“জগদগুরু” উপাধি শুধুমাত্র শিবের জন্য: এক সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ
জগদগুরু শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ
“জগদগুরু” শব্দটি দুটি অংশে বিভক্ত—”জগৎ” এবং “গুরু”। “জগৎ” শব্দের অর্থ বিশ্ব বা সমগ্র সৃষ্টিজগৎ, এবং “গুরু” শব্দের অর্থ গুরুত্ত্ব বহনকারী, জ্ঞানপ্রদানকারী বা পথপ্রদর্শক। অর্থাৎ, যিনি সমগ্র জগৎকে ধারণ করেন, রক্ষা করেন এবং পথনির্দেশ করেন, তিনিই প্রকৃত জগদগুরু।
এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, কেবলমাত্র শিবই জগদগুরু হতে পারেন। কারণ, তিনি পরমাত্মা, তিনিই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধারক ও সংহারক, এবং তিনিই জ্ঞানের একমাত্র উৎস।
শিব: বেদের প্রথম ব্যাখ্যাতা ও জ্ঞানের উৎস
বেদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি “অপরুষেয়”—অর্থাৎ, এটি কোনো মানব রচিত নয়। তবে এই চিরন্তন জ্ঞানের অর্থ বোঝা এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, শিবই হলেন বেদের প্রথম ব্যাখ্যাতা।
১. মহেশ্বরসূত্র ও শিবের ভাষাতাত্ত্বিক অবদান
সংস্কৃত (sanskrit) ভাষার ব্যাকরণ এবং ধ্বনিতত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো মহেশ্বরসূত্র। কথিত আছে, মহর্ষি পাণিনি শিবের তপস্যা করার পর শিব তাঁর ডমরু থেকে চতুর্দশ ধ্বনি প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীকালে সংস্কৃত ব্যাকরণের মূলসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই বলা হয়, ভাষা, ধ্বনি এবং জ্ঞানের মূল উৎস শিব।
২. শিবের ধ্যানযোগে বেদের উপলব্ধি
ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ—এই চারটি বেদকে উপলব্ধি করার জন্য ধ্যান ও আত্মজ্ঞান প্রয়োজন। এই ধ্যান ও জ্ঞানের সর্বোচ্চ রূপ হলো যোগ, এবং যোগশাস্ত্রের মূল প্রবক্তা হলেন শিব। যোগসূত্রে পতঞ্জলি শিবকে “আদিগুরু” হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কারণ তিনিই প্রথম ধ্যানের মাধ্যমে বেদের সত্য উপলব্ধি করেন এবং ঋষিদের মাধ্যমে তা প্রচার করেন।
জগদগুরু উপাধি কেন শিব ব্যতীত অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য নয়?
১. বিষ্ণু ও ব্রহ্মার ভূমিকা
ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা এবং বিষ্ণু পালনকর্তা হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তাদের কেউই বেদ বা জ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা নন। শিবই হলেন জ্ঞানের প্রকৃত উৎস। পৌরাণিক কাহিনীতে একাধিকবার দেখা যায় যে, ব্রহ্মা ও বিষ্ণু শিবের কাছে জ্ঞান অর্জনের জন্য ধ্যান করেছেন বা তপস্যা করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, শিবপুরাণ ও স্কন্দপুরাণে উল্লেখ আছে যে, একবার ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে তর্ক হয় যে, কে শ্রেষ্ঠ? তখন মহাশূন্যে একটি অগণিত আকাশগঙ্গার মতো এক বিশাল জ্যোতির্লিঙ্গ আবির্ভূত হয়। উভয়েই সেই লিঙ্গের শুরু ও শেষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। পরে শিব স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে জানান যে, তিনিই পরম সত্য এবং তিনিই জগদগুরু।
২. কৃষ্ণ বা অন্য অবতারদের প্রসঙ্গ
পুরাণ ও মহাভারতে কৃষ্ণকে কখনো কখনো “জগদগুরু” বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে কৃষ্ণ ব্যক্তিরূপে নন, বরং তাঁর মধ্যে নিহিত শিবতত্ত্বই প্রকৃত জগদগুরু। কৃষ্ণ নিজেই গীতায় বলেছেন:
“শিবোহম! শিবোহম!”—অর্থাৎ, “আমি শিব।”
গীতার উপদেশে কৃষ্ণ যে জ্ঞান প্রদান করেছেন, তা আসলে শিবের শাশ্বত জ্ঞান। তাই কৃষ্ণ যদি জগদগুরু হন, তবে সেটিও শিবতত্ত্বের মাধ্যমেই।
৩. শঙ্করাচার্যের দৃষ্টিভঙ্গি
আদি শঙ্করাচার্য কখনো নিজেকে “জগদগুরু” বলেননি। বরং তিনি “পরমগুরু” হিসেবে শিবের বন্দনা করেছেন এবং তাঁর গুরু গৌড়পাদাচার্য ও গোবিন্দপাদাচার্যও এই উপাধি গ্রহণ করেননি। কারণ তারা জানতেন, এই উপাধি কেবলমাত্র শিবের জন্যই সংরক্ষিত।
কেন শিবই প্রকৃত জগদগুরু?
