Bengali Page

রাবণ বধের নিমিত্ত শ্রীরাম কর্ত্তৃক দেবীর অকালবোধন ও দুর্গোৎসব- কৃত্তিবাসী রামায়ণ

Premature invocation of Goddess and celebration of Durga by Lord Rama for killing Ravana

Krittivasi Ramayana

কৃত্তিবাসী রামায়ণ – লঙ্কাকাণ্ড[86-97]

 রাবণের স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া অম্বিকার অভয় দান

স্তবে তুষ্টা হয়ে মাতা দিলা দরশন।
বসিলেন রথে, কোলে করিয়া রাবণ।।
আশ্বাস করিয়া কন না কর রোদন।
ভয় নাই ভয় নাই রাজা দশানন।।
আসিয়াছি আমি আর কারে কর ডর।
আপনি যুঝিব যদি আসে শঙ্কর।।
অসিত-বরণী কালী কোলে দশানন।
রূপের ছটায় ঘন তিমির নাশন।।
অলকা ঝলকা উচ্চ কাদম্বিনী কেশ।
তাহে শ্যামরূপে নীল সৌদামিনী বেশ।।
কর পদ নখে শশী অলকা প্রকাশে।
বিম্বফল স্খলিত অধরে মন্দ হাসে।।
শোক গেল রাবণের দুঃখ বিনাশনে।
হইল আহ্লাদ চিত্ত দেবী দরশনে।।
নয়নে গলিত ধারা সবিনয়ে কয়।
দয়াময়ী বিনা মোরে সদয়া কে হয়।।
সাক্ষাতে করিলা স্তব রাজা লঙ্কেশ্বর।
রাম সনে সংগ্রামে চলিল অতঃপর।।
ছাড়ে ঘন হুহুঙ্কার গভীর গর্জ্জনে।
বাণ বরিষণ করে তর্জ্জন গর্জ্জনে।।
আগুসারি যুদ্ধে এল রাম রঘুপতি।
দেখিলেন রাবণের রথে হৈমবতী।।
বিস্ময় হইয়া রাম ফেলে ধনুর্ব্বাণ।
প্রণাম করিলা তাঁরে করি মাতৃজ্ঞান।।
বিভীষণে কন তবে ত্রিলোকের নাথ।
রাবণ বিনাশে মিতা ঘটিল ব্যাঘাত।।
কার সাধ্য বিনাশিতে পারে দশাননে।
রক্ষিছে রাবণে আজি হর-বরাঙ্গনে।।
ঐ দেখ রাবণের রথে বিভীষণ।
জলদ-বরণী-কোলে রাজা দশানন।।
দেখিয়া ধার্ম্মিক বিভীষণ সবিস্ময়।
প্রমাদ ঘটিল কি হইবে দয়াময়।।
বিষণ্ন হইয়া রাম বসিলা ভূতলে।
পরম বিমর্ষ হয়ে চিন্তিল সকলে।।
তারা যদি করিলেন এমন ব্যাঘাত।
তবে আর কে করিবে দশাস্যে নিপাত।।
উপায় নাহিক আর করিব কেমন।
দেখিয়া রামের চিন্তা চিন্তে দেবগণ।।
এ সময়ে হৈমবতী কি করিলা আর।
দেবারিষ্ট বিনাশে ব্যাঘাত চণ্ডিকার।।
বিধাতারে কহিলেন সহস্র-লোচন।
উপায় করহ বিধি যা হয় এখন।।
বিধি কন বিধি আছে চণ্ডী-আরাধনে।
হইবে রাবণ বধ অকাল-বোধনে।।
ইন্দ্র কন কর তাই বিলম্ব না সয়।
ইন্দ্রের আদেশে ব্রহ্মা করিবারে যায়।।
রাবণ বধের জন্য বিধাতা তখন।
আর শ্রীরামের অনুগ্রহের কারণ।।
এই দুই কর্ম্ম ব্রহ্মা করিতে সাধন।
অকালে শরতে কৈলা চণ্ডীর বোধন।।
দেবগণ সহিতে পূজিতে মহামায়।
এখানে চিন্তিত রাম কি হবে উপায়।।
আমা হৈতে নাহি হৈল রাবণ সংহার।
জনক-নন্দিনী সীতা না হৈল উদ্ধার।।
মিথ্যা পরিশ্রম কৈনু সঞ্চয় বানর।
মিথ্যা কষ্টে করিলাম বন্ধন সাগর।।

