ঔপনিষদ ব্রহ্ম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- Oupanishad Brahma- Rabindranath Thakur
Home » Law Library Updates » Law Library » Bengali Page » ঔপনিষদ ব্রহ্ম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- Oupanishad Brahma- Rabindranath Thakur
ঔপনিষদ ব্রহ্ম
আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে শ্ৰীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য্য দ্বারা মুদ্রিত ।
৫৫নং অপার চিৎপুর রোড । শ্রাবণ, ১৩০৮ সাল ।
Read Next
মূল্য । চারি আনা
ওঁ নমঃ পরমঋষিভ্যো নমঃ পরমঞ্চষিভ্যঃ, পরম ঋষিগণকে নমস্কার করি, পরম ঋষিগণকে নমস্কার করি, এবং অন্তকার সভায় সমাগত আৰ্য্যমণ্ডলীকে জিজ্ঞাসা করি— ব্রহ্মবাদী ঋষিরা যে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন সে কি একেবারেই ব্যর্থ হইয়াছে ? অদ্য আমরা কি তাহদের সহিত সমস্ত যোগ বিচ্ছিন্ন করিয়াছ ? বৃক্ষ হইতে যে জীর্ণ পল্লবটি ঝরিয়া পড়ে সেও বৃক্ষের মজার মধ্যে কিঞ্চিৎ প্রাণশক্তির সঞ্চার করিয়া যায়—স্বৰ্য্যকিরণ হইতে যে তেজটুকু সে সংগ্রহ করে তাহ বৃক্ষের মধ্যে এমন করিয়া নিহিত করিয়া যায় যে মৃত কাষ্ঠও তাহা ধারণ করিয়া রাখে, আর আমাদের ব্রহ্মবিদ ঋষিগণ ব্ৰহ্ম-স্বৰ্য্যলোক হইতে যে পরম তেজ, যে মহান সত্য আহরণ করিয়াছিলেন তাহা কি এই নানা শাখাপ্রশাখাসম্পন্ন বনম্পতির—এই ভারতব্যাপী পুরাতন আৰ্য্যজাতির মজ্জার মধ্যে সঞ্চিত করিয়া যান নাই ? তবে কেন আমরা গৃহে গৃহে আচারে অনুষ্ঠানে কায় মনে বাক্যে র্তাহাদের মহাবাক্যকে প্রতি মুহূৰ্ত্তে পরিহাস করিতেছি? তবে কেন আমরা বলিতেছি, নিরাকার ব্ৰহ্ম আমাদের জ্ঞানের গম্য নহেন, আমাদের ভক্তির আয়ত্ত নহেন, আমাদের কৰ্ম্মানুষ্ঠানের লক্ষ্য নহেন ? ঋষিরা কি এ সম্বন্ধে লেশমাত্র সংশয় রাখিয়া গিয়াছিলেন, র্তাহাদের অভিজ্ঞতা কি প্রত্যক্ষ এবং তাহাদের উপদেশ কি সুস্পষ্ট নহে? তাহারা বলিতেছেন— ইহ চেৎ আবেদীদথ সত্যমস্তি, নচেৎ ইহাবেদীর্মহতী বিনষ্টি: ; এখানে যদি তহিকে জানা যায় তবেই জন্ম সত্য হয়, যদি না জানা যায় তবে মহতী বিনষ্টি:, মহা বিনাশ । অতএব ব্রহ্মকে না জানিলেই নয় ।
কিন্তু কে জানিয়াছে ? কাহার কথায় আমরা আশ্বাস পাইব ? ঋষি বলিতেছেন— ইহৈব সন্তোহথ বিদ্যুস্তং বয়ং— নচেৎ আবেদীর্মহতী বিনষ্টি: । এখানে থাকিয়াই তাহাকে আমরা জানিয়াছি, যদি না জানিতাম তবে আমাদের মহতী বিনষ্টি হইত। আমরা কি সেই তত্ত্বদশী ঋষিদের সাক্ষ্য অবিশ্বাস করিব ? ইহার উত্তরে কেহ কেহ সবিনয়ে বলেন—আমরা অবিশ্বাস করি না—কিন্তু ঋষিদের সহিত আমাদের অনেক প্রভেদ ; তাহারা