সমগ্র বিশ্ব, জ্ঞান, ভাষা, ব্যাকরণ, ধ্যান, যোগ এবং বেদের প্রকৃত উৎস একমাত্র শিব। যদি কোনো শাস্ত্রে কৃষ্ণ বা অন্য দেবতাদের “জগদগুরু” বলা হয়, তবে তা আসলে শিবের মধ্যস্থতা বা শিবতত্ত্বের প্রতিফলন মাত্র। শিব ছাড়া আর কেউ এই উপাধির প্রকৃত অধিকারী হতে পারেন না।
তাই “জগদগুরু” উপাধি একমাত্র শিবের জন্যই সংরক্ষিত, অন্য কারো জন্য নয়।
জগদগুরু উপাধি শুধুমাত্র শিবের জন্য, অন্য কারও জন্য নয়
“জগদগুরু” উপাধিটি একমাত্র মহাদেব শিবকে নির্দেশ করে, অন্য কাউকে নয়, এমনকি বিষ্ণু বা ব্রহ্মাকেও নয়। পুরাণ বা অ-ঋগ্বৈদিক সাহিত্যে যদি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, কৃষ্ণ বা শক্তির প্রসঙ্গে কোথাও কৃষ্ণকে জগদগুরু বলা হয়ে থাকে, তবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ এই যে, শিবই প্রকৃত অর্থে জগদগুরু। কারণ শিবই হলেন পরমাত্মা, এবং পরমাত্মাই প্রকৃত জগদগুরু।
পরমাত্মার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই, কিন্তু যদি আমরা তাঁকে কোনো বিশেষ নাম দ্বারা অভিহিত করতে চাই, তাহলে “শিব” শব্দটিই সর্বোত্তম ও যথাযথ। শঙ্করাচার্য কখনো নিজেকে “জগদগুরু” বলে উল্লেখ করেননি, এমনকি তাঁর গুরু গোবিন্দপাদাচার্য বা গৌড়পাদাচার্যও এই উপাধি গ্রহণ করেননি। এই উপাধিটি চিরকাল শিবের সঙ্গেই সংযুক্ত ছিল এবং থাকবে।
শিব: সকল শিক্ষার মূল, জগদগুরু ও জ্ঞানের উৎস
সকল শিক্ষার প্রকৃত উৎস শিব। শাস্ত্র, দর্শন, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, সংগীত কিংবা ভাষাবিজ্ঞান—যে কোনো জ্ঞানতত্ত্বের মূল ভিত্তি শিবের মধ্যেই নিহিত। বৈদিক ও তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারে, শিবই সর্বপ্রথম পুরুষীয় (পুরুষার্থসংযুক্ত) বেদের ব্যাখ্যাতা, যিনি শাশ্বত বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে মানবজাতির কল্যাণার্থে তা প্রকাশ করেছেন।
শিব: প্রথম ব্যাখ্যাতা ও বেদ-বাণীর উৎস
বেদকে “অপরুষেয়” বলা হয়, অর্থাৎ এটি কোনো মানব রচিত নয়, এটি চিরন্তন এবং স্বয়ম্ভূ। তবে বেদকে বোঝার জন্য যে ভাষা, যে ব্যাখ্যা প্রয়োজন, তার মূল উৎস শিব। বলা হয়, বেদ ধ্বনিরূপে চিরকাল মহাশূন্যে বিরাজ করে, কিন্তু তার যথাযথ অনুধাবন এবং ভাষাগত বিন্যাস সম্ভবপর হয়েছে শিবের কৃপায়। শিবই সেই আদিগুরু যিনি ধ্বনির সঙ্গে অর্থের যোগ স্থাপন করেছেন, যার ফলে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষের জন্য জ্ঞান লাভ করা সম্ভবপর হয়েছে।
শিব: সকল ধ্বনির উৎস
সমস্ত ধ্বনি তথা ভাষার মূল উৎসও শিব। শাস্ত্র মতে, শিবের তাণ্ডব নৃত্যের মধ্য দিয়েই ধ্বনির সৃষ্টি হয়, যার থেকে সংস্কৃত ভাষা, ব্যাকরণ এবং নানাবিধ উচ্চারণতত্ত্বের উৎপত্তি। একারণে শিবকে “প্রণব” বলা হয়, কারণ তিনি নিজেই “ওংকার” বা মহাধ্বনি। পতঞ্জলির মতে, “ওং” ধ্বনি হলো পরমাত্মার প্রতীক, যা মূলত শিব থেকেই উদ্ভূত।
