১৯০৫ সালে বাংলা – 1905 Sale Bangla
Home » Law Library Updates » ১৯০৫ সালে বাংলা – 1905 Sale Bangla
নিবেদন
এই পুস্তকে সংগৃহীত লাঞ্ছিতদিগের বিবরণ এবং বরিশাল বিভ্রাটের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত প্রধানতঃ হিতবাদী, সঞ্জীবনী, চারুমিহির, বরিশাল হিতৈষী প্রভৃতি সংবাদ পত্র হইতে সঙ্কলিত হইয়াছে। এই পুস্তকে অনেক স্থলে সংবাদ পত্রাদির ভাষা অবিকল পরিগ্রহণ করিয়াছি, তজ্জন্য সম্পাদক মহাশয়গণের নিকট ঋণী রহিলাম। যদি এই ক্ষুদ্র পুস্তক পাঠে কাহারও দেশের জন্য কষ্ট সহিবার প্রবৃত্তি মনে বদ্ধমূল হয়, তাহা হইলে শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব। উক্ত পুস্তকে ১৯০৫ সালের ইতিহাসই যথাসম্ভব দেওয়া গেল পরবর্ত্তী সংস্করণে যদি সম্ভব হয় তবে ১৯০৫ হইতে ১৯৩১ পর্য্যন্ত দেওয়ার ইচ্ছা রহিল। ইতি—
বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্টরূপ আছে, একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে, একটা স্বতন্ত্র ধর্ম্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে, অধিকার আছে, সাধনা আছে কর্ত্তব্য আছে। বুঝিলাম, বাঙ্গালীকে প্রকৃত বাঙ্গালী হইতে হইবে। বিশ্ববিধাতার যে অনন্ত বিচিত্র সৃষ্টি, বাঙ্গালী সেই সৃষ্টিস্রোতের মধ্যে এক বিশিষ্ট সৃষ্টি। অনন্তরূপ লীলাধারের রূপ বৈচিত্র্যে বাঙ্গালী একটী বিশিষ্টরূপ হইয়া ফুটিয়াছে। আমার বাঙ্গালা সেইরূপের মূর্ত্তি আমার বাঙ্গালা সেই বিশিষ্টরূপের প্রাণ, যখন জাগিলাম, মা আমার আপন গৌরবে—তাঁহার বিশ্বরূপ দেখাইয়া দিলেন, সে রূপে প্রাণ ডুবিয়া গেল, দেখিলাম, সে রূপ বিশিষ্ট, সে অনন্ত!
পূর্ব্বাভাষ
ইংরাজ যখন প্রথমে আমাদের এদেশে আসে, তখন নানা কারণে আমাদের জাতীয় জীবন দুর্ব্বলতার আধার হইয়াছিল। তখন আমাদের ধর্ম্ম একেবারেই নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল, এদিকে চির পুরাতন চিরশক্তির আকর সনাতন হিন্দু ধর্ম্ম কেবল মাত্র মৌখিক আবৃত্তি ও আড়ম্বরের মধ্যে আপনার শিবশক্তিকে হারাইয়া ফেলিয়াছিল ও অপর দিকে যে অপূর্ব প্রেমধর্ম্মের বলে মহা প্রভু সমস্ত বাঙ্গলা দেশকে জয় করিয়াছিলেন, সেই প্রেমধর্ম্মের অনন্ত মহিমা ও প্রাণ-সঞ্চারিণী শক্তি কেবল মাত্র তিলককাটা ও মালা ঠকঠকানিতেই নিঃশেষিত হইয়া যাইতেছিল। বাঙ্গলার হিন্দুর সমগ্র ধর্ম্মক্ষেত্র শক্তিহীন শাক্ত ও প্রেমশূন্য বৈষ্ণবের ধর্ম্মশূন্য কলহে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, তখন নবদ্বীপের চিরকীর্ত্তিময় জ্ঞানগৌরব কেবল মাত্র ইতিহাসের কথা, অতীত কাহিনী, বাঙ্গালী জীবনের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধ ছিল না, এই রূপে কি ধর্ম্মে, কি জ্ঞানে বাঙ্গালার হিন্দু তখন সর্ব্ববিষয়ে প্রাণহীন হইয়া পড়িয়াছিল।
আলিবর্দ্দি খাঁর পর হইতেই বাংলার মুসলমানও ক্রমশঃ নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল এবং সেই সময় তাহাদের সকল জ্ঞানী ও সকল শক্তি বলহীনের বিলাসে ভাসিয়া গিয়াছিল। এমন সময় সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে ইংরাজ বণিক-বেশে আগমন করিল এবং অল্প দিনের মধ্যেই রাজত্ব স্থাপন করিয়া অসাধারণ শক্তির পরিচয় দিল। আমাদের জাতীয় দুর্ব্বলতা নিবন্ধন আমরা ইংরাজ রাজত্বের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ইংরাজ জাতিকে ও তাহাদের সভ্যতা ও তাহাদের বিলাসকে বরণ করিয়া লইলাম। দুর্ব্বলের যাহা হয়, তাহাই হইল। ইংরাজী সভ্যতার সেই প্রখর আলোক সংযতভাবে ধারণ করিতে পারিলাম না। অন্ধ হইয়া পড়িলাম। অন্ধকারাক্রান্ত দিগ্ভ্রান্ত পথিক যেমন বিস্ময়ে ও মোহবশতঃ আপনার পদ প্রান্তস্থিত সুপথকে অনায়াসে পরিত্যাগ করিয়া, নিজের শাস্ত্রকে অবজ্ঞা করিয়া, নিজের সাহিত্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিয়া, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ইঙ্গিতে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করিয়া ইংরাজের সাহিত্য ইংরাজের ইতিহাস, ইংরাজের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দিকে নিতান্ত অসংযতভাবে ঝুঁকিয়া পড়িলাম। সেই ঝোঁক অনেকটা কমিয়া আসিয়াছে সত্য, কিন্তু এখনও একেবারে যায় নাই। রামমোহন যে দেশে “বিজ্ঞানের তুর্য্যধ্বনি” করিয়াছিলেন, আমরা তাহাই শুনিয়াছিলাম, বা মনে করিয়াছিলাম শুনিয়াছি, অন্ততঃপক্ষে বিজ্ঞানের বুলি আওড়াইতে আরম্ভ করিলাম। কিন্তু রামমোহন যে গভীর শাস্ত্রালোচনায় জীবনটাকে ঢালিয়া দিয়াছিলেন, তাহার দিকেত আমাদের চোখ পড়ে নাই। তিনি যে আমাদেব সভ্যতা ও সাধনার মধ্যে আমাদের উদ্ধারের পথ খুঁজিয়াছিলেন সে কথা ত আমরা একবারও মনে করি নাই। তারপর দিন গেল। আমাদের স্কুল, কলেজ, প্রতিষ্ঠিত হইল, আমাদের ঝোঁকটা আরও বাড়িয়া গেল, তারপর বঙ্কিম সর্ব্বপ্রথমে বাঙ্গালার মূর্ত্তি গড়িলেন, প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিলেন, বঙ্গজননীকে দর্শন করিলেন, সেই “সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং শস্যশ্যামলাং মাতরম্” তাহারই গান গাহিলেন, সবাইকে ডাকিয়া বলিলেন, “দেখ দেখ, এই আমাদের মা, বরণ করিয়া ঘরে তোল।” কিন্তু আমরা তখন সে মূর্ত্তি দেখিলাম না; সে গান শুনিলাম না, তাই বঙ্কিম আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আমি একা মা মা বলিয়া রোদন করিতেছি।” তার পর শশধর তর্কচূড়ামণির হিন্দু ধর্ম্মের পুনরুখানের আন্দোলন। এই আন্দোলন সম্বন্ধে আমাদের দেশে অনেক মত ভেদ আছে। কেহ বলেন, উহা আমাদের দেশে অনেক অনিষ্ট করিয়াছিল, আবার কেহ কেহ বলেন অমিাদের অশেষ উপকার সাধন করিয়াছিল। সে সব কথা লইয়া আলোচনা করা আমি আবশ্যক মনে করি না। এই আন্দোলন যে অনেক দিকে একেবারেই অল্প ছিল, তাহা আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি যেন সেই আন্দোলনের মধ্যেই বাঙ্গালী জাতির, অন্ততঃ পক্ষে শিক্ষিত বাঙ্গালীর আত্মস্থ হইবার একটা প্রয়াস—একটা উদ্যম দেখিতে পাই। সেইটুকুই আমাদের লাভ। তারপর আরও দিন গেল, ১৯০৩ খৃঃ হইতে স্বদেশী আন্দোলনের বাজনা বাজিতে লাগিল, বাঙ্গালী আপনাকে চিনিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিল। রবীন্দ্র নাথ গাহিলেন—
“বাংলার মাটী বাংলার জল
সত্য কর সত্য কর হে ভগবান্”
বাঙ্গালার জল বাঙ্গলার মাটী আপনাকে সার্থক করিতে লাগিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানীগুণী মহাপণ্ডিত আছেন, যাহারা নাকি বলেন যে, এই স্বদেশী আন্দোলন ইহা একটা বৃহৎ ভ্রান্তির ব্যাপার। আমরা নাকি সব দিকে ঠিক হিসাব করিয়া চলিতে পারি নাই। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে আমাদের দেশে একটা প্রাণহীন জ্ঞানের আবির্ভাব হইয়াছে। এই মুখস্ত করা জ্ঞানের ক্ষমতা অল্পই; কিন্তু অহঙ্কার অনেক খানি। এই জ্ঞানে যাঁরা জ্ঞানী, তাঁহারা সব জিনিষ সের দাঁড়ি লইয়া মাপিতে বসেন। তারা অঙ্ক শাস্ত্রের শাস্ত্রী, সব জিনিষ লইয়া আঁক কষিতে বসেন। কিন্তু, প্রাণের যে বন্যা, সে ত অঙ্ক শাস্ত্র মানে না, সে যে সকল মাপ কাঠি ভাসাইয়া লইয়া যায়। স্বদেশী আন্দোলন একটা ঝড়ের মত বহিয়া গিয়াছিল, একটা প্রবল বন্যায় আমাদের ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল। প্রাণ যখন জাগে তখন ত হিসাব করিয়া জাগে না। মানুষ যখন জন্মায়, সেত হিসাব করিয়া জন্মায় না, না জন্মাইয়া পারে না বলিয়াই সে জন্মায়। আর না জাগিয়া থাকিতে পারে না বলিয়াই প্রাণ একদিন অকস্মাৎ জাগিয়া উঠে। এই যে মহাবন্যার কথা বলিলাম, তাহাতে আমরা ভাসিয়া—ডুবিয়া বাঁচিয়াছি। বাঙ্গলার যে জীবন্ত প্রাণ, তাহার সাক্ষাৎ পাইয়াছি। বাঙ্গলার প্রাণে প্রাণে আবহমান যে সভ্যতা ও সাধনার স্রোত, তাহাতে অবগাহন করিয়াছি। বাঙ্গলার যে ইতিহাসের ধারা, তাহাকে কতকটা বুঝিতে পারিয়াছি। বৌদ্ধের বুদ্ধ, শৈবের শিব, শাক্তের শক্তি, বৈষ্ণবের ভক্তি, সবই যেন চক্ষের সম্মুখে প্রতিভাত হইল। চণ্ডিদাস বিদ্যাপতির গান মনে পড়িল। মহাপ্রভুর জীবন-গৌরব আমাদের প্রাণের গৌরব বাড়াইয়া দিল। জ্ঞান দাসের গান, গোবিন্দ দাসের গান, লোচন দাসের গান সবই যেন এক সঙ্গে সাড়া দিয়া উঠিল। কবিওয়ালাদের গানের ধ্বনি প্রাণের মধ্যে বাজিতে লাগিল। রামপ্রসাদের সাধন সঙ্গীতে আমরা মজিলাম। বুঝিলাম, কেন ইংরাজ এদেশে আসিল, রামমোহনের তপস্যার নিগূঢ় মর্ম্ম কি? বঙ্কিমের যে ধ্যানের মূর্ত্তি সেই—
“তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম,
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে,
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা—ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে”—
সেই মাকে দেখিলাম, বঙ্কিমের গান আমাদের “কানের ভতর দিয়া মরমে পশিল,” বুঝিলাম, রামকৃষ্ণের সাধনা কি— সিদ্ধ কোথায়! বুঝিলাম কেশব চন্দ্র কেন কাহার ডাক শুনিয়া ধর্ম্মের তর্ক রাজ্য ছাড়িয়া মর্ম্মরাজ্যে প্রবেশ করিয়া ছিলেন। বিবেকানন্দের বাণীতে প্রাণ ভরিয়া উঠিল। বুঝিলাম, বাঙ্গালী হিন্দু হউক, মুসলমান হউক খৃষ্টান হউক, বাঙ্গালী বাঙ্গালী।
বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্টরূপ আছে, একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে, একটা স্বতন্ত্র ধর্ম্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে, অধিকার আছে, সাধনা আছে কর্ত্তব্য আছে। বুঝিলাম, বাঙ্গালীকে প্রকৃত বাঙ্গালী হইতে হইবে। বিশ্ববিধাতার যে অনন্ত বিচিত্র সৃষ্টি, বাঙ্গালী সেই সৃষ্টিস্রোতের মধ্যে এক বিশিষ্ট সৃষ্টি। অনন্তরূপ লীলাধারের রূপ বৈচিত্র্যে বাঙ্গালী একটী বিশিষ্টরূপ হইয়া ফুটিয়াছে। আমার বাঙ্গালা সেইরূপের মূর্ত্তি আমার বাঙ্গালা সেই বিশিষ্টরূপের প্রাণ, যখন জাগিলাম, মা আমার আপন গৌরবে—তাঁহার বিশ্বরূপ দেখাইয়া দিলেন, সে রূপে প্রাণ ডুবিয়া গেল, দেখিলাম, সে রূপ বিশিষ্ট, সে অনন্ত! তোমরা হিসাব করিতে হয় কর, তর্ক করিতে চাও কর—সেরূপের বালাই লইয়া মরি।
(বাংলার কথা হইতে উদ্ধৃত) “দেশবন্ধু।”
তারপর স্বদেশী আন্দোলনের প্রবল ঢেউ বাংলার হৃদয়-কূলে আঘাতে করিল। দেশবন্ধু বাংলাকে যতটা ভালোবাসিয়াছিলেন ঠিক ততটা আবেগ এবং উন্মাদনা লইয়া বাংলার দুর্গম-পন্থী যুবকগণ এই আন্দোলনের স্রোতে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। শাসকের অমোঘ বজ্র তাহাদের উপর নিক্ষিপ্ত হইল। কিন্তু প্রলয়ের ইঙ্গিত পাইয়া সমুদ্রের ঢেউ যেমন চঞ্চল হইয়া ওঠে। রাজশক্তির এই প্রতিকূলতায় স্বদেশী আন্দোলনের স্রোতে জোয়ার আসিয়া গেল।
প্রলয়ের সেই সংশয় জটিল মুহুর্ত্তে যাহারা লাভ-লোকসানের হিসাব না খতাইয়া ভরা জোয়ারে গা| ভাসাইয়াছিলেন, এবং রাজরোষে পড়িয়| লাঞ্ছিত হইয়াছিলেন, তাঁহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে যাইয়া আমাদের কম বেগ পাইতে হয় নাই।
Writer : লিখেছেন অজ্ঞাত
সৎকার্য্যে বাধাদানের চেষ্টা
স্বদেশী আন্দোলন উপলক্ষে নিগৃহীত মহোদয়গণের প্রভি যৎসামান্য সম্মান প্রকাশে উদ্যত হইয়া আমাদিগকে সামান্য বিড়ম্বিত হইতে হয় নাই। আমাদিগের স্বদেশবাসী এক শ্রেণীর লোকের কাপুরুষতা, খলতা ও নীচাশয়তাই এস্থলে বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। যাহারা স্বদেশী আন্দোলনে সহায়তা করিতে গিয়া জন্মভূমির সেবায় আগ্রহাধিক্য প্রকাশ পুরঃসর রাজপুরুষ দিগের বিরাগ-ভাজন হইয়াছেন, ইংরাজের ধর্ম্মাধিকরণে অভিযুক্ত হইয়া দণ্ডিত হইয়াছেন, তাঁহাদিগের প্রতি সম্মান প্রকাশের চেষ্টাতে বিবিধ ব্যক্তি অশেষ প্রকারে বাধা দানের প্রয়াস পাইয়াছিল। যাঁহারা স্বদেশের হিতসাধন করিতে গিয়া, রাজপুরুষদিগের হস্তে নিগৃহীত হইয়াছেন, এবং প্রফুল্লবদনে সেই সকল নিগ্রহ সহ্য করিয়া আবার স্বদেশ-সেবায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন, সেই সকল মহাপ্রাণ ব্যক্তির প্রতি যে প্রকাশ্যভাবে কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রকাশ করা আমাদের প্রধান কর্ত্তব্য, একথা কে না স্বীকার করিবেন? সকল দেশেই এইরূপ বীরপূজা হইয়া থাকে। যাঁহারা দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেন, তাঁহাদিগের নাম সকল দেশে প্রাতঃস্মরণীয় হইয়া থাকে। যে জাতি বীরপূজা করিতে জানে না, বা আত্মোৎসর্গকারীর মহত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিয়া তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অগ্রসর হয় না, সে জাতির উন্নতির সম্ভাবনা অতি অল্প, একথা বলাই বাহুল্য।
দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের একদল মহাত্মা এই সদনুষ্ঠানে বাধা দানে সাধ্যমত ত্রুটী করেন নাই। ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ দেশবাসীর নিকট পণ্ডিত ও সম্ভ্রান্ত বলিয়া পরিচিত; কাহারও কাহারও স্বদেশভক্ত বলিয়া পরিচয় দানের আগ্রহও অল্প নহে। তথাপি ভীরুতা বশেই হউক, অথবা স্বভাব-দোষেই হউক, তাঁহারা রাজপুরুষদিগের হস্তে লাঞ্ছিত দেশের লোকের প্রতি প্রকাশ্যভাবে সম্মান প্রকাশে প্রতিবাদ করিয়াছেন। তাহার পর যাহাতে কলিকাতা টাউনহলে এরূপ সভার অধিবেশন না হয়, দেশের নেতৃবৃন্দ যাহাতে এই কার্য্যে যোগ না দেন, সেজন্যও গুণধরেরা চেষ্টার ত্রুটী করেন নাই। এই সকল ব্যক্তির চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়াছিল সত্য, তথাপি ইহাদের নীচতামূলক ব্যবহার কোন মতেই উপেক্ষণীয় নহে। নানা শ্রেণীর লোক ভিন্ন ভিন্ন কারণে এবিষয়ে আপত্তি করিয়াছিল। আমরাও কাহারও নামোল্লেখ না করিয়া অতি সংক্ষেপে কারণ গুলির উল্লেখ ও আলোচনা করিতেছি।
প্রথম আপত্তি, লাঞ্ছিত ব্যক্তিরা সম্মান প্রাপ্তির যোগ্য কোন কার্য্য করেন নাই। অন্যান্য দেশে যাহা্রা বড় বড় কার্য্য করেন তাঁহাদিগেরই সম্মান লাভ ঘটে। আমরা কেন তিলকে তাল করিয়া তুলিব? তাহাতে কি লাভ হইবে?
ইহার উত্তরে আমরা এই মাত্র বলিব, প্রাণের যে উচ্চতা, সৎসাহস ও মহানুভবতা সর্ব্বত্র সমাদৃত হয় আমাদিগের লাঞ্ছিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সেই সকল গুণের অসদ্ভাব ছিল না, যাঁহারা সম্মানিত হইতেছেন, আমরা তাঁহাদিগকে এই মাত্র জানাইতেছি যে, তাঁহারা রাজদ্বারে নিগ্রহ ভোগ করিলেও দেশের লোক তাঁহাদিগের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে; আমরা তাঁহাদিগকে সম্মানিত করিয়া নিজের সম্মানই বাড়াইতেছি, তাঁহাদিগের ইহাতে ব্যক্তিগত লাভ নাই, আমাদিগেরই জাতিগত লাভ। রাজপুরুষেরা এই কার্য্যে জানিতে পারিবেন যে, তাঁহাদিগের অকারণ লাঞ্ছনায় মানের হ্রাস না হইয়া বৃদ্ধিই হইয়া থাকে। দুর্ব্বল চিত্ত ব্যক্তিরাও ঈদৃশ সম্মান প্রদর্শন দর্শনে উন্নতচেতা হইয়া থাকে।
দ্বিতীয় আপত্তি, রাজপুরুষেরা বিরক্ত হইবেন, তাঁহারা রীতিমত বিচার করিয়া যাহাদিগকে দোষী সাব্যস্ত করিলেন, প্রজা হইয়া আমরা তাহাদিগকে সম্মানিত করি কিরূপে? যাঁহারা বিরক্ত হন হউন আমরা কি করিব? মান্যবর বাবু ভূপেন্দ্রনাথ বসুর পত্রে, ইহার একটি সদুত্তর দেওয়া হইয়াছে। ফলতঃ ইংরাজের দেবতা পাশ্চাত্য জগতের উপাস্য প্রভু ও যীশুখৃষ্টও প্রকাশ্য আদালতে রীতিমত বিচারে “দোষী সাব্যস্ত” হইয়া কঠোরতম প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন, ইহা বাইবেলের উক্তি।
তৃতীয় আপত্তি, যাহারা স্বদেশের কার্য্য করেন নাই, অকারণে রাজপুরুষদিগের ভ্রমে বা কাহারও চক্রান্তে লাঞ্ছিত, তাঁহাদিগকে সম্মানিত করা সম্মানের অপব্যবহার। এ উক্তি অত্যন্ত অসার। কারণ যাহারা লাঞ্ছিত তাঁহারা অধিকাংশস্থলে অভিযোগের বিষয়ীভূত ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকিলেও অন্যরূপে স্বদেশী আন্দোলনের জন্য কর্ত্তৃপক্ষের বিরাগভাজন। এ বিষয়ে অধুনা অধিক কিছু বলা যুক্তিসিদ্ধ বোধ করি না। এই পর্য্যন্ত বলিতে পারি, যদি কোন ব্যক্তি যোগ্যতা ব্যতিরেকে সম্মানিতই হন, তাহাতে যোগ্যের গৌরব লাঘব হয় না।
এই গেল স্বদেশবাসী কতিপয় ধুরন্ধরের বিরুদ্ধাচরণের কথা। ইহার পর শ্বেতাঙ্গ মহোদয়েরাও বিরুদ্ধাচরণে ক্ষান্ত হন নাই। গত ৫ই ফেব্রুয়ারি (১৯০৬) সোমবার এই বিরাট সভার অধিবেশন করিবার কন্য যখন টাউনহলে স্থান-প্রার্থনা করিয়া সুরেন্দ্র বাবু মিউনিসিপ্যাল চেয়ারম্যান এলেন সাহেবকে পত্র লিখেন, তখন তিনি টাউনহলে এই সভার অধিবেশন বিষরে অনুমতি-দান করিয়াছিলেন। তদনুসারে সংবাদ পত্রাদিতে টাউনহলে সভা হইবে বলিয়া ঘোষণা করা হয়। বলা বাহুল্য, যে উদ্দেশ্যে সভা হইবে, তাহা সুরেন্দ্র বাবুর পত্রে অতি স্পষ্টভাষায় খুলিয়া লেখা হইয়াছিল। এলেন সাহেব তখন উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিয়া সভার অধিবেশনের অব্যবহিত পূর্ব্বে অর্থাৎ ১২ই ফেব্রুয়ারি সোমবারে মতের পরিবর্তন করিলেন; তিনি উক্ত সোমবারে সুরেন্দ্র বাবুকে যে পত্র পাঠাইয়াছিলেন, তাহা এস্থলে উদ্ধৃত হইল—
MY DEAR SIR,
When you asked me for permission to hold a meeting at the Town Hall to express sympathy with the sufferers in the cause of Swadeshi, I did not clearly understand the object of your meeting. I now learn that you intend to express sympathy with persons who have been convicted for offences committed in connection with the boycott agitation. I certainly do not consider that the Town Hall is the proper place for a demonstration of this character and I regret that I must revoke my sanction to the use of the Town Hall for this purpose.
C ALLEN
অর্থাৎ এলেন সাহেব বলিয়াছেন যে, প্রথমবার সম্মতিদানের সময় তিনি, যে উদ্দেশ্যে সভা করা হইবে, তাহা ঠিক বুঝিতে পারেন নাই। কিন্তু পরে বিশেষ বিবেচনা করিয়া তিনি বুঝিয়াছেন যে, বিলাতী বর্জ্জন ব্যাপারে যাহারা অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া আদালতে দণ্ডিত হইয়াছেন, তাঁহাদিগের প্রতি সম্মান প্রকাশের জন্য টাউন হলে সভার অধিবেশন করা হইবে। এই নিমিত্ত টাউন হল কোনক্রমেই দেওয়া উচিত বলিয়া আমি মনে করি না। এই বলিয়া চেয়ারম্যান মহাশয় টাউন হলে সভার জন্য স্থানদান করিবার পূর্ব্ব প্রদত্ত অনুমতির প্রত্যাহার করিলেন।
টাউনহল পাওয়া যাইবেনা, অধিবেশনের দুই দিন পূর্ব্বে এই কথা শ্রবণগোচর হইল; সেই দুই দিনের মধ্যে আয়োজন করিয়া অন্যত্র সভা করিতে হইল, ইহা কীদৃশ শ্রম, ব্যয় ও কষ্টসাপেক্ষ তাহা ভুক্তভোগী ভিন্ন অন্যে বুঝিতে পারবেন না। কত হ্যাণ্ডবিল, প্লেকার্ড নষ্ট হইল, পুনশ্চ মুদ্রাঙ্কন হইল না, পরিশেষে একজন দয়ালু হিন্দুস্থানী মহাজনের অনুগ্রহে স্থান-লাভ ঘটিলেও কি কষ্টে সেই স্থান সুসজ্জিত করিতে হইয়াছিল, তাহা সকলে জানেন না। পূর্ব্বে এই বাটীতে থিয়েটার হইত, কয়েক মাস পূর্ব্বে তাহা বন্ধ হইয়া যাওয়ায় স্থানটি অব্যবহার্য্য হইয়া উঠিয়াছিল; গ্যাস কাটা, বৈদ্যুতিক আলোক বন্ধ, বসিবার আসন নাই, স্থানটি ধূলিরাশি সমাকীর্ণ, কত কষ্টে তাহা পরিস্কৃত করিতে হইয়াছিল তাহা অন্যে বুঝিবে না।
ইহার উপর পুলিশ কমিশনার মহাশয়ের ভয় হইয়াছিল ছাত্রেরা “লাঠী” প্রভৃতি ভয়ঙ্কর অস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া দাঙ্গা হাঙ্গামা করিবে! দাঙ্গা হাঙ্গামার উদ্বেগ-প্রকাশক পত্র পাঠ করিয়া আমরা হাস্যসংবরণ করিতে পারি নাই।
এ ত গেল এক পর্ব্ব। তাহার পর মিউনিসিপাল আফিসের কত্তৃপক্ষগণ টাউনহলে যে সভা হয় নাই, সেই সভার আলোক, পাহারা, ফরাস প্রভৃতির হিসাব দাখিল করিয়া আমাদিগের নিকট হইতে ৬৩ টাকা চাহিয়াছেন। তাহাদিগের মূলপত্র এইঃ– No. 1244.9 M.
MUNICIPAL OFFICE
,
Calcutta, the 14th February 1906,
Re: Engagement of the Town Hall for a Public Meeting on 14th February 1906. Dear Sir,
In continuation of my letter No, 11979 M, dated the 6th February 1906, I write to ask you to kindly remit Rs. 63 to meet the undernoted charges –
| Provisional cost for gas… | RS. | 30 |
| Lighting charges… | RS. | 5 |
| Police Attendance… | RS. | 8 |
| Total | Rs. | 63 only, |
The amount mentioned in item (1) will be adjusted in accordance with the actual consumption of gas and the balance if any refunded to you.
(Illegible)
for Secy, to the Corporation,
ইহাতেও শেষ হয় নাই। টাউনহল হইতে চেয়ার ভাড়ার জন্য আরও ৪১ টাকার দাবীতে একজন ইনস্পেক্টর তাগাদা করেন তাহারও উত্তর দেওয় হইয়াছে।
গ্রাণ্ড থিয়েটারে বিরাট সভা
১৪ই ফেব্রুয়ারী (১৯০৬ সালে) ২রা ফাল্গুন বুধবার অপরাহ্ল কালে গ্র্যাণ্ড থিয়েটারে, স্বদেশী আন্দোলন উপলক্ষে, রাজপুরুষ দিগের দ্বারা লাঞ্ছিত মহোদয়গণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিবার জন্য একটি বিরাট সভার অধিবেশন হইয়াছিল। সভার সময় মুষলধারে বৃষ্টিপাত হইলেও জনতা এত অধিক হইয়াছিল যে, অনেককেই স্থানাভাবে ফিরিয়া যাইতে হয়। রঙ্গালয়ের মধ্যে এত লোক হইয়াছিল যে, তিল ধারণের স্থান ছিল না বলিলে অত্যুক্তি হয় না। স্বদেশসেবা ব্রতে আগ্রহ নিবন্ধন এই লাঞ্ছিত মহাত্মাদিগকে দেখিবার জন্য লোকে যে প্রকার ঔৎসুক্য প্রকাশ করিয়াছিল, তাহা বর্ণনাতীত। যখন লাঞ্ছিত ভদ্রলোকেরা রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত হইলেন, তখন বন্দমাতরম্ ধ্বনিতে রঙ্গালয়টি পুন: পুনঃ প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। কলিকাতার সকল শ্রেণীর ও সকল সম্প্রদায়ের লোকই এই সভার কার্য্যে যোগদান করিয়াছিলেন।
সভাপতি নরেন্দ্র নাথ সেনের বক্তৃতা
প্রবীণ দেশহিতৈষী, সুপ্রসিদ্ধ মিরার সম্পাদক বাবু নবেন্দ্র নাথ সেন সভাপতির আসন গ্রহণ পূর্বক যে সারগর্ভ বক্তৃতা পাঠ করেন, তাহা এইরূপঃ—
Gentlemen,—We have met here this evening to honour those gentlemen who have suffered for the Swadeshi cause, and it is superfluous for me to say that in honouring them, we are honour- ing ourselves as a nation. The occasion is a unique one, for this is the first time in the history of modern India that the nation has been called upon to honour people who have suffered for the country’s cause The event marks a new era in the history of our country, and heralds a new destiny for our countrymen. No nation need despair of its future that counts in its ranks men who are ready to suffer for their Motherland.
These gentlemen, whom we see before us, are the sufferers for the Swadeshi cause. They have suffered first for a just and righteous cause, and our sympathy naturally goes out to them. But I may be permitted to say, that their sufferings, however great, are nothing compared with what the people of Ireland, Russia and China have suffered, and are suffering still. Through her patient suffering, Ireland is about to realise her long-cherished aspiration for Home Rule. Through her suffering, Russia has wrung not a few concessions from the Autocratic Czar. Through her suffering China too, with the aid of the Reform Party, has emerged from her stagnant national life. Suffering constitutes the best and greatest sacrifice and no cause has ever been won without it. Our people are yet at the beginning of the struggle and they must be prepared for greater sacrifices than they have yet undergone. Let them fight the battle manfully, undeterred by any difficulties which they may find in their way.
Gentlemen, what strikes me as peculiar is that in such a cause as Swadeshi anybody should have to suffer persecution from a progressive and enlightened Government like the British Government. We know that Lord Curzon when in India posed himself as an apostle of Swadeshi. The Swadeshi Gospel is preached by all the advanced nations of the West, and by none so eloquently as the school of politicians in England who follow the Chamberlain flag. But the dullest amongst us can see that Government is bitterly opposed to that Swadeshi movement, and is determined to put it down by force. At the beginning, the attempt to suppress the movement was a veiled one. The veil has since been thrown aside, and an open crusade is now being waged against the movement all over the country. Why so, we cannot understand. Is not the Swadeshi movement beneficial both to Indians and Anglo-Indians? We do not refuse to use articles of English manufacture. All we want is that the articles of our use may be produced in the country by whom it does not matter. The term “Swadeshi’’ is sufficiently elastic to include products of Indian as well as Anglo-Indian enterprise provided only that in the latter case as in the former the capital and labour are employed in India. In this view, the Anglo-Indian planter and miner are as much Swadeshists as the Indian tiller of the soil. It is reported that the Government of India have in contemplation the issue of orders for the extended purchase of articles manufactured in this country for Government stores. It not this an encouragement of the Swadeshi moveinent? If our rulers had acted in conformity with their declarations, our people would not have been victims of unmerited persecution in connection with the Swadeshi movement. In the new Province, I regret to Say, the policy of our rulers has been one of stern repression. But gentlemen, history teaches the great lesson that repression is never successful in checking the tide of national progress, nor marring any good and righteous work which a nation takes upon itself to accomplish. For every act of repression, there is a martyr and it is martyrdom that strengthens the foundation of a national movement. In spite of repression and persecution we see to day the watch-fires of Swadeshi burning in every city, every town and every village in the country,—we see not one or two here and there, but hundreds patiently suffering for the national cause, Martyrdom has sanctified Swadeshi,—it has stamped the movement with a glorified halo. And I make bold to say that so long as this policy of repression lasts, the Swadeshi cause will spread and prosper with increasing vigour.
Gentlemen, I must not be understood, in all that I have said, to mean that the methods, employed in advancing the Swadeshi cause have been invariably right. My point is that the Government has mistaken the true end and scope of the movement. The stand taken by Swadeshi is one of defence not defiance. All the more we regret the attitude of the Government in view of the fact that it is now generally acknowledged in Anglo-Indian circles, that a new national sentiment as the product of English education has sprung up among the people of this country. Swadeshi is the result of that Sentiment. Why then should the ruling race keep away from the movement, as if it were designed for unlawful and sinister purposes? I ventur to think that Swadeshi furnishes the exact basis on which an entente cordiale may be established between Indians and Anglo-Indians. May we hope that our non-official Anglo-Indian brethren will approach the subject in a rational spirit, and make common cause with the childred of the soil in furthering a movement which is calculated to promote the material interests of both alike? As regards Government, I can only say that it is pursuing and altogether mistaken policy in regard to the movement.
Among the gentlement whom we see before us to-day may 1 mention in particular, without meaning to make my invidious distinction, the name of Babu Aswini Kumar Dutt of Barisal than whom there are few sincere, self-sacrificing patriots known in all Bengal both old and new. I am told Babu Aswini Kumar has left Calcutta and is not with us this evening. However, I say again that in honouring all these gentlemen who have suffered for the Swadeshi cause, we are honouring ourselves as a nation. To all workers for our dear Motherland. I would say: Have patience. India’s struggles, however great are not greater than those of Ireland and Russia. Sacrifice is the true test of of patriotism. There con be no progress without struggle and suffering. Go on working with trust in Providence, and you will soon reach the goal which you seek, I need only remind you of what the poet says:—
Courage yet, my brother or my sister.
Keep on—Liberty is to be subserved whatever occurs;
That is nothing that is quell’d by one or two failures, or any number of failures.
Or by the indifference or ingratitude of the people, or by any unfaithfulness.
Or the show of the tushes of powers, soldiers, cannon, penal statutes.
What we believe in waits latent for ever through all the continents.
Invites no one, promises nothing, sits in calmness and light, is positive and composed, knows no discouragement.
Waiting patiently, waiting its time.
বাঙ্গালায় ইহার মর্ম্ম এই—যে সকল ভদ্রলোক স্বদেশের মঙ্গল সাধন করিতে গিয়া রাজপুরুষদিগের হস্তে লাঞ্ছিত হইয়াছেন, তাঁহাদিগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থ আজি আমরা এই সভাস্থলে সমবেত হইয়াছি। তাঁহাদিগের প্রতি সম্মান প্রকাশ করিয়া আমরা যে সমগ্র বাঙ্গালীজাতিকে সম্মানিত করিতেছি, একথা বলাই বাহুল্য। আজিকার ঘটনা অভূতপূর্ব্ব। যাঁহারা স্বদেশের কল্যাণ-সাধন-কল্পে নিগ্রহ ভোগ করিতেছেন, তাঁহাদিগের প্রতি সম্মান প্রকাশ করিবার জন্য সমগ্র জাতিকে কেহ আর ইতঃপূর্ব্বে আহবান করে নাই। আজিকার এই ঘটনা আমাদিগের জাতীয় ইতিহাসে নুতন যুগারম্ভের নির্দ্দেশ করিতেছে এবং সমগ্র বাঙ্গালী জাতির অভিনব ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ঘোষণা করিতেছে। যে জাতি স্বদেশহিতব্রতে উৎসর্গীকৃতপ্রাণ ব্যক্তিদিগকে সম্মান প্রদর্শন করিতে শিখিয়াছে, তাহাদিগের ভবিষ্যৎ ভাবিয়া হতাশ হইবার কোন কারণ নাই।
যে সকল ভদ্রলোক আজ আমাদিগের সম্মুখে সমাসীন রহিয়াছেন, ইহারাই সর্ব্বপ্রথমে স্বদেশী পণ্য প্রচলন মূলক আন্দোলন সূত্রে লাঞ্ছিত হইয়াছেন। ইহার অতি ন্যায়সঙ্গত ও পূণ্যময় ব্রত পালন করিতে গিয়াই নিগ্রহভোগ করিয়াছেন, এইজন্য ইহারা আমাদিগের আন্তরিক সহানুভূতিভাজন হইয়াছেন। কিন্তু স্বদেশের মঙ্গলের জন্য ইহারা যে লাঞ্ছনাভোগ করিয়াছেন আয়র্লণ্ড রুষিয়া ও চীনের স্বদেশভক্তদিগের নিগ্রহের তুলনায় তাহা কিছুই নহে। আয়র্লণ্ডবাসীরা নানা নিগ্রহভোগের পর এক্ষণে তাঁহাদিগের চির বাঞ্ছিত স্বায়ত্তশাসনলাভের পথে বহুদূর অগ্রসর হইয়াছেন। রুষিয়ার অধিবাসিবুন্দ বহু নির্য্যতন সহ্য করিয়া রুষিয়ার যথেচ্ছাচারপরায়ণ সম্রাটের নিকট অল্প স্বত্ব ও অধিকার লাভ করেন নাই। বিবিধ লাঞ্ছনাভোগ করিয়া সংস্কারক সম্প্রদায়ের সহায়তায় চীনের অধিবাসীরা এক্ষণে উন্নতিপথে প্রবেশ করিয়াছেন, চীনে এক্ষণে নূতন জাতীয় জীবনের সঞ্চার হইয়াছে। স্বদেশের জন্য নিগ্রহভোগ আত্মত্যাগের উৎকৃষ্ট ও উচ্চ উদাহরণ। এবংবিধ আত্মত্যাগ ব্যতীত কোন মহৎ কার্য্যই সুসম্পন্ন হয় না। আমাদিগের স্বদেশবাসিগণ এই সর্ব্ব প্রথম স্বদেশের জন্য সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তাঁহাদিগকে ভবিষ্যতে এতদপেক্ষা বহুগুণ নিগ্রহভোগ এবং আত্মত্যাগ করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে। সংকল্প সাধনে যতই বিঘ্ন উপস্থিত হউক না কেন তাঁহাদিগকে মনুষোচিত দৃঢ়তা সহকারে পণ রক্ষার্থ চেষ্টা করিতে হইবে।
স্বদেশের শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি-সাধন করিতে গিয়া লোকে যে বৃটিশ গবর্ণমেণ্টের ন্যায় সুসভ্য ও উন্নতিশীল গবর্ণমেণ্টের হস্তে নিগৃহীত হইয়াছে, ইহাই আমার নিকট সর্ব্বাপেক্ষ বিচিত্র ব্যাপার বলিয়া বোধ হয়; নূতন প্রদেশের শাসনকর্ত্তারা, নিদারুণ জন নিগ্রহকেই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ শাসননীতি রূপে গ্রহণ করিয়াছেন, ইহা অতীব দুঃখের বিষয়। কিন্তু কেবল নির্য্যাতন যে কোন জাতির উন্নতির স্রোত প্রতিরুদ্ধ হয় না, জাতীয় সাধু অনুষ্ঠান বিঘ্নবিহত হয় না, ইতিহাসই তাহার সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। রাজপুরুষের প্রজাবৃন্দের উন্নতিস্রোতে বাধা দিবার জন্য চেষ্টা করিলেই এক একজন স্বদেশেভক্ত লোক স্বদেশের মঙ্গলের জন্য নিজ ইচ্ছায় রাজার হস্তে নির্য্যাতন সহ্য করেন―ফলে স্বদেশের হিতকর অনুষ্ঠানাদি আরও বদ্ধমূল হইয়া উঠে। রাজার উৎপীড়ন ও অত্যাচার সত্ত্বেও আজি দেশের প্রত্যেক নগর ও পল্লীতে স্বদেশী পণ্যের প্রচলনকল্পে লোকের উৎসাহবহ্নি উজ্জল আলোক বিকীর্ণ করিতেছে। এক আধ জন নহে―শত শত ব্যক্তি স্বদেশের মঙ্গলসাধনের জন্য অম্নলাবদনে নিগ্রহভোগ করিতেছেন। স্বদেশভক্তের আত্মত্যাগ স্বদেশব্রতকে পুণ্যময় এবং গৌরবে উদ্ভাসিত করিয়াছে। আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতেছি, রাজপুষেরা স্বদেশী আন্দোলনের দমনকল্পে জননিগ্রহে যতই আগ্রহ প্রকাশ করুন না―এ আন্দোলনের স্রোত কিছুই হ্রাস পাইবে না, বরং উত্তরোত্তর ইহার শক্তি ও প্রসার বর্ধিত হইবে।
অতঃপর বক্তা স্বদেশী আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গবর্ণমেণ্টের স্বদেশী আন্দোলন দমনমূলক নিন্দনীয় নীতি সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া স্বদেশভক্তদিগকে ধৈর্য্যশালী হইতে উপদেশ প্রদান করেন। তিনি বলেন, আত্মোৎসর্গই স্বদেশ ভক্তির প্রকৃত পরীক্ষা। সংঘর্ষ ও লাঞ্ছনা ব্যতীত উন্নতিলাভ সম্ভবপর নহে। সকলে ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া কার্য্য করিতে থাকুন, অচিরে আমরা বাঞ্ছিতফল লাভে সমর্থ হইব।
সভাপতির বক্তৃতা শেষ হইলে ভবানীপুরের স্বদেশসেবক সম্প্রদায় “বন্দেমাতরম্” সঙ্গীত গান করিলেন। সভাস্থ সকলে বহুবার “বন্দেমাতরম্” শব্দ উচ্চারণ করিলে অভ্যর্থনা, সমিতির সম্পাদক শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ সভায় অনুপস্থিত কতিপয় স্বদেশ-হিতৈষীর নিকট হইতে প্রাপ্ত পত্র ও তারের সংবাদ পাঠ করিতে আদিষ্ট হইলেন।
তন্মধ্যে ঢাকা পিপলস্ এসোসিয়েশনের পত্র ও শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একখানি পত্র এই স্থানে প্রকাশিত হইল।
The Dacca People’s Association hereby express their feeling of hearty sympathy with the object of the public meeting to be held on the 14th Instant at the Town Hall to honour the Gentlemen who have suffered in the “Swadeshi Cause”.
| Dacca |
I have the honour to be
|
| The 10-2-06. |
Sir,
|
|
Your most obedient servant
|
|
|
Rajaninath Bose,
|
|
|
Secy, to the People’s Association.
|
রবীন্দ্র নাথের পত্র
বাংলা দেশের বর্ত্তমান স্বদেশী আন্দোলনে কুপিত রাজদণ্ড যাঁহাদিগকে পীড়িত করিয়াছে তাহাদের প্রতি আমার নিবেদন এই যে, তাহাদের বেদন যখন আজ সমস্ত বাংলা দেশ হৃদয়ের মধ্যে বহন করিয়া লইয়াছেন, তখন এই বেদন অমৃতে পরিণত হইয়া তাঁহাদিগকে অমর করিয়া তুলিয়াছে; রাজচক্রের ষে অপমান তাঁহাদের অভিমুখে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল মাতৃভূমির করুণ করম্পর্শে তাহা বরমাল্য রূপ ধারণ করিয়া তাঁহাদের ললাটকে আজ ভূষিত করিয়াছে। যাহারা মহাব্রত গ্রহণ করিয়া থাকেন বিধাতা জগৎসমক্ষে তাহদের অগ্নি-পরীক্ষা করাইয়া সেই ব্রতের মহত্বকে উজ্জল করিয়া প্রকাশ করেন—অন্য কঠিন ব্রতনিষ্ঠ বঙ্গভূমির প্রতিনিধি স্বরূপ যে কয়জন এই দুঃসহ অগ্নিপরীক্ষার জন্য বিধাতা কর্তৃক বিশেষ রূপে নির্ব্বাচিত হইয়াছেন তাঁহারা ধন্য, তাঁহাদের জীবন সার্থক। রাজরোষরক্ত-অগ্নিশিখা তাঁহাদের জীবনের ইতিহাসে লেশমাত্র কালিমার সঞ্চার না করিয়া বার বার সুবর্ণ অক্ষরে লিখিয়া দিয়াছে।
বন্দেমাতরম্।
২রা ফাল্গুন ১৩১২।
শ্রীরবীন্দ্র নাথ ঠাকুর।
সুরেন্দ্র নাথের বক্তৃতা
অনন্তর বাবু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাহার স্বভাবসিদ্ধ ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা করেন। সুরেন্দ্রবাবুর মূল বক্তৃতা এই স্থলে উদ্ধৃত হইল:— Sir,— we are assembled here to-night to perform what I, for one, regard as a solemn patriotic duty and, in respect of which, I will add that we are not to be deterred therefrom by the frowns or the smiles of power. I think, Sir, our countrymen have proved, by the hard logic of facts which have transpired within the last few months, that the Bengali of to-day is a very different personage from the Bengali as he is represented to be by historians, more anxious to round off their sonorons periods than to tell the real and veritable truth. Our countrymen have proved and the martyrs, whom we are about to honour to-day, have had a large share in it, our countrymen have proved by their sufferings that repression will not daunt them. We have read the lessons of history and we have read in a book, which we highly prize, that the blood of the martyrs is the cement of the Church. Our cause, consecrated by the sufferings of our youngmen, will grow in stregth and vitality as the years roll on. We have heard the story of the young men of Mymensing. They were sent to the lock-up in connection with some Swadeshi incident. As soon as they found themselves within their prison cells, they made the prison walls resound with the echoes of their patriotic songs. The hearts of the jailers were touched, for after all they are human. They brought them food which they declined to partake of. The terrors of the law will not indeed daunt us. We have cheerfully submitted to the stroke of the whip. With equal alacrity have we suffered the rigours of imprisonment; and now are gathered together in this hall to declare to the world that those, who have suffered for their devotion to the Swadeshi cause, have not been degraded in our estimation but that on the contrary, their punishments have enhanced the public respect which is felt for them and have won for them a high place in our affectionate regard. It is not indeed possible for us to reverse the decrees of our rulers. We are impotent our voice and our vote count for nothing in the counsels of the Empire. But, in our social and domestic concerns, we are still all powerful. Here we permit no intrusion of any kind on the part of any one. Here, in this domain which is exclusively reserved for us, we say. “Hands off – this is our affair and not yours.” If we cannot reverse the decrees of our rulers, we can, at any rate, guide and control the public mind of Bengal. If we cannot modify the punishments which have been inflicted, we can, at any rate, neutralize their effect upon public opinion. If the object of punishment be to deter by degrading, we say that those who have suffered in the Swadeshi cause shall not be degraded. If the object of punishment be to deter by the infliction of pain, we say that pain cheerfully borne is no deterrent, and pain is cheerfully borne when the plaudits of the whole community and the mandate of an approving conscience follow the infliction. It has been asked whether it is constitutional to hold a demonstration such as this, and if constitutional, whether it is wise and expedient? I venture to answer both these questions in the affirmative. The authorities of the State hold their powers as a trust for the public good. The public are their masters and they are truly public servants—not in a figurative, but in a higher and literal, sense. The public have therefore every right to sit in judgement on their conduct. They do so every day in connection with executive orders. The same principle applies to judicial decisions. Our Anglo-Indian fellow-citizens have set an excellent example to us in this respect. You know what they do when they believe that any of their community has been wrongly punished by a court of law. They agitate, and agitate and never cease to agitate until they have obtained some sort of redress, You know what they did in connection with the Bain case. Even after the accused had been discharged by the High Court, they submitted a protest to Government, with a view to prevent a recurrence of proceeding such as those which had formed the subject matter of their complaint. We are, therefore, quite within our rights in holding this demonstration. But is it wise and consistent with prudence and considerations of expediency I confess this is, a question somewhat more difficult and complicated. But I ask—is it possible to overlook the moral significance and the educative value of a demonstration like this? If the political and moral education of the people be a supreme factor in the evolution of national life, then I venture to hold that the demonstration of to-day is abundantly justified. It might be said that a meeting like the present will still further irritate our rulers. I fear it is too late in the day to bring forward an argument of this kind. We have been offending our rulers rather too frequently in recent years. The Indian National Congress is a huge offence. The smaller Provincial Couferences are so many offences on a somewhat reduced scale. Our political agitations are a perennial source of irritation. The agitation against the partition of Bengal is cordially detested as implying a perverse determination, on our part, not to accept what is regarded as an accomplished fact. I ask you—are you prepared to give up the Congress, to close your Conferences, to abandon political agitation and to accept the partition of Bengal and go down on your knees and invoke the blessing of Almighty Providence on your rulers for the boon which they have thrust upon you against your wishes and which, forsooth, you in your folly, are not able or are unwilling to appreciate! I fear, you are not prepared to do anything of the sort. I fear, it is too late in the day to discuss the question of pleasing or displeasing the authorities. We cannot hunt with the bounds, and run with the hare. We cannot serve both God and Mammon. For my part, as one going down the vale of years, I will say this, that I have made my choice—definite, clear and pronounced Have you made yours? I ask you whether you have decided to serve God or Mammon; whether you will consecrate yourselves to the service of your country or the furtherance of your personal self-aggrandisement? Let there go forth a spontaneous outburst of expression from this great gathering that we, who are assembled here, are resolved to live and die for the Swadeshi cause. The line of cleavage between the rulers and the ruled is becoming wider day by day. I ask—who is responsible for it? God knows that that awful burden does not rest upon our heads. Our rulers are responsible. Those who misapprehned the situation and who coming from the wilds of the Central Provinees, misunderstand the termper and character of the people of Bengal are accountable for the unhappy tension and excitement which prevail throughout these provinces. They seek to repress, where the sovereign remedy is conciliation. They seek to quench the flame by the application of force, and the flame blazes forth with redoubled fury. But whatever may be the defects of our rulers—and there has been a distinct deterioration in their qualities—our course of duty is plain and simple, namely to serve our country with unflinching devotion to her interest and to the cause of constitutional agitation which we are resolved to uphold. You, gentlemen, have by your sufferings set up a noble example, and it is because we mean to profit by that example that we are here tonight. We desire to record a vote of confidence in your favour—not in your interest, but in our own—we want to declare to the world that your punishments have not degraded you, that punishments cheerfully borne in the country’s cause, never degrade any one, but they are the passports to public honour and popular applause and affection and to the affection and gratitude of the country. Martyrs in our cause, go forth from this hall impressed with the conviction that in honouring you we proclaim to the world our firm determination to honour the future martyrs of our race. You are among the first of the glorious band. I am sure, you will not be the last. But whether first or last, in your sufferings you had our sympathies and now in the hour of your triumph you enjoy, in an unstinted measure, the blessings of your fellow countrymen. In honouring the martyrs, however let us not forget the cause for which they have suffered. I ask you to rise from your places and cry out Bande Mataram.
(At this the whole meeting rose to a man and there was a loud and prolonged shouting of Bande Mataram.)
Continuing, the speaker said:—Renew the Swadeshi vow—the solemn vow—before you go, that you will abstain, as far as in your power lies, from purchasing and using foreign goods, and that you will, to the best of your powers, use and purchase home made and indigenous articles. Will you take this vow in the presence of God and man?
Loud and prolonged cries of Bande Mataram.
সুরেন্দ্র বাবুর বক্তৃতা।
(মর্ম্মানুবাদ)
আমরা অদ্য যে অভিপ্রায়ে এই সভাস্থলে সমবেত হইয়াছি তাহা অতীব মহান্ এবং দেশের পক্ষে অশেষ কল্যাণের আকর। আমরা শক্তিমানদিগের নিগ্রহ বা অনুগ্রহের ভয়ে কোনক্রমেই এই কর্ত্তব্যপথ হইতে বিচলিত হইতে পারি না। গত কয়েক মাসের মধ্যে প্রকৃত কার্য্যক্ষেত্রে আমাদিগের দেশের লোকে অবলীলাক্রমে প্রতিপন্ন করিয়াছেন যে, যে ঐতিহাসিকেরা সরল সরল সত্যের আবৃত্তি অপেক্ষা কল্পনাময় ললিত-পদ-বিন্যাসে সমধিক অনুরাগী সেই সকল লেখকের বর্ণিত বাঙ্গালী এবং এখনকার বাঙ্গালী এই উভয়ের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়।
আমাদিগের দেশের লোকে প্রতিপন্ন করিয়াছেন, বিশেষতঃ অদ্য যে সকল লাঞ্ছিত মহোদয়কে সম্মানিত করিতেছি তাঁহারা দেখাইয়াছেন, যে নির্য্যাতনে তাঁহারা ভীত হইবার পাত্র নহেন। আমরা ইতিহাসের উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করিয়াছি, সম্মান-যোগ্য পাশ্চাত্য গ্রন্থেই পাঠ করিয়াছি যে সর্ব্বত্রই ভক্তদিগের রক্তে ধর্ম্মের ভিত্তিমূল দৃঢ়তর হইয়াছে। আমাদিগের যুবকসম্প্রদায়ের কষ্টসহিষ্ণুতায় আমাদিগের মহান্ উদ্দেশ্য দিন দিন অধিকতর শক্তি সংগ্রহ করিয়া পরিপুষ্ট ও পরিবদ্ধিত হইতে থাকিবে। ময়মনসিংহের যুবকদিগের কথা আমরা সকলেই শুনিয়াছি, স্বদেশী ব্যাপারের সংশ্রবে তাহারা অবরুদ্ধ হইয়াছিল, কারাগৃহে প্রবেশ করিয়াই তাহারা দেশানুরাগপ্রকাশক সঙ্গীতের ধ্বনিতে চারিদিক প্রতিধ্বনিত করিয়াছিল। কারারক্ষকদিগের হৃদয় গলিয়া গেল, তাহারা ত মানুষ;তাহার খাদ্য আনিয়া দিল কিন্তু যুবকেরা হাজতে আনীত খাদ্য পরিগ্রহণ করিল না। রাজবিধানের বিভীষিকা আমাদিগকে কখনই বিচলিত করিবে না। আমরা অম্লান বদনে বেত্রদণ্ডের আঘাত সহ্য করিয়াছি, অবিচলিত চিত্তে কারাগারে গমন করিয়াছি, এবং এক্ষণে এই সভাক্ষেত্রে সমবেত হইয়া সমগ্র জগৎকে দেখাইতেছি যে যাহার স্বদেশী আন্দোলনের সংশ্রবে নির্য্যাতন ভোগ করিয়াছেন তাঁহারা আমাদিগের নিকটে কোন ক্রমেই সম্মানভ্রষ্ট বা গৌরবহীন হন নাই। বরং তাঁহাদিগের লাঞ্ছনা ভোগে সাধারণের নিকট তাঁহাদিগের সম্মান বৃদ্ধি হইয়াছে এবং তাঁহারা সাধারণের অধিকতর অনুরাগের পাত্র ও শ্রদ্ধাভাজন হইয়া লোকের হৃদয়ে উচ্চতর স্থান অধিকার করিয়াছেন।
রাজাদেশের প্রত্যাহার করা আমাদিগের পক্ষে সম্ভব নহে। আমরা অশক্ত, আমাদিগের উক্তি, আমাদিগের মত, রাজ্য পরিচালন কালে গণনার যোগ্য বিবেচিত হয় না। কিন্তু আমাদিগের সামাজিক ও গার্হস্থ্য ব্যাপারে আমরা এখনও সম্পূর্ণ শক্তিসমন্বিত। সেখানে আমরা অপর কাহাকেও হস্তক্ষেপ করিতে দিইনা। সে রাজ্য আমাদিগের, তথায় অনধিকারীদিগকে আমরা অনায়াসে অপসারিত করিয়া দিতে পারি, বলিতে পারি সরিয়া যাও এ আমাদিগের বিষয়, তোমাদিগের আলোচ্য নহে। রাজদেশের ব্যতিক্রম সংঘটন আমাদিগের অসাধ্য হইলেও বঙ্গের জন সাধারণের মনোরাজ্যে আমরা শাসনকর্ত্তা ও পরিচালক রূপে প্রতিভাত হইতে পারি। আমরা রাজদণ্ডের অন্যথা করিতে না পারিলেও তাহাতে যেন সমাজের মত পরিবর্ত্তিত না হয়, এরূপ ব্যবস্থা করিতে পারি। লোকের নিকট অবজ্ঞাত করা যদি দণ্ড প্রয়োগের উদ্দেশ্য হয়, যাহারা স্বদেশী আন্দোলনের সংস্পর্শে দণ্ডিত তাহারা অবজ্ঞাত হইবে না এই স্থির করিয়া আমরা সেই উদেশ্য ব্যর্থ করিতে পারি। যদি কষ্ট দিয়া কার্য্য রহিত করা দণ্ড প্রয়োগের উদ্দেশ্য হয়, আমরা মনে করিব প্রফুল্লচিত্তে যে কষ্ট সহ্য করা যায় তাহা কার্য্যের প্রতিরোধক নহে। দণ্ড সহিলে মনে অসন্তোষ জন্মে না, সমগ্র সমাজের প্রশংসা ও সমাদর লাভ হয় এবং বিবেকের বিচারে আত্মপ্রসাদ জন্মে, সেই দণ্ড অম্লান বদনে সহ্য করা যায়।
প্রশ্ন উঠিয়াছে, এরূপ সম্মানার্থ সভা করা ব্যবস্থাবিরোধী কি না, এবং ব্যবস্থাবিরোধী না হইলেও যুক্তিসিদ্ধ কিনা? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি ইহা ব্যবস্থাসঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত। সাধারণের হিতার্থই রাজ্যশাসন। প্রত্যেক রাজকর্ম্মচারী সাধারণের ভৃত্য, তাহাদিগের শক্তি প্রজার মঙ্গলার্থ তাহাদিগের হস্তে ন্যস্ত রহিয়াছে। তাহারা সাধারণের সেবক (সরকারী চাকর) ইহা উক্তি মাত্র নহে প্রকৃত প্রস্তাবেই তাহারা জনসাধারণের ভৃত্য। সুতরাং তাহাদিগের কার্য্য কলাপের সমালোচনায় সাধারণের সম্পূর্ণ অধিকার আছে। শাসন বিভাগের অনুমতি সম্বন্ধে প্রত্যহই লোকে সমালোচনা করিয়া থাকে। আদালতের মীমাংসা সম্বন্ধেও এই নিয়ম অনুসৃত হয়। এ বিষয়ে এ দেশের “এংগ্লো ইণ্ডিয়ান্” সম্প্রদায় আমাদিগকে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত দেখাইয়াছেন; আপনারা জানেন তাঁহাদিগের সম্প্রদায়ভুক্ত কোন ব্যক্তি রাজদ্বারে অবৈধ ভাবে দণ্ডিত হইয়াছেন বিশ্বাস হইলে তাঁহারা কি করেন? তাঁহারা পুনঃ পুনঃ আন্দোলন করেন, এবং যতক্ষণ পর্য্যন্ত কোন প্রকার প্রতিকার লাভ ন হয় ততক্ষণ আন্দোলনে বিরত হন না। “বেইনকেস” নামক প্রসিদ্ধ মামলায় তাঁহারা কি করিয়াছিলেন, তাহা আপনার অবগত আছেন। হাইকোর্টে আসামী অব্যাহতি পাইবার পরেও তাঁহার কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করিয়া প্রার্থনা করেন যে ভবিষ্যতে বিচারের অভিনয় যেন আর না হয়। সুতরাং এই সম্মান প্রকাশের সভা করিয়া আমরা প্রজস্বত্বের ব্যতিক্রম করি নাই, বরং এরূপ করায় আমাদিগের শাস্তিপ্রিয়তা ও কর্ত্তব্যের উপলব্ধিই প্রকাশ পাইতেছে। কিন্তু আমাদিগের বর্ত্তমান অবস্থায় এরূপ অনুষ্ঠান কি স্ববুদ্ধির পরিচায়ক ও যুক্তিসঙ্গত? আমি স্বীকার করি এবারকার সমস্যা অপেক্ষাকৃত জটিল ও কঠিন। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, এরূপ সম্মান সভার নীতিগত সুফল ও শিক্ষণবিধায়িনী শক্তি কি কোন অংশে উপেক্ষণীয়? জাতীয় জীবনের বিকাশে যদি রাজনীতিগত ও ধর্ম্মনীতিগত শিক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া স্বীকৃত হয়, তাহা হইলে আমি সাহস করিয়া বলিতে পারি যে, আদ্যকার সভার যথেষ্ট সার্থকতা আছে।
এরূপও বলা যাইতে পারে, যে ঈদৃশ সভায় রাজপুরুষদিগের আরও বিরক্তি বুদ্ধি হইবে। কিন্তু বোধ হয় এখন এরূপ তর্কের সময় আর নাই। আমরাত গত কয়েক বৎসর পদে পদেই রাজপুরুযদিগের নিকট অপরাধী হইতেছি। জাতীয় মহাসমিতির অনুষ্ঠান একটা ভয়ঙ্কর অপরাধ। ছোট ছোট প্রাদেশিক সমিতিগুলি বোধ হয় কিয়ৎ পরিমাণে লঘু অপরাধ। আমাদিগের রাজনীতিক আন্দোলনাদিও প্রভুদিগের চিরদিন বিরক্তির মূল। বঙ্গব্যবচ্ছেদ সম্বন্ধে আমাদিগের দেশব্যাপী প্রতিবাদ, আমাদিগের জঘন্য নিব্বন্ধাতিশয়ের নিদর্শন ও অনুষ্ঠিত বিভাগ স্বীকারে অবৈধ অপ্রবৃত্তি বলিয়া ঘৃণিত হয়। আমি জিজ্ঞাসা করি, আপনার কি জাতীয় মহাসমিতি বন্ধ করিবেন? প্রাদেশিক সমিতিগুলি পরিত্যাগ করিবেন, রাজনীতিচর্চ্চা পরিহার করিবেন? আপনারা কি বঙ্গব্যবচ্ছেদের আদেশ শিরোধার্য্য করিতে প্রস্তুত আছেন? এবং জানু অবনত করিয়া ভগবৎসমীপে রাজপুরুষদিগের মঙ্গল কামনা করিয়া আপনারা কি বলিবেন, যে মোহান্ধবশে যাহার উপকারিতা আপনারা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিতেছেন না, আপনা- দিগের ইচ্ছার প্রতিকূলে সেই-মহোপকার সাধনের জন্য আপনার বাধিত হইয়াছেন? আমার বোধ হয় আপনার কেহই এরূপ করিতে স্বীকৃত নহেন। রাজপুরুষেরা কিসে তুষ্ট হইবেন, কিসে রুষ্ট হইবেন, তাহার মুখাপেক্ষী হইবার সময় চলিয়া গিয়াছে। আমরা শিকারী কুকুরের সঙ্গে শিকার করিব ও পলায়নপর শশকের সহিত লুকাইবার চেষ্টা করিব, এই উভয়দিকে চলিতে পারিব না। আমবা জগদীশ্বর ও ধনেশ্বর উভয়ের সেবা করিতে পারি না। আমার জীবনের অধিত্যকাদেশ হইতে অবরোহণ কালে এই পর্য্যস্ত বলিতে পারি যে নির্দিষ্ট পরিস্কৃত ও স্পষ্টভাবে আমি আমার সঙ্কল্প স্থির করিয়াঠি। আপনারা কি আপনাদিগের ইতিকর্ত্তব্যতা নির্ণয় করিয়াছেন? আমি জিজ্ঞাসা করি, আপনারা জগদীশ্বরের সেবা করিবেন, না ধনেশ্বরের সেবা করিবেন? আপনার জন্মভূমির সেবায় জীবন সমর্পণ করিবেন, না ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির পন্থানুসরণ করিবেন? এই মহতী সভার কেন্দ্রস্থল হইতে প্রচার হউক যে এই স্থানে আমরা সমবেত হইয়া সত্যবদ্ধ হইতেছি স্বদেশী ব্যাপারের জন্য আমরা বাঁচিতে মরিতে প্রস্তুত রহিলাম। শাসিত ও শাসনকর্ত্তাদিগের মধ্যে বিচ্ছেদ-রেখা দিন দিন বিস্তারিত হইতেছে। ইহার জন্য দায়ী কে? জগদীশ্বর জানেন এই দায়িত্বের গুরুভার আমাদিগের শিরোপরি ন্যস্ত নছে, ইহার জন্য আমাদিগের শাসকবর্গই সম্পূর্ণ দায়ী। যাহার প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে পারেন না, মধ্যপ্রদেশের মহাবন হইতে সমাগত হইয়া যাঁহারা বাঙ্গালীর মনোভাব ও প্রকৃতি হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ নহেন, এই দেশব্যাপী শোচনীয় বিরোধ ও উত্তেজনার জন্য তাঁহারাই দায়ী। যেখানে মিলন ও সান্ত্বনায় কার্য্য হয় সেইখানে তাঁহার কঠোর দমন নীতির প্রয়োগ করিয়াছেন। তাঁহারা অগ্নিশিখা বলপ্রয়োগে নির্ব্বাপিত করিতে চেষ্টা করিয়াছেন, শিখা দ্বিগুণবেগে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু আমাদিগের রাজপুরুষদিগের দোষ যাহাই হউক না কেন, তাঁহদিগের গুণবত্তার যতই লাঘব ঘটিয়া থাকুক, আমাদিগের কর্ত্তব্য পথ সরল ও স্পষ্টই রহিয়াছে। দেশের সেবায় অবিচলিত চিত্তে নিযুক্ত হওয়া ও বিধিসঙ্গত উপায়ে আন্দোলনে প্রবৃত্ত থাকা আমাদিগের কর্ত্তব্য কার্য্য।
মহোদয়গণ! আপনারা লাঞ্ছনাভোগ করিয়া আমাদিগের সম্মুখে যে উচ্চ আদর্শ উপস্থাপিত করিয়াছেন সেই আদর্শে আমরা লাভবান্ হইব বলিয়া এস্থলে সমবেত হইয়াছি। আপনাদিগের উপর আমাদিগের আস্থা ও অনুরাগ আছে ইহা আপনাদিগের সম্মানার্থ নহে, আমাদিগের নিজেরই মঙ্গলার্থে লিপিবদ্ধ করিতেছি। আমরা সমস্ত জগৎসমক্ষে প্রকাশ করিতে চাহি যে আপনাদিগের উপর দণ্ডপ্রয়োগে আপনার অপদস্থ হন নাই, দেশের কল্যাণার্থ প্রফুল্লচিত্তে শাস্তি সহ্য করায় কাহারও গৌরব হানি হয় না বরং তাহাতে সাধারণের নিকট সম্মানবৃদ্ধি ও প্রশংসা লাভ হয়। এবং দেশের লোকের স্নেহ ও কৃতজ্ঞতা আকর্ষণ করে।
আমাদিগের পবিত্র ব্রতের নিমিত্ত লাঞ্ছিত মহোদয়গণ আপনাদিগের সম্মানে আমরা জগৎ সমক্ষে প্রচার করিতেছি যে আমাদিগের দেশের ভবিষ্যৎ লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত মহোদয়বর্গকে সম্মানিত করিতে আমরা কৃত সংকল্প হইয়াছি; সভাস্থল পরিত্যাগ কালে আপনারা এই ধারণা হৃদয়ে অঙ্কিত করিয়া যাইবেন। সেই গৌরবান্বিত মহাত্মাদিগের মধ্যে আপনারাই প্রথম ও অগ্রবর্ত্তী। আমি নিশ্চিত বলিতে পারি আপনারাই সর্ব্বশেষ বলিয়া পরিগণিত হইবেন না। পরন্তু, প্রথমই হউন আর শেষই হউন, নিশ্চয় জানিবেন আপনাদিগের লাঞ্ছনায় আমাদিগের প্রত্যেকের সহানুভূতি ছিল, এবং এক্ষণে আপনাদিগের বিজয় লাভের মাহেন্দ্রক্ষণে আপনার পর্য্যাপ্ত পরিমাণে সমগ্র স্বদেশ বাসীর আশীর্ব্বাদ লাভ করিতেছেন। লাঞ্ছিত দিগের প্রতি অনুরাগ প্রকাশের সময়ে যে ব্রতের জন্য তাঁহাদিগের লাঞ্ছনা ভোগ হইয়াছে সে কথা আমরা যেন ভুলিয়া না যাই। আমি আপনাদিগকে দণ্ডয়মান হইয়া “বন্দে মাতরম্” এই মহামন্ত্র উচ্চারণ করিতে বলিতেছি।
(সকলে দাঁড়াইয়া বার বার বন্দেমাতরম্ বলিলেন) প্রস্থানের পূর্ব্বে আপনার পুনর্ব্বার স্বদেশী প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হউন, সাধ্যমত বিদেশী দ্রব্যের বর্জন, স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার ও প্রচারে ব্রতী থাকিবেন এই মহতী প্রতিজ্ঞার পুনরাবৃত্তি করুন, মানবের সম্মুখে জগদীশ্বরের সম্মুখে এই গভীর সংকল্প দেদীপ্যমান রাখুন, ইহাই আমার বক্তব্য।
[চারিদিকে “বন্ধে মাতরম্” ধ্বনি উচ্চারিত হইতে লাগিল। বক্তা আসন গ্রহণ করিলে আবার জয়ধ্বনি হইতে লাগিল।]
উপহার প্রদান
সুরেন্দ্র বাবু বক্তৃতা শেষ করিয়া লাঞ্ছিত মহোদয়গণকে একে একে আহ্বানপূর্বক পদক, বন্দেমাতরম পরিদোলক বা লকেট, বন্ধনী ব্রুচ এবং প্রশংসাসূচক রুমাল প্রদান করিলেন। পদকগুলি রৌপ্য নির্ম্মিত; পদকে এবং প্রশংসা পত্রে লাঞ্ছিত দিগের নাম লিখিত ছিল। সুরেন্দ্র বাবু নাম ধরিয়া একে একে সকলকে আহবান পূর্ব্বক পুষ্পমাল্যে সুশোভিত করিলেন এবং অবশেষে গাঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ করিয়া তাঁহাদিগকে পদকাদি ও প্রশংসা সূচক রুমাল উপহার দিলেন।
যাহারা পদক, লকেট প্রভূতি উপহার প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহাদের মধ্যে অনেকেই সভায় উপস্থিত থাকিয়া সুরেন্দ্র বাবুর নিকট হইতে উপহার গ্রহণ করিয়া ছিলেন। যাহারা সভাস্থলে উপস্থিত হইতে পারেন নাই, তাঁহাদিগের নিমিত্ত প্রস্তুত পদকাদি সুবিধাক্রমে প্রেরিত হইবে এই মীমাংসান্তে তখন তুলিয়া রাখা হইল। প্রথমে সভার অধিবেশনস্থল সম্বন্ধে গোলযোগ ঘটায় সংবাদ আদান প্রদানের অনেক ব্যতিক্রম ঘটিয়াছিল। এমন কি শেষে জানা গেল অনেক লাঞ্ছিত ব্যক্তি আদৌ সংবাদ পান নাই। সহৃদয় মহাত্মার ক্রটি মার্জন করিবেন।
এই সময়ে “আমার যায় যাবে জীবন চলে, শুধু তোমার কাজে, জগৎ মাঝে, বন্দেমাতরম্ ব’লে’, এই সঙ্গীতটি ভবানীপুরের স্বদেশ সেবক সম্প্রদায় দ্বারা গীত হইয়া শ্রোতৃবর্গকে বিমোহিত ও উত্তেজিত করিয়াছিল। এই সঙ্গীত ও জয়ধ্বনি শেষ হইলে শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ নিম্নলিখিত মহোদয়গণের ধন্যবাদ করেন।
১। শ্রীযুক্ত মতিলাল রাধাকিষণ, কাষ্ঠ বিক্রেতা। ইনি অসময়ে, প্রার্থনা পত্র প্রাপ্তি মাত্রেই এই রঙ্গমঞ্চে সভা করিবার অনুমতি প্রদান করেন।
২। বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ মল্লিক ১৬৪ নং বারাণসী ঘোষের ষ্ট্রীট। ইনি স্বহস্তে নির্ম্মিত ৭ খানি কারুকার্য্য সংবলিত কাষ্ঠফলক “বন্দে মাতরম” শব্দাঙ্কিত করিয়া সাতজনকে প্রদান করিবার জন্য সম্পাদকের হস্তে সমর্পণ করিয়াছিলেন। তাহা ঐ সভায় প্রদত্ত হইয়াছে।
৩। এইচ, বসু, ইনি কুন্তলীন প্রেসের স্বত্বাধিকারী। প্রদত্ত রুমাল ছাপিবার জন্য অভ্যর্থনা সমিতির নিকট হইতে এক কপর্দ্দকও গ্রহণ করেন নাই।
৪। ভবানীপুরের বাবু প্রভাসচন্দ্র দাস। ইনি বিপিন বাবু ইন্দ্র বাবু এবং যতীন বাবুকে উপহার দিবার জন্য তিনটি বন্দে মাতরম্ অঙ্কিত নিকেল নির্ম্মিত সেফটি পিন ও তিনটি পুষ্পগুচ্ছ প্রদান করিয়াছিলেন।
২। জোড়াসাকো সেন কোম্পানির স্বত্বাধিকারী শ্রীযুক্ত অমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী। ইনি সমুদয় পুষ্পগুচ্ছ ও মাল্য প্রভৃতি প্রদান করিয়াছিলেন।
ভূপেন্দ্র নাথ বসুর পত্র
অনারেবল বাবু ভূপেন্দ্র নাথ বসু সভায় উপস্থিত হইতে পারেন নাই বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিয়া একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন, বৃষ্টির প্রাবল্যে ও জনতার বাহুল্যে ঐ পত্র কিঞ্চিৎ বিলম্বে মঞ্চোপরি উপস্থাপিত হইয়াছিল। সুতরাং তাহা এই সময়ে পঠিত হইল। পত্রখানি এই—
“My dear Kabyabisarad, I am truly sorry that a too recent bereavement renders it impossible for me to attend to-day’s meeting held in honour of the martyrs in the Swadeshi cause. I am in hearty sympathy with the object of the meeting. It is the height of supercilious sanctimoniousness to treat these gentlemen as convicted criminals: neither history nor ethics would justify such an attitude of mind towards men who have dared the terrors of the law for the sake of their convictions. Constitutional authority not unoften represents hidebound superstition or ignorance; and those great men who have hallowed the history of the world have suffered for what they believed and preached as the true principles of religious or national life. Jesus of Nazareth, whom the peoples of Europe profess to worship and adore, was a convict, sentenced by a constitutional authority; and the regenerator of the French nation, Joan of Arc, was burned at the stake by authority legally exercised. I might name Luther and Galileo, and coming to our own times and to lesser men, the Nonconformist ministers who have suffered imprisonment for disobedience of the Education Act. Our gratitude is due to our friends for proving to the world that the Bengalees of today can do more than talk— they can suffer for their country-and their truest reward will be not what we can offer them at this meeting, but their example always kept in sight and borne in mind. May He, who holds in the hollow of his palm the weak and the strong, and judges them equally, grant them years of strenuous work, to the glory of His name and the everlasting good of my unhappy country, is the earnest prayer of.
Bhupendra Nath Bose,
প্রিয় কাব্যবিশারদ-স্বদেশের কল্যাণ কামনায় যাঁহারা লাঞ্ছিত হইয়াছেন, তাঁহাদের প্রতি সম্মান প্রকাশের সভায়, অধুনাতন একটা পারিবারিক দুর্ঘটনার জন্য উপস্থিত হইতে পারিলাম না বলিয়া বড়ই দুঃখিত হইয়াছি। অদ্যকার সভার কার্য্যে আমার আস্তরিক সহানুভূতি আছে। এই সকল লাঞ্ছিত মহাত্মাগণকে রাজদণ্ডে দণ্ডিত জ্ঞানে ঘৃণা করা বড়ই নীচতার পরিচায়ক। দেশের মঙ্গলের জন্য যাঁহারা রাজদণ্ড দেখিয়াও বিচলিত হন নাই, তাঁহাদিগকে ঘৃণা করা ঐতিহাসিক অথবা দার্শনিক কাহারও দৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত নহে। রাজপুরুষগণ অনেক সময়ে ভ্রমে পতিত হইয়া প্রকৃত মহাত্মাদিগকে লাঞ্ছিত করেন সত্য, কিন্তু মহাত্মারা কখনও রাজপুরুষগণের ভ্রুকুটী ভঙ্গীতে বিচলিত হন না। যে যিশুখৃষ্টকে আজ সমগ্র ইউরোপ পূজা করিতেছেন বলিয়া প্রকাশ, সেই খৃষ্টও বিধিসঙ্গত বিচারালয়ে রাজদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন; ফ্রান্সের উদ্ধারকর্ত্রী জোয়ান অফ আর্ককে রাজপুরুষগণ রাজ বিধানের দোহাই দিয়া দগ্ধ করিয়াছিল; মার্টিন লুথার, গ্যালিলিও এবং আমাদের সমকালে বহু সংখ্যক নন্কনফাৰ্মিষ্ট মন্ত্রী কারাদণ্ড ভোগ করিয়াছেন। যে সকল মহাত্মা সমগ্র পৃথিবীর নিকট সপ্রমাণ করিয়াছেন যে, বাঙ্গালী কেবল বাক্যবীর নহেন, কর্ম্মবীর, তাঁহারাও দেশের কল্যাণের জন্য সকল প্রকার উৎপীড়ন সহ্য করিতে পারেন, সেই সকল মহাত্মা বাস্তবিকই আমদের আস্তরিক ধন্যবাদের পাত্র। অদ্যকার সভাতে আমরা যাহা উপহার জিতেছি, তাহাই তাঁহাদের চরম পুরস্কার নহে; দেশের সকলেই যে তাঁহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিতে চেষ্টা করিবে, ইহাই তাঁহাদের প্রকৃত পুরস্কার। যিনি দুর্ব্বল ও বলবান্কে সমদৃষ্টিতে দেখিয়া সমান বিচার করেন, সেই সর্বনিয়ন্তা ভগবান্ এই সকল মহাত্মাদিগকে দেশের মুখ উজ্জল করিবার জন্য—চিরদুঃখিনী বঙ্গভূমির দুঃখ মোচন করিবার জন্য, সুদীর্ঘ আয়ুঃ প্রদান করুন, ইহাই আমার প্রার্থনা।
অনন্তর “দণ্ড দিকে চণ্ডমুণ্ডে এস চণ্ডি যুগান্তরে, পাষণ্ড প্রচণ্ড বলে অঙ্গ খণ্ড খণ্ড করে,” এই আগমনী সঙ্গীত গীত হইল। তৎপরে বানারীপড়ার (বরিশাল) শ্রীযুক্ত প্যারীমোহন গুহ ঠাকুরত। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া একটী অনতিদীর্ঘ বক্তৃতা করেন। এই অশীতপর বৃদ্ধের প্রত্যেক কথায় লোকের হৃদয় বিচলিত হইয়াছিল। কলিকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিষ্ট্রেট, জানকীনাথ দত্ত নামক যে বালকটিকে বেত্রদণ্ডে দণ্ডিত করিয়াছিলেন, সেই বালকের পিতা বাবু বসন্তকুমার দত্ত, পুত্রের মুখপাত্র স্বরূপ সভার অনুষ্ঠাতৃবর্গের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনন্তর হবিবপুরের লাঞ্ছিত ব্যক্তিদিগের অন্যতম বাবু বিপিনচন্দ্র গুহ সভার কর্ত্তৃপক্ষের ধন্যবাদ করিয়া সভাপতির হস্তে নয় আনা পয়সা দিয়া বলিলেন যে, তিনি এবং তাঁহার সহযোগীরা যখন কারামুক্ত হয়েন, তখন কারাধ্যক্ষ তাহাদের পাথেয় স্বরূপ এই নয় আনা পয়সা প্রদান করিয়াছিলেন। এই পয়সা ন্যাশন্যাল ডিফেন্সফাণ্ডে প্রেরণ করিবার জন্য বিপিন বাবু সভাপতিকে অনুরোধ করিলেন।
ঢাকাবাসীর পক্ষ হইতে বাবু জ্ঞানচন্দ্র রায় বি, এল, সভার অনুষ্ঠাতাদিগের ধন্যবাদ করিবার জন্য দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন যে, শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ মহাশয় দেশের কল্যাণ কামনায় যে প্রকার অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়াছিলেন নিজের শারিরীক সুখ দুঃখের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ না করিয়া যে প্রকার দেশে দেশে স্বদেশী আন্দোলনের জন্য ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেছেন, তাহাতে তিনি সকলেরই ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছেন। তাহার উপর প্রভূত অর্থব্যয় পূর্ব্বক তিনি লাঞ্ছিতদিগের উপহার প্রদানের ব্যবস্থা করিয়া বঙ্গবাসী মাত্রেরই কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন। আর, মাননীয় সুরেন্দ্র বাবুর বিষয় কিছু বলাই নিস্প্রয়োজন। সুরেন্দ্র বাবুর দেশহিতৈষিতা, তাঁহার সাহস, তাঁহার অদম্য উৎসাহ কেবল বঙ্গদেশে নহে, সমগ্র ভারতে অতুলনীয়। সুরেন্দ্র বাবুর পদাঙ্ক অনুসরণ করিতে পারিলে সকলেই আপনার জীবন সার্থক বলিয়া মনে করেন। প্রবীণ স্বদেশহিতৈষী, সুবিজ্ঞ, পণ্ডিতপ্রবর নরেন্দ্রনাথ সেন যে ইণ্ডিয়ান মিরারের গুরুতর সম্পাদকীয় ভার গ্রহণ করিয়াও দেশের কার্য্যে জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন, ইহা বঙ্গবাসী মাত্রেরই গৌরবের কথা। নরেন্দ্র বাবু এই সভাপতির আসন গ্রহণ করিয়া লাঞ্ছিত দেশভক্তগণের গৌরব শতগুণ বৰ্দ্ধিত করিয়াছেন। সুরেন্দ্র বাবু ও নরেন্দ্রবাবুর ধন্যবাদ উপযুক্ত ভাবে করা আমার সাধ্যাতীত।
তবে কাব্যবিশারদ মহাশয়ের বিষয়ে আমি আরও কয়েকটা কথা না বলিয়া থাকিতে পারি না। তাঁহার মত ব্যক্তি এরূপ শ্রম স্বীকার ও অকাতরে অর্থব্যয় না করিলে অদ্যকার এই অলৌকিক দৃশ্য নয়নগােচর হইত না। এ প্রস্তাব তাঁহার, এ উদযােগ তাঁহার, ব্যয় ভারও তাঁহার; তিনি বিঘ্নে নিরস্ত হন নাই, সুতরাং এ উদ্যোগ যে কার্যে পরিণত হইয়াছে সেজন্য তিনি স্বদেশবাসীর অজস্র ধন্যবাদের পাত্র। অধিক কি বলিব, তাঁহার গুণগ্রাহিতায় আমরা মুগ্ধ হইয়াছি।
জ্ঞানচন্দ্র বাবুর বক্তৃতা শেষ হইলে মৌলবী লিয়াকৎ হােসেন বলিলেন যে, ১৬ই ফেব্রুয়ারী শুক্রবার অপরাহ্ণে কলিকাতার মুসলমানগণ লাঞ্ছিত ব্যক্তিদিগের প্রতি সম্মান প্রকাশ করিবার জন্য এলবার্ট হলে একটী সভা করিবেন। অনন্তর ডাক্তার গফুর ওজস্বিনী ভাষায় একটা অনতিদীর্ঘ বক্তৃতা করিলে সভাপতির ধন্যবাদ পূর্ব্বক সভা ভঙ্গ করা হইল। সভাভঙ্গের পূর্বে স্বদেশ-সেবক সম্প্রদায় আর একটা জাতীয় সঙ্গীত গান করিয়াছিলেন।
দ্বিতীয় সভা
উল্লিখিত সভা ভঙ্গকালে প্রবলবেগে বারি বর্ষণ হইতেছিল বলিয়া অন্যূন তিন সহস্র শ্রোতা গ্রাণ্ড থিয়েটার পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই। তখন সর্বসম্মতিক্রমে তথায় একটী স্বদেশী সভার অধিবেশন হইল। এই সভায় শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। বাবু বিপিনচন্দ্র পাল, পণ্ডিত গীষ্পতি কাব্যতীর্থ, ডাক্তার আবদুল গফুর প্রভৃতি অনেকে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন। স্বদেশ-সেবক সম্প্রদায় এই সভাতেও জাতীয় সঙ্গীত গান করিয়াছিল।
মুসলমান সমাজের সম্মান প্রকাশ
৪ঠা ফাল্গুন শুক্রবার লাঞ্ছিত স্বদেশভক্তদিগের অভ্যর্থনা করিবার জন্য মুসলমান সমাজের কয়েকজন নেতা এলবার্ট হলে একটী সভার অধিবেশন করিয়াছিলেন। ঐ দিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছিল এবং ক্রমাগত বৃষ্টিপাত হইতেছিল। এরূপ দুর্য্যোগ সত্ত্বেও সভার কার্য্য নির্ব্বেঘ্নে সুসম্পন্ন হইয়াছিল; সভায় অনুষ্ঠানকারীরা লাঞ্ছিতদিগের প্রতি যথোচিত আদর ও সম্মান প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং আতর পুষ্পমাল্য ও পুষ্পগুচ্ছ প্রদান পূর্ব্বক তাহাদিগের প্রতি বৰ্দ্ধন করিয়াছিলেন। মৌলবী লিয়াফৎ হোসেন, মুন্সী দেদারবক্স এবং ডাক্তার আবদুল গফুর প্রভৃতি এই স্বদেশ-সেবকদিগকে প্রীতিপূর্ণ-হৃদয়ে আলিঙ্গন করেন। দুর্য্যোগবশতঃ সেদিন লাঞ্ছিতদিগের সকলে সভাস্থলে উপস্থিত হইতে পারেন নাই। লাঞ্ছিতদিগের মধ্যে বাবু ধীরেন্দ্রনাথ সিংহ, বাবু স্বরেন্দ্রনাথ সিংহ, বাবু ভূতনাথ ভট্টাচার্য্য ও বাবু নগেন্দ্রনাথ গুহ রায় এই কয়েক ব্যক্তি সভায় উপস্থিত হইয়াছিলেন।
সিটি কলেজের সঙ্গীত শিক্ষক বাবু হেমচন্দ্র সেন দ্বারা কতিপয় জাতীয় সঙ্গীত গীত হইবার পর সভার কার্য্য আরব্ধ হয়। মুন্সী দেদার বক্স মহোদয়ের প্রস্তাব এবং সমবেত জনগণের সম্মভিক্রমে মৌলবী লিয়াকৎ হোসেন সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। অতঃপর সভাপতি মহাশয়ের অনুরোধক্রমে মুন্সী দেদার বক্স বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, হিন্দু ও মুসলমান এই উভয় সম্প্রদায় দীর্ঘকাল সম্প্রীতি সহকারে এদেশে বাস করিতেছেন। মুসলমান নরপতিদিগের শাসনকালে ভারতবর্ষ বিশেষ সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়াছিল এবং হিন্দু মুসলমানের মধ্যে আন্তরিক প্রতি ও সৌহৃদ্য বিদ্যমান ছিল। এখনও মুসলমানদিগের প্রতি হিন্দুদিগের প্রীতি ও সহৃদয়তা অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে। একবার বক্তা রেলগাড়ীতে দারুণ বেদন রোগে আক্রান্ত হইলে উপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় নামক একজন হিন্দু যুবক শুশ্রূষা করিয়া তাঁহার প্রাণ রক্ষা করেন। দেশের কল্যাণ সাধন করিতে গিয়া যাঁহারা লাঞ্ছিত হইয়াছেন, এবং স্বদেশবাসীর নিকট সম্মান-সুচক পদক প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহাদিগের মধ্যে একজনও মুসলমান নহেন,— ইহাই গভীর পরিতাপের বিষয়।
অতঃপর ডাক্তার আবদুল গফুর বক্তৃতা করেন, তিনি মুসলমান যুবকদিগকে স্বদেশ-প্রীতি ও স্বদেশের মঙ্গল সাধন বিষয়ে লাঞ্ছিত স্বদেশভক্তদিগের পদাঙ্কামুসরণ করিতে বলেন এবং মুক্তকণ্ঠে লাঞ্ছিত ব্যক্তিবর্গের ধন্যবাদ করেন।
গফুর মহোদয়ের বক্তৃতা শেষ হইলে শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ মহাশয় বলেন যে,—স্বদেশের কার্য্যে মুসলমান সম্প্রদায়ও নিশ্চেষ্ট নহেন। তাঁহারাও স্বদেশী শিল্পের উন্নতি ও প্রচলনকল্পে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিতেছেন। মুসলমানেরা যে কর্তৃপক্ষের হস্তে অধিক পরিমাণে নিগৃহীত হন নাই, তাহার কারণ মুসলমানদিগের স্বদেশ-সেবার অভাব নহে। কর্তৃপক্ষের অবলম্বিত কূটনীতির ফলেই এইরূপ ঘটিয়াছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ উপস্থিত করিবার জন্য তাঁহারা ঐরূপ ভেদনীতির অনুসরণ করিতেছেন। হিন্দু-মুসলমানে চিরদিনই সম্ভাব আছে, মুসলমান সম্রাটদিগের শাসনকালে হিন্দু মুসলমান স্থখস্বাচ্ছন্দ্যে এবং সুহৃদ্যভাবে কালযাপন করিয়াছেন। কিন্তু মুসলমানের সহিত হিন্দুর মিলন ও সম্প্রীতি কর্তৃপক্ষের শাসননীতির প্রতিকুল। এইজন্য তাঁহারা উভয় জাতির মধ্যে বিবাদ ঘটাইবার চেষ্টা করিতেছেন। তবে গবর্ণমেণ্ট এ বিষয়ে যতই চেষ্টা করুন না কেন, পরিণামে তাঁহাদিগের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিফল হইবে। যে সকল নাম সভামধ্যে সে দিন প্রকাশিত হয় নাই, তন্মধ্যে যে একজনও নিগৃহীত মুসলমান ছিলেন না, একথা কে বলিতে পারে? নানা কারণে এ অবস্থায় সকলের নাম প্রকাশিত হয় নাই। যাহা হউক, এ স্থলে সে বিষয়ে অধিক আন্দোলন করা অনাবশ্যক।
অতঃপর বাবু লালবিহারী সাহা খৃষ্টান সমাজের পক্ষ হইতে সভার কার্য্যে সম্পূর্ণ সহানুভূতি প্রকাশ করেন। ইহার পর বাবু কৃষ্ণকুমার মিত্র ও সভাপতি মহোদয় প্রভৃতি বক্তৃতা করিলে শ্রীযুক্ত গীষ্পতি রায়-চৌধুরী কাব্যতীর্থ সভার উদ্দেশ্যও কার্য্যের আলোচনা পূর্ব্বক সভাপতি মহোদয়ের ধন্যবাদ করিলে শ্রীযুক্ত গীষ্পতি রায়-চৌধুরী কাব্যতীর্থ সভার উদ্দেশ্যও কার্য্যের আলোচনা পূর্ব্বক সভাপতি মহোদয়ের ধন্যবাদ করিলে সভাভঙ্গ হয়।