যেখানে আনন্দে বিচরণ করিতেন আমরা সেখানে নিঃশ্বাস গ্রহণ করিতে পারি না । সেই প্রাচীন মহারণ্যবাসী বৃদ্ধ পিপ্পলাদ ঋষি এবং স্ককেশা চ ভারদ্বাজ শৈবশ সত্যকামঃ, সৌৰ্য্যায়নী চ গার্গ্যঃ, কৌশল্যাশ্চাশ্বলায়নো ভার্গবো বৈদভি: কবন্ধী কাত্যায়নস্তে হৈতে ব্ৰহ্মপরা ব্রহ্মনিষ্ঠা: পরং ব্রহ্মান্বেষমাণাঃ– সেই ভরদ্বাজপুত্র মুকেশ, শিবিপুত্র সত্যকাম, সৌৰ্য্যপুত্র গার্গ্য, অশ্বলপুত্র কৌশল্য, ভৃগুপুত্র বৈদভি, কাত্যায়নপুত্র কবন্ধী, সেই ব্ৰহ্মপর ব্রহ্মনিষ্ঠ পরংব্ৰহ্মান্বেষমাণ ঋষিপুত্ৰগণ, যাহারা সমিং হস্তে বনস্পতিচ্ছায়াতলে গুরুসন্মুখে সমাসীন হইয়া ব্রহ্মজিজ্ঞাসা করিতেন র্তাহাদের সহিত আমাদের তুলনা হয় না । ন হইতে পারে, ঋষিদের সহিত আমাদের প্রভেদ থাকিতে পারে, কিন্তু সত্য এক, ধৰ্ম্ম এক, ব্রহ্ম এক ;—যাহাতে ঋষিজীবনের সার্থকতা, আমাদের জীবনের সার্থকতাও তাহাতেই ; যাহাতে র্তাহাদের মহতী বিনষ্টি তাহাতে আমাদের পরিত্রাণ নাই । শক্তি এবং নিষ্ঠার তারতম্য অনুসারে সত্যে ধৰ্ম্মে এবং ব্রহ্মে আমাদের নূ্যনাধিক অধিকার হইতে পারে কিন্তু তাই বলিয়া অসত্য অধৰ্ম্ম অব্রহ্ম আমাদের অবলম্বনীয় হইতে পারে না। ঋষিদের সহিত আমাদের ক্ষমতার প্রভেদ আছে বলিয়া তাহাদের অবলম্বিত পথের বিপরীত পথে গিয়া আমরা সমান ফল প্রত্যাশা করিতে পারি না । যদি তাহাদের এই কথা বিশ্বাস কর যে, ইহ চেদবেদীদথ সত্যমস্তি, এখানে তাহাকে জানিলেই জীবন সার্থক হয়—নচেৎ মহতী বিনষ্টি:, তবে বিনয়ের সহিত শ্রদ্ধার সহিত মহাজনপ্রদর্শিত সেই সত্যপথই অবলম্বন করিতে হইবে । সত্য ক্ষুদ্র বৃহৎ সকলেরই পক্ষে এক মাত্র এবং ঋষির মুক্তিবিধানের জন্য যিনি ছিলেন আমাদের মুক্তিবিধানের জন্যও সেই একমেব অদ্বিতীয়ং তিনি আছেন । যাহার পিপাসা অধিক তাহার জন্যও নিৰ্ম্মল নিঝরিণী অভ্ৰভেদী অগম্য গিরিশিখর হইতে অহোরাত্র নিঃস্তন্দিত, আর যাহার অল্প পিপাসা এক অঞ্জলি জলেই পরিতৃপ্ত র্তাহার জন্যও সেই অক্ষয় জলধারা অবিশ্রাম বহমান,—হে পান্থ, হে গৃহী, যাহার যতটুকু ঘট, লইয়া আইস, যাহার যতটুকু পিপাসা পান করিয়া যাও! আমাদের দৃষ্টিশক্তির প্রসর সঙ্কীর্ণ তথাপি সমুদয় সৌর জগতের একমাত্র উদ্দীপনকারী স্থৰ্য্যই কি আমাদিগকে আলোক বিতরণের জন্য নাই ? অন্ধকূপই আমাদের মত ক্ষুদ্রকায়ার পক্ষে যথেষ্ট হইতে পারে তবু কি অনন্ত আকাশ হইতে আমরা বঞ্চিত হইয়াছি ? পৃথিবীর অতি ক্ষুদ্র একাংশ সম্বন্ধে কথঞ্চিং জ্ঞান থাকিলেই আমাদের জীবনযাত্রা স্বচ্ছন্দে চলিয়া যায়, তবু কেন মহন্ত চন্দ্রস্থৰ্য্যগ্ৰহতারার অপরিমেয় রহস্ত উদঘাটনের জন্য অশ্রাস্ত কৌতুহলে নিরস্তর লোকলোকাস্তরে আপন গবেষণা প্রেরণ করিতেছে ?
Read Next
আমরা যতই ক্ষুদ্ৰ হই না কেন তথাপি ভূমৈব সুখং ভূমাই আমাদের মুখ, নাল্পে মুখমস্তি, অল্পে আমাদের স্বথ নাই। হঠাৎ মনে হইতে পারে ব্রহ্ম হইতে অনেক অল্পে, পরিমিত আকারবদ্ধ আয়ত্তগম্য পদার্থে আমাদের মত স্বল্পশক্তি জীবের সুখে চলিয়া যাইতে পারে—কিন্তু তাহ চলে না । ততো যদুত্তরতরং তদরূপমনাময়ং—যিনি উত্তরতর অর্থাৎ সকলের অতীত, র্যাহাকে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না, ধিনি অশরীর, রোগশোক-রহিত—য এতদ্বিচুঃ অমৃতাস্তে ভবস্তি, যাহারা ইহাকেই জানেন র্তাহারাই অমর হন—অথ ইতরে দুঃখমেব অপিয়স্তি, আর সকলে কেবল দুঃখই লাভ করেন । উপনিষৎ সকলকে আহবান করিয়া বলিতেছেন,— . তদেতৎ সত্যং তদমুতং তদ্বেদ্ধব্যং সোম্য বিদ্ধি । । তিনি সত্য, তিনি অমৃত, র্তাহাকে বিদ্ধ করিতে হইবে, হে সেীম, তাহাকে বিদ্ধ কর । ধনুগ্রহীত্বেীপনিষদং মহাস্ত্রং— উপনিষদে যে মহাস্ত্র ধন্থর কথা আছে সেই ধন্থ গ্রহণ করিয়া— শরং হ্যপাসানিশিতং সন্ধয়ীত— উপাসনা দ্বারা শাণিত শর সন্ধান করিবে ! আয়ম্য তদ্ভাবগতেন চেতসা লক্ষ্যং তদেবাক্ষরং সোম্য বিদ্ধি ! তদ্ভাবগত চিত্তের দ্বারা ধন্থ আকর্ষণ করিয়া লক্ষ্য-স্বরূপ সেই অক্ষর ব্রহ্মকে বিদ্ধ কর । এই উপমাটি অতি সরল । যখন শুভ্ৰ সবলতনু আৰ্য্যগণ আদিম ভারতবর্ষের গহন মহারণ্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, যখন হিংস্র পশু এবং হিংস্র দস্থ্যদিগের সহিত তাহাদের প্রাণপণ সংগ্রাম চলিতেছে তখনকার সেই টঙ্কারমুখর অরণ্যনিবাসী কবির উপযুক্ত এই উপমা ! এই উপমার মধ্যে যেমন সরলতা তেমনি একটি প্রবলতা আছে। ব্রহ্মকে বিদ্ধ করিতে হইবে—ইহার মধ্যে লেশমাত্র কুষ্ঠিত ভাব নাই। প্রকৃতির একান্ত সারল্য এবং ভাবের একাগ্র বেগ না থাকিলে এমন অসঙ্কোচ বাক্য কাহারো মুখ দিয়া বাহির হয় না। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দ্বারা যাহার ব্রন্ধের সহিত অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছেন তাহারাই এরূপ সাহসিক উপমা এমন সহজ এমন প্রবল সরলতার সহিত উচ্চারণ করিতে পারেন। মৃগ যেমন ব্যাধের প্রত্যক্ষ লক্ষ্য, ব্রহ্ম তেমনি আত্মার অনন্য লক্ষ্যস্থল। অপ্রমত্তেন বেন্ধব্যং শরবত্তন্ময়ো ভবেৎ। প্রমাদ-শূন্ত হইয় তাহাকে বিদ্ধ করিতে হুইবে এবং শর যেমন লক্ষ্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়া আচ্ছন্ন হইয়া যায় সেইরূপ ত্রন্ধের মধ্যে তন্ময় হইয়া যাইবে । উপমাটি যেমন সরল, উপমার বিষয়গত কথাটি তেমনি গভীর। এখন সে অরণ্য নাই, সে ধন্থঃশর নাই ; এখন নিরাপদ নগরনগরী অপরূপ অস্ত্রশস্ত্রে স্বরক্ষিত । কিন্তু সেই আরণ্যক ঋষিকবি যে সত্যকে সন্ধান করিয়াছেন সেই সত্য অন্তকার সভ্য যুগের পক্ষেও দুর্লভ। আধুনিক সভ্যতা কামান বন্দুকে ধন্থঃশরকে জিতিয়াছে কিন্তু সেই কত শত শতাব্দীর পূর্ববর্তী ব্ৰহ্মজ্ঞানকে পশ্চাতে ফেলিতে পারে নাই। সমস্ত প্রত্যক্ষ পদার্থের মধ্যে তদেতৎ সত্যং, সেই যে একমাত্র সত্য, যা অণুভ্যোণুচ, যাহা অণু হইতেও অণু, অথচ যস্মিন লোক নিহিত লোকিনশ্চ, যাহাতে লোক সকল এবং লোকবাসী সকল নিহিত রহিয়াছে সেই অপ্রত্যক্ষ ধ্রুব সত্যকে শিশুতুল্য সরল ঋষিগণ অতি নিশ্চিতরূপে জানিয়াছেন । তদস্মৃতং, তাহাকেই তাহারা অমৃত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন এবং শিষ্যকে ডাকিয়া বলিয়াছেন তদ্ভাবগতেন চেতসা, তদ্ভাবগত চিত্তের দ্বারা তাহাকে লক্ষ্য কর—তদ্বেদ্ধব্যং সোম্য বিদ্ধি, তাহাকে বিদ্ধ করিতে হইবে, হে সৌম্য র্তাহাকে বিদ্ধ কর । শরবত্তন্ময়ো ভবেৎ, লক্ষ্যপ্রবিষ্ট শরের ন্যায় তাহারই মধ্যে তন্ময় হইয়া যাও । সমস্ত আপেক্ষিক সত্যের অতীত সেই পরম সত্যকে কেবলমাত্র জ্ঞানের দ্বারা বিচার করা সেও সামান্ত কথা নহে, শুদ্ধ যদি সেই জ্ঞানের অধিকারী হইতেন তবে তাহাতেও সেই স্বল্লাশী বিরলবসন সরলপ্রকৃতি বনবাসী প্রাচীন আৰ্য্য ঋষিদের বুদ্ধিশক্তির মহৎ উৎকর্ষ প্রকাশ পাইত ।
কিন্তু উপনিষদের এই ব্ৰহ্মজ্ঞান কেবলমাত্ৰ বুদ্ধিবৃত্তির সাধনা নহে—সকল সত্যকে অতিক্রম করিয়া ঋষি র্যাহাকে একমাত্র তদেতৎ সত্যং বলিয়াছেন, প্রাচীন ব্রহ্মজ্ঞদের পক্ষে তিনি কেবল জ্ঞানলভ্য একটি দার্শনিক তত্ত্বমাত্র ছিলেন না—একাগ্রচিত্ত ব্যাধের ধন্থ হইতে শর যেরূপ প্রবলবেগে প্রত্যক্ষ সন্ধানে লক্ষ্যের দিকে ধাবমান হয়, ব্রহ্মর্ষিদের আত্মা সেই পরম সত্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তন্ময় হইবার জন্য সেইরূপ আবেগের সহিত ধাবিত হইত। কেবল মাত্র সত্য নিরূপণ নহে, সেই সত্যের মধ্যে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ তাহাদের লক্ষ্য ছিল। কারণ, সেই সত্য কেবলমাত্র সত্য নহে, তাহা অমৃত । তাহা কেৰল আমাদের জ্ঞানের ক্ষেত্র অধিকার করিয়া নাই, তাহাকে আশ্রয় করিয়াই আমাদের আত্মার অমরত্ব। এই জন্য সেই অমৃত পুরুষ ছাড়িয়া আমাদের আত্মার অন্ত গতি নাই ঋষিরা ইহা প্রত্যক্ষ জানিয়াছেন এবং বলিয়াছেন— স য: অন্তম আত্মন: প্ৰিয়ং ৰুবাণং ব্রুয়াং— অর্থাং যিনি পরমাত্মা ব্যতীত অন্তকে আপনার প্রিয় করিয়া বলেন-প্রিয়ং রোৎস্ততীতি-ৰ্তাহার প্রিয় বিনাশ পাইবে । যে সত্য আমাদের জ্ঞানের পক্ষে সকল সত্যের শ্রেষ্ঠ আমাদের আত্মার পক্ষে তাহাই সকল প্রিয়ের প্রিয়তম ;–যদয়মাত্মা— এই যে সৰ্ব্বাপেক্ষা অন্তরতর পরমাত্মা ইনি আমাদের পুত্র হইতে প্রিয়, বিত্ত হইতে প্রিয়, অন্য সকল হইতে প্রিয়। তিনি শুষ্ক জ্ঞানমাত্র নহেন, তিনি আমাদের আত্মার প্রিয়তম । আধুনিক হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যাহারা বলেন ব্রহ্মকে আশ্রয় করিয়া কোন ধৰ্ম্ম সংস্থাপন হইতে পারে না, তাহা কেবল তত্ত্বজ্ঞানীদের অবলম্বনীয়, তাহারা উক্ত ঋষিবাক্য স্মরণ করিবেন ।
ইহা কেবল বাক্যমাত্র নহে,—প্রীতিরসকে অতি নিবিড় নিগুঢ় রূপে আস্বাদন করিতে না পারিলে এমন উদার উন্মুক্ত ভাবে এমন সরল সবল কণ্ঠে প্রিয়ের প্রিয়ত্ব ঘোষণা করা যায় না । তদেতৎ প্রেয়ঃ পুত্রাৎ প্রেয়ো বিত্তাং প্রেয়োহন্তস্মাং সৰ্ব্বস্মাৎ আস্তরতরং যদয়মাত্মা— ব্রহ্মর্ষি এ কথা কোন ব্যক্তিবিশেষে বদ্ধ করিয়া বলিতেছেন না—তিনি বলিতেছেন না, যে, তিনি আমার নিকট আমার পুত্র হইতে প্রিয়, বিত্ত হইতে প্রিয়, অন্ত সকল হইতে প্রিয়—তিনি বলিতেছেন আত্মার নিকটে তিনি সৰ্ব্বাপেক্ষা অন্তরতর— জীবাত্মামাত্রেরই নিকট তিনি পুত্র হইতে প্রিয়, বিত্ত হইতে প্রিয়, অন্য সকল হইতে প্রিয়—জীবাত্মা যখনই তাহাকে যথার্থরূপে উপলব্ধি করে তখনি বুঝিতে পারে তাহ অপেক্ষ প্রিয়তর আর কিছুই নাই । অতএব পরমাত্মাকে যে কেবল জ্ঞানের দ্বারা জানিব তদেতৎ সত্যং, তাহা নহে, তাহাকে হৃদয়ের দ্বারা অনুভব করিব তদমুতং । তাহাকে সকলের অপেক্ষা অধিক বলিয়া জানিব, এবং সকলের অপেক্ষা অধিক বলিয়া প্রীতি করিব । জ্ঞান ও প্রেম সমেত আত্মাকে ত্রহ্মে সমর্পণ করার সাধনাই ব্রাহ্মধর্শ্বের সাধনা–তম্ভাবগতেন চেতসা এই সাধনা করিতে হইবে ; ইহা নীরস তত্ত্বজ্ঞান নহে, ইহা ভক্তিপ্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্ম । উপনিষদের ঋষি যে জীবাত্মামাত্রেরই নিকট পরমাত্মাকে সৰ্ব্বাপেক্ষা প্ৰতিজনক বলিতেছেন তাঁহার অর্থ কি ? যদি তাহাই হইবে তবে আমরা তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া ভ্ৰাম্যমাণ হই কেন ? একটি দৃষ্টাস্ত দ্বারা ইহার অর্থ বুঝাইতে ইচ্ছা করি । , কোন রসজ্ঞ ব্যক্তি যখন বলেন কাব্যরসাবতারণায় বাল্মীকি শ্রেষ্ঠ কবি—তখন একথা বুঝিলে চলিবে না যে কেবল তাহারই নিকট বাল্মীকির কাব্যরস সৰ্ব্বাপেক্ষ উপাদেয়। তিনি বলেন সকল পাঠকের পক্ষেই এই কাব্যরস সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ—ইহাই মনুষ্য-প্রকৃতি । কিন্তু কোন অশিক্ষিত গ্রাম্য জানপদ বাল্মীকির কাব্য অপেক্ষ যদি স্থানীয় কোন পাচালি গানে অধিক সুখ অনুভব করে তবে তাহার কারণ তাহার অজ্ঞতামাত্র। সে লোক অশিক্ষাবশতঃ বাল্মীকির কাব্য যে কি তাহ জানে না, এবং সেই কাব্যের রস যেখানে, অনভিজ্ঞতাবশতঃ সেখানে সে প্রবেশ লাভ করিতে পারে ন!—কিন্তু তাহার অশিক্ষাবাধা দূর করিয়া দিবামাত্র যখনি সে বাল্মীকির কাব্যের যথার্থ পরিচয় পাইবে তখনি সে স্বভাবতই মানবপ্রকৃতির নিজগুণেই গ্রাম্য পাচালি অপেক্ষা বাল্মীকির কাব্যকে রমণীয় বলিয়া জ্ঞান করিবে । তেমনি যে ঋষি ব্রহ্মের অমৃতরস আস্বাদন করিয়াছেন, যিনি তাহাকে পৃথিবীর অন্য সকল হইতেই প্রিয় বলিয়া জানিয়াছেন, তিনি ইহা সহজেই বুঝিয়াছেন যে ব্রহ্ম স্বভাবতই আত্মার পক্ষে সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রতিদায়ক— ব্রহ্মের প্রকৃত পরিচয় পাইবামাত্র আত্মা স্বভাবতই তাহাকে পুত্র, বিত্ত ও অন্ত সকল হইতেই প্রিয়তম বলিয়া বরণ করে। ব্রহ্মের সহিত এই পরিচয় যে কেবল আত্মার আনন্দ সাধনের জন্য তাহা নহে, সংসারযাত্রার পক্ষেও তাহা না হইলে নয়। ব্রহ্মকে যে ব্যক্তি বৃহৎ বলিয়া না জানিয়া সংসারকেই বৃহৎ বলিয়া জানে সংসারযাত্রা সে সহজে নিৰ্ব্বাহ করিতে পারে না,— সংসার তাহাকে রাক্ষসের ন্যায় গ্রাস করিয়া নিজের জঠরানলে দগ্ধ করিতে থাকে ! এই জন্য ঈশোপনিষদে লিখিত হইয়াছে— ঈশা বাস্তমিদং সৰ্ব্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ— ঈশ্বরের দ্বারা এই জগতের সমস্ত যাহা কিছু আচ্ছন্ন জানিবে এবং— তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্তস্বিন্ধনং তাহার দ্বারা যাহা দত্ত, যাহা কিছু তিনি দিতেছেন তাহাই ভোগ করিবে পরের ধনে লোভ করিবে না । সংসারযাত্রার এই মন্ত্র । ঈশ্বরকে সৰ্ব্বত্র দর্শন করিবে, ঈশ্বরের দত্ত আনন্দ-উপকরণ উপভোগ করিবে, লোভের দ্বারা পরকে পীড়িত করিবে না । যে ব্যক্তি ঈশ্বরের দ্বারা সমস্ত সংসারকে আচ্ছন্ন দেখে সংসার তাহার নিকট একমাত্র ঔপনিষদ ব্রহ্ম মুখ্যবস্তু নহে। সে যাহা ভোগ করে তাহা ঈশ্বরের দান বলিয়া ভোগ করে—সেই ভোগে সে ধৰ্ম্মের সীমা লঙ্ঘন করে না—নিজের ভোগমত্ততায় পরকে পীড়া দেয় না । সংসারকে যদি ঈশ্বরের দ্বারা আবৃত না দেখি, সংসারকেই যদি একমাত্র মুখ্য লক্ষ্য বলিয়া জানি তবে সংসারমুখের জন্য আমাদের লোভের অস্ত থাকে না, তবে প্রত্যেক তুচ্ছ বস্তুর জন্য হানাহানি কাড়াকড়ি পড়িয়া যায়, দুঃখ হলাহল মথিত হইয়া উঠে ।
Read Next
এই জন্য সংসারীকে একান্ত নিষ্ঠার সহিত সৰ্ব্বব্যাপী ব্রহ্মকে অবলম্বন করিয়া থাকিতে হইবে—কারণ সংসারকে ব্রহ্মের দ্বারা বেষ্টিত জানিলে এবং সংসারের সমস্ত ভোগ ব্রহ্মের দান বলিয়া জানিলে তবেই কল্যাণের সহিত সংসারযাত্রা নিৰ্ব্বাহ সম্ভব হয়। পরের শ্লোকে বলিতেছেন :– কুৰ্ব্বন্নেবেহ কৰ্ম্মাণি জিজীবিষেচ্ছতং সমাঃ এবং ত্বয়ি নান্যথেতোহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে । কৰ্ম্ম করিয়া শত বৎসর ইহলোকে জীবিত থাকিতে ইচ্ছা করিবে, হে নর, তোমার পক্ষে ইহার আর অন্যথা নাই, কৰ্ম্মে লিপ্ত হইবে না এমন পথ নাই । কৰ্ম্ম করিতেই হইবে এবং জীবনের প্রতি উদাসীন হইবে ন!—কিন্তু ঈশ্বর সর্বত্র আচ্ছন্ন করিয়া আছেন ইহাই স্মরণ করিয়া কৰ্ম্মের দ্বারা জীবনের শতবর্ষ যাপন করিবে । ঈশ্বর সর্বত্র আছেন অনুভব করিয়া ভোগ করিতে হইবে এবং ঈশ্বর সর্বত্র আছেন অতুভব করিয়া কৰ্ম্ম করিতে হইবে । — সংসারের সমস্ত কৰ্ত্তব্য পরিত্যাগ করিয়া কেবল ব্রহ্মে নিরত থাকা তাহাও ঈশোপনিষদের উপদেশ নহে— অন্ধং তম: প্রবিশন্তি যে অবিদ্যামুপাসতে । । ততো ভূয় ইব তে তমে য উ বিদ্যায়াং রতাঃ । যাহারা কেবলমাত্র অবিদ্যা অর্থাৎ সংসারকৰ্ম্মেরই উপাসনা করে তাহারা অন্ধতমসের মধ্যে প্রবেশ করে—তদপেক্ষ ভূয় অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করে যাহারা কেবলমাত্র ব্রহ্মবিদ্যায় নিরত । ঈশ্বর আমাদিগকে সংসারের কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্মে স্থাপিত করিয়াছেন। সেই কৰ্ম্ম যদি আমরা ঈশ্বরের কৰ্ম্ম বলিয়া না জানি, তবে পরমার্থের উপরে স্বার্থ বলবান হইয়া উঠে এবং আমরা অন্ধকারে পতিত হই । অতএব কৰ্ম্মকেই চরম লক্ষ্য করিয়া কৰ্ম্মের উপাসনা করিবে না, তাহাকে ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া পালন করিবে । কিন্তু বরঞ্চ মুগ্ধভাবে সংসারের কৰ্ম্ম নিৰ্ব্বাহও ভাল তথাপি সংসারকে উপেক্ষা করিয়া সমস্ত কৰ্ম্ম পরিহারপূর্বক কেবল মাত্র আত্মার আনন্দ সাধনের জন্য ব্রহ্মসম্ভোগের চেষ্টা শ্রেয়স্ক নহে। তাহা আধ্যাত্মিক বিলাসিত, তাহা