মিথ্যা করিলাম যত রাক্ষস সংহার।
লক্ষ্মণের শক্তিশেল ক্লেশমাত্র সার।।
অনুপায় সকলি হইল এইবার।
বিভীষণে কহেন কি হবে মিতা আর।।
নয়নেতে বহে জল শুখাইল মুখ।
তাহা দেখি বিভীষণের দুঃখে ফাটে বুক।।
বলে প্রভু আমার নাহিক সাধ্য আর।
আমা হৈতে হৈলে হৈত উপায় ইহার।।
এত শুনি কান্দেন আপনি রঘুরায়।
ধূলায় লোটায় ছিন্ন নীলোৎপল প্রায়।।
লক্ষ্মণ কান্দিছে আর বীর হনুমান।
সুগ্রীব অঙ্গদ নল নীল জাম্ববান।।
রোদন করিছে সবে ছাড়িছে সমর।
দেখিয়া রামের দুঃখ যতেক অমর।।
ইন্দ্ররাজ বিধাতারে সবিনয়ে কয়।
শ্রীরামের দুঃখ আর প্রাণে নাহি সয়।।


রাবণ বধের নিমিত্ত ব্রহ্মা কর্ত্তৃক দেবীর অকালবোধন ও ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ

ইন্দ্রের শুনিয়া বাণী, কন কমণ্ডলু-পাণি,
উপায় কেবল দেবীপূজা।
তুমি পূজি যে চরণ, জিনিলে অসুরগণ,
বোধিয়া শরতে দশভুজা।।
পূজা রাম কৈলে তাঁর, হবে রাবণ সংহার,
শুন সার সহস্রলোচন।
শুনি কহে সুরপতি, যাহ তুমি শীঘ্রগতি,
জানাও শ্রীরামে বিবরণ।।
প্রেমে পুলকিত চিত, পদ্মযোনি আনন্দিত,
শ্রীরাম নিকটে উপনীত।
বিনয় করিয়া কয়, শুন প্রভু দয়াময়,
রাবণ বধের যে বিহিত।।
ব্রহ্মার বচন শুনি, কন রাম গুণমণি,
কহ বিধি কি উপায় করি।
মিথ্যা শ্রম করিলাম, অনুপায়ে ঠেকিলাম,
রক্ষিল রাবণে মহেশ্বরী।।
বিধাতা কহেন প্রভু, এক কর্ম্ম কর বিভু,
তবে হবে রাবণ সংহার।
অকালে বোধন করি, পূজ দেবী মহেশ্বরী,
তরিবে হে এ দুঃখ-পাথার।।
শ্রীরাম কহেন তবে, কিরূপে পূজিতে হবে,
অনুক্রম কহ শুনি তার।
শ্রীরাম আপনি কয়, বসন্তে শুদ্ধ সময়,
শরৎ অকাল এ পূজার।।
বিধি আছে নিরূপণ, নিদ্রা ভাঙ্গিতে বোধন,
কৃষ্ণা নবমীর দিনে তাঁর।
সে দিন হয়েছে গত, প্রতিপদে আছে মত,
কল্পারম্ভে সুরথ রাজার।।
সে দিন নাহিক আর, পূজা হবে কি প্রকার,
শুক্লা ষষ্ঠী মিলিবে প্রভাতে।
কন্যারাশি মাস বটে, কিন্তু পূজা নাহি ঘটে,
অত্র যোগ সব হৈল যাতে।।
বিধাতা কহেন সার, শুন বিধি দিই তার,
কর – ষষ্ঠীকল্পেতে বোধন।
ব্যাঘাত না হবে তায়, বিধি খণ্ডি পুনরায়,
কল্পখণ্ডে সুরথ রাজন।।
এই উপদেশ কন, শুনি রাম সুখী হন,
বিধাতা গেলেন নিজ ধাম।
প্রভাত হইল নিশা, প্রকাশ পাইল দিশা,
স্নান দান করিলা শ্রীরাম।।
বনপুষ্প ফলমূলে, গিয়া সাগরের কূলে,
কল্প কৈলা বিধির বিচার।
পূজি দুর্গা রঘুপতি, করিলেন স্তুতি নতি,
বিরচিল চণ্ডীপূজা সার।।


