কালিকাপুরাণম্ – পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত
বেদবিৎ পণ্ডিতগণ যাঁহাকে “অক্ষয়” (অবিনাশী) বলিয়া থাকেন, সেই সনাতন পরম জ্যোতিকে চিন্তা করিব।
প্রথম অধ্যায় – কামদেবের জন্ম
অতীব পবিত্র চিত্ত যোগিগণ ভবভয় ও ভবরোগ বিনাশের যোগ্য যাহাকে অবলম্বন করিয়া বন্দনা করেন, যিনি পদবিক্ষেপে পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও স্বর্গ এই তিনলোক অধিকার করিয়াছিলেন, সেই হরিপাদপদ্মযুগল (Vishnu) আবির্ভূত হইয়া তোমাদিগকে পবিত্র করুন। ১
যিনি সকল যোগিজনের চিত্তস্থিত অবিদ্যা-তিমির-বিনাশে সূৰ্য রূপিণী ও মতিগণের মুক্তির হেতু হইয়া থাকেন, যিনি নিখিল জীবকে মোহিত করেন বলিয়া বিষ্ণুমায়া (Vishnu Maya) নামে প্রসিদ্ধ এবং যিনি জন্মে শুদ্ধ (মানবগণের) কুমতি দূর করেন, তিনি তোমাদিগকে রক্ষা করুন। ২
নিত্যজ্ঞান-সম্পন্ন, জগতের আদি সেই পুরুষোত্তম ঈশ্বরকে (Vishnu) প্রণাম করিয়া কালিকা পুরাণ বলিতেছি। ৩
(একদা) কমঠাদি মুণিগণ হিমালয় সন্নিধানে অবস্থিত মুনিশ্রেষ্ঠ মার্কণ্ডেয়কে (Markandeye) প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন। ৪
ভগবন্! আপনি সৰ্ব্বশাস্ত্রের তত্ত্ব সম্যকরূপে বর্ণনা করিয়াছেন, ষড়ঙ্গের সহিত সমস্ত বেদ মন্থন করিয়া তাহার সারাংশ উত্তমরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন; সমস্ত বেদে ও অন্যান্য শাস্ত্রে আমাদের যে যে সংশয় ছিল, হে ব্ৰহ্মণ! সূর্য যেমন তমোজাল বিদূরিত করেন, সেইরূপ আপনি আমাদের সেই সেই সন্দেহ দূর করিয়াছেন। ৫-৬
হে চিরজীবী দ্বিজশ্রেষ্ঠ! আপনার প্রসাদে আমরা বেদে ও সকল শাস্ত্রে নিঃসংশয় হইয়াছি। ৭
হে ব্ৰহ্মন। ব্রহ্মা কর্তৃক কথিত সেই ধর্মশাস্ত্র, রহস্য গূঢ়তত্ত্ব সহিত আদ্যপান্ত আপনার নিকটে অধ্যয়ন করিয়া আমরা চরিতার্থ হইয়াছি। ৮
পুনরায় আপনার নিকটে শুনিতে ইচ্ছা করিতেছি যে, পুরাকালে কালী সংযমী মহেশ্বর শিবকে কিরূপে সতীরূপে মোহিত করিয়াছিলেন? যিনি সৰ্ব্বদা ধ্যাননিষ্ঠ সংসার বিমুখ সংযত সেই যতিবর হরকে কিরূপে বিচলিত করিয়াছিলেন? সুশোভনা সতী দক্ষপত্নীতে কিরূপে উৎপন্ন হইলেন এবং কেমন করিয়া শিব তাহাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক ছিলেন? পুরাকালে সতীই বা কি হেতু দক্ষের প্রতি কোপবশতঃ নিজ দেহ ত্যাগ করিলেন এবং হিমালয়ের কন্যা হইয়া পুনঃ জন্মগ্রহণ করিয়া আসিলেন কেন? এবং পুনরায় কামরিপু শিবের অর্ধশরীরভাগিনী হইলেন কেন? হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, এই সমস্ত বিষয় সবিস্তারে বর্ণনা করুন। আপনার মত সংশয় দূর করিতে অন্য কেহ নাই এবং কেহ হইবেনও না। সুতরাং এই সমস্ত বিষয় যাহাতে আমরা জানিতে পারি, হে আত্মজ্ঞানসম্পন্ন বিপ্ৰশ্রেষ্ঠ, আপনি তাহা করুন।* ৯-১৪
[* “তৎ কুরুষ সদার্থবৎ” এইরূপ পাঠও আছে। তাহার অর্থ;-আমরা যাহাতে তাৎপৰ্যসমেত ইহা বুঝিতে পারি, আপনি সর্বদা তাহা করুন।” “তংকুরুবৈতদাত্মবিৎ” এই পাঠানুসারে অনুবাদ করিয়াছি।]
মার্কণ্ডেয় কহিলেন;-সেই সাতিশয় গোপনীয়, বাঞ্ছাকল্পতরু, জ্ঞানজনক পরম পবিত্র মঙ্গলকর আখ্যান আজ মুনিমণ্ডলী সকলে শ্রবণ করুন। ১৫
পূৰ্বে ব্রহ্মা, মহাত্মা নারদকর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া তাহার নিকট ইহা প্রকাশ করেন। অনন্তর, সেই নারদও বালখিল্যগণসকাশে তৎসমস্ত কীর্তন করেন। ১৬
তৎপরে বালখিল্য মুনিগণ, আবার যবক্রীত মুনিকে বলেন। তিনি আবার অসিত ঋষির নিকটে ব্যক্ত করেন। ১৭
হে দ্বিজগণ! অসিত ঋষি আমাকে ইহা বিস্তৃতরূপে বলিয়াছেন। পরমাত্মা জগদীশ্বর চক্রপাণিকে প্রণাম করিয়া এই পুরাতন উপাখ্যান আমি তোমাদিগের নিকট বলিতেছি। ১৮
যিনি ব্যক্ত অব্যক্ত সৎ অসৎ স্থল সূক্ষ্ম ও জ্ঞান অজ্ঞানরূপে বিরাজমান, যিনি নিত্য, নিত্যজ্ঞানরূপী, নির্বিকার, চৈতন্যময়, কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ মদ-মাৎসর্য এই ছয়টি ভীষণ তরঙ্গ যাহাকে আক্রমণ করিতে পারে না, যিনি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়কারী হইয়াও উদাসীন; সেই কালরূপী সৰ্বব্যাপক জগন্নিবাস বিশ্বরূপ ঈশ্বরকে (Vishnu) প্রণাম। ১৯-২১
বেদবেদাঙ্গ বেত্তা যোগিগণ যাঁহাকে চিন্তা করেন; সেই হৃদয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত পরম জ্যোতির্ময়কে (Hiranya Garva) প্রণাম করি। ২২
ভগবান্ লোক-পিতামহ ব্রহ্মা তাহার আরাধনাফলেই সুরাসুর-নর-প্রভৃতি যাবতীয় প্রজা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছেন। ২৩
Sandha
বিধাতা, দক্ষ প্রভৃতি প্রজাপতিগণকে সৃষ্টি করিয়া যখন, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বসিষ্ঠ, ভৃগু ও নারদ এই দশজন মানব পুত্র সৃষ্টি করেন, তখন তাহার মন হইতে, এক পরম রূপবতী উত্তম রমণী আবির্ভূত হন। তিনি সন্ধ্যা নামে বিখ্যাত। এই সন্ধ্যাই সায়ংকালে অর্চিত হইয়া থাকেন।* ২৪-২৫
[* ১। “সায়ংসন্ধ্যাং যজন্তিযাং”। ২। “সায়ংসন্ধ্যা জয়ন্তিকা”। ৩। সায়ংসন্ধ্যা বরান্তিকা” এই তিন প্রকার পাঠ আছে। আমরা মূলে প্রথমোক্ত পাঠের ব্যাখ্যা করিয়াছি। “ইনি সর্বোৎকৃষ্টা সায়ংসন্ধ্যাধিষ্ঠাত্রী দেবী” ইহা ২ পাঠের অর্থ। “এই সন্ধ্যা দক্ষ প্রভৃতির জ্যেষ্ঠা ভগিনী তুল্য” ইহা ৩ পাঠের অর্থ।]
তাদৃশ সম্পূর্ণ-গুণ-শালিনী রমণী, তৎকালে স্বর্গ-মর্ত্য পাতালে ছিল না; তৎপূৰ্বে বা পরেও হয় নাই, হইবেও না। ২৬
হে দ্বিজোত্তমগণ! এই সন্ধ্যা স্বভাব সুন্দর সুনীল কুন্তলভারে বর্ষাকালীন ময়ূরীর ন্যায় বিরাজ করিতে লাগিলেন। ২৭
ইহার আকৰ্ণবিলম্বী অলকগুচ্ছ-শোভিত আপাটল ললাটদেশ, ইন্দ্রধনু বা নবীন শশধরের ন্যায় শোভা পাইল। ২৮
চকিত হরিণীনয়নবৎ চঞ্চল, প্রফুল্ল-নীল-কমল-সন্নিভ তদীয় নয়নযুগল বড়ই শোভা পাইল। ২৯
হে দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! তাহার স্বভাব-চপল আকৰ্ণবিস্তৃত পরম রমণীয় ভ্রমরকৃষ্ণ যুগল মদনশরাসনের সদৃশ। ৩০
তিলকুসুম-সদৃশ তদীয় নাসিকা ভ্রূ মধ্যের অধোদেশ হইতে নিম্নাভিমুখে আয়ত ও উন্নত। বুঝি ললাটের লাবণ্যই আধিক্যবশতঃ তথা হইতে বিগলিত হইয়া নাসিকা রূপে পরিণত হইয়াছিল। ৩১
কোকনদপ্রভ পূর্ণচন্দ্র সদৃশ কামিজন-মনোহর তদীয় বদনমণ্ডল বিম্বফলসম–অধরোষ্ঠের অরুণ কান্তিযোগে নিরতিশয় শোভা পাইতেছিল। ৩২
যাহার সৌন্দর্য্য ও লাবণ্যগুণে বদনমণ্ডলের পরিপূর্ণতা,–চিবুকের নিকট আসিবার জন্যই যেন তদীয় স্তনযুগলের উদ্যম। হে বিপ্রগণ! তাঁহার সেই কমলকলিকাকৃতি, উত্তুঙ্গ, পীবর পরস্পরসংসক্ত শ্যামাগ্র স্তনযুগল দেখিলে মুনিরাও মোহিত হইতেন। ৩৩
তাহার ত্রিবলি-শোভিত ক্ষীণ কটিদেশ, বসনের ন্যায় মুষ্টি-গ্রাহ্য। তাহার কটিদেশকে সকলেই কামদেবের শক্তি বলিয়া মনে করিয়াছিল। ৩৪
করভ-কর-প্রমাণ আনত করিকর-সদৃশ স্থূল-মূল মন্থরগমনোপযোগী তদীয় সুকোমল ঊরুযুগল দীপ্তি পাইয়াছিল। ৩৫
ফুল্লকমলারুণ সুন্দরপার্ষ্ণি-বিরাজিত তদীয় চরণদ্বয় কুসুম-শর-শরনিকর সদৃশ অঙ্গুলীদলে সমধিক শোভমান হইয়াছিল। ৩৬
সেই চারুদর্শন তনুলোমাবলি বিরাজিতা কৃশাঙ্গী স্মেরবদনা বিশালনয়না চারুহাসিনী, রমণীয় শ্রুতিপুটশালিনী সুলক্ষণ। সুন্দরীকে দেখিয়া বিধাতা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন। ৩৭-৩৮।
সেই বরবৰ্ণিনীকে দেখিয়া দক্ষ প্রভৃতি প্রজাপতিগণ ও ব্রহ্মার মরীচি প্রভৃতি মানস পুত্রগণ সকলেই নিতান্ত ঔৎসুক হইয়া ভাবিতে লাগিলেন। ৩৯
এই বরবৰ্ণিনী সৃষ্টিমধ্যে কি করিবেন; কাহারই বা হইবেন; ইহাই তাহারা সকলে ঔৎসুক্যসহকারে ভাবিয়াছিলেন। ৪০
Kamadeva
হে মুনিবরগণ! ব্রহ্মা এইরূপ চিন্তা করিতে থাকিলে কাঞ্চন-চূর্ণবৎ-পীতবর্ণ এক মনোহর চঞ্চল পুরুষ তাহার মন হইতে আবির্ভূত হইয়া নিঃসৃত হইলেন। ৪১
তাঁহার বক্ষঃস্থল পীবর, নাসিকা সুচারু, ঊরু কটি ও জঙ্ঘা সুবৃত্ত, কুন্তলবর নীল কুঞ্চিত, ভ্রূযুগল পরস্পর সংলগ্ম। মুখমণ্ডল পূর্ণচন্দ্র সদৃশ। ৪২
তাহার সুবিশাল বক্ষঃস্থল লোমাবলিশোভিত; বাহুযুগল ঐরাবতকরবৎ পীবর ও সুবৃত্ত; করতল, চক্ষু, মুখ, পদতল ও নখরশ্রেণী আরক্তবর্ণ। ৪৩
তাহার ক্ষীণ কটিদেশ, মনোহর দন্তপংক্তি, মত্তহস্তীর ন্যায় গমন, প্রফুল্ল কমলবৎ লোচন, বকুলপুষ্পের ন্যায় গাত্ৰ-সৌরভ। তিনি কম্বুগ্রীব, উন্নতকায়, মীনকেতু, মকর-বাহন। ৪৪
পুষ্পময় পঞ্চশরে ও কুসুমকার্মুকে শোভিত সেই কমনীয় পুরুষ স্বীয় নয়ন যুগল ঘুরাইতেছিলেন। ৪৫
দক্ষ প্রভৃতি প্রজাপতিগণ ও ব্রহ্মার মরীচি প্রভৃতি দশজন মানসপুত্র বিস্মিতচিত্তে সেই সুগন্ধপবন-সহচর শৃঙ্গাররস সেবিত তথাবিধ পুরুষকে অবলোকন করিয়া সাতিশয় উৎকণ্ঠিত ও মনোবিকার প্রাপ্ত হইলেন। ৪৬-৪৭
সেই পুরুষও সৃষ্টিকর্তা জগৎপতি বিধাতাকে দেখিয়া প্রণামপূর্বক বিনয়-নম্র ভাবে বলিলেন;–হে ব্ৰহ্মন্! আমি কোন্ কাৰ্য্য করিব? আমি যখন পুরুষ, তখন কাৰ্য্য করাই আমার পক্ষে উচিত, অতএব হে বিধাতঃ আমাকে প্রশস্ত ন্যায্য কর্মে নিযুক্ত করুন। ৪৮-৪৯
হে লোকেশ! আমার অনুরূপ নাম ধাম ও পত্নী করিয়া দিন। যেহেতু আপনি জগতের সৃষ্টিকর্তা। ৫০
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–ব্রহ্মা, সেই মহাত্মা পুরুষের এবংবিধ বাক্য শ্রবণ করিয়াও ক্ষণকাল মৌনভাবে রহিলেন। সৃষ্টি তাহার নিজকৃত হইলেও তিনি তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছিলেন। ৫১
অনন্তর ব্রহ্মা, সম্পূর্ণরূপে বিস্ময় পরিত্যাগপূর্বক চিত্ত সুস্থির করিয়া সেই পুরুষকে তাঁহার কর্তব্য উপদেশ করত বলিলেন। ৫২
তুমি তোমার এই মনোমোহন মূর্তি ও পুষ্পময় পঞ্চশরে স্ত্রী-পুরুষদিগকে মোহিত করত চিরস্থায়িনী সৃষ্টির প্রবর্তক হও। ৫৩
দেব, গন্ধৰ্ব্ব, কিন্নর, সর্প, দৈত্য, দানব, বিদ্যাধর, রাক্ষস, যক্ষ, পিশাচ, ভূত, বিনায়ক, গুহ্যক, সিদ্ধ, মনুষ্য, পশু, পক্ষী, মৃগ, কীট, পতঙ্গ এবং জলজ প্রাণিগণ, সকলেই তোমার শরব্য হইবে। ৫৪-৫৬
