো চোখ খোলা এবং সে দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকলেও মনে হয় তার মধ্যে একটা ভীতি রয়েছে যেন।

ভয়ে বিস্ফারিত।

চিৎ করে শোয়ান ছিল মৃতদেহ-কিরীটীর নির্দেশেই আবার দেহটা উপুড় করে দেওয়া হলো ক্ষত চিহ্নটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্য।

ঘাড়ের ডান দিকে কানের তল ঘেঁষে আড়াই ইঞ্চি পরিমাণ একটা গভীর ক্ষত চিহ্ন।

ক্ষত চিহ্নের দুপাশে কালো রক্ত শুকিয়ে আছে। নীচু হয়ে মৃতদেহ পরীক্ষা করতে করতে হঠাৎ মৃতের মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতটার প্রতি নজর পড়ল কিরীটীর।

মুঠিটা পরীক্ষা করতে গিয়ে ভাল করে দেখা গেল তার ভিতর কি একটা বস্তু যেন চক চক করছে।

কিরীটী তারপরও আরো কিছুক্ষণ মৃতদেহটা পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়াল এবং বলল, চলুন, যে ঘরে ওকে মৃত পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরে চলুন।

অতঃপর সকলে ভৃত্যদের মহলে যে ঘরে করালীচরণ থাকত ও যে ঘরে তাকে নিহত অবস্থায় গতকাল প্ৰত্যুষে পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরে সকলে এসে প্রবেশ করল—ঘরের দরজায় তালা দেওয়া ছিল, সেই তালা খুলে।

ঘরের মেঝেতে প্রথম দৃষ্টি পড়ে কিরীটীর। ছোট একটা তক্তপোশের সামনে মেঝেতে তখনও চাপ চাপ রক্ত কালো হয়ে শুকিয়ে আছে।

দারোগা সাহেব স্থানটা দেখিয়ে বলেন, ঐখানে করালীচরণকে মৃত পড়ে থাকতে দেখা যায় মিঃ রায়–

কিরীটী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার ঘরটার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। ছোট্ট অল্প পরিসর একখানি ঘর। ঘরের মধ্যে মেটমাট দুটি জানালা। জানালার মধ্যে একটা ভিতর থেকে বন্ধ। অন্যটার একটা পাল্লা খোলা–বাকীটা বন্ধ।

জিনিসপত্রের মধ্যে একটা পুরানো ট্রাঙ্ক ও একপাশে একটা বিছানা তক্তপোশের উপর গোটান অবস্থায় রয়েছে। কিরাট তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারিদিক দেখতে লাগল।

কিরীটী দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, কোথায় ঠিক মৃতদেহ ছিল দারোগা সাহেব?

ঠিক যেখানে দেখছেন মেঝেতে এখনো রক্ত কালো হয়ে জমাট বেঁধে আছে ঐখানেই ছিল–

হুঁ-আচ্ছা ঠিক আছে-এক সেকেণ্ড আমি একটু বাইরে মানে ঐ যে জানালাটা ঘরের বন্ধ আছে সে জায়গাটা বাইরে গিয়ে দেখে আসি।

কথাটা বলে কিরীটী ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু যেখানে যাবে বলেছিল। সেখানে গেল না। গেল সোজা যে ঘরে মৃতদেহ রয়েছে সেই দিকে।

কনেস্টবলটা দরজার বাইরে তখনো দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। কিরীটীকে ফিরতে দেখে বিস্মিত হয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল।

কিরীটী মৃদু একটু হেসে বললে, জেরা মেহেরবাণী করকে কেয়ারী ঠো খোল দিজিয়ে সাব। হামারা একঠো চিজ ঘরকা অন্দরামে গির পড়া।

কনেস্টবল দরজাটা খুলে সরে দাঁড়াল।

কিরীটী ঘরের মধ্যে ঢুকে ক্ষিপ্ৰ হস্তে মৃতের মুষ্টিবদ্ধ হাতের মধ্য থেকে সেই একটু আগে দেখা রঙিন চকচকে বস্তুটি খুলে নিল।

সেটা একটা রঙিন কাঁচের সুদৃশ্য বোতাম।

তাড়াতাড়ি সেটা পকেটে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিরীটীকে পুনরায় ঘরে এসে ঢুকতে দেখে দারোগা সাহেব শুধালো, কিছু দেখতে পেলেন?

হ্যাঁ।

কি? একটা কাঁচের বোতাম—

বোতাম! কথাটা বলে দারোগা সাহেব যেন বোকার মতই কিরীটীর মুখের দিকে তাকায়।

কিরীটী বলে, চলুন এবার, যা দেখবার দেখা হয়েছে, বাইরে যাওয়া যাক।

চলুন।

সকলে এসে বাইরের ঘরে জমায়েত হলো পুনরায়।

দারোগা সাহেবই এবার প্রশ্ন করে, সব তো দেখলেন, আপনার কি মনে হচ্ছে কিরীটীবাবু?

মনে হচ্ছে ব্যাপারটা হত্যাই–

হত্যা! মৃগাঙ্কমোহন কিরীটীর মুখের দিকে তাকাল।

হ্যাঁ–করালীচরণকে যতদূর মনে হচ্ছে আমার, হত্যাই করা হয়েছে মৃগাঙ্কবাবু। অর্থাৎ আপাততঃ আমার অনুমান তাই।

কিন্তু-মৃগাঙ্কমোহন কি যেন বলতে চায় কিন্তু দারোগা সাহেব বাধা–

বলে, না মৃগাঙ্কবাবু, এর মধ্যে আর কোন কিন্তু নেই। কারালীচরণকে কেউ হত্যাই করেছে। আমি তো আগেই আপনাকে বলেছিলাম।

মৃগাঙ্ক বলে, আপনারা বলছেন বটে, কিন্তু আমার এখানো বিশ্বাস হয় না-প্রথমতঃ, কে তাকে হত্যা করবে-আর কেনই বা করবে।–দ্বিতীয়তঃ, তার হাতের মধ্যে ভেজালী যে ধরা ছিল সে ব্যাপারটা আপনারা কেউ ভাবছেন না কেন?

কে বললে ভাবছি না-কিরীটী বলে, কিন্তু ক্ষত চিহ্ন দেখে কেউ বলবে না ঐ ভাবে কেউ নিজের গলায় ভেজালী বসাতে পারে। absurd–অসম্ভব।

কিন্তু—

না-মৃগাঙ্কবাবু, করালীচরণ আত্মহত্যা করেনি—তাকে কেউ নিষ্ঠুরভাবে হত্যাই করেছে।

দারোগা সাহেব মাথা দুলিয়ে নিঃশব্দে যেন কিরীটীকে সায় দেয়।

আরো কিছুক্ষণ পরে।

দারোগা সাহেব মৃতদেহ ময়না তদন্ত করবার ব্যবস্থা করে ফিরে গিয়েছেন।

ঘরের মধ্যে মৃগাঙ্কমোহন, সুব্রত ও কিরীটী।

কিরীটী বলে, বেলা সাড়ে তিনটার স্টীমারেই আমি ফিরে যেতে চাই মৃগাঙ্কবাবু।

চলে যাবেন?

হ্যাঁ।

কিন্তু যে জন্য আপনাকে ডেকে এনেছিলাম। সে সম্পর্কে কোন কথাই তো আমাদের হলো না মিঃ রায়।

একটা কথা মৃগাঙ্কবাবু, সত্যি সত্যিই করালীচরণ আত্মহত্যা করেনি–তাকে হত্যা করা হয়েছে জেনেও ব্যাপারটির একটা নিস্পত্তি চান?

বাঃ! নিশ্চয়ই, সেই জন্যই তো আপনাকে ডাকা—

বেশ-তবে তাই হবে। দু-একদিনের মধ্যেই হয়। আবার আমি আসব না হয় কি করছি না করছি। খবর আপনি পাবেন।

আপনার পারিশ্রমিকের ব্যাপারটা–

সে একটা স্থির করা যাবে পরে—এখন ও নিয়ে মাথা ঘামাবেন না।

ফিরবার পথে স্টীমারে কিরীটী বোতামটা হাতের উপর নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল।

সুব্রত হঠাৎ প্রশ্ন করল, তখন কি যেন বলছিলি-বোতাম না কি?

কিরীটী মৃদুকণ্ঠে বলল, হ্যাঁ একটা জামার বোতাম।–এই বোতামটার কথাই বলছিলাম—

কোথায় পেলি?

জানালার বাইরে কুড়িয়ে। বোতামটি বেশ, না সুব্রত?

সত্যই বোতামটা দেখতে ভারী সুন্দর। রঙিন কাঁচের বোতামটা, একদিকে গোল ডিম্বাকৃতি। অন্যদিক চ্যাপ্টা।

সাদা বোতামটার গা থেকে একটা ঈষৎ লালচে আভা ঠিকরে বেরুচ্ছে।

কি ভাবছিস বলত? সুব্ৰত জিজ্ঞাসা করল।

কই? কিছুনা।

মৃদু হেসে কিরীটী বোতামটা জামার পকেটে রেখে দিল।

অপরাহ্নের স্নান আলোয় চারিদিক কেমন যেন বিষণ্ণ মনে হয়।

আকাশে আবার মেঘ করছে। [WORDS:- 1016]

Bengali to English Translation-page-10

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES

ঘটনাটা যেমন নৃশংস তেমনি বীভৎস।

পুলিস ইন্সপেক্টর সুদৰ্শন মল্লিক ঘরের মধ্যে ঢুকেই যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল।

সমস্ত ঘরের মেঝেতে চাপচাপ রক্ত।

তার মধ্যে পড়ে আছে দুটি মৃতদেহ।

একটি বছর ত্রিশ-একত্রিশের তরুণীর মৃতদেহ আর অন্যটি একটি বছর চারেকের শিশুর। দুজনকেই কোন ধারালো অন্ত্রের সাহায্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে দেখলেই বোঝা যায়।

তরুণীর দেহে অনেকগুলো ক্ষতচিহ্ন-চোখে মুখে গলায় পেটে বুকে—মনে হয় বুঝি কোন উন্মাদ কোন তীক্ষ ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে বার বার আঘাত করেছে—যার ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

শিশুটিকেও ঠিক অনুরূপভাবে হত্যা করা হয়েছে।

পাশাপাশি ঘরের মেঝেতে দুটি মৃতদেহ পড়ে আছে।

দেহটা নৃশংসভাবে ক্ষতবিক্ষত হলেও দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না তরুণী সত্যিই সুন্দরী ছিল। টকটকে গৌর গাত্ৰবৰ্ণ-টানা টানা দুটি চোখ-মাথাভর্তি মেঘের মত একরাশ কালো চুল ছড়িয়ে আছে।

পরনে একটা দামী ঢাকাই শাড়ি—গায়ে লাল সিস্কের ফুলহাতা ব্লাউজ। মাথায় সিঁদুর— দু-হাতে ছয় গাছা করে বারো গাছা সোনার চুড়ি-গলায় হার, কানো হীরার টাব।

তাতেই মনে হয় ব্যাপারটা কোন চোর-ডাকাতের কাজ নয়, কোন বাগালারি নয়। তাহলে নিশ্চয়ই গহনাগুলো গায়ে তারা রেখে যেত না হত্যা করার পর!

শিশুটির খালি গা পরনে ইজের-মাথাভর্তি কেঁকড়া কেঁকড়া চুল—হাতে সোনার বালা। গলায় সোনার বিছোহার।

শিশুটি মেয়ে।

দুৰ্ঘনটা ঘটেছে একেবারে প্রখর দিবালোকে।

কলকাতা শহরে সি আই টি-র কল্যাণে যেসব এলাকা নতুন করে গড়ে উঠেছে-বড় বড় চওড়া পীচঢালা রাস্তা আর তারই দু’পাশে নানা ধরনের সব নতুন বাড়ি—সেই এলাকাতেই অর্ধসমাপ্ত একটা চারতলার বাড়ির ফ্ল্যাটে ঘটনাটা ঘটেছে।

একতলায় একটা ব্যাঙ্ক।

ব্যান্ধে ঐ সময় পুরোদস্তুর কাজকর্ম চলছিল।

বাড়িটা এখনো কমপ্লিট হয়নি। দোতলা ও তিনতলার গোটাচারেক ফ্ল্যাটে মাত্র ভাড়াটে এসেছে।

তিনতলা ও চারতলার কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, চলছে। সামনে ও পিছনে বাঁশের ভারা বাঁধা। চার-পাঁচ জন রাজমিস্ত্রী ও জনাচারেক মজুর কাজ করছিল। ঐ সময়।

অথচ আশ্চর্য!

ব্যাপারটা কেউ ঘুণাক্ষরে জানতে পারেনি।

জানাও যেত। কিনা সন্দেহ সন্ধ্যার আগে যদি না স্ত্রীলোকটির স্বামী ডালহৌসীর অফিসে বসে কাজ করতে করতে জরুরী একটা ফোন-কাল পেয়ে তখুনি একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাসায় এসে না হাজির হত!

মণিশঙ্কর ঘোষাল, মেয়েটির স্বামী, বেলা দুটো নাগাদ একটা ফোন-কাল পায়।

অফিসের পি. বি. এক্স. থেকে ফোনের কানেকশনটা টেলিফোন অপারেটার তার টেবিলে দিয়েছিল।

মিঃ ঘোষাল, আপনার ফোন! অফিসেরই ব্যাপারে হয়তো কেউ ফোন করছে ভেবে মণিশঙ্কর ঘোষাল ফোনটা তুলে নিয়েছিল।

হ্যালো—আপনি কি মণিশঙ্কর ঘোষাল? মণিশঙ্করের মনে হয়েছিল গলার স্বরটা কোন পুরুষের-মোটা, কর্কশ ও কেমন যেন সর্দিধারা গলার মত ভাঙা-ভাঙা।

হ্যাঁ, কথা বলছি। মণিশঙ্কর জবাব দেয়।

আপনি একবার এখুনি আপনার বাসায় যান।

বাসায় যাব! কেমন যেন বিস্মিত হয়েই প্রশ্নটা করে মণিশঙ্কর।

হ্যাঁ, দেরি করবেন না—এখুনি চলে যান। সেখানে বিশ্ৰী একটা ব্যাপার ঘটেছে—

কিন্তু কেন—কী হয়েছে বাসায়?

আপনার স্ত্রী ও মেয়ে—

কি? কি হয়েছে তাদের?

উৎকণ্ঠায় যেন ভেঙে পড়ে মণিশঙ্করের গলার স্বর।

গেলেই দেখতে পাবেন-চলে যান।

কিন্তু আপনি কে? কে কথা বলছেন?

অপর প্রান্তে গলার স্বর তখন থেমে গিয়েছে—আর কিছু শোনা যায়নি।

মণিশঙ্কর কিছুক্ষণ তারপর কেমন যেন হতভম্ভ হয়ে চেয়ারটার উপর বসে ছিল—ব্যাপারটা তখনো যেন ঠিক তার মাথার মধ্যে থিতোয়নি।

কে ফোন করলে তাকে-কি হয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যার!

শেষ পর্যন্ত উঠেই পড়ে মণিশঙ্কর!

ম্যানেজারকে বলে ছুটি নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে পড়ে।

বেলা তখন দুটো বেজে মিনিট দশেক হয়েছে। রাস্তায় নেমে একটা খালি ট্যাক্সিও পেয়ে গেল মণিশঙ্কর-সোজা চলে যায় বেলেঘাটায়। ট্যাক্সি থেকে যখন নামল সেখানে কোনরকম কিছু অস্বাভাবিক তার নজরে পড়েনি।

ব্যাঙ্কের মধ্যে নিয়মমত কাজকর্ম চলেছে সে-সময়।

ভিতরে ব্যাঙ্কের কর্মচারীরা যে যার আপনি আপনি কাজে ব্যস্ত।

রাস্তায়ও দু-চারজন লোক নজরে পড়ে। একটা বাস চলে গেল। গোটা দুই ট্যাক্সি চলে গেল। একটা রিকশা চলে গেল–

দুজন মিস্ত্রী ভারায় বসে কাজ করছে।

অবিশ্যি এই তল্লাটে সাধারণতঃই লোকজনের ভিড় বা চলাচল একটু কম সব সময়ই। এখানো তেমন কলকাতা শহরের অন্যান্য অংশের মত জনবহুল ও ঘিঞ্জি হয়ে উঠতে পারেনি বলেই হয়তো।

বাড়িতে ফোন নেই।

অবিশ্যি নীচের তলায় ব্যাঙ্কে ফোন আছে। ইচ্ছে করলে বা প্রয়োজন হলে সেখান থেকে ফোন করা যেতে পারে।

বিজিতা দু-একবার সেখান থেকে অফিসে প্রয়োজনে ফোনও করেছে মণিশঙ্করকে।

কিন্তু আজ যে তাকে অফিসে কে ফোন করল—এখনো ভেবে পাচ্ছে না মণিশঙ্কর!

