Durga Puja in Bengal

বঙ্গদেশীয় আগমনীর গান

Banga Desiya Agamanir Gan

গিরিরাজ হে, জামায়ে এনো মেয়ের সঙ্গে

গিরিরাজ হে, জামায়ে এনো মেয়ের সঙ্গে।
মেয়ের যেরূপ মন, মায়ে বোঝে যেমন,
পুরুষ পাষাণ তুমি, বুঝ না তেমন,
তাই শিবের নাম করি, আমার নাম ধরি,
উপহাস করিতেছ রঙ্গে॥
আমি ভুলি নাই আরবারের কথা,
মায়ের মনে, আমি মা হয়ে দিয়াছি ব্যথা,
উমা এলো বাহিরদুয়ারে,
কোলে করি ত্বরা ক’রে, জিজ্ঞাসি উমারে,
“আমার শিব তো আছেন ভাল?”
উমা বলে – “আছেন ভাল”, – চোখে দেয় অঞ্চল,
বলে – “চোখে কি হলো? আমার চোখে কি হলো?”
আমি বুঝিনু সকল, কেন চোখে দেয় অঞ্চল,
হিয়ের জল ঝিয়ের চোখে উথলিল,
জামায়ের প্রসঙ্গে॥
আমি ভুলি নাই আরবারের কথা,
সরমে মরমের কথা, হিয়েয় আছে গাঁথা।
কার্তিকে রাখিয়া বুকে, নাচায় গৌরী থেকে থেকে,
সোনার কার্তিক তোমায় দেখে, উঠে চমকে;
বলে তোমায় দেখিয়ে – “মা, ও মা, ও কে দাঁড়ায়ে?”
উমা বলে – “তোমার দাদা ঐ, বাবা, আমার বাবা ঐ।”
বাপ-সোহাগে বাপের ছেলে, জড়িয়ে মায়ের ধরে গলে,
বলে – “মা, আমার বাবা কই,
বাবা কেন এল না, ও মা বল না!”
ব’লে কেশে ধ’রে টানে, উমা চাহি আমার পানে,
বলে – “কেন এলেন না, তোমার দিদি জানে।”
আমি সেই অবধি, সরমে মরমে আছি মনোভঙ্গে॥

অক্ষয়চন্দ্র সরকার


বল গিরি, এ দেহে কি প্রাণ রহে আর

বল গিরি, এ দেহে কি প্রাণ রহে আর,
মঙ্গলার না পেয়ে মঙ্গল সমাচার।
দিবানিশি শোকে সারা, না হেরিয়া প্রাণ-তারা,
বৃথা এই আঁখি-তারা, সব অন্ধকার।
খেদে ভেদ হয় মর্ম, মিছে করি গৃহে কর্ম,
মিছে এ সংসার-ধর্ম, সকলি অসার।
তুমি তো অচল পতি, বল কি হইবে গতি,
ভিক্ষা করে ভগবতী কুমারী আমার।
বাঁচি বল কার বলে, দুঃখানলে মন জ্বলে,
ডুবিল জলধি-জলে প্রাণের কুমার।
ত্রিজগতে নাহি অন্যে, একমাত্র সেই কন্যে,
না ভাব তাহার জন্যে তুমি একবার!

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত


উমা গো যদি দয়া কোরে হিমপুরে এলি

উমা গো যদি দয়া কোরে হিমপুরে এলি,
আয় মা করি কোলে।
বর্ষাবধি হারায়ে তোরে, শোকের পাষাণ বক্ষে ধোরে,
আছি শূন্য ঘরে।
কেবল মরি নাই – মা বেঁচে আছি,
দুর্গা দুর্গা নাম কোরে॥
একবার আয় মা বক্ষে ধরি, পুত্রশোক নিবারি,
চাঁদমুখে শঙ্করী, ডাক ‘মা’ বোলে।
শোকের অনল ছিল প্রবল, এসে নিভালে।
আমি অচলা নারী, অচলের নারী,
যেতে নারি কৈলাসপুরে আনতে তোমারে।
আমার বন্ধু-বান্ধব নাই, কারে আর পাঠাই,
এলে, – দেখলাম মা তোমারে!
তুমি আসবে বোলে সজীব বিল্বমূলে কল্লেম বোধন,
তার সুফল আজ ফল্লো কপালে॥