শিব: ব্যাকরণ ও নিরুক্তের প্রবর্তক
সংস্কৃত ব্যাকরণের অন্যতম ভিত্তি হলো মহর্ষি পাণিনির “অষ্টাধ্যায়ী”, কিন্তু প্রাচীন শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, পাণিনি স্বয়ং শিবের অনুগ্রহেই এই ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, একবার পাণিনি শিবের ধ্যানমগ্ন হলে, শিব তাঁর ডমরু বাজান, এবং সেই ডমরুর চতুর্দশ ধ্বনির (মাহেশ্বর সূত্র) মধ্য থেকেই সংস্কৃত ব্যাকরণের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই কারণেই বলা হয়, শিবই ভাষার প্রথম ব্যাকরণবিদ এবং নিরুক্ততত্ত্বের (শব্দের মূল ব্যাখ্যা) উৎস।
শিব ও বেদের হৃদয়গত উপলব্ধি
বেদ কোনো লিখিত গ্রন্থ নয়; এটি শাশ্বত এবং চিরন্তন। এর উপলব্ধি কেবল বাহ্যিক উচ্চারণ বা পঠন-পাঠনের মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং এটি হৃদয়ে প্রতিস্থাপিত হয় আত্মজ্ঞান ও ধ্যানের দ্বারা। সেই ধ্যানের শক্তিও শিবই প্রদান করেন। ঋষিরা তাদের অন্তরদৃষ্টি দিয়ে বেদ উপলব্ধি করেছিলেন, এবং সেই উপলব্ধির জ্যোতিষ্ক ছিলেন শিব। বেদজ্ঞ ঋষিরা ধ্যানযোগের মাধ্যমে শিবের কৃপায় বেদকে আত্মস্থ করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ভাষারূপে প্রকাশ পায়।
শব্দ ও অর্থের সংযোগ: শিবের অবদান
ভাষা শুধু ধ্বনির সমষ্টি নয়, এটি অর্থবাহী হতে হয়। প্রতিটি শব্দের একটি নির্দিষ্ট অর্থ থাকতে হয়, এবং সেই অর্থ যথাযথভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় শিবের কৃপায়। শাস্ত্র মতে, মহেশ্বর তাঁর মহাজ্ঞান দ্বারা প্রতিটি শব্দের সঙ্গে তার যথার্থ অর্থ সংযুক্ত করেছেন। তাই আজও ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, তার সঠিক অর্থান্বেষণ এবং উপযুক্ত প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিবকে স্মরণ করা হয়।
শিব: প্রকৃত জগদগুরু
“জগৎ” শব্দের অর্থ হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং “গুরু” শব্দের অর্থ হলো ভার বা গুরুত্ত্ব বহনকারী। সেই মহাপুরুষই প্রকৃত জগদগুরু যিনি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গুরুত্ত্ব বহন করতে সক্ষম। শিবের শক্তিই সমগ্র বিশ্বকে ধারণ করে, পরিচালনা করে এবং রক্ষা করে। তাই তিনিই প্রকৃত অর্থে জগদগুরু।
শিব কেবল একজন দেবতা (deity) নন, তিনি হলেন জ্ঞানের, ভাষার, সংগীতের, ধ্যানের, এবং সমগ্র জগৎব্যাপী চেতনার উৎস। তিনি বেদের প্রথম ব্যাখ্যাতা, সকল ধ্বনির মূল, এবং ভাষা ও ব্যাকরণের প্রকৃত উদ্ভাবক। শিবের কারণেই শব্দ তার যথাযথ অর্থ ধারণ করে এবং ভাষা জ্ঞানের বাহক হয়। তাই জগদগুরু বলতে যদি কাউকে বোঝানো হয়, তবে তা একমাত্র শিবকেই বোঝানো উচিত, কারণ তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি সত্যিকার অর্থে সমগ্র বিশ্বকে ধারণ করতে সক্ষম।