নানা কথা ভাবতে ভাবতেই মণিশঙ্কর সিঁড়ি দিয়ে তার দোতলার ফ্লাটে উঠে এসেছিল। দরজাটা বন্ধ।

ধাক্কা দিয়ে দরজার গায়ে ভৃত্য শম্ভুকে ডাকতে যাবে কিন্তু হাতের সামান্য ঠেলাতেই দরজার পাল্লা দুটো খুলে গেল আপনা থেকেই।

তিনখানা ঘর-পর পর। পিছনের দিকে দুটো পর পর ল্যাভেটরি।

একটা বাথরুম—রান্নাঘর বা কিচেন, ছোট্ট মত একটা স্টোররুম।

তারই ভাড়া তিনশ টাকা।

অফিস থেকে ভাড়ার অর্ধেক টাকা দেয়, বাকিটা দিতে হয় নিজের পকেট থেকে, তাই মণিশঙ্কর ফ্ল্যাটটা নিতে সাহস করেছিল মাসচারেক আগে।

নূতন ফ্ল্যাটে উঠে এসেছে মাত্র চার মাস। আগে ছিল শ্যামবাজার অঞ্চলে দেড়খানা ঘর নিয়ে একতলায়। দমবন্ধ হয়ে আসার যোগাড়। মাত্র দেড়খানা ঘর, স্বামী স্ত্রী ওরা দুজন ছাড়াও একজন চাকর।

চাকর না হলে চলে না। বাজার আনাটা—টুকটাক ফাইফরমাশ কে করে। তার উপর মেয়েটাকে একটু বেড়াতে নিয়ে যাওয়া।

মণির তো সময়ই নেই। সেই সকাল নটায় অফিস যায়, ফিরতে সেই কোন সাড়ে ছাঁটাসাতটা। বিজিতাকেও একলা থাকতে হয়!

অনেক খুঁজে পেতে বছর বারোর একটা বাচ্চা চাকর পাওয়া গিয়েছিলশদ্ভুচরণ।

তা ছেলেটা ভাল। সব সময়ই হাসিমুখ। এক পায়ে খাড়া। শম্ভুকে পেয়ে যেন ওমা বেঁচে গিয়েছিল।

বাইরের বসবার ঘরটা বেশ সাজানো। ছিমছাম।

কিন্তু ঘর খালি।

শম্ভু এই শস্তু-দরজাটা খুলে রেখেছিস কেন? বলতে বলতে দ্বিতীয় ঘরে পা দিল মণিশঙ্কর। সে ঘরেও কেউ নেই–

শেষে শোবার ঘরে পা দিয়েই অকস্মাৎ একটা আতঙ্কে যেন থমকে দাঁড়িয়ে যায় মণিশঙ্কর।

নতুন মোজেকের ঘষা চকচকে ঘরের মেঝেতে চাপচাপ রক্ত।

উঃ।

মাথাটা যেন সহসা কেমন ঘুরে উঠল মণিশঙ্করের।

শঙ্কিত বিহ্বল দৃষ্টির সামনে যেন দৃশ্যটা স্পষ্ট—বিজিতা আর রুণার রক্তাক্ত দুটো দেহ-কিছুটা ব্যবধানে চাপ-চাপ রক্তের মধ্যে পড়ে আছে।

বিজিতার পরিধেয় শাড়িটার আচিল স্খলিত গা থেকে।

বুকের কাছে বীভৎস চার-পাঁচটা ক্ষত—ঝলকে ঝলকে রক্ত বোধ হয় বের হয়ে এসেছিল সেই ক্ষতমুখ দিয়ে—জামা—শাড়ি-মেঝেতে খালি রক্ত আর রক্ত।

শুধু বুকেই নয়—মুখে, গালে, গলায় হাতে সর্বত্র ক্ষত। প্রত্যেকটি ক্ষতস্থান দিয়ে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে।

হঠাৎ ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে যায়। মণিশঙ্কর—চিৎকার করবার চেষ্টা করে, কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বের হয় না।

সিঁড়ি দিয়ে নামছিল মণিশঙ্কর একপ্রকার পাগলের মতই যেন ছুটতে ছুটতে, ঐসময় দোতলার পাশের ফ্ল্যাটের অন্য ভাড়াটে ইঞ্জিনীয়ার গোপেন বসুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক গোপেনবাবু।

কি কি হয়েছে। মণিবাবু—

খুন–

খুন-কে? কে খুন হলো?

আমার স্ত্রী-আমার মেয়ে—তাদের মেরে ফেলেছে গোপেনবাবু—তাদের মেরে ফেলেছে—বলতে বলতে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে মণিশঙ্কর।

কোথায়, কোন ঘরে।

উপরে শোবার ঘরে।

চলুন-চলুন দেখি

না, না—আমি যাবো না—রক্তের বন্যা বইছে-না, না—

গোপেন বসুই নীচে গিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে থানায় ফোন করে দিয়েছিল, শীঘ্ৰ আসুন স্যার— বেলেঘাটা নতুন সি. আই. টির ফ্ল্যাটে দুটো খুন হয়েছে।

আপনি কে? থানা-অফিসার রবীন দত্ত জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

আমার নাম গোপেন বসু, ঐ বাড়ির উপরের ফ্ল্যাটে আমি থাকি।

রবীন দত্ত ছুটে আসে জীপ নিয়ে। দেরি করে না।

অকুস্থানে দাঁড়িয়ে যখন সরেজমিন তদন্ত করছে ইন্সপেক্টর সুদৰ্শন মল্লিক লালবাজার হোমিসাইডাল স্কোয়াডের একটা পুলিস ভ্যানে চেপে হাজির হলো।

বাড়ির সামনে ও ভিতরে, সিঁড়ির নীচে পুলিস ছিল, তারা সুদর্শকে সেলাম করল।

কোথায় খুন হয়েছে? সুদৰ্শন প্রশ্ন করে।

দোতলার ফ্ল্যাটে স্যার—

সুদৰ্শন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে। প্রথম ঘরটাতে একজন লাল-পাগড়ি ছিল— সেই সুদৰ্শনকে ইঙ্গিতে ঘরটা দেখিয়ে বলে, ভিতরের ঘরে স্যার ডেড বডি।

সুদৰ্শন পরের ঘরটা পার হয়ে শেষের ঘরে পা ফেলেই দরজা-পথে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

সমস্ত ঘরের মেঝেতে চাপ-চাপ রক্ত। জমাট বেঁধে আছে রক্ত।

আর সেই চাপ-চাপ জমাট বাঁধা রক্তের মধ্যে পড়ে আছে দুটো মৃতদেহ। [WORDS:-1125]

Bengali to English Translation-page-7

PAGE:-  2 – 3 456 78 9 10 – 1112 131415
TRANSLATE WITHIN 10 MINUTES

লরেটা ও আমি রিকশা করে যাচ্ছি। আমি বললাম, তোমার কি মন খারাপ?

না।

আমার তো খুব মন খারাপ লাগছে। তোমার কেন লাগছে না লরেটা?

তোমার কি কান্না পাচ্ছে?

হ্যাঁ।

কই; দেখি?

আমি তাকালাম লরেটার দিকে। লরেটা দেখল আমার চোখ জলে ভেজা। সে মমতাময়ী নারীর গলায় বলল, আমি যখন বড় হব তখন তোমাকে বিয়ে করব।

আমি বললাম, আচ্ছা। আমি কি মাঝে মাঝে তোমার খোঁজ নিতে আসব?

না।

যোগাযোগ তো থাকা দরকার। ধর, ঐ বাড়ি ছেড়ে আমরা চলে গেলাম। তুমি তো জানবে না কোথায় গেছি।

বড় হয়ে আমি তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করব।

ঠিক আছে।

লরেটাকে নামিয়ে দিয়ে ফিরছি, সন্ন্যাসী ভোলাবাবুর সঙ্গে দেখা। গায়ে কোনোই কাপড় নেই। আমাকে দেখেই এই যে এই যে বলে এগিয়ে এলেন। আমি আঁৎকে উঠলাম। ভাবলাম, নিৰ্ঘাৎ কোন উন্মাদ।

টুকু সাহেব, ভালো আছেন? আমি তোলা।

ও আচ্ছা।

কাপড়-চোপড় ছেড়ে পুরো নাঙ্গা হয়ে গেলাম।

তাই তো দেখছি।

শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না, জ্বর-জ্বারি হচ্ছিল। একটু বৃষ্টিতেই জ্বর। নাঙ্গা হবার পর শরীরটা ঠিক হয়ে গেছে।

লজ্জা লাগছে না।?

প্রথম বারো ঘন্টা লজ্জা লাগে, তারপর আর লাগে না। চলুন এককাপ চা খাই।

এই অবস্থায় রেস্টুরেন্টে বসে চা খাবেন?

জ্বিনা। মাঠে বসব। ছোেট ছোট ছেলে আছে, তারা চা এনে দিবে। ভাইজান, টাকা আছে তো আপনার কাছে?

জ্বি আছে।

আমরা রেসকোর্সের মাঠে গিয়ে বসলাম। ভোলাবাবু বললেন, আচ্ছা, আপনার কি কখনো সাধু-সন্ন্যাসী হতে ইচ্ছা করে?

না।

করলে সরাসরি নাঙ্গা হয়ে যাবেন। ঈশ্বরের ধ্যান-ট্যান কিছু করতে হবে না। শুধু মনটাকে হাল্কা করে ছড়িয়ে দেবেন। ওতে কাজ হবে।

উপদেশের জন্য ধন্যবাদ।

আমি কিন্তু সাধু হিসেবে অনেক উপরের দরের। আপনি বোধহয় বিশ্বাস করছেন না।

না।

আপনার সম্পর্কে একটা ভবিষ্যদ্বাণী করছি। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি হচ্ছে—আপনার জীবনটা কষ্টে কষ্টে কাটবে।

চমৎকার ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য ধন্যবাদ।

সতের বছর এই রকম কাটবে, তারপর আপনার বিবাহ হবে। যে কন্যাটির সঙ্গে বিবাহ হবে সে আপনার চেয়ে খুব কম করে হলেও কুড়ি বছরের ছোট।

আমি তীক্ষ্ণ চোখে ভোলাবাবুর দিকে তাকালাম।

ভোলাবাবু হাসি হাসি মুখে তাকালেন। নরম গলায় বললেন, সতের বছর পর বুঝবেন—ভোলাবাবু নকল জিনিস না।

আমি কিছুই বললাম না।

ভোলাবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন–

খেপার মতন কেন এ জীবন,
অর্থ কী তার, কোথা এ ভ্রমণ,
কে তুমি গোপনে চালাইছ মোরে
আমি যে তোমারে খুঁজি।

এই কবিতাটা কার লেখা বলুন তো? বলতে পারলেন না। আমিও জানি না। একবার শুনেছিলাম, মনে গেঁথে আছে। মানুষের মন বড়ই বিচিত্ৰ টুকু সাহেব। বড়ই বিচিত্র [WORDS:- 366]

Bengali to English Translation-page-6

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES 

সকালটা বেশ সুন্দর। ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। গাছগুলোর পাতা সব ধোওয়া, ঝকমকে সবুজ। আজও একটা ময়ূর এসে ডাকছে। পোষা হরিণগুলো ঘুরছে আপন মনে।

বারান্দায় বসেই চা খাওয়া হয়ে গেছে একটু আগে। এঁটো কাপ-ডিশগুলো পড়ে আছে টেবিলের ওপর। কাকাবাবু গেছেন বাথরুমে। ম্যানেজার নুরুলসাহেব গল্প করছেন সন্তুদের সঙ্গে।

নুরুলসাহেবের পাঁচ বছরের মেয়ে আমিনা খেলা করছে সামনে। সে ছুটে-ছুটে একটা প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছে। চার-পাঁচ রকমের রঙিন ফ্রক পরা মেয়েটি নিজেও যেন একটা প্রজাপতি।

একটা জিপগাড়ি এসে থামল বাগানের পাশে। তার থেকে নামল একটা গাঁট্টাগোট্টা লোক, এগিয়ে আসতে লাগল বাংলোর দিকে।

আমিনা প্রজাপতির দিকে চেয়ে-চেয়ে ছুটছে, অন্য কিছু দেখছে না, সেই লোকটার সঙ্গে তার ধাক্কা লেগে গেল বেশ জোরে।

এরকম ধাক্কা লাগলে যে-কোনও লোক ছোট মেয়েটিকে আদর করে কিংবা কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে যে তার লেগেছে কি না। কিন্তু এই লোকটা বিরক্তভাবে আমিনাকে জোরে ঠেলে দিল, সে আছড়ে পড়ল মাটিতে। কেঁদে উঠল সঙ্গে-সঙ্গে।

নুরুলসাহেব মেয়েকে ধরতে গেলেন না, লোকটিকেও কিছু বললেন না।

প্রচণ্ড রাগে সন্তুর মুখ-চোখ লাল হয়ে গেল। লোকটা আর একটু কাছে আসতেই সন্তু অন্য কিছু আর চিন্তা না করে ছুটে গিয়ে লোকটির মুখে খুব জোরে একটা ঘুসি কষাল।

লোকটা ধড়াম করে পড়ে গেল চিত হয়ে। এক ঘুসিতেই প্রায় অজ্ঞান। ঘুসিটা লেগেছে ঠিক নাকের ডগায়। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে।

নুরুলসাহেব আঁতকে উঠে বললেন, এ কী করলে ভাই? সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। ওকে মারলে?

সন্তু হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল, মারব না, নিশ্চয়ই মারব।

জোজো বলল, বেশ করেছে মেরেছে। ও না মারলে আমি নিজেই ওর মাথাটা একটা নারকোলের মতন ফাটিয়ে দিতাম।

জোজো ছুটে গিয়ে আমিনাকে মাটি থেকে তুলে নিল।

নুরুলসাহেব বললেন, ও লোকটা কতার সিং! তোমরা চেনো না। ঠাকুর সিংয়ের ডান হাত!

সন্তু বলল, ডান হাত, বাঁ হাত যাই-ই হোক, ওইটুকু একটা মেয়েকে মারলে শাস্তি দিতে হবে না?

নুরুলসাহেব ভয়ে আমসির মতন মুখ করে বললেন, ওদের চটালে আমি যে এখানে চাকরিই করতে পারব না। ওরা যা ইচ্ছে তাই-ই করে। শিকার করা নিষেধ, তবু জঙ্গলে গিয়ে হরিণ মারে, খরগোশ মারে। আমার এখানে খাবার নিতে আসে মাঝে-মাঝে। যক্ষুনি যা চাইবে, দিতে হবে সঙ্গে-সঙ্গে।

কতার সিং উঠে বসল আস্তে-আস্তে। জ্বলন্ত চোখে তাকাল সন্তুর দিকে। দাঁত কিড়মিড় করে কী যেন একটা খারাপ গালাগালি দিল।

সন্তু যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই রইল, সরল না এক চুলও।

কর্তার সিং উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কুত্তার বাচ্চা, তোকে জানে মেরে দেব।

সন্তু দুটো হাত মুঠি করে বুক আড়াল রেখে বলল, আও না, আও! তোমাকে আরও শিক্ষা দেব আমি।

সন্তুর তুলনায় কতার সিংয়ের শরীর অন্তত আড়াইগুণ বড়। সন্তুকে দেখলে মনেই হয় না তার গায়ে খুব জোর আছে। সে মাল-টাল ফোলায় না। প্যান্ট আর শার্ট পরা সাধারণ চেহারা। কিন্তু বক্সিং সে ভাল জানে।

কতার সিং বক্সিংটক্সিংয়ের ধার ধারে না। একটা ঘুসি খেয়েই সে সন্তুর মুঠোর ওজন বুঝে গেছে। সে আর ও লাইনে গেল না।

বাঁ হাত দিয়ে সে মুখের রক্ত মুছল। ডান হাতে ঝাঁ করে একটা ছুরি বার করল।

সন্তু তবু পালাল না। তার সিংয়ের চোখে চোখ রেখে পিছিয়ে গেল খানিকটা।

এই সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন কাকাবাবু। এরকম একটা আসন্ন লড়াইয়ের দৃশ্য দেখে হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, কী ব্যাপার, কী হয়েছে?