উদয়চাঁদ বৈরাগী


এলো গিরিনন্দিনী, লয়ে সুমঙ্গলধ্বনি

এলো গিরিনন্দিনী, লয়ে সুমঙ্গলধ্বনি,
ঐ শুন গো রাণি।
চল বরণ করিয়ে, উমা আনি ধেয়ে,
কি কর পাষাণরমণী গো।
অমনি উঠিয়ে, পুলকিত হইয়ে,
ধাইল যেন পাগলিনী।
চলিতে চঞ্চল, খসিল কুণ্ডল,
অঞ্চল লয়ে ধরণী।
আঙিনার বাহিরে, হেরিয়ে গৌরীয়ে, দ্রুত
কোলে নিল রাণী। অমিয়া বরষি, উমামুখশশী,
চুম্বয়ে যেন চকোরিণী।
গৌরী কোলে করি, মেনকাসুন্দরী, ভবনে
লইল ভবানী। কমলাকান্তের, পুলকে অন্তর,
হেরি বিধু ও মুখখানি।

কমলাকান্ত ভট্টাচার্য


এলো গৌরী ভবনে আমার

এলো গৌরী ভবনে আমার। তুমি ভুলে ছিলে
বুঝি মা বলে এতদিনে। চিরদিনে। মায়ের
পরাণ কান্দে রাত্র দিন, শয়নে স্বপনে হেরি গো,
ও মুখ তোমার।
কত কামনা করিয়ে কাননে, আমি পেয়েছি যতনে,
চন্দন ফুলে, নব বিল্লদলে, পূজেছিলাম গঙ্গাধরে,
গো হইয়ে নিরাহার।
গিরিপুর-রমণী চারি পাশে, কত কহিছে হাস্য-
পরিহাসে, তরুমূলে ঘর স্বামী দিগম্বর তা নহিলে
আর কত দিন হইত তোমার।
তুমি পুণ্যবতী গিরিরাণী, শুন কমলাকান্তের বাণী,
জগতজননী তোমার নন্দিনী, বিরিঞ্চিবাঞ্ছিত ধন
গো, চরণ যাহার।

কমলাকান্ত ভট্টাচার্য


আমার উমা এলো বলে, রাণী এল্যোকেশে ধায়

আমার উমা এলো বলে, রাণী এল্যোকেশে ধায়। যত নগরনাগরী,
সারি সারি সারি, দৌড়ি গৌরী-মুখপানে চায়॥
কারু পূর্ণ কলসী কক্ষে, কারু শিশু বালক বক্ষে; কার আধ
শিরসি বেণী, কার আধ অলকা শ্রেণী; বলে চল চল চল, অচল-তনয়া
হেরি ওমা! দৌড়ে আয়॥
আসি নগর-প্রান্তভাগে, তনু পুলকিত অনুরাগে; কেহ চন্দ্রানন
হেরি, দ্রুত চুম্বে অধর-বারি; তখন গৌরী কোলে করি, গিরিনারী,
প্রেমানন্দে তনু ভেসে যায়॥
কত যন্ত্র মধুর বাজে, সুর-কিন্নরীগণ সাজে; কেহ নাচত কত
রঙ্গে, গিরিপুর-সহচরী-সঙ্গে; আজু কমলাকান্ত, গো! হেরি নিতান্ত,
মগ্ন দুটি রাঙাপায়।

কমলাকান্ত ভট্টাচার্য


কি শুনালে গিরিবর, উমা কি ভবনে এলো

কি শুনালে গিরিবর, উমা কি ভবনে এলো?
ভবেরি ভবানী আমার ভবন করিল আলো!
উমা-শশী না হেরিয়ে ছিল নয়ন অন্ধ হোয়ে,
এবে নয়ন-তারা নিরখিয়ে আঁখি মম জুড়াইল॥