শিব: ঈশোপনিষদে উল্লিখিত ঈশ্বর ও জ্ঞান-স্বরূপ জগদগুরু
শিব: ঈশোপনিষদে উল্লিখিত ঈশ্বর
ঈশোপনিষদের প্রথম মন্ত্রেই বলা হয়েছে—
“ঈশা বাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগত্।”
অর্থাৎ, সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই ঈশ্বর দ্বারা আচ্ছাদিত। এই ঈশ্বর কে? বেদান্তের মতে, শিবই হলেন সেই ঈশ্বর, যিনি সমগ্র বিশ্বে বিরাজমান কিন্তু নিজে অদৃশ্য। তিনি “নির্গুণ ব্রহ্ম” এবং “অপরিচ্ছন্ন চৈতন্য” হিসেবে চিহ্নিত হন।
ঋগ্বেদ (১০.১২৫.১) এ বলা হয়েছে:
“অহং রুদ্রায় ধনুরাতনোমি”
অর্থাৎ, “আমি রুদ্রের (শিবের) ধনুকে প্রসারিত করি,” যা নির্দেশ করে যে শিবই সেই পরম শক্তি যিনি বিশ্বকে ধারণ করেন ও পরিচালনা করেন।
শিব: ব্রহ্মের অদৃশ্য রূপ এবং বিষ্ণু তার দৃশ্যমান রূপ
ব্রহ্ম উপনিষদীয় দর্শনে দ্বৈত ও অদ্বৈত উভয় রূপে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বেদের ব্যাখ্যান অনুসারে, ব্রহ্মের দুই দিক রয়েছে—
- অদৃশ্য বা নিরাকার দিক: যা চিন্তা ও উপলব্ধির অতীত, যা শুদ্ধ চৈতন্য। এটি শিবতত্ত্ব দ্বারা প্রকাশিত।
- দৃশ্যমান বা সগুণ দিক: যা বিশ্বে প্রকাশিত শক্তি বা কার্যরূপ। এটি বিষ্ণুতত্ত্ব দ্বারা প্রকাশিত।
ঋগ্বেদের (Rigveda) একাধিক স্থানে বিষ্ণুকে “ব্যাপ্তি” (সর্বত্র প্রবাহিত) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু তার প্রকৃত উৎস কোথায়? তার উৎস সেই পরম ব্রহ্ম, যা শিবরূপে অবস্থান করে। যেমন ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪৬ এ বলা হয়েছে:
“একং সত্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি অগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহু:”
অর্থাৎ, এক ব্রহ্মকে জ্ঞানীরা বিভিন্ন নামে ডাকে—কখনো অগ্নি, কখনো যম, কখনো মাতরিশ্বান (বায়ু), কখনো বিষ্ণু, কখনো শিব।
অর্থাৎ, শিব ও বিষ্ণু আলাদা কিছু নয়; শিবই ব্রহ্মের মূল আত্মা, আর বিষ্ণু হলেন তার প্রকাশিত রূপ।
গায়ত্রী মন্ত্র ও শিব-সাবিতার সম্পর্ক
গায়ত্রী (Gayatri) মন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্রহ্মজ্ঞানকে উপলব্ধি করা।
“ওং ভুর্ভুবঃ স্বঃ।
তৎ সবিতুর্বরেণ্যং।
ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো যো নঃ প্রচোदयাত্॥”
এখানে “সবিতু” শব্দের অর্থ “সাবিতা”, যা সূর্যালোক ও জ্ঞানের প্রতীক। কিন্তু সাবিতা (দৃশ্যমান আলো) একমাত্র পরমতত্ত্বেরই একটি প্রকাশ মাত্র। মূলত, শিবই সেই চেতনা, যা আমাদের চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে সেই জ্যোতির সন্ধান দেয়।
বেদে বলা হয়েছে:
“ন তত্র সূর্য ভাতি ন চন্দ্র তারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোয়মগ্নিঃ।”
—কঠোপনিষদ (২.২.১৫)