ঈশ্বরের সেবা নহে। কৰ্ম্ম সাধনাই একমাত্র সাধনা । সংসারের উপযোগিতা সংসারের তাৎপৰ্য্যই তাই। মঙ্গলকৰ্ম্ম সাধনেই আমাদের স্বার্থ প্রবৃত্তি সকল ক্ষয় হইয়া আমাদের লোভ মোহ আমাদের হৃদগত বন্ধন সকলের মোচন হইয়া থাকে—আমাদের যে রিপু সকল মৃত্যুর মধ্যে আমাদিগকে জড়িত করিয়া রাখে সেই মৃত্যুপাশ অবিশ্রাম মঙ্গল কর্মের সংঘর্বেই ছিন্ন হইয়া যায়। কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্মের সাধনাই স্বাৰ্থপাশ হইতে মুক্তির সাধনা,–এবং ত্বয়ি নান্তখেতোহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে—ইহার আর অন্যথা নাই—কৰ্ম্মে লিপ্ত হইবে না এমন পথ নাই । বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীত্ব বিস্তয়াস্তমশ্ন তে। বিদ্যা এবং অবিদ্যা উভয়কে যিনি একত্র করিয়া জানেন তিনি অবিদ্যা অর্থাৎ কৰ্ম্ম দ্বারা মৃত্যু হইতে উত্তীর্ণ হইয়া ব্ৰহ্মলাভের দ্বারা অমৃত প্রাপ্ত হন। ইহাই সংসারধর্মের মূলমন্ত্ৰ—কৰ্ম্ম এবং ব্রহ্ম, জীবনে উভয়ের সামঞ্জস্য সাধন । কৰ্ম্মের দ্বারা আমরা ক্ৰক্ষের অভ্ৰভেদী মন্দির নিৰ্ম্মাণ করিতে থাকিব, ব্ৰহ্ম সেই মন্দির পরিপূর্ণ করিয়া বিরাজ করিতে থাকিবেন । নহিলে কিসের জন্য আমরা ইন্দ্রিয়গ্রাম পাইয়াছি, কেন এই পেশী, এই স্বায়ু, এই বাহুবল, এই বুদ্ধিবৃত্তি, কেন এই স্নেহপ্রেম দয়া, কেন এই বিচিত্র সংসার ? ইহার কি কোন অর্থ নাই ? ইহা কি সমস্তই অনর্থের হেতু ? ব্রহ্ম হইতে সংসারকে বিচ্ছিন্ন করিয়া জানিলেই তাহা অনর্থের নিদান হইয়া উঠে এবং সংসার হইতে ব্রহ্মকে দূরে রাখিয়া তাহাকে একাকী সম্ভোগ করিতে চেষ্টা করিলেই আমরা আধ্যাত্মিক স্বার্থপরতায় নিমগ্ন হইয়া জীবনের বিচিত্র সার্থকতা । পিতা আমাদিগকে বিদ্যালয়ে পাঠাইয়াছেন, সেখানকার নিয়ম এবং কৰ্ত্তব্য সৰ্ব্বথা স্থখজনক নহে। সেই দুঃখের হাত হইতে নিস্কৃতি পাইবার জন্য বালক পিতৃ-গৃহে পালাইয়া আনন্দলাভ করিতে চায় । সে বোঝে না বিদ্যালয়ে তাহার কি প্রয়োজন— সেখান হইতে পলায়নকেই সে মুক্তি বলিয়া জ্ঞান করে, কারণ পলায়নে আনন্দ আছে। মনোযোগের সহিত বিস্তা সম্পন্ন করিয়া বিদ্যালয় হইতে মুক্তিলাভের যে আনন্দ তাহ সে জানে না। কিন্তু মুছাত্র প্রথমে পিতার স্নেহ সৰ্ব্বদা স্মরণ করিয়া বিস্তাশিক্ষার দুঃখকে গণ্য করে না, পরে বিদ্যাশিক্ষায় অগ্রসর হইবার আনন্দে সে তৃপ্তি হয়— অবশেষে কৃতকাৰ্য্য হইয় মুক্তিলাভের আনন্দে সে ধন্ত হইয়া থাকে ।