জোজো বলল, ওই লোকটা অমানুষ। বাচ্চা মেয়ে আমিনাকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। সন্তু রেগে গিয়ে ওর নাকে একটা ঘুসি মেরেছে বলে এখন ও ছুরি তুলেছে। কাওয়ার্ড কোথাকার! রোদ্দুরে কতার সিংয়ের স্থবির ফলাটা চকচক করে উঠল।

কাকাবাবু ইচ্ছে করলেই চট করে ঘর থেকে রিভলভারটা আনতে পারতেন। কিন্তু আনলেন না। নিজের একটা ক্রাচ সন্তুর দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, এটা ধর, সন্তু। লোকটাকে আচ্ছা করে পিটিয়ে দে।

সন্তু চট করে একটু ঘুরেই লুফে নিল ক্রাচটা। তারপর সেটা বনবন করে ঘোরাতে লাগল।

কতার সিং একটা ন ইঞ্চি ছুরি নিয়ে অত বড় ক্রাচের সঙ্গে কী করে লড়বে? সে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই সন্তু দমাস দমাস করে মারতে লাগল তার পিঠে, বুকে।

আমিনা কান্না ভুলে গিয়ে খলখল করে হাসতে লাগল তা দেখে।

দুবার কতার সিং ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। তারপর উঠেই সে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাবার চেষ্টা করল। সন্তু তাড়া করে গেল তাকে।

কাকাবাবু চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, মার, আরও মার দে, সন্তু। ওর এত সাহস, সকালবেলাতেই ছুরি বার করে এত লোকের সামনে?

কতার সিং কোনওক্রমে উঠে পড়ল জিপগাড়িতে। দুর্বোধ ভাষায় কী যেন শাসাল মুখ বার করে। তারপর হুস করে বেরিয়ে গেল জিপটা।

সন্তু ফিরে আসতেই কাকাবাবু তার কাঁধ চাপড়ে বললেন, বাঃ, ভাল লড়েছিস, সন্তু। বেশ করেছিস ওকে মেরেছিস।

নুরুলসাহেবের দিকে ফিরে বললেন, আপনার ওইটুকু মেয়েকে মারল, আপনি নিজে কিছু বললেন না?

নুরুলসাহেব বললেন, আমাকে এখানে চাকরি করতে হয়। পুলিশ পর্যন্ত ওঁদের ভয় পায়। এই যে কাণ্ডটা ঘটল, এর পর কী হয় কে জানে!

কাকাবাবু বললেন, এত ভয়ে-ভয়ে চাকরি করতে হবে? এর চেয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে না খেয়ে থাকাও ভাল। মানুষের আত্মসম্মান না থাকলে আর কী। রইল?

জোজো বলল, ওই লোকটা নিশ্চয়ই দলবল নিয়ে ফিরে আসবে।

কাকাবাবু বললেন, আসুক। দেখি ওদের মুরোদ। ঠাকুর সিং টের পেয়ে গেছে, আমি কে! তোরা এক কাজ কর তো জোজো। তুই আর সন্তু ওই যে চেকপোেস্টটা আছে, তার কাছে চলে যা। ওখান দিয়ে অনেক গাড়ি যায়। ঠা র সিং-এর গাড়ি কিংবা লোকজনেরাও যাবে নিশ্চয়ই। তোরা ওখানে অন্য লোকজনদের শুনিয়ে-শুনিয়ে গল্প কর যে কতার সিংকে কেমন মেরেছিস! সবাইকে বুঝিয়ে দে যে আমরা ভয় পাই না।

সন্তু আর জোজো মজা পেয়ে গেল। মহিমও যোগ দিল তাদের সঙ্গে। ওরা তিনজনে সেই চেকপোস্টের কাছে একটা কালভার্টে গিয়ে বসল।

একটা গাড়ি থামতেই জোজো হাসতে হাসতে বলল, ওই যে কর্তার সিং না কে একটা লোক এসেছিল, ঠাকুরুসিং-এর বাঁ হাত…

মহিম বলল, বাঁ হাত না, ডান হাত!

জোজো বলল, ডান হাত না ডান পা কে জানে! দেখতেই তাগড়া চেহারা, আসলে একটা ভা! একখানা ঘুসিতে কুপোকাত!

মহিম বলল, মটিতে পড়ে গিয়েই চ্যাঁচাতে লাগল, ঠাকুর সিং, বাঁচাও, বাঁচাও! কোথায় ঠাকুর সিং! সেও তো একটা মহাভিতু!

জোজো বলল, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি নামে সিনেমাটায় একটা গান ছিল জানিস!

তারপর সে গেয়ে উঠল, ভজন পূজন জানি না, মা, জেতেতে ফিরিঙ্গি…

থেমে গিয়ে বলল, এ গানটা না, আর-একটা গান আছে ঠাকুর সিং সম্পর্কে :

হয়ে ঠাকুর সিংয়ের বাপের জামাই
কোর্তা-টুপি ছেড়েছি।

মহিম হাসতেহাসতে বলল, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি এই ঠাকুর সিংয়ের কথা কী করে জানল?

জোজো বলল, ঠাকুর সিং নাকি খুব বীরপুরুষ। তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক যাত্রাদলের সেনাপতির মতন। কাকাবাবু মাত্র পাঁচ মিনিট লড়ে ওর হাত থেকে তলোয়ারটা উড়িয়ে দিলেন। তারপর থেকে আর ঠাকুর সিং কাকাবাবুর চোখের দিকে তাকাতেই সাহস পায়নি, লক্ষ করেছিলি?

সন্তু বলল, ঠাকুর সিংয়ের তো প্রাণ বেঁচে গেল কাকাবাবুর দয়ায়।

জোজো বলল, ভারী তো বীর! বনগাঁয়ে শিয়াল রাজা!

তিনজনে হোহো করে হেসে উঠল একসঙ্গে।

একটা গাড়ি থেমে চেকপোস্টে নম্বর লেখাচ্ছিল। দুজন লোক ওদের কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এল। একজন হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কার কথা বলছেন? কোন ঠাকুর সিং?

জোজো অবজ্ঞার সঙ্গে বলল, এই তো এখানকার ঠাকুর সিং। যার বাড়ির নাম রূপ মঞ্জিল। আমাদের কাকাবাবুর সঙ্গে লড়তে এসেছিল, হেরে ভূত হয়ে গেছে। [WORDS:-1044]

Bengali to English Translation-page-5

TRANSLATE WITHIN 15 MINUTES 

পরদিন আমার অনিচ্ছায় যাওয়া ঘটিয়া উঠিল না। কিন্তু পরের দিন আর ঠেকাইয়া রাখা গেল না, মুরারিপুর আখড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিতেই হইল। রাজলক্ষ্মীর বাহন রতন, সে নহিলে কোথাও পা বাড়ানো চলে না, কিন্তু রান্নাঘরের দাসী লালুর মাও সঙ্গে চলিল। কতক জিনিসপত্র লইয়া রতন ভোরের গাড়িতে রওনা হইয়া গিয়াছে, সেখানকার স্টেশনে নামিয়া সে খান-দুই ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করিয়া রাখিবে। আবার আমাদের সঙ্গেও মোটঘাট যাহা বাঁধা হইয়াছে তাহাও কম নয়।

প্রশ্ন করিলাম, সেখানে বসবাস করতে চললে না কি?

রাজলক্ষ্মী বলিল, দু’একদিন থাকব না? দেশের বনজঙ্গল, নদীনালা, মাঠঘাট তুমিই একলা দেখে আসবে, আর আমি কি সে-দেশের মেয়ে নই? আমার দেখতে সাধ যায় না?

তা যায় মানি, কিন্তু এত জিনিসপত্র, এত রকমের খাবার-দাবার আয়োজন—

রাজলক্ষ্মী বলিল, ঠাকুরের স্থানে কি শুধুহাতে যেতে বলো? আর তোমাকে ত বইতে হবে না, তোমার ভাবনা কিসের?

ভাবনা যে কত ছিল সে আর বলিব কাহাকে? আর এই ভয়টাই বেশি ছিল যে, বৈষ্ণব-বৈরাগীর ছোঁয়া ঠাকুরের প্রসাদ সে স্বচ্ছন্দে মাথায় তুলিবে, কিন্তু মুখে তুলিবে না। কি জানি সেখানে গিয়া কোন একটা ছলে উপবাস শুরু করিবে, না রাঁধিতে বসিবে বলা কঠিন। কেবল একটা ভরসা ছিল মনটি রাজলক্ষ্মীর সত্যকার ভদ্র মন। অকারণে গায়ে পড়িয়া কাহাকেও ব্যথা দিতে পারে না। যদিবা এ-সব কিছু করে, হাসিমুখে রহস্যে-কৌতুকে এমন করিয়াই করিবে যে আমি ও রতন ছাড়া আর কেহ বুঝিতেও পারিবে না।

রাজলক্ষ্মীর দৈহিক ব্যবস্থায় বাহুল্যভার কোনকালেই নাই, তাহাতে সংযম ও উপবাসে সেই দেহটাকে যেন লঘুতার একটি দীপ্তি দান করিয়াছে। বিশেষ করিয়া তাহার আজিকার সাজসজ্জাটি হইয়াছে বিচিত্র। প্রত্যূষে স্নান করিয়া আসিয়াছে, গঙ্গার ঘাটে উড়েপাণ্ডার সযত্ন-রচিত অলক-তিলক তাহার ললাটে, পরনে তেমনি নানা ফুলে-ফুলে লতায়-পাতায় বিচিত্র খয়ের রঙের বৃন্দাবনী শাড়ি, গায়ে সেই কয়টি অলঙ্কার, মুখের ‘পরে স্নিগ্ধ-প্রসন্নতা—আপন মনে কাজে ব্যাপৃত। কাল গোটা-দুই লম্বা আয়না-লাগানো আলমারি কিনিয়া আনিয়াছে, আজ যাইবার পূর্বে তাড়াতাড়ি করিয়া কি-সব তাহাতে সে গুছাইয়া তুলিতেছিল। কাজের সঙ্গে হাতের বালার হাঙ্গরের চোখ-দুটা মাঝে মাঝে জ্বলিয়া উঠিতেছে, হীরা ও পান্নাবসানো গলার হারের বিভিন্ন বর্ণচ্ছটা পাড়ের ফাঁক দিয়া ঝলকিয়া উঠিতেছে, তাহার কানের কাছেও কি যেন একটা নীলাভ দ্যুতি, টেবিলে চা খাইতে বসিয়া আমি একদৃষ্টে সেইদিকে চাহিয়া ছিলাম। তাহার একটা দোষ ছিল—বাড়িতে সে জামা অথবা সেমিজ পরিত না। তাই কণ্ঠ ও বাহুর অনেকখানি হয়ত অসতর্ক মুহূর্তে অনাবৃত হইয়া পড়িত, অথচ বলিলে হাসিয়া কহিত, অত পারিনে বাপু। পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, দিনরাত বিবিয়ানা আর সয় না। অর্থাৎ জামা-কাপড়ের বেশি বাঁধাবাঁধি শুচিবায়ুগ্রস্তদের অত্যন্ত অস্বস্তিকর।

আলমারির পাল্লা বন্ধ করিয়া হঠাৎ আয়নায় তাহার চোখ পড়িল আমার ‘পরে। তাড়াতাড়ি গায়ের কাপড় সামলাইয়া লইয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল, রাগিয়া বলিল, আবার চেয়ে আছ? এভাবে বারে বারে কি আমাকে এত দেখ বলো ত? বলিয়াই হাসিয়া ফেলিল।

আমি হাসিলাম, বলিলাম, ভাবছিলাম বিধাতাকে ফরমাশ দিয়ে না জানি কে তোমাকে গড়িয়েছিল।

রাজলক্ষ্মী কহিল, তুমি। নইলে এমন সৃষ্টিছাড়া পছন্দ আর কার? আমার পাঁচ-ছ’বছর আগে এসেচো, আসবার সময় তাঁকে বায়না দিয়ে এসেছিল—মনে নেই বুঝি?

না, কিন্তু তুমি জানলে কি করে?

চালান দেবার সময় কানে কানে তিনি বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু হ’লো চা খাওয়া? দেরি করলে যে আজও যাওয়া হবে না।

নাই বা হ’লো।

কেন বলো ত?

সেখানে ভিড়ের মধ্যে হয়ত তোমাকে খুঁজে পাব না।

রাজলক্ষ্মী কহিল, আমাকে পাবে। আমিই তোমাকে খুঁজে পেলে বাঁচি।

বলিলাম, সেও ত ভালো নয়।

সে হাসিয়া কহিল, না, সে হবে না। লক্ষ্মীটি চল। শুনেচি নতুনগোঁসাইয়ের সেখানে একটা আলাদা ঘর আছে, আমি গিয়েই তার খিলটা ভেঙ্গে রেখে দেব। ভয় নেই, খুঁজতে হবে না—দাসীকে এমনই পাবে।

তবে চলো।

আমরা মঠে গিয়া যখন উপস্থিত হইলাম তখন ঠাকুরের মধ্যাহ্নকালীন পূজা সেইমাত্র সমাপ্ত হইয়াছে। বিনা আহ্বানে, বিনা সংবাদে এতগুলি প্রাণী অকস্মাৎ গিয়া হাজির, তথাপি কি যে তাহারা খুশি হইল বলিতে পারি না। বড়গোঁসাই আশ্রমে নাই, গুরুদেবকে দেখিতে আবার নবদ্বীপে গিয়াছেন, কিন্তু ইতিমধ্যে জন-দুই বৈরাগী আসিয়া আমারই ঘরে আস্তানা গাড়িয়াছে। [WORDS:-563]

Bengali to English Translation-page-4

রাত্রে মহেন্দ্রের ভালো নিদ্রা হইল না। প্রত্যুষেই সে বিহারীর বাসায় আসিয়া উপস্থিত। কহিল, “ভাই, ভাবিয়া দেখিলাম, কাকীমার মনোগত ইচ্ছা আমিই তাঁহার বোনঝিকে বিবাহ করি।”
বিহারী কহিল, “সেজন্য তো হঠাৎ নূতন করিয়া ভাবিবার কোনো দরকার ছিল না। তিনি তো ইচ্ছা নানাপ্রকারেই ব্যক্ত করিয়াছেন।”
মহেন্দ্র কহিল, “তাই বলিতেছি, আমার মনে হয়, আশাকে আমি বিবাহ না করিলে তাঁহার মনে একটা খেদ থাকিয়া যাইবে।”
বিহারী কহিল, “সম্ভব বটে।”
মহেন্দ্র কহিল, “আমার মনে হয়, সেটা আমার পক্ষে নিতান্ত অন্যায় হইবে।”
বিহারী কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক উৎসাহের সহিত কহিল, “বেশ কথা, সে তো ভালো কথা, তুমি রাজি হইলে তো আর কোনো কথাই থাকে না। এ কর্তব্যবুদ্ধি কাল তোমার মাথায় আসিলেই তো ভালো হইত।”
মহেন্দ্র। একদিন দেরিতে আসিয়া কী এমন ক্ষতি হইল।
যেই বিবাহের প্রস্তাবে মহেন্দ্র মনকে লাগাম ছাড়িয়া দিল, সেই তাহার পক্ষে ধৈর্য রক্ষা করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল। তাহার মনে হইতে লাগিল, “আর অধিক কথাবার্তা না হইয়া কাজটা সম্পন্ন হইয়া গেলেই ভালো হয়।”
মাকে গিয়া কহিল, “আচ্ছা মা, তোমার অনুরোধ রাখিব। বিবাহ করিতে রাজি হইলাম।”
মা মনে মনে কহিলেন, “বুঝিয়াছি, সেদিন মেজোবউ কেন হঠাৎ তাহার বোনঝিকে দেখিতে চলিয়া গেল এবং মহেন্দ্র সাজিয়া বাহির হইল।”
তাঁহার বারংবার অনুরোধ অপেক্ষা অন্নপূর্ণার চক্রান্ত যে সফল হইল, ইহাতে তিনি সমস্ত বিশ্ববিধানের উপর অসন্তুষ্ট হইয়া উঠিলেন। বলিলেন, “একটি ভালো মেয়ে সন্ধান করিতেছি।”
মহেন্দ্র আশার উল্লেখ করিয়া কহিল, “কন্যা তো পাওয়া গেছে।”
রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে কন্যা হইবে না বাছা, তাহা আমি বলিয়া রাখিতেছি।”
মহেন্দ্র যথেষ্ট সংযত ভাষায় কহিল, “কেন মা, মেয়েটি তো মন্দ নয়।”
রাজলক্ষ্মী। তাহার তিন কুলে কেহ নাই, তাহার সহিত বিবাহ দিয়া আমার কুটুম্বের সুখ কী হইবে।
মহেন্দ্র। কুটুম্বের সুখ না হইলেও আমি দুঃখিত হইব না, কিন্তু মেয়েটিকে আমার বেশ পছন্দ হইয়াছে মা।
ছেলের জেদ দেখিয়া রাজলক্ষ্মীর চিত্ত আরো কঠিন হইয়া উঠিল। অন্নপূর্ণাকে গিয়া কহিলেন, “বাপ-মা মরা অলক্ষণা কন্যার সহিত আমার এক ছেলের বিবাহ দিয়া তুমি আমার ছেলেকে আমার কাছ হইতে ভাঙাইয়া লইতে চাও? এতবড়ো শয়তানি!”
অন্নপূর্ণা কাঁদিয়া কহিলেন, “মহিনের সঙ্গে বিবাহের কোনো কথাই হয় নাই, সে আপন ইচ্ছামত তোমাকে কী বলিয়াছে আমিও জানি না।”
মহেন্দ্রের মা সে কথা কিছুমাত্র বিশ্বাস করিলেন না। তখন অন্নপূর্ণা বিহারীকে ডাকাইয়া সাশ্রুনেত্রে কহিলেন, “তোমার সঙ্গেই তো সব ঠিক হইয়াছিল, আবার কেন উল্‌টাইয়া দিলে। আবার তোমাকেই মত দিতে হইবে। তুমি উদ্ধার না করিলে আমাকে বড়ো লজ্জায় পড়িতে হইবে। মেয়েটি বড়ো লক্ষ্মী, তোমার অযোগ্য হইবে না।”