হে পুরুষপ্রবর! অন্য প্রাণীর কথা দূরে থাক, আমি, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর আমরাও তোমার বশবর্তী হইব। ৫৭
তুমি স্বয়ং প্রচ্ছন্নরূপে প্রাণিগণের হৃদয়ে প্রবেশ করত সতত সুখজনক হইয়া সনাতন সৃষ্টির (eternal biological creative force) প্রবর্তক হও। ৫৮
সকল প্রাণীর মনই, তোমার পুষ্পবাণের প্রধান লক্ষ্য হইবে। তুমি উহাদিগের সতত মত্ততা ও আনন্দ সম্পাদন করিবে। ৫৯
আমি তোমার এই সৃষ্টিপ্রবর্তনোপযোগী কৰ্ম্ম নির্দেশ করিয়া দিলাম, যাহা অনুরূপ হয়, তোমার তাদৃশ নামকীর্তনও করিব। ৬০
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সুরজ্যেষ্ঠ বিধাতা এই কথা বলিয়া মানস পুত্রদিগের মুখের দিকে দৃষ্টিপাতপূর্বক ক্ষণমধ্যে পদ্মাসনে উপবিষ্ট হইলেন। ৬৯
কালিকাপুরাণে প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত। ১
দ্বিতীয় অধ্যায় – কাম-বিক্রম
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর, মরীচি অত্রি প্রভৃতি সেই মুনিগণ, ব্রহ্মার অভিপ্রায় বুঝিয়া সেই পুরুষের অনুরূপ নামকরণ করিয়াছিলেন। ১
আর সেই দক্ষ প্রভৃতি প্রজাপতিগণ, ব্রহ্মা মুখের দিকে চাহিলেন দেখিয়াই বৃত্তান্ত বুঝিয়া তাহার উপযুক্ত স্থান নির্দেশ ও পত্নী দান করিয়াছিলেন। ২
হে দ্বিজোত্তমগণ। মরীচি প্রভৃতি বিপ্ৰমণ্ডলী, নিশ্চয় করিয়া এই পুরুষের নিকট সঙ্গতভাবে তদীয় নাম কীর্তন করিতে লাগিলেন। ৩
যেহেতু তুমি আমাদিগের এবং বিধাতার চিত্ত মথিত করিয়া উৎপন্ন হইয়াছ, এইজন্য লোকে তুমি মন্মথ নামে অভিহিত হইবে। ৪
তুমি জগতের অসাধারণ কামরূপী; তোমার সদৃশ কেহ নাই। অতএব হে মনোভব! তুমি কাম নামে বিখ্যাত হও। ৫
লোককে মত্ত কর বলিয়া তোমার নাম মদন; আর তুমি মহাদেবের দর্পনাশে সমর্থ বলিয়া দর্পক এবং কন্দর্প নামে জগতে বিখ্যাত হইবে। ৬
তোমার পঞ্চশরের যে রূপ পরাক্রম; বৈষ্ণবাস্ত্র, রৌদ্রাস্ত্র এবং ব্রহ্মাস্ত্রেরও তাদৃশ পরাক্রম নহে। ৭
স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল বা সনাতন ব্রহ্মলোক–সকল স্থানেই তুমি থাকিবে; যেহেতু তুমি সৰ্বব্যাপী। অধিক বলিয়া কি হইবে? ফল কথা এই যে, তোমার সমান কেহ নাই। ৮
তৃণ হউক আর বনস্পতিই হউক, প্রাণী যে যে স্থানে থাকিবে, ব্ৰহ্মসভা হইতে তত্তৎ সমুদয় স্থানই তোমার হইবে। ৯
হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! এই আদি প্রজাপতি স্বয়ং দক্ষই তোমার ইচ্ছামত শোভনা পত্নী প্রদান করিবেন। ১০
আর ব্রহ্মার মানসজাতা এই সুন্দরী কন্যা ত্রিভুবনে সন্ধ্যা নামে বিখ্যাতা হইবেন। ১১
যেহেতু এই বরবৰ্ণিনী ব্রহ্মার সম্পূর্ণ ধ্যানসময়ে উৎপন্ন হইয়াছেন, সেইজন্য জগতে ইহার ‘সন্ধ্যা’ বলিয়া প্রসিদ্ধি হইবে। ১২
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–হে দ্বিজবরগণ! সেই মুনিগণ, এই কথা বলিয়া ব্রহ্মার মুখাবলোকনপূর্বক তাহার সম্মুখে বিনয়-নম্রভাবে মৌনী হইয়া রহিলেন। ১৩
হে দ্বিজোত্তমগণ! অনন্তর কামদেব-রমণী ভ্রূ-সদৃশ বক্র, উন্মাদননামক কুসুমনিৰ্মিত শরাসন এবং হর্ষণ, রোচন, মোহন, শোষণ ও মারণ নামে প্রসিদ্ধ, মুনিদিগেরও জ্ঞাননাশক, পুষ্পময় পঞ্চশর গ্রহণ করিয়া সেইখানেই প্রচ্ছন্নরূপে অবস্থিতি করা কর্তব্য চিন্তা করিতে লাগিলেন। ১৪-১৬
ব্রহ্মা আমার যে নিত্যকৰ্ম্ম স্থির করিয়া দিয়াছেন, তাহার পরীক্ষা এই খানে মুনিগণ সন্নিধানেই এই ব্রহ্মার উপরেই করিয়া দেখি। ১৭
এখানে মুনিগণ আছেন; দক্ষ প্রজাপতি আছেন; স্বয়ং ব্রহ্মাও আছেন, আর এই বরাঙ্গনা সন্ধ্যাও এখানে অবস্থিত। ১৮
এই সকল পুরুষ এবং সন্ধ্যাও আজ আমার শরব্য হইবেন। ১৯
“অন্য প্রাণীর কথা দূরে থাক, আমি বিষ্ণু এবং মহাদেবও তোমার অস্ত্রের বশবর্তী” ব্রহ্মা এখনই এই কথা বলিয়াছেন। আমি আজি তাহা সার্থক করিব। ২০
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–কামদেব ইহা মনে মনে চিন্তা করিয়া স্থির করিলেন। অনন্তর, তিনি কুসুমশরাসনের কুসুমগুণে শরযোজনা করিলেন। ২১
তখন ধনুর্ধরপ্রধান কামদেব আলীঢ়-প্রণালী-অনুসারে উপবেশন করত যত্নপূর্বক শরাসন আকর্ষণ করিয়া বলয়াকার করিলেন। ২২
হে মুনিবরগণ! তিনি কার্মুকে শরসন্ধান করিলে, তথায় পরমানন্দকারী সুগন্ধ অনিল বহিতে লাগিল। ২৩।
অনন্তর, মদন, ব্ৰহ্মা দক্ষাদি-প্রজাপতি ও ব্রহ্মার সমস্ত মানস পুত্রগণকে পৃথক পৃথক্ কুসুমশরপ্রহারে মোহিত করিলেন। অনন্তর, শরপীড়িত সেই সমস্ত মুনি এবং ব্রহ্মা মোহিত হইয়া মনে মনে কিঞ্চিৎ বিকার প্রাপ্ত হইলেন। ২৪-২৫
তাহারা সকলে বিকার প্রাপ্ত হইয়া বারংবার সন্ধ্যার দিকে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন; দেখিতে দেখিতে তাহাদিগের অত্যন্ত কাম বৃদ্ধি হইল। কেননা, রমণী হইতেই কামবৃদ্ধি হইয়া থাকে। ২৬
তখন সেই দুষ্ট মদন তাহাদিগকে পুনঃপুনঃ মোহিত করিয়া, যাহাতে তাহাদিগের বহিরিন্দ্রিয়ের বিকার হয়, তাহা করিল। ২৭
অনন্তর যখন ব্রহ্মা, উদগতেন্দ্রিয় হইয়া সন্ধ্যাকে দেখিতে লাগিলেন, তখন তাহার শরীর হইতে একোন-পঞ্চাশৎ সাত্ত্বিক ভাবের আবির্ভাব হইল। ২৮
তাহারা সন্ধ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে থাকিলে সন্ধ্যাও বারংবার কটাক্ষ পাত ও কটাক্ষসঙ্কোচ প্রভৃতি মদন-শরপাত-সনভূত বিবিধ ভাবপ্রকাশ করিতে লাগিলেন। ৩০
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ উঠিলে, মন্দাকিনীর যেমন শোভা হয়, তদ্রূপ স্বভাবসুন্দরী সন্ধ্যাদেবীও মদন-বিকার-জনিত সেই সেই ভাব প্রকাশ করত অত্যন্ত শোভা পাইয়াছিলেন। ৩১
অনন্তর বিধাতা সেই ভাববতী সন্ধ্যাকে(Sandhya) অবলোকন করিতে করিতে বিধাতার শরীরে স্বৈদজলধারা বহিতে লাগিল; তিনি সন্ধ্যার প্রতি অভিলাষী হইলেন। ৩২
অনন্তর মরীচি, অত্রি প্রভৃতি সেই সমস্ত মুনি ও দক্ষ-প্রমুখ মুনিবরগণও ইন্দ্রিয়বিকার প্রাপ্ত হইলেন। ৩৩
তখন মদন, বিধাতাকে, দক্ষ-মরীচি-প্রমুখ মুনিগণকে এবং সন্ধ্যাকে তথাবিধ বিকার প্রাপ্ত অবলোকন করিয়া আপনার কৰ্ম্মপটুতার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিলেন। ৩৪।
ব্রহ্মা আমার যে কৰ্ম্ম কৰ্তব্য বলিয়া নির্দেশ করিয়া দিয়াছেন, আমি তাহা করিতে পারি, তাহার এই আত্মাদরবর্ধক বিশ্বাস জন্মিয়াছিল। ৩৫
ইত্যবসরে, আকাশচারী মহাদেব (Mahdeva) ব্রহ্মাকে এবং দক্ষ-সমেত মানস পুত্র গণকে তাদৃশ বিকারপ্রাপ্ত অবলোকন করিয়া হাস্য উপহাস করিলেন। ৩৬
হে দ্বিজবরগণ! বৃষধ্বজ তাহাদিগকে ধিক্কার প্রদানপূর্বক পুনঃপুনঃ হাস্য করত লজ্জিত করিয়া এই কথা বলিলেন,–অহে ব্ৰহ্মা। নিজের তনয়াকে দেখিয়া তোমার কি না কামভাব উপস্থিত হইল! ছিঃ! যাহারা বেদানুসারে চলে, এ কাজ তাহাদিগের যোগ্য নহে। ৩৭-৩৮
পুত্রবধূ ও কন্যা মাতৃতুল্য; ইহা বেদের সিদ্ধান্ত। তুমিই এই সিদ্ধান্তের প্রকাশক। বিধি! তুমি সামান্য কামের প্রভাবে তাহা বিস্মৃত হইলে কিরূপে? ৩৯
হে চতুরানন! ধৈৰ্য্য তোমার মনকে সর্বদা সতর্ক করিয়া রাখে। বিধি! তথাপি ক্ষুদ্রকাম কি না তোমার সে মন বিগড়াইয়া দিল। ৪০
হে একান্তযোগী, সৰ্ব্বদা দিব্যদর্শী দক্ষ মরীচি প্রভৃতি মানস পুত্রগণ! কি তোমরা রমণীলোলুপ হইলে! ৪১
ছিঃ! আজ কি না মন্দবুদ্ধি কামের বাসনা পূর্ণ হইল! অবসরানভিজ্ঞ স্বল্পবুদ্ধি কাম তোমাদিগকে শরব্য করিল! ৪২
হে মুনিবরগণ! কামিনী হঠাৎ যাহার ধৈৰ্য্য লোপ করিয়া চিত্ত চঞ্চল করে, তাহাকে ধিক্। ৪৩
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–মহাদেবের এই কথা শুনিয়া লজ্জাবশে ব্ৰহ্মার ক্ষমধ্যে দ্বিগুণ ঘৰ্ম্ম হইতে লাগিল। ৪৪
চতুরানন সেই কামরূপিণী সন্ধ্যাকে গ্রহণ করিতে ইচছুক হইলেও অতঃপর ইন্দ্রিয়বিকার সম্বরণ করিলেন, তাহাকে আর গ্রহণ করিলেন না। ৪৫
হে দ্বিজবরগণ! তাহার শরীর হইতে যে ঘৰ্ম্মজল পতিত হইয়াছিল, তাহা হইতে অগ্নিষ্বাত্ত ও বর্হিষদ পিতৃগণ উৎপন্ন হইলেন। ৪৬।
তাঁহাদিগের সকলের বর্ণ দলিতাঞ্জন-সদৃশ; নয়ন ফুল্ল-কমল-সন্নিভ। তাঁহারা সকলেই অত্যন্ত যতি, পরম পবিত্র এবং সংসার পরাঙ্মুখ। ৪৭।
হে দ্বিজগণ। কথিত আছে, অগ্নিষ্বাত্তগণ চতুঃষষ্টি সহস্র; বর্হিষদগ ষড়শীতি সহস্র। ৪৮
দক্ষ-শরীর হইতে যে ঘৰ্ম্মজল ভূমিতলে পতিত হইয়াছিল, তাহা হইতে নিখিল গুণশালিনী এক কোমল-কৃশাঙ্গী বরবৰ্ণিনী উৎপন্ন হইলেন। ৪৯
তাহার মধ্য ক্ষীণ; লোমাবলি স্বল্প; দশনপংক্তি মনোহর; এবং বর্ণ তপ্ত কাঞ্চনবৎ সুচারু। ৫০
ক্রতু, বসিষ্ট, পুলস্ত এবং অঙ্গিরা ব্যতীত মরীচি প্রভৃতি অপর ছয় জন ঋষি, ইন্দ্রিয়বিকার-নিরোধে সমর্থ হইয়াছিলেন। ৫১
হে দ্বিজগণ! ক্রতু প্রভৃতি বারজন ঋষির যে ঘৰ্ম্মজল ভূতলে পতিত হইয়াছিল, তাহা হইতে অপর পিতৃগণ উৎপন্ন হইলেন। ৫২
তাহার সোমপ, আজ্যপ, সুকালিন্ এবং হবির্ভুজ, (হবিষ্মন্ত) নামে বিখ্যাত, তাহারা সকলেই কব্যবাহী। ৫৩
সোমপগণ ক্রতুর পুত্র; সুকালিনগণ বসিষ্ঠের পুত্র; আজ্যপগণ পুলস্ত্যের পুত্র; এবং হবিষ্মন্তগণ অঙ্গিরার পুত্র। ৫৪
হে বিপ্রশ্রেষ্ঠগণ! অগ্নিষ্বাত্ত প্রভৃতি সেই কব্যবাহী লোক-পিতৃগণ চারিদিকে উৎপন্ন হইলে ব্ৰহ্মা (Brahma) সৰ্ব্বভূতেরই পিতামহ হইলেন। আর সন্ধ্যা পিতৃগণের জননী হইলেন। কেননা সন্ধ্যা তাহাদিগের গর্ভধারিণী না হইলেও উৎপত্তির নিদান বটে। ৫৫-৫৬
অনন্তর পিতামহ, শঙ্করের কথায় লজ্জিত হইয়া তৎক্ষণাৎ কন্দর্পের প্রতি ক্রুদ্ধ হইলেন। ক্রোধে তাহার বদনমণ্ডল ভ্রূকুটীভীষণ হইল। ৫৭
সেই অপরাধী মন্মথও প্রথম হইতেই ব্রহ্মার অভিপ্রায় বুঝিয়া তাহার ও মহাদেবের ভয়ে সত্বর শরাসন গোপন করিল।* ৫৮
[* “শরান্ ন সঞ্জহারাশু” এই পাঠ থাকিলে তাহার অর্থ “তিনি যোজিত শর পরিত্যাগ করিলেন না” এইরূপ হইবে।]
হে দ্বিজবরগণ! অনন্তর লোকপিতামহ ব্রহ্মা রোষাবিষ্ট হইয়া যাহা করিলেন, একাগ্ৰমনে তাহা শ্রবণ কর। ৫৯
দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ২
তৃতীয় অধ্যায় – রতিপরিণয়
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–অনন্তর পূর্ণ রোষাবিষ্ট জগৎপতি ব্রহ্মা, দিধক্ষু অনলের ন্যায় অত্যন্ত প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। ১