শ্রীরামচন্দ্রের দুর্গোৎসব

চণ্ডীপাঠ করি রাম করিলা উৎসব।
গীত নাট্ট করে জয় দেয় কপি সব।।
প্রেমানন্দে নাচে আর দেবীগুণ গায়।
চণ্ডীর অর্চ্চনে দিবাকর অস্ত যায়।।
সায়াহ্ন-কালেতে রাম করিলা বোধন।
আমন্ত্রণ অভরায় বিল্বাদি-বাসন।।
আপনি গড়িয়া রাম মূরতি মৃন্ময়ী।
হইতে সংগ্রামে দুষ্ট রাবণ বিজয়ী।।
আচারেতে আরতি করিলা অধিবাস।
বান্ধিলা পত্রিকা নব বৃক্ষের বিলাস।।
এইরূপে উদ্যোগ করিলা দ্রব্য যত।
পদ্ধতি প্রমাণে আছে নিয়ম যেমত।।
অসাধ্য সুসাধ্য তাহে নাহি অনুমান।
ত্রিভুবন ভ্রমিয়া আনিল হনুমান।।
গত হৈল ষষ্ঠী-নিশা দিবা সুপ্রভাত।
উদয় হইল পূর্ব্বে দিবসের নাথ।।
স্নান করি আসি প্রভু পূজা আরম্ভিলা।
বেদ-বিধি মতে পূজা সমাপ্ত করিলা।।
শুদ্ধসত্ত্বভাবে পূজা সাত্ত্বিকী আখ্যান।
গীতনাট্ট চণ্ডীপাঠে দিবা অবসান।।
সপ্তমী হইল সাঙ্গ অষ্টমী আইল।
পুনর্ব্বার রামচন্দ্র অর্চ্চনা করিল।।
নিশাকালে সন্ধিপূজা কৈলা রঘুনাথ।
নৃত্যগীতে বিভাবরী হইল প্রভাত।।
নবমীতে পূজে রাম দেবীর চরণে।
নৃত্যগীতে নানা মতে নিশি জাগরণে।।


 নবমী পূজা

নবমীতে রঘুপতি, পূজিবারে ভগবতী,
উদ্যোগ করিল ফল মূল।
যথা বেদবিধি মত, আনিলা সামগ্রী যত,
কপিগণ যোগাইছে ফুল।।
অশোক কাঞ্চন জবা, মল্লিকা মালতী ধরা,
পলাশ পাটলি ও বকুল।
গন্ধরাজ আদি যত, বনপুষ্প নানামত,
স্থলপদ্ম কদম্ব পারুল।।
রক্তোৎপল শতদল, কুমুদ কহ্লার নল,
আমলকীপত্র পারিজাত।
শেফালী করবী আর, কনক-চম্পক সার,
কোকনদ সহস্রেক পাত।।
অতসী অপরাজিতা, যাতে দুর্গা হরষিতা,
চামেলী চম্পক নাগেশ্বর।
কাষ্ঠমল্লিকা দুপাটী, জাঁতি যূথী আর ঝাঁটি,
দ্রোণপুষ্প মাধবী টগর।।
তুলসী তিসি ধাতকী, ভুমি-চম্পক কেতকী,
পদ্মবক কৃষ্ণকেলি আর।
স্বর্ণযূথিকা বান্ধুলি, শীর্ণ শিউলি-আঁধুলি,
কুরুচি গোলাপ পুষ্পসার।।
কৃষ্ণচূড়া চমৎকার, পুষ্প রাখে ভারে ভার,
সচন্দন কদলীর দলে।
নৈবেদ্যের আয়োজন, করিল বানরগণ,
অপূর্ব্ব অপূর্ব্ব বনফলে।।