অর্থাৎ, যেখানে পরম ব্রহ্মের প্রকাশ ঘটে, সেখানে সূর্য, চন্দ্র বা অগ্নির কোনো প্রয়োজন নেই। এই পরম ব্রহ্মই শিব।
মানস ও চিত্তের বিলোপ: বেদের মূল লক্ষ্য
মানব চিত্ত (মনের তরঙ্গ) ও মনস (ভাবনার ধারা) আমাদের সাধারণ চেতনার সীমাবদ্ধতা। বেদের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা।
যোগসূত্র (১.২) এ বলা হয়েছে—
“যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ।”
অর্থাৎ, চিত্তের সকল প্রবাহ বন্ধ করাই যোগ। যখন চিত্ত থেমে যায়, তখন শূন্যতার মধ্যে একমাত্র শিবের উপস্থিতি অনুভূত হয়।
শিবলিঙ্গ: আলো ও জ্ঞানতত্ত্ব
আমরা সাধারণত শিবলিঙ্গকে একটি পাথরের প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখি, কিন্তু এর প্রকৃত রূপ এক গভীর জ্ঞানতত্ত্ব বহন করে। শিবলিঙ্গের প্রকৃত অর্থ হলো “জ্যোতির্লিঙ্গ”, অর্থাৎ, এটি এক ধরনের আলোক প্রতীক।
বেদের ভাষায়:
“ন তত্র সূর্যো ভাতি, ন চন্দ্র তারকং।”
অর্থাৎ, ব্রহ্মরূপী শিব নিজেই একমাত্র আলোকস্বরূপ। মন্দিরে রাখা শিবলিঙ্গ আসলে একটি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের প্রতীক, যা “জ্ঞানপ্রদীপ” হিসেবে আমাদের চেতনার অন্ধকার দূর করে।
এই আলোই “জগদগুরু”। এটি সর্বত্র প্রবেশ করে, তাই এটিই প্রকৃত অর্থে “বিষ্ণু”। কারণ, বিষ্ণু শব্দের অর্থ হলো—”যা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত”।
মায়া, বিজ্ঞান ও যোগসূত্রের নির্বাণ তত্ত্ব
শক্তি বা মহামায়া ব্রহ্মের কার্যরূপ, যা বিশ্বকে পরিচালনা করে। বিষ্ণুমায়া বলতে বোঝানো হয় সেই জ্ঞান, যা পরিমাপযোগ্য।
“মায়া” শব্দের অর্থই হলো “পরিমাপ করা” (মা=পরিমাপ করা, যা=যা হয়)। যা পরিমাপযোগ্য, তাই বিজ্ঞান। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে:
“মায়া তু প্রকৃতিং বিদ্যান্মায়িনং তু মহেশ্বরম্।”
—শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৪.১০)
অর্থাৎ, প্রকৃতিই মায়া, এবং এই মায়ার অধীশ্বর হলেন মহেশ্বর (শিব)।
যোগসূত্রে বলা হয়েছে:
“তদা দ্রষ্টুঃ স্বরূপে অবস্থানম্।”
অর্থাৎ, যখন মানসিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই প্রকৃত আত্মস্বরূপের উপলব্ধি হয়, তখনই শিবতত্ত্ব উপলব্ধ হয়।
যখন প্রদীপের তেল নিঃশেষিত হয়, তখন তার আলো নিভে যায়। এটিই “নির্বাণ”, যোগদর্শনে যার চূড়ান্ত মুক্তি বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১. শিবই হলেন বেদে উল্লিখিত ঈশ্বর, যিনি অদৃশ্য পরমাত্মা।
2. বিষ্ণু সেই দৃশ্যমান ব্রহ্ম, যা জগতে প্রকাশিত হয়।
3. গায়ত্রী মন্ত্রের মাধ্যমে আমরা শিবের আলোর দিকে ধাবিত হই।
4. মানস ও চিত্ত বিলোপের মাধ্যমে শিবতত্ত্ব উপলব্ধ হয়।
5. শিবলিঙ্গ কোনো শিলা নয়, বরং এক জ্ঞানদীপ, যা প্রকৃত জগদগুরু।
6. শক্তি বা মায়া বিজ্ঞানকে নির্দেশ করে, এবং মায়ার বিলোপের মাধ্যমেই শিবতত্ত্ব উপলব্ধ হয়।
7. যোগসূত্র অনুযায়ী, যোগের চূড়ান্ত অবস্থা শিবের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, যা নির্বাণ নামে পরিচিত।
এই সমস্ত তত্ত্বই বেদ এবং উপনিষদ থেকে উদ্ভূত, যা শিবকেই প্রকৃত জগদগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
“জগদগুরু” উপাধি কোনো মানুষকে দেওয়া যায় না: বেদ অনুযায়ী বিশ্লেষণ
“জগদগুরু” শব্দের প্রকৃত অর্থ ও অপব্যবহার
“জগদগুরু” শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো “সেই যিনি সমগ্র বিশ্বকে ধারণ করতে সক্ষম”। বেদ ও উপনিষদের আলোকে এই উপাধি একমাত্র শিবের জন্য প্রযোজ্য। কারণ, শিবই হলেন পরমাত্মা, যিনি সমস্ত সৃষ্টির ভিত্তি এবং যাঁর মধ্যে সমস্ত কিছু বিলীন হয়।
কিন্তু বর্তমানে “জগদগুরু” শব্দের ভয়ানক অপব্যবহার চলছে। কুম্ভমেলার মতো বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে হাজার হাজার ভণ্ডগুরু নিজেদের “জগদগুরু” বলে দাবি করে। তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, জমিদারদের মতো থাকে, পর্তুগিজ বণিকদের মতো হাঁটে, এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য “গুরুগীতা” নামক একটি অশাস্ত্রীয় বই থেকে ভুল ব্যাখ্যা দেয়।
“গুরুগীতা” বইয়ের প্রতারণা
এই তথাকথিত “গুরুগীতা” বলে যে, “একজন সাধারণ মানুষ, যে টয়লেটে যায়, সে-ই ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর।” এই ধারণাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বেদের পরিপন্থী।
বেদ বলে:
“ঈশা বাস্যমিদং সর্বং”
— (ঈশোপনিষদ ১.১)
অর্থাৎ, ঈশ্বর সমস্ত কিছুর মধ্যেই বিরাজমান, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ঈশ্বরই প্রত্যেক মানুষ। মানুষ তার সীমাবদ্ধ মনের কারণে ঈশ্বর হতে পারে না।
একজন মানুষ যদি খাবার খায়, ঘুমায়, প্রস্রাব করে এবং শরীরের অন্যান্য প্রাকৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে সে কীভাবে “জগদগুরু” হতে পারে? জগদগুরু তো সেই, যার মধ্যে সমগ্র বিশ্ব টিকে আছে।
ভণ্ড গুরুদের প্রতারণা ও তাদের আসল চেহারা
এই তথাকথিত “জগদগুরু”রা প্রকৃতপক্ষে ধোঁকাবাজ। তারা বলবে:
- “আমি অবতার, আমি ঈশ্বরের অংশ।”
- “আমি ঈশ্বরকে দেখেছি, আমি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলেছি।”
- “ঈশ্বর আমার হাত থেকে খাবার গ্রহণ করেছেন।”
এইসব বক্তব্য একেবারেই মিথ্যা এবং প্রতারণামূলক। বেদ এবং উপনিষদে কোথাও বলা নেই যে, ঈশ্বর মানুষের মতো আচরণ করবেন এবং কোনো গুরুর হাত থেকে খাবার গ্রহণ করবেন।
ঋগ্বেদ বলে:
“ন তস্য প্রতিমা অস্তি”
— (ঋগ্বেদ ১০.১২৯.৩)
অর্থাৎ, ঈশ্বরের কোনো প্রতিমূর্তি বা রূপ নেই, তিনি কারও দ্বারা ধরা পড়েন না।
অভিনব ব্যবসায়ী গুরুরা কিভাবে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে?
এই তথাকথিত গুরুদের প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- তারা বিশাল আশ্রম বানায় এবং রাজাদের মতো জীবনযাপন করে।
- তারা ব্যবসায়ীদের মতো ধর্মের নামে টাকা তোলে।
- তারা নিজেকে “ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর” হিসেবে উপস্থাপন করে।
- তারা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ভক্ত সংগ্রহ করে।
বেদের কোথাও লেখা নেই যে, একজন ভণ্ড গুরু, যে প্রস্রাব-পায়খানা করে, সে-ই ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর হতে পারে।
আসল অবধূত কেমন হন?
আসল অবধূত বা প্রকৃত সন্ন্যাসী কখনোই এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন না।
উপনিষদ বলে:
“অদ্বৈতদর্শনং জ্ঞানং”
— (শিবসংহিতা ৩.২৬)
অর্থাৎ, আসল জ্ঞান হলো অদ্বৈত দর্শন, যেখানে কোনো ব্যক্তি নিজেকে আলাদা সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করবে না।
প্রকৃত অবধূতদের কিছু বৈশিষ্ট্য:
- তারা কখনো কারও কাছে ভিক্ষা চায় না।
- তারা রাস্তার পাশে পড়ে থাকা শিবলিঙ্গের মতো থাকেন—কারও থেকে কিছু চাওয়ার নেই, কাউকে কিছু বলার নেই।
- কেউ যদি তাদের জল দেয়, তারা কিছু বলে না; কেউ যদি বিষ দেয়, তবুও তারা কিছু বলে না।
- তারা এমন কোনো কাজ করে না যা সরকার বা সমাজ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
- অবধূত ধৰ্ম প্রচার ও করেন না বা শিষ্য করেন না।
এই কারণেই আসল অবধূতদের চেনা খুবই কঠিন।
অবধূতের সন্ধান করা যাবে না, তিনি নিজেই আসবেন
একজন প্রকৃত অবধূত (Avadhut) কাউকে আশীর্বাদ দেন না, কাউকে জ্ঞানও দেন না। কারণ, প্রকৃত জ্ঞান নিজের মধ্যেই আবিষ্কৃত হয়।
“অবধূতকে কখনো খুঁজতে যেয়ো না।”
যখন তোমার কর্মফল যথেষ্ট পরিমাণে পবিত্র হবে, তখন তিনি নিজেই তোমার সামনে আবির্ভূত হবেন।
এবং মনে রেখো—
অবধূতকে স্পর্শ করো না…..
“যদি তুমি ভুল করেও অবধূতকে স্পর্শ করো, তাহলে তিনি তোমার আত্মা নিয়ে নেবেন।”
অবধূত বিমর্ষ অন্যত্র ব্যাখ্যা করবো ।
भट्टाचार्य तन्मयकृत वज्रजालतन्त्रे योगानुशासने भास्वतीतन्त्रभाष्यं ।
Date:31st January 2025