ঈশ্বরকে (Eesan) বলিতে লাগিলেন; হে শিব! কাম যেমন আপনার সম্মুখে আমাকে শরাঘাত করিল, সেইরূপ ফল পাইবে। ২।
হে দেবাদিদেব! এই কন্দর্প অহঙ্কারে মত্ত হইয়া অতি দুষ্কর কর্ম সাধন পূর্বক আপনার নয়নানলে ভস্মীভূত হইবে। ৩
হে দ্বিজসত্তমগণ! ব্যোমকেশ ও সংযতচিত্ত মুনিগণের সমক্ষে স্বয়ং বিধাতা এইরূপে কামকে শাপ দিয়াছিলেন। ৪
অনন্তর রতিপতি নিদারুণ শাপশ্রবণে ভীত হইয়া অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগপূর্বক তাহাদিগের সমক্ষে প্রাদুর্ভূত হইলেন। ৫
দক্ষ মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণসমক্ষে ব্রহ্মাকে যথার্থ কথা বলিতেও তাহার কণ্ঠস্বর ভয়ে জড়িত হইতে লাগিল। ভয় হইলে কাহারও ধৈর্য্য ও সাহসাদি গুণ থাকে না। ৬
মন্মথ বলিলেন,–হে ব্ৰহ্মন্! আমি ন্যায্যপথানুবর্তী নিরপরাধ; হে লোকেশ! তবে আমাকে কি জন্য অতি দারুণ শাপ দিলেন? ৭।
আপনি আমাকে যে কাৰ্য্য করিতে বলিয়াছেন, প্রভো! আমি তাহাই করিয়াছি; অন্য কিছু করি নাই; তাহাতে আমাকে শাপ দেওয়া আপনার অনুচিত হইয়াছে। ৮।
আপনি যে বলিয়াছিলেন, “আমি, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর আমরা সকলেই তোমার বশবর্তী,” আমি তাহারই পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি মাত্র। ৯
হে ব্ৰহ্মন্! এ বিষয়ে আমার কিছুমাত্র অপরাধ নাই। হে জগৎপতে। নিরপরাধে আমার প্রতি প্রদত্ত এই নিদারুণ শাপ মোচন করুন। ১০
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–তাহার এই কথা শুনিয়া জগৎপতি বিধাতা সেই সংযত-চিত্ত মদনকে অত্যন্ত আনন্দিত করত উত্তর প্রদান করিলেন। ১১
ব্ৰহ্মা বলিলেন,–এই সন্ধ্যা, আমার কন্যা, তুমি আমাকে ইহার প্রতি কামভাবাপন্ন করিতে লক্ষ্য করিয়াছিলে বলিয়া আমি তোমাকে শাপ দিয়াছি। ১২
এখন আমার ক্রোধ-শান্তি হইয়াছে। মনোভব! যেরূপে শাপ মোন হইবে, তাহা তোমাকে বলিয়া দিতেছি। ১৩
মদন! তুমি মহাদেবের নয়নানলে ভস্মীভূত হইয়া পশ্চাৎ তাহার অনুগ্রহে আবার শরীর পাইবে। ১৪
যখন, দেবাদিদেব মহাদেব দারপরিগ্রহ করিবেন; তখন তিনিই তোমাকে শরীরী করিবেন। ১৫
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–লোক-পিতামহ ব্রহ্মা মদনকে এই কথা বলিয়া মানস সম্ভূত মুনিবরগণের সমক্ষেই অন্তর্হিত হইলেন। ১৬
সৰ্ববিধাতা ব্রহ্মা অন্তর্হিত হইলে, মহাদেব, বায়ুবৎ শীঘ্রগামী বৃষভে আরোহণপূর্বক অভিলষিত স্থানে গমন করিলেন। ১৭
বিধাতা অন্তর্হিত হইলে এবং মহাদেব নিজালয়ে গমন করিলে, দক্ষ মদনের পত্নী নির্দেশ করিলেন। ১৮
দক্ষ তাহাকে বলিলেন,–কন্দর্প! এই আমার দেহজাত কন্যা; আমার রূপ গুণ ইহাতে বিদ্যমান; ইনি গুণে তোমার অনুরূপা বটে; ইহাকে বিবাহ কর। ১৯
এই মহাতেজস্বিনী রমণী তোমার সতত সহচারিণী এবং তোমার ইচ্ছানুসারে ধর্মতঃ বশবর্তিনী হইবেন। ২০
Rati
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–দক্ষ এই কথা বলিবার পর নিজ শরীরের স্বেদজল-সম্ভূত কন্যাকে সম্মুখে করিয়া তাহাকে রতি নামে অভিহিত করত কন্দর্পের হস্তে সম্প্রদান করিলেন। ২১
মদন, সেই রতি-নাম্নী মনোহরা রমণীকে নিরীক্ষণ করিবামাত্র নিজ শরে বিদ্ধ হইয়া রতি-অনুরাগে মুগ্ধ হইলেন। ২২
সৌদামিনীর ন্যায় অতিশয় গৌরবর্ণা সেই চঞ্চলাপাঙ্গী মৃগনয়না রমণী তাঁহারই অনুরূপ ভাৰ্য্যা হইয়া বড় শোভা পাইলেন। ২৩
মদন তাহার ভ্রুযুগল দেখিয়া সংশয় করিয়াছিলেন যে, বিধাতা কি আমার উন্মাদন নামক শরাসন এই রমণীতে নিবেশিত করিয়াছেন? ২৪
হে দ্বিজবরগণ! মদন, তদীয় কটাক্ষের আশুগামিতা দেখিয়া স্বীয় অস্ত্র গণের আশুগতা বা চারুতার উপর বীতশ্রদ্ধ হইলেন। ২৫
মদন, তাঁহার স্বভাব সুগন্ধ মৃদু নিশ্বাসবায়ু আঘ্রাণ করিয়া মলয় পবনে শ্রদ্ধাহীন হইলেন। ২৬
মদন, ভ্রূরেখা-লাঞ্ছিত পূর্ণচন্দ্রনিভ তদীয় বদন অবলোকন করিয়া সেই মুখ ও প্রকৃত চন্দ্রের পার্থক্য নির্ধারণে সমর্থ হইলেন না। ২৭
ভ্রমরসেবিত সুবর্ণকমলকলিকাকার তদীয় কুচদ্বয়, চুচুকযুগলযোগে শোভা পাইয়াছিল। ২৮
তাহার দৃঢ় পীবর সমুন্নত পরস্পরসংলগ্ন স্তনযুগলের মধ্য হইতে নাভিপৰ্যন্ত লম্বমান, বিরল দীর্ঘ কমনীয় লোমাবলী দেখিয়া বোধ হয়, কাম নিজ কুসুম শরাসনের ভ্রমরপূর্ণ মৌর্ব্বী ভুলিয়া গিয়াছিলেন; নতুবা সেই মৌর্ব্বী ত্যাগ করিয়াইহা দেখিতে এত ব্যগ্র হইবেন কেন? ২৯-৩০
তদীয় গম্ভীর নাভিরঞ্জ মধ্যস্থলে, চারিপাশের চর্ম দ্বারা সংবৃত রন্ধ্র মুখ ক্ষুদ্রায়তন; তাঁহার মুখ ও নয়নযুগল আরক্ত-কমল-সন্নিভ। ৩১
একে তাহার বর্ণ স্বভাবতঃ সুবর্ণসদৃশ, তাহাতে আবার মধ্যদেশে ক্ষীণ; হে দ্বিজবরগণ! কাজেই কাম তাহাকে স্বর্ণবেদীর ন্যায় * দেখিতে লাগিলেন। ৩২ [* অথৰ্ব্ববেদিগণ যজ্ঞীয় বেদীর মধ্যস্থল ক্ষীণ করিয়া থাকেন।]
কাম, কদলীস্তম্ভবৎ আয়ত ও স্নিগ্ধ কমনীয় কোমল ঊরুযুগল, নিজ শক্তি বোধে দেখিতে লাগিলেন। ৩৩
তাহার বিচিত্র পদদ্বয়ের পার্ষ্ণি, পদাগ্র ও প্রান্তভাগ সকলই আরক্ত। মদন, সেই রক্তিমাকে আপনার প্রতি রতির অনুরাগ বোধ করিয়াছিলেন। ৩৪*
[*১ “অনুরাগময়ং চিত্ৰম” এই পাঠানুসারে ব্যাখ্যা করা হইল। ২। “অনুরাগময়ং মিত্ৰং” এই পাঠও আছে–তাহার অর্থ “অনুরাগরূপী বন্ধু” এ পাঠ অপেক্ষা প্রথমোক্ত পাঠ স্ফূটার্তযুক্ত।]
হে দ্বিজসত্তমগণ! কিংশুক-কুসুম-সদৃশ নখর-নিকরে ও সূক্ষ্মাগ্র নিস্তল অঙ্গুলীযোগে মনোহর রক্তবর্ণ তদীয় কর-যুগল দেখিয়া মদন ভাবিলেন,–রতি কি আমার অস্ত্রই দ্বিগুণ করিয়া তদ্বারা আমাকে মোহিত করিতে উদযোগ করিয়াছেন। ৩৫-৩৬।
কাম ভাবিলেন;-বুঝি লাবণ্য জল প্রবাহই দ্বিধা বিভক্ত হইয়া ইহার মৃণালযুগলসদৃশ স্নিগ্ধ কোমল আয়ত কমনীয় বাহুযুগলসদৃশ আসিতেছে। তাহার নীলনীরদ-সন্নিভ মদনমোহন মনোহর কেশপাশ, চমরী মৃগীর পুচ্ছস্থিত কেশগুচ্ছের ন্যায় শোভা পাইয়া থাকে। ৩৭
মদন, সেই যতিজন-মনোহারিণী রতি দেবীকে দেখিয়া মহাদেব যেমন গঙ্গাকে গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেইরূপ প্রীতি-প্রফুল্লনয়নে তাহাকে গ্রহণ করিলেন। ৩৮
রতিদেবীও সাক্ষাৎ গঙ্গা; কেননা গঙ্গার সকল চিহ্নই তাহাতে বর্তমান, তিনি কান্তিরূপ জলপ্রবাহে পূর্ণ; তাহার কুচাগ্রযুগল কমল-কলিকা; বদন মণ্ডল প্রফুল্লকমল; সুন্দর বাহু মৃণালখণ্ড; ভ্রূভঙ্গী তাহার ক্ষুদ্র তরঙ্গ; কটাক্ষ পাত উত্তুঙ্গলহরী; নয়নযুগল নীলোৎপল; ক্ষীণ লোমাবলী তাহার শৈবাল; নিম্ননাভি তাহার আবৰ্ত্ত; লোকের চিত্তরূপ বৃক্ষ আত্মসাৎ করিতেও তিনি সুপটু; আর দক্ষ-প্রজাপতিস্বরূপ হিমালয় গিরি হইতে তাহার উৎপত্তি। ৩৯-৪২
কাম তখন সাতিশয় প্রমোদ বশত সেই ব্ৰহ্মদত্ত নিদারুণ শাপ বিস্মৃত হইয়া দক্ষকে বলিলেন;–প্রভো! এই সম্পূর্ণ সুন্দর-রূপশালিনী রমণী আমার সহচারিণী হইলে আমি এখন মহাদেবকে মোহিত করিতে পারিব, অন্য প্রাণীর কথা কি বলিব কি? ৪৩-৪৪
হে অনঘ! আমি যে যে স্থান লক্ষ্য করিয়া শরাসন ধরিব, তথায় তথায় ইহাকেও রমণ-মায়াযোগে আমার অনুকূলে চেষ্টা করিতে হইবে। ৪৫
আমি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের মধ্যে যখন যেখানে যাইব, এই সতত-চারু হাসিনী তখনই আমার সহগামিনী হইবেন। ৪৬।
হে প্রজাপতি! নারায়ণের যেমন লক্ষ্মী, জলদজালের যেমন সৌদামিনী, তদ্রূপ ইনিও যেন সর্বদা আমার সহচারিণী হন। ৪৭
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–মদন এই কথা বলিয়া নারায়ণ যেমন সাগরোত্থিতা লক্ষ্মীকে গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেইরূপ উত্তমা রমণী রতিদেবীকে ঔৎসুক্য সহকারে গ্রহণ করিলেন। সন্ধ্যাকালে মেঘ যেমন মনোহর সৌদামিনীসহ শোভা পায়, ফুট গৌরবর্ণ কামদেব রতিসহ সেইরূপ শোভা পাইলেন। ৪৮-৪৯
এইরূপে সাতিশয় আনন্দযুক্ত রতিপতি,–যোগী যেমন বিদ্যাকে (তত্ত্বজ্ঞান) হৃদয়ে ধারণ (চিন্তা) করেন, তদ্রূপ সেই রতিদেবীকে হৃদয়ে (বক্ষঃস্থলে) ধারণ করিলেন। জলধিনন্দিনী হরিকে পতিরূপে পাইয়া যেমন সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন, পূর্ণচন্দ্রবদনা রতিদেবীও শ্রেষ্ঠ স্বামী পাইয়া সেইরূপ সন্তোষ লাভ করিলেন। ৫০
তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত। ৩
চতুর্থ অধ্যায় – মহাদেবকে কামবশ করিতে ব্রহ্মার উদ্যোগ
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–ইতিপূর্বে বিধাতা মহাদেবের বাক্যে অবমানিত হইয়া যখন অন্তর্হিত হন, তদবধি চিন্তা কবিতে লাগিলেন;-রমণীতে অভিলাষ মাত্র দেখিয়া মহাদেব আমাকে নিন্দা করিলেন, তিনি নিজে মুনিগণের সমক্ষে দারপরিগ্রহ করিবেন কিরূপে? ১-২
আর তাহার হৃদয়-মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী যিনি, তাহার হৃদয়স্থিত যোগমার্গে অনাস্থা জন্মাইয়া তাহাকে ভুলাইতে পারিবেন, এমন রমণীই বা কে, যে তাহার জায়া হইবেন? ৩
কামও তাহাকে ভুলাইতে পারিবে না। তিনি অত্যন্ত যোগাসক্ত, স্ত্রীলোকের নামও ভালবাসেন না। ৪
মহেশ্বর দারপরিগ্রহ না করিলে আদি, মধ্য ও অন্তে সৃষ্টি হইবে কিরূপে? তাহা হইলে সৃষ্টিলোপ-নিবারণও অপরের সাধ্যাতীত। ৫
কোন কোন মহাবীর ভূতলে জন্মিবে, তাহাদের কাহার উপায়তঃ আমার বধ্য; কাহারাও উপায়তঃ বিষ্ণুর বধ্য, কাহারও বা উপায়তঃ মহাদেবের বধ্য। ৬
শম্ভু (Sambhu) একান্ত বৈরাগ্যসম্পন্ন ও সংসাপরাঙ্মুখ হইলে সৃষ্টি চলিবে কিরূপে? ইনি ভিন্ন অপরে ইহার কৰ্ম্ম করিতে পারিবে না, ইহা নিশ্চয়। ৭।
লোক-পিতামহ লোকেশ ব্রহ্মা ইহা চিন্তা করত গগনমণ্ডলে অবস্থিত হইয়া পুনরায় ভূতলস্থিত দক্ষাদিকে (Daksha) অবলোকন করিলেন। ৮
তিনি মদনকে রতিসহচর ও আনন্দযুক্ত দেখিয়া পুনর্বার তথায় গমনপূর্বক পুষ্পশরকে সান্ত্বনা করত বলিলেন। ৯
হে মনোভব। এই রমণীকে সহচারিণী পাইয়া তোমার শোভা হইয়াছে; আর এই রমণীও তোমাকে পতিরূপে পাইয়া যোগ্যসমাগম প্রযুক্ত অত্যন্ত শোভা পাইতেছে। ১০
যেমন লক্ষ্মীযোগে নারায়ণ ও নারায়ণযোগে লক্ষ্মী, যেমন শশি-যোগে নিশা ও নিশা-যোগে শশী–সেইরূপ তোমরা উভয়েই পরস্পরে শোভিত এবং উৎকৃষ্ট দাম্পত্যভাবে অনুপ্রাণিত। অতএব তুমি জগতের কেতু (শ্রেষ্ঠ) এই জন্য তুমি বিশ্বকেতু নামে বিখ্যাত হইবে। ১১-১২
হে বৎস! তুমি জগতের হিতার্থে মহাদেবকে ভুলাও; তিনি যেন প্রীত-মনে দারপরিগ্রহ করেন। ১৩
নির্জন স্নিগ্ধ প্রদেশেই হউক, পৰ্বতেই হউক, আর নদীতেই হউক, ঈশ্বর যেখানে যেখানে যাইবেন তুমি এই রতিদেবীর সহিত তথায় তথায় গিয়া সেই বনিত-পরাঙ্মুখ সংযতচিত্ত হরকে ভুলাইবে। ১৪-১৫
তুমি ভিন্ন তাহাকে তুলাইতে পারে, এমন লোক কেহ নাই। ১৬
হে মনোভব! মহাদেবের রমণী-অনুরাগ সঞ্চার হইলে তোমারও শাপ মোচন হইবে। অতএব এই আত্মহিতকর কাৰ্য্য করিতে বিমুখ হইও না। ১৭
যদি মহেশ্বর অনুরাগ সহকারে কোন করভোরূ রমণীর প্রতি স্পৃহা করেন, তাহা হইলে তখন তিনি তৎকালিক ভাবের উপযোগী বলিয়া তোমাকে সম্মানিত করিবেন। ১৮
অতএব তুমি জগতের হিতার্থে মহাদেবকে ভুলাইতে যত্ন কর। আর তাহাকে ভুলাইয়া তুমি বিশ্বকেতু হও। ১৯
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–মন্মথ পরমাত্মা ব্রহ্মার এই কথা শুনিয়া জগতের হিতজনক যথার্থ কথা তাহাকে বলিতে লাগিলেন;-প্রভো! আমি আপনার বচনানুসারে মহাদেবকে ভুলাইব। কিন্তু আমার প্রধান অস্ত্র রমণী; আপনি নির্জনে সৃজন করুন। ২০-২১
হে বিধাতঃ! আমি শম্ভুকে ভুলাইলে পর যিনি তাহার পরেও তাহাকে ভুলাইয়া রাখিতে পারিবেন, এইরূপ মনোরমা রমণী আমাকে বলিয়া দিন। ২২
যিনি তাঁহাকে ভুলাইয়া রাখিতে পারিবেন, বর্তমান সময়ে এরূপ রমণী আমি ত দেখিতে পাই না; অতএব আপনি তদ্বিষয়ে উপায় করুন। ২৩
কন্দর্প এই কথা বলিলে লোকপিতামহ ব্রহ্মা ভাবিতে লাগিলেন, কোন রমণী মহাদেবকে ভুলাইতে পারিবেন? ২৪
অনন্তর চিন্তাকুল বিধাতার দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল; তাহা হইতে কুসুমসংহতি ভূষিত বসন্ত উৎপন্ন হইলেন। ২৫
বসন্ত অলিকুলসঙ্কুল মুকুলিত চুতাঙ্কুর, কিংশুক কুসুম ও কমলশ্রেণী ধারণ কত ফুল্লকুসুমিত তরুবরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। ২৬
তাহার রক্তকমল সদৃশ বর্ণ, নলিনাভ লোচনযুগল, সন্ধ্যাকালীন পূর্ণ শশধরের ন্যায় মুখমণ্ডল, তাহার সুন্দর নাসিকা, শঙ্খসদৃশ চরণাবর্ত, কুন্তলজাল নীলকুঞ্চিত। তিনি অস্ত গমনোন্মুখ দিবাকরের ন্যায় উজ্জ্বল রক্তবর্ণ কুণ্ডল যুগলে ভূষিত। ২৭-২৮।
তাহার গতি মত্তমাতঙ্গের ন্যায়, বক্ষঃস্থল প্রশস্ত; তাহার নিস্তল পীবর দীর্ঘ ভুজযুগল, অকর্ম কঠিন করতলদ্বয়; তাহার ঊরু, কটি ও জঙ্ঘা সুবৃত্ত, গ্রীবা কম্বুসন্নিভ, স্কন্ধ উন্নত, জত্রুদেশ গূঢ় এবং মুখমণ্ডল পরিপূর্ণ। ২৯-৩০
সেই সৰ্বসুলক্ষণাক্রান্ত পূর্ণাবয়ব কুসুমাকর উৎপন্ন হইলে উত্তম সদ্গন্ধপূর্ণ বায়ু বহিতে লাগিল এবং তরুনিকর পুষ্পিত হইল। ৩১
মধুরস্বর কোকিলকুল শতশতবার পঞ্চমস্বরে গান করিতে লাগিল। আর সুনিৰ্ম্মল সরসীসলিলে কমলরাজি বিকশিত হইল। ৩২
সেই সুলক্ষণপূর্ণ বসন্ত সেইরূপে উৎপন্ন হইলেন দেখিয়া হিরণ্যগর্ভ মদনকে মধুর বচনে বলিলেন,–মন্মথ! এই ব্যক্তি তোমার পরম মিত্র ও সতত সহচর হইবে, আর তোমার কাৰ্যে সৰ্ব্বদাই আনুকূল্য করিবে। ৩৩-৩৪
বায়ু যেমন অগ্নির মিত্র বলিয়া সৰ্ব্বত্র তাহার উপকার করেন, সেইরূপ এই তোমার বন্ধু সৰ্ব্বদা তোমার অনুগমন করিবেন। ৩৫
বসতির অন্ত হেতু বলিয়া অর্থাৎ প্রবাসীকে প্রবাসে থাকিতে দেন না বলিয়া ইহার নাম হউক “বসন্ত”। তোমার অনুগমন এবং লোকরঞ্জনই ইহার কৰ্ম্ম। ৩৬।
বসন্তেই শৃঙ্গার এবং মলয় পবন বসন্তেরই উপকরণ। সমস্ত ভাব তোমার সতত বশবর্তী সুহৃদ হউক। ৩৭
আর এই সকল সুহৃদগণের সহিত তোমার যেমন সৌহার্দ, সেইরূপ বিব্বোকাদি হাব এবং চতুঃষষ্টি কলা রতির সহিত সৌহার্দ স্থাপন করুন। ৮
কাম তুমি বসন্ত প্রভৃতি এই সকল সহচর ও কথিত পরিজন-পরিবৃতা সহচরী এই রতি দেবীর সহিত মিলিত হও। ৩৯
মহাদেবকে মোহিত কর; এই সৃষ্টিকে চিরস্থায়িনী কর। তুমি সকল সহচরে পরিবৃত হইয়া ইচ্ছামত প্রদেশে গমন কর। আর যিনি হরকে ভুলাইতে পারিবেন, এইরূপ রমণী, যাহাতে হয়, আমি তাহা করিতেছি। ৪০
সুরজ্যেষ্ঠ ব্ৰহ্মা এই কথা বলিলে মদন আনন্দিত হইয়া পত্নী-সমভিব্যাহারে তদীয় চরণে প্রণিপাত করিলেন। ৪১
তখন মন্মথ, যেখানে শিব ছিলেন, দক্ষকে এবং সেই সমস্ত ব্ৰহ্মার মানস পুত্রদিগকে অভিবাদন করিয়া তথায় গমন করিলেন। ৪২
হে দ্বিজবরগণ! সেই মন্মথ, অন্যান্য অনুচর ও শৃঙ্গারাদি ভাবগণ সমভিব্যাহারে গমন করিলে পিতামহ দক্ষ ও মরীচি অত্রিপ্রভৃতি মুনিবরগণকে মধুর বচনে বলিয়াছিলেন। ৪৩
চতুর্থ অধ্যায় সম্যপ্ত।
পঞ্চম অধ্যায় – ব্রহ্মাকর্তৃক মহামায়ার স্তব
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর ব্রহ্মা, তখন মহাত্মা দক্ষকে এবং মরীচি প্রভৃতিকে এই কথা বলিলেন। ১
ব্ৰহ্মা বলিলেন,–কোন্ রমণী শম্ভুর পত্নী হইবেন? কোন্ রমণী তাহাকে ভুলাইতে পারিবেন? এইরূপ চিন্তা করিতেছি। কিন্তু কাহাকেও শিবপত্নী বলিয়া স্থির করিতে পারিতেছি না। ২।
দক্ষ! সন্ধ্যা ও সাবিত্রীর আরাধ্য দেবতা জগন্ময়ী মহামায়া বিষ্ণুমায়া (Vishnu Maya) ব্যতীত শিবকে ভুলাইতে পারে, এমন নারী কেহ নাই। ৩
অতএব আমি জগজ্জননী যোগনিদ্রা (Yoganidra) বিষ্ণুমায়াকে স্তব করি, তিনি সুন্দর রূপে তাহাকে মোহিত করিবেন। ৪
দক্ষ! তুমিও সেই বিশ্বময়ীরই পূজা কর, তিনি যেন তোমার কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করিয়া শিবের পত্নী হন। ৫
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–পরমাত্মা ব্রহ্মার এই কথা শুনিয়া দক্ষ, মরীচিপ্রভৃতির বচনানুসারে সেই সৃষ্টিকর্তাকে বলিলেন। ৬।
দক্ষ বলিলেন,–ভগবন্! আপনি জগতের হিতজনক যে যথার্থ কথা বলিয়াছেন, হে লোকেশ। আমরা তদনুসারে কাৰ্য্য করিব। ৭
বিষ্ণুমায়া ব্যতীত শিবের মনোহরণ করিতে অপর কেহ পারিবে না, ইহা স্থির বটে। স্বয়ং বিষ্ণুমায়া যাহাতে আমার কন্যা হইয়া মহাত্মা শিবের পত্নী হন, আমি তদনুরূপ চেষ্টা করিব। ৮।
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–তখন মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণ, “এই’ই বটে” বলিলে, দক্ষ, জগন্ময়ী বিষ্ণুমায়াকে পূজা করিতে আরম্ভ করিলেন। ৯
দক্ষ, ক্ষীরোদ-সাগরের উত্তর তীরে অবস্থিত হইয়া জগদম্বাকে হৃদয়-মন্দিরে স্থাপনপূর্বক তপস্যা করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই জগদম্বাকে প্রত্যক্ষ করাই তপস্যার উদ্দেশ্য। ১০
দৃঢ়ব্রত দক্ষ সংযতচিত্ত হইয়া নিয়ম সহকারে তিন সহস্র দিব্য বৎসর তপস্যা করিয়াছিলেন। ১১
বায়ু-ভক্ষণ, অনশন, জলমাত্র পান অথবা বৃক্ষের গলিত পত্র ভোজন করিয়া জগন্ময়ী বিষ্ণুমায়াকে চিন্তা করত সেই দীর্ঘকাল অতিবাহিত করিয়া ছিলেন। ১২
দক্ষ, তপস্যা করিতে গেলে, সৰ্ব্বজগৎপতি ব্রহ্মা, পরম পবিত্র পুণ্যজনক মন্দরগিরিসমীপে গমন করিলেন। ব্রহ্মা মন্দরগিরির প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ পুণ্য ক্ষেত্রে জগজ্জননী জগদ্ধাত্রী বিষ্ণুমায়াকে তদ্গত একাগ্রচিত্তে অর্থপূর্ণ রচনাবলী দ্বারা স্তব করিতে লাগিলেন। ১৩-১৪
Universal Mother
ব্রহ্মা বলিলেন,–যিনি অবিদ্যা, বিদ্যা ও স্থূল সূক্ষ্ম-স্বরূপ, নিরাধারা নিরাকুলা এবং বিশুদ্ধ, সেই জগদ্ধাত্রী দেবীকে স্তব করি। ১৫
জগতের উপাদান কারণ জগদতীত প্রকৃতি যাহা হইতে উদ্ভুত, সেই পরমাত্মার অবয়বরূপিণী সনাতনী নিদ্রাকে স্তব করি। ১৬
তুমিই চিৎশক্তি, তুমিই পরমানন্দরূপী পরমাত্মা, তুমি সৰ্ব্বভূতের শক্তি এবং তুমিই পবিত্রতাবিধায়িনী। ১৭।
তুমি সাবিত্রী, তুমি জগদ্ধাত্রী, তুমি সন্ধ্যা, তুমি রতি, তুমি ধৃতি; আর জ্যোতিঃস্বরূপে তুমিই সংসারের প্রকাশিকা। ১৮
তমোরূপে তুমি জগৎকে আবরণে রাখ। তুমিই সৃষ্টিরূপে ইহাকে পূর্ণ কর। ১৯
তুমি বৈষ্ণবীরূপে জগতের স্থিতিকারিণী, হিতৈষিণী আবার তুমিই অন্তরূপে জগতের প্রলয় করিয়া থাক। ২০
তুমি মেধা; তুমি মহামায়া; তুমিই পিতৃলোকের আনন্দদায়িনী স্বধা। তুমি স্বাহা, তুমিই নমঃশব্দ, বষট্কার এবং স্মৃতিরূপা। ২১
তুমি পুষ্টি, ধৃতি, মৈত্রী; তুমি করুণা, তুমি মুদিতা, তুমিই লজ্জা; তুমি শান্তি, তুমি কান্তি, তুমিই জগতের ঈশ্বরী! ২২
আবার বলি, তুমি মৈত্রী, তুমি মহামায়া (Maha Maya), তুমি পিতৃদেবতা স্বধা। হে নিত্যশক্তি-স্বরূপে! আমার সৃষ্টিশক্তি, বিষ্ণুর স্থিতিশক্তি এবং রুদ্রের বিনাশ শক্তি–এই সমস্ত শক্তিও তোমা হইতে স্বতন্ত্র নহে। ২৩।
একা তুমিই আত্মপ্রকাশক তত্ত্বজ্ঞান ও আত্মগোপক অজ্ঞানরূপ দ্বিবিধভাব অবলম্বনপূর্বক কাহারও মুক্তি এবং কাহারও সংসারবন্ধন সাধন করিতেছ। ২৪
তুমি সৰ্ব্বভূতের লক্ষ্মী, তুমি ছায়া, তুমি সরস্বতী; তুমি ঋগ-যজুঃ সাম বেদরূপিণী, তুমি ত্রিমাত্রা (প্লুতরূপ) এবং সৰ্ব্বভূত-স্বরূপা। ২৬
তুমি পিতৃগণমনোরঞ্জিনী সামগীতি, তুমি সকল যজ্ঞেরই বেদি, সামধেনী এবং হবিঃ! ২৭
পরমাত্মার নিষ্কল অব্যক্ত অনিৰ্দেশ্য রূপ এবং সমস্ত জগৎ–এই সূক্ষ্ম স্থূল সকল রূপই তোমার। ২৮
বিশ্বম্ভরে! যে সর্বাধারভূত বিশাল মূর্তি পৃথিবীকে ধারণ করিয়া রাখিয়াছে, জগতে মঙ্গলদায়িনী শক্তিরূপ। তুমিই সেই মূর্তি *।
২৯ [* যা মূর্তিং বিততাং সর্বধরিত্রী বিভ্ৰতী ক্ষিতিঃ ইহা পাঠান্তর। যে সর্বাধারভূতা পৃথিবী বিস্তৃত মূর্তি ধারণ করিয়া আছেন, তুমিই সেই পৃথিবীস্বরূপ। উক্ত পাঠের এইরূপ অর্থ হয়।]
তুমি লক্ষ্মী, চেতনা, কান্তি, তুমি পুষ্টি, তুমি নিতা, তুমি কালরাত্রি, তুমি মুক্তি, শান্তি, প্রজ্ঞা এবং স্মৃতি। ৩০
হে সুখভোগপ্রদায়িনি! তুমিই ভবসাগর পার তরণিরূপিণী; মাগো! প্রসন্ন হও; নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের তুমিই গতি; তুমিই মতি। ৩১
তুমি নিত্যা আবার তুমিই অনিত্যা! তুমি এই স্থাবর-জঙ্গমময় নিখিল জগন্মোহিনী; তুমি সঙ্গতিবিধায়িনী এবং সাঙ্গোপাঙ্গ-সকলযোগ-মার্গ-প্রবর্তিনী। ৩২।
তুমি যতিগণের ধ্যান, যতিগণের কীর্তি; যোগের অষ্টাঙ্গ তোমাতে বিদ্যমান; তুমি খড়্গ, শূল এবং চক্র ধারণ করিয়া থাক; তুমি ঘোররূপা। ৩৩
তুমি ঈশ্বরী, জনগণের প্রতি সর্ববিধ অনুগ্রহ করিতে সমর্থ; তুমি জগতের আদি অথচ তোমার আদি নাই; তোমা হইতে জগতের উৎপত্তি, অথচ তোমার উৎপত্তি নাই। ৩৪
এক তুমি প্রলয়কালে জগন্মণ্ডল সংহার করিয়া থাক; অথচ তোমার নাশ নাই। এক তুমিই শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপা এবং তামসী বলিয়া বর্ণিত আছ; এক তুমিই হিংসা এবং অহিংসা; তুমিই কালী এবং চতুরাননা। ৩৫
তুমি পরাৎপরা ও সকলের জননী; তুমি আনন্দময়ী এবং আনন্দদায়িনী। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তোমাতেই বিলীন হয় এবং তুমি ইহা রক্ষণ ও ধারণ করিতেছ। ৩৬
তুমি দৃষ্টিহীন। অথচ তোমার দৃষ্টি অতি উত্তম; তুমি কর্ণহীনা অথচ তোমার শ্রবণযুগল পরম রমণীয়। তোমার হস্ত পদ নাই, অথচ তোমার গমনবেগ ও গ্রহণ-পাটব অত্যন্ত প্রবল। ৩৭।
তুমি স্বর্গ, তুমি জল, তুমি জ্যোতিঃ, তুমি বায়ু, তুমি আকাশ, তুমি মন এবং অহঙ্কারও তুমি–অধিক কি এই জগতের যে আট প্রকার প্রকৃতি (কারণ–প্রকৃতি মহত্তত্ত্ব প্রভৃতি) আছে, তৎসমুদায়ই তুমি, আবার তুমিই যত্নস্বরূপা। ৩৮
তুমি মেরুরূপে জগতের নাভি এবং পরম নালিকা-স্বরূপা। তুমিই শুদ্ধ সত্বময়ী পরাৎপর, আবার তুমিই মোহপ্রদায়িনী মহামায়া। ৩৯
জগতের জন্য তোমাকে কারণ, কাৰ্য, সত্য, শান্ত, মঙ্গলময় এবং অমঙ্গলময় নানারূপ ধারণ করিতে হইয়াছে। সেই সমস্ত রূপ উপাসকবৃন্দের ভক্তিবৃক্ষের ফলস্বরূপ। ৪o
তুমি অতি হ্রস্ব, অতিদীর্ঘ; তুমি অতি ক্ষুদ্র, অতি বৃহৎ; তুমি অতি সূক্ষ্ম অথচ নিখিল লোকব্যাপিনী জগন্ময়ী! ৪১
তুমি মানহীনা অথচ তোমার অত্যন্ত মান; তুমি অপরিমেয়া এবং উন্নত কায় গিরিরাজের দুহিতা। তোমার জগদ্ব্যাপী রূপরাজি সমবেত ও পৃথক্ ভাবে সেবা-ভক্তি করিলে সমুদয় সংসার-ভ্রান্তি দূর হয়। ৪২
তুমি ইষ্টানিষ্ট-পরিণামজ্ঞানসম্পন্না এবং লোকের ইষ্টানিষ্ট তোমার দ্বারাই হইয়া থাকে। আর তোমার নিখিল রূপই সৃষ্টি স্থিতি সংহারময়। ৪৩
অষ্টাঙ্গযোগ (Astanga Yoga) বলে বারংবার বিচার করিয়া যে তত্ত্ব স্থিরীকৃত হয়, সেই নিত্যরূপ তোমার। ৪৪
তুমি বাহ্য অন্তর; তুমি সুখ দুঃখ; তুমি জ্ঞান অজ্ঞান, তুমি জীবন মরণ; তুমি শান্তি অশান্তি; তুমিই জগদীশ্বরের ঐশী শক্তি। ৪৫
ত্রিভুবনে যাঁহার প্রভাব বর্ণন করিতে কেহ সমর্থ হয় না, তুমি সেই জগদীশ্বরেরও মোহকারিণী; আমি আর তোমাকে স্তব করিব কি? ৪৬
তুমি যোগনিদ্রা ও মহানিদ্রা ও মোহনিদ্রা; তুমি জগন্ময়ী বিষ্ণুমায়া; তুমিই প্রকৃতি; তোমাকে স্তব করিয়া উঠিতে পারে কে? ৪৭
আমি, বিষ্ণু এবং শিব আমাদিগের শরীর গ্রহণ, যাহা হইতে হইয়াছে, তাহার প্রভাব ও গুণাবলী বর্ণন করিতে কে সমর্থ হইবে? ৪৮
তুমি প্রকাশ করিয়া থাক বলিয়া অভ্যন্তরচারিণী জ্যোতিঃস্বরূপিণী; আবার তুমিই বহিশ্চারিণী স্থাবর জঙ্গমস্বরূপা। ৪৯
প্রসন্ন হও মা! তুমি নিখিল জগতের জননী লক্ষ্মীরূপিণী; হে বিশ্বময়ি। বিশ্বেশ্বরি! হে সনাতনি(Sanatan)! প্রসন্ন হও। ৫০
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–ব্রহ্মা এইরূপ স্তব করিতে থাকিলে, যোগনিদ্রা, স্নিগ্ধাঞ্জন-সমপ্রভা, মনোহর রূপবতী চতুর্ভূজা বজ্র-খড়্গধারিণী সিংহবাহিনী মুক্তকেশীরূপে সেই পরমাত্মা (Paramatma) ব্রহ্মার সম্মুখে আবির্ভুতা হইলেন। ৫১
নিখিল জগদ্গুরু বিধাতা তাহাকে সম্মুখে দেখিবামাত্র প্রণাম করিয়া ভক্তি নম্র মস্তকে স্তব করিতে লাগিলেন। ৫২
হে জগতের প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি রূপিণি! সৃষ্টিস্থিতিস্বরূপে! তোমাকে বার বার নমস্কার। আপনি চরাচরের শক্তিরূপা অখিলবিমোহিনী সনাতনী। ৫৩
কেশবের অর্ধাঙ্গরূপিণী লক্ষ্মী, সর্বাধারভূতা পৃথিবী, যোগিজনপূজিতা মনোহারিণী দেবী লজ্জা-এ সকলই তুমি; হে পরমাত্মসারে! তোমাকে নমস্কার। ৫৪
যোগিগণ, শ্রবণ-মননদ্বারা অবগত হইয়া সমাধিপূত-হৃদয়ে যে স্বপ্রকাশ সত্ত্বময় বিশুদ্ধ বিদ্যা ভাবনা করেন, তুমিই সেই বিবিধ বিষয়াবলম্বিনী মহা বিদ্যা। ৫৫
জগৎ-পরিবর্তনহেতু কালস্বরূপ কূটস্থ (পরিবর্তনশূন্য) অব্যক্ত অচিন্তনীয় রূপ ধারণ করত তুমি জগতকে সতত পুরাতন নূতন ও মধ্যাবস্থাপন্ন করিতেছ। ৫৬
তুমি সত্ত্ব, রজ, তম, এই গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থা-জগতের একমাত্র হেতু প্রকৃতি; এই প্রকৃতিই পুরুষের বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ বস্তুতে আসক্তি নিবৃত্তি করিয়া স্বয়ং অপসৃত হইয়া থাকেন। ৫৭
হে নিখিল-ব্ৰহ্মাণ্ডজননি! জ্ঞেয়-জ্ঞানরূপে! জগতের হিতের জন্য যত্ন করুন; হে বিষ্ণুমায়ে! তোমাকে নমস্কার। ৫৮
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–ত্রিলোকবিমোহিনী মহামায়া কালী(Kali) বিশ্ব-ধাতার এই কথা শুনিয়া মেঘগম্ভীর-স্বরে তাহাকে বলিতে লাগিলেন;–হে ব্ৰহ্মন! কি জন্য তুমি আমাকে স্তব করিতেছ? আর শুন, কাহার উপরে তোমার ক্ষমতা খাঁটিতেছে না, আমার নিকট শীঘ্র বল। ৫৯-৬০
প্রত্যক্ষগোচর হইলে নিশ্চয় কার্য সিদ্ধ হয়। অতএব তুমি নিজ অভিলাষ ব্যক্ত কর; আমি আগ্রহ সহকারে তাহা করিব! ৬১
ব্ৰহ্মা বলিলেন,–ভূতপতি মহাদেব, একাকী বিচরণ করিতেছেন; সহ চারিণী করিতে ইচ্ছা করেন না। অতএব তুমি তাহাকে মোহিত কর, তিনি যেন স্বয়ং দারগ্রহণে অভিলাষী হন। ৬২।
তোমা ভিন্ন আর কোন রমণীই তাহার মনোহারিণী হইবে না, অতএব তুমিই একরূপে শিবমোহিনী হও। ৬৩
তুমি জগতের হিতের জন্য লক্ষ্মীরূপ ধারণ করত, নারায়ণকে যেমন আনন্দিত করিতেছ, এই মহাদেবকেও সেইরূপ আনন্দিত কর। ৬৪
আমার রমণীর প্রতি, মাত্র ইচ্ছা হইয়াছিল, বৃষধ্বজ তাহারই নিন্দা করিয়াছেন। তিনি স্বেচ্ছাক্রমে কখনই দার পরিগ্রহ করিবেন না। ৬৫
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের মধ্যে প্রলয় হেতু সেই রুদ্র, বৈরাগ্যবশে দারপরিগ্রহ করিলে সৃষ্টিচক্র চলিবে কিরূপে? ৬৬
আমি এইরূপ চিন্তা করিয়া তোমারই শরণাগত হইয়াছি। এ বিপদে তোমা ভিন্ন আর কেহ রক্ষক নাই; জগতের হিতের জন্য তুমি আমার এই কাৰ্য্যটী সাধন কর। ৬৭
বিষ্ণু, লক্ষ্মী, কাম বা আমি–আমরা কেহই সেই ঈশ্বরকে ভুলাইতে পারিব না। অতএব হে জগন্মাতঃ! তুমি তাহাকে মোহিত কর। ৬৮
যেমন একা তুমি সৰ্ব্বভূতের কীর্তি, সংযতচিত্ত ব্যক্তিদিগের লজ্জা এবং বিষ্ণুর প্রেয়সী; (এইরূপ নানা মূর্তি ধরিয়া রহিয়াছ) সেইরূপ আর এক মূর্তি ধরিয়া ঈশ্বরকেও মোহিত কর। ৬৯,
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর যোগময়ী কালী ব্ৰহ্মাকে সম্বোধন করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন, হে মহাভাগ দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! তাহা শ্রবণ করুন। ৭০
পঞ্চম অধ্যায় সমাপ্ত। ৫
ষষ্ঠ অধ্যায় – দেবীর আশ্বাস প্রদান
দেবী বলিলেন,–ব্ৰহ্মন! তুমি যাহা বলিলে, তাহা সত্য। এজগতে আমি ভিন্ন শঙ্করকে মোহিত করিতে পারে, এরূপ কেহ নাই। ১
মহেশ্বর দারপরিগ্রহ না করিলে সনাতন সৃষ্টি-চক্র চলিবে না, এতৎসমস্তও তুমি প্রতিপাদন করিয়াছ। ২
এই জগৎপতি মহাদেবকে ভুলাইতে আমারও স্বাভাবিক যত্ন আছে। আজ আবার তোমার কথায় তাহা দ্বিগুণতর প্রগাঢ় হইল। ৩
হর যাহাতে বিমোহিত হইয়া যন্ত্রচালিতের ন্যায় আপনা হইতেই দার পরিগ্রহ করেন, অমি তদ্বিষয়ে যত্ন করিব। ৪
মহাভাগ! লক্ষ্মী যেমন বিষ্ণুর বশবর্তিনী, তদ্রূপ আমিও সুচারু মূর্তি ধারণ করত তাহারই বশীভূতা হইব। ৫।
আর সেই প্রিয় মহাদেব, যাহাতে আমার বশবর্তী হন, তাহাও করিব। অধিক কি, মহাদেবকে আমি সামান্য-সংসারীর ন্যায় করিয়া ফেলিব। ৬।
হে বিধাতঃ! আমি কল্পান্তরেও প্রতি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ে আকুলতাশূন্য মহেশ্বরের রমণীরূপে অনুসরণ করিব। ৭
হে পিতামহ! আমি প্রতি সৃষ্টিতেই দক্ষপত্নীর গর্ভে উৎপন্ন হইয়া মনো হররূপে শঙ্করের সহিত মিলিত হইব। ৮
তাহাতেই দেবগণ, বিষ্ণুমায়া জগন্ময়ী যোগনিদ্রারূপিণী আমাকে শঙ্করী এবং রূদ্রাণী বলিয়া স্তব করিবে। ৯
জন্মিবামাত্র জীবকে আমি যেমন মোহিত করিয়া থাকি, প্রমথপতি শঙ্করকেও তদ্রূপ মোহিত করিব। ১০
পৃথিবীতে যেমন সাধারণ প্রাণী, রমণীর বশে থাকে, শঙ্কর ততোধিক স্ত্রীর বশতাপন্ন হইবেন। ১১
তিনি হৃদয়মন্দিরে সমাধিলীলা ভঙ্গ করিয়া মুগ্ধ হইবার জন্যই আমাকে বিদ্যারূপে গ্রহণ করিবেন ১২
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–হে দ্বিজোত্তমগণ! ভগবতী বিষ্ণুমায়া ব্রহ্মাকে এই কথা বলিয়া তাহার সমক্ষেই তথা হইতে অন্তর্হিতা হইলেন। ১৩
তিনি অন্তর্হিত হইলে লোক-পিতামহ ব্রহ্মা, যথায় কামদেব, অনুচরগণের সহিত অবস্থিত ছিলেন, তথায় গমন করিলেন। ১৪।
হে মুনিপুঙ্গবগণ! তিনি মহামায়ার বাক্য স্মরণ করত অতিশয় আনন্দিত হইতে লাগিলেন এবং তখন আপনাকে কৃতার্থ বোধ করিলেন। ১৫
অনন্তর মদন, মহাত্মা বিরিঞ্চিকে হংসযানে আসিতে দেখিয়া তৎক্ষণাৎ ব্যস্ততার সহিত উঠিয়া দাঁড়াইলেন। ১৬
মনোভব, হৃষ্টচিত্ত সৰ্ব্বলোক-বিধাতাকে আসনে বসাইয়া হর্ষোৎফুল্ল নয়নে বন্দনা করিলেন। ১৭
অনন্তর ভগবান্ বিধাতা, বিষ্ণুমায়া যাহা বলিয়াছিলেন, সেই কথা মদনকে আনন্দিত করত, হর্ষ-বিজড়িত-মধুরস্বরে বলিতে লাগিলেন। ১৮
বৎস মনোভব! পূর্বে আমি মহাদেবকে মোহিত করিতে প্রস্তাব করিলে তুমি যে আমাকে বলিয়াছিলে, “বরাবর মোহিত করিয়া রাখিতে পারে, এমন এক জন রমণী সৃজন করুন”, আমি তদনুসারে কার্যসিদ্ধির জন্য মন্দরপৰ্ব্বতের গুহামধ্যে একাগ্রচিত্তে জগন্ময়ী যোগনিন্দ্রা দেবীর স্তব করি। ১৯-২০
বৎস! তখন তিনি আপনিই সন্তোষসহকারে আমার প্রত্যক্ষণোচর স্বীকার করেন ‘আমি শম্ভুকে মোহিত করিব’। ২১
মনোভব! তিনি অচিরকালমধ্যেই দক্ষগৃহে জন্মগ্রহণ করিয়া সত্যই শঙ্করকে মোহিত করিবেন। ২২
মদন বলিলেন,–ব্ৰহ্মণ! জগন্ময়ী বা যোগনিদ্রা কাহার নাম? তপোনিষ্ঠ মহাদেবকে কেমন করিয়া তিনি বশীভূত করিবেন? ২৩
সেই দেবীর প্রভাব কিরূপ? তিনি কে? উঁহার অবস্থিতিই বা কোথায়? হে লোক-পিতামহ! এই সকল কথা আমি আপনার নিকট শুনিতে ইচ্ছা করি। ২৪
সমাধিত্যাগ করিয়া নয়ন উন্মীলন করিলে যাহার দৃষ্টিগোচরে আমরাও ক্ষণকাল থাকিতে পারি না, সেই মহাদেবকে তিনি কেমন করিয়া মোহিত করিবেন? ২৫
ব্ৰহ্মন! জ্বলন্ত অনল-সন্নিভ নয়নত্রয় ও বিকট জটাজূটে ঘোরদর্শন শূলপাণিকে দেখিয়া তাহার সম্মুখে কে থাকিতে পারে? ২৬
এবংবিধ শূলপাণিকে সম্পূর্ণরূপে মোহিত করিতে অভিলাষিণী হইয়া যিনি তাহা স্বীকার করিয়াছেন, তাহার তত্ত্ব শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি। ২৭
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–চতুরানন কিছু বলিতে ইচ্ছা করিলেও, শিবকে মোহিত করা সম্বন্ধে মনোভবের সেই অনুৎসাহব্যঞ্জক বাক্য শ্রবণ করিয়া “কাম মহাদেবকে ভুলাইতে পারিবে না”, এই ভাবিতে ভাবিতে বারংবার নিশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন। ২৮-২৯
নানারূপধারী, মহাবল-পরাক্রান্ত, লোলজিহ্বা, ভীষণাকৃতি চঞ্চলস্বভাব “গণ”–তাহার নিঃশ্বাসবায়ু হইতে উৎপন্ন হইল। ৩০
তাহাদিগের কেহ তুরঙ্গানন, কেহ কেহ গজানন, কতিপয় ব্যক্তি সিংহ ব্যাঘ্ৰানন; কাহারও মুখ কুকুরের ন্যায়, কাহারও বরাহের ন্যায়, কাহারও বা গর্দভের ন্যায় মুখ, কেহ ভল্লুকানন, কেহ বিড়লানন, কেহ শরভানন, কেহ শুকানন, কাহারও কাহারও বদন বানরের ন্যায়, কাহারও শৃগালের ন্যায়; কোন কোন ব্যক্তির মুখ সর্পের ন্যায়, কতকগুলি ব্যক্তির আকৃতি গোরুর ন্যায়, কাহারও কাহারও মুখ গোরুর ন্যায়, কাহারও বা মুখ পক্ষীর ন্যায়। ৩১-৩৩
অত্যন্ত দীর্ঘাকৃতি, অতি খর্বাকৃতি, অতিশয় স্থূল, অত্যন্ত কৃশ, পিঙ্গল লোচন, নির্মল নেত্র, ত্রিনয়ন, একনয়ন, স্থূলোদর, এককৰ্ণ, ত্ৰিকৰ্ণ, চতুঙ্কর্ণ, স্থূলকর্ণ, মহাকর্ণ, বিস্তৃতকর্ণ, কর্ণহীন, দীর্ঘনয়ন, স্থূলনয়ন, সূক্ষ্মনেত্র, দৃষ্টিহীন, চতুস্পদ, পঞ্চপদ, ত্রিপদ, একপদ, হ্রস্বপদ, দীর্ঘপদ, স্থূলপদ, মহাপদ, একহস্ত, চতুর্হস্ত, দ্বিহস্ত, ত্রিহস্ত, হস্তহীন, রিরূপাক্ষ, গোধাকার, মনুষ্যাকার, শিশু মারানন, ক্রৌঞ্চাকৃতি, বকাকার, হংসরূপী, সারসরূপী, মদ্গু-মুখ, কুররাস্য, কঙ্ক-বদন, কাকানন, অৰ্দ্ধকৃষ্ণ, অৰ্দ্ধরক্ত, কপিলবর্ণ, পিঙ্গলবর্ণ, নীলবর্ণ, শুক্লবর্ণ, পীতবর্ণ, হরিদ্বর্ণ এবং বিচিত্রবর্ণ এইরূপ নানা দলে বিভক্ত সেই “গণ” (Gana) শঙ্খ, পট্ট, মৃদঙ্গ, ডিণ্ডিম, গোমুখ এবং পণবাদি বাদ্য বাজাইতে লাগিল! ৩৪-৪০
হে বিপ্রশ্রেষ্ঠগণ! তাহারা সকলেই উন্নত নিবিড় পিঙ্গল জটাজুটে ভীষণ তর; সকলেই রথারোহী। ৪১
তাহাদিগের হস্তে শূল, পাশ, খড়্গ, ধনু, শক্তি, অঙ্কুশ, গদা, বাণ, পট্টিশ এবং প্রাস। ৪২
নানা প্রহরণধারী মহাবলসম্পন্ন সেই “গণ” ঘোরতর শব্দ করত ব্রহ্মার সম্মুখে ‘মার কাট’ বলিতে লাগিল। ৪৩
তাহারা তথায় ‘মার কাট” ইত্যাদি শব্দ করিতে থাক; বিধাতা সেদিকে দৃকপাত না করিয়া যোগনিদ্রার প্রভাব কীৰ্ত্তন করিতে আরম্ভ করিলেন। ৪৪
অনন্তর, মদন, সেই “গণ’ দর্শনে ব্রহ্মার কথায় বাধা দিয়া তাহাকে সম্বোধনপূর্বক গণগণসম্মুখেই বলিতে লাগিলেন,–প্রভো! ইহারা কি কাৰ্য করিবে? থাকিবে কোথায়? ইহাদিগের নামই বা কি? ৪৫
যাহা ইহাদিগের প্রকৃত কাৰ্য্য; যথায় ইহারা থাকিবে, এবং ইহাদিগের যে নাম, তৎসমুদায় স্থির করিয়া দিয়া পরে আমার নিকট মহামায়ার প্রভাব কীৰ্ত্তন করিবেন। ৪৬
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সৰ্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মা মদনের এই কথা শ্রবণে তাহার সহিত পরামর্শ করিয়া গণদিগের কর্মাদি নির্দেশ করত তাহাদিগকে বলিলেন,–ইহার জন্মিবামাত্র স্পষ্টভাবে বারংবার ‘মার মার’ বলিয়াছিল এইজন্য ইহাদিগের নাম হউক ‘মার’(Mara)। ৪৭-৪৮
আর মারাত্মক অর্থাৎ কামের অধীন বা সাংঘাতিক বলিয়াও ইহারা ‘মার’ নামে অভিহিত হউক। ইহার অবারিতভাবে সকল প্রাণীরই বিঘ্ন সাধন করিবে। ৪৯
হে মনোভব! তোমার অনুগমন করাই ইহাদিগের প্রধান কাৰ্য্য হইবে। তুমি যখন যখন নিজ কার্য সাধনেদ্দেশে যথায় যথায় গমন করিবে, তখন তখন ইহারাও তোমার সাহায্যার্থ তথায় তথায় যাইবে। ৫০
তুমি যাহাদিগের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিবে, ইহারা তাহাদিগের মন উচ্চাটন করিবে; জ্ঞানীদিগের জ্ঞানপথেও সৰ্ব্বদা বিঘ্ন করিবে। ৫১
সকল প্রাণিগণ যাহাতে সংসার বন্ধনের অনুকূল কাৰ্য্য করে, বিঘ্ন থাকিলেও ইহারা সৰ্ব্বতোভাবে তাহা করিবে। ৫২
ইহারা বেগশালী ও কামরূপী হইয়া সৰ্বত্ৰ থাকিতে পারিবে। তুমি এই গণের অধিনায়ক হইবে। আর ইহারা নিত্যকর্মীদিগের পঞ্চযজ্ঞাংশ-ভোগী ও উদকশায়ী হইবে। ৫৩
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর তাহারা সকলে অভিলাষ অনুসারে কাৰ্য শ্রবণ করিয়া বিধাতা ও মদনের চতুর্দিকে দণ্ডায়মান রহিল। ৫৪
হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ! পৃথিবীতে কেহই তাহাদিগের মাহাত্ম্য ও প্রভাব বর্ণন করিতে পারে না, যেহেতু তাঁহারা বিশেষ তপোনিষ্ঠ। ৫৫
তাহাদিগের স্ত্রী পুত্র নাই, তাহারা সকলেই মাহাত্মা সন্ন্যাসী, সতত নিস্পৃহ এবং ঊৰ্দ্ধরেতা। ৫৮
অনন্তর ব্রহ্মা মদনের নিকট পুনরায় যোগনিদ্রার মাহাত্ম সম্পূর্ণরূপে বর্ণন করিতে আরম্ভ করিলেন। ৫৭
Yoga Maya
যিনি অব্যক্তকে সত্ত্ব, রজ ও তম এই তিন ভাবে ব্যক্তরূপে বিভক্ত করিয়া প্রয়োজন সিদ্ধি করেন, তাহার নাম বিষ্ণুমায়া। ৫৮
যিনি ব্রহ্মাণ্ডের নিম্ন, অন্তর এবং অধোদেশে অবস্থিত হইয়া পুরুষকে তাহা হইতে পৃথক করিবার পর স্বয়ং অপসৃত হন, তাহারই নাম যোগনিদ্রা। ৫৯
যিনি যোগিগণের মন্ত্র-মৰ্ম্মোদঘাটনে তৎপর, পরমানন্দস্বরূপা সত্ত্ববিদ্যা, তাহাকেই জগন্ময়ী বলা যায়। ৬০
গর্ভমধ্যে জীবের তত্ত্বজ্ঞানোদয় হইলেও সে সূতিপবনে প্রেরিত হইয়া ভূমিষ্ঠ হয়, তৎক্ষণাৎ তাহাকে যিনি তত্ত্বজ্ঞানশূন্য করেন, আর পূর্বপূৰ্ব জন্মের সংস্কার বলে আহারাদিকাৰ্য্যে সতত প্রবৃত্ত করিয়া মোহ, মমতা ও সংশয় উৎপাদন করিয়া থাকেন। ৬১-৬২।
যিনি জীবকে পুনঃপুনঃ ক্রোধ লোভ মোহমধ্যে নিক্ষেপ করিয়া যেই চিন্তাকুল জীবকে নিরন্তর কামসাগরে নিক্ষেপ করত আমোদযুক্ত ও ব্যসনাসক্ত করেন, তাহারই নাম মহামায়া। সেই শক্তিবলেই তিনি জগদীশ্বরী। ৬৩-৬৪
মহত্তত্ত্ব(Mahat tattva) অহঙ্কার প্রভৃতি সৃষ্টিকারণ বস্তুর উৎপত্তি-হেতু বলিয়া জগতে তাহাকে অনন্তরূপিণী উৎপত্তি শক্তি বলিয়া থাকে। ৬৫
যেমন বীজনিঃসৃত অঙ্কুরের ক্রমবিকাশ মেঘের জলে হয়, সেইরূপ তিনি উৎপন্ন জীবের ক্রম পুষ্টি সাধন করিয়া থাকেন। সেই সৰ্ব্বসৃষ্টিকরাই সৃষ্টি শক্তি; তিনিই খ্যাতি, তিনিই ঈশ্বরী। ৬৬
তিনি ক্ষমাশীল ব্যক্তিগণের নিত্য ক্ষমা, তিনি দয়ালুদিগের দয়া; সেই নিত্যদেবী জগতের অভ্যন্তরে নিত্যরূপে প্রকাশমানা। ৬৭
সেই পরাৎপরা দেবী, জ্যোতিঃম্বরূপে ব্যক্ত-অব্যক্ত প্রকাশ করিতেছেন; সেই বৈষ্ণবীই বিদ্যারূপে যোগিগণকে মুক্তি দিতেছেন। ৬৮
তিনিই আবার অবিদ্যারূপে সাংসারিকদিগকে সংসারবন্ধনে, দৃঢ়বদ্ধ করিতেছেন, তিনিই লক্ষ্মীরূপে কৃষ্ণের সহচারিণী হইয়া তাহার মনোহরণ করিতেছেন। হে মনোভব! আমার কণ্ঠে তিনিই ত্রয়ীরূপে (Vedas) সতত অবস্থিত। ৬৯
সেই দিব্য মূর্তি পরাৎপরা, সৰ্ব্বত্রস্থায়িনী সৰ্ব্বত্রগামিনী এবং সর্বময়ী, তিনি স্ত্রীরূপে নিখিল প্রাণীকেই সৰ্ব্বতোভাবে মোহিত করিয়া রাখিয়াছেন, অধিক কি তাহার প্রভাবে নারায়ণ (Narayan) প্রভৃতিও সর্বদা বিমোহিত। ৭০
ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত। ৬
ব্রহ্মা ও কামের কথোপকথন
শিবকে মোহিত করিতে প্রযত্নসম্পন্ন ব্রহ্মা এইরূপে মহামায়া-স্বরূপ বর্ণন করিয়া মদনকে পুনরায় বলিলেন,–ইতিপূৰ্বে বিষ্ণুমায়া, মহাদেব যাহাতে দারপরিগ্রহ করেন, তাহা করিতে স্বীকার করিয়াছেন। ১-২
স্মর! তিনি নিশ্চয়ই দাক্ষায়ণীরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া মহাত্মা শম্ভুর সহ চারিণী হইবেন, একথা তিনি নিজেই বলিয়াছেন। ৩
শঙ্কর, যাহাতে দারপরিগ্রহ করিতে অভিলাষী হন, এই নিজদলবল, রতি এবং বসন্তের সহিত মিলিত হইয়া তুমিও তাহা করিতে থাক। ৪
মদন! শিব দারপরিগ্রহ করিলে আমরা কৃতকার্য হই, কেননা, তাহা হইলে এই সৃষ্টি নিশ্চয়ই অবিচ্ছিন্নভাবে চলে। ৫
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–হে দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! অনন্তর, মনোভব, মহাদেবকে মোহিত করিতে তিনি যে ভাবে চেষ্টা করিতেছিলেন, তাহা ব্রহ্মার নিকট বলিতে লাগিলেন। ৬
ব্ৰহ্মন্! আমরা শিবকে মোহিত করিতে তাহার সাক্ষাতে বা অসাক্ষাতে যে সকল কার্য করিতেছি, তাহা বলি, শ্রবণ করুন। ৭।
যখন শিব সংযতচিত্তে সমাধি অবলম্বন করিয়া থাকেন, হে লোকেশ! তখন আমি মোহকর মৃদুমন্দ সুগন্ধ শীতল পবন দ্বারা তাহাকে নিরন্তর বীজন করি। ৮
আমি স্বীয় পঞ্চবাণ এবং শরাসন গ্রহণ করিয়া তদীয়গণকে মোহিত করত তাহার সমীপ ভ্রমণ করি। ৯
তথায় আমি নিরন্তর, সিদ্ধমিথুনগণকে সুরত কার্যে ব্যাপৃত করিতেছি, সেই সমস্ত হাবভাবগণ, ক্রমে সেই সিদ্ধনরনারীগণে প্রবেশ করিতেছে। ১০
আমি প্রবিষ্ট হইবামাত্র তথাকার সকল প্রাণিবৃন্দই মুগ্ধ হইয়া থাকে, কেবল মহাদেব ও তাহার বৃষ মনোবিকার প্রাপ্ত হন না। ১২
যখন প্রমথপতি, হিমালয়প্রস্থে গমন করেন, বিধাতঃ! তখন আমিও রতি এবং বসন্ত সমভিব্যাহারে তথায় গমন করি। ১৩।
যখন তিনি সুমেরু পৰ্বতে মন্দরপ্রস্থে বা কৈলাস পর্বতে গমন করেন, আমিও তখন তথায় গমন করি। ১৪
যখন শিব, ক্ষণকালের জন্য সমাধি ত্যাগ করিয়া অবস্থিতি করেন, তখন আমি তাহার সম্মুখে চক্রবাক-মিথুনকে মোহিত করি। ১৫
ব্ৰহ্মন্! সেই চক্রবাক-মিথুন, হাবভাব-সম্পন্ন হইয়া অনবরত নানারঙ্গে উত্তম দাম্পত্যপরিপাটি করিতে থাকে। ১৬
হে বিধাতঃ! আমি ময়ুর-ময়ূরীবৃন্দ এবং অন্যান্য সস্ত্রীক পক্ষীদিগকেও তাহার সম্মুখে সম্মোহিত করিয়া থাকি। ১৭
যখন ময়ূরমিথুন, বিচিত্রভাবে ক্রীড়া করিতে প্রবৃত্ত হয়, তখন তাহা দেখিয়া কাহার মনে না উৎকণ্ঠা জন্মে?
তখন তাহার সম্মুখবর্তী মৃগগণ তাহার পার্শ্বে ও সম্মুখে উৎসুক ভাবে স্ব স্ব রমণীসহ উপযুক্ত ভাব প্রকাশ করিতে থাকে। ১৮
হে সৰ্ব্বলোককৃৎ! কিন্তু তাহার এমন ছিদ্র আমি কখন দেখিতে পাই না যে, তদীয় শরীরে শরক্ষেপ করিব। ২০
আমি অনেক দেখিয়া স্থির করিয়াছি; রমণীসঙ্গ ব্যতীত মহাদেবকে মোহিত করিতে সসহায়ে চেষ্টা করিয়াও সমর্থ হইব না। ২১
হে মহাভাগ! আবার বসন্ত তাঁহাকে মোহিত করিবার জন্য আপনার অনুরূপ যে কাৰ্য্য নিত্য করিতেছেন অথচ ফলদায়ক হইতেছে না; তাহা শ্রবণ করুন! ২২
যেখানে মহাদেব অবস্থিতি করেন, বসন্ত,-তথাকার চম্পক, বকুল, আম্র, বরুণ, পাটল, নাগকেশর, পুন্নাগ, কেতক, কিংশুক, বক, মল্লিকা, মাধবী, পর্ণধারা ও কুরুবকশ্রেণীকে প্রফুল্ল কুসুমে ভূষিত করেন। ২৩-২৪।
ফুল্লকমলময় সরোবরে মলয় পবন বহাইয়া শঙ্করনিকেতন যত্নসহকারে অতিশয় সদ্গন্ধযুক্ত করিয়া থাকেন। ২৫
তথায় লতা সকল ফুল্ল কুসুমশালিনী ও নবদলাঙ্কুরে মণ্ডিত হইয়া মনোহর ভাবে তরুগণকে বেষ্টন করিয়া থাকে। ২৬
সেই সুগন্ধ সমীরণ বিকম্পিত সুন্দর-কুসুমময় পাদপবৃন্দ অবলোকন করিয়া কামবশ হয় নাই, এমন মুনিও তথায় নাই। ২৭
হে লোকেশ! মহাদেবের গণ (দলবল), অমরবৃন্দ, সিদ্ধসঙ্ঘ, এবং যাহারা অত্যন্ত তপোনিষ্ঠ, তাহারাও নানাভাবে সুশোভন ক্রীড়া করিতে থাকেন। ২৮
কিন্ত শঙ্করের মোহকারণ আমরা কিছুমাত্র দেখি নাই। অণুমাত্র কাম ভাবও তাহার হয় না। ২৯
আমি এই সব দেখিয়া এবং শিবের চিত্তবৃত্তি বুঝিয়া মায়া ব্যতীত তাহাকে মোহিত করিবার চেষ্টা হইতে সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্ত হইয়াছি। ৩০
আমি এখন আবার আপনার মুখে যোগনিদ্রার উক্তি ও তাহার প্রভাব শ্রবণ করিয়া এবং এই সকল গণ দর্শন করিয়া বোধ করিতেছি, সহায়সম্পন্ন হইলাম। আমি শম্ভুকে মোহিত করিতে আবার উদ্যম করিতেছি। ৩১
হে ত্রিলোকনাথ! যোগনিদ্রা যাহাতে শীঘ্র শিবের পত্নী হন, আপনি তদ্বিষয়ে সম্পূর্ণ যত্ন করুন। ৩২
মহেশ্বরের নিত্যসঙ্গী যম, নিয়ম, প্রাণায়াম, আসন, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা, সমাধির বিঘ্ন, এইরূপ শত শত মারগণ দ্বারাও হইবে না, ইহা আমি বুঝি। ৩৩-৩৪
তথাপি এই মারগণ যতটুকুই পারে, ততটুকু মহাদেবের যোগাঙ্গ বিঘ্ন সম্পাদন করুক। অপরের সমক্ষে ক্ষমতা প্রকাশ করিতে পারুক না পারুক তাহাতে ক্ষতি-বৃদ্ধি নাই। * ৩৫ [* ‘সমক্ষমন্যস্য ন কর্ত্তু মোজঃ” এই পাঠ বহুসম্মত। মূলের অনুবাদ এতদনুসারে হইয়াছে। “সমক্ষমপ্যস্য এই পাঠের অনুবাদ,–“অথবা ইহাঁর সমক্ষে ইহারা ক্ষমতা প্রকাশ করিতে পারিবে না।”]
সপ্তম অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ৭
অষ্টম অধ্যায় – দক্ষের প্রতি দেবীর বরদান
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–হে তপোধনগণ! অনন্তর ব্রহ্মাও যোগনিদ্রার কথা স্মরণ করিয়া নিশ্চয়পূর্বক মদনকে পুনরায় এই কথা বলিলেন,–সেই যোগ নিদ্রা অবশ্যই শিব-পত্নী হইবেন। তুমিও তাঁহার যথাশক্তি সাহায্য কর। ১-২
হে মনোভব! শঙ্কর, যেখানে আছেন; তুমি নিজগণ ও বসন্তের সহিত সত্বর সেইখানে গমন কর। ৩
এখন প্রতি দিন দিবারাত্রের চারিভাগের একভাগ মাত্র জগৎ মোহিত করিতে থাক, আর অবশিষ্ট তিনভাগ সৰ্ব্বদা সগণে শিব-সমীপে থাক। ৪
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সৰ্ব্বলোক-পতি ব্রহ্মা এই কথা বলিয়া সেইখানেই অন্তর্হিত হইলেন। তখন মদন নিজগণ সমভিব্যাহারে শম্ভুসন্নিধানে গমন। করিলেন। ৫
এদিকে সেই সময়ে সুব্রত দক্ষ, বহুকাল তপস্যায় নিযুক্ত থাকিয়া বহু নিয়মে দেবীর আরাধনা করিতেছিলেন। ৬
হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ! দক্ষ নিয়মযোগে যোগনিদ্রার অর্চনা করিতে থাকিলে সেই সৰ্বমঙ্গলা তাহার প্রত্যক্ষগোচর হইলেন। ৭
অনন্তর, দক্ষপ্রজাপতি, জগন্ময়ী বিষ্ণুমায়াকে প্রত্যক্ষ দেখিয়া আপনাকে কৃতাৰ্থ বোধ করিলেন। ৮
সেই সিংহবাহিনী, ঘনঘটা-শ্যামলা সু-উচ্চ-পীন-পয়োধরা নীলোৎপলধারিণী বরাভয়-দায়িনী চারু-বদনা চতুর্ভুজা খড়্গধারিণী সৰ্বগুণ-শালিনী আরক্তনয়না আলুলায়িত-রুচির-কুন্তলা মনোহারিণী সৰ্বমঙ্গলা মহামায়াকে দেখিয়া প্রজাপতি দক্ষ বিনয়নম্র-কন্ধরে পরম প্রীতিসহকারে তাহার স্তব করিতে লাগিলেন। ৯-১১
তুমি জগতের আনন্দকারিণী সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়রূপা আনন্দময়ী দেবী; তুমি মঙ্গলময়ী, নারায়ণের লক্ষ্মী, তোমাকে স্তব করি। ১২
জগতের আশ্রয়, স্বপ্রকাশ সময় জ্যোতিঃস্বরূপ যে পরম তত্ত্ব, হে মহেশ্বরি। তাহা তোমারই অংশ। ১৩
হে জগন্ময়ি! রজোগুণের আধিক্যে যে কামপ্রকাশক, মধ্যবস্থিত রাগ উৎপন্ন হয়, তাহা তোমার অংশাংশ। তমোগুণের আধিক্যে চেতনগণের আবরণ-কারক যে মোহের আবির্ভাব হয়, তাহাও তোমার অংশাংশ সম্ভূত। ১৪
তুমি লোক-মোহিনী নিৰ্ম্মলা বিশুদ্ধরূপা পরাৎপরা; তুমি ত্রিরূপা অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা বা ব্রহ্মাবিষ্ণুমহেশ্বর-স্বরূপা, ঋগ্ যজুঃ সামবেদ তোমার মূর্তি, তুমি এ বিপন্ন জগতের একমাত্র গতি। ১৫
মাধব যে নিজ মূর্তি দ্বারা পৃথিবী ধারণ করিতেছেন, সৰ্ব্বজগতের উপকার কারিণী সেই মূর্তি তোমারই। তুমি সূক্ষ্ণা অপরাজিতা মহাপ্রভাবশালিনী বিশ্বশক্তি, তুমি ব্রহ্মাণ্ডের ঊর্ধ্ব ও অধোভাগ আবরণ করিয়া রাখিয়াছ বলিয়াই বিশ্বমধ্যে বায়ু বহিয়া থাকে। ১৬-১৭
হে পরম-মাত্রারূপিণি! নিখিল পদার্থের উৎপত্তি হেতু সময় নিরালম্ব নিষ্কল নিৰ্ম্মল যে পরম জ্যোতিকে যোগিগণ চিন্তা করেন, সেই তত্ত্ব ও তোমার অন্তর্গোচর। ১৮
বুদ্ধি, প্রসিদ্ধও বটে, অপ্রসিদ্ধও বটে। কাৰ্য্য দেখিয়া বুদ্ধির অস্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়, তাই প্রসিদ্ধ; সাক্ষাৎ উপলব্ধি করা যায় না, তাই অপ্রসিদ্ধ; বুদ্ধি যোগহৃদয়ে প্রপঞ্চ-শূন্য, আর সংসারহৃদয়ে প্রপঞ্চবর্তী অর্থাৎ তুমি বহুশাখান্বিতা প্রসিদ্ধ। অপ্রসিদ্ধ প্রপঞ্চশূন্যা প্রপঞ্চবতী বজ্রগ্রাহিণী জনগণের হৃদয়মধ্যে অবস্থিত নিৰ্ম্মল-স্বরূপা বুদ্ধি। ১৯
তুমি বিদ্যা, তুমিই অবিদ্যা, তুমি সাবলম্বা, তুমিই নিরবলম্ব, তুমি জগৎ প্রপঞ্চময়ী আদ্যাশক্তি তুমিই জগদীশ্বরী। ২০
যিনি সরস্বতী নামে আখ্যাত হন, তুমি সেই বিরিঞ্চিকণ্ঠবাসিনী বেদ প্রকাশিনী ব্রহ্মাণ্ডোদ্ভাসিনী বাণী। ২১
তুমি অগ্নি, তুমি স্বাহা; তুমি পিতৃগণ, তুমি স্বধা, তুমি আকাশ, তুমি কাল, তুমি দিক্, তুমিই বাহ্যবিষয়। ২২
তুমি অচিন্ত্যা, তুমি অব্যক্তা, তুমি অনিৰ্দেশ্য রূপা, তুমি কালরাত্রি, তুমি শান্তা, তুমিই পরমা প্রকৃতি। ২৩
সংসারস্থ জীবগণের পরিত্রাণের জন্য তুমি যে বাহ্যরূপ ধারণ করিয়াছ, তাহাই ব্ৰহ্মা প্রভৃতি অবগত আছেন, কিন্তু পরাৎপররূপিণী তোমাকে কে জানিতে পারে? ২৪
মা ভগবতি! প্রসন্ন হও; হে সৌম্যরূপে! প্রসন্ন হও; হে ঘোররূপিণি! প্রসন্ন হও; হে জগন্ময়! তোমাকে নমস্কার। ২৫
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–হে দ্বিজগণ! মহাত্মা দক্ষ এইরূপ স্তব করিলে, মহামায়া, তাহার অভিসন্ধি স্বয়ং অবগত থাকিয়াও তাহাকে বলিলেন,–দক্ষ তোমার এই পরমভক্তি দ্বারা আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি। তুমি অভিলষিত বর প্রার্থনা কর,আমি স্বয়ং তাহা দিতেছি। ২৬-২৭
প্রজাপতে। তোমার নিয়ম, তপস্যা ও স্তবের দ্বারা আমি অতীব সন্তুষ্ট হইয়াছি। তুমি অভিলষিত বর প্রার্থনা কর,-আমি প্রদান করিব। ২৮।
দক্ষ বলিলেন,হে জগন্ময়ি। হে মহামায়ে। যদি আমাকে বর প্রদান করা হয়, তাহা হইলে এই বর প্রদান কর যে, তুমি অবিলম্বে আমার কন্যা হইয়া শিবপত্নী হইবে। ২৯
হে দেবী! প্রজেশ্বরি। এই বর (wish) একা আমার পক্ষে নহে, কিন্তু এই জগতের–অধিক কি ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরেরও পক্ষে জানিবে। ৩০
দেবী বলিলেন,–হে প্রজাপতে! আমি অবিলম্বেই তোমার পত্নীর গর্ভে তোমার কন্যারূপে উৎপন্ন হইয়া শঙ্করের সহধর্মিণী হইব। ৩১
যখন তুমি আমার প্রতি শিথিলাদর হইবে, তখন আমি তৎক্ষণাৎ দেহ ত্যাগ করিব; আর যদি আদর শৈথিল্য না হয়, তাহা হইলে চিরদিন সুখে থাকিব। ৩২।
হে প্রজাপতে! আমি প্রতি সৃষ্টিতেই তোমার কন্যা হইয়া মহাদেবের প্রেয়সী হইব, এই বর তোমাকে দিলাম। ৩৩
প্রজাপতে! আকুলতা-শূন্য মহাদেব, যাহাতে যতবার মিলন হইবে, ততবারই মোহিত হন তাহা করিব।* ৩৪
[* “প্রতিসঙ্গং” এই পাঠ বহুসন্মত। এই পাঠের অর্থ উপরে লিখিত হইল। “প্রতিসঙ্গং” পাঠের অর্থ—“মহাদেব যাহাতে প্রতি দৃষ্টিতেই মোহিত হন।”]
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–মহামায়া প্রজাপতি প্রধান দক্ষকে এই কথা বলিয়া তাঁহার সমক্ষেই তথা হইতে অন্তর্হিত হইলেন। ৩৫
মহামায়া অন্তর্হিতা হইলে দক্ষ ও আপন আশ্রমে গমন করিলেন, আর মহামায়া কন্যা হইবেন মনে করিয়া বড়ই আহ্লাদিত হইলেন। অনন্তর দক্ষ স্ত্রীসঙ্গ ব্যতিরেকেই সঙ্কল্প, অভিসন্ধি, মানস এবং চিন্তার সাহায্যে প্রজা উৎপাদন করিলেন। ৩৬-৩৭
হে দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! এরূপে তাহার যে সকল পুত্ৰ উৎপন্ন হইল, তাহারা নারদের উপদেশ ক্রমে এই পৃথিবী পৰ্যটন করিতে লাগিল। ৩৮
দক্ষের পুনঃপুনঃ সহস্র সহস্র পুত্র উৎপন্ন হইতে লাগিল; তাহারা সকলেই নারদের বাক্যে পূৰ্বজাত ভ্রাতৃগণের পদবী অনুসরণ করিল। ৩৯
হে দ্বিজোত্তমগণ! তোমরা সকলেই ভূমণ্ডলের এক এক জন সৃষ্টিকর্তা; অতএব এই বিস্তৃত ভূভাগের উপান্ত প্রান্ত একবার সম্পূর্ণরূপে দেখ। ৪০
দক্ষতনয়গণ নারদের এই কথায় প্রেরিত হইয়া পৃথিবী পৰ্যটনে প্রবৃত্ত হইলেন, আজিও প্রতিনিবৃত্ত হইলেন না। ৪১
অনন্তর, দক্ষ, মৈথুনধৰ্ম্মে প্রজা উৎপাদন করিবার নিমিত্ত ইচ্ছানুরূপ বীরণতনয়াকে বিবাহ করিলেন। ৪২।
হে সাধু-প্রধানগণ! তাহার নাম বীরিণী এবং অসিক্লী, হে দ্বিজোত্তমগণ! দক্ষ প্রজাপতির তাঁহাতে প্রথম সঙ্কল্প হইল; অর্থাৎ ইহার গর্ভে সন্তান হউক, এই প্রথম অভিসন্ধি হইলেই তাহার গর্ভে সদ্য মহামায়া উৎপন্ন হইলেন। তিনি উৎপন্ন হইবামাত্র প্রজাপতি অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং সেই দুহিতার উজ্জ্বল তেজ দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন, ইনিই সেই মহামায়া। ৪৩-৪৪
তিনি উৎপন্ন হইলে, পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল; মেঘমালা বারিধারা বর্ষণ করিতে লাগিল; দিত্মণ্ডল প্রশান্ত ভাব ধারণ করিল। ৪৫
দেবগণ, নভস্তলে অবস্থিত হইয়া মঙ্গল বাদ্য বাজাইলেন। হে নরোত্তম গণ! তিনি ভূমিষ্ঠ হইলে নিৰ্বাণ অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। ৪৬-৪৭
দক্ষ সেই মহামায়া জগদীশ্বরী বিষ্ণুমায়াকে দেখিয়া বীরিণীর অলক্ষ্যে যথাশক্তি তাহার সন্তোষ উৎপাদন করিতে যত্নশীল হইলেন। ৪৭
দক্ষ বলিলেন,–বিষ্ণু যাহাকে শিবা, শান্তা, যোগনিদ্রা এবং জগন্ময়ী বলেন, সেই নিত্যরূপাকে প্রণাম করি। ৪৮
বিধাতা যাহার নিয়োগে জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন, জগৎপতি বিষ্ণু যাহার আদেশ পালন করিতে তৎপর, যাহার আজ্ঞায় রুদ্র সংহারকারী, সেই মহীয়সী দেবীকে নমস্কার করি। ৪৯
নির্বিকারা, নির্মলা, অপ্রমেয়া, প্রমা-প্রমাণ- প্রমেয়রূপিণী প্রমাবতী সুখাত্মিকা দেবীকে প্রণাম করি। ৫০
যে ব্যক্তি বিদ্যা-অবিদ্যারূপিণী পরাৎপরা তোমাকে ধ্যান করে, ভোগ ও মুক্তি তাহার করতলস্থ। ৫১
যে ব্যক্তি, বিদ্যা-অবিদ্যা-প্রকাশিনী পবিত্রতা-কারিণী তোমাকে একবারও প্রত্যক্ষ অবলোকন করে অবশ্য তাহার মুক্তি হয়। ৫২।
হে যোগনিদ্রে! মহামায়ে! হে জগন্ময়! বিষ্ণুমায়ে! প্রমাণ-প্রমেয়-বতী চিৎশক্তিমাত্রেই তোমার অংশ। ৫৩
জগদম্বে। যাহারা আপনাকে অম্বিকা, জগন্ময়ী এবং মায়া বলিয়া স্তব করে, তাহাদিগের সকলই হয়। ৫৪
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–মহাত্মা দক্ষ, জগদম্বার এইরূপ স্তব করিলে, মা যাহাতে শুনিতে না পান এইরূপ ভাবে তিনি দক্ষকে বলিতে লাগিলেন। ৫৫