নীলপদ্ম আনয়নের মন্ত্রণা

পরম আনন্দে রাম পূজেন শঙ্করী।
সাত্ত্বিক ভাবেতে ভাব বিধান আচরি।।
তন্ত্র-মন্ত্রমতে পূজা করে রঘুনাথ।
একাসনে সভক্তিতে লক্ষ্মণের সাথ।।
অর্চ্চনা করিলা যদি দেব ভগবান।
থাকিতে নারিলা দেবী ঘটে অধিষ্ঠান।।
কপটে করুণাময়ী রহিলা গোপন।
শ্রদ্ধায় রামের পূজা করিলা গ্রহণ।।
বিধিমতে পূজা সাঙ্গ করিলা শ্রীহরি।
কিন্তু হৈল সন্দেহ না দেখি মহেশ্বরী।।
বিভীষণে কন রাম কি হইবে আর।
আমা প্রতি দয়া বুঝি না হৈল দুর্গার।।
বঞ্চনা করিলা দেবী, বুঝি অভিপ্রায়।
সীতার উদ্ধারে আর নাহিক উপায়।।
নয়নে বহিছে ধারা সশোক অন্তর।
কান্দেন করুণাময় প্রভু পরাৎপর।।
কাতর হইয়া তবে কন বিভীষণ।
এক কর্ম্ম কর প্রভু নিস্তার কারণ।।
তুষিতে চণ্ডীর মন করহ বিধান।
অষ্টোত্তরশত নীলোৎপল কর দান।।
দেবের দুর্ল্লভ পুষ্প যথা তথা নাই।
তুষ্টা হবে ভগবতী শুনহ গোঁসাই।।
শুনিয়া তাঁহার বাক্য রামচন্দ্র কন।
কোথা পাব নীলপদ্ম মিত্র বিভীষণ।।
দেবের দুর্ল্লভ যাহা কোথা পাবে নর।
সকলি আমার ভাগ্যে বিধান দুষ্কর।।
কাতর দেখিয়া রামে হনুমান কয়।
স্থির হও চিন্তা দূর কর মহাশয়।।
দাস আছে কেন চিন্তা কর প্রভু মনে।
থাকে যদি নীলপদ্ম আনিব এক্ষণে।।
স্বর্গ মর্ত্ত্য পাতাল ভ্রমিয়া ভূমণ্ডল।
একদণ্ডে আনি দিব শত নীলোৎপল।।
বিভীষণ কন বীর হনুমান কাছে।
অবনীতে দেবীদহে নীলপদ্ম আছে।।
এক বৎসরের পথ হইবে নিশ্চয়।
হনু কহে আনি দিব নাহিক সংশয়।।
রামচন্দ্রে প্রণমিয়া বীর হনুমান।
দেবীদহ উদ্দেশেতে করিল পয়াণ।।


শ্রীরামচন্দ্র কর্ত্তৃক দেবীর স্তব ও হনুমানের নীলপদ্ম আনয়ন

হনুমানে পাঠাইয়া পদ্ম আনিবারে।
শ্রীরাম করেন স্তব দেবী চণ্ডিকারে।।
দুর্গে দুঃখহরা তারা দুর্গতি নাশিনী।
দুর্গমে শরণি বিন্ধ্যাগিরি-নিবাসিনী।।
দুরারাধ্যা ধ্যানসাধ্যা শক্তি সনাতনী।
পরাৎপরা পরমা প্রকৃতি পুরাতনী।।
নীলকণ্ঠপ্রিয়া নারায়ণী নিরাকারা।
সারাৎসারা মূলশক্তি সচ্চিদা সাকারা।।
মহিষমর্দ্দিনী মহামায়া মহোদরী।
শিব সীমন্তিনী শ্যামা সর্ব্বাণী শঙ্করী।।
বিরূপাক্ষী শতাক্ষী সারদা শাকম্ভরী।
ভ্রামরী ভবানী ভীমা ধূমা ক্ষেমঙ্করী।।
কালীহ কালহরা কালাকালে কর পার।
কুলকুণ্ডলিনী কর কাতরে নিস্তার।।
লম্বোদরা দিগম্বরা কলুষ-নাশিনী।
কৃতান্ত-দলনী কাল ঊরু বিলাসিনী।।
ইত্যাদি অনেক স্তব করিলা শ্রীহরি।
তুষ্টা হৈলা হৈমবতী অমর ঈশ্বরী।।
কিন্তু রৈলা অদৃশ্যেতে নীলপদ্ম আশে।
রামের কমল আঁখি অশ্রুজলে ভাসে।।
এইরূপে কতক্ষণ রহে ভগবান।
ওথা নীলোৎপল তুলে বীর হনুমান।।
অষ্টোত্তর শত পদ্ম করি উত্তোলন।
পবনবেগেতে বীর করে আগমন।।
রামচন্দ্র নিকটে আসিয়া উত্তরিল।
গণনা করিয়া রামে নীলপদ্ম দিল।।
আনন্দিত হৈল রাম পেয়ে নীলপদ্ম।
দেবীভাগে বিচিত্র করিল চিত্ত-পদ্ম।।
সঙ্কল্প করিল পদ্ম করিতে প্রদান।
কৃত্তিবাস রচিলেন গীত রামায়ণ।।