বিহারী কহিল, “কাকীমা, সে কথা আমাকে বলা বাহুল্য। তোমার বোনঝি যখন, তখন আমার অমতের কোনো কথাই নাই। কিন্তু মহেন্দ্র–”
অন্নপূর্ণা কহিলেন, “না বাছা, মহেন্দ্রের সঙ্গে তাহার কোনোমতেই বিবাহ হইবার নয়। আমি তোমাকে সত্য কথাই বলিতেছি, তোমার সঙ্গে বিবাহ হইলেই আমি সব চেয়ে নিশ্চিন্ত হই। মহিনের সঙ্গে সম্বন্ধে আমার মত নাই।”
বিহারী কহিল, “কাকী, তোমার যদি মত না থাকে, তাহা হইলে কোনো কথাই নাই।”
এই বলিয়া সে রাজলক্ষ্মীর নিকটে গিয়া কহিল,
”মা, কাকীর বোনঝির সঙ্গে আমার বিবাহ স্থির হইয়া গেছে, আত্মীয় স্ত্রীলোক কেহ কাছে নাই–কাজেই লজ্জার মাথা খাইয়াা নিজেই খবরটা দিতে হইল।”
রাজলক্ষ্মী। বলিস কী বিহারী। বড়ো খুশি হইলাম। মেয়েটি লক্ষ্মী মেয়ে, তোর উপযুক্ত। এ মেয়ে কিছুতেই হাতছাড়া করিস নে।
বিহারী। হাতছাড়া কেন হইবে। মহিনদা নিজে পছন্দ করিয়া আমার সঙ্গে সম্বন্ধ করিয়া দিয়াছেন।
এই-সকল বাধাবিঘ্নে মহেন্দ্র দ্বিগুণ উত্তেজিত হইয়া উঠিল। সে মা ও কাকীর উপর রাগ করিয়া একটা দীনহীন ছাত্রাবাসে গিয়া আশ্রয় লইল।
রাজলক্ষ্মী কাঁদিয়া অন্নপূর্ণার ঘরে উপস্থিত হইলেন; কহিলেন, “মেজোবউ, আমার ছেলে বুঝি উদাস হইয়া ঘর ছাড়িল, তাহাকে রক্ষা করো।”
অন্নপূর্ণা কহিলেন, “দিদি, একটু ধৈর্য ধরিয়া থাকো, দুদিন বাদেই তাহার রাগ পড়িয়া যাইবে।”
রাজলক্ষ্মী কহিলেন,
“তুমি তাহাকে জান না। সে যাহা চায়, না পাইলে যাহা-খুশি করিতে পারে। তোমার বোনঝির সঙ্গে যেমন করিয়া হউক, তার–”
অন্নপূর্ণা। দিদি, সে কী করিয়া হয়–বিহারীর সঙ্গে কথাবার্তা একপ্রকার পাকা হইয়াছে।
রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে ভাঙিতে কতক্ষণ।” বলিয়া বিহারীকে ডাকিয়া কহিলেন,
”বাবা, তোমার জন্য ভালো পাত্রী দেখিয়া দিতেছি, এই কন্যাটি ছাড়িয়া দিতে হইবে, এ তোমার যোগ্যই নয়।”
বিহারী কহিল, “না মা, সে হয় না। সে-সমস্তই ঠিক হইয়া গেছে।”

তখন রাজলক্ষ্মী অন্নপূর্ণাকে গিয়া কহিলেন, “আমার মাথা খাও মেজোবউ, তোমার পায়ে ধরি, তুমি বিহারীকে বলিলেই সব ঠিক হইবে।”
অন্নপূর্ণা বিহারীকে কহিলেন, “বিহারী, তোমাকে বলিতে আমার মুখ সরিতেছে না, কিন্তু কী করি বলো। আশা তোমার হাতে পড়িলেই আমি বড়ো নিশ্চিন্ত হইতাম, কিন্তু সব তো জানিতেছই–”
বিহারী। বুঝিয়াছি কাকী। তুমি যেমন আদেশ করিবে, তাহাই হইবে। কিন্তু আমাকে আর কখনো কাহারো সঙ্গে বিবাহের জন্য অনুরোধ করিয়ো না।
বলিয়া বিহারী চলিয়া গেল। অন্নপূর্ণার চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল, মহেন্দ্রের অকল্যাণ-আশঙ্কায় মুছিয়া ফেলিলেন। বার বার মনকে বুঝাইলেন-যাহা হইল, তাহা ভালোই হইল।
এইরূপ রাজলক্ষ্মী অন্নপূর্ণা এবং মহেন্দ্রের মধ্যে নিষ্ঠুর নিগূঢ় নীরব ঘাত-প্রতিঘাত চলিতে চলিতে বিবাহের দিন সমাগত হইল। বাতি উজ্জ্বল হইয়া জ্বলিল, সানাই মধুর হইয়া বাজিল, মিষ্টান্নে মিষ্টের ভাগ লেশমাত্র কম পড়িল না।
আশা সজ্জিতসুন্দরদেহে লজ্জিতমুগ্ধমুখে আপন নূতন সংসারে প্রথম পদার্পণ করিল; তাহার এই কুলায়ের মধ্যে কোথাও যে কোনো কণ্টক আছে, তাহা তাহার কম্পিত-কোমল হৃদয় অনুভব করিল না; বরঞ্চ জগতে তাহার একমাত্র মাতৃস্থানীয়া অন্নপূর্ণার কাছে আসিতেছে বলিয়া আশ্বাসে ও আনন্দে তাহার সর্বপ্রকার ভয় সংশয় দূর হইয়া গেল।
বিবাহের পর রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রকে ডাকিয়া কহিলেন, “আমি বলি, এখন বউমা কিছুদিন তাঁর জেঠার বাড়ি গিয়াই থাকুন।”
মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “কেন মা।”
মা কহিলেন, “এবারে তোমার এক্‌জামিন আছে, পড়াশুনার ব্যাঘাত হইতে পারে।”
মহেন্দ্র। আমি কি ছেলেমানুষ। নিজের ভালোমন্দ বুঝে চলিতে পারি না?
রাজলক্ষ্মী। তা হোক-না বাপু, আর-একটা বৎসর বৈ তো নয়।
মহেন্দ্র কহিল, “বউয়ের বাপ-মা যদি কেহ থাকিতেন, তাহাদের কাছে পাঠাইতে আপত্তি ছিল না-কিন্তু জেঠার বাড়িতে আমি উহাকে রাখিতে পারিব না।”
রাজলক্ষ্মী। (আত্মগত) ওরে বাস্‌ রে! উনিই কর্তা, শাশুড়ি কেহ নয়! কাল বিয়ে করিয়া আজই এত দরদ! কর্তারা তো আমাদেরও একদিন বিবাহ করিয়াছিলেন, কিন্তু এমন সৈত্রণতা, এমন বেহায়াপনা তো তখন ছিল না!
মহেন্দ্র খুব জোরের সহিত কহিল, “কিছু ভাবিয়ো না মা। একজামিনের কোনো ক্ষতি হইবে না।” [WORDS:- 879]

Bengali to English Translation-page-3

TRANSLATE WITHIN 20 MINUTES 

শ্রাবণ মাসের সকালবেলায় মেঘ কাটিয়া গিয়া নির্মল রৌদ্রে কলিকাতার আকাশ ভরিয়া গিয়াছে। রাস্তায় গাড়িঘোড়ার বিরাম নাই, ফেরিওয়ালা অবিশ্রাম হাঁকিয়া চলিয়াছে, যাহারা আপিসে কালেজে আদালতে যাইবে তাহাদের জন্য বাসায় বাসায় মাছ-তরকারির চুপড়ি আসিয়াছে ও রান্নাঘরে উনান জ্বালাইবার ধোঁওয়া উঠিয়াছে–কিন্তু তবু এত বড়ো এই-যে কাজের শহর কঠিন হৃদয় কলিকাতা, ইহার শত শত রাস্তা এবং গলির ভিতরে সোনার আলোকের ধারা আজ যেন একটা অপূর্ব যৌবনের প্রবাহ বহিয়া লইয়া চলিয়াছে।

এমন দিনে বিনা-কাজের অবকাশে বিনয়ভূষণ তাহার বাসার দোতলার বারান্দায় একলা দাঁড়াইয়া রাস্তায় জনতার চলাচল দেখিতেছিল। কালেজের পড়াও অনেক দিন চুকিয়া গেছে, অথচ সংসারের মধ্যেও প্রবেশ করে নাই, বিনয়ের অবস্থাটা এইরূপ। সভাসমিতি চালানো এবং খবরের কাগজ লেখায় মন দিয়াছে– কিন্তু তাহাতে সব মনটা ভরিয়া উঠে নাই। অন্তত আজ সকালবেলায় কী করিবে তাহা ভাবিয়া না পাইয়া তাহার মনটা চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল। পাশের বাড়ির ছাতের উপরে গোটা-তিনেক কাক কী লইয়া ডাকাডাকি করিতেছিল এবং চড়ুই-দম্পতি তাহার বারান্দার এক কোণে বাসা-নির্মাণ-ব্যাপারে পরস্পরকে কিচিমিচি শব্দে উৎসাহ দিতেছিল– সেই সমস্ত অব্যক্ত কাকলি বিনয়ের মনের মধ্যে একটা কোন্‌ অস্পষ্ট ভাবাবেগকে জাগাইয়া তুলিতেছিল।

আলখাল্লা-পরা একটা বাউল নিকটে দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া গান গাহিতে লাগিল–

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়

বিনয়ের ইচ্ছা করিতে লাগিল বাউলকে ডাকিয়া এই অচিন পাখির গানটা লিখিয়া লয়, কিন্তু ভোর-রাত্রে যেমন শীত-শীত করে অথচ গায়ের কাপড়টা টানিয়া লইতে উদ্যম থাকে না, তেমনি একটা আলস্যের ভাবে বাউলকে ডাকা হইল না, গান লেখাও হইল না, কেবল ঐ অচেনা পাখির সুরটা মনের মধ্যে গুন্‌ গুন্‌ করিতে লাগিল।

এমন সময় ঠিক তাহার বাসার সামনেই একটা ঠিকাগাড়ির উপরে একটা মস্ত জুড়িগাড়ি আসিয়া পড়িল এবং ঠিকাগাড়ির একটা চাকা ভাঙিয়া দিয়া দৃকপাত না করিয়া বেগে চলিয়া গেল। ঠিকাগাড়িটা সম্পূর্ণ উল্‌টাইয়া না পড়িয়া এক পাশে কাত হইয়া পড়িল।

বিনয় তাড়াতাড়ি রাস্তায় বাহির হইয়া দেখিল গাড়ি হইতে একটি সতেরো-আঠারো বৎসরের মেয়ে নামিয়া পড়িয়াছে, এবং ভিতর হইতে একজন বৃদ্ধগোছের ভদ্রলোক নামিবার উপক্রম করিতেছেন।

বিনয় তাঁহাকে ধরাধরি করিয়া নামাইয়া দিল, এবং তাঁহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেছে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার লাগে নি তো?”

তিনি “না, কিছু হয় নি” বলিয়া হাসিবার চেষ্টা করিলেন, সে হাসি তখনই মিলাইয়া গেল এবং তিনি মূর্ছিত হইয়া পড়িবার উপক্রম করিলেন। বিনয় তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিল ও উৎকণ্ঠিত মেয়েটিকে কহিল, “এই সামনেই আমার বাড়ি; ভিতরে চলুন।”

বৃদ্ধকে বিছানায় শোওয়ানো হইলে মেয়েটি চারি দিকে তাকাইয়া দেখিল ঘরের কোণে একটি জলের কুঁজা আছে। তখনই সেই কুঁজার জল গেলাসে করিয়া লইয়া বৃদ্ধের মুখে ছিটা দিয়া বাতাস করিতে লাগিল এবং বিনয়কে কহিল, “একজন ডাক্তার ডাকলে হয় না?”

বাড়ির কাছেই ডাক্তার ছিল। বিনয় তাঁহাকে ডাকিয়া আনিতে বেহারা পাঠাইয়া দিল।

ঘরের এক পাশে টেবিলের উপরে একটা আয়না, তেলের শিশি ও চুল আঁচড়াইবার সরঞ্জাম ছিল। বিনয় সেই মেয়েটির পিছনে দাঁড়াইয়া সেই আয়নার দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিল।

বিনয় ছেলেবেলা হইতেই কলিকাতার বাসায় থাকিয়া পড়াশুনা করিয়াছে। সংসারের সঙ্গে তাহার যাহা-কিছু পরিচয় সে-সমস্তই বইয়ের ভিতর দিয়া। নিঃসম্পর্কীয়া ভদ্রস্ত্রীলোকের সঙ্গে তাহার কোনোদিন কোনো পরিচয় হয় নাই।

আয়নার দিকে চাহিয়া দেখিল, যে মুখের ছায়া পড়িয়াছে সে কী সুন্দর মুখ! মুখের প্রত্যেক রেখা আলাদা করিয়া দেখিবার মতো তাহার চোখের অভিজ্ঞতা ছিল না। কেবল সেই উদ্‌বিগ্ন স্নেহে আনত তরুণ মুখের কোমলতামণ্ডিত উজ্জ্বলতা বিনয়ের চোখে সৃষ্টির সদ্যঃপ্রকাশিত একটি নূতন বিস্ময়ের মতো ঠেকিল।

একটু পরে বৃদ্ধ অল্পে অল্পে চক্ষু মেলিয়া “মা” বলিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন। মেয়েটি তখন দুই চক্ষু ছলছল করিয়া বৃদ্ধের মুখের কাছে মুখ নিচু করিয়া আর্দ্রস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “বাবা, তোমার কোথায় লেগেছে?”

“এ আমি কোথায় এসেছি” বলিয়া বৃদ্ধ উঠিয়া বসিবার উপক্রম করিতেই বিনয় সম্মুখে আসিয়া কহিল, “উঠবেন না– একটু বিশ্রাম করুন, ডাক্তার আসছে।”

তখন তাঁহার সব কথা মনে পড়িল ও তিনি কহিলেন, “মাথার এইখানটায় একটু বেদনা বোধ হচ্ছে, কিন্তু গুরুতর কিছুই নয়।”

সেই মুহূর্তেই ডাক্তার জুতা মচ্‌ মচ্‌ করিতে করিতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন; তিনিও বলিলেন, “বিশেষ কিছুই নয়।” একটু গরম দুধ দিয়া অল্প ব্রাণ্ডি খাইবার ব্যবস্থা করিয়া ডাক্তার চলিয়া যাইতেই বৃদ্ধ অত্যন্ত সংকুচিত ও ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার মেয়ে তাঁহার মনের ভাব বুঝিয়া কহিল, “বাবা, ব্যস্ত হচ্ছ কেন? ডাক্তারের ভিজিট ও ওষুধের দাম বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেব।”

বলিয়া সে বিনয়ের মুখের দিকে চাহিল।

সে কী আশ্চর্য চক্ষু! সে চক্ষু বড়ো কি ছোটো, কালো কি কটা সে তর্ক মনেই আসে না– প্রথম নজরেই মনে হয়, এই দৃষ্টির একটা অসন্দিগ্ধ প্রভাব আছে। তাহাতে সংকোচ নাই, দ্বিধা নাই, তাহা একটা স্থির শক্তিতে পূর্ণ।

বিনয় বলিতে চেষ্টা করিল, “ভিজিট অতি সামান্য, সেজন্যে– সে আপনারা– সে আমি–”

মেয়েটি তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকাতে কথাটা ঠিকমত শেষ করিতেই পারিল না। কিন্তু ভিজিটের টাকাটা যে তাহাকে লইতেই হইবে সে সম্বন্ধে কোনো সংশয় রহিল না।

বৃদ্ধ কহিলেন, “দেখুন, আমার জন্যে ব্রাণ্ডির দরকার নেই–”

কন্যা তাঁহাকে বাধা দিয়া কহিল, “কেন বাবা, ডাক্তারবাবু যে বলে গেলেন।”

বৃদ্ধ কহিলেন, “ডাক্তাররা অমন বলে থাকে, ওটা ওদের একটা কুসংস্কার। আমার যেটুকু দুর্বলতা আছে একটু গরম দুধ খেলেই যাবে।”

দুধ খাইয়া বল পাইলে বৃদ্ধ বিনয়কে কহিলেন, “এবারে আমরা যাই। আপনাকে বড়ো কষ্ট দিলুম।”

মেয়েটি বিনয়ের মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “একটা গাড়ি–”

বৃদ্ধ সংকুচিত হইয়া কহিলেন, “আবার কেন ওঁকে ব্যস্ত করা? আমাদের বাসা তো কাছেই, এটুকু হেঁটেই যাব।”

মেয়েটি বলিল, “না বাবা, সে হতে পারে না।”

বৃদ্ধ ইহার উপর কোনো কথা কহিলেন না এবং বিনয় নিজে গিয়া গাড়ি ডাকিয়া আনিল। গাড়িতে উঠিবার পূর্বে বৃদ্ধ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার নামটি কী?”

