জানার ইচ্ছা: এক ধরণের রোগ এবং তপস্যা
এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে জানার (knowledge) মতো কিছুই নেই। জানার আকাঙ্ক্ষা এক ধরণের রোগ (disease), এক প্রকারের আসক্তি (addiction)। মানুষ প্রায়ই ভাবে যে তারা জানলে সব সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জানার ইচ্ছাই মানসিক অশান্তির মূল কারণ। মানুষ শুধু জীবনযাপন করার দক্ষতা অর্জন করলেই যথেষ্ট। জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বেঁচে থাকার সরলতাই মানুষের আসল প্রয়োজন।
জানার আকাঙ্ক্ষা এবং রোগের তুলনা
যেভাবে শারীরিক রোগ শরীরকে দুর্বল করে, ঠিক তেমনই জানার অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা মনকে অবসন্ন করে তোলে। একজন কৃষকের উদাহরণ ধরা যাক। সে যদি চাষাবাদের সহজ কৌশল জানে, তাহলে সে তার জীবন সুন্দরভাবে চালাতে পারে। কিন্তু যদি সে প্রতিনিয়ত বিশ্বের প্রতিটি প্রযুক্তি, প্রতিটি নতুন উদ্ভাবন জানার চেষ্টা করে, তবে সে নিজেই তার জীবনে অশান্তি ডেকে আনবে।
জানার আকাঙ্ক্ষা বনাম তপস্যা
তপস্যার মূল কথা হলো নিজেকে সংযমে রাখা। এই সংযমের মধ্যে একটি হল আত্ম-আরোপিত অজ্ঞতা (Self-Imposed Ignorance)। এই অজ্ঞতা মানে নিজের মস্তিষ্ককে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত করা। এটি সহজ নয়। এটি দীর্ঘ সাধনার ফল। যেমন একজন যোগী দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান করে তার মনকে স্থির করেন, তেমনি “কিছু না জানার” অবস্থায় পৌঁছানোর জন্যও অনেকদিনের অনুশীলন প্রয়োজন।
“জানার কিছু নেই” এবং বিয়োগ (বিয়োগাযোগ)
বিয়োগ হল সেই অবস্থা যেখানে মস্তিষ্ক জানার আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। এই প্রক্রিয়া একটি কঠোর তপস্যার মতো। এটি শুরুতে খুব কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে এই অবস্থা শান্তি এবং মুক্তি নিয়ে আসে।
উদাহরণ:
- বৈদিক ঋষি: প্রাচীন ঋষিরা অনেক জ্ঞান থাকলেও জানার ইচ্ছাকে সংযত করতেন। তারা বলতেন, “নেতি নেতি” অর্থাৎ “এটাও নয়, সেটাও নয়।” এর মাধ্যমে তারা জানার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারতেন।
- গ্রামের বৃদ্ধা মা: গ্রামের এক বৃদ্ধা মাকে দেখুন। তিনি হয়তো বড় বড় গ্রন্থ পড়েননি, কিন্তু জীবনযাপন দক্ষতায় তিনি একজন পণ্ডিত। তার কাছে জ্ঞান নয়, অভিজ্ঞতা এবং সরলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জানার ইচ্ছা এক ধরণের মানসিক রোগ এবং তা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হল আত্ম-আরোপিত অজ্ঞতা। এটি একটি তপস্যার মতো, যা আমাদের জানার বোঝা থেকে মুক্তি দেয় এবং প্রকৃত শান্তি দেয়। বাঁচার জন্য যা যা দরকার, কেবল তাই শেখা উচিত। বাকিটা জানা একপ্রকারের বিলাসিতা, যা আমাদের মনের স্থিরতা কেড়ে নেয়।
আথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা: জ্ঞান বা জানার আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত অর্থ
ব্রহ্মসূত্রের (Brahmastra) প্রথম সূত্র, “আথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা,” প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। এখানে ব্রহ্ম জানার আকাঙ্ক্ষা বলা হলেও, এর প্রকৃত অর্থ হল জানার ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে থামানো। এটি সেই অবস্থা যেখানে মস্তিষ্কের প্রশ্ন করার এবং জানার চক্রটি থেমে যায়। জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তিই আসল অর্জন।
জানার বোঝা এবং তার ফল
জীবনের পথে মানুষ জ্ঞান সংগ্রহ করে, তথ্য আর তত্ত্বের পাহাড় গড়ে তোলে। কিন্তু এই তথাকথিত “জ্ঞান”ই জীবনের শান্তি কেড়ে নেয়। যেমন:
- একজন ব্যক্তি যদি বিভিন্ন শাস্ত্র পড়ে এবং প্রতিটি বিষয়ই জানার চেষ্টা করে, তবে তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই জানার বোঝা তাকে সবসময় আরও জানার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
- উদাহরণস্বরূপ, একজন বৈজ্ঞানিকের কথা ভাবুন। সে যদি প্রতিটি জিনিসের কারণ আর ব্যাখ্যা জানার চেষ্টা করে, তাহলে তার মনের শান্তি থাকবে না।
জ্ঞান থেকে মুক্তি: সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা
আসল বুদ্ধিমত্তা হলো জানার ইচ্ছাকে সংযত করা।
- উদাহরণ ১: এক গরিব কৃষক, যে জানে কীভাবে ফসল ফলাতে হয়। সে তার নিজের জীবনে সুখী। কিন্তু একজন জ্ঞানী ব্যক্তি, যিনি প্রতিটি বিষয় জানার চেষ্টা করেন, তার জীবনে শান্তি কম।
- উদাহরণ ২: গ্রামে এক বৃদ্ধা আছেন, যিনি লেখাপড়া জানেন না, কিন্তু তার জীবনের অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তিনি কোনো অতিরিক্ত তথ্য জানার প্রয়োজন মনে করেন না।
জানার ইচ্ছার প্রকৃত রূপ
জানার ইচ্ছা এক ধরণের আসক্তি। মানুষ ভাবে, “আমি জানলে সুখ পাব।” কিন্তু বাস্তবে, জানার মধ্যেই দুঃখ লুকিয়ে থাকে। যেমন:
- একজন ধনী ব্যবসায়ী সব ধরনের ব্যবসা জানে। কিন্তু সে সবসময় নতুন কিছু জানার আকাঙ্ক্ষায় দুঃখ পায়, কারণ তার মনের তৃষ্ণা কখনও মেটে না।
- এক ঋষি, যিনি সবকিছু জানার পর এই উপসংহারে পৌঁছান যে জানার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। তার মস্তিষ্ক জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হয়, এবং তখনই তিনি প্রকৃত শান্তি পান।
ব্রহ্মজিজ্ঞাসার প্রকৃত অর্থ
“আথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা” আসলে বলে, “এখন জানার আকাঙ্ক্ষাকে ছেড়ে দাও।” ব্রহ্ম মানে শাশ্বত সত্য, যা জানার বাইরে। জানার আকাঙ্ক্ষা থামিয়ে যে শান্তি আসে, সেটাই ব্রহ্ম। জানার জন্য জ্ঞান নয়, বরং জানার ইচ্ছাকে সংযত করার ক্ষমতা দরকার।
জীবনে আসল বুদ্ধিমত্তা হলো জানার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা। জ্ঞান অর্জন করে আরেক সেট জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করা আসলে একপ্রকারের নির্বুদ্ধিতা। বরং, নিজেকে জানার বোঝা থেকে মুক্ত করা উচিত। জীবনযাপনের জন্য যা প্রয়োজন, শুধু সেটুকুই জানাই যথেষ্ট। বাকিটা জানা মানে নিজেকে দুঃখের দিকে ঠেলে দেওয়া।
জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভ্রান্তি: বুদ্ধের ব্যাধি এবং বিয়োগের মহিমা
গৌতম সিদ্ধার্থ, বুদ্ধ নামে পরিচিত, জ্ঞান প্রাপ্ত করেছিলেন। সে জ্ঞান তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করে নি , রোগ ও বার্ধক্য নিবারণ করে নি এবং অশেষ রোগে তাকে মৃত্যু বরণ করতে হয় । মূল কথা হলো যেটা আমরা “জানার” চেষ্টা করি, সেটা ইতিমধ্যেই অভিজ্ঞতার আকারে আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে আবার জানার চেষ্টা করা এক ধরণের মূর্খতা, এবং সেই জানা অভিজ্ঞতাকে আবার পুনরায় ভোগ করার ইচ্ছা আরও বড় মূর্খতা।
মানুষের চেতনাই যথেষ্ট, যা তাকে তার প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে। চেতনাই আমাদের খাদ্য, বিশ্রাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য সঠিক দিশা দেখায়। কিন্তু মনের মধ্যে যখন জানার প্রবৃত্তি জাগে, তখন সেই চেতনাকে দাসে পরিণত করা হয়। জ্ঞান বিক্রি করা, তত্ত্ব শেখানোর নামে মস্তিষ্ককে ভারাক্রান্ত করা আসলে ধূর্তদের কাজ। এরা নিজেদের প্রয়োজনে জ্ঞানের নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। দুষ্ট লোকেরা ভগবান দেখে, আর ফলাও করে সেই জ্ঞান বাজারে বিক্রি করে, মুর্খেরা তা ব্যাগে করে পয়সা দিয়ে কিনে আনে ।
জ্ঞানের ভার থেকে মুক্তি এবং মস্তিষ্কের রসায়ন
যখন কেউ জ্ঞান (knowledge) থেকে মুক্তি পায় এবং মস্তিষ্কের অতিরিক্ত বোঝা নামিয়ে ফেলে, তখন তার মস্তিষ্কে এক আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটে। এই মস্তিষ্ক তখন একধরণের “জীবন রস” বা “বায়ো-ওয়াইন” উৎপন্ন করে। এই রস আমাদের শরীরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।
- এই বায়ো-ওয়াইন: এটি মস্তিষ্ক থেকে নির্গত হয় এবং ধীরে ধীরে পেটে জমা হয় এবং সমস্তকোষে ছড়িয়ে পরে। এই অবস্থায় পেট হয়ে ওঠে “অমৃত কুম্ভ” বা অমৃতের পাত্র।
- বিয়োগের সাধনা: যারা বিয়োগের (ব্রেনের প্রশ্ন থামানোর সাধনা) পথে চলে, তারাই এই জীবন্ত অমৃত পান করতে সক্ষম হয়। এই অমৃতের স্বাদ নেওয়ার পর তাদের জীবন সত্যিকারের আনন্দে পূর্ণ হয়।
উদাহরণ:
- জীবনের ঘটনা: কেউ একজন জানার জন্য রাজ্য ছেড়ে বেরিয়েছিলেন। বহু বছর তপস্যা করার পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সব জ্ঞানই অবাস্তব। তার মস্তিষ্ক (brain) যখন জানার আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দেয়, তখনই তিনি প্রকৃত শান্তি লাভ করেন।
- এক সরল কৃষকের জীবন: সে শুধু তার জীবিকার জন্য কাজ করে এবং প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম থাকে। সে জানার ভার চাপিয়ে নিজের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে না। তার জীবন সহজ, কিন্তু গভীরতর সুখে ভরা।
জীবনে জানার ইচ্ছা, তত্ত্ব শেখা বা অভিজ্ঞতার পেছনে দৌড়ানো প্রকৃত সুখের পথে অন্তরায়। প্রকৃত সুখ তখনই আসে, যখন আমরা জানার ভার থেকে মুক্ত হই এবং মস্তিষ্ককে নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনি। যে মস্তিষ্ক জানার তৃষ্ণা থেকে মুক্ত, সেই মস্তিষ্ক থেকেই “অমৃতের ধার” প্রবাহিত হয়।
জ্ঞান আমাদের জীবনকে ভারাক্রান্ত করে; অজ্ঞান সাধনায় মুক্ত মস্তিষ্ক আমাদের জীবনকে আলোকিত করে। বিয়োগ সাধনার মাধ্যমে মনের এই অবস্থা অর্জন করা সম্ভব। তখনই দেহই অমৃত কুম্ভ হয়ে ওঠে, আর জীবনের প্রকৃত তৃপ্তি অনুভব করা যায়। অতএব, জ্ঞানের পেছনে দেশ-বিদেশে দৌড়ানো বন্ধ করে নিজের মধ্যে থাকা অমৃত কুম্ভের সন্ধান করুন।
গ্রন্থপঞ্জি (বিবলিওগ্রাফি)
- ব্রহ্মসূত্র
- লেখক: ব্যাদব্যাস বা বাদরায়ণ
- প্রকাশনার তারিখ: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০-২০০
- পাঠের কারণ: ব্রহ্মসূত্র বেদান্ত দর্শনের মূল ভিত্তি। এটি জীবনের সর্বোচ্চ সত্য বা ব্রহ্ম সম্পর্কে অনুসন্ধানের পথ নির্দেশ করে। এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কেন জানার ইচ্ছাকে দমন করা এবং আত্ম-স্বরূপে স্থিত হওয়া মানবজীবনের চরম লক্ষ্য।
- মহাপরিনির্বাণ সূত্র
- লেখক: বৌদ্ধ ভিক্ষুগন
- প্রকাশনার তারিখ: আনুমানিক 5ম শতাব্দী
- পাঠের কারণ: এই গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা এবং তার জীবন সম্পর্কে নির্দেশনা পাওয়া যায়।
- যোগসূত্র
- লেখক: পতঞ্জলি
- প্রকাশনার তারিখ: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০
- পাঠের কারণ: যোগসূত্রে মনের স্থিরতা এবং জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তির জন্য যোগের সাধনার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
- অষ্টাভক্র গীতা
- লেখক: অষ্টাভক্র
- প্রকাশনার তারিখ: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০
- পাঠের কারণ: এটি দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানার এবং অভিজ্ঞতার মায়া থেকে মুক্তির পথ দেখায়। যারা ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করতে চান তাদের জন্য এটি অপরিহার্য।
- অমৃতানুভূতি
- লেখক: জ্ঞানেশ্বর
- প্রকাশনার তারিখ: ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ
- পাঠের কারণ: এটি অমৃতের সন্ধান এবং আত্মার শাশ্বত আনন্দ অনুভব করার গভীর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখকের উপলব্ধি প্রকাশ করে।
Source: भट्टाचार्य तन्मयकृत वज्रजालतन्त्रे भास्वतीतन्त्रभाष्ये अज्ञान बिमर्ष ।
Date: 25th January 2025