দেবী কর্ত্তৃক একটী পদ্ম হরণ

পুলকিত চিত, বিধান রচিত,
মূলমন্ত্র উচ্চারণে।
ক্রমে নীলোৎপল, সহস্রেক দল,
সঁপে শঙ্করী-চরণে।।
করিলেন ছল, বুঝিতে সকল,
দেবী হর-মনোহরা।
হরিলেন আর, এক পদ্ম তাঁর,
মহেশ্বরী পরাৎপরা।।
ক্রমে পদ্ম সব, দিলেন রাঘব,
রাম জগৎ-গোঁসাই।
শেষেতে বিয়োগ, হৈল অত্র যোগ,
এক পদ্ম মিলে নাই।।
হইয়া বিস্মিত, চিত্ত চমকিত,
সঙ্কল্প ভঙ্গেতে ভয়।
হনুমানে কন, ব্রহ্ম-সনাতন,
শুন পবন-তনয়।।
সঙ্কল্প করিয়া, বিধান রচিয়া,
শতাষ্ট আছে সংখ্যায়।
এক পদ্ম তায়, পাওয়া নাহি যায়,
ঠেকিলাম ঘোর দায়।।
যাহ পুনর্ব্বার, এক পদ্ম আর,
আন গিয়া বাছাধন।
হনুমান কয়, শুন মহাশয়,
শতাষ্ট আছে গণন।।
শুন হে গোঁসাই, আর পদ্ম নাই,
দেবীদহে বনমালী।
হেন লয় চিতে, তোমারে ছলিতে,
পঙ্কজ হরিলা কালী।।
আমায় বিস্ময়, অন্যথা না হয়,
দেখেছি গণনা-ক্রমে।
নিশ্চয় তারিণী, হরিলা নলিনী,
না ভুলিও প্রভু ভ্রমে।।
পবন-নন্দন, কহিল যখন,
শুনিয়া বিস্ময় রাম।
আঁখি ছল ছল, বহে অশ্রুজল,
কান্দেন ত্রিলোক-ধাম।।
বুঝিলাম সার, কপালে আমার,
আছে যে কত যন্ত্রণা।
কৃত্তিবাস গায়, এ হেতু আমায়,
অভয়ার বিড়ম্বনা।।


শ্রীরামচন্দ্র কর্ত্তৃক পুনর্ব্বার কালিকার স্তব

নমস্তে শর্ব্বাণী, ঈশানী ইন্দ্রাণী,
ঈশ্বরী ঈশ্বর-জায়া।
অর্পণা অভয়া, অন্নপূর্ণা জয়া,
মহেশ্বরী মহামায়া।।
উগ্রচণ্ডা উমা, আশুতোষ-রমা,
অপরাজিতা উর্ব্বশী।
রাজরাজেশ্বরী, ভীমা ভয়ঙ্করী,
শঙ্করী শিবা ষোড়শী।।
মাতঙ্গী বগলা, কল্যাণী কমলা,
ভবানী ভুবনেশ্বরী।
সর্ব্ব বিশ্বোদরী, শুভে শুভঙ্করী,
ক্ষিতি ক্ষেত্র ক্ষেমঙ্করী।।
সহস্র সুহস্তে, ভীমা ছিন্নমস্তে,
মাতা মহিষ-মর্দ্দিনী।
নিস্তার-কারিণী, নরক-বারিণী,
নিশুম্ভ-শুম্ভ-ঘাতিনী।।
দৈত্য-নিকৃন্তিনী, শিব-সীমন্তিনী,
শৈলসুতা সুবদনী।
বিরিঞ্চি-বন্দিনী, দুষ্ট-নিষ্কন্দিনী,
দিগম্বরের ঘরণী।।
দেবী দিগম্বরী, দুর্গে দুর্গ-অরি,
কালিকা করালবেশী।
শিবে শবারূঢ়া, চণ্ডী চন্দ্রচূড়া,
ঘোররূপা এলোকেশী।।
সর্ব্বসুশোভিনী, ত্রৈলোক্য-মোহিনী,
নমস্তে লোল-রসনা।
নমো দিগ্বসনা, সর্ব্ব-শবাসনা,
বিশ্বা বিকট-দশনা।।
সারদা বরদা, শুভদা সুখদা,
অন্নদা মোক্ষদা শ্যামা।
মৃগেশ বাহিনী, মহেশ-ভাবিনী,
সুরেশ বন্দিতা বামা।।
কামাখ্যা রুদ্রাণী, হরা হর-রাণী,
হর-রমা কাত্যায়নী।
শমন ত্রাসিনী, অরিষ্ট-নাশিনী,
দয়াময়ী দাক্ষায়ণী।।
হের মা পার্ব্বতী, আমি দীন অতি,
আপদে পড়েছি বড়।
সর্ব্বদা চঞ্চল পদ্ম-পত্র-জল,
ভয়ে ভীত জড়সড়।।
বিপদে আমার, না হয় তোমার,
বিড়ম্বনা করা আর।
মম প্রতি দয়া, কর গো অভয়া,
ভবার্ণবে কর পার।।