বিনয়। আমার নাম বিনয়ভূষণ চট্টোপাধ্যায়।

বৃদ্ধ কহিলেন, “আমার নাম পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। নিকটেই ৭৮ নম্বর বাড়িতে থাকি। কখনো অবকাশমত যদি আমাদের ওখানে যান তো বড়ো খুশি হব।”

মেয়েটি বিনয়ের মুখের দিকে দুই চোখ তুলিয়া নীরবে এই অনুরোধের সমর্থন করিল। বিনয় তখনই সেই গাড়িতে উঠিয়া তাঁহাদের বাড়িতে যাইতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু সেটা ঠিক শিষ্টাচার হইবে কি না ভাবিয়া না পাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। গাড়ি ছাড়িবার সময় মেয়েটি বিনয়কে ছোটো একটি নমস্কার করিল। এই নমস্কারের জন্য বিনয় একেবারেই প্রস্তুত ছিল না, এইজন্য হতবুদ্ধি হইয়া সে প্রতিনমস্কার করিতে পারিল না। এইটুকু ত্রুটি লইয়া বাড়িতে ফিরিয়া সে নিজেকে বার বার ধিক্‌কার দিতে লাগিল। ইঁহাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইতে বিদায় হওয়া পর্যন্ত নিজের আচরণ সমস্তটা আলোচনা করিয়া দেখিল; মনে হইল, আগাগোড়া তাহার সমস্ত ব্যবহারেই অসভ্যতা প্রকাশ পাইয়াছে। কোন্‌ কোন্‌ সময়ে কী করা উচিত ছিল, কী বলা উচিত ছিল, তাহা লইয়া মনে মনে কেবলই বৃথা আন্দোলন করিতে লাগিল। ঘরে ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, যে রুমাল দিয়া মেয়েটি তাহার বাপের মুখ মুছাইয়া দিয়াছিল সেই রুমালটি বিছানার উপর পড়িয়া আছে– সেটা তাড়াতাড়ি তুলিয়া লইল। তাহার মনের মধ্যে বাউলের সুরে ঐ গানটা বাজিতে লাগিল–

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়।

বেলা বাড়িয়া চলিল, বর্ষার রৌদ্র প্রখর হইয়া উঠিল, গাড়ির স্রোত আপিসের দিকে বেগে ছুটিতে লাগিল, বিনয় তাহার দিনের কোনো কাজেই মন দিতে পারিল না। এমন অপূর্ব আনন্দের সঙ্গে এমন নিবিড় বেদনা তাহার বয়সে কখনো সে ভোগ করে নাই। তাহার এই ক্ষুদ্র বাসা এবং চারি দিকের কুৎসিত কলিকাতা মায়াপুরীর মতো হইয়া উঠিল; যে রাজ্যে অসম্ভব সম্ভব হয়, অসাধ্য সিদ্ধ হয় এবং অপরূপ রূপ লইয়া দেখা দেয়, বিনয় যেন সেই নিয়ম-ছাড়া রাজ্যে ফিরিতেছে। এই বর্ষাপ্রভাতের রৌদ্রের দীপ্ত আভা তাহার মস্তিষ্কের মধ্যে প্রবেশ করিল, তাহার রক্তের মধ্যে প্রবাহিত হইল, তাহার অন্তঃকরণের সম্মুখে একটা জ্যোতির্ময় যবনিকার মতো পড়িয়া প্রতিদিনের জীবনের সমস্ত তুচ্ছতাকে একেবারে আড়াল করিয়া দিল। বিনয়ের ইচ্ছা করিতে লাগিল নিজের পরিপূর্ণতাকে আশ্চর্যরূপে প্রকাশ করিয়া দেয়, কিন্তু তাহার কোনো উপায় না পাইয়া তাহার চিত্ত পীড়িত হইতে লাগিল। অত্যন্ত সামান্য লোকের মতোই সে আপনার পরিচয় দিয়াছে– তাহার বাসাটা অত্যন্ত তুচ্ছ, জিনিসপত্র নিতান্ত এলোমেলো, বিছানাটা পরিষ্কার নয়, কোনো-কোনো দিন তাহার ঘরে সে ফুলের তোড়া সাজাইয়া রাখে, কিন্তু এমনি দুর্ভাগ্য– সেদিন তাহার ঘরে একটা ফুলের পাপড়িও ছিল না। সকলেই বলে বিনয় সভাস্থলে মুখে মুখে যেরূপ সুন্দর বক্তৃতা করিতে পারে কালে সে একজন মস্ত বক্তা হইয়া উঠিবে, কিন্তু সেদিন সে এমন একটা কথাও বলে নাই যাহাতে তাহার বুদ্ধির কিছুমাত্র প্রমাণ হয়। তাহার কেবলই মনে হইতে লাগিল, “যদি এমন হইতে পারিত যে সেই বড়ো গাড়িটা যখন তাঁহাদের গাড়ির উপর আসিয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছে আমি বিদ্যুদ্‌বেগে রাস্তার মাঝখানে আসিয়া অতি অনায়াসে সেই উদ্দাম জুড়িঘোড়ার লাগাম ধরিয়া থামাইয়া দিতাম!’ নিজের সেই কাল্পনিক বিক্রমের ছবি যখন তাহার মনের মধ্যে জাগ্রত হইয়া উঠিল তখন একবার আয়নায় নিজের চেহারা না দেখিয়া থাকিতে পারিল না।

এমন সময় দেখিল একটি সাত-আট বছরের ছেলে রাস্তায় দাঁড়াইয়া তাহার বাড়ির নম্বর দেখিতেছে। বিনয় উপর হইতে বলিল, “এই-যে, এই বাড়িই বটে।” ছেলেটি যে তাহারই বাড়ির নম্বর খুঁজিতেছিল সে সম্বন্ধে তাহার মনে সন্দেহমাত্র হয় নাই। তাড়াতাড়ি বিনয় সিঁড়ির উপর চটিজুতা চট্‌ চট্‌ করিতে করিতে নীচে নামিয়া গেল– অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে ছেলেটিকে ঘরের মধ্যে লইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিল।

সে কহিল, “দিদি আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে।”

এই বলিয়া বিনয়ভূষণের হাতে এক পত্র দিল।

বিনয় চিঠিখানা লইয়া প্রথমে লেফাফার উপরটাতে দেখিল, পরিষ্কার মেয়েলি ছাঁদের ইংরেজি অক্ষরে তাহার নাম লেখা। ভিতরে চিঠিপত্র কিছুই নাই, কেবলই কয়েকটি টাকা আছে।

ছেলেটি চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেই বিনয় তাহাকে কোনোমতেই ছাড়িয়া দিল না। তাহার গলা ধরিয়া তাহাকে দোতলার ঘরে লইয়া গেল।

ছেলেটির রঙ তাহার দিদির চেয়ে কালো, কিন্তু মুখের ছাঁদে কতকটা সাদৃশ্য আছে। তাহাকে দেখিয়া বিনয়ের মনে ভারি একটা স্নেহ এবং আনন্দ জন্মিল।

ছেলেটি বেশ সপ্রতিভ। সে ঘরে ঢুকিয়া দেয়ালে একটা ছবি দেখিয়াই জিজ্ঞাসা করিল, “এ কার ছবি?”

বিনয় কহিল, “এ আমার একজন বন্ধুর ছবি।”

ছেলেটি জিজ্ঞাসা করিল, “বন্ধুর ছবি? আপনার বন্ধু কে?”

বিনয় হাসিয়া কহিল, “তুমি তাঁকে চিনবে না। আমার বন্ধু গৌরমোহন, তাঁকে গোরা বলি। আমরা ছেলেবেলা থেকে একসঙ্গে পড়েছি।”

“এখনো পড়েন?”

“না, এখন আর পড়ি নে।”

“আপনার স–ব পড়া হয়ে গেছে?”

বিনয় এই ছোটো ছেলেটির কাছেও গর্ব করিবার প্রলোভন সম্বরণ করিতে না পারিয়া কহিল, “হাঁ সব পড়া হয়ে গেছে।”

ছেলেটি বিস্মিত হইয়া একটু নিশ্বাস ফেলিল। সে বোধ হয় ভাবিল, এত বিদ্যা সেও কত দিনে শেষ করিতে পারিবে।

বিনয়। তোমার নাম কী?

“আমার নাম শ্রীসতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।”

বিনয় বিস্মিত হইয়া কহিল, “মুখোপাধ্যায়?”

তাহার পরে একটু একটু করিয়া পরিচয় পাওয়া গেল। পরেশবাবু ইহাদের পিতা নহেন– তিনি ইহাদের দুই ভাইবোনকে ছেলেবেলা হইতে পালন করিয়াছেন। ইহার দিদির নাম আগে ছিল রাধারানী– পরেশবাবুর স্ত্রী তাহা পরিবর্তন করিয়া “সুচরিতা’ নাম রাখিয়াছেন।

দেখিতে দেখিতে বিনয়ের সঙ্গে সতীশের খুব ভাব হইয়া গেল। সতীশ যখন বাড়ি যাইতে উদ্যত হইল বিনয় কহিল, “তুমি একলা যেতে পারবে?”

সে গর্ব করিয়া কহিল, “আমি তো একলা যাই!”

বিনয় কহিল, “আমি তোমাকে পৌঁছে দিই গে।”

তাহার শক্তির প্রতি বিনয়ের এই সন্দেহ দেখিয়া সতীশ ক্ষুব্ধ হইয়া কহিল, “কেন, আমি তো একলা যেতে পারি।” এই বলিয়া তাহার একলা যাতায়াতের অনেকগুলি বিস্ময়কর দৃষ্টান্তের সে উল্লেখ করিতে লাগিল। কিন্তু তবু যে বিনয় কেন তাহার বাড়ির দ্বার পর্যন্ত তাহার সঙ্গে গেল তাহার ঠিক কারণটি বালক বুঝিতে পারিল না।

সতীশ জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি ভিতরে আসবেন না?”

বিনয় সমস্ত মনকে দমন করিয়া কহিল, “আর-এক দিন আসব।”

বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া বিনয় সেই শিরোনামা-লেখা লেফাফা পকেট হইতে বাহির করিয়া অনেকক্ষণ দেখিল– প্রত্যেক অক্ষরের টান ও ছাঁদ একরকম মুখস্থ হইয়া গেল– তার পরে টাকা-সমেত সেই লেফাফা বাক্সের মধ্যে যত্ন করিয়া রাখিয়া দিল। এ কয়টা টাকা যে কোনো দুঃসময়ে খরচ করিবে এমন সম্ভাবনা রহিল না। [WORDS 1660]

Bengali to English Translation-page-2

PAGE :- 1 – 2 – – 4 – 5 – – 7 – – – 10 – 11 – 12 13 –14 – 15 – 16 – 17 – 18 – 19 – 20 – 21 
TRANSLATE WITHIN 15 MINITES 

১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে এক দিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রামখানি গৃহময়, কিন্তু লোক দেখি না। বাজারে সারি সারি দোকান, হাটে সারি সারি চালা, পল্লীতে পল্লীতে শত শত মৃন্ময় গৃহ, মধ্যে মধ্যে উচ্চ নীচ অট্টালিকা। আজ সব নীরব। বাজারে দোকান বন্ধ, দোকানদার কোথায় পলাইয়াছে ঠিকানা নাই। আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে, দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে, অধ্যাপকে টোল বন্ধ করিয়াছে; শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, কেবল শ্মশানে শৃগাল-কুক্কুর। এক বৃহৎ অট্টালিকা – তাহার বড় বড় ছড়ওয়ালা থাম দূর হইতে দেখা যায় – সেই গুহারণ্যমধ্যে শৈলশিখরবৎ শোভা পাইতেছিল। শোভাই বা কি, তাহার দ্বার রুদ্ধ, গৃহ মনুষ্যসমাগমশূন্য, শব্দহীন বায়ুপ্রবেশের পক্ষেও বিঘ্নময়। তাহার অভ্যন্তরে ঘরের ভিতর মধ্যাহ্নে অন্ধকার, অন্ধকারে নিশীথফুল্লকুসুমযুগলবৎ এক দম্পতি বসিয়া ভাবিতেছে। তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।

১১৭৪ সালে ফসল ভাল হয় নাই, সুতরাং ১১৭৫ সালে চাল কিছু মহার্ঘ হইল – লোকের ক্লেশ হইল, কিন্তু রাজা রাজস্ব কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়া লইল। রাজস্ব কড়ায় গণ্ডায় বুঝাইয়া দিয়া দরিদ্রেরা এক সন্ধ্যা আহার করিল। ১১৭৫ সালে চাল বর্ষাকালে বেশ বৃষ্টি হইল। লোকে ভাবিল, দেবতা বুঝি কৃপা করিলেন। আনন্দে আবার রাখাল মাঠে গান গায়িল, কৃষকপত্নী আবার রূপার পেঁচার জন্য স্বামীর কাছে দৌরাত্ম্য আরম্ভ করিল। অকস্মাৎ আশ্বিন মাসে দেবতা বিমুখ হইলেন। আশ্বিনে কার্ত্তিকে বিন্দুমাত্র বৃষ্টি পড়িল না, মাঠে ধান্যসকল শুকাইয়া একেবারে খড় হইয়া গেল, যাহার দুই এক কাহন ফলিয়াছিল, রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহীর জন্য কিনিয়া রাখিলেন। লোকে আর খাইতে পাইল না। প্রথমে এক সন্ধ্যা উপবাস করিল, তার পর এক সন্ধ্যা আধপেটা করিয়া খাইতে লাগিল, তার পর দুই সন্ধ্যা উপবাস আরম্ভ করিল। যে কিছু চৈত্র ফসল হইল, কাহারও মুখে তাহা কুলাইল না। কিন্তু মহম্মদ রেজা খাঁ রাজস্ব আদায়ের কর্ত্তা, মনে করিল, আমি এই সময়ে সরফরাজ হইব। একেবারে শতকরা দশ টাকা রাজস্ব বাড়াইয়া দিল। বাঙ্গালায় বড় কান্নার কোলাহল পড়িয়া গেল।

লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল, তার পরে কে ভিক্ষা দেয়! – উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তার পরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল। গোরু বেচিল, লাঙ্গল, জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ী বেচিল। জোত জমা বেচিল। তার পর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী কে কিনে? খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল। ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।

রোগ সময় পাইল, জ্বর, ওলাউঠা, ক্ষয়, বসন্ত। বিশেষতঃ বসন্তের বড় প্রাদুর্ভাব হইল। গৃহে গৃহে বসন্তে মরিতে লাগিল। কে কাহাকে জল দেয়, কে কাহাকে স্পর্শ করে। কেহ কাহার চিকিৎসা করে না; কেহ কাহাকে দেখে না; মরিলে কেহ ফেলে না। অতি রমণীয় বপু অট্টালিকার মধ্যে আপনা আপনি পচে। যে গৃহে একবার বসন্ত প্রবেশ করে, সে গৃহবাসীরা রোগী ফেলিয়া ভয়ে পলায়।

মহেন্দ্র সিংহ পদচিহ্ন গ্রামে বড় ধনবান্‌ – কিন্তু আজ ধনী নির্ধনের এক দর। এই দুঃখপূর্ণ কালে ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া তাঁহার আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী সকলেই গিয়াছে। কেহ মরিয়াছে, কেহ পলাইয়াছে। সেই বহুপরিবারমধ্যে এখন তাঁহার ভার্য্যা ও তিনি স্বয়ং আর এক শিশুকন্যা। তাঁহাদেরই কথা বলিতেছিলাম।

তাঁহার ভার্য্যা কল্যাণী চিন্তা ত্যাগ করিয়া, গো-শালে গিয়া স্বয়ং গো-দোহন করিলেন। পরে দুগ্ধ তপ্ত করিয়া কন্যাকে খাওয়াইয়া গোরুকে ঘাস-জল দিতে গেলেন। ফিরিয়া আসিলে, “এরূপে কদিন চলিবে?”