তখন অম্বিকা, কেবল দক্ষ শুনিতে পান ও অপরে শুনিতে না পায় এইরূপ ভাবে তত্রস্থ জনগণকে মোহিত করিয়া বলিতে লাগিলেন;-হে মুনিবর! তুমি পূর্বে যে কার্যের জন্য আমাকে আরাধনা করিয়াছিলে, তোমার সেই অভিলষিত কাৰ্য্য সিদ্ধ হইয়াছে; এখন সময় মত অবধারণ কর। ৫৬-৫৭
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–তখন দেবী এই কথা বলিয়া দক্ষকেও নিজ মায়ায় আচ্ছন্ন করিলেন; আপনি শৈশবভাব অবলম্বন করিয়া জননী-পার্শ্বে রোদন করিতে লাগিলেন। ৫৮
অনন্তর, বীরিণী, সযত্নে যথোচিত ভাবে মুখ চক্ষু প্রভৃতি মার্জনা করিয়া দিয়া শিশুপালন-বিধি-অনুসারে তাহাকে স্তন্যপানাদি করাইতে লাগিলেন। ৫৯
তিনি বীরিণী ও মহাত্মা দক্ষকর্তৃক পালিত হইয়া শুক্লপক্ষের শশধরের ন্যায় দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন। ৬০
হে দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! যেমন সমস্ত মনোহর কলা চন্দ্রে প্রবেশ করে, সেইরূপ তদীয় গুণাবলী শৈশবেই তাহাতে দেখা দিল। ৬১
যখন তিনি, সখীমধ্যে নিজ ভাবে ক্রীড়া করিতেন, তখনই নিরন্তর মহান দেবের প্রতিমূর্তি লিখিতেন। ৬২
যখন তিনি বাল্যোচিত গান করিতে প্রবৃত্ত হইতেন তখন অন্য কথার পরিবর্তে উগ্র, স্থাণু, হর, রুদ্র, স্মরশাসন–এই সকল কথাই তাহার স্মৃতিপথে আসিত। ৬৩।
হে দ্বিজবরগণ! সৰ্বগুণে গুণবতী প্রশংসাপাত্রী সেই দুহিতার সত্তা অর্থাৎ সাধুতা ও নীতিপরায়ণতা দেখিয়া দক্ষ ‘সতী’ নাম রাখিলেন। ৬৪
বাল্যকালেও নিত্য-ভক্তিমতী সেই দুহিতার প্রতি, দক্ষ এবং বীরিণীর অনুপম বাৎসল্য প্রতিদিন প্রতিক্ষণে বাড়িতে লাগিল। ৬৫
হে দ্বিজোত্তমগণ! শৈশবোচিত সকল গুণে গুণবতী সতত নীতিপরায়ণা সেই দুহিতা, মাতাপিতাকে নিয়ত সন্তুষ্ট করিতেন। ৬৬।
অনন্তর একদা তিনি পিতার পার্শ্বে বসিয়া আছেন, এমন সময় ব্রহ্মা ও নারদ ভূমণ্ডলের রত্নভূতা সেই কন্যাটিকে দেখিতে আসিলেন। ৬৭
সতীও,–ব্রহ্মা এবং নারদকে দেখিয়া হৃষ্টচিত্তে সবিনয়ে প্রণাম করিলেন। ৬৮
বিধি-নারদ, প্রণামের পর বিনয়াবনতা সতীর প্রতি দৃষ্টিপাত করত এই আশীৰ্বাদ করিলেন যিনি তোমাকে কামনা করিতেছেন, আর তুমি যাহাকে পতি করিতে অভিলাষিণী; সেই সৰ্ব্বজ্ঞ জগদীশ্বর তোমার পতি হউন। ৬৯
হে কল্যাণি। যিনি তোমা ব্যতীত অপর রমণী গ্রহণ করেন নাই, করেন না এবং করিবেন না, তোমার সেই অনন্যসদৃশ পতি-লাভ হউক। ৭০
হে দ্বিজবরগণ! তাহারা এই কথা বলিয়া অনেকক্ষণ দক্ষালয়ে অবস্থিতি করিলেন, তৎপরে দক্ষের নিকট বিদায় লইয়া স্বস্থানে গমন করিলেন। ৭১
অষ্টম অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ৮
নবম অধ্যায় – দাক্ষায়ণীর ব্রত
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর সতী, শৈশব অতিক্রম করিয়া শোভন যৌবনে পদার্পণ করিলেন। ১
তখন সেই সহজ-সৰ্বাঙ্গসুন্দরীর অঙ্গে রূপরাশি দ্বিগুণ উথলিয়া পড়িল। প্রজাপতি দক্ষ দুহিতাকে প্রারূঢ়-যৌবনা দেখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই কন্যাকে মহাদেবের হস্তে সম্প্রদান করিব কিরূপে? ২
অনন্তর, সতী আপনিও, মহাদেবকে পাইবার আশয়ে, মাতৃ-আদেশে গৃহস্থিত চিত্ৰিত মহাদেবের আরাধনা করিতে লাগিলেন। ৩
আশ্বিন মাসের নন্দকানামী অষ্টমীতে গুড়ৌদন ও লবণদ্বারা মহাদেবের পূজা করিয়া বন্দনা করিতে লাগিলেন, এইরূপে সেইদিন অতিবাহিত করিলেন। ৪
কার্তিক মাসের চতুর্দশীতে বিবিধ পায়স পিষ্টক দ্বারা শিবের আরাধনা করিয়া সেই পরমেশ্বরকে স্মরণ করিতে লাগিলেন। ৫
অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে যবৌদন ও তিল দ্বারা দেবাদি দেবের আরাধনা করিয়া সেইদিন অতিবাহিত করিলেন। ৬
সেই সতী, পৌষমাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমীনিশাতে জাগরণাদি করিয়া প্রাতঃকালে কৃসরান্ন (তিল-মুগ-সিদ্ধ ওদন) দ্বারা মহাদেবের পূজা করিলেন। ৭
তিনি মাঘমাসের পূর্ণিমাতে রাত্রিজাগরণ করিয়া নদীতীরে অবসনে শিবপূজা করিলেন। ৮
আর সম্পূর্ণ মাঘমাসে তৎকাল সম্ভুত বিবিধ পুষ্প ফল দ্বারা শিবপূজা-নিরত হইয়া সংযতাহারে থাকিলেন। ৯
ফাল্গুনমাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে রাত্রি জাগরণ করিয়া বিল্বপত্র দ্বারা বিশেষরূপে শিবপূজা করিলেন। ১০
সতী চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশীতে দিবসে ও রাত্রিতে পলাশ কুসুম দ্বারা শিবপূজা করিলেন এবং শিবকে স্মরণ করত সেই দিবারাত্রি অতিবাহিত করিলেন। ১১
তিনি বৈশাখমাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়াতে যবোদন দ্বারা শিবপূজা করিলেন, সম্পূর্ণ বৈশাখমাস ধৃত ভোজন করিয়া রহিলেন এবং মহাদেবকে স্মরণ করত নিরাহারে সেই দিন যাপন করিলেন। ১২
জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমানিশাতে বসন ও বৃহতী পুষ্প দ্বারা মহাদেবের পূজা করিয়া নিরাহারে সেই রজনী অতিবাহিত করিলেন। ১৩
আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশীতে বৃহতীকুসুম দ্বারা মহাদেবের পূজা করিলেন। ১৪
শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী এবং চতুর্দশীতে যজ্ঞোপবীত, বস্ত্র এবং কুশ দ্বারা শিবপূজা করিলেন। ১৫
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে নানাবিধ পুষ্প ও ফল দ্বারা শিব পূজা করিয়া পরদিন চতুর্দশীতে জল পান করিয়া থাকিলেন। ১৬
যখন সতী এই ব্ৰতারম্ভ করেন, তখনই সাবিত্র’ সমভিব্যাহারে ব্রহ্মা, লক্ষ্মী সমভিব্যাহারে ভগবান বাসুদেব-যথায় গণপরিবৃত মহাদেব অবস্থিত ছিলেন, সেই হিমালয় প্রস্থে তদীয় সমীপে গমন করিয়াছিলেন। ১৭-১৮
মহেশ্বর, ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে সস্ত্রীক সমাগত দেখিয়া যথোচিত সম্ভাষণপূর্বক তাহাদিগের আগমন প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করিলেন। ১১
মহাদেব তাহাদিগকে দাম্পত্যপ্রেমে আবদ্ধ দেখিয়া দারপরিগ্রহ করিতে মনে মনে কিঞ্চিৎ অভিলাষ করিলেন। ২০
অনন্তর “তোমাদিগের আগমন প্রয়োজন যথার্থরূপে বল; তোমরা কিজন্য আসিয়াছ? এখানে তোমাদিগের কি প্রয়োজন আছে?” ২১
মহাদেব এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে সৰ্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মা বিষ্ণুকর্তৃক প্রণোদিত হইয়া মহাদেবকে বলিলেন;–হে ত্রিলোচন! আমরা যে জন্য আসিয়াছি তাহা শ্রবণ কর; হে বৃষধ্বজ! দেবতাদের জন্য, বিশেষতঃ সৃষ্টি রক্ষার জন্যই আমরা আসিয়াছি। ২২-২৩
শম্ভু! আমি প্রতিবারেই এই জগৎ সৃষ্টি করি, বিষ্ণ, পালন করেন, তুমি সংহার করিয়া থাক। ২৪।
তোমাদিগের উভয়ের সাহায্যে আমি আমার কর্তব্যকাৰ্য করিতে সমর্থ; বিষ্ণ, তোমার ও আমার সাহায্যে পালনকার্য্যে সমর্থ হন; তুমিও আমা দিগের উভয়ের সাহায্য ব্যতীত সংহার করিতে সমর্থ হও না। ২৫
অতএব হে বৃষধ্বজ! আমাদিগের পরস্পরের কাৰ্যে পরস্পরের সাহায্য করা উচিত; নতুবা জগৎ থাকে না। ২৬
কোন কোন অসুর আমার বধ্য হইবে; কোন কোন অসুর। নারায়ণের বধ্য হইবে; কোন কোন অসুর তোমারও বধ্য হইবে। ২৭
কতকগুলি সুরবৈরী তোমার পুত্রের বধ্য; কতকগুলি আমার আত্মজ দিগের বধ্য; কতকগুলি বা মায়ার বধ্য হইবে। ২৮
তুমি সর্বদা যোগরত, বাগদ্বেষাদি-শূন্য ও দয়া-মাত্ৰসার হইলে তোমার। বধ্য অসুরসকলের আর বধ হইবে না। ২৯
হে ঈশ! হে বৃষধ্বজ! অথচ তাহাদিগের বধ না হইলে বারে বারে উপযুক্তমত সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ই হইবে না। ৩০
হে হর! যদি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় না করা গেল, তাহা হইলে আমাদিগের মায়ার শরীর ভেদ হওয়ার আবশ্যকতা নাই। ৩১
আমরা সকলেই এক; কেবল কাৰ্য্যভেদে রূপভেদ হইয়াছে; সেই কাৰ্য্য ভেদই যদি সিদ্ধ না হইল, তাহা হইলে রূপভেদের প্রয়োজন কি? ৩২
আমরা একই; ত্রিবিধ হইয়া বিভিন্নস্বরূপ হইয়াছি। মহেশ্বর। এই সনাতনতত্ত্ব জানিও। ৩৩
মায়াও কাৰ্যভেদে বিভিন্ন রূপ ধারণ করাতে–কমলা, সরস্বতী, সাবিত্রী ও সন্ধ্যা হইয়াছেন। ৩৪
হে মহেশ্বর! নারীই প্রবৃত্তি ও অনুরাগের মূল। স্ত্রীপরিগ্রহের পর, কাম ক্কোধাদির উৎপত্তি হয়। ৩৫
কাম-ক্রোধাদির উৎপত্তি হেতু অনুরাগ উৎপন্ন হইলে, প্রাণিগণ যত্নপূর্বক বৈরাগ্য হেতুকে পরিত্যাগ করে। ৩৬
সঙ্গই, অনুরাগবৃক্ষের মহৎ ও প্রথম ফল। সঙ্গ হইতে কাম কাম হইতে ক্রোধের উৎপত্তি। ৩৭
বৈরাগ্য এবং নিবৃত্তি শোকবশতও হয়, স্বভাববলেও হয়; সংসারপরাধ ব্যক্তির কদাপি সঙ্গ হয় না। ৩৮
তাহা হইলেই, হে মহেশ্বর! তাহার দয়া ও শান্তি উপস্থিত হয়। তখন অহিংসা, ক্ষমা এবং জ্ঞানমার্গের অনুসরণে প্রবৃত্তি হয়। ৩৯
তুমি তপোনিষ্ঠ সঙ্গ-হীন এবং সতত দয়াযুক্ত হইলে তোমার অহিংসা ও সতত শাস্তি হইবে। ৪০
তাহা হইলে তোমার অসুর-বধে প্রযত্ন হইবে কিরূপে?–দারপরিগ্রহ না করিলে যে যে দোষ, তৎসমস্তই তোমাকে বলিলাম। ৪১
অতএব হে জগদীশ্বর! শুধু দেবগণের নহে,-জগতের হিতার্থে, তুমি এক সুশোভনা রমণীর পাণিগ্রহণ কর। ৪২
বিষ্ণর যেমন লক্ষ্মী, আমার যেমন সাবিত্রী সেইরূপ তোমার যিনি সহচরী হইবেন, হে শম্ভু! এখন তুমি তাহার পাণিগ্রহণ কর। ৪৩
মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–মহাদেব, ব্ৰহ্মার এই কথা শ্রবণে মুখ তুলিয়া ঈষৎ হাস্য করত নারায়ণ সমীপে তাহাকে বলিতে লাগিলেন। ৪৪।
ঈশ্বর বলিলেন,–ব্ৰহ্মন! জগতের জন্য তুমি যাহা বলিলে তাহা ঠিক বটে, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে ব্ৰহ্মচিন্তাই আমার স্বার্থ। সেই স্বার্থব্যাঘাত-ভয়েই জগতের হিতকর কাৰ্যেও আমার প্রবৃত্তি হইতেছে না। ৪৫
তথাপি আমি যেরূপ জগতের হিতানুষ্ঠান করিতে পারি তাহা বলিতেছি। হে মহাভাগ। আমার উচিত কথা শ্রবণ কর। ৪৬।
যিনি ভাগে ভাগে আমার তেজ গ্রহণে সমর্থ হইবেন, আমার ভার্যা করিবার জন্য তাদৃশ কামরূপিণী যোগিনী রমণী নির্দেশ কর। ৪৭।
আমি যোগমুক্ত হইলে যোগযুক্ত হইবে; আমি কামাসক্ত হইলে মোহিনী হইবে;-হে ব্ৰহ্মন্! এইরূপ বরবণিনী রমণী কে বলিয়া দাও? ৪৮
আমি ভাৰ্য্যা করিতে প্রস্তুত আছি। বেদবিৎ পণ্ডিতগণ যাঁহাকে “অক্ষয়” (অবিনাশী) বলিয়া থাকেন, সেই সনাতন পরম জ্যোতিকে চিন্তা করিব। ৪৯
তদীয় চিন্তায় আসক্ত হইয়া গাঢ় সমাধিস্থ হইব; যে রমণী তাহাতে বিঘ্ন করিবে, সে-ই আমার ভাৰ্য্যা হইতে পারিবে। ৫০
তুমি, আমি বা বিষ্ণু–আমরা সকলেই পরম ব্রহ্মের অংশ (Param Brahman); হে মহাভাগ! তাহার চিন্তা করা আমাদিগের উচিত। ৫১
হে কমলাসন! তদীয় চিন্তা ব্যতীত আমি ক্ষণকালও থাকিতে পারি না। অতএব বলিয়া দাও, কে সতত আমার কৰ্ম্মের অনুগামিনী রমণী;–আমি তাহাকে বিবাহ করিতে পারি। ৫২।
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সৰ্ব্বজগৎপতি ব্রহ্মা মহাদেবের এই কথা শুনিয়া। স্মিতমুখে হৃষ্টচিত্তে এই কথা বলিলেন। ৫৩
ব্রহ্মা বলিলেন,–মহাদেব! তুমি যেরূপ চাহিতেছ, সেরূপ রমণী আছে। ৫৪
সতীনাম্নী শুভাননা দক্ষতনয়া তোমার প্রার্থনানুরূপ রমণী, সেই বুদ্ধি শালিনীই তোমার ভাৰ্য্যা হইবেন। ৫৫
তিনি তোমাকে পাইতে অভিলাষিণী হইয়া তোমার প্রীতি-সাধনোদ্দেশে তপস্থা করিতেছেন জানিও; হে দেবদেবেশ! তুমি সর্বান্তর্যামী-সকলই জানিতেছ। ৫৬
মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর ব্রহ্মার বাক্য শেষ হইলে ভগবান মধুসূদন বলিলেন,–ব্ৰহ্মা যাহা বলিলেন, তাহা তুমি কর। ৫৭
শিব “করিব” বলিলে ব্ৰহ্মা-সাবিত্রী ও লক্ষ্মী-নারায়ণ হৃষ্টচিত্তে স্ব স্ব স্থানে গমন করিলেন। ৫৮
শিবের সেই কথা শ্রবণ করিয়া মদন, রতি এবং মদনের বন্ধুবৰ্গ বিশেষ হর্ষযুক্ত হইলেন। অনন্তর মদন, শিব-সমীপে গমনপূর্বক বসন্তকে সতত নিযুক্ত রাখিয়া প্রচ্ছন্নরূপে অবস্থান করিতে লাগিলেন। ৫৯
নবম অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ৯
দশম অধ্যায় – দাক্ষায়ণীকে শিবের বর প্রদান
to be added