দেবীর প্রতি শ্রীরামের স্তুতিবাক্য

কাতরে কহেন রাম দেবী পদতলে।
আর্দ্রচিত্ত রোমাঞ্চিত ভাসে অশ্রুজলে।।
কৃতাঞ্জলি হয়ে রাম স্তুতিবাক্যে কয়।
হের গো নয়নে কালী মোর অসময়।।
পরাৎপরা সারাৎসারা বিপদ-ছেদিনী।
মহামায়ারূপে ত্রিজগৎ-আচ্ছাদিনী।।
তুমি কর্ম্ম, তুমি মূল কর্ম্মের কারণ।
তুমি স্মৃতি বৃত্তি দয়া লজ্জা নিরূপণ।।
সর্ব্বময়ী সর্ব্ব-আত্মা তুমি সর্ব্বশক্তি।
তোমাতে আশ্রিত জীব সংসারানুরক্তি।।
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের কারণ গো তুমি।
সজীব অজীব ব্যাপ্তি স্বর্গ সুরভূমি।।
সকলি কর মা তুমি শুভাশুভ যত।
আপন সম্পদ ধর্ম্মাধর্ম্ম অনুগত।।
তুমি কর্ম্মাকর্ম্ম ভোগ মোক্ষ প্রদায়িনী।
স্ত্রী পুরুষ নপুংসক জীব-সহায়িনী।।
যোগমায়া-যোগে মোরে আনিলে ভূতলে।
বিড়ম্বনা করিয়া ভাসালে শোকজলে।।
চিন্তামণি নাম দিয়া চিন্তা সমর্পণ।
তুমি কর্ম্মে প্রযোজক প্রযোজ্য গণন।।
সর্ব্বভূতে সর্ব্বরূপে ভিন্ন কর দেহ।
তুমি শক্তি সর্ব্বধারা ছাড়া নহে কেহ।।
সংসার তোমার মায়া ছায়াবাজী প্রায়।
তোমার এ নাট্য-খেলা পুত্তলিকা প্রায়।।
কারে কর রাজা, কারে মন্ত্রী কর তার।
কেহ গজবাহী, কেহ গজ রক্ষাকার।।
কেহ দীর্ঘজীবী, কেহ অল্পদিনে পাত।
কারো শিরে ছত্র, কারো শিরে বজ্রাঘাত।।
কেহ যার শিবিকায়, কেহ তারে বয়।
কেহ সুখী মহাভোগী, কেহ কষ্টে রয়।।
কারো স্বর্ণপাত্রে অন্ন পঞ্চাশ ব্যঞ্জন।
কারো অন্ন নাহি মিলে, ভিক্ষায় ভক্ষণ।।
কেহ রোগী, রাগী কেহ হয় বলাম্বিত।
কেহ সাধু, চোর কেহ ধর্ম্মে ধর্ম্মাতীত।।
এইরূপে সংসারের কর মা স্থাপন।
আমারে করেছ মাত্র দুঃখের ভাজন।।
ত্রিভুবনে দুঃখ তাপে স্থাপিছ আমায়।
আর দুঃখ দিও না মা, নিবেদি তোমায়।।
সুখভাণ্ড অল্প হলো দুঃখ তাহে ভারি।
তথাপি রাখিছ দুঃখ পূর্ব্ব না বিচারি।।
নিষেধ করি গো তাই যদি ভেঙ্গে যায়।
এ দুঃখ রাখিতে স্থান পাইবে কোথায়।।
বলে অবসন্ন আমি, যা জান তা কর।
হইয়াছি অতিশয় জীর্ণ কলেবর।।