কল্যাণী বলিল, “বড় অধিক দিন নয়। যত দিন চলে; আমি যত দিন পারি চালাই, তার পর তুমি মেয়েটি লইয়া সহরে যাইও।”

মহেন্দ্র । সহরে যদি যাইতে হয়, তবে তোমায় বা কেন এত দুঃখ দিই। চল না এখনই যাই। পরে দুই জনে অনেক তর্ক বিতর্ক হইল।

ক । সহরে গেলে বিশেষ কিছু উপকার হইবে কি?

ম । সে স্থান হয়ত এমনি জনশূন্য, প্রাণরক্ষার উপায়শূন্য হইয়াছে।

ক । মুরশিদাবাদ, কাশিমবাজার বা কলিকাতায় গেলে প্রাণরক্ষা হইতে পারিবে। এ স্থান ত্যাগ করা সকল প্রকারে কর্ত্তব্য।

মহেন্দ্র বলিল, “এই বাড়ী বহুকাল হইতে পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত ধনে পরিপূর্ণ; ইহা যে সব চোরে লুঠিয়া লইবে।”

ক । লুঠিতে আসিলে কি দুই জনে রাখিতে পারিব? প্রাণে না বাঁচিলে ধন ভোগ করিবে কে? চল, এখনও বন্ধ সন্ধ করিয়া যাই। যদি প্রাণে বাঁচি, ফিরিয়া আসিয়া ভোগ করিব।

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি পথ হাঁটিতে পারিবে কি? বেহারা ত সব মরিয়া গিয়াছে, গোরু আছে ত গাড়োয়ান নাই, গাড়োয়ান আছে ত গোরু নাই।”

ক । আমি পথ হাঁটিব, তুমি চিন্তা করিও না।

কল্যাণী মনে মনে স্থির করিলেন যে, না হয় পথে মরিয়া পড়িয়া থাকিব, তবু ত ইহারা দুই জন বাঁচিবে।

পরদিন প্রভাতে দুই জনে কিছু অর্থ সঙ্গে লইয়া, ঘরদ্বারের চাবি বন্ধ করিয়া, গোরুগুলি ছাড়িয়া দিয়া, কন্যাটিকে কোলে লইয়া রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রা করিলেন। যাত্রাকালে মহেন্দ্র বলিলেন, “পথ অতি দুর্গম। পায়ে পায়ে ডাকাত লুঠেরা ফিরিতেছে, শুধু হাতে যাওয়া উচিত নয়।” এই বলিয়া মহেন্দ্র গৃহে ফিরিয়া আসিয়া বন্দুক, গুলি, বারুদ লইয়া গেলেন।

দেখিয়া কল্যাণী বলিলেন, “যদি অস্ত্রের কথা মনে করিলে, তবে তুমি একবার সুকুমারীকে ধর। আমিও হাতিয়ার লইয়া আসিব।” এই বলিয়া কল্যাণী কন্যাকে মহেন্দ্রের কোলে দিয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

মহেন্দ্র বলিলেন তুমি আবার কি হাতিয়ার লইবে?

কল্যাণী আসিয়া একটি বিষের ক্ষুদ্র কৌটা বস্ত্রমধ্যে লুকাইল। দুখের দিনে কপালে কি হয় বলিয়া কল্যাণী পূর্ব্বেই বিষ সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিলেন।

জ্যৈষ্ঠ মাস, দারুণ রৌদ্র, পৃথিবী অগ্নিময়, বায়ুতে আগুন ছড়াইতেছে, আকাশ তপ্ত তামার চাঁদোয়ার মত, পথের ধূলিসকল অগ্নিস্ফুলিঙ্গবৎ। কল্যাণী ঘামিতে লাগিল, কখনও বাবলা গাছের ছায়ায়, কখনও খেজুর গাছের ছায়ায় বসিয়া, শুষ্ক পুষ্করিণীর কর্দ্দমময় জল পান করিয়া কত কষ্টে পথ চলিতে লাগিল। মেয়েটি মহেন্দ্রের কোলে – এক একবার মহেন্দ্র মেয়েকে বাতাস দেয়। একবার নিবিড় শ্যামলপত্ররঞ্জিত সুগন্ধকুসুমযুক্ত লতাবেষ্টিত বৃক্ষের ছায়ায় বসিয়া দুই জনে বিশ্রাম করিল। মহেন্দ্র কল্যাণীর শ্রমসহিষ্ণুতা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। বস্ত্র ভিজাইয়া মহেন্দ্র নিকটস্থ পল্বল হইতে জল আনিয়া আপনার ও কল্যাণীর মুখে হাতে পায়ে কপালে সিঞ্চন করিলেন।

কল্যাণী কিঞ্চিৎ স্নিগ্ধ হইলেন বটে, কিন্তু দুই জনে ক্ষুধায় বড় আকুল হইলেন। তাও সহ্য হয় – মেয়েটির ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য হয় না। অতএব আবার তাঁহারা পথ বাহিয়া চলিলেন। সেই অগ্নিতরঙ্গ সন্তরণ করিয়া সন্ধ্যার পূর্ব্বে এক চটীতে পৌঁছিলেন। মহেন্দ্রের মনে মনে বড় আশা ছিল, চটীতে গিয়া স্ত্রী কন্যার মুখে শীতল জল দিতে পারিবেন, প্রাণরক্ষার জন্য মুখে আহার দিতে পারিবেন। কিন্তু কই? চটীতে ত মনুষ্য নাই! বড় বড় ঘর পড়িয়া আছে, মানুষ সকল পলাইয়াছে। মহেন্দ্র ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিয়া স্ত্রী কল্যাণীকে বলিলেন, “তুমি একটু সাহস করিয়া একা থাক, দেশে যদি গাই থাকে, শ্রীকৃষ্ণ দয়া করুন, আমি দুধ আনিব।” এই বলিয়া একটা মাটির কলসী হাতে করিয়া মহেন্দ্র নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কলসী অনেক পড়িয়া ছিল। [ WORDS:-990]

Bengali to English Translation

PAGE :- 1 – 2 – – 4 – 5 – – 7 – – – 10 – 11 – 12 13 –14 – 151617 1819 – 20 – 21 22


TRANSLATE WITHIN 40 MINUTES 

দু একজনের কাছে জিগ্যেস করতেই বাসাটা খুঁজে পেল বাবর। কাজী সাহেব তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।

আরে আপনি! কখন এলেন? কীভাবে এলেন? আসুন, আসুন।

চলে এলাম। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এমন কী দূর! গাড়ি চালিয়ে চলে এলাম।

পরীক্ষণেই বাবরের মনে হলো আসবার কারণ কিছু না বললে উপস্থিতিটা শোভন হচ্ছে না। তাই সে যোগ করল, এখানে একটা কাজ ছিল।

দুহাত নেড়ে কাজী সাহেব বলে উঠলেন, কাজ পরে হবে, আগে বিশ্রাম করুন। কতদিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা, আগে ভাল করে গল্প-টল্প করি।

আজ সেরেই এসেছি। এখন আর কাজ নেই। ভাবছি আজই ঢাকায় ফিরে যাব।

যেতে দিলে তো! কাল যাবেন।

কাল?

হ্যাঁ কাল। অসুবিধো কী!

না, অসুবিধে কিছু নেই।

আলাদা বিছানার ব্যবস্থা আছেই। শুধু পেতে দিলেই হলো। একটু বসুন, ভেতরে খবর দিয়ে আসি। সিগারেট খান। আপনার তো এ ব্ৰ্যাণ্ড চলে না বোধহয়। আচ্ছা, আমি এক্ষুণি আনিয়ে দিচ্ছি।

সে-কী! না, না।

আপনি বসুন তো। চা না কফি? দুটোই আছে।

চা।

লতিফা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। পরনে কালো পাজামা, শাদার ওপরে কালো সবুজ বর্ডার আঁকা কামিজ। লতিফার সতের সুন্দর একজোড়া স্তন নিঃশব্দে ওঠানামা করছে, প্ৰায় বোঝা যায় কী যায় না।

একটা চেয়ার টেনে জুৎ করে তার সামনে বসলেন কাজী সাহেব। বললেন, আজ তো যাওয়া হবে না। কালও যেতে দিই কি-না সন্দেহ।

কাল না গেলে অসুবিধে হবে খুব।

কী এমন অসুবিধে? আমাদের মত তো চাকরি করতে নেই আপনার।

তা নেই। সত্যি।

বেশ আছেন। আপনার প্রোগ্রাম মাঝে মাঝে টেলিভিশনে দেখি! খুব ভাল লাগে। চমৎকার হয়।

ধন্যবাদ।

শুধু টেলিভিশন নিয়েই আছেন, না অন্য কিছু?

ব্যবসা আছে।

কীসের?

ইনডেনটিং। ভাবছি, আমিও চাকরি থেকে রিটায়ার করে একটা ব্যবসা-ট্যাবসা করব। বড় ছেলেটা আর্মিতে এখনও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। তারপরে লতিফা। ওর বিয়েটা দিলেই থাকে আরেক ছেলে।

আপনার আর চিন্তা কী তবে? বেশ গুছিয়ে এনেছেন।

কই আর? আপনার ছেলেমেয়ে কটি?

বাবর মিথ্যে করে বলল, ছেলেমেয়ে দুটি।

তবে যে লতিফার কাছে শুনেছিলাম তিনটি।

বাবর ভাবল, দুষ্ট মেয়ে, কীভাবে মিথ্যে কথা বলেছে দেখ। মুখে সে বলল, ভুল করেছে, এক ছেলে এক মেয়ে।

লতিফা আপনাকে কিন্তু খুব শ্রদ্ধা করে। বলে বাবর চাচার মত মানুষ হয় না।

বাড়িয়ে বলে।

কী যে বলেন। আপনারা হলেন আমাদের গৌরবের বস্তু। আর মেয়েকে আমি আজীবন সেই শিক্ষাই দিয়েছি, মানীজনকে সম্মান দেওয়া। সতের বছর বয়েস হলে কী হবে লতিফার, বুদ্ধিতে, বিবেচনায়, নিজের মেয়ে বলে বলছি না, যে কারো সাথে পাল্লা দিতে পারে। আমি জানি। এবার তো আই.এ দিল।

হ্যাঁ, দিয়েছে। ভাবছিলাম বি.এ পর্যন্ত পড়াব।

তা কী হলো?

একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসে গেল।

বিয়ে দিচ্ছেন লতিফার?

অবাক হয়ে গেল বাবর। এজন্যেই কি তাকে কোনো খবর না দিয়ে ঢাকা থেকে চলে এসেছে লতিফা? ওভাবে তার হঠাৎ অন্তর্ধানের কোনো কারণ খুঁজে না পেয়েই বাবরের এতদূর আসা। আসার ঝুঁকিটাও কম ছিল না। যদি কাজী সাহেব সহৃদয় ব্যবহার না করেন? যদি তিনি কিছু সন্দেহ করে বসেন? কিম্বা লতিফাই যদি কঠিন হয়?

লতিফা চা নিয়ে এলো। চায়ের সঙ্গে নানা রংয়ের পাঁপড় ভাজা।

ভাল আছেন বাবর চাচা?

তার অপূর্ব সেই উজ্জ্বল মুখখানা সৃষ্টি করে লতিফা বলল। বলে মাথা কাৎ করে চা বানাতে লেগে গেল। কোনো কিছুতে মনোযোগ দিলেই লতিফার মাথাটা কাৎ হয়ে আসে। ভঙ্গিটা বাবরের ভারি চেনা।

হ্যাঁ, ভাল আছি। তুমি? তুমি কেমন?

ভাল। চায়ে কতটা চিনি?

এই ছলনাটুকু ভাল লাগল বাবরের। লতিফা জানে বাবর চায়ে কতটা চিনি খায়।

এক চামচ। ব্যাস। ওতেই হবে।

বাবা, তোমাকে কতটা চিনি?

বাড়িতে তো থাকিস না জানিসও না। চায়ে আমি চিনি খাই না।

ও, মনে ছিল না।

কাজী সাহেব প্ৰীত মুখে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, জানেন বাবর সাহেব, আমার এই মেয়েটাকে আমি কত ভালবাসি।

যেন তোমার আরো দুপাঁচটা মেয়ে আছে। ঠোঁট গোল করে লতিফা বলল। বাবর জিগ্যেস করল, তুমি চা খাচ্ছ না?

না, এইমাত্র খেয়ে উঠেছি।

বিকেল চারটায় ভাত খেয়েছ?

আর বলবেন না, মেয়টা যদি কোনো কথা শোনে। শুধু অনিয়ম করবে। এইতো সারা দুপুর বাথরুমে বসে বসে পানি ঢেলেছে।

বলেছে তোমাকে!

তা নয়তো কী?

আচ্ছা। আপনিই বলুন বাবর চাচা, চুল ঘষতে, শ্যাম্পু করতে সময় লাগে না? বাবা কিছু বুঝে না।

কিন্তু ঠাণ্ডা লাগতে পারে। ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হতে পারে।

জুর আমার হয় না।

সে-কী!

জিজ্ঞেস করে দেখুন না বাবাকে, কবে আমার জ্বর হয়েছে।

কেন, ৬৬ সালে দেশে গিয়ে এক ঝুড়ি কাঁচা আমি খেয়ে যে জ্বর বাধালি। সেটা বুঝি জ্বর না!

মফঃস্বলে আমন রোদে গায়ে করে তা অভ্যোস নেই। তাই গা গরম হয়েছিল একটু।

হা হা করে হেসে উঠলেন কাজী সাহেব। বললেন, লতিফার সঙ্গে কারো পারবার উপায় নেই।

সত্যি কথা বলি বলেই পার না।

লতিফার গলায় একটু ঝাঁঝ, একটু তিক্ততা টের পেল বাবর। কেন? কেন এই উষ্মা? কার ওপর? একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সে, হঠাৎ কাপ পিরীচের শব্দে জেগে উঠল। লতিফা ট্রে গুছিয়ে ভেতরে যাবার উদ্যোগ করছে।

বাবর বলল, বাপ মায়ের কাছে এসে তোমার স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে।

ছাই হয়েছে।

তুই কী বুঝিস? অ্যাঁ তুই বুঝিস কী। কাজী সাহেব হাসতে হাসতে তিরস্কার করে উঠলেন মেয়েকে। বুঝলেন বাবর সাহেব, হোস্টেলে থেকে থেকে খাওয়া দাওয়াই ভুলে গেছে। মেয়েটা। এক টুকরোর বেশি দুটুকরো মাংস দিলে তেড়ে ওঠে এখন।

হ্যাঁ খাইয়ে খাইয়ে আমাকে একটা হাতি বানাও।

শুনছেন, কথা শুনছেন ওর। রাতদিন এই বলবে। আর না খেয়ে থাকবে। আচ্ছা বলুন তো কী এমন মোটা ও?

মোটেই না।

আপনাদের ও দুটো চোখ, না বোতাম? বলে লতিফা হাসতে হাসতে ট্রে নিয়ে চলে গেল। তার পেছনটা দুলে উঠল। নরোম একটা ছোট্ট শাদা জন্তুর মত। ময়মনসিংহে এসে স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে লতিফার। গাল দুটো লাল হয়েছে। শরীরে একটা তরঙ্গ এসেছে।

আপনার মেয়েটি চমৎকার। অসাধারণ বুদ্ধিমতি। মাথা অত্যন্ত পরিষ্কার। ওর সায়েন্স পড়া উচিত ছিল। ডাক্তার হতে পারত। কিন্তু অংকে বড্ড কাঁচা বলেই তো দিইনি।

অংকে কাঁচা নাকি?

ম্যাট্রিকে মাত্ৰ চল্লিশ পেয়েছিল। তাছাড়া কী জানেন, আমিও আগেই বুঝেছি লেখাপড়া বিশেষ ওর হবে না।

এটা আমি স্বীকার করলাম না।

কাজী সাহেব বলে চললেন, আমি ওকে শুধু ভাল হাউস-ওয়াইফ হতে যা দরকার তাই করে দিচ্ছি। যেন কোনো অবস্থাতেই অপ্রতিভ না হয়।

অবশ্যি এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গি; কিন্তু আমি সমর্থন করি না।

মৃদু হাসছিলেন কাজী সাহেব তখন থেকে। এবার হাসিটা আরো স্পষ্ট দেখােল! বোধহয় কিছু বলতে চান। বাবর উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল। তাঁর দিকে।

কই, সিগারেট খান।

কাজী সাহেব তার ব্ৰ্যাণ্ড বাড়িয়ে দিলেন।

আপনার ব্ৰ্যাণ্ড আনতে দিয়েছি।

কেন আবার কষ্ট করতে গেলেন?

না, না, কষ্ট কীসের। আপনি এসেছেন, কত যে খুশি হয়েছি। মনে মনে আপনার কথাই ভাবছিলাম কদিন থেকে। আপনি খুব ভাল সময়ে এসেছেন। খুব ভাল হয়েছে।

কী ভাল হয়েছে জানতে পারার আগেই কাজী-গৃহিণী এলেন। চট করে একটা ধোয়া শাড়ি পরে মাথার চুল গুছিয়ে গাছিয়ে এসেছেন।

উঠে দাঁড়াল বাবর।

আদাব ভাবী। ভাল আছেন।

জি ভাল। বসুন। ছেলেমেয়ে সব ভাল?

ভাল।

কাজী-গৃহিণী হাসলেন।

মিথ্যেটার জন্যে বাবর একটু অস্বস্তি বোধ করল। বিয়ে সে করেনি, এই কথাটা এদের আর জানাবার উপায় নেই।

আপনাকে টেলিভিশনে মাঝে মাঝে দেখি।

বিজ্ঞানের এই এক অবদান! নিজে না আসতে পারলেও কেমন দেখা হয়ে যাচ্ছে।

স্বামী স্ত্রী উভয়েই অনাবিল উপভোগ করলেন রসিকতটুকু।

আজ থেকে যেতে হবে কিন্তু।

কাজী ভাইকে তো বলেছি থাকব।

কাজী সাহেব ভাই সম্বোধনে খুব প্রীত হলেন, উৎসাহ পেলেন, কৃতাৰ্থ বোধ করলেন। বললেন, কয়েক দিন থাকলে সত্যি খুব খুশি হতাম।

আরেকবার এসে না হয় থাকব।

তখন তো বাড়ি খালি হয়ে যাবে। বিষণ্ণ স্বরে কথা কটি উচ্চারণ করলেন কাজী সাহেব।

বাবর ঠিক বুঝতে পারল না অর্থটা। জিজ্ঞেস করল, মানে?

লতিফার বিয়ে দিচ্ছি যে।

কানে শুনেও যেন কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারল না। বাবর।

বিয়ে দিচ্ছেন?

হ্যাঁ। একটা ভাল ছেলে পেয়ে গেলাম।

শুকনো গলায় বাবর জিজ্ঞেস করল, কবে?

দিন তারিখ ঠিক হয়নি। তবে খুব শিগগির। পাকা দেখা হয়ে গেছে।

ছেলে কী করে?

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়তে বিলেতে যাচ্ছে এ বছরে। লতিফাকে নিয়ে যাবে।

বিলেত যাবার এতদিনের স্বপ্নটা তাহলে সত্যি হবে লতিফার— ভাবল বাবর। চুপ করে রইল সে।

কাজী গৃহিণী বললেন, পাত্র আমারই খালাতো বোনের ছেলে। লতিফাকে দেখে ওর খুব পছন্দ। আমি পড়ানোর পক্ষে। ছেলে বলল, বিয়ের পরেও তো পড়তে পারে। বিলেতে পড়াশুনা আরও ভাল হবে।

তা হবে।

মনটা যেন কোথায় এক চিলতে খারাপ লাগছে। কিন্তু কেন, বাবর তা বুঝতে পারল না। বাহ লতিফার কোনোদিন বিয়ে হবে না নাকি? সে নিজেই তো কতদিন লতিফাকে বিয়ের কথা বলেছে। বলেছে, বিয়ে হলে তার বাড়িতে যাবে। কী খেতে দেবে লতিফা? থাকবার জন্যে জোর করবে না? স্বামীর সঙ্গে কী বলে আলাপ করিয়ে দেবে তাকে?–আরো কত কী! আর, লতিফার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এদিকে, অথচ কিছুই সে জানে না। এ জন্যেই কি হঠাৎ ঢাকা থেকে সে চলে এসেছে কোনো খবর না রেখে? কই লতিফার সঙ্গে তার যখন শেষ দেখা হয়েছে তখন তো কিছুই বোঝা যায় নি। অথচ কতদিন বাবরকে বলেছে, কোনো কিছুই তার কাছে সে গোপন করে না।

কাজী-গৃহিণী বললেন, সন্ধ্যে হয়ে এলো। আমি রান্না ঘরে যাই।

ভাল করে রান্না করো কিন্তু।

সে তোমাকে বলতে হবে না। ওঁর মত লোক আসা ভাগ্যের কথা।

কী যে বলেন। সলজ্জ শোভন হবার চেষ্টা করল বাবর। কী এমন মানুষ আমি।

বাপরে বাপ! টেলিভিশনে এত সুন্দর প্রোগ্রাম করেন। আপনার ধাঁধার আসরগুলো এত মজার হয়। লোকজনকে যখন বলি উনি আমাদের চেনা, তারা বিশ্বাসই করে না।

মনে করে আমরা গল্প করছি। গৃহিণীর সঙ্গে যোগ করলেন কাজী সাহেব।

ভাল কথা, উনি তো শিল্পী মানুষ–কাজী-গৃহিণী স্বামীকে বললেন, লতিফার গয়নার ডিজাইনগুলো ওঁকে দেখাও না। বাবরকে বললেন, আপনি দু একটা পছন্দ করে দিন, কেমন? আমি ডিজাইনের বইটা পাঠিয়ে দিচ্ছি।

কবিতা লেখে না, গল্প লেখে না, অভিনয় করে না, ছবি আঁকে না, গান গায় না–টেলিভিশনে শুধু ধাঁধার আসর পরিচালনা করে বাবর। আর এরা কি-না তাকে শিল্পী বলছে। মনে মনে হাসল বাবর। নিজের সম্বন্ধে অহেতুক উচ্চ ধারণা কোনো সময়েই তার ছিল না। তবু কেমন যেন খুশিও হলো শিল্পী বিশেষণটা শুনে।

হ্যাঁ, পাঠিয়ে দাও। না, আমি নিজেই নিয়ে আসছি।

বাবর আরো খানিকক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখল। লতিফার চেহারাটা ঠিক মনে করতে পারছে না সে। মনে করতে পারলে কল্পনায় মিলিয়ে নেয়া যেত কোনটা তাকে মানাবে। ছোট ছোট আয়তক্ষেত্র একটা করে আংটা দিয়ে ঝুলানো–এমনি একটা নকসা চোখে ধরল। বাবরের। তাকিয়ে দেখল কাজী সাহেব উন্মুখ হয়ে আছেন চশমার ভেতর দিয়ে।

বাবর বলল, এটা কেমন?

এইটা?

হ্যাঁ। কিম্বা। আরো দেখতে পারি। দাঁড়ান দেখছি।

আরো কয়েকটা পাতা ওন্টাল বাবর। আবার প্রথম থেকে দেখল। কিন্তু কোনো নকসা চোখে ধরল না। তার। তখন সে প্ৰথমে যেটা পছন্দ করেছিল সেটাই আবার বের করল।

আমার মনে হয় এটাই ওকে মানাবে। চমৎকার। খুব আধুনিক। অথচ জমকালো নয়।

বলেই বই থেকে চোখ তুলে দেখে কাজী সাহেবের পেছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে লতিফা। ঠাণ্ডা স্থির চোখে তাকে দেখছে। বেড়ালের মত সরু তার চোখের তারা।

এক মুহুর্ত কোনো কথা বলতে পারল না। বাবর। টেলিভিশনে অমন তুখোর অমন সপ্রতিভ কথা বলিয়ে যার খ্যাতি সেই বাবর একেবারে বোবা হয়ে গেল। তার চোখে শুধু অর্থহীনভাবে খেলা করতে লাগল লতিফার ভিজে ভিজে চুল যা ঘাড়ের উপর মৃদু হাওয়ায় উড়ছে। একটু লালচে। গোঁড়ার দিকে একটু কুঞ্চিত। ঢাকাতে এ রকম খোলা চুল কখনো দেখেনি সে লতিফার। নিত্য নতুন বাঁধনে আবদ্ধ তার চুল বাবরকে প্রীত করেছে। আজকের এই খোলামেলা ছেড়ে দেওয়া চুলের রাশ লতিফাকে যেন কন্যারূপে তুলে ধরেছে।

কিন্তু টেলিভিশনে আসর পরিচালনা করে বাবর খ্যাতিমান। যে কোনো অবস্থায় সপ্রতিভ হয়ে থাকাটা তার প্রতিভা। এখনও তার প্রমাণ পাওয়া গেল। মুহুর্তে সপ্রাণ হয়ে উঠে সে। বলল, বাতিটা জ্বালো লতিফা। চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

হ্যাঁ, আরে তাইতো, বাতি জ্বল মা, কখন সন্ধ্যে হয়েছে। কাজী সাহেব ব্যস্ত গলায় বললেন। মেয়ের সামনে মেয়ের গয়নার নকসা তাকে অপ্ৰস্তুত করে ফেলেছে।

হঠাৎ লতিফা বাবার কাঁধে হাত রেখে বলল, বাবা, সন্ধ্যে হয়ে গেছে, তুমি এখনো ঘরে! কী যে বুড়ো হয়েছ, যাও একটু বেড়িয়ে এসো।

বারে, তোর বাবর চাচা এসেছেন যে!

তা তাকেও নিয়ে যাও। তাকে কি রেখে যেতে বলছি! আর আসবার পথে একটা টম্যাটো কেচাপের বোতল নিয়ে এসো।

আচ্ছা, আচ্ছা।

গৃহিণীর সাথে সাথে কাজী সাহেবও ভেতরে চলে গেলেন।

ভেতরে একা একা লতিফা কী করছে? কেন সে আসছে না? বাবরের কপাল কুঞ্চিত হলো। লতিফা কী তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে? অসুখী হয়েছে সে আসতে? হয়ত সেজন্যেই কথায় অত ঝােঝ ছিল তার। বাবার উপরেও নিশ্চয়ই খুব চটে যাচ্ছিল তাঁর অমন সহৃদয়তা দেখে। লতিফার সঙ্গে দেখা হলে ভাল হতো। বাবর তাকে জিগ্যেস করত। এভাবে ঢাকা থেকে হঠাৎ তার গা ঢাকা দেবার অর্থটা কী? সে কেন সেদিন কথা দিয়েও আসেনি? বাবর তার জন্যে সারা দিন বসবার ঘরের পর্দা টেনে টেপ রেকর্ডার ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করেছিল।

অপেক্ষাটা এখনো বড় অসহ্য মনে হচ্ছে। সামান্যক্ষণের জন্য দেখা দিয়ে লতিফা গোল কোথায়? কাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করবে বাঁ ডেকে দিতে বলবে, কেমন সঙ্কোচ হলো। এমনিতেই এভাবে এসে পড়ে অবধি অপরাধ বোধটা যাচ্ছে না। পাছে ওরা কেউ টের পেয়ে যায়। ময়সনসিংহে আদতেই তার কোনো কাজ ছিল না এক লতিফার খোঁজ নেয়া ছাড়া।

গয়নার একটা ছোট বই আর চশমা নিয়ে কাজী সাহেব ঘরে এলেন। বসলেন চেয়ার টেনে ঘন হয়ে। মেলে ধরলেন বই।

আপনি চশমা ব্যবহার করেন নাকি? সলজ্জ হেসে কাজী সাহেব উত্তর করলেন, ঐ পড়ার সময়। বয়স তো কম হলো না।

কত আর হবে?

এই নভেম্বরে চুয়াল্লিশ পড়বে।

বেশ অল্প বয়সেই তাহলে বিয়ে করেছিলেন।

অল্প আর কোথায়? আমার তখন বাইশ কী তেইশ। বড় খোকা এখন কুড়িতে। ছেলেবেলায় বাবা মারা গিয়েছিলেন তো, তাই ঝটপট সংসারী হতে হয়েছিল।

আমার চেয়ে মাত্র চার সাড়ে চার বছরের বড়, ভাবল বাবর। তার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন, দুদিন বাদে নানা হবেন, আর সে এখনও বিয়েই করল না। সময় হলো না সংসারী হবার। বিলেতে একবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। বছরখানেক জয়েসির সঙ্গে বাস করেছে। মাখনের মত রং সেই তার নগ্ন শরীরটা এখনো চোখে ভাসে বাবরের। বিছানায় চমৎকার সাড়া দিত মেয়েটা। বিয়ের জন্যে শেষ দিকে বড্ড ঝুল ধরেছিল। তাকে কোনোক্রমে সোবহানের ঘাড়ে এবং ঘরে চাপিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছিল সে। বিয়ের কথা কিছুতেই ভাবতে পারত না। কল্পনা করতে পারত না স্বামী হিসেবে। মানুষ কী করে সংসার করে, বাবা হয়, শ্বশুর হয়, নানা-দাদা হয় কে জানে?

প্রথমে গলার হার দেখুন। এইটেই জরুরি। এর সঙ্গে মিলিয়ে কানে আর হাতে। দেখুন। ডিজাইনের চলচ্চিত্র সরে যেতে থাকে বাবরের চোখের সম্মুখে। পাতার পর পাতা উল্টে যান কাজী সাহেব।

কোনটা পছন্দ?

আপনারা কোনটা পছন্দ করেছেন?

আগে আপনি পছন্দ করুন, তারপর বলব।

লতিফা বাবরের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ভেতরে চলে গেল। চলে গেলে কাজী সাহেব হেসে বললেন, বুঝলেন না মেয়ের লজ্জা হয়েছে।

কেন?

বিয়ের গয়না পছন্দ করছি যে আপনাকে নিয়ে।

হুঁ, তাই। বাবর যোগ করল, মেয়েদের এই লজ্জাটা স্বাভাবিক।

কাজী সাহেব উত্তরে বললেন, আজকাল অবশ্য অনেক নির্লজ্জ মেয়ে দেখবেন। আমার মেয়েকে আমি সব রকম আধুনিকতা শিখিয়েছি, কিন্তু তাই বলে কোনোদিন নির্লজ্জ হবার শিক্ষা দিই নি।

আপনি অনেক ভাবেন দেখছি।

হ্যাঁ ভাবি। অনেকের অনেক রকম উচ্চাশা থাকে। আমার একটি মাত্রই অ্যাম্বিশন, আর তা হচ্ছে ছেলেমেয়েদের মানুষ করা। তারা শিক্ষিত হবে, আধুনিক হবে, আবার ভয়ভক্তি থাকবে। গোঁড়া হবে না।

আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আপনি সফল।

লতিফাকে দেখে বলছেন তো? তবুও বেয়াড়া, মেজ কি-না তাই। দেখতেন। আমার ছেলেটাকে।

কী যেন নাম?

ডাকি বড় খোকা বলে। ভাল নাম কাজী আসাদুল্লাহ। ওর কম্যাণ্ডিং অফিসার ভারি পছন্দ করে খোকাকে। কুমিল্লা ক্যান্টে আছে। যদি কখনো যান খোঁজ করবেন।

হ্যাঁ, নিশ্চয় করব। আমি সব সময়েই ঘুরে বেড়াই। যেমন আজ এই হঠাৎ ময়মনসিংহে আসতে হলো।

এসেছেন খুব খুশি হয়েছি। কুমিল্লায় গিয়ে বলবেন ব্রিগেডিয়ার সাহেবের এডিসি-র কথা। আমার ছেলেই এখন এডিসি। দেখলে আলাপ করলে বুঝতে পারবেন। ছেলেমেয়েকে কোন শিক্ষায় আমি মানুষ করেছি।

হ্যাঁ, আলাপ করব। বোধহয় সামনের মাসে যাব কুমিল্লায়।

এটাও একটা মিথ্যে। এক মিথ্যের জন্য কত মিথ্যে যে বলতে হয়। ময়মনসিংহে আসাটা যে নেহাতই ব্যবসার কাজে সেই মিথ্যেটার সমর্থনে এখন কুমিল্লা যাবার প্রতিশ্রুতি এমনকি সম্ভাব্য সময়ও দিতে হলো।

চলুন বেরই। ময়সনসিংহে এসেছেন কখনো এর আগে?

না।

তাহলে প্ৰথমে শহরটা একবার ঘোরা যাক, কী বলেন।

না, না এসেছি কাজে, কাজ শেষ হয়েছে, আপনাদের দেখা পেলাম। শহর দেখার চেয়ে আপনাদের সাথে বসে দুটো কথা বলার ইচ্ছে। মনের মত মানুষই আজকাল পাওয়া যায় না যে কথা বলবেন।

চলুন তাহলে ক্লাবে যাওয়া যাক। সেখানে বসে গল্প হবে। কাজী সাহেব গাড়ি বের করলেন। বাবর বলল আমার গাড়িটাই নিতাম।

সারাদিন চালিয়ে এসেছেন ঢাকা থেকে। এখন বিশ্রাম দরকার।

আমার না। গাড়ির? বাবর একটু রসিকতা করল।

দুজনেরই। তাছাড়া আপনাকে নিয়ে যাব এত আমার সৌভাগ্য।

খাঁটি ভদ্রলোক কাজী সাহেব। বোধহয় খুব একা থাকেন। একা থাকলে অনেক সময় মানুষ এ রকম আগ্রহ হয়ে উঠে কারো উপস্থিতিতে। বাবর লক্ষ করল, কাজী সাহেব গাড়ি খুব চালান না। তার একটু ভয়ই করল। যখন তিনি গেট দিয়ে গাড়ি বের করার সময় দেয়ালের সঙ্গে প্রায় লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। ওদিকে পথে পড়েই একটা রিকশাকে বাচাতে গিয়ে এমন জোরে ব্রেক করলেন যে বাবরের মাথাটা উইণ্ডশিন্ডে প্রায় ঠুকে গেল।

কাজী সাহেব অপ্ৰস্তৃত হয়ে একটু হাসলেন। বলেলেন, ব্রেকটা একটু ট্রাবল দিচ্ছে।

বাবর ভাবছিল লতিফার কথা। একটু অন্যমনস্ক ছিল।

কী ভাবছেন?

না, কিছু না।

নিশ্চয়ই কোনো প্রোগ্রামের কথা।

প্রোগাম মানে টেলিভিশন প্রোগ্রাম। বাবর ভাবল, এরা বাইরে থেকে মনে করেন আমরা একেকটা প্রোগ্রামের জন্য সারাক্ষণ চিন্তা করি। ভুলটা সংশোধন করবার লোভ হলো তার, কিন্তু করল না। বাবর তার প্রোগ্রাম নিয়ে কখনোই আগে থেকে কিছু ভেবে রাখে না। সে মুহুর্তের প্রেরণায় বিশ্বাসী। প্রোগ্রাম রেকর্ড করবার ঘণ্টাখানেক আগে খানিকটা সুরা পান করে এবং একা থাকে। তার যা কিছু করণীয় বাঁ বক্তব্য সেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বের করে ফেলে সে। তারপর সোজা চলে যায় ক্যামেরার সামনে রেকর্ড করবার জন্যে। যতক্ষণ রেকর্ড না হচ্ছে অস্বাভাবিক রকমে গম্ভীর থাকে। বাবর। আয়েশা বলে যে মেয়েটা, সে একবার বলেছিল, বাবর যখন সঙ্গম করে তখন এত গম্ভীর থাকে যে মনে হয়। অংক করছে। নিন, সিগারেট নিন।

আপনি শুধু শুধু কিনলেন। আমিই নিতাম।

ও একই কথা। কোনদিকে যাব বলুন?

যেদিকে ইচ্ছে।

শহর দেখবেন?

না। ক্লাবে যাবেন বলছিলেন।

ঘড়ি দেখলেন কাজী সাহেব। বললেন, ক্লাব খোলার এখনো মিনিট কুড়ি বাকি আছে। আচ্ছা চলুন।

গাড়ি ক্লাবের দিকে ঘোরালেন কাজী সাহেব।

বাবর বলল, আমার কিন্তু ঐ ডিজাইনটা ভারি পছন্দ। লতিফাকে মানাবেও। ওটারই একটা সেট বানিয়ে দিন।

লতিফা অন্য একটা পছন্দ করেছিল।

কোনটা?

ঐ যে একটার মধ্যে ছোট ছোট সার্কল-ক্ৰমে বড় হচ্ছে যত নিচে নামছে, – ঐটা, মাঝে পাথর বসানো।

মনে পড়েছে। ওটাও ভাল।

আসলে বাবরের মনে পড়েনি। কোন ডিজাইনের কথা কাজী সাহেব বলছেন কে জানে। বাবর বলল, বানাতে দেয়া হয়ে গেছে?

না, হয়নি। আজকেই দোকানে যাবার কথা ছিল। আপনি এলেন-।

আমার জন্যে কী ছিল। তাহলে আমিও যেতাম।

কাল যাওয়া যাবে। কাজী সাহেব একটু পর আবার বললেন, আপনি যেটা পছন্দ করছেন সেটাও খুব ভাল। আমারও খুব মনে ধরেছে। ভাবছি, ওটাও এক সেট বানিয়ে দেব।

হ্যাঁ, একই মেয়েতো আপনার।

হ্যাঁ, ঐ একটাই মেয়ে। বড় আদরে যত্নে ওকে মানুষ করেছি। বাবর সাহেব। মেয়ের বাপ হবার ট্রাজেডি কী জানেন? নিজ হাতে মানুষ করে তাকে অন্যের কাছে দিতে হয়। এই যে এত আপন, সব মিথ্যে, পর হয়ে যাবে। আপনার মেয়ে বড় হোক তখন বুঝবেন।

বাবর চুপ করে রইল।

আপনার মেয়ের নাম কী রেখেছেন? চমকে উঠল বাবর। আরো একটা মিথ্যে কথা বলতে হবে তাকে। সে বলল, বাবলি।

বাবলির কথাই একটু আগে সে ভাবছিল।

বাহ, ভারি সুন্দর নাম। ভাল নাম কী?

বাবলি বাবর।

অবলীলাক্রমে সে বানিয়ে ফেলল। নামটা। বানিয়ে ভারি পছন্দ হয়ে গেল! তাই আবার সে উচ্চারণ করল, বাবলি বাবর। আমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছি।

খুব সুরেলা নাম। কবছর যেন বয়েস হলো?

এখন পাঁচ।

যাক, আরো অন্তত বছর পনের কাছে পাবেন। তার পরই মেয়ে আপনার পর।

বিয়ে দিলেই মেয়ে পর হয়?

কী জানি, আমার যেন তাই মনে হয়। আমি কিন্তু আপনার পছন্দ ঐ ডিজাইনেরও একটা সেট বানিয়ে দেব।

নিশ্চয়ই।

ক্লাবের সামনে এসে পড়ল তারা। কাজী সাহেব গাড়ি একটা মনমত কোণে রাখতে রাখতে বললেন, সাধারণত ক্লাবে আসি না। অনেকদিন পরে আজ আসছি। তা প্ৰায় মাস তিনেক হবে।

শুধু শুধু তাহলে এসে কী দরকার ছিল?

শুধু শুধু কেন? আপনি আছেন যে। মনের মত লোক না পেলে এখানে এসে দুদণ্ড বসা যায় না। ছোট শহর। বসলেই পরিচর্চা আর চাকরির গল্প, ভাল লাগে না সাহেব। পরিচর্চার মত সুস্বাদু আর কিছু নেই যে।

খুব ভাল বলেছেন পরিচর্চা যারা করে তাদের আমি এক মুহুর্ত সহ্য করতে পারি না।

ক্লাবটা ভারি সুন্দর। নিচু একতলা লম্বা দালান। সামনে পেছনে বাগান। খেলার জায়গা। বসবার কোণ।

বাইরে বসবেন, না ভেতরে?

বাইরের বসি।

বাইরে বেশিক্ষণ বসা ঠিক হবে না।

কেন?

ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে যে! ঠাণ্ডা লেগে যাবে।

আপনাদের বাথরুমটা কোথায়?

এতক্ষণ একবারও যাবার সুযোগ হয়নি। পেটটা ফুলে রয়েছে। লতিফাদের বাসাতেই লেগেছিল। কিন্তু ভদ্রতা করে বলেনি।

ঐ তো বাঁ ধারে, সোজা চলে যানে। সুইচ ঠিক দরোজার বাইরেই আছে। যান।

বাবর গেল। বাতি জ্বলিয়ে ভেতরে ঢুকল। আয়নায় নিজেকে দেখল। খানিক। অহেতুক মাথায় পাকা চুলের সন্ধান করল সে। থাকলেও রাতে তা চোখে পড়ল না। গালের দুপাশে ডলল কয়েকবার। সেভ ঠিকই হয়েছে। ট্রাউজারের বোতাম খুলল সে! ঘণ্টা সাতেক প্রস্রাব করা হয়নি। হলুদ হয়ে গেছে রং। যন্ত্রটাও বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রায় ভীমাকার ধারণ করেছে। ভারমুক্ত হবার পর এত আরাম লাগল যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সে একটা হাসি উপহার দিল। তারপর দ্রুত বেরিয়ে এলো বাইরে।

এদিকে আসুন। বলে একটা দরোজার দিকে হাত তুলে ইশারা করলেন কাজী সাহেব। বাবর চোখ তুলে দেখল দরোজার মাথায় সবুজ রংয়ে লেখা BAR.

হঠাৎ কেমন রাগ হলো বাবরের। লোকটা নিজেকে এত হীন ভাবতে ভালবাসে কেন? এ কোন ধরনের আনন্দ। অথচ সত্যি সত্যি আমি যদি তাকে বলি, আপনি তুচ্ছ, আপনি সাধারণ, আমার কথা শুনুন, আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাহলে বোমা বিস্ফোরণ হবে। এই অতি ভদ্র অতি বিনয়ী লোকটাই হিংস্র ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। মানুষ কেন এ অভিনয় করে?

ভাবতেই চমকে উঠল বাবর। সে নিজেও কি একজন শক্তিশালী অভিনেতা নয়? না, না ও কথা থাক। ও কথা এখন ভাবতে চায় না। বাবর। ভাবনাটাকে ভাসিয়ে দেবার জন্য সে ঢাক ঢক করে এক সঙ্গে বেশ খানিকটা হুইঙ্কি গলায় ঢেলে দিল।

আপনি যে হঠাৎ এভাবে আসবেন, তা ভাবতেই পারিনি।

আমিও না।

ভাবছিলাম, আজকের সন্ধ্যেটা খুবই খারাপ কাটবে। দৈবের কী কাজ দেখুন, আজকের সন্ধ্যেটাই এমন হলো যে আমার অনেকদিন মনে থাকবে।

আমারও।

আপনাকে অনেকে তাকিয়ে দেখছে।

দেখছে নাকি?

দেখবে না? আপনাকে টেলিভিশনে দেখে। ওরা অবাক হয়ে গেছে, আপনি কী করে এখানে এলেন।

আর বলবেন না, ঢাকাতেও এই কাণ্ড। কোনোখানে যেতে পারি না, বসতে পারি না, একটু একা থাকতে পারি না–লোকে চিনে ফেলে।

লতিফার কাছে শুনেছি। ঢাকায় খুব পপুলারিটি আপনার। ও তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

বলে বাবর চাচার মত প্রোগ্রাম আর কেউ করতে পারে না।

বলে নাকি?

বলে। আপনি আছেন বলে আমার ভরসাও কম নয়। মেয়েটা একা একা ঢাকায় থাকে। জানি, কিছু একটা হলে আপনি আছেন, দেখতে পাবেন, খবর পাব।

তাতো নিশ্চয়ই।

তাছাড়া আমি জানি, আপনিও ওকে খুব স্নেহ করেন। আপনার ওখানে যায় তো মাঝে মাঝে? যায় না?

হ্যাঁ, যায়।

আমি ওকে বলে দিয়েছিলাম, ঢাকায় কোথাও যেতে হলে বাবার সাহেবের বাসায় যাবি। আর কোথাও না। বোঝেন তো বার-বাড়ন্ত মেয়ে। সব জায়গায় যেতে দিতে নেই। আমার নিকট সম্পর্কেরও দুজন আত্মীয় আছেন, আমি তাদের বাসায় পর্যন্ত লতিফাকে যেতে দিই না।

কেন?

নিজের মেয়ে বড় হোক তখন বুঝবেন। ভাবছি হোস্টেলে গিয়ে আপনার নাম ভিজিটারদের খাতায় তুলে দিয়ে আসব।

কিন্তু যে বললেন লতিফার বিয়ে দিচ্ছেন। বিলেত যাচ্ছে।

ওহো! এই দেখুন। একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। বলে হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাসতে লাগলেন কাজী সাহেব। বাবর বুঝতে পারল হুইস্কি কাজ করতে শুরু করেছে। কাজী সাহেব নেশার আমেজে কী বলতে কী বলছেন। কাজী সাহেব বললেন, আমার জামাইটা খুব ভাল হচ্ছে।

নিশ্চয়ই।

নিজের জামাই বলে বলছি না।এ-কী আপনার গ্লাস খালি, বেয়ারা জলদি দাও।

আপনি?

আমিও নেব। কী বলছিলাম?

বলছিলেন। আপনার হবু জামাইয়ের কথা।

দুটো ছোট ছোট দ্রুত চুমুক দিয়ে কাজী সাহেব বললেন, হবু বলছেন কেন? জামাই হয়েই গেছে। বড় ভাল ছেলে। অমন ব্ৰিলিয়েন্ট ছেলে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। আমার অনেকদিন থেকেই চোখ ছিল ছেলেটার ওপর।

আপনার তো আত্মীয়ের মধ্যেই?

জি, আমার এক কাজিন শালীর একমাত্র ছেলে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়তে যাচ্ছে। লতিফাকেও নিয়ে যাবে।

বাবর অত্যন্ত সাবধান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, লতিফা কী বলে।

ওতো বিলেত যাবার নামে ওড়ে।

না, বিলেতের কথা বলছি না।

তবে?

এত অল্প বয়সে–মাত্র তো সতের–বিয়ে হচ্ছে, তাই বলছিলাম।

তা বিয়ের জন্যে বয়েসটা একটু কম। সেজন্য আমিও ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না। কামাল ওর মাকে বলেছিল–

কামাল কে?

কেন, আমার জামাই!

ও, বলুন।

কামাল ওর মাকে বলেছিল বিয়ে করলে লতিফাকেই করবে। ওর মা বিলেত যাবার আগে ছেলের বিয়ে নিয়ে চাপাচাপি করেছিলেন কি-না তাই।

তারপর?

কাজী সাহেব আরেকটা বড় চুমুক দিলেন গ্লাসে। মুখটা মুছলেন। তারপর চোখ স্তিমিত করে বললেন, অনেকদিন পরে খাচ্ছি কি-না তাই কেমন কেমন লাগছে।

সে-কী, মাত্র দুপেগ তো খেয়েছেন।

আমি খাই-ই কম। আপনি নিন।

নেব। এটা খালি হোক। এখানে চিপস-টিপস কিছু—

বেয়ারা, চিপস।

সে বলল, চিপসের তো ব্যবস্থা নেই।

যেখান থেকে পার ব্যবস্থা কর। প্রায় হুংকার দিয়ে উঠলেন কাজী সাহেব। তার এ মূর্তি বাবর দেখেনি। উনি যে কাউকে ধমক দিতে পারেন সেটা একেবারে অচিন্তনীয়। অপ্রস্তুত হয়ে গেল বাবর। বলল, থাক না, আমি এমনি বলেছিলাম।

[ WORDS :- 3717]

_______________________________

ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের হাতে বেশি পরমাণু বোমা রয়েছে বলে জানাল সুইডেনের এক বিশেষজ্ঞ সংস্থা। আগেও নানা সংস্থার রিপোর্টে পাকিস্তানের হাতে বেশি সংখ্যক পরমাণু বোমা থাকার কথা উঠে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সংখ্যা দিয়ে পরমাণু বোমার উপযোগিতা বিচার করা যায় না। তা কত কিলোটনের বোমা তার উপরেই কার্যকারিতা নির্ভর করে। সুইডেনের বিশেষজ্ঞ সংস্থাটি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, পাকিস্তানের হাতে এখন ১৪০-১৫০টি পরমাণু বোমা রয়েছে। ভারতের হাতে আছে ১৩০-১৪০টি। চিনের হাতে রয়েছে পাকিস্তানের দ্বিগুণ, অর্থাৎ প্রায় ২৮০টি। ভারত, চিন ও পাকিস্তান ভূমি, আকাশ ও জল থেকে পরমাণু হামলা চালানোর উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও মান ক্রমাগত বাড়াচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা। সংস্থাটির মতে, ২০১৭ সালের গোড়ায় আমেরিকা-সহ ন’টি দেশের হাতে ১৪৪৬৫টি পরমাণু বোমা ছিল। তার মধ্যে উত্তর কোরিয়ার হাতে ছিল ১০ থেকে ২০টি। তার মধ্যে ৩৭৫০টি বোমা হামলা চালানোর উপযোগী অবস্থায় ছিল। ২০১৮ সালের গোড়ায় ওই ন’টি দেশের হাতে রয়েছে ১৪৯৩৫টি বোমা।

Pakistan has more nuclear weapons than India, said an expert from Sweden. Earlier, reports from various agencies showed that Pakistan had more and more nuclear bombs. However, experts say that the use of atomic bombs with only numbers can not be judged. It depends on the effectiveness of the Kiloton bomb on it. Sweden’s expert company reported in a report that Pakistan now has 140-150 nuclear bombs India has 130-140 China has twice the number of Pakistan, that is, about 280. India, China and Pakistan are continuously increasing the number and quality of missiles capable of carrying nuclear weapons from the ground, water and water. According to the agency, at the beginning of the year 2017, there were 14465 nuclear bombs in the hands of nine countries including America. Among them, North Korea had 10 to 20 weapons. Of them, 3750 bombs were in a suitable condition. At the beginning of the year 2018, there are 14935 bombs in the hands of the nine countries.

______________________________________