দেবীর প্রতি শ্রীরামের নিবেদন

জন্মাবধি দুঃখ মোর কি কহিব আর।
তবু দুঃখ দেও দয়া না হয় তোমার।।
ক্লেশে অবসন্ন তনু শুন গো তারিণী।
দয়া কর দয়াময়ী পতিতোদ্ধারিণী।।
কত দুঃখ দিলে মাতা ভেবে দেখ মনে।
রাজ্য বিনাশিয়া শেষে আনিলে কাননে।।
তথাপি নাহিক ক্ষমা অরণ্যে আনিলে।
রাবণের দ্বারায় শেষে জানকী হরালে।।
কত কষ্টে কটক সঞ্চয় কপিগণে।
শিলা বৃক্ষে সেতু বান্ধি সমুদ্র-তরণে।।
সীতার উদ্ধারে তারা হইনু তৎপর।
রাক্ষস নাশিনু শেষ আছে লঙ্কেশ্বর।।
কষ্টে রণ করিলাম, হরের অঙ্গনা।
তথাপি আপনি কালী করিছ বঞ্চনা।।
করিলাম অর্চ্চনা মা অকাল-বোধনে।
তবু কৃপা না হইল মোর আরাধনে।।
শেষে শ্যামা নীলপদ্মে পূজিব চরণ।
শত অষ্ট সঙ্কল্পেতে করিনু রচন।।
তার মধ্যে কৃপণতা করিলে মোহনী।
হরিলে গো হর-রাণী সঙ্কল্প-নলিনী।।
আমি দীন হীন ক্ষীণ অতি অভাজন।
হের মা নয়ন-কোণে মানস পূরণ।।
নীলপদ্ম দেখাইয়া পূর্ণ কর ফল।
না সহে যাতনা আর, জীবন বিকল।।
এইরূপে রামচন্দ্র করেন বিনয়।
তথাপি তারার তাহে সাক্ষাৎ না হয়।।
কান্দিয়া শ্রীরঘুনাথ হইলা অস্থির।
বক্ষ মুখ বহিয়া পড়িছে অশ্রু-নীর।।
লক্ষ্মণ কান্দেন আর বীর হনুমান।
সুগ্রীব সুষেণ বিভীষণ জাম্ববান।।
শ্রীরাম কহেন সবে কিবা দেখ আর।
বুঝিনু নিশ্চয় সীতা না হৈল উদ্ধার।।
যাহ মিতা সুগ্রীব স্বগণে লয়ে যাও।
মিথ্যা আর কেন কান্দ মিছে মুখ চাও।।
বিভীষণে রাজ্য দিব অযোধ্যা ভুবনে।
রাখিব যতনে তারে সত্যের পালনে।।
ঝাঁপ দিব জলে আমি সমুদ্র ভিতরে।
এত বলি কান্দে রাম দুঃখিত অন্তরে।।
আকুল দেখিয়া রামে সকলে বুঝায়।
কৃত্তিবাস বিরচিল মধুর ভাষায়।।


শ্রীরামচন্দ্র কর্ত্তৃক দেবীকে নিজ চক্ষু দিবার সঙ্কল্প ও দেবী কর্ত্তৃক নিবারণ

শ্রীরামে কাতর দেখি কহে হনুমান।
এরূপ ব্যাকুল কেন হলে ভগবান।।
সাধিব সকল কর্ম্ম আমি আপনার।
মারিয়া রাবণে সীতা করিব উদ্ধার।।
এইরূপে সকলেতে বুঝায় তখন।
না শুনে কাহারো কথা করেন রোদন।।
শিরে করাঘ্যত করি করেন হুতাস।
বলেন কেবল মোর সকলি নৈরাশ।।
ভাবিতে ভাবিতে রাম করিলেন মনে।
নীল-কমলাক্ষ মোরে বলে সর্ব্বজনে।।
যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোৎপল।
সঙ্কল্প করিব পূর্ণ বুঝিবে সকল।।
এক চক্ষু দিব আমি দেবীর চরণে।
এত বলি কহে রাম অনুজ লক্ষ্মণে।।
আর কিবা দেখ ভাই কি করি এখন।
না হৈল দুর্গার কৃপা বিফল জীবন।।
কমল-লোচন মোরে বলে সর্ব্বজনে।
এক চক্ষু দিব আমি সঙ্কল্প পূরণে।।
এত বলি তূণ হৈতে লইলেন বাণ।
উপাড়িতে যান চক্ষু করিতে প্রদান।।
কান্দিতে কান্দিতে রাম করেন স্তবন।
দেবীর হইল দয়া দেখিয়া রোদন।।
চক্ষু উপাড়িতে রাম বসিলা সাক্ষাতে।
হেনকালে কাত্যায়নী ধরিলেন হাতে।।
কি কর কি কর প্রভু জগৎ-গোঁসাই।
পূর্ণ হৈল, চক্ষু উপাড়িয়া কার্য্য নাই।।
কাতরে শ্রীরাম কন দেবীরে তখন।
অবিরত জলধারে ভাসিছে নয়ন।।
ভাল দুঃখ দিলে মাতা পেয়ে অসময়।
কিন্তু জননীর হেন করা ভাল নয়।।
পুত্র প্রতি মাতৃস্নেহ সর্ব্বশাস্ত্রে গায়।
মোর পক্ষে মীন ভুজঙ্গের মাতা প্রায়।।
ঠেকেছি বিষম দায়ে জানকী উদ্ধারে।
অনুমতি কর মাতা রাবণ সংহারে।।
যা করিলে সে ভাল, বারেক ফিরে চাও।
শবে অস্ত্রাঘাত, মিথ্যা আক্ষেপ বাড়াও।।
ভরসা তোমার তারা না কর নৈরাশ।
আশা আছে, আশ্বাসেতে দাও মা আশ্বাস।।
কালবিনাশিনী কালে কালের কামিনী।
প্রকৃতি পরমেশ্বরী পরম মোহিনী।।
অশন বিহনে তনু শীর্ণ আছে মোর।
কবিবর কহে মা দুঃখের নাহি ওর।।


রাবণ বধের জন্য শ্রীরামের প্রতি দেবীর আদেশ ও দশমী পূজা সমাপন

রামের বচন শুনি, বিষাদে হরিষ গণি,
স্তুতিবাক্যে কাত্যায়নী কন।
শুন প্রভু দয়াময়, অখিল ব্রহ্মাণ্ডচয়,
হও তুমি ব্রহ্ম-সনাতন।।
তুমি আদি ভগবান, অখণ্ড কাল সমান,
বিশ্ব রহে তব লোমকূপে।
তুমি চরাচর-গতি, অচ্যূত অব্যয় অতি,
ব্যাপকতা পরমাণুরূপে।।
মায়ায় মনুষ্য তুমি, চতুর্ব্ব্যূহ আসি ভূমি,
নাশিতে রাক্ষস দুরাচার।
ভব-ভাব্য প্রভু হও, কভু কোন্ ভাবে রও,
শুদ্ধতত্ত্ব কে জানে তোমার।।
তোমার জানকী যিনি, পরমা প্রকৃতি তিনি,
রাবণের কি সাধ্য হরিতে।
সীতা উদ্ধারের ছলে, সেতু বান্ধি সিন্ধুজলে,
রাক্ষসের বিনাশ করিতে।।
দেখহ মনে বিচারি, রাবণ তোমার দ্বারী,
পূর্ব্বে ছিল বৈকুণ্ঠ নগরে।
ব্রহ্মাশাপে ধরা এল, শত্রু ভাবেতে পাইল,
তেঁই প্রভু তুমি ধরা পরে।।
অকাল-বোধন পূজা, কৈলে তুমি দশভুজা,
বিধিমতে করিলে বিন্যাস।
লোকে জানাবার জন্য, আমারে করিতে ধন্য,
অবনীতে করিলে প্রকাশ।।
রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি.
এত বলি হৈলা অন্তর্দ্ধান।
নাচে গায়ে কপিগণ, প্রেমানন্দে নারায়ণ,
নবমী করিলা সমাধান।।
দশমীতে পূজা করি, বিসর্জ্জিয়া মহেশ্বরী,
সংগ্রামে চলিলা রঘুপতি।
আদেশ পাইয়া রাম, সিদ্ধ কৈল মনস্কাম,
চণ্ডীলীলা মধুর ভারতী।।


Source: কৃত্তিবাসী রামায়ণ – লঙ্কাকাণ্ড [86-97]

Categories: Bengali